তাওবাহ



কুকুরের কান্নার মতো খানিকক্ষণ একটানা শব্দ। কিছুটা সময় বিরতি। তারপর আবার একটানা একঘেয়ে কান্না… মেশিনগানটা সমানে তপ্ত সীসা উগড়ে দিচ্ছে। খুব কাছ থেকে একটা কালাশনিকভ গর্জে উঠলো, কুকুরের কান্নার প্রতিউত্তরে যেমন কেঁদে ওঠে এলাকার ‘পাতি’ কুকুর। টি-১৪ ট্যাঙ্কের নিরাপদ আশ্রয়ে এগিয়ে আসছে মৃত্যদূতেরা। এতো কাছে যে অচিন ভাষায় তাদের টুকরো টুকরো কথা কানে ভেসে আসছে। বিকট একটা বিস্ফোরণ হল এই সময়।বহুতল সরকারি ভবনটি নিমিষেই মিশে গেল মাটির সঙ্গে।
.
দেয়ালের ফুটো থেকে চোখ সরিয়ে ফেলল সোনালি চুলের দীর্ঘদেহী এক যুবক। কাপড় দিয়ে ঢেকে ফেলে হাতের জলন্ত সিগারেটে বেশ বড় একটা টান দিল। তারপর মেঝেতে একদলা থুথু ফেলল। তাকালো পাশে বসা নীল নয়না সঙ্গিনীর দিকে। ভয়ে মেয়েটার চেহারা একদম সাদা হয়ে গিয়েছে। মোমের মতো। নগ্ন আতঙ্ক দুই নীল চোখ জুড়ে। এই সেই দুই নীল চোখ, প্রথম দেখাতেই যার ফাঁদে পড়ে গিয়েছিল যুবক। খুব রহস্যময় মনে হয়েছিল। বিয়ের পাঁচ বছরেও যুবক রহস্যের কোন কুলকিনারা করতে পারেনি। এখন অবশ্য কোন রহস্য নেই দু চোখে… যে কেউ পড়ে ফেলতে পারবে… সহজ সরল ভয়। মৃত্যুর ভয়, জলপাই রঙের উর্দি পরা পশুদের হাতে অপমানিত হবার ভয়। স্ত্রীর মুঠিতে একটু জোরে চাপ দিল যুবক। স্মিতহাস্যে বললো,‘ ভয় পেয়োনা। কিচ্ছু হবেনা। সব ঠিক হয়ে যাবে দেখো তুমি!’
.
যুবকের চেহারায় ভয়ের কোন চিহ্ন নেই । অসম্ভব শান্ত দেখাচ্ছে তাকে। অথচ ভেতর ভেতর সে তার স্ত্রীর চেয়েও বেশি ভয় পেয়েছে।‘… সব ঠিক হয়ে যাবে’ ফালতু কথা! কিচ্ছু ঠিক হবেনা, কিচ্ছু না। পশুরা এই অন্ধকার ঘরে তাদের ঠিক খুঁজে বের করবে। তার সামনে তার স্ত্রীকে ছিঁড়ে খুবলে খাবে… তারপর ট্যাঙ্কের নিচে পিষে মারবে দুইজনকেই। মৃত্য তাদের অবধারিত। এর অন্যথা কিছু হবে না।
হয়নি।
হয়নি যুবকের বোন আর বোন জামাইয়ের ক্ষেত্রে, হয়নি তাদের মোটাসোটা গোলগাল ভালো মানুষ প্রতিবেশী দম্পতির ক্ষেত্রে..
হিপ পকেট থেকে লুগ্যারটা বের করল যুবক। ম্যাগাজিনে মাত্র ২ টা বুলেট অবশিষ্ট আছে , সেফটি ক্যাচ তুলে দিল সাবধানে…কোনমতেই স্ত্রীকে পশুদের হাতে পড়তে দেওয়া যাবেনা।
.
যুবকের জায়গায় কল্পনা করুন নিজেকে। যুবকের স্ত্রীর জায়গায় আপনার নিজের স্ত্রী। অথবা বোন। কল্পনা করুন। ভীষণ বিপদ ঘিরে ধরেছে আপনাদের। মৃত্যুর পূর্বে নিজের চোখে আপনজনকে অপমানিত হতে দেখা! এই ভীষণ বিপদের মুহূর্তে কেউ যদি মুক্তির টিকেট অফার করে আপনাকে আপনি কি সেটি ফিরিয়ে দিবেন?
.
আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যখন কসম করে কিছু বলেন তখন সেটা প্রচন্ড গুরুত্ব বোঝায়। তিনি মামুলি কোন বিষয়ে কসম করেননা। আল্লাহ্‌ (সুবঃ) খুব শক্ত কসম করে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে’। মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে, রয়েছে ভীষণ বিপদের মধ্যে। এই বিপদ যুদ্ধক্ষেত্রের যে কোন বিপদের চেয়েও অনেক অনেক গুন বেশি। যুদ্ধক্ষেত্রের মৃত্যু, অপমান তো মাত্র একবার। প্রাণপাখিটা উড়ে গেলেই সব শেষ। কিন্তু মৃত্যুর পরের সেই অনন্ত জীবনের জাহান্নামের আগুনের শাস্তি, যাক্কুম বৃক্ষ আর ফুটন্ত পানির শাস্তির কোন সীমা নেই,শেষ নেই। সময়ের কোন ফ্রেমে যাকে বোঝা যায়না।
.
মানুষ ভুলে যায় এই শাস্তির কথা, এই বিপদের কথা। মানুষ ভুল করে। জাহান্নামের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও অবাধে আল্লাহ্‌র বিরুদ্ধচারণ করে।
.
রহমান আল্লাহ্‌ জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার জন্য মানুষকে এক স্পেশাল অফার দিয়ে রেখেছেন। ‘তওবা’র অফার। যেকোন সময় যেকোন মানুষ আন্তরিক তওবা করলে আল্লাহ্‌ (সুবঃ) তাকে এই ভীষণ বিপদ থেকে রক্ষা করবেন। চিরসুখের জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। তওবার এই অফার আল্লাহ্‌ বান্দাকে দিয়ে রেখেছেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। কিন্তু আমরা প্রতারনা করি নিজের সাথে, এখন মজা করি পরে তওবা করব, বয়স হোক।
.
কিন্তু আমরা কি নিশ্চিত? কবরের প্রশ্নের মুখোমুখি হবার আগে, আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করার আগে তওবাহর সুযোগ পাবো? মৃত্যু কখন আসবে আমরা কি জেনে গেছি? মৃত্যু কি আমাদের এক একজনের জুতো ফিতের চেয়েও আরো কাছের না?
.
#KnowYourDeen

source

Leave a Reply