দাওয়াহর পথ



দাওয়াহর আগে নিজের নিয়্যাতকে বিশুদ্ধ করে নাও। প্রতিটি শব্দ উচ্চারনের আগে, প্রতিটি লেখার আগে নিজেকে প্রশ্ন করো – এই কথাটা কেন আমি বলছি? কোন উদ্দেশ্যে? দাওয়াহর কাজ করতে গেলে অনেকে সময় তোমার উপর অপবাদ দেওয়া হবে, অথবা কোন তর্ক-বিতর্কে তুমি জড়িয়ে যাবে। কোন কথার জবাব দেয়ার আগে নিজেকে প্রশ্ন কর, এটা কি তুমি আত্মপক্ষ সমর্থন কিংবা তর্কে জেতার জন্য বলছো নাকি এটা তোমার দাওয়াহর সাথে সম্পৃক্ত বিষয় বলে বলছো? যদি উত্তর পাও যে তুমি নিজের জন্য জবাব দিতে উদ্যত হচ্ছো, তাহলে ঐ জবাব দেয়ার কোন প্রয়োজন নেই।
.
অর্ধেক নিজের জন্য আর অর্ধেক আল্লাহর জন্য তর্ক-ঝগড়ায় জড়িয়ে যাবার চাইতে আল্লাহর রাহে সম্পূর্ণ নিশ্চুপ থাকা অনেক ভালো। নিজেকে নিয়ে চিন্তা করো না। আদর্শকে ডিফেন্ড করো, নিজেকে না।
‘ইলম যখন আন্তরিকতা ও আমল থেকে বিচ্ছিন্ন হয় তখন তা ব্যক্তির উপকারে আসে না, বরং তার ক্ষতির কারন হয়। আমল ছাড়া ‘ইলম, আন্তরিকতা ছাড়া ‘ইলম পরিতাপের কারন হয়। ‘ইলম অর্জনের উদ্দেশ্য নিজের ফ্যান-ফলোয়ার, অনুসারী বাড়ানো না। ‘ইলমের উদ্দেশ্য পপুলারিটি পাওয়া না। তালিবুল ‘ইলমগণ রকস্টার কিংবা কমেডিয়ান না তারা ‘ইলম অন্বেষণকারী।
.
সালাফগণ বলতেন যখন কেউ ‘ইলমের অন্বেষণ করে তখন সেটা তার কাজের মধ্যে প্রতিভাত হয়। যখন একজন ‘ইলমের দিকে মনযোগী হয় তখন তার আচার-আচরন, বেশভূষা, অ্যাটীটিউড সব কিছুতেই তার ছাপ পড়ে।
শায়খ আহমাদ মুসা জ্রিব্রিল হাফিযাহুল্লাহ
.
২.
আলহামদুলিল্লাহ ত্রিশ বছরের বেশি হবে আমি দাওয়াহর কাজে আছি। দীর্ঘদিনের এই মেহনত, মুজাদাহা, পরিশরম ও অভিজ্ঞতার পর আমি কয়েকটি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি –
.
যে আন্দোলন বা ইসলামী রাজনীতি বা জিহাদি কার্যক্রম আত্মশুদ্ধি ও হৃদয়কে শুচিশুদ্ধ করার উপর প্রতিষ্ঠিত হবে না, তার পতন অবশ্যম্ভাবী। তার কাঠামো যটোই মজবুত হোক না কেন। কারন, দাওয়াহর কাজ এমন যে যারা এ কাজে সম্পৃক্ত তাদের সে অহংকারী করে তোলে। তার দাওয়াহর মাধ্যমে নতুন নতুন লোক যোগদানের ফলে তার মধ্যে সাফল্যের অহংকার ভর করে। এমন অবস্থায় দাঈ যদি সে কাজের উপযুক্ত না হয় তাহলে সে দাওয়াহর জন্য এবং ইসলামের জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়ায়। তাই দাওয়াহর কাজে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের আত্মশুদ্ধির ব্যাপারে সচেতন হওয়া দরকার।
.
যে ব্যক্তি দাওয়াহর কাজে মশগুল রইলো, কিন্তু নিজের নফসকে পরিশুদ্ধ করে নিল না; চিন্তার নির্মল প্রস্রবন ধারায় সে স্বচ্ছ হল না; তার দাওয়াহ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হতে পারে না। আল্লাহর ইবাদতে সে আন্তরিক নয়। তার হৃদয়ে পংকিলতা জমাট বেঁধে যায়।
শায়খ আব্দুল্লাহ আযযাম রাহিমাহুল্লাহ
.
৩.
তাওহিদের ও হক্বের দাওয়াহর বৈশিষ্ট্য হল একসময় না একসময় এই দাওয়াহর সাথে যুক্ত ব্যক্তি পরীক্ষিত হবে। এটা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সুন্নাহ। যদি কোন ব্যক্তি সব মিথ্যা ইলাহ এবং সব মিথ্যে আনুগত্যকে বাদ দিয়ে একমাত্র আল্লাহ ‘আযযা ওয়া জাল – কে ইলাহ হিসেবে গ্রহন করে, যদি সে বাকি সব মিথ্যা ইলাহর আনুগত্য করতে অস্বীকার করে তবে তাকে পরীক্ষিত হতে হবে। কারন তাওহিদ কোন হালকা বিষয় না। এটি এমন একটি বিষয় যা ফিরআউন, নমরুদ, আবু জাহল এবং তাদের অনুসারীদের উদ্বিগ্ন ও ক্রোধান্বিত করে। আর তারা তাদের সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করে তাওহিদের প্রচারক ও অনুসারীদের নিশ্চিহ্ন করতে। যুগে যুগে এটাই হয়ে এসেছে।
.
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন –
আলিফ-লাম-মীম।
মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদের ছেড়ে দেয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না?
আর আমি তো তাদের পূর্ববর্তীদের পরীক্ষা করেছি। ফলে আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন, কারা সত্য বলে এবং অবশ্যই তিনি জেনে নেবেন, কারা মিথ্যাবাদী। [আল-আনকাবুত, ১-৩]
.
কিন্তু আমরা অনেকেই বিষয়টি উপলব্ধি করি না। তাওহিদের পথে, মিল্লাতু ইব্রাহিমের উপর অটল থাকা নিজের গায়ে লাগিয়ে রাখার কোন ব্যাজ না, কোন স্পেশাল স্ট্যাটাস না, কোন থ্রিল সিকিং অ্যাডভেঞ্চার না, কোন ট্রেন্ড না, কোন গসিপের বিষয় না। মিল্লাতু ইব্রাহিমের উপর থাকার নিয়্যাত করা কোন স্পেশাল ক্লাব বা গ্রুপের মেম্বারশিপ পাওয়ার মতো কিছু না। যারা এ সত্যকে উপলব্ধি করে না তারা ঝড়ে যাবে, অথবা বিপথগামী হবে। কারন এই পথে অটল থাকার মতো শক্তি আমাদের নিজেদের ভেতরে নেই, আল্লাহ আর-রাহমানুর রাহীম তার রাহমাহর কারনে আমাদের এই শক্তি দান করেন। কিন্তু বিশুদ্ধ নিয়্যাত ছাড়া আল্লাহ ইবাদাত গ্রহন করেন না।
.
এই পথ অত্যন্ত কঠিন পথ, পরীক্ষার পথ, এবং আলহামদুলিল্লাহ চূড়ান্ত সাফল্যের পথ। বিশুদ্ধ তাওহিদ আকড়ে থাকার কারনে হয়তোবা দুনিয়ার অনেক কিছুই আপনাকে হারাতে হবে কিন্তু ইন শা আল্লাহ আপনি আখিরাতকে পাবেন। তাই নম্র হোন, নিজেকে পরিশুদ্ধ করুন, নিয়্যাতকে বিশুদ্ধ করুন, তিরস্কারকারীর তিরস্কার, নিন্দুকের নিন্দা এবং ভীতিপ্রদর্শনকারীর হুমকি উপেক্ষা করুন এবং সেই আল্লাহকে স্মরণ করুন যার কাছে যাররা যাররা হিসেবে আমাদের দিতে হবে।
.
#KnowYourDeen

source

Leave a Reply