পরকাল ১

পরকাল 

ড. মুহাম্মাদ বিন আব্দুর রহমান আরিফী 

ভাষান্তর ও বিন্যাস উমাইর লুঙ্কর রহমান। 

একটি ঘটনা… 

জনৈক তরুণ বারবার আমাকে “কল” দিচ্ছিল। ব্যস্ততার দরুন “কল” রিসিভ করতে বিলম্ব হওয়ায় বারবার সে আমাকে মেসেজ করছিল। “কল” ব্যাক করলাম, সে প্রশান্তচিত্তে কথা শুরু করল। ধীরে ধীরে তার কণ্ঠস্বর ভারী হতে লাগল। তাকে খুবই চিন্তিত বোঝাচ্ছিল। এক পর্যায়ে জিজ্ঞেস করল, শায়খ, মৃত্যুর পর আমাদের গন্তব্য কোথায়? বললাম, কী আশ্চর্য! স্বভাবতই আমরা মৃত্যুর পর কবরে যাব, অতঃপর পুনরুত্থিত হব, হাশর কায়েম হবে, আল্লাহর কাছে। আমাদেরকে কৃতকর্মের জবাব দিতে হবে… ইত্যাদি..! সে কথার মাঝে ভেটো দিয়ে অস্থির কণ্ঠে বলতে লাগল, “বিশ্বাস করি না.. বিশ্বাস করি না!” 

বলার ধরণ শুনে আন্দাজ করলাম, অবশ্যই কোনো পুস্তক, রচনা কিংবা কোনো ওয়েবসাইটের আর্টিকেল পড়ে সে প্রভাবিত হয়েছে অথবা জ্ঞানশূন্য পেয়ে নাস্তিকদল যুক্তির বেড়াজালে আবদ্ধ করে তাকে পরাজিত করেছে। বললাম, কেন তুমি বিশ্বাস করছ না!? বলল, শায়েখ, ইহ-পরকাল সম্বন্ধে আলোচনা হয় এমন কিছু ব্লগিং সাইটে কতিপয় অপরিচিত ব্যক্তির সাথে আমার বিতর্ক হয়। আমার শৈশব, আমার ধর্মীয় আক্কীদা, জান্নাত, জাহান্নাম, সিরাত, হিসাব.. এগুলোর বিশ্বাস বুকে লালন করে আমার বেড়ে ওঠা। আসলে এগুলো কী?!! বললাম, শুন! শান্ত হও! পরিপূর্ণ জ্ঞানার্জন না করে কোনো বিষয়ে বিতর্ক করতে যেও না।। আল্লাহ বলেন, 

ولا تقف ما ليس لك به عله الإسراء: ۳۲ 

“যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই তার পেছনে পড়ো না” (সূরা ইসরা-৩৬) অজানা বিষয়ে বিতর্ককারী অবশ্যই সংশয়ে পড়বে। ভ্ৰষ্টকারীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। শুন! তাওহীদ, ঈমান ও ইসলামের আক্কীদাই তো আমাদের সৃষ্টির মূল। এগুলো ব্যতীত অন্তর প্রশান্তি পাবে না। দেখবে, ইসলামে প্রবেশকারীদের সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে বৈ কমছে না। 

সাধারণ লোকদের পাশাপাশি ভার্সিটির ডক্টর, বিজ্ঞানী, আবিষ্কারক, বিখ্যাত মন্ত্রী এমনকি বিভিন্ন দেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতগণ পর্যন্ত ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিচ্ছে। জান্নাত, জাহান্নাম, হিসাব, সিরাতের ধারক-বাহক এ মহান ধর্মে প্রবেশ করতে কীসে তাদের বাধ্য করল?! কেউ তো তাদের। বাধ্য করেনি! প্রলোভন দেখিয়ে প্ররোচিত করেনি! এটিই তাওহীদ। এটিই স্বভাবজাত প্রক্রিয়া। এটিই আত্মার প্রশান্তি এবং অন্তরের আস্থা। একটিমাত্র আত্মা থেকে আমাদের সৃষ্টি। আদম আ.। এরপর মাতা হাওয়া আ.। অতঃপর পৃথিবীকে আবাদ করতে তাদের থেকে আল্লাহ তা’লা সকল মানুষ সৃষ্টি করলেন। যেন এ পৃথিবীকে আমরা আবাদ করি। আল্লাহর এবাদত করি। মানুষের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করি। সৌভাগ্যশীল হয়ে সন্তুষ্টচিত্তে জীবনযাপন করি। এরপর আমাদের মৃত্যু হবে। অতঃপর পুনরুত্থান। এরপর হিসাবনিকাশ..! এগুলোর সম্যক বাস্তবতার পেছনে অসংখ্য যৌক্তিক এবং অগণিত বর্ণনাভিত্তিক প্রমাণ রয়েছে..” কথাগুলো বললাম! মনোযোগ সহকারে সে শুনছিল। দীর্ঘ নীরবতার ফলে সে কল কেটে দিয়েছে ভেবে বারবার জিজ্ঞেস করছিলাম “আমার কথা শুনছো?” “আছো?” ইত্যাদি। চিন্তাশীল ব্যক্তির ন্যায় গভীর নীরবতার সাথে সে কথাগুলো শুনছিল। ভাবলাম, তার মতো অসংখ্য যুবক আজ এ মরণ ব্যাধিতে আক্রান্ত। ফেতনা ফাসাদ এবং দ্বীন নিয়ে অবহেলার এ যুগে শত্রুদের আক্রমণের শিকার হয়ে অগণিত মানুষ আজ এ কঠিন ব্যথায় জর্জরিত। ফলে বক্ষ্যমাণ গ্রন্থটি লেখার উদ্যোগ নিলাম “আল-আলামুল আখর” (“পরকাল”) আল্লাহ যেন আমার এ ক্ষুদ্র প্রয়াস কবুল করেন এবং উম্মতের জন্য একে উপকারী বানান.. আমীন..!! 

ড. মুহাম্মদ বিন আব্দুর রহমান আরীফী।

 উসতায, কিং-সউদ ইউনিভার্সিটি, রিয়াদ নভেম্বর ২০১১ হিঃ 

অনুবাদকের কথা। 

সকল প্রশংসা আল্লাহর। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক নবী। মোহাম্মাদ সা. এবং তাঁর সকল নিষ্ঠাবান অনুসারীর উপর। দুনিয়া এবং আখেরাতে চির সৌভাগ্যের একমাত্র উপায় হলো, বিনম্র হয়ে আল্লাহর আনুগত্যের দিকে চলে আসা। আল্লাহর সান্নিধ্য লাভে মনোনিবেশ করা। এভাবেই মানুষ আল্লাহর ইবাদতের স্বাদ উপভোগ করে এবং ধীরে ধীরে তাঁর প্রিয়পাত্র হয়ে যায়। আল্লাহ বলেন, 

هو أن هوقي ، اناء الليل ساجدا ويمايد آخر يرجو أرمة به قل هل يستوي الذين يعلمون والذين لا يكون إلاینگر أولو الألب ي كه الزمر:۹ 

“যে ব্যক্তি রাত্রিকালে সেজদার মাধ্যমে অথবা দাঁড়িয়ে এবাদত করে, পরকালের আশংকা রাখে এবং তার পালনকর্তার রহমত প্রত্যাশা করে, সে কি তার সমান, যে এরূপ করে না; বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না; তারা কি সমান হতে পারে? 

চিন্তা-ভাবনা কেবল তারাই করে, যারা বুদ্ধিমান।” (সূরা যুমার 

এটাই মানুষকে পরকাল বিশ্বাসে সহায়তা করে। এভাবেই পরকালের বাস্তবতা ধীরে ধীরে হৃদয়ঙ্গম হতে থাকে। বক্ষ্যমাণ গ্রন্থটি আরবী “আল-আলামুল আখীর” এর বাংলা-রূপ। আরব বিশ্বের প্রখ্যাত দাঈ ও সুলেখক ড. মুহাম্মদ বিন আব্দুর রহমান আরীফীর অন্যসব বইয়ের ন্যায় এটিও আরব-বিশ্বে ব্যাপক প্রচার ও প্রসিদ্ধি পেয়েছে। পাঠকালেই অনুবাদের সংকল্প নিয়েছিলাম। দীর্ঘ পরিশ্রমের পর তা আজ আপনাদের হাতে। হাদিসের উদ্ধৃতিগুলো প্রসিদ্ধ “মাকতাবায়ে শামেলা থেকে সংগৃহীত। অনুবাদ ও সম্পাদনার কাজে যারাই আমাকে সহযোগিতা করেছেন, সকলের জন্য কৃতজ্ঞভরা দুয়া, আল্লাহ তা’লা সকলের সহযোগিতা কবুল করুন ও বইটিকে উম্মতে মুসলিমা’র জন্য উপকারী করুন এবং পরকালে আমার নাজাতের অসিলা বানান! যেকোনো সুপরামর্শ বা মন্তব্য লিখে পাঠানোর অনুরোধ রইল। 

উমাইর লুৎফর রহমান।

facebook – Umair Lutfor Rahman email- kothamedia@outlook.com 

“সংস্কারকবৃন্দ নিত্যদিন আপনার জন্য তৈরি করছে। 

প্রয়োজনীয় ইসলামী জ্ঞানসম্বলিত অত্যাধুনিক গ্রাফিক পোস্টার 

ফেসবুকে আমাদের সঙ্গেই থাকুন। facebook.com/moslehoon.bn 

কেন.. পরকাল? 

সকল প্রশংসা আল্লাহর, দরূদ ও সালাম শ্রেষ্ঠনবী, তাঁর পরিবার, তার নিষ্ঠাবান সহযোগী এবং কেয়ামত পর্যন্ত আগত তাঁর সকল অনুসারীর উপর।মানুষ একদিন মৃত্যুবরণ করবে, অতঃপর কর্মের প্রতিফল প্রদানের উদ্দেশ্যে তাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে, অত্যাচারী তার অত্যাচারের সাজা ভোগ করবে এবং সৎ নিষ্ঠাবানগণ পুরস্কৃত হবে একথার উপর সকল নবী একমত ছিলেন। কারণ, পৃথিবী কারো স্থায়ী ঠিকানা নয়! আল্লাহ তালা বলেন, 

جعل الذين امنوا وعملوا الصليبي المفيدين في الأرض أو جعل 

و التقيت لجارهم ص: ۲۸ | 

“আমি কি বিশ্বাসী ও সঙ্কর্মশীলদেরকে পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী কাফেরদের সমতুল্য করে দেব? না খোদাভীরুদেরকে পাপাচারীদের সমান করে দেব?” (সূরা ছাদ-২৮) অন্য আয়াতে বলেন,

لتنبؤ بما عملولك على اله يي به 

وقل بل وربي لتبع 

Y:২৬/| “বলুন! অবশ্যই হবে, আমার পালনকর্তার কসম, তোমরা নিশ্চয় পুনরুত্থিত হবে। অতঃপর তোমাদেরকে অবহিত করা হবে যা তোমরা করতে। এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।” (সূরা তাগাবুন-৭)। পরকালের উপর বিশ্বাস হলো ঈমানের মূল ভিত্তি। যে পুনরুত্থানকে মিথ্যারোপ করল, সে আল্লাহর বাণী অস্বীকার করে কাফের হয়ে গেল। আল্লাহ তা’লা বলেন, 

و الذين يصدون عن سبيل اليه ويتوها عوجا وهم با خر گورو ( في الأعراف: ۵ 

“যারা আল্লাহর পথে বাধা দিত এবং তাতে বক্রতা অন্বেষণ করত, তারা পরকালের বিষয়েও অবিশ্বাসী ছিল।” (সূরা আরাফ ৪৫)। 

তাহলে 

* পরকাল কী? 

* মৃত্যু কী?

 * কবরে কীসের সম্মুখীন হতে হবে? 

* হাউযে কাউসার কী? মীযান কী? 

* পুলসিরাত কী? আমলনামা কী?

 * জান্নাত-জাহান্নামের বৈশিষ্ট্য কী?

 * পরকালের অত্যাশ্চর্য বিষয়গুলো কী? সেখানে মানুষের অবস্থা কীরূপ হবে?

 * পরকালে কখন আমরা আল্লাহর সাক্ষাত লাভ করব? কখন তাঁকে প্রাণভরে দেখব? 

আসুন.. অল্প সময়ের জন্য.. পরকালের এই ছোট্ট ভ্রমণে..! 

কেন.. পরকালে বিশ্বাস? 

আল্লাহ তা’লা ইহকালের পর পরকাল নির্ধারিত করে সেখানকার পরিস্থিতি মানুষকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন। তাদেরকে উপদেশ করেছেন। তাতে বিশ্বাস রাখা আবশ্যক করেছেন। এর জন্য সঠিক ও যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণে মনোনিবেশ করতে জোর তাগিদ করেছেন। পরকাল-স্মরণ সৎ ও কল্যাণকর কাজে উৎসাহ দেয়। অন্তর থেকে সন্দেহ-সংশয় দূর করে। অত্যাচার থেকে বারণ করে এবং দুর্বলের উপর আক্রমণ থেকে নিবৃত্ত রাখে। যেমনটি আল্লাহ বলেন, 

ووضع الموازين القسط ليؤير القيمة لا ظلم نفس شیوان 

ان مثقال حبة تم ځل أنيابها وكفى باكييين ( که 

| ৫Y :- …’। “আমি কেয়ামতের দিন ন্যায়বিচারের মানদণ্ড স্থাপন করব। সুতরাং কারও প্রতি জুলুম হবে না। যদি কোনো আমল সরিষার দানা পরিমাণও হয়, আমি তা উপস্থিত করব এবং হিসাব গ্রহণের জন্যে আমিই যথেষ্ট।” (সূরা আম্বিয়া-৪৭) অন্য আয়াতে বলেন,

قانون الوجوه للحي القيوي وقد خاب من حمل ظلما که طه: ۱۱۱ | 

“সেই চিরঞ্জীব চিরস্থায়ীর সামনে সব মুখমণ্ডল অবনমিত হবে এবং সে ব্যর্থ হবে যে জুলুমের বোঝা বহন করবে।” (সূরা ত্বহা-১১১) নবী করীম সা. বলেন, “কেউ যদি কারো উপর অত্যাচার করে থাকে বা কারো মানহানি করে থাকে, আজই যেন সে তার থেকে দাবী ছুটিয়ে নেয় সেদিন। আসার পূর্বেই, যেদিন কোনো দীনার-দিরহাম (মুদ্রা) থাকবে না। সৎকর্ম থাকলে অত্যাচার পরিমাণ কেটে নেয়া হবে। না থাকলে অত্যাচারিতের কৃত পাপের বোঝা তার উপর চাপিয়ে দেয়া হবে।” (বুখারী-২৩১৭)। 

পরকালে বিশ্বাস মানুষকে বিশৃঙ্খলা ও নাস্তিকতা থেকে বিরত রাখে। পক্ষান্তরে যে কাফের, সে ভালমন্দ যাচাইয়ের যোগ্যতা রাখে না। যেমনটি আল্লাহ তালা বলেন, 

که و إن الذين لا يؤمنون بالآخرة عن الضرط لتكبون 

| V৫ :৩১~454 “আর যারা পরকালে বিশ্বাস করে না, তারা সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে।” (সূরা মুমিনূন-৭৪)। পরকালে বিশ্বাস মানুষের চরিত্র সংশোধন করে, বিপদে ধৈর্যের শিক্ষা দেয়, অনর্জিত বস্তুর লোভ থেকে নিবৃত্ত রাখে। কারণ, পরকালের পুরস্কার তো বিশাল ও অসীম। নবী করীম সা. বলেন, “কোনো মুসলিম বিপদগ্রস্ত হলে বিনিময়ে আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করেন, এমনকি যদি একটা কাঁটাও বিধে..!” (বুখারী ৫৩১৭)। পরকালে বিশ্বাস মানুষকে অপরাধ স্বীকারে বাধ্য করে, তাকে পরিত্রাণ দিতে সহায়তা করে। যার ফলে সাহাবায়ে কেরাম আত্মশুদ্ধি অর্জনে আদর্শ স্থাপন করে গেছেন।

একটি ঘটনা..

 মায়িয বিন মালিক রা. একজন প্রসিদ্ধ সাহাবী। একদা শয়তান তাকে প্ররোচনা দিয়ে এক আনসারী সাহাবীর কৃতদাসীর প্রেমে জড়িয়ে দেয়। অতঃপর তারা উভয়ে নির্জনে গমন করলে শয়তান তাদের উভয়কে পরস্পরের জন্য সুন্দর করে উপস্থাপন করে, ফলে তারা ব্যভিচারে লিপ্ত হয়। অতঃপর যখন মায়িয তার মনোবৃত্তি পূরণ করে নেয় এবং শয়তান তাদের থেকে দূরে সরে যায়, তখন সে কাঁদতে থাকে। দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। নিজেকে তিরস্কার করতে থাকে। আল্লাহর শাস্তিকে ভয় করতে থাকে। দুশ্চিন্তায় ইহজীবন তার বিস্বাদ হয়ে উঠে। অপরাধ তাকে বেষ্টন করে ফেলে। ঠিক তখনই সে মহা-চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়। নবীজীর সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলতে থাকে, হে আল্লাহর রাসূল, অধম ব্যভিচার করেছে! আমাকে পবিত্র করুন! নবীজী তাকে এড়িয়ে যান।সে অপর-পাশে এসে পুনরাবৃত্তি করে, হে আল্লাহর রাসূল, আমি ব্যভিচার করেছি, আমাকে পবিত্র করুন! নবীজী বলেন, ধিক তোমার! ফিরে যাও! আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও! তাওবা কর! অতঃপর কিছুদূর গিয়ে সে আবার ফিরে এসে বলতে থাকে, হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে পবিত্র করুন! নবীজী উচ্চস্বরে বললেন, ধিক তোমার! তুমি কি জান- ব্যভিচার কী? দূরে

সরানোর আদেশ করা হলে তাকে দূরে সরিয়ে দেয়া হলো। দ্বিতীয়বার আবার ফিরে এসে বলতে থাকে, হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে পবিত্র করুন! নবীজী উচ্চস্বরে বললেন, ধিক তোমার! তুমি কি জান- ব্যভিচার কী? দূরে সরানোর আদেশ করা হলে তাকে সরিয়ে দেয়া হলো। এরপর তৃতীয়বার.. চতুর্থ বারও এমন করল। অতিরিক্ত জোরাজোরির ফলে নবীজী জিজ্ঞেস করলেন, সে কি পাগল? সবাই বলল, না! তার ব্যাপারে তো কোনো সমস্যা শুনিনি আমরা। নবীজী বললেন, সে কি মদপান করেছে? একজন দাঁড়িয়ে তার মুখের গন্ধ শোঁকে মদের কোনো ঘ্রাণ পেল না। নবীজী বললেন, তুমি কি জান- ব্যভিচার কী? সে। বলল, জি, আমি অন্যায়ভাবে এক নারীর সাথে এমন কাজ করেছি, যা হালাল রূপে কেউ তার স্ত্রীর সঙ্গে করে থাকে। নবীজী বললেন, একথার মাধ্যমে তুমি কী চাও? সে বলল, আমি চাই আপনি আমাকে পবিত্র করে দিন। নবীজী বললেন, আচ্ছা! অতঃপর তাকে প্রস্তর নিক্ষেপের আদেশ করলেন। প্রস্তর নিক্ষেপ করা হলে সে মৃত্যুবরণ করল। জানাজা ও দাফন শেষে নবীজী সাথীদের নিয়ে ফিরছিলেন, এমন সময় শুনতে পেলেন জনৈক ব্যক্তি অপরকে বলছে, “দেখ এই ব্যক্তিকে; আল্লাহ তার অপরাধ গোপন করেছিলেন, কিন্তু তার হৃদয় তাকে তা গোপন করতে দেয়নি। ফলে কুকুরের মতো প্রস্তরাঘাতে তাকে হত্যা করা হলো।” নবীজী সেখানে তাদেরকে কিছু না বলে অল্প-সময় চললেন। পথিমধ্যে পড়ে থাকা একটি গাধার মৃতদেহের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, প্রখর রোদে গাধার চেহারা ফোলে উঠেছিল, পা স্ফীত হয়ে গিয়েছিল। বলতে লাগলেন, অমুক অমুক ব্যক্তি কোথায়? উভয়ে বলল, আমরা এখানে হে আল্লাহর রাসূল! বললেন, তোমরা অবতরণ কর এবং গাধার এই মৃতদেহ ভক্ষণ কর! উভয়ে বলল, হে আল্লাহর নবী, আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন, কোনো মানুষ কি এই মৃতদেহ খেতে পারে? তখন নবীজী বলতে লাগলেন, কিছুক্ষণ পূর্বে তোমাদের ভাই সম্পর্কে তোমরা যে কথা উচ্চারণ করেছ, তা এই মৃতদেহ ভক্ষণ অপেক্ষা নিকৃষ্ট। অবশ্যই মায়িয এমন তাওবা করেছে, যদি তার তাওবা পুরো জাতির মাঝে বণ্টন করা হয়, তবে সকলের মুক্তির জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে। সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, নিশ্চয় এ মুহূর্তে সে জান্নাতের নদীসমূহে সাঁতার কাটছে!” সাধুবাদ হে মায়িয বিন মালিক! হ্যাঁ.. সে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে নিজের গোপনীয়তা প্রকাশ করেছে। কিন্তু যখন সে তার কৃত পাপ সমাধা করেছে, তখন সকল স্বাদ উধাও হয়ে কেবল দুঃখই তার রয়ে গেছে। তবে সে এমন তাওবা করেছে, তা যদি পুরো জাতির মাঝে বণ্টন করা হয়, তবে সবার মুক্তির জন্য সেটি যথেষ্ট হয়ে যাবে।। পরকালে বিশ্বাস মানুষকে বিশ্বস্ততা রক্ষায় অভ্যস্ত করে। আত্ম প্রদর্শন থেকে বিরত রাখে। যেমনটি আল্লাহ তালা বলেন, 

و إما يعمر مسجد آل من امن بالبر واليوير آخر وأقام الصلوة و اى آلوة ولريش إلا الله فى أوليك أن يكونوا 

و التوبة: ۱۸ 

من المهتدين 

“নিঃসন্দেহে তারাই আল্লাহর মসজিদ আবাদ করবে যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি ও শেষদিনের প্রতি এবং কায়েম করেছে নামায ও আদায় করে যাকাত; আল্লাহ ব্যতীত আর কাউকে ভয় করে না। অতএব, আশা করা যায়, তারা হেদায়েত প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (সূরা তাওবা-১৮) 

মনে রাখবেন, পরকালে বিশ্বাসই হচ্ছে দুনিয়ায় শান্তি এবং আখেরাতে সুখের একমাত্র উপায়। 

কেয়ামত 

“কেয়ামত” শব্দটি দু’টি অর্থে ব্যবহৃত। এক, যা আমাদের চোখের সামনে ঘটে বা সচরাচর আমরা দেখে থাকি। দুই, যা কেবল একবারই ঘটবে, তা দেখে সকল সৃষ্টি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যাবে। সুতরাং কেয়ামতকে আমরা দু’টি ভাগে বিভক্ত করতে পারিঃ 

ছোট কেয়ামত

ছোট কেয়ামত এটি হচ্ছে বিশেষ এক কেয়ামত। কেননা, যখন কোনো মানুষ মৃত্যুবরণ করে, তখনই তার কেয়ামত ঘটে যায়। যেমনটি মুগীরা বিন শু’বা রা. বলেন,

“সবাই বলাবলি করে- কেয়ামত.. কেয়ামত.. কেয়ামত..! আরে.. ব্যক্তির মৃত্যুই তো তার জন্য কেয়ামত..!” আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে এই ছোট কেয়ামতের প্রতিই ইঙ্গিত এসেছেঃ । “জীর্ণশীর্ণ কতিপয় বেদুইন নবীজীর কাছে এসে জিজ্ঞেস করেছিল, কেয়ামত কখন? নবীজী তাদের সর্বকনিষ্ঠের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, এ বৃদ্ধ হওয়ার আগেই তোমাদের কেয়ামত এসে যাবে।” (বুখারী-৬৫১১)। অর্থাৎ এই ছেলেটি বৃদ্ধ হওয়ার আগেই তোমরা মৃত্যুবরণ করবে। 

বড় কেয়ামত

 এ হচ্ছে মহা প্রলয়। যার প্রতিফলন সকল সৃষ্টিকে নির্জীব করে দেবে। যার পরক্ষণেই হিসাব-নিকাশের জন্য মহান আল্লাহ সৃষ্টির পুনরুত্থান ঘটাবেন। তাদের জন্য জান্নাত অথবা জাহান্নাম নির্ধারণ করবেন। উভয় প্রকার কেয়ামতকেই আল্লাহ তা’লা কুরআনুল কারীমে। এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ 

 “অতঃপর তার মৃত্যু ঘটান এবং তাকে কবরস্থ করেন। এরপর যখন ইচ্ছা করবেন তাকে পুনরুজ্জীবিত করবেন।” (সূরা আবাছা-২১-২২)।

ছোট কেয়ামত

========= 

মনে রাখবেন, যে ব্যক্তি ছোট কেয়ামতের প্রস্তুতি সম্পন্ন করল, বড় কেয়ামতের কঠিন মুহূর্তগুলো তার জন্য সহজ হয়ে যাবে। 

ছোট কেয়ামত হলো মৃত্যু তথা আত্মার দেহ-বিচ্ছেদ। জীব মাত্রই মৃত্যু আস্বাদন করবে। সকলের জন্যই তাতে কিছু শিক্ষা, কিছু উপদেশ এবং কিছু সূক্ষ্ম বার্তা রয়েছে..! 

* ছোট কেয়ামতের মুহূর্তে মানুষের অবস্থা কীরূপ হয়? * অন্তিম মুহূর্তে কতিপয় ব্যক্তিদের কিছু দুর্লভ ঘটনা * সুসমাপ্তি এবং কুসমাপ্তির নিদর্শনগুলোকী? * আত্মা কী? 

এ হলো মৃত্যু.. বর্ণিত, আল্লাহর নবী হযরত দাউদ আ. এর একজন মর্যাদাসম্পন্ন উপদেষ্টা ছিল। দাউদ আ. এর মৃত্যুর পর সে সুলাইমান আ. এর বিশেষ উপদেষ্টার পদ লাভ করে। একদিন সূর্যোদয়ের খানিক পর সুলাইমান আ. এ উপদেষ্টাকে নিয়ে বসা ছিলেন। এমন সময় একজন অপরিচিত লোক সালাম দিয়ে এসে সুলাইমান 

আ. এর সাথে কথা বলতে শুরু করে এবং উপদেষ্টার দিকে অদ্ভুতভাবে তাকাতে থাকে। লোকটির এমন অদ্ভুত তাকানো দেখে উপদেষ্টা ভয় পেয়ে যায়। লোকটি বেরিয়ে যাওয়ার পর উপদেষ্টা বৈঠক থেকে দাঁড়িয়ে সুলাইমান আ. কে জিজ্ঞেস করে, হে আল্লাহর নবী, লোকটি কে? তার দৃষ্টি আমাকে হতভম্ব করে দিয়েছে। সুলাইমান আ. বললেন, এ হলো মৃত্যুর ফেরেশতা। মানবরূপে আমার কাছে এসেছে! এ কথা শুনে উপদেষ্টা ভয়ের আতিশয্যে কাঁদতে আরম্ভ করে। বলতে থাকে, হে নবী, আল্লাহর দোহাই যদি বাতাসকে বলেন আমাকে দূরে কোথাও রেখে আসতে! হিন্দুস্তানে পৌঁছে দিতে! সুলাইমান আ. তার কথামতো বাতাসকে আদেশ করলেন তাকে হিন্দুস্তানে ছেড়ে আসতে..। পরদিন মৃত্যুর ফেরেশতা আবার আসলে সুলাইমান আ. তাকে জিজ্ঞেস করলেন, গতকাল আমার সাথীকে তুমি ভয় দেখিয়েছ! 

তার দিকে অদ্ভুত-রূপে তাকাচ্ছিলে কেন? মৃত্যুদূত বলে, হে আল্লাহর নবী, সূর্যোদয়ের কিছুক্ষণ পর আমি আপনার কাছে এসেছিলাম, আর সেদিন দুপুরে আল্লাহ তা’লা আমাকে হিন্দুস্তানে তার রূহ কবজা করার আদেশ করেছিলেন। আর তাকে আপনার কাছে দেখে আমি অবাক হয়েছিলাম। সুলাইমান আ. বললেন, তারপর কী করলে? সে বলে, তারপর আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী হিন্দুস্তানের সেস্থানে তার রূহ কবজা করতে গিয়ে দেখি সে ওখানেই উপস্থিত। অতঃপর তার রূহ কবজা করি।

হ্যাঁ.. এ হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ..! 

و قل إن الموت الذي تفون يرثه فإنهو مقيكررون إلى علي الغيب والشهدة بنگریماکت تموت عنه الجمعة: ۸ 

“বলুন, তোমরা যে মৃত্যু থেকে পলায়নপর, সেই মৃত্যু অবশ্যই তোমাদের মুখোমুখি হবে, অতঃপর তোমরা অদৃশ্য ও দৃশ্যের জ্ঞানী আল্লাহর কাছে উপস্থিত হবে। তিনি তোমাদেরকে জানিয়ে দেবেন সেসব কর্ম, যা তোমরা করতে।” (সূরা জুমুআ-৮)। রাজা-বাদশাহ, মন্ত্রী-উপদেষ্টা, মর্যাদাবান-অমর্যাদাবান, ধনী দরিদ্র বরং নিকটবর্তী। ফেরেশতাগণ, জ্বিন-শয়তান এমনকি সকল জীবজন্তু আল্লাহর এই চ্যালেঞ্জের সামনে অসহায়। 

صدقين ) که آل 

الموت إن 

وقل قادر وأعين في 

عمران: ۱۹۸ 

“তাদেরকে বলে দিন, এবার তোমরা নিজেদের উপর থেকে মৃত্যুকে সরিয়ে দাও যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক।” (সূরা আলে ইমরান-১৬৮) 

و ايتمات وأدركك لو لوك في بروج مشدوه النساء: 

“তোমরা যেখানেই থাক না কেন, মৃত্যু তোমাদেরকে পাকড়াও করবেই” (সূরা নিসা-৭৮) 

কোথায় বিশাল সেনা বহর? কোথায় রাজত্ব? কোথায় অহংকার? কোথায় সেই প্রতাপশালী পারস্য রাজা? কোথায়। অহংকারী রোম সম্রাট? কোথায় অধিপতিরা? কোথায় ধনী ব্যক্তিবর্গ? বরং কোথায় খ্যাতিমান বিজ্ঞানী-সকল? 

মনে রাখবেন, মৃত্যুই হলো পরকালের সূচনা।

মৃত্যুর উপস্থিতি 

মৃত্যুর উপস্থিতি এবং আত্মা বহির্গমনের সেই মুহূর্ত কতই না কঠিন! প্রতিটি জীবকেই এর মুখোমুখি হতে হবে।। 

মৃত্যু কোন পরিচ্ছন্ন জীবনকে এলোমেলো করে দেয়নি..?! মৃত্যু কোন সদা আন্দোলিত পা’কে থামিয়ে দেয়নি..?! পূর্বপুরুষদের সে কি ক্ষমা করেছে? বন্ধুত্বের বিচ্ছেদ ঘটায়নি? স্ত্রীদের বিধবা করেনি? সন্তানদের এতিম করেনি? 

মৃত্যুর উপস্থিতি এবং আত্মার বিচ্ছেদ-মুহূর্তে কতসব আশ্চর্য বিষয় লক্ষ্য করা যায়..! 

নবী মোহাম্মাদ সা. এর মৃত্যু 

বিদায় হজ্জ্ব থেকে ফেরার পর নবী করীম সা. এর মৃত্যুকালীন 

ব্যাধির সূচনা হলো। ধীরে ধীরে তা বাড়তে লাগল। বিভিন্ন অসিয়ত উচ্চারণ করে তিনি উম্মতকে বিদায় 

জানাচ্ছিলেন। জ্বর যখন তীব্র থেকে তীব্রতর হতে লাগল, পরকালের দিকে। যাত্রা নিশ্চিত জানতে ও বুঝতে পারলেন, তখন লোকদের থেকে বিদায় নেয়ার ইচ্ছা করলেন। সাদা কাপড়ে মাথা পেঁচিয়ে নিলেন। ফাযল বিন আব্বাসকে নির্দেশ দিলেন সবাইকে মসজিদে সমবেত করতে। তিনি গিয়ে সকলকে মসজিদে জমায়েত করলেন। দু’জনের কাঁধে ভর করে নবী করীম সা. মসজিদের মিম্বরে এসে বসলেন। আল্লাহর যথাযোগ্য প্রশংসা করে বলতে লাগলেন “হে লোকসকল, আমার উপর তোমাদের কিছু পাওনা আছে। বলে মনে হচ্ছে। এই স্থানে তোমরা আর কোনোদিন আমাকে দেখতে পাবে না। ভালো করে শুন! আমি যদি কারো পিঠে বেত্রাঘাত করে থাকি, তবে এই আমার পিঠ, সে যেন প্রতিশোধ নিয়ে নেয়। কারো থেকে যদি কোনো সম্পদ নিয়ে থাকি, তবে এই হলো আমার সম্পদ, সে যেন সমপরিমাণ নিয়ে নেয়। যদি কারো মানহানি করে থাকি, সে যেন এর বদলা নিয়ে নেয়। | কেউ যেন শত্রুতার ভয়ে অন্তরে কিছু লুকিয়ে না রাখে। শত্রুতা 

আমার অভ্যাস নয়, আমার স্বভাবও নয়। বরং যে আমার কাছে। কিছু পাবে এবং সে নিজের প্রাপ্য নিয়ে নেবে বা সমাধা করে ফেলবে, তাকেই আমি বরং অধিক আপন ভাববো। যেন। আল্লাহর সাথে সাক্ষাতকালে আমার উপর বিন্দুমাত্র কোনো পরাধিকার না থাকে..!” (তাবারানী-৭১৮)। অতঃপর নবীজী মিম্বর থেকে নেমে নিজের ঘরে চলে গেলেন। 

নবী করীম সা. এর মৃত্যুকালীন রোগ। 

 দিনদিন জ্বর তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছিল। খুব কষ্ট করে মসজিদে মানুষদের নিয়ে নামায পড়তেন। জুমুআর দিন। সাথীদের নিয়ে মাগরিব আদায় করে ঘরে প্রবেশ করলেন। জ্বর আরো তীব্র হলো। সাথীগণ বিছানা করে তাঁকে শুইয়ে দিলেন। বিছানায় থাকা অবস্থায়ই মৃত্যুজনিত রোগ ধীরে ধীরে তাঁর উপর ভর করতে লাগল। মানুষ ইশার নামাযের জন্য নবীজীর ইমামতির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল। এদিকে অসুস্থতাও বাড়ছিল। বিছানা থেকে উঠার চেষ্টা করছিলেন, পারছিলেন না। বিলম্ব হওয়ায় কিছু মানুষ “নামায, নামায” বলে ঘোষণাও দিলেন। নবীজী তাদের কণ্ঠ শুনে কাছের লোকদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, সবাই কি নামায পড়ে ফেলেছে? তারা বলল, না হে আল্লাহর রাসূল! সকলেই আপনার অপেক্ষায়! নবীজী মসজিদের দিকে। তাকিয়ে উঠতে চাইলেও শরীরের অত্যধিক তাপমাত্রা তাঁকে সে সুযোগ দেয়নি। নবীজী বললেন, বড় পাত্র দিয়ে পানি ঢালো! সবাই তাঁর জন্য পানির ব্যবস্থা করে শরীরে পানি ঢালতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পানি ঢালার পর কিছুটা উদ্যমতা অনুভব করলে “যথেষ্ট হয়েছে” ইঙ্গিত দিলেন। পানি সরিয়ে নেয়া হলো। দুই হাতে ভর করে উঠতে চেষ্টা করলেন, এমনসময় অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরলে প্রথমেই জিজ্ঞেস করলেন, সবাই কি নামায পড়ে ফেলেছে? তারা বলল, না হে আল্লাহর রাসূল! সবাই আপনার অপেক্ষায়! বললেন, বড় পাত্র দিয়ে পানি ঢালো!

অতঃপর সবাই তাঁর জন্য পানির ব্যবস্থা করে সারা গায়ে পানি ঢালতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পানি ঢালার পর আবারো কিছুটা উদ্যমতা অনুভব করলে দুই হাতের উপর ভর করে উঠতে যেয়ে আবার অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরলে প্রথমেই আবার জিজ্ঞেস করলেন, সবাই কি নামায পড়ে ফেলেছে? বলল, না হে আল্লাহর রাসূল! সবাই আপনার অপেক্ষায়! বললেন, বড় পাত্র দিয়ে পানি ঢালো! আবারো পানির ব্যবস্থা করে সারা গায়ে অধিক পরিমাণে ঠাণ্ডা পানি ঢালা হলো। কিছুক্ষণ পানি ঢালার পর “যথেষ্ট হয়েছে” ইঙ্গিত করলেন। আবারো দুই হাতে ভর করে উঠতে যেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। পরিবারের সদস্যগণ তাঁর দিকে মায়াভরে তাকিয়ে ছিলেন। অন্তরগুলো তাদের ধুকধুক করছিল। চোখে অশ্রু টলমল করছিল।সবাই মসজিদে নামাযের জন্য তাঁর অপেক্ষায়। তাকে ইমাম হিসেবে দেখতে, তাঁর সঙ্গে তাকবীর বলে, তাঁর সঙ্গে রুকু সেজদা করে নামায আদায় করবে.. এ আশায় সকলেই অধীর আগ্রহে বসে ছিলেন। এদিকে নবীজী অচেতন। কিছুক্ষণ পর হুঁশ ফিরে এলে প্রথমেই জিজ্ঞেস করলেন, সবাই কি নামায পড়ে ফেলেছে? সবাই বলল, না হে আল্লাহর রাসূল! তারা আপনার অপেক্ষায়! হ্যাঁ.. সেই পবিত্র দেহ, যা আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য করেছে, পালনকর্তার জন্য সদা প্রাণ বাজি রেখে যুদ্ধ করেছে। সেই পবিত্র দেহ, যা স্রষ্টার এবাদতে বহু রাত বিনিদ্র কাটিয়েছে, জীবনে সকল কঠিন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। সেই পবিত্র দেহ, আল্লাহর ভয়ে যার দু’চোখ অঝোর ধারায় অশ্রু বর্ষণ করেছে। আল্লাহর রাস্তায় শাস্তি ভোগ করেছে, ক্ষুধার্ত থেকেছে, যুদ্ধ করেছে..। নবীজী নিজের শারীরিক অবস্থা বুঝতে পেরে সাথীদের বললেন, “আবু বকরকে বল সকলকে নিয়ে নামায আদায় করে নিতে”। বেলাল রা. নামাযের ইকামাত বললেন। আবু বকর রা. নবীজীর মেহরাবে দাঁড়িয়ে নামাযের ইমামতি করলেন। প্রচণ্ড কান্নার দরুন সাহাবীগণ তার কেরাত ভালো করে বুঝতে পারলেন না। এভাবেই এশার নামায শেষ হলো। পরদিন ফজরের নামায আদায়ের জন্য সবাই জমায়েত হলেন। আবু বকর রা. ইমামতি করলেন। নবীজীর মৃত্যুশয্যায় আবু বকর রা. এভাবে দিন-কয়েক নামাযের ইমামতি করেছিলেন। 

জামাতে নামায

 সোমবার-দিন জুহর এবং আসরের সময় নবীজী কিছুটা সুস্থতা অনুভব করলে আব্বাস ও আলী রা. কে ডেকে উভয়ের কাঁধে ভর করে ধীরে ধীরে ঘর থেকে বের হলেন, একটু অগ্রসর হয়ে পর্দা উঠিয়ে দেখলেন যে, জামাত দাঁড়ানো, সকলেই নামাযে । মগ্ন। দেখলেন, সাথীরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। উজ্জ্বল চেহারা আর পবিত্র দেহ। এই লোকদের নিয়েই তো তিনি কত নামায আদায় করেছেন! তাদেরকে সাথে। নিয়ে জিহাদ করেছেন! দিনরাত তাদের সাথে উঠা বসা করেছেন! কত রাত তাদের নিয়ে দীর্ঘ নফল পড়েছেন! কতদিন তাদের নিয়ে রোযা পালন করেছেন! কতই না ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে তারা তাঁর সাথে। নিষ্ঠার সাথে দোয়া করেছে আল্লাহর কাছে। দ্বীনকে বিজয়ী করতে কত সময় তারা পরিজনকে দূরে রেখেছে। বন্ধু-বান্ধব এবং দেশকে পরিত্যাগ করেছে। তাদের মধ্যে আবার অনেকেই শহীদ হয়ে গেছে আবার অনেকেই শাহাদাতের অপেক্ষায়..। বাস্তবেই, একটুও বদলায়নি তারা। আজ তিনিই তাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন পরকালের উদ্দেশ্যে, যেখানকার সুখ-শান্তির কথা শুনিয়েছেন তাদের সারা জীবনভর। 

তাদেরকে নামাযে দেখে খুবই আপ্লুত হলেন, আনন্দে মুচকি হাসলেন। মনে হচ্ছিল তাঁর চেহারা যেন এক টুকরো চাঁদ। অতঃপর পর্দা নামিয়ে বিছানায় ফিরে এলেন। আসমান হতে মৃত্যুর ফেরেশতাগণ অবতরণ করলেন সর্ব পবিত্র ও শ্রেষ্ঠ আত্মাকে নিয়ে যেতে। 

নবীজীর উপর মৃত্যু-যন্ত্রণা ধীরে ধীরে মৃত্যু-যন্ত্রণা শুরু হতে লাগল। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বলেন, “মৃত্যুর সময় আমি নবীজীকে দেখেছি, তিনি পাশে রাখা পানি ভর্তি পাত্রে হাত ভিজিয়ে চেহারা মুছতে মুছতে বলছেন, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই! অবশ্যই মৃত্যুর যন্ত্রণা আছে! ফাতেমা রা, পাশে বসে কেঁদে কেঁদে বলছিলেন,আব্বুর উপর কী বিপদ..! নবীজী ফাতেমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আজকের পর থেকে তোমার আব্বুর কোনো বিপদ থাকবে না। আমি তাঁর চেহারা মুছে দিচ্ছিলাম আর সুস্থতার দোয়া করছিলাম। তিনি বললেন, না! বরং আমি সর্বোন্নত সাথী আল্লাহকে চাই; জিবরীল, মিকাঈল এবং ইসরাফীলের সাথে..! 

অতঃপর যখন নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছিল, যন্ত্রণা তীব্রতর হচ্ছিল, তখন সর্বশেষ কথাগুলো তিনি উচ্চারণ করছিলেন।

সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো বলছিলেন, শিরক থেকে উম্মতকে সতর্ক করছিলেনঃ । 

 “ইহুদী খৃস্টানদের উপর আল্লাহর অভিশাপ, নবীদের কবরগুলোকে তারা মসজিদ বানিয়েছে” 

“ঐ জাতির উপর আল্লাহর ক্রোধ অধিক হয়েছে, যারা তাদের নবীদের কবরগুলোকে মসজিদ বানিয়েছে”। নবীজীর সর্বশেষ উচ্চারিত ছিল। 

 “নামায.. নামায.. এবং তোমাদের আয়ত্তাধীন কৃতদাস..!” এরপর নবীজী ইন্তেকাল করলেন (আমার পিতা-মাতা এবং আমার আত্মা তার জন্য উৎসর্গ হোক) সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। 

হ্যাঁ.. সর্বশেষ নবী, শ্রেষ্ঠ রাসূল, হেদায়েত-প্রাপ্তদের ইমাম এবং রাব্বল আলামীনের প্রিয়পাত্র দুনিয়া থেকে বিদায় হয়ে গেছেন। কেউ তার প্রতি কোনোরূপ জুলুমের অপবাদ দেয়নি, কথার মাধ্যমে কাউকে আঘাত দেয়ার অভিযোগ করেনি, হারাম পথে উপার্জনের সাক্ষ্য দেয়নি, কখনো কেউ তাকে পরনিন্দা বা অপরাধ করতে দেখেনি। বরং তিনি তো ছিলেন আল্লাহর দিকে মানুষকে আহ্বানকারী, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনাকারী, নামায

ও এক আল্লাহর দিকে এবাদতের আদেশকারী এবং শিরক ও মূর্তিপূজা থেকে বারণকারী মহান ব্যক্তিত্ব। পালনকর্তা তাঁর গুণ বর্ণনায় সত্যই বলেছেন, 

هرول بين أفير عزيز عليه ما عيم 

ولقد جاء 

له التوبة: ۱۴۸ 

چي 

حريص عليكم بالمؤمنين رو 

“তোমাদের কাছে এসেছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল। তোমাদের দুঃখ-কষ্ট তার পক্ষে দুঃসহ। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল, দয়াময়।” (সূরা তাওবা ১২৮)। 

উমর রা. এর ইন্তেকাল

চলুন, ইসলামের কেন্দ্র-ভূমি মদিনার দিকে একটু চোখ বুলাই। দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা.। যিনি দ্বীনকে নুসরাত করেছেন, পালনকর্তার সন্তুষ্টি কামনায় জিহাদে অংশ নিয়েছেন। অগ্নিপূজকদের রাজত্বের অগ্নিশিখা চিরতরে নিভিয়ে দিয়েছেন। শত্রুরা সেই উমর রা. এর উপর প্রতিহিংসা করল। অগ্নিপূজক আবু লুলু ছিল একজন কামার। কাঠমিস্ত্রির কাজে অভ্যস্ত এ কৃতদাস মদিনাতেই বসবাস করত। চাউল ভাঙ্গানোর কাজে ব্যবহৃত চাক্কি তৈরি করত। উমর রা. থেকে প্রতিশোধ গ্রহণে সে প্রায়ই সুযোগ খুঁজত। একদিন পথের মধ্যে আবু লুলুর সাথে উমর রা. এর সাক্ষাত হলে তিনি বললেন, শুনেছি তুমি নাকি বল, “চাইলে এমন চাক্কিও আমি তৈরি করতে পারব, যা বাতাসে ঘুরালেও আটা তৈরি করবে।” কৃতদাস উমরের দিকে কুঞ্চিত করে তাকিয়ে বলল, অবশ্যই! আমি আপনার জন্য এমন চাক্কি তৈরি করব, যার সুনাম প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে আলোচিত হবে। উমর রা. সাথীদের দিকে তাকিয়ে বললেন, শুনে রাখো, সে কিন্তু আমাকে 

ওয়াদা দিচ্ছে! অতঃপর আবু লুলু দু’মুখখা একটি ধারালো ছুরি তৈরি করল, উভয় দিক দিয়ে আক্রমণের সুবিধার্থে কজা মাঝখানে স্থাপন করে পুরো ছুরিতে বিষ মাখিয়ে নিলো। আক্রমণ দুর্বল হলেও যাতে বিষক্রিয়ায় কাজ সমাধা করতে পারে। অতঃপর রাতের আঁধারে এসে মসজিদে নববীর এক কোণায় উৎ পেতে বসে রইল। উমর রা. মসজিদে প্রবেশ করে নামায শুরু করতে বললেন। ইকামত শেষ হলে তিনি সামনে গিয়ে তাকবিরে তাহরিমা’ বললেন। অতঃপর যখন কেরাত শুরু করলেন, তখনই সে তার উপর এলোপাথাড়ি আক্রমণ করে মুহূর্তের মধ্যেই বক্ষে, বুকের একপাশে এবং নাভির সামান্য নীচে তিন-তিনটি ছুরিকাঘাত বসিয়ে দিল। 

উমর রা,চিৎকার করে 

وكان أمر الله قدرا مقدورا م که الأحزاب: ۳۸ 

“আল্লাহর আদেশ নির্ধারিত, অবধারিত” (সূরা আহযাব-৩৮) আয়াতটুকু পড়তে পড়তে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। আব্দুর রহমান বিন আউফ সামনে এগিয়ে নামায পূর্ণ করলেন। এদিকে কৃতদাস উমর রা. কে আহত করে পাগলপ্রায় হয়ে মুসল্লিদের কাতার ভেদ করে পালাতে চেষ্টা করল। সামনে যেই পড়ছিল, তাকেই আহত করছিল। প্রায় তের জনের মতো আহত এবং সাতজনকে নিহত করল। সাহস করে একজন চাদর দিয়ে মুখ ঢেকে তাকে জড়িয়ে ধরলে গ্রেফতার নিশ্চিত ভেবে আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে নিজের পেটে ছুরিকাঘাত করলে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হলো। এদিকে উমর রা. কে অচেতন অবস্থায় ঘরে নিয়ে আসা হলো। আমীরুল মুমিনীনের উপর আচমকা এ দুর্ঘটনায় সকলেই কাঁদতে লাগলেন।সূর্যোদয় পর্যন্ত এভাবেই তিনি অজ্ঞান হয়েছিলেন। 

সবাই কি নামায পড়ে ফেলেছে?

 জ্ঞান ফেরার পর পাশে থাকা মানুষদেরকে প্রথমেই জিজ্ঞেস করলেন, সবাই কি নামায পড়ে ফেলেছে? বলল, হ্যাঁ. আমীরুল মুমিনীন! বললেন, আলহামদুলিল্লাহ! যে নামায ত্যাগ করল, ইসলামে তার কোনো অংশ নেই। অতঃপর ওযুর পানি আনতে 

বললেন। ওযু শেষ করে নামাযের উদ্দেশ্যে দাঁড়াতে চাইলেন। পারলেন না। পুত্র আব্দুল্লাহকে ধরে নিজের পেছনে বসালেন। ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ঝরছিল। আব্দুল্লাহ বলেন, আমি ক্ষতস্থানে আঙ্গুল রেখে রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে চাইলাম। অনেক চেষ্টা করেও পারলাম। অতঃপর পাগড়ির কাপড় দিয়ে ভালোভাবে বেঁধে দিলাম। তিনি ফজরের নামায আদায় করলেন। অতঃপর ইবনে আব্বাস রা. কে উদ্দেশ্য করে বললেন, দেখ হে ইবনে আব্বাস! একজন অগ্নিপূজক কৃতদাস আমাকে গুরুতর আহত করেছে। অতঃপর অনেককেই ক্ষতবিক্ষত করে পরিশেষে আত্মহত্যা করেছে।এরপর বললেন, “আল্লাহর প্রশংসা, আমার হত্যাকারীকে তিনি সেজদাকারী বানাননি যে, আল্লাহর কাছে সেজদার বিনিময়ে সে আমার বিরুদ্ধে প্রমাণ দাঁড় করাবে।” অতঃপর চিকিৎসার জন্য ডাক্তার এলো, আঘাত পাকস্থলী পর্যন্ত পৌঁছুল কিনা যাচাই করতে ডাক্তার উমর রা. কে খেজুর মিশ্রিত পানি পান করাল। পানি মুখ দিয়ে প্রবেশ করে পাকস্থলী দিয়ে বের হয়ে গেল। ডাক্তার ভাবল, হয়ত রক্তপিণ্ড বের হচ্ছে।

অতঃপর দুধের পাত্র এনে দুধ পান করালে দুধও নাভির নীচ দিয়ে নির্গত হয়ে গেল। ডাক্তার বুঝতে পারল, এলোপাথাড়ি আঘাতে তাঁর দেহ ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে, ফলে পেট কোনো খাদ্য বা পানীয় বহন করতে পারছে না। ডাক্তার বলল, হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি অসিয়ত করতে পারেন। আমার ধারণা, আপনি আর একদিন বা অর্ধদিন বেঁচে থাকবেন। উমর রা, মৃত্যুর উপর পূর্ণ বিশ্বাস রেখে বলতে লাগলেন, তুমি সত্যই বলেছ। অন্য কিছু বললে তোমাকে মিথ্যুক ভাবতাম। অতঃপর বললেন, “আল্লাহর শপথ,পুরো বিশ্ব যদি আমার আয়ত্তাধীন হতো, তবে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর পরিবর্তে আমি তা 

মুক্তিপণ হিসেবে দিয়ে দিতাম।” 

ইবনে আব্বাস রা. এর প্রশংসা জ্ঞাপন

 তার এই নম্রতা-পূর্ণ ও আল্লাহর প্রতিশ্রুত বিষয়াবলীর প্রতি অতি আগ্রহপূর্ণ কথাগুলো শুনে ইবনে আব্বাস রা. বলতে লাগলেন, “আপনি যা বলছেন, তার জন্য আল্লাহ আপনাকে উত্তম বিনিময় দান করুন। নবী করীম সা. কি আপনার মাধ্যমে দ্বীনের মর্যাদা বৃদ্ধি করার দোয়া করে যাননি? মক্কায় মুসলমানগণ ভয়ে দিন কাটাতেন। আপনি যখন মুসলমান হলেন, আপনার মাধ্যমে ইসলাম শক্তি সঞ্চয় করল। আপনি যখন হিজরত করেছিলেন, 

সে ছিল এক মহাবিজয়। এরপর আপনি নবীজীর সাথে মুশরিকদের বিরুদ্ধে সকল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। নবীজীর মৃত্যুকালে তিনি আপনার উপর পূর্ণ সন্তুষ্ট ছিলেন। নবীজীর পরবর্তী খলীফার প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন। তিনিও মৃত্যুকালে। আপনার উপর সন্তুষ্ট ছিলেন। অতঃপর শাসক নিযুক্ত হলেন। আপনার মাধ্যমে মুসলমানদেরকে আল্লাহ অসংখ্য দেশ-বিজয়ের সুসংবাদ শুনিয়েছেন। অঢেল ধনসম্পদের অধিকারী বানিয়েছেন। শত্রুদের দেশান্তরিত করিয়েছেন। পরিশেষে আপনার জন্য শাহাদাত লিখে রেখেছেন। আপনার জন্য অজস্র সংবর্ধনা! কথা শেষ হলে উমর রা. বললেন, আমাকে বসাও! বসানোর পর তিনি ইবনে আব্বাসকে বললেন, কী বলেছ আবার বল! কথাগুলো পুনরাবৃত্তি করলে উমর রা. বললেন, “আল্লাহর শপথ, তোমার কথায় তো মানুষ কঠিন ধোঁকায় পড়ে যাবে।” ইবনে আব্বাসের জ্ঞান ও খোদাভীরুতা সম্পর্কে তিনি ভালো রকম অবগত ছিলেন। তার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি যা বলছ, আল্লাহর সাথে সাক্ষাতকালে কি এরকম বলতে পারবে? ইবনে আব্বাস বললেন, জি হ্যাঁ..! উমর রা. খুশি হয়ে বললেন, তোমার জন্যই প্রশংসা হে আল্লাহ! অতঃপর সবাই একে একে তাঁর প্রশংসা করতে লাগল। তাকে বিদায় জানাতে লাগল। 

অন্তিম উপদেশ 

এক যুবক উমর রা. এর কাছে এসে বলতে লাগল, সুসংবাদ গ্রহণ করুন হে আমীরুল মুমিনীন! নবী করীম সা. এর সাহচর্য পেয়েছেন, মুসলমানদের শাসক হয়ে ন্যায়বিচার করেছেন, পরিশেষে শাহাদাতের মর্যাদা পাচ্ছেন। উমর রা. বললেন, “আমি চাই যৎসামান্য নিয়েই আমি দুনিয়া থেকে বিদায় হই। আমার উপর কোনো পাওনা না থাকে। আমার জন্য কারো দুঃখবোধ না হয়।” যুবকটি চলে যাওয়ার সময় উমর রা. লক্ষ্য করলেন তার পাজামা মাটি স্পর্শ করছে। বললেন, তাকে নিয়ে এসো! যুবক ফিরে এলে উমর তাকে উপদেশ দিচ্ছিলেন, “হে ভ্রাতুস্পুত্র, কাপড় উপরে উঠাও! তাহলে বস্ত্রও পরিষ্কার থাকবে, আল্লাহর আদেশও পালন হবে।” ব্যথা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছিল। প্রায়সময়ই অজ্ঞান হয়ে পড়ছিলেন। পুত্র আব্দুল্লাহ রা. বলেন, অচেতন হয়ে পড়লে আব্বাজানের মাথাটুকু ধরে আমার কোলে রাখলাম। চেতনা ফেরার পর বললেন, আমার মাথা জমিনে রাখো! অতঃপর আবার অচেতন হয়ে পড়লেন। চেতনা ফেরার পর মাথা আমার কোলে দেখে আবারো বললেন, মাথা জমিনে রাখো! বললাম, আমার কোল এবং জমিন। 

 তো একই আব্বাজান! বললেন, আমার চেহারাটুকু মাটির দিকে করে দাও! হয়ত আল্লাহ অধমের অবস্থা দেখে দয়াপরায়ন। হবেন। মৃত্যু হলে দ্রুত আমায় কবরস্থ করো! হয়ত কোনো কল্যাণ-স্থলে আমাকে প্রেরণ করছ অথবা কোনো অকল্যাণকর বোঝা তোমরা কাঁধ থেকে নামিয়ে ফেলছ। অতঃপর বলতে লাগলেন, ধিক উমরের! ধিক তার মায়ের..! যদি ক্ষমাপ্রাপ্ত না হয়। অতঃপর ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস ভারী হচ্ছিল, মৃত্যুযন্ত্রণা তীব্র হচ্ছিল। অবশেষে তিনি ইন্তেকাল করলেন। নবীজী এবং আবু বকর রা. এর পাশেই তিনি কবরস্থ হলেন। হ্যাঁ.. সত্যিই উমর মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এরকম লোকের মৃত্যু হয় না। জীবনভর সকর্ম করেছেন। উন্নত আসন লাভ করেছেন। কবরে সাথে নিয়ে গেছেন তিনি কুরআনের তিলাওয়াত, আল্লাহর ভয়ে অধিক ক্রন্দন। বিপদে নামায যাকে আনন্দ দিত। তার জিহাদ তার মর্যাদা উঁচু করত। দুনিয়াতে অল্প পরিশ্রান্ত হলেও আখেরাতে কিন্তু ঠিকই তিনি চিরসুখী হয়ে গেলেন। নবী করীম সা. তাকে জান্নাতের সুসংবাদ-প্রাপ্তদের অন্যতম বলে গেছেন। নবীজী বলেন, 

 “একদা নিদ্রায় আমি নিজেকে জান্নাতে আবিষ্কার করলাম। দেখি এক মহিলা বড় প্রাসাদের পাশে ওযু করছে। জিজ্ঞেস করলাম, প্রাসাদটি কার? বলল, উমরের। তখন উমরের আত্মমর্যাদাবোধ স্মরণ করে আমি চলে এলাম। একথা শুনে উমর রা. কেঁদে কেঁদে বলতে লাগলেন, আপনার উপর আমি আত্মমর্যাদাবোধ দেখাব হে আল্লাহর রাসূল?!” (বুখারী-৩০৭০) 

আবু বাকরা (রা)

আবু বাকরা রা. এর মৃত্যুশয্যায়। সন্তানগণ ডাক্তার নিয়ে আসতে চাইলে তিনি বারণ করলেন। মৃত্যুর ফেরেশতা আসার পর সন্তানদের উদ্দেশ্যে উচ্চস্বরে বলতে লাগলেন, “কোথায় ডাক্তার? সত্যবাদী হলে মৃত্যুদূতকে ফেরাও তো দেখি!” 

আমির বিন যুবাইর। 

তার মৃত্যুশয্যায় পরিবার পাশে বসে কাঁদছিল। মৃত্যুর যন্ত্রণা ভোগ করছিলেন এমন সময় মাগরিবের আযান হলো। কণ্ঠনালিতে নিঃশ্বাস ত্যাগের আওয়াজ শুনা যাচ্ছিল। আযান শুনে পাশের লোকদের বললেন, আমাকে উঠাও! সবাই বলল, কোথায়? বলল, মসজিদে। এই কঠিন মুহূর্তে মসজিদে? বললেন, কেন নয়? সুবহানাল্লাহ. আযান শুনেও আমি মসজিদে যাব না?! আমাকে উঠাও! সবাই ধরে তাঁকে মসজিদে নিয়ে গেলেন। ইমামের সাথে এক রাকাত সম্পন্ন করে সেজদারত অবস্থায় ইন্তেকাল করলেন। হ্যাঁ.. সেজদারত অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন। যে ব্যক্তি নামায কায়েম করল, আল্লাহর আনুগত্যে ধৈর্যধারণ করল, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে সুসমাপ্তি দান করবেন। 

আব্দুর রহমান বিন আছওয়াদ

সৎকর্মশীলগণ মৃত্যুকালে সৎকাজের বিচ্ছেদে অনেক আফসোস করেন। আকাঙ্ক্ষা করেন, যদি আরেকটু আয়ু পেতাম, তবে আরও সৎকর্ম বাড়িয়ে নিতাম। 

আব্দুর রহমান বিন আছওয়াদ রা, মৃত্যুকালে কাঁদছিলেন। জিজ্ঞেস করা হলো, কাঁদছেন কেন? আপনি তো অমুক কাজ করেছেন, তমুক কাজ করেছেন! (অর্থাৎ অনেক এবাদত করার সুযোগ পেয়েছেন) বললেন, এজন্য কাঁদছি.. আল্লাহর শপথ, নামায এবং রোযার উপর আমার আফসোস হয় (যদি আরো বেশী করে পালন করতে পারতাম), অতঃপর কুরআনুল কারীম তেলাওয়াত করতে করতে ইন্তেকাল করলেন। 

ইয়াজিদ রাকাশী

মৃত্যুর সময় তিনি কাঁদছিলেন আর নিজেকে সম্বোধন করে বলছিলেন, হে ইয়াযিদ, মৃত্যুর পর কে তোমার জন্য নামায পড়বে? কে তোমার জন্য রোযা রাখবে? কে তোমার অপরাধের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করবে? অতঃপর শাহাদাত পাঠ করতে করতে ইন্তেকাল করলেন।

আল্লাহ আমাদের সকলকে সুসমাপ্তি দান করুন.. আমীন! 

উপদেশ, 

عليگور آدوأ 

و الذين تتوقف المليك طيبيب يقولون 

اة يماگر تموين کوه النحل: ۳۴ | 

“পবিত্রতম মুহূর্তে ফেরেশতারা যাদের জান কবজ করেন। ফেরেশতারা বলেন, তোমাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। তোমরা যা করতে, তার প্রতিদানস্বরূপ জান্নাতে প্রবেশ কর।” (সূরা নাহলো-৩২) 

অন্তিম উপদেশ 

মৃত্যু কখনো ধনী-গরিব চেনে না। প্রেসিডেন্ট বা মন্ত্রী বলে পরোয়া করে না। ধনী কিংবা প্রভাবশালী তোয়াক্কা করে না। কতিপয় বাদশাহ মৃত্যুকালে কিছু উপদেশ শুনিয়ে গেছেনঃ 

হারুনুর রশীদ

অর্ধপৃথিবী জুড়ে যার রাজত্ব বিস্তৃত ছিল। সর্বত্রই যার সেনাদল নিয়োজিত ছিল। যিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে মেঘমালাকে লক্ষ্য করে বলতেন, “তুমি হিন্দুস্তানে বৃষ্টি বর্ষণ কর কিংবা চীনে, যেখানেই বর্ষণ করবে, সেখানেই আমার রাজত্ব।” সেই প্রতাপশালী বাদশাহ হারুনুর রশীদ একদা শিকারে বের হলেন। পথিমধ্যে বাহলুল নামক এক ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাত হলে তিনি তাকে কিছু উপদেশ শুনাতে বললেন। বাহলুল উপদেশ দিতে গিয়ে বললেন, 

“হে আমীরুল মুমিনীন! কোথায় আপনার বাবা-মা? কোথায় আপনার পূর্বপুরুষ? নবীজী থেকে নিয়ে আপনার পিতা পর্যন্ত.. কোথায় তারা? বাদশাহ বললেন, সবাই তো মারা গেছে। বলল, কোথায় তাদের প্রাসাদ? বাদশাহ বললেন, এগুলিই তো তাদের প্রাসাদ ছিল। বাহলুল বললেন, এখন তাদের কবর কোথায়? বাদশাহ বললেন, এই তো তাদের কবর। অতঃপর বাহলুল বললেন, ওইগুলো তাদের প্রাসাদ ছিল আর এইগুলো হলো তাদের কবর! তবে তাদের সুবিশাল প্রাসাদগুলো কী উপকারে এসেছে কবরে তাদের?” হারুন বললেন, আপনি সত্যই বলেছেন।আরও কিছু উপদেশ দিন! বাহলুল বলতে লাগলেন, দুনিয়ায় আপনার প্রাসাদগুলও অনেক প্রশস্ত ছিল, কিন্তু কবর কখনই প্রশস্ত হবে না। বাদশাহ হারুন তার কথাগুলো শুনে কাঁদছিলেন। বাহলুল আরো বললেন, ধরুন, আপনি পারস্য সম্রাটের সকল ধনভাণ্ডারের মালিক হলেন এবং এগুলো ভোগ করার জন্য দীর্ঘ আয়ুও লাভ করলেন। পরিশেষে কবর কি আপনার ঠিকানা নয়? যেখানে সকল নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে?!” হারুনুর রশীদ বললেন, নিশ্চয়ই..! 

এরপর বাদশাহ ভ্রমণ থেকে ফিরে এসে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। কিছুদিন পর তিনি মৃত্যুশয্যায়ী হয়ে গেলেন। মৃত্যুর কিছু পূর্বে | তিনি চিৎকার করে তার সকল বাহিনীকে একত্র করতে বললেন। অসংখ্য অগণিত সেনাদল তরবারি আর লৌহ বর্ম পরে বাদশাহর সামনে উপস্থিত হলো। বাদশাহ তাদের দেখে কেঁদে কেঁদে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে বললেন, “ওহে যার রাজত্বের কখনো পতন ঘটে না, রাজত্বের পতন ঘটছে এমন 

অসহায় রাজার প্রতি একটু দয়া করুন!” অতঃপর ক্রন্দনরত অবস্থায়ই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। অর্ধপৃথিবী জুড়ে রাজত্বকারী এই বাদশাহ’কে কবরস্থ করা হচ্ছে ছোট্ট একটি গর্তে। যেখানে তার কোনো উপদেষ্টা থাকবে না। কোনো মন্ত্রী পরিষদ থাকবে না। বিলাসিতার কোনো উপকরণ সেখানে পাওয়া যাবে না। এমনকি একটি বিছানা পর্যন্ত সেখানে বিছানো হবে না। রাজত্ব সেখানে বিন্দুমাত্র কোনো কাজে আসবে না। 

আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান

খলীফা আব্দুল মালিকের যখন মৃত্যু নিকটবর্তী গেল, নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল, তখন ঘরের সকল জানালা খুলে দিতে বললেন। অতঃপর জানালার দিকে তাকিয়ে দেখলেন, একজন দরিদ্র ধোপা কাপড় পরিষ্কার করছে, জামা-কাপড়গুলো দেয়ালে মারছে। এই দৃশ্য দেখে তিনি বলতে লাগলেন, 

“হায়! আমি যদি ধোপা হতাম! হায়! আমি যদি মিস্ত্রী হতাম! হায়! আমি যদি কুলি হতাম! হায়! আমি যদি আমীরুল মুমিনীন 

না হতাম..!” বলতে বলতে তিনি ইন্তেকাল করলেন। হ্যাঁ. তারা পাড়ি জমিয়েছেন। এমন জগতে, যেখানে কোনো সেবক নেই। কোনো আত্মীয়-স্বজন নেই। উপদেষ্টা বা সহযোগী নেই। এমন জগত, যেখানে সাথে থাকবে শুধুই কৃতকর্ম। আল্লাহ বলেন, 

که فصلت: 46 

وماربك بظل للعبيد 

“আপনার পালনকর্তা বান্দাদের প্রতি মোটেই জুলুম করেন না” (সূরা ফুসসিলাত-৪৬)

অপর একটি দল, যাদেরকে আল্লাহ পূর্ণ রিজিক দান করেছিলেন। শারীরিক সক্ষমতা দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিতে অবহেলা করেছে। অতঃপর মৃত্যু আকস্মিক তাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে। স্বজনদের থেকে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে। নিকৃষ্টতম কর্মের উপর তাদের মরণ হয়েছে। মৃত্যু প্রত্যক্ষকালে তারা দুনিয়ায় পুনঃপ্রত্যাবর্তন চেয়েছে।না কোনো ব্যবসার উদ্দেশ্যে নয়, সম্পদ অর্জনের জন্য নয়, পরিবারের সাথে সাক্ষাতের নিমিত্তে নয়; বরং আমল সংশোধন করতে। সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে। কিন্তু.. মহান। সৃষ্টিকর্তা ফায়সালা করেছেন, কখনই তারা দুনিয়াতে ফিরে যাবে না। 

ব্যতিক্রমী কিছু মৃত্যু

 পাপী, অপরাধী, উদাসীন ও দুনিয়ার মোহে লিপ্ত ব্যক্তিদের জন্য মরণকালে কঠিন শাস্তি অবধারিত। তাদের ও আল্লাহর মাঝে অন্তরায় সৃষ্টি হওয়ার বিবরণ এসেছে। ইমাম কুরতুবী রহ. বলেন, “দুনিয়া এবং অতি প্রত্যাশার প্রতি প্রবল আসক্ত এক ব্যক্তির মৃত্যুকালে সন্তানরা তাকে বিদায় জানাচ্ছিল, কালেমা পাঠ করতে উদ্বুদ্ধ করছিল। কিন্তু সে চিৎকার করছিল আর বলছিল, অমুক ঘরটি এভাবে ঠিক কর। অমুক ক্ষেতে ওটা চাষ কর। অমুক দোকানে ওই মাল উঠাও… এ কথাগুলো বলতে বলতেই সে দুনিয়া ত্যাগ করল।” হ্যাঁ.. সে মৃত্যুবরণ করল। কিন্তু তার দোকানগুলো তো অন্যদের ভোগদখলে। আহ.. দুঃখের কোনো সীমা রইল কি?! 

মদ্যপ

ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেন, মদ্যপদের সাথে উঠা-বসায় অভ্যস্ত এক ব্যক্তির মৃত্যুকালে স্বজনরা বলল, বল, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ.. (আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই) একথা শুনে তার চেহারা বিবর্ণ হয়ে ওঠল। জিহ্বা ভারী হয়ে গেল। কয়েকবার এভাবে তালকিনের পর সে চিৎকার করে বলতে লাগল, “না.. আগে তুমি পান কর, পরে আমাকে | দাও! না.. আগে তুমি পান কর, পরে আমাকে দাও!” এ কথা 

বলতে বলতে সে মৃত্যুবরণ। করল। মুহাম্মদ বিন মুগীস মদপানে অভ্যস্ত এক পাপিষ্ঠ ব্যক্তি ছিল। অতি-অভ্যাসের দরুন মদ বিক্রেতার ঘর থেকে সে বেরই হতো না। হঠাৎ প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে মৃত্যুশয্যায়ী হয়ে গেল। সাথীগণ তাকে বলল, শরীরে কি শক্তি পাও! চলতে পার? সে বলল, হ্যাঁ.. চাইলে এখনই মদ-বিক্রেতার বাড়ীতে যেতে পারব। সাথী বলল, নাউযুবিল্লাহ.. বরং বল, চাইলে এখনই মসজিদে যেতে পারব! একথা শুনে সে কাঁদতে কাঁদতে বলছিল, এটিই আমার উপর প্রবল হয়ে গেছে। মানুষ যা অভ্যাস করবে, মৃত্যুর সময় তাই মুখ দিয়ে বের হবে। আমি তো কখনই মসজিদে। যেতাম না।” ইবনে আবি রাওয়াদ বলেন, “এক ব্যক্তির মৃত্যুর সময় আমি তার কাছে উপস্থিত হলাম। পাশে থাকা সাথীগণ তাকে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র তালকিন করছিল। কিন্তু তার এবং উক্ত মূল্যবান কালেমার মধ্যে অন্তরায় তৈরি হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর যখন নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছিল আর সবাই বারবার তালকিন করছিল, তখন চিৎকার করে বলে উঠল, “সে লা ইলাহা ইল্লাল্লায় কাফের ছিল..” অতঃপর শ্বাস টানতে টানতে মৃত্যুমুখে পতিত হলো। তিনি বলেন, অতঃপর দাফন শেষে আমরা পরিবারকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তারা বলল, সে ছিল মদ্যপ।” (আলজাওয়াবুল কাফী-১৬৫)। 

অপমৃত্যু এবং কুসমাপ্তি থেকে আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন। কবীরা গুনাহ থেকে রক্ষা করুন। দুনিয়াতে যে ব্যক্তি মদপান করবে, আখেরাতে জান্নাতের পবিত্র শরাব থেকে সে বঞ্চিত হবে; মদ্যপকে আখেরাতে “ত্বীনাতুল খাবাল” পান করানো হবে। “ত্বীনাতুল খাবাল” কী জিজ্ঞেস করা হলে নবীজী বললেন, জাহান্নামীদের দেহ-নির্গত পুঁজ। তবে যদি মৃত্যুর পূর্বেই খাঁটি-মনে তাওবা করে ফিরে আসে, তবে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন।তবে অশ্লীল সংগীত এবং নৃত্য পরিবেশনকারীদের মৃত্যুকালে কঠিন শাস্তি অপেক্ষা করছে। 

নামায ত্যাগকারী 

সবচেয়ে বড় অপরাধী। শয়তানের সহযোগী। একজন মানুষ আর কুফুরের মাঝে পার্থক্য কেবল নামায। মৃত্যুর মুহূর্তে তাদের অবস্থা হবে অতিশোচনীয়। ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেন, অপরাধী এক ব্যক্তির মৃত্যুকালে লোকেরা দৌড়াদৌড়ি করে তার কাছে। 

এসে কালেমার তালকিন | it । 

করতে লাগল। রূহ কবজের মুহূর্তে চিৎকার করে বলে উঠল, “আমি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলব? লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ আমার কী উপকারে আসবে? আমি তো এক ওয়াক্ত নামাযও পড়িনি।” একথা বলেই সে মৃত্যুবরণ করল। 

এই হলো মৃত্যু..! পরকাল ভ্রমণপথের প্রথম যাত্রাবিরতি..! 

জিজ্ঞাসা সম্পদ বিনষ্ট হলে বা মারাত্মক দৈহিক অসুস্থতার ফলে মৃত্যু কামনা বৈধ কি? 

উত্তরঃ কখনই নয়। হয়ত আল্লাহ কঠিন বিপদের পর সহজ কিছুর ফায়সালা রেখেছেন। সেজন্য ধৈর্যধারণ করা এবং অধিক 

পরিমাণে দোয়ায় লিপ্ত থাকা আবশ্যক; মৃত্যু কামনা নয়। 

 নবী করীম সা. বলেন, “কঠিন বিপদের দরুন তোমাদের কারোর মৃত্যু কামনা বৈধ নয়। যদি বলতেই হয়, তবে এতটুকু বলবে, হে আল্লাহ, যতক্ষণ আমার জীবনে কল্যাণ থাকে, ততক্ষণ আমাকে বাঁচিয়ে রাখুন! মৃত্যুই যদি আমার জন্য কল্যাণকর হয়, তবে আমাকে মরণ দিন!” (বুখারী-৫৬৭১)। 

আরো বলেন, “তোমাদের কেউ যেন মৃত্যু কামনা না করে। আগেভাগেই যেন মরণকে আহ্বান না করে। কারণ, মৃত্যুর সাথে সাথে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়। মুমিন যতই দীর্ঘজীবী হবে, ততই তার জন্য তা কল্যাণকর হবে।” (বুখারী-২৬৮২) 

মনে রাখবেন, ব্যক্তির কাজ ভালো হোক কিংবা মন্দ মৃত্যুর সময় অবশ্যই তা প্রভাব ফেলবে। 

মৃত্যুতে বিশ্বাস 

চিন্তা করলে বুঝা যায় যে, মৃত্যু এক কঠিন বিষয়, যা মানুষকে অনন্ত সুখ কিংবা চির-দুঃখের দিকে ঠেলে দেয়। হায়, যদি মৃত্যু কেবলই দেহ-বিচ্ছেদকারী অথবা স্মৃতি-বিনষ্টকারী বিষয় হতো। 

মৃত্যু কোনো দুশ্চিন্তার বিষয় নয়, কারণ এ দরজা দিয়ে সকলেই একদিন প্রবেশ করবে। চিন্তা হলো মৃত্যু-পরবর্তী জীবন নিয়ে..!! জান্নাতে ও নির্ঝরিণীতে? নাকি লাঞ্ছনা ও আগুনের শাস্তিতে? আল্লাহর চিরন্তন বিধান হল, জীবনভর মানুষ যে কাজের উপর অভ্যস্ত থাকবে, সে কাজের উপরই তার পরিসমাপ্তি ঘটবে। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর জিকির এবং নামাযে মনযোগী ছিল, সাদকা ও দান খয়রাতে সচেষ্ট ছিল, তার পরিণতি হবে শুভ। 

আর যে কল্যাণকর কাজ থেকে বিমুখ ছিল, প্রবল আশংকা যে, তার মৃত্যু সে স্বভাবের উপরই হবে। 

মৃত্যু কী?

মৃত্যু এমন এক বিষয়, যা প্রাণী-মাত্রই কোনোরূপ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়াই বুঝে ফেলে। মানুষ-জ্বিন, পশু পাখি.. সকলেই। সংক্ষেপে মৃত্যু হলও দেহ, আত্মা ও মনের পারস্পরিক বিচ্ছেদ। দেহের মৃত্যু হলেও আত্মার কোনো মরণ নেই। দেহ-বিচ্ছেদের পরক্ষণেই সে হয়তো অনন্ত সুখে অথবা চিরদুঃখে প্রবেশ করে। কখনো শান্তি বা শাস্তি কেবল আত্মার ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। আর কখনো আত্মা এবং দেহ উভয়ের ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে। মৃত্যুতে বিশ্বাসের মর্ম হলো, সকল সৃষ্টি চিরঞ্জীব নয়; সবকিছু একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে। সকলকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে। আল্লাহ বলেন, 

و شیء هالك إلا وجهه ه القصص: ۸۸ 

“আল্লাহর সত্তা ব্যতীত সবকিছু ধ্বংস হবে।” (সূরা কাসাস-৮৮)

অন্য আয়াতে বলেন, 

“ভূপৃষ্ঠের সবকিছুই ধ্বংসশীল। একমাত্র আপনার মহিমায় ও মহানুভব পালনকর্তার সত্তা ছাড়া।” (সূরা আর-রাহমান ২৬-২৭)। অপর আয়াতে বলেন, 

تسابق الموتی که آل عمران: ۱۸۰ 

“প্রত্যেক প্রাণীকে আস্বাদন করতে হবে মৃত্যু” (সূরা আলে ইমরান-১৮৫) ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সা. বলেন, আপনার মর্যাদার দোহাই দিয়ে আশ্রয় চাই! আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, আপনার মৃত্যু নেই; বরং মানুষ ও জ্বিন মরণশীল। (বুখারী-৭৩৮৩) মৃত্যুর কাজ সমাধা করতে আল্লাহর পক্ষ থেকে নিযুক্ত রয়েছে এক ফেরেশতা। 

কে সেই মৃত্যুদূত?

প্রত্যেক ফেরেশতার জন্য আল্লাহ দায়িত্ব নির্ধারণ করেছেন। জিবরীল হলেন ওহি’র বাহক। মিকাঈল বৃষ্টির তত্ত্বাবধায়ক। ইসরাফিল শিঙ্গায় ফুৎকারের জন্য অপেক্ষমাণ। অনেক ফেরেশতা পর্বতকুল রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে। আবার অনেকে জীবের মৃত্যুর কাজ সমাধা করতে। কুরআনুল কারীমে মৃত্যুদূত সম্পর্কে আল্লাহ এভাবে বলেছেন, 

ل به إلى ترجعون 

قوقل يتوفر ملك الموت الذي و 

“বলুন, তোমাদের প্রাণ হরণের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা তোমাদের প্রাণ হরণ করবে। অতঃপর তোমরা তোমাদের পালনকর্তার কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে।” (সূরা আছ-সাজদা-১১)

মৃত্যুর ফেরেশতার অনেক সঙ্গী আছে.. আল্লাহ বলেন, । 

توا 

وهم لايفون و الأنعام: 11 

“তখন আমার প্রেরিত ফেরেশতারা তার আত্মা হস্তগত করে। নেয়। এতে বিন্দুমাত্রও তারা বিলম্ব করে না” (সূরা আল আনআম-৬১) নবী করীম সা. বলেন, 

“অতঃপর মৃত্যুর ফেরেশতা এসে মাথার পাশে বসেন।” (মুসনাদে আহমদ-১৮৫৫৭) 

কখনই তারা নির্ধারিত সময়ের পূর্বে আসেন না। প্রতিটি জীবের জন্যই সময় নির্ধারিত। বিন্দুমাত্র আগপিছ করেন না। আল্লাহ। তা’লা বলেন, 

با متن و 

وماات إنفس أن تموت إبإذن اللير 

 “আর আল্লাহর হুকুম ছাড়া কেউ মরতে পারে না, সেজন্য একটা সময় নির্ধারিত রয়েছে।” (সূরা আলে ইমরান-১৪৫) মায়ের পেটে অবস্থানকালেই সেই নির্ধারিত সময় লেখা হয়ে গেছে। যেমনটি নবী করীম সা. বলেছেন, 

 “মায়ের পেটে তোমাদের আকৃতি চল্লিশ দিনে সম্পন্ন করা হয়। অতঃপর তা একটি রক্তপিণ্ডে অনুরূপ সময়ে তৈরি করা হয়, অতঃপর তা একটি মাংসপিণ্ডে অনুরূপ সময়ে তৈরি করা হয়। অতঃপর আল্লাহ তা’লা তার কাছে একজন ফেরেশতা পাঠান। ফেরেশতাকে তার কর্ম, রিজিক, মৃত্যু-মুহূর্ত এবং সৌভাগ্যবান নাকি দুর্ভাগা লিখে দিতে বলা হয়।” (মুসলিম-৬৮৯৩) 

কেউ জানে না কোথায় তার মৃত্যু 

আল্লাহ তা’লা বলেন, 

و وما تدري نفس ماذا تكسب غدا وما تدري نفس بأي أرض تموت إن الله علييييه لقمان: ۳۶ 

“কেউ জানে না আগামীকাল সে কী উপার্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন ভূমিতে সে মৃত্যুবরণ করবে” (সূরা লোকমান ৩৪) 

নবী করীম সা. বলেন, 

 “আল্লাহ তা’লা যখন কোনো নির্দিষ্ট স্থানে বান্দার রূহ হস্তগত করতে চান, তখন সে স্থানে তার জন্য প্রয়োজন তৈরি করে দেন।” (ইবনে হিব্বান-৬১৫১)। এটাই বাস্তবতা। কত মানুষ ভিনদেশে পাড়ি জমানোর স্বপ্ন দেখে, সেখানে ভ্রমণের কোনো কল্পনাও সে কোনোদিন করেনি। কিন্তু আল্লাহ তা’লা ঠিকই তার মৃত্যু সেখানে লিখে রেখেছেন। যখন তার মৃত্যুর নির্ধারিত সময় নিকটবর্তী হয়, তখন সেস্থলে তার কোনো প্রয়োজন তৈরি করে দেন, চিকিৎসা.. ব্যবসা.. বা কর্মসংস্থান..। অতঃপর সেখানেই ফেরেশতাগণ তার রূহ হস্তগত করেন। 

মৃত্যুর স্মরণ নবী করীম সা. বলেন, 

 “সকল ভোগবিলাস ধ্বংসকারীকে (মৃত্যু) বেশি করে স্মরণ কর।” (তিরমিযী-২৪৬০)। ইবনে উমর রা. কে উদ্দেশ্য করে নবীজী বলেছিলেন, 

 “দুনিয়াতে এমনভাবে চল, যেন তুমি এক অপরিচিত অথবা পথিক।” (বুখারী-৬৪১৬) ইবনে উমর রা. বলতেন, 

 “সন্ধ্যায় জীবিত থাকলে সকালের অপেক্ষা করো না। সকালে জীবিত থাকলে সন্ধ্যার অপেক্ষা করো না। অসুস্থতার আগেই সুস্থতার মূল্যায়ন কর। মৃত্যু আসার পূর্বেই জীবনকে কাজে লাগাও!” (বুখারী-৬৪১৬) 

মৃত্যুতে অনীহা কি আল্লাহর সাক্ষাতে অনীহা? 

আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সা. বলেন, যে আল্লাহর সাক্ষাত পছন্দ করবে, আল্লাহও তার সাক্ষাত পছন্দ করবেন। আর যে আল্লাহর সাক্ষাত অপছন্দ করবে, আল্লাহও তার সাক্ষাত অপছন্দ করবেন। বললাম, হে আল্লাহর নবী, তাহলে মৃত্যুতে অনীহা? মৃত্যুকে তো সকলেই অপছন্দ করে। নবীজী বললেন, বিষয়টি এমন নয়; বরং মুমিনকে যখন আল্লাহর রহমত, তাঁর সন্তুষ্টি এবং জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন সে আল্লাহর সাক্ষাতে উদগ্রীব হয়ে ওঠে। কিন্তু কাফেরকে যখন আল্লাহর ক্রোধ ও শাস্তির কথা শুনানো হয়, তখন সে আল্লাহর সাক্ষাতে অনীহা প্রদর্শন করে। আল্লাহও তখন তার সাক্ষাত অপছন্দ করেন।” (মুসলিম-২৬৮৫)। 

কঠিন বাস্তবতা, সকলেই মৃত্যুতে বিশ্বাস করে, কিন্তু খুব কম লোকই তার জন্য প্রস্তুতি নেয়। 

মৃত্যুর প্রস্তুতি 

মৃত্যু আসার পূর্বেই তার জন্য যথাযথ প্রস্তুতি নেয়া সকলের কর্তব্য। মৃত্যু অবশ্যই সকলের কাছে আসবে। ছোট-বড় কাউকে সে ছাড় দেবে না। সংশোধনের উদ্দেশ্যে কারো জন্য সে কাল বিলম্ব করবে না। 

* মানুষ কীভাবে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হবে? * মৃত্যুর পর উপকারী কাজগুলো কী? 

ভূমিকা তাওবা করে আমরণ সৎকর্মে লিপ্ত থাকাই মৃত্যু-পরবর্তী জীবনে সুখী হওয়ার একমাত্র উপায়। আল্লাহ তা’লা বলেন, 

الموت فيقول رب لولا 

وأنفقوأمن ارترين قبل أن يأتي أحد أتين إلى أجل قريب أدق وأن 

بين الصيحين ( وكن و اله 

و المنافقون: ۱۰ – ۱۱ 

تقا إذا جاء أجلها والله حبيباتمون 

“আমি তোমাদেরকে যা দিয়েছি, তা থেকে মৃত্যু আসার আগেই ব্যয় কর। অন্যথায় সে বলবে, হে আমার পালনকর্তা, আমাকে আরও কিছুকাল অবকাশ দিলে না কেন? তাহলে আমি সাদকা। করতাম এবং সৎকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। প্রত্যেক ব্যক্তির নির্ধারিত সময় যখন উপস্থিত হবে, তখন আল্লাহ কাউকে অবকাশ দেবেন না। তোমরা যা কর, আল্লাহ সে বিষয়ে খবর রাখেন।” (সূরা মুনাফিকুন ১০-১১) নবী করীম সা. বলেন, পাঁচটি বিষয় মূল্যায়ন কর অপর পাঁচটি বিষয় আসার পূর্বেই। যৌবনকে বার্ধক্যের পূর্বে, সুস্থতাকে অসুস্থতার পূর্বে, ধনৈশ্বর্যকে দারিদ্রের পূর্বে, অবসরকে ব্যস্ততার পূর্বে এবং জীবনকে মৃত্যুর পূর্বে। (সহীহ তারগীব-৩৩৫৫) 

মৃত্যুর পর উপকারী আমল

সন্তানদেরকে সকর্মশীলরূপে গড়ে তোলে। কেননা পরবর্তীতে পিতৃ-পুরুষদের জন্য সে রহমত ও মাগফেরাতের দোয়া করবে। শরীয়তের জ্ঞান শিখা, চর্চা করা 

এবং প্রচার করা।সাদকায়ে জারিয়া’র কাজ বেশি করে করা। উপরোক্ত সবগুলোর ফযিলত নবী করীম সা. একটিমাত্র হাদিসে বলেছেন, 

“মানুষ মরে গেলে তিনটি আমল ছাড়া তার সমস্ত আমল বন্ধ। হয়ে যায়, এক- সাদকায়ে জারিয়া। দুই- মানুষ উপকৃত হয় এমন এলেম। তিন- মৃত্যুর পর তার জন্য দোয়া করবে এমন সুসন্তান।” (মুসলিম-১৬৩১)। সাদকায়ে জারিয়া হিসেবে আরও যে সব আমলের প্রতিফল মুমিনের কাছে গিয়ে পৌঁছুবে, 

” নবী করীম সা. বলেন, “মৃত্যুর পর মুমিনের কাছে যে সকল আমল গিয়ে পৌঁছুবে- যে দীনী জ্ঞান সে শিক্ষা দিয়েছে এবং প্রচার করেছে, যে সুসন্তান সে ছেড়ে এসেছে, যে কুরআন সে পরবর্তীদের কাছে রেখে গেছে, যে ঘর সে পথিক মুসাফিরদের জন্য তৈরি করেছে, যে নদী (পুকুর) সে প্রবাহিত (খনন)। করেছে, সুস্থ অবস্থায় যে সাদকা তার সম্পদ থেকে বের করেছে এবং সর্বশেষ সাথে থাকবে তার মৃত্যু-পরবর্তী জীবন।” (ইবনে মাজা-২৪২) 

অসিয়ত লেখা

 মৃত্যুর প্রস্তুতিস্বরূপ অসিয়ত লিখে রাখা আবশ্যক। উত্তম হলো কিছু সম্পদ সাদকা’র জন্য নির্ধারণ করা। কতিপয় সাহাবী একতৃতীয়াংশ আবার। কেউ এক চতুর্থাংশ সম্পদ সাদকা’র জন্য অসিয়ত করে গিয়েছিলেন। নবী করীম সা. বলেন, 

| “নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের মৃত্যু-মুহূর্তে সৎকর্ম বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তোমাদের এক তৃতীয়াংশ সম্পদ সাদকা হিসেবে গ্রহণ। করেছেন।” (ইবনে মাজা-২৭০৯) অপর হাদিসে নবী করীম সা. এরশাদ করেন,

“কোনো মুসলিমের কাছে যদি কিছু সম্পদ অবশিষ্ট থাকে যা সে অসিয়ত করে দিতে চায়, তবে সে যেন দুই রাত অতিবাহিত হওয়ার পূর্বেই অসিয়ত লিখে রাখে।” (বুখারী-২৭৩৮) আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, “নবীজীর মুখে একথা শুনার পর অসিয়ত লেখা-বিহীন একটি রাত্রও আমার অতিবাহিত হয়নি।”

আত্মার সাথে মৃত্যুর সম্পর্ক

দেহের মাঝে আত্মার প্রকৃতি নিয়ে মানুষ মতপার্থক্য করেছে। আত্মা দেহের প্রত্যেকটি অঙ্গে বিচরণশীল। আত্মার উপস্থিতিই জীবন। আত্মা এবং অন্তর অভিন্ন বস্তু। আত্মার বিচরণক্ষেত্র হলো দেহ। দেহ থেকে আত্মা যখন পৃথক হয়ে যায়, তখন মানুষ মৃত্যুর সম্মুখীন হয়। রূহ কেবল একটি সৃষ্টি। তবে দেহের মৃত্যুর ফলে আত্মার মৃত্যু ঘটে না। আত্মার দেহ-বিচ্ছেদ ইন্তেকাল (স্থান-পরিবর্তন) মাত্র; কিন্তু আত্মার কোনো মৃত্যু নেই। দেহ নিঃশেষ হওয়ার পরও আত্মা অবশিষ্ট থাকে। হয়তো চির-সুখে অথবা অসহনীয় দুঃখে। 

বাস্তবতা.. 

যে ব্যক্তি আল্লাহর সাক্ষাৎ পছন্দ করে, আল্লাহও তার সাক্ষাৎ পছন্দ করেন। আর যে আল্লাহর সাক্ষাৎ অপছন্দ করে, আল্লাহও তার সাক্ষাৎ অপছন্দ করেন। 

মৃতের বিধান। 

জ্ঞান ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের এ অত্যাধুনিক যুগে মৃত্যু আসার পূর্বেই নিদর্শন দেখে অনেকেই মৃত্যু বুঝে ফেলে। কিন্তু অনেক সময় মানুষ সম্পূর্ণ প্রতিকুল পরিস্থিতিতে মৃত্যুবরণ করে। তাই মৃত্যুর নিদর্শনাবলী সম্পর্কে অবগত হওয়া সকলের জন্যই একান্ত জরুরী। মৃত্যুর কিছু শরয়ী বিধান রয়েছে। রয়েছে কিছু ফিকহী মাছায়িল। তাই মৃত্যুর নিদর্শনগুলো জানতে হবে। মৃতের গোসল এবং তার কাফন-দাফনের পদ্ধতি শিখতে হবে। 

* মৃত্যুর নিদর্শনগুলো কী কী? * মৃতকে কীভাবে গোসল দেয়া হয় এবং কাফন পরানো হয়? * কীভাবে জানাযা পড়তে হয় এবং দাফন করতে হয়? 

মৃত্যুর নিদর্শন 

রূহ বের হওয়ার সময় মৃতের উপর যে সব অবস্থার প্রকাশ ঘটে, ১। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে, যেন তার দৃষ্টি উপরের দিকে বহুদূর চলে গেছে। 

২। নাসিকা খানিকটা ডানদিকে অথবা বামদিকে সরে যাবে। ৩। সর্বাঙ্গ নিস্তেজ হওয়ার ফলে চোয়ালের নিম্নাংশ ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। ৪। দেহ শিথিল হয়ে যাবে। ৫। হৃদকম্পন থেমে যাবে। এ সবগুলো বা কয়েকটি যদি কারো উপর প্রকাশ হয়, তবে বুঝতে হবে তার মৃত্যু হয়ে গেছে। 

লাশ কবরে নিয়ে যাওয়া। দ্রুত কাফন ও জানাজা শেষ করে লাশ কবরের দিকে নিয়ে যাওয়া উত্তম। নবী করীম সা. বলেন, “জানাজা শেষ হলে লোকেরা যখন লাশ কাঁধে উঠায়, মৃত সৎলোক হলে তখন বলতে থাকে, দ্রুত নিয়ে চল আমায়.. দ্রুত নিয়ে চল আমায়..। আর অসৎ হলে বলতে থাকে- হায়, কোথায় নিয়ে চললে আমায়? এভাবে সে চিৎকার করতে থাকে। মানুষ ব্যতীত সকল প্রাণীই তার চিৎকার শুনতে পায়। যদি মানুষ। শুনত তবে বেহুশ হয়ে যেত।” (বুখারী-১৩১৪)। দ্রুত কাফন-দাফন সম্পন্ন করা উত্তম। নবী করীম সা. বলেন, “দ্রুত জানাজা শেষ করে দাফন সম্পন্ন কর। যদি সে সৎ হয়, তবে কতই না উত্তম স্থানে তাকে এগিয়ে দিচ্ছ। আর। যদি অসৎ হয়, তবে অনিষ্টকে তোমাদের কাঁধ থেকে নামিয়ে দিচ্ছ।” (মুসলিম-১৩১৬) 

তিনটি বস্তু মৃতের সাথে কবরে যায় জীবদ্দশায় মানুষ কতকিছু কামনা করে, সম্পদ সঞ্চয়, উৎকৃষ্ট ফার্নিচার দিয়ে ঘর সজ্জিত-করণ, সর্বাধুনিক গাড়ি নির্বাচন, সর্বোন্নত বাড়ী নির্মাণ ইত্যাদি। পাশাপাশি সে গুরুত্ব দেয় তার স্ত্রী-সন্তান ও পেশা; ভাল হোক চায় মন্দ।। অতঃপর যখন মারা যায়, তখন তিনটি বিষয় তার সাথে কবরের দিকে যায়- ধন সম্পদ, অর্থাৎ তার কেনা গাড়িতে করে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। পরিবার অর্থাৎ স্ত্রী-পুত্র ও ভাই-বোন এবং তার কর্ম। কবরস্থ করার পর প্রথম দুটো ফিরে যায়। কেবল কর্ম তার সাথে রয়ে যায়। হ্যাঁ. পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব, ধন-সম্পদ.. সবকিছুই ফিরে যায়। কেবল তার কর্মই তার সাথে থেকে যায়। যেমনটি নবী করীম সা. বলেছেন, “তিনটি বস্তু মৃতের সাথে কবরের দিকে যায়, দুটি ফিরে আসে, একটি রয়ে যায়- সম্পদ, পরিবার ও কর্ম। পরিবার ও সম্পদ। ফিরে আসে; থেকে যায় কেবল কর্ম।” (মুসলিম) আত্মার দেহ-বিচ্ছেদের পরপরই মৃত দুনিয়ার জগত থেকে বারযাখের জগতে চলে যায়। তবে কেমন হয় সেই বারযাখী জীবন? আর কবরবাসীর অবস্থাই কীরূপ? 

হায় আশ্চর্য..! যারা কবরে রেখে চলে আসবে, তাদের আমরা মূল্যায়ন করি, আর যে কবরে সঙ্গ দেবে, তাকে আমরা অবহেলা করি। 

বারযাখ এর জীবন 

.. ভূমিকা 

.. কবর। … কবরে মানুষের অবস্থা … আত্মা এবং দেহের সম্পর্ক … কবরে শাস্তি ও শান্তির পক্ষে প্রমাণ … বারযাখী জীবনে মানুষের অবস্থা । .. কবরের আযাবের কারণ .. কবরের আযাব থেকে বাঁচার উপায় … যে সকল সৃষ্টি ধ্বংস হয় না 

. কবরের ব্যাপারে সাতটি বিধান 

ভূমিকা 

বারযাখ অর্থ হলো দু’টি বস্তুর মাঝে পার্থক্য বিধানকারী এক সীমারেখা (অন্তরাল)। যেমনটি আল্লাহ কুরআনে বলেছেন, 

لا يبغيان چه الرحمن:20 

وبينهما 

“উভয়ের মাঝখানে রয়েছে অন্তরাল, যা তারা অতিক্রম করে না।” (সূরা আর-রাহমান-২০) অর্থাৎ সুমিষ্ট পানি ও লবণাক্ত পানির মাঝে রয়েছে একটি সীমারেখা, ফলে এতদুভয় মিশ্রিত হয় না। বারযাখ এর জীবন হলো দুনিয়া এবং আখেরাতের মধ্যবর্তী একটি অন্তর্বর্তীকালীন জীবন। কবরস্থ হোক বা না হোক। জ্বালিয়ে দেয়া হোক, পানিতে ডুবিয়ে দেয়া হোক বা জীবজন্তু তাকে খেয়ে ফেলুক. সর্বাবস্থায় তাকে বারযাখে পদার্পণ করতে হবে। মারা যাওয়ার সাথে সাথে মানুষ বারযাখী জীবনে প্রবেশ করে।পুনরুত্থান পর্যন্ত সে সেখানেই অবস্থান করবে। যেমনটি আল্লাহ তালা বলেছেন, 

إذا جاء أحد الموت قال رب ارجعون ( العام 

و 

لم هوابها وين رابهم 

؟ إنها 

صلحا فيما تے برز إلى يوم يبعونه 

المؤمنون: ۹۹ – ۱۰۰ | 

“যখন তাদের কারও কাছে মৃত্যু আসে, তখন সে বলে, হে আমার পালনকর্তা, আমাকে পুনরায় (দুনিয়াতে) প্রেরণ করুন! যাতে আমি সৎকর্ম করতে পারি, যা আমি করিনি। কখনই নয়, এ তো তার একটি কথার কথা মাত্র। তাদের সামনে বারযাখ (পর্দা) রয়েছে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত।” (সূরা মুমিনুন ৯৯-১০০) 

কবর 

কবর হলো মানুষের ঘর এবং কেয়ামত পর্যন্ত তাদের আবাসস্থল। কবরস্থকরণ বিষয়টি প্রথম আদম সন্তান থেকেই প্রচলিত। সকর্মশীলগণ কবর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং দু’চোখে অশ্রু ঝরায়। কারণ, তারা ভালো করেই জানে, চিরদিনের জন্য একদিন তাদেরকে সেখানে চলে যেতে হবে। 

* তবে কবর কী? * সেখানে মানুষের অবস্থা কীরূপ হবে? * কেনইবা নবী করীম সা. আমাদেরকে কবর যিয়ারতের 

আদেশ করেছেন? 

একটি ঘটনা

একদা উমর বিন আব্দুল আযীয রহ. তার পরিবারস্থ একজনের দাফন শেষে উপস্থিত লোকদের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলেন, “হে লোকসকল! কবর আমাকে ডেকে বলছে, হে উমর বিন আব্দুল আযীয, জিজ্ঞেস কর না তোমার বন্ধুদের সাথে আমি কী আচরণ করেছি?! বললাম, কী আচরণ করেছ! বলল, তাদের কাফন ছিড়ে ফেলেছি।দেহ ক্ষতবিক্ষত করেছি।রক্ত চুষে নিয়েছি। মাংস ভক্ষণ করেছি। জিজ্ঞেস করছ না তোমার সুহৃদদের সঙ্গে কীরূপ আচরণ করেছি? বললাম, কীরূপ? বলল, তাদের দুই হাতকে কব্জি থেকে আলাদা করে দিয়েছি। দুই কনুইকে বাহু থেকে পৃথক করে দিয়েছি। দুই বাহুকে স্কন্ধ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছি। নিতম্বকে উরু থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছি। দুই উরুকে হাঁটু থেকে আলাদা করে দিয়েছি।দুই হাটুকে নলা থেকে পৃথক করে ছেড়েছি। দুই নলাকে পা থেকে। বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছি। 

অতঃপর উমর কাঁদতে কাঁদতে বললেন, জেনে রেখো, দুনিয়ার আয়ু খুবই অল্প। এখানকার সম্মানিতরা একদিন অপমানিত হবে। যুবকেরা একদিন বৃদ্ধ হবে। জীবিতরা একদিন মৃত্যুমুখে পতিত হবে। দুনিয়ার মোহে যে প্রতারিত হলো, সেই প্রকৃত প্রতারিত। আধুনিক শহর-বন্দরের রূপকারগণ আজ কোথায়? মাটি তাদের সঙ্গে কী আচরণ করেছে? কীট তাদের হাড়গুলো কী বানিয়েছে? দুনিয়াতে তারা কোমল বিছানায় আরাম করত। দামি গালিচার উপর হাঁটত। শত শত সেবক-সেবিকা রাতদিন ব্যস্ত থাকত তাদের বিনোদন দিতে। তাদের জন্য পানিয় সরবরাহ করতে। তাদের কবরের দিকে আজ তাকিয়ে দেখ! ধনিদের জিজ্ঞেস কর, কোনো সম্পদ কি তারা সেখানে নিয়ে যেতে পেরেছে? দরিদ্রদের জিজ্ঞেস কর, তাদের দারিদ্র্য কি সেখানে অবশিষ্ট আছে? তাদের জিহ্বাকে জিজ্ঞেস কর, যা দিয়ে তারা কথা বলত। চোখকে জিজ্ঞেস কর, যা দিয়ে তারা সৌন্দর্য অবলোকন করত। তাদের নরম চামড়া এবং সুশ্রী চেহারাগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞেস কর। কীট এগুলো কীসে পরিণত করেছে! বিবর্ণ করে ছেড়েছে। মাংস খেয়ে ফেলেছে। হাড়গুলো ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। কোথায় আজ তাদের সেবক-সেবিকা? কোথায় তাদের অঢেল ধনসম্পদ? আল্লাহর শপথ, কবরে তারা গালিচা বিছানোর সুযোগ পায়নি। সোফায় হেলান দেয়ার সাহস পায়নি দিন-রাত কি তাদের জন্য সমান নয়? মৃত্যু তাদের আমলকে বন্ধ করে দিয়েছে। বন্ধু-বান্ধব থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। স্ত্রীরা ভিন্ন স্বামী গ্রহণ করে সংসার করছে। ছেলে-মেয়েরা নতুন জীবন নিয়ে সুখে আছে। উত্তরাধিকার পেয়ে সকলেই পরম শান্তিতে দিনযাপন করছে। 

আর কারো কারো কবরকে প্রশস্ত করে দেয়া হয়েছে। সেখানে। তারা সীমাহীন সুখে জীবনযাপন করছে। অতঃপর আবারো কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন, “হে আগামীর কবরবাসী! কীসে তোমাদের প্রতারিত করে রেখেছে? আজকের সজ্জা, সুগন্ধি এবং সৌন্দর্য কি সেদিন তোমার সঙ্গে থাকবে? হায়, মৃত্যুর ফেরেশতা পালনকর্তার পক্ষ থেকে কী বার্তা নিয়ে তোমার কাছে এসে পৌঁছুবে?! 

অতঃপর ক্রন্দনরত অবস্থায় বাড়ী ফিরে গেলেন। এর ঠিক এক সপ্তাহ পরই তিনি ইন্তেকাল করেছিলেন। (আল্লাহ তাঁকে রহম করুন) 

কবরই তোমার প্রকৃত ঘর, একে সুসজ্জিত কর অথবা অবহেলায় নষ্ট কর! 

কবরে মানুষের অবস্থা 

কবর এমন এক জগত, যেখানে অনেক কিছুই ঘটতে পারে। নবী করীম সা, আমাদেরকে সে সম্পর্কে অবহিত করে সতর্ক করেছেন। আমল অনুযায়ী কবরে মানুষের অবস্থা বিভিন্ন রকম হয়। মৃতের অবস্থা, আত্মার দেহ-বিচ্ছেদ মুহূর্ত, ফেরেশতাদের উপস্থিতি, মুমিনদের জন্য আসমানের দরজাগুলো উন্মোচন এবং কাফেরদের জন্য তা বদ্ধকরণ ইত্যাদি বিষয়গুলো নবী করীম সা, সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন। 

* তাহলে মুমিন ও কাফেরের মধ্যে কী পার্থক্য? * এবং দেহের সাথে আত্মার কী সম্পর্ক? 

মুমিনের অবস্থা 

বারা বিন আযিব রা. বলেন, একদা নবী করীম সা. এর সাথে আমরা এক লোকের জানাজায় উপস্থিত হলাম। নবী করীম সা. কবরের উপরে বসলে আমরা তার চারপাশে বসে গেলাম। শান্তভাবে উপবেশন করলাম, ঠিক যেন আমাদের মাথার উপর পাখি বসে আছে। অন্যদিক মৃতের জন্য কবর খনন চলছিল। নবীজী দুইবার অথবা তিনবার বললেন, কবরের আযাব থেকে তোমরা আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা কর! অতঃপর বললেন, মুমিন ব্যক্তির যখন ইহজগৎ ত্যাগ করে পরকালের দিকে যাত্রার। সময় হয়, তখন আসমান হতে সূর্যের ন্যায় আলোকজ্জ্বল চেহারা-ধারী অতিসুন্দর ফেরেশতাগণ জান্নাতের একটি কাফন ও জান্নাতের একটি চাদর নিয়ে তার কাছে অবতরণ করে তার দৃষ্টিসীমার ভেতরে বসে যায়। অতঃপর মৃত্যুর ফেরেশতা তার মাথার পাশে এসে বসে বলতে থাকে, হে পবিত্র আত্মা, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ক্ষমার সহিত তুমি বেরিয়ে এসো! তখন পানি যেমন পাত্রের মুখ থেকে ধীরে ধীরে বেয়ে পড়তে থাকে, আত্মাও তেমন ধীরে ধীরে বের হয়ে চলে আসে। অতঃপর মৃত্যুর ফেরেশতা রূহকে কবজা করে অবিলম্বে। ঐ কাফনে আবৃত্ত করে নেয়। আর তা থেকে মিশকের চেয়েও অধিক সুঘ্রাণ বের হতে থাকে। 

আসমানের দিকে যাত্রা নবীজী বলতে লাগলেন, অতঃপর তারা রূহকে নিয়ে উধ্বাকাশে গমন করে। পথিমধ্যে যখনই কোনো ফেরেশতা-দল জিজ্ঞেস করে, কে এই পবিত্র আত্মা? উত্তরে বলা হয়, অমুকের পুত্র অমুক (দুনিয়ায় সর্বোত্তম যে নামে। তাকে ডাকা হতো) এভাবে তারা দুনিয়ার আসমানে গিয়ে স্থির হয়। আসমানের দরজা খুলতে বলা হলে তার জন্য দরজা খুলে দেয়া হয়। এভাবে প্রত্যেক আসমানের দরজা তার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। শেষপর্যন্ত সপ্তম আসমানে গিয়ে স্থির হয়। অতঃপর আল্লাহ বলেন, আমার এ বান্দার নামটুকু তোমরা “ইল্লিয়্যীন”-এ লিখে দাও এবং জমিনে তাকে ফেরত পাঠাও। কারণ, জমিন থেকেই তাকে সৃষ্টি করেছি। জমিনেই তাকে ফেরত পাঠাব এবং জমিন থেকেই তাকে পুনরুত্থান করব। অতঃপর তার রূহ দেহে প্রত্যাবর্তন করলে দু’জন ফেরেশতা এসে তাকে বসিয়ে জিজ্ঞেস করেন, তোমার প্রভু কে? সে বলে, আমার প্রভু আল্লাহ! জিজ্ঞেস করে, তোমার ধর্ম কী? উত্তর দেয়, আমার ধর্ম ইসলাম। আবার জিজ্ঞেস করে, তোমাদের কাছে প্রেরিত এই পুরুষটি কে? সে বলে, তিনি আল্লাহর রাসূল? আবার জিজ্ঞেস করে, তোমার জ্ঞান কী? উত্তর দেয়, আমি আল্লাহর কালাম পড়েছি, তাতে বিশ্বাস করেছি এবং সত্যায়ন। করেছি। অতঃপর আসমান থেকে ঘোষকের ঘোষণা ভেসে আসে, “আমার বান্দা সত্যই বলেছে, সুতরাং তার জন্য তোমরা জান্নাতের বিছানা বিছিয়ে দাও! জান্নাতের পোশাক পরিয়ে দাও! জান্নাতের দিকে তার জন্য একটি দরজা করে দাও! অতঃপর জান্নাতের সুবাস ও সুবাতাস তার কাছে আসতে থাকে। কবর তার দৃষ্টিসীমা পরিমাণ প্রশস্ত করে দেয়া হয় এবং তার কাছে সুন্দর সুশ্রী, সুগন্ধিময় ও শ্রেষ্ঠ পোশাকে সজ্জিত একলোক এসে বলে, সর্বোত্তম বিষয়ের সুসংবাদ গ্রহণ কর! এটাই সেই প্রতিশ্রুত দিন। সে জিজ্ঞেস করে, তুমি কে? তোমাকে দেখে শুভ-লক্ষণ বুঝা যাচ্ছে! উত্তরে সে বলে, আমি তোমার সৎকর্ম। অবশ্যই তুমি দুনিয়াতে আল্লাহর আনুগত্যে তৎপর ছিলে। আল্লাহর অবাধ্যতায় নিরুৎসাহী ছিলে। ফলে আল্লাহ তোমাকে এই সম্মান দান করেছেন। অতঃপর সে বলতে থাকে, হে প্রতিপালক, কেয়ামত সংঘটিত করুন, যেন আমি আমার পরিজন ও (জান্নাতের) ধন-ভাণ্ডারের দিকে ফিরে যেতে পারি। হ্যাঁ.. আমিই তোমার সেই সৎকর্ম.. তবে কী সৎকর্ম?এ তো তার নামায, রোযা, তার সততা ও সত্যবাদিতা, তার ভয় ও কান্না, তার হজ্জ্ব ও উমরা, তার কুরআন তেলাওয়াত, পালনকর্তার প্রতি তার অতিশয় শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা, রাত্রিকালে তার বিরামহীন এবাদত, দিনের বেলায় রোযা, পিতা-মাতার প্রতি তার সদাচরণ, জ্ঞানের প্রতি তৃষ্ণা, আল্লাহর পথে জিহাদ এবং সত্যের দিকে মানুষকে দাওয়াত। মুমিন ব্যক্তি সুন্দর এই লোকটিকে সুসংবাদ দিতে দেখবে। চারপাশে তাকিয়ে দেখবে, কবর তার দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত প্রশস্ত হয়ে গেছে। তাতে জান্নাতের বিছানা বিছানো। গায়ে জান্নাতের পোশাক। সে বুঝতে পারবে, জান্নাতে তার জন্য অপেক্ষমাণ নেয়ামতসমূহের তুলনায় এগুলো কিছুই না। ফলে দোয়া করতে থাকবে, হে প্রতিপালক! কেয়ামত ত্বরান্বিত করুন, যেন পরিবার ও চিরসুখের দিকে আমি চলে যেতে পারি। 

কাফের ও পাপিষ্ঠের অবস্থা নবী করীম সা. বলছিলেন, নিশ্চয় কাফের ও পাপিষ্ঠের যখন মৃত্যুর সময় হয়, আখেরাতের দিকে যাত্রার মুহূর্ত এসে যায়, আসমান হতে তখন কালাে কুৎসিত আকৃতিতে মােটা অমসৃণ। পােশাক নিয়ে ফেরেশতাগণ তার কাছে এসে তার দৃষ্টিসীমার । ভেতরে বসে যায়। অতঃপর মৃত্যুর ফেরেশতা এসে মাথার পাশে বসে বলে, হে পাপিষ্ঠ আত্মা, আল্লাহর ক্রোধ ও গোস্বা নিয়ে তুই বেরিয়ে আয়! অতঃপর আত্মা শরীরে ছুটাছুটি করতে থাকে। অতঃপর ফেরেশতা তার শরীর থেকে এমনভাবে তাকে টেনে বের করে, যেমন গরম শিক থেকে সিদ্ধ মাংস টেনে বিক্ষিপ্তভাবে আলাদা। করা হয়। আসমান জমিনের সকল ফেরেশতা তাকে অভিশাপ দিতে থাকে। আত্মা বহিষ্কারের পর অবিলম্বে তাকে সেই মোটা অমসৃণ পোশাকের ভিতরে রেখে দেয়া হয়। আর তা থেকে পচা-গলা বস্তুর চেয়ে নিকৃষ্ট দুর্গন্ধ বের হতে থাকে। তাকে নিয়ে। ফেরেশতারা উপরে উঠতে থাকে। কোনো ফেরেশতার পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে জিজ্ঞেস করে, কে এই পাপিষ্ঠ আত্মা? উত্তরে তারা বলে, অমুকের ছেলে অমুক (দুনিয়াতে যে নিকৃষ্ট নাম দিয়ে তাকে ডাকা হতো) শেষপর্যন্ত তাকে দুনিয়ার আসমান পর্যন্ত নিয়ে আসমানের দরজা খুলতে বলা হয়, কিন্তু পাপিষ্ঠ এই আত্মার জন্য দরজা খোলা হয় না। অতঃপর নবীজী আয়াত পাঠ করলেন, “তাদের জন্য আসমানের দ্বারগুলো উন্মুক্ত করা হবে। 

না। যে পর্যন্ত না সূচের ছিদ্র দিয়ে উট প্রবেশ করে।” (সূরা আ’রাফ-৪০) অতঃপর আল্লাহ বলেন, তার নামটা জমিনের সর্বনিম্ন “সিজ্জীন”-এ লিখে দাও! অতঃপর তার রূহকে নিক্ষেপ করা হয়। নবীজী আয়াত পাঠ করলেন, “যে কেউ আল্লাহর সাথে শরীক করল; সে যেন আসমান থেকে ছিটকে পড়ল, অতঃপর মৃতভোজী পাখী তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল অথবা বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে কোনো দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করল।” (সূরা হজ্ব-৩১) অতঃপর আত্মা দেহে প্রত্যাবর্তন করলে দু’জন ফেরেশতা এসে। তাকে বসিয়ে জিজ্ঞেস করে, তোমার প্রভু কে? সে বলে, হায় হায়.. আমি তো জানি না। জিজ্ঞেস করে, তোমার ধর্ম কী? সে বলে, হায় হায়.. আমি তো জানি না। আবার জিজ্ঞেস করে, তোমাদের কাছে প্রেরিত এই ব্যক্তিটি কে? সে বলে, হায় হায়.. আমি তো জানি না। তারা বলতে থাকে, তুমি কিছুই জাননি! কিছুই পড়নি! 

অতঃপর আসমান হতে ঘোষকের ঘোষণা ভেসে আসে, “সে মিথ্যা বলেছে, সুতরাং তার জন্য জাহান্নামের বিছানা বিছিয়ে দাও! জাহান্নামের দিকে তার জন্য দরজা করে দাও! ফলে জাহান্নামের উত্তাপ এবং অগ্নিশিখা তার কবরে আসতে থাকে। কবরকে তার জন্য অতি-সংকীর্ণ করে দেয়া হয়, ফলে তার দেহের মাংসপিণ্ডগুলো বিক্ষত হয়ে যায়। অতঃপর দুর্গন্ধযুক্ত, 

বিশ্রী ও ভয়ানক চেহারাবিশিষ্ট একলোক অমসৃণ পোশাকে তার কাছে এসে বলতে থাকে, এটাই তোমার সেই প্রতিশ্রুত দিন। আল্লাহর আনুগত্যে তুমি অবহেলা করতে। আল্লাহর অবাধ্যতায় তুমি তৎপর ছিলে। ফলে তোমার আজ এই পরিণতি। সে বলবে, তুমি কে? তোমাকে দেখে অশুভ লক্ষণ বুঝা যাচ্ছে। সে বলবে, আমিই তোমার সেই অপকর্ম.. হ্যাঁ.. সে বলবে, আমিই তোমার সেই অপকর্ম! তবে কী সেই অপকর্ম..? এতো আল্লাহর সঙ্গে তার অংশীদার সাব্যস্ত-করণ, আল্লাহকে ছেড়ে অন্যদের নামে শপথ, কবর-পূজা, মদ্যপান, ব্যভিচার, সুদি লেনদেন, গানবাদ্য শ্রবণ, উপদেশ-কারীদের অবমূল্যায়ন এবং সৃষ্টিকর্তার উপর দুঃসাহস প্রদর্শন। সেদিনের শত অনুতাপ তার কোনো কাজে আসবে না। পরিতাপ কেবল বাড়তেই থাকবে। সেদিনের হাজারো অশ্রু ফোটা বিন্দুমাত্র উপকারে আসবে না। কোথায় ছিল তোমার এত মায়াকান্না, যখন তুমি নিষিদ্ধ বস্তুর দিকে তাকিয়ে থাকতে! অশ্লীলতা এবং কু-প্রবৃত্তির অনুসরণ করতে! যৌনাঙ্গ, দৃষ্টি, কর্ণ ইত্যাদি সংরক্ষণের জন্য কত উপদেশ তোমার কাছে এসেছিল। আজ তুমি কাঁদো বা হাসো; শাস্তি হতে রক্ষা পাওয়ার কোনো উপায় নেই। আল্লাহ বলেন, 

وأضلوها أضوا أو لا تصبروا سوا لي إنما ترون ماگم عمون يه الطور: ۱۶ 

“এতে প্রবেশ কর অতঃপর তোমরা সবর কর অথবা না কর, উভয়ই তোমাদের জন্য সমান। তোমরা যা করতে তোমাদেরকে কেবল তারই প্রতিফল দেয়া হবে।” (সূরা তুর-১৬) তখনই সে বুঝতে পারবে, কবর-পরবর্তী জীবন অধিক ভয়াবহ। 

অধিক স্থায়ী। নবীজী বলেন, অতঃপর সে বলবে, হে পালনকর্তা! আপনি কেয়ামত ঘটাবেন না। অতঃপর তার শাস্তির জন্য এক অন্ধ, বোবা ও বধির ফেরেশতা নিয়োগ করেন, যার হাতে একটি বিশাল হাতুড়ি, তা দিয়ে যদি সে পর্বকে আঘাত করে, তবে নিমিষেই পর্বত মাটির সাথে মিশে যাবে। হাতুড়ি দিয়ে সে তাকে একটি আঘাত করে, আঘাতের ফলে সে মাটির সাথে মিশে যায়। অতঃপর তাকে পুনরায় জীবিত করে পূর্বের মতো করে দেয়া হয়। আবারো ফেরেশতা তাকে আঘাত করে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। তার চিৎকার মানুষ ও জ্বিন ছাড়া সকলেই শুনতে পায়। (মুসনাদে আহমদ-১৮৫৩৪)। এই হলো কবরে মানুষের অবস্থা। মুসলিমরা যদি জানত, তবে অবশ্যই তার জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি নিত। কবরকে জান্নাতের বাগিচা বানাতে প্রাণপণ চেষ্টা করত। অধিক পরিমাণে সকর্ম করত। 

হে আল্লাহ! আমাদের কবরগুলো জান্নাতের বাগিচা বানিয়ে দিন! জাহান্নামের গহ্বর থেকে আমাদের বাঁচান। 

আত্মা এবং দেহ 

কবরে সুখ বা শাস্তি অবশ্যম্ভাবী। এতে বিন্দু পরিমাণ সন্দেহের অবকাশ নেই। সকল সৃষ্টির উপরই তা প্রতিফলিত হবে। দাফন হোক বা না হোক। 

* কবরে সুখ বা শাস্তি আত্মায় প্রতিফলিত হবে নাকি দেহে? * আত্মার অবস্থান কোথায়? * মুমিনদের আত্মার পরিণাম-স্থল কোথায় এবং কাফেরদের আত্মার পরিণাম-স্থল কোথায়? 

ভূমিকা আল্লাহ ব্যতীত কেউ আত্মিক তত্ত্ব সম্পর্কে অবগত নয়। যেমনটি আল্লাহ বলেন, 

و ويونك عن الروح قل الروح من أمر ربي وما أوتيوين العلم إلا 

که الإسراء: ۸۰ 

قليلا 

“তারা আপনাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দিন রূহ আমার পালনকর্তার আদেশ ঘটিত। এ বিষয়ে তোমাদেরকে সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে।” (সূরা ইসরা-৮৫) 

কবরে সুখ বা শাস্তি মূলত আত্মার উপর প্রতিফলিত হবে। দাফনের পর তা দেহের সাথে থাকুক বা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন। হোক। যেমন, কাউকে যদি পুড়িয়ে ফেলা হয় বা তার লাশ | কেটে টুকরো টুকরো করে দেয়া হয়। সুখ বা শাস্তি আস্বাদনের 

জন্য আত্মা দেহের মুখাপেক্ষী নয়। কেবল আত্মাই শাস্তি এবং সুখ অনুভব করতে পারে। 

আত্মার অবস্থান কোথায়? _ উত্তরঃ মৃত্যুর পর তার অবস্থান বিভিন্ন স্থানে হতে পারে। জান্নাতে, জাহান্নামে, ভূপৃষ্ঠে বা অন্য কোনো স্থানে। 

নবীদের রূহ বারযাখী জীবনে নবীদের রূহগুলো “ইল্লিয়্যীন”-এর সর্বোন্নত স্তরে অবস্থান করে। যেমনটি নবী করীম সা. মে’রাজের রাত্রিতে দেখেছিলেন। আদম আ. কে প্রথম আসমানে, ইয়াহিয়া এবং ঈসা আ. কে দ্বিতীয় আসমানে, ইউসুফ আ. কে তৃতীয় আসমানে, ইদ্রিস আ. কে চতুর্থ আসমানে, হারুন আ, কে পঞ্চম। আসমানে, মুছা আ. কে ষষ্ঠ আসমানে এবং ইবরাহীম আ. কে সপ্তম আসমানে দেখেছিলেন। 

শহীদদের রূহ বারযাখী জীবনে শহীদদের রূহগুলো সবুজ পাখীদের দেহে অবস্থান করে। যেথা ইচ্ছা, ঘুরে বেড়ায়। 

নবী করীম সা. কে “আর যারা আল্লাহর রাহে নিহত হয়, তাদেরকে তুমি কখনো মৃত মনে করো না। বরং তারা নিজেদের পালনকর্তার নিকট জীবিত ও জীবিকা-প্রাপ্ত।” (সূরা আলে ইমরান-১৬৯) এই আয়াত 

সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন, “তাদের রূহগুলো আল্লাহর আরশের সাথে সম্পৃক্ত প্রদীপসমূহের। আশপাশে অবস্থান করে। জান্নাতের যেখানেই মনে চায় ঘুরে বেড়িয়ে অবশেষে ঐ প্রদীপের নিকট ফিরে আসে। তাদের। প্রতিপালক তাদের প্রতি মনযোগী হয়ে বলেন, তোমাদের কী চাওয়া বল! তারা বলে, সবসময় আমরা জান্নাতে ঘোরাফেরা করি, যেখানেই মনে চায় যেতে পারি; এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে! এভাবে তিনবার জিজ্ঞেস করেন। কোনো উপায় না দেখে বলতে থাকে, হে প্রতিপালক, আমাদের আত্মাগুলো আমাদের দেহে প্রবেশ করিয়ে দিন, আবার আমরা দুনিয়াতে ফিরে গিয়ে আপনার পথে যুদ্ধ করে দ্বিতীয়বার শহীদ হয়ে আসি! অতঃপর পালনকর্তা কোনো চাওয়া নেই দেখে তাদের ছেড়ে দেন।” (মুসলিম-৪৯৯৩)। 

শহীদদের অবস্থার বিস্তারিত বিবরণ বারযাখী জীবনে নবীজীর চাচাতো ভাই জাফর বিন আবি তালিব রা. দু’ডানা দিয়ে ফেরেশতাদের সঙ্গে জান্নাতে উড়ে বেড়ান। জাফর রা. হচ্ছেন আলী রা. এর আপন ভাই। তিনি এবং তার স্ত্রী আসমা রা. কৈশোরেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তার বয়স ছিল তখন ২১ বৎসর। ইসলাম গ্রহণের পর মক্কায় তাদেরকে চরম নিপীড়নের সম্মুখীন হতে হয়। নবী করীম সা. তাদেরকে 

হাবাশায় (ইথিওপিয়া) হিজরতের অনুমতি দিলে তিনি হিজরত করে সেখানে চলে যান। মক্কার উচ্চবংশীয় হওয়া সত্ত্বেও জন্মভূমি ছেড়ে তাকে পরদেশ হাবাশায় চলে যেতে হয়। যেখানে কেউ তাকে চেনে না, জানে না, তাদের ভাষা বুঝে না। তিন বৎসর সেখানে তিনি অবস্থান করেন। অতঃপর কুরাইশের সকল লোক ইসলাম গ্রহণ করেছে শুনে তিনি ও তার স্ত্রী মক্কায় ফিরে আসেন। কিন্তু নবী করীম সা, তাদেরকে আবারো হাবাশায় হিজরত করতে বললে দ্বিতীয়বার তারা হাবাশায় হিজরত করে সেখানে সাত বৎসর অবস্থান করেন। পরবর্তীতে খায়বার বিজয়ের সময় নবী করীম সা, হাবাশায়। হিজরতকারী মুসলমানদেরকে মদিনায় নিয়ে আসার জন্য কিছু মুসলমানকে পাঠান। তারা মদিনায় আসলে নবী করীম সা. তাদের দেখে যারপরনাই খুশি হন। উল্লেখ আছে, জাফর রা. কে দেখে তিনি তার দুই চোখে চুমু খেয়ে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলেছিলেন, 

 বুঝতে পারছি না কোনটি আজ বেশী আনন্দের; খায়বার বিজয় নাকি জাফরের প্রত্যাবর্তন! (মুস্তাদরাকে হাকিম-৪২৪৯) জাফর রা, দৈহিকভাবে অনেকটাই নবীজীর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিলেন। এমনকি নবী করীম সা. জাফরকে দেখে বলতেন, 

অবয়ব ও চরিত্র দু’টোতেই তুমি আমার সাদৃশ্য পেয়েছ! (মুসনাদে আহমদ-৮৫৭) 

মুতা প্রান্তরের দিকে যাত্রা

 বেশীদিন হয়নি জাফর রা. মদিনায় এসেছেন, হঠাৎ সংবাদ এলো রোমক বাহিনী মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে মুতা প্রান্তরে একত্র হয়েছে। সংবাদ পেয়ে নবীজী মুসলিমদের সমন্বয়ে সেনাবাহিনী গঠন করলেন। কমান্ডার নিযুক্ত করলেন যাইদ বিন হারিসাকে। বলে দিলেন, যাইদ নিহত হলে জাফর সেনাপতি। জাফর নিহত হলে আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা। | তিন হাজার যোদ্ধার সমন্বয়ে মুসলিম-বাহিনী গঠন করে নবী 

করীম সা, তাদেরকে মুতা প্রান্তরের দিকে প্রেরণ করলেন। মুসলিমগণ মুতা প্রান্তরে পৌঁছে দেখেন চার লক্ষ যোদ্ধার সমন্বয়ে গঠিত রোমক বাহিনী সেখানে উপস্থিত। যুদ্ধ শুরু হলো। যাইদ রা. ঝাণ্ডা হাতে নিলেন। অল্প সময় যুদ্ধ করার পর তিনি শহীদ হয়ে গেলেন। অতঃপর জাফর রা, ঝাণ্ডা ধারণ করে যুদ্ধ করতে লাগলেন। লড়াই যখন চরম আকার 

ধারণ করল, ঘোড়া থেকে লাফ দিয়ে তিনি নেমে বলতে লাগলেন, 

 “হায়, জান্নাত কতই না সন্নিকটে। কত সুঘ্রাণময়। তার পানিয় কতই না শীতল। নিম্ন-বংশীয় কাফের রোমকদের শাস্তি আজ ত্বরান্বিত। যাকেই সামনে পাব নিস্তেজ করে ছাড়ব।” ডান হাতে ঝাণ্ডা ধারণ করে তিনি যুদ্ধ করছিলেন। এক শত্রুসেনা তার ডান হাতে আঘাত করলে ডান হাত কেটে পড়ে গেল। বাম হাতে। ঝাণ্ডা ধারণ করলেন। বাম হাতে আঘাত করা হলে বাম হাতও কেটে গেল। অতঃপর কর্তিত উভয় বাহু দিয়ে বুকের সাথে ঝাণ্ডা ধারণ করে রাখলেন। শেষপর্যন্ত তিনি শহীদ হয়ে গেলেন। শাহাদাতকালে তার বয়স ছিল ত্রিশ বৎসর। 

আব্দুল্লাহ বিন উমর রা. বলেন, “আমি জাফর রা, এর লাশ দেখলাম। তার দেহে নব্বইটিরও বেশী আঘাত ছিল।” 

অতঃপর আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা ঝাণ্ডা হাতে নিলেন। তিনিও আক্রান্ত হয়ে শহীদ হয়ে গেলেন। সর্বশেষ খালিদ বিন ওয়ালিদ রা, ঝাণ্ডা ধারণ করলেন। শেষপর্যন্ত বিশাল রোমক বাহিনী পরাজিত হয়ে রণাঙ্গন ছেড়ে পালাতে বাধ্য হলো। 

মদিনায় শহীদদের সংবাদ এটা ছিল মুতা প্রান্তরের পরিস্থিতি। ওদিকে মদিনার অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে আনাছ রা. বলেন, নবী করীম সা. ঘর থেকে বের হয়ে মিম্বরে উঠে বললেন, আমি | কি তোমাদেরকে মুতা’য় মুসলিম বাহিনীর সংবাদ বলব? আমরা 

বললাম, অবশ্যই হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বলতে লাগলেন, এইমাত্র যাইদ ঝাণ্ডা হাতে নিলো, সে আক্রান্ত হয়ে শহীদ হয়ে গেল। তোমরা তার জন্য ক্ষমা ও দয়া প্রার্থনা কর! সবাই বলল, হে আল্লাহ! তাকে ক্ষমা ও দয়া করুন! বললেন, অতঃপর জাফর ঝাণ্ডা ধারণ করল, সেও আক্রান্ত হয়ে শহীদ হয়ে গেল। তোমরা তার জন্য ক্ষমা ও দয়া প্রার্থনা কর! সবাই বলল, হে আল্লাহ, তাকে ক্ষমা ও দয়া করুন! বললেন, অতঃপর আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা ঝাণ্ডা ধারণ করল, সেও আক্রান্ত হয়ে শহীদ হয়ে গেল। তোমরা তার জন্য ক্ষমা ও দয়া প্রার্থনা কর! সবাই বলল, হে আল্লাহ, তাকে ক্ষমা ও দয়া করুন! নবীজীর চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছিল। সিক্ত নয়নে মিম্বর থেকে নেমে জাফরের বাড়ির দিকে রওয়ানা হলেন। জাফর রা, এর স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইছ রা. বলেন, আমি বাচ্চাদেরকে গোসল করিয়ে তাদের গায়ে তেল মাখছিলাম। খামিরা তৈরি করে জাফরের অপেক্ষায় ছিলাম। এমন সময় নবীজী আমাদের ঘরে ঢুকে বললেন, আমার ভ্রাতুস্পুত্রদের ডেকে নিয়ে এসো। তিনি বলেন, আমি তাদের নিয়ে এলাম। নবীজীকে দেখে তারা ছুটাছুটি করে কাছে চলে এলো। বাচ্চারা তাকে। পিতা ভেবে চুমু খেতে লাগল। নবীজী তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে কাঁদছিলেন। আসমা রা. জিজ্ঞেস করলেন, জাফর সম্পর্কে কোনো সংবাদ পৌঁছেছে হে আল্লাহর রাসূল? তিনি নীরব রইলেন। দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করলে নবীজী বললেন, জাফর শহীদ হয়েছে! আসমা 

রা. বলতে লাগলেন- হায়, সে বাচ্চাদেরকে এতিম বানিয়ে চলে গেল! সে বাচ্চাদের এতিম বানিয়ে চলে গেল! নবীজী বললেন, তুমি কি পরিবারে অভাবের আশংকা করছ? আমিই দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের অভিভাবক। অতঃপর নবীজী এ কথা বলতে বলতে ঘর থেকে বেরুচ্ছিলেন, “জাফরের মতো লোকের শাহাদাতে রোদনকারীরা রোদন করুক!” অতঃপর নবীজী ঘরে এসে স্ত্রীদের বললেন, জাফরের পরিবারের জন্য খাবার তৈরি কর। তারা বিপদের সম্মুখীন। হ্যাঁ.. জাফর শহীদ হয়ে গেলেন। সম্পদ ও পরিবার রেখে চলে গেলেন। কিন্তু বিনিময়ে বিশাল জান্নাত ও চিরস্থায়ী সুখ জয়। করে নিলেন। নবী করীম সা. বলেন,

 “আমি জাফরকে জান্নাতে দেখেছি, রক্তে রঞ্জিত দু’টি ডানা। বিশিষ্ট। দু’ডানায় ভর করে ফেরেশতাদের সঙ্গে সে উড়ে বেড়াচ্ছে।” (মুস্তাদরাকে হাকিম-৪৩৪৮) ঠিক তেমনি হামযা রা.ও.. নবী করীম সা. স্বীয় চাচা হামযা রা. কে তার বারযাখী জীবনে। সিংহাসনে হেলান দিয়ে বসে থাকতে দেখেছেন। তিনি বলেন, 

“গতরাতে আমি জান্নাতে প্রবেশ করে দেখি, জাফর ফেরেশতাদের সঙ্গে উড়ে বেড়াচ্ছে আর হামযা সিংহাসনে হেলান দিয়ে বসা।” (মুস্তাদরাকে হাকিম) 

বারযাখী জীবনে আরো কতিপয় শহীদ রূহ। যারা জান্নাতের প্রবেশমুখে সবুজ গম্বুজের পাশে অবস্থান করে। নবী করীম সা. বলেন, 

 “শহীদগণ জান্নাতের প্রবেশদ্বারে একটি উজ্জ্বল নদীর তীরে। সবুজ গম্বুজের পাশে অবস্থান করে। সকাল-সন্ধ্যা তাদের কাছে জান্নাতের রিজিক এসে থাকে।” (মুসনাদে আহমদ-২৩৯০) 

শহীদ ব্যতীত অন্য মুমিনদের রূহ। যেমনটি নবী করীম সা. বলেছেন,“নিশ্চয় মুমিনের রূহ ঘুরে ফিরে জান্নাতের বৃক্ষ থেকে ফলমূল আহরণ করে। কেয়ামত পর্যন্ত এভাবেই সে নেয়ামত ভোগ করতে থাকবে।” (নাসাঈ-১৫৮১৫) 

জান্নাতে মুমিনদের রূহগুলো কি পরস্পর সাক্ষাৎ 

করতে পারে? হ্যাঁ.. বারযাখী জীবনে মুমিনদের রূহ পরস্পর সাক্ষাৎ করতে পারে। একে অন্যের সাথে কথা বলতে পারে। 

* * নবী করীম সা. বলেন, “মুমিন বান্দার মৃত্যুর সময় দয়াময় আল্লাহর পক্ষ থেকে ফেরেশতাগণ কোমল সাদা রেশমি চাদর নিয়ে উপস্থিত হয়ে বলে, আল্লাহর সন্তুষ্টি নিয়ে এবং সন্তোষভাজন হয়ে প্রতিপালকের অনুগ্রহ ও তাঁর রহমতের দিকে বের হয়ে আস! অতঃপর রূহ মিশক এর চেয়ে অধিক সুগন্ধিময় হয়ে দেহ থেকে বেরিয়ে এসে অন্য মুমিনদের সাথে সাক্ষাত করে। ফেরেশতাগণ তাকে আকাশের দিকে নিয়ে গেলে আসমানের প্রহরীগণ বলে, দুনিয়া থেকে আসা এত উত্তম সুগন্ধিময় কে সে? অতঃপর তার কাছে অন্য মুমিনদের রূহগুলোও এসে থাকে। তাকে পেয়ে তারা যারপরনাই খুশি হয়। যেমন তোমাদের কেহ দীর্ঘ ভ্রমণ থেকে ফিরে এলে পরিবার-পরিজন ও বন্ধু-বান্ধব খুশি হয়। তারা জিজ্ঞেস করে, অমুকের পুত্র অমুকের কী অবস্থা? অমুক কী করেছে? তারা বলে, তাকে বিশ্রাম করতে দাও। সদ্যই সে জাগতিক দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে এসেছে। সে জিজ্ঞেস করে, অমুক কি তোমাদের কাছে আসেনি? তারা উত্তর দেয়, তাকে জাহান্নামে। নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পক্ষান্তরে কাফেরের মৃত্যুর সময় আযাবের ফেরেশতাগণ অমসৃণ মোটা পোশাকে তার কাছে এসে বলে, ক্রোধান্বিত ও গোস্বাভাজন হয়ে আল্লাহর আযাবের দিকে বেরিয়ে। আয়! অতঃপর রূহ অতি দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে বেরিয়ে আসে। তাকে নিয়ে ফেরেশতাগণ উপরের দিকে যাত্রা করে। আকাশের ফেরেশতাগণ তাকে দেখে বলতে থাকে, কী দুর্গন্ধযুক্ত আত্মা! শেষপর্যন্ত তাকে কাফেরদের রূহগুলোর কাছে নিয়ে যাওয়া হয়” (সুনানে নাসাঈ-১৯৫৯) 

| একে অপরের সাক্ষাতপ্রাপ্ত হন..! 

শহীদগণ শহীদদের সম্পর্কে আল্লাহ তা’লা বলেন, 

“যারা আল্লাহর রাহে নিহত হয়, কখনো তাদেরকে আপনি মৃত মনে করবেন না। বরং তারা নিজেদের পালনকর্তার নিকট জীবিত ও জীবিকা-প্রাপ্ত। আল্লাহ নিজের অনুগ্রহ থেকে যা দান করেছেন তার প্রেক্ষিতে তারা আনন্দ উদ্যাপন করছে। আর যারা এখনও তাদের কাছে এসে পৌঁছেনি তাদের পেছনে তাদের জন্যে আনন্দ প্রকাশ করে। কারণ, তাদের কোনো ভয়-ভীতিও নেই এবং কোনো দুশ্চিন্তাও নেই। আল্লাহর নেয়ামত ও অনুগ্রহের জন্যে তারা আনন্দ প্রকাশ করে এবং তা এভাবে যে, আল্লাহ ঈমানদারদের শ্রমফল বিনষ্ট করেন না।” (সুরা আলে ইমরান ১৬৯-১৭১)। 

এই আয়াতগুলোতে শহীদদের মর্যাদা ও আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের প্রতি পরম অনুগ্রহের বিবরণ এসেছে। পাশাপাশি এতে শহীদদের জীবিত আত্মীয়-স্বজনকে সান্ত্বনা প্রদানের পাশাপাশি তাদের প্রতি ধৈর্যের উপদেশ বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহর রাস্তায় সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে এবং নিজেকে শাহাদাতের পথে। নিবেদিত করতে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। 

ولا تحسبن الذين يروا في سبيل اير بنوتاه 

“আল্লাহর রাহে নিহতদেরকে তুমি মৃত মনে করো না” 

এখানে ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কালিমা, তাঁর প্রদত্ত সমুদয় বিধান এবং তাঁর প্রণীত শাসনব্যবস্থাকে সকল অপশাসনের উপর বিজয়ী করার উদ্দেশ্যে সশস্ত্র সংগ্রামে নিহত ব্যক্তিগণ উদ্দেশ্য। এটা ভাববেন না যে, তারা নিহত হয়ে হারিয়ে গেছে। দুনিয়ার ভোগবিলাস থেকে বঞ্চিত থেকে গেছে; বরং তারা অতি উত্তম স্থানে সর্বোন্নত জীবিকা-প্রাপ্ত হয়ে দিনযাপন করছে। আল্লাহর পক্ষ থেকে মহা-নেয়ামত পেয়ে তারা যারপরনাই আনন্দিত। দুনিয়াতে যুদ্ধরত সাথীদের সম্পর্কে তারা একে অপরকে সুসংবাদ দেয় যে, অচিরেই তারাও আমাদের সাথে এসে মিলিত হবে। কোনো ভয় ও দুশ্চিন্তা তাদের গ্রাস করতে পারে না। দুনিয়াতে রেখে আসা ধন-সম্পদ ও পরিবার-পরিজন নিয়ে তাদের দুঃখবোধ হয় না। আল্লাহ তা’লা আমাদেরকে এ মহাসৌভাগ্য অর্জনের তাওফিক দিন। শহীদী মরণ নসীব করুন। নবী ও শহীদগণের সাথে হাশর করুন.. আমীন..!! 

কবরে সুখ বা শাস্তি রূহের উপর হবে.. কখনো কখনো তা দেহের সঙ্গে মিলিত অবস্থায়..! 

কবরে সুখ বা শাস্তির ব্যাপারে প্রমাণ। 

কবর হলো পরকাল-যাত্রার প্রথম ঘাটি। সকর্মশীলদের জন্য তা স্বস্তি ও আনন্দের ঘর। অসৎকর্মীদের জন্য অন্ধকার ও ভয়াবহ শাস্তির গহ্বর। নবী করীম সা. বলেন, 

 “কবর হলো আখেরাত যাত্রার প্রথম ঘাটি। কবরে যে পার পেয়ে যাবে, পরবর্তী ঘাটিগুলো তার জন্য সহজ হয়ে যাবে। কবরে যে গ্রেফতার হবে, পরবর্তী ঘাটিগুলো তার জন্য কঠিন হয়ে যাবে।” (তিরমিযী-২৩০৮) 

* কবরে সুখ বা শাস্তির ব্যাপারে কী প্রমাণ? * কবরে প্রশ্ন কখন শুরু হয়? * তারা কি জীবিতদের যিয়ারত বুঝতে পারে? 

ভূমিকা কবরে সুখ বা শাস্তিতে বিশ্বাস করা অদৃশ্য বিষয়াবলীর উপর ঈমানের অন্তর্ভূক্ত। পরকালের প্রতি ঈমান আনয়নের জন্য তা 

একটি মৌলিক বিষয়। কবরে ঘটিত সুখ বা শাস্তি সম্পর্কে কুরআন-হাদিসে অসংখ্য দলীল বর্ণিত হয়েছে। 

কবরে সুখ বা শাস্তির ব্যাপারে প্রমাণ ফেরাউনের পরিবার সম্পর্কে আল্লাহ কুরআনে বলেন, 

والنار يعرضون لهادا وعشيا و توم آلساعه أدخلوا الفرعون أشد العذابي که غافر: 40 

“সকালে ও সন্ধ্যায় তাদেরকে আগুনের সামনে। পেশ করা হয় এবং যেদিন কেয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন আদেশ করা হবে, ফেরাউন গোত্রকে কঠিনতর আযাবে দাখিল কর।” (সূরা গাফির-৪৬) কবরে থাকাবস্থায়ই সকাল-সন্ধ্যা তাদের সামনে জাহান্নাম উপস্থাপন করা হয়। আর বিচার-দিবসে তাদেরকে স্থায়ীভাবে জাহান্নামের শাস্তিতে প্রবিষ্ট করানো হবে। আল্লাহ বলেন, 

التوبة: ۱۰۱ 

س هم مرتين يوت إلى عذاب عظيره 

“আমি তাদেরকে আযাব প্রদান করব দুইবার, তারপর তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হবে মহান আযাবের দিকে।” (সূরা তাওবা-১০১) দুনিয়াতে কাফের ও মুনাফিকদেরকে প্রথম আযাব দেয়া হয় দুশ্চিন্তা ও দুরবস্থার মাধ্যমে। দ্বিতীয় শাস্তি দেয়া হয় কবরে।আর বিচার-দিবসে তাদেরকে জাহান্নামের কঠিন শাস্তিতে নিক্ষেপ করা হবে। নবী করীম সা. বলেন, 

 “.. বান্দাকে যখন কবরস্থ করা হয় এবং সাথীরা তাকে কবরস্থ করে চলে যেতে থাকে, তখন সে তাদের জুতার আওয়াজ শুনতে পায়।” (বুখারী-১২৭৩)। পূর্বোক্ত হাদিসে কবরে কাফের বা মুনাফিককে “তোমাদের কাছে। প্রেরিত এ পুরুষটি কে?” (অর্থাৎ মোহাম্মাদ সা. সম্পর্কে) জিজ্ঞেস করা হলে সে উত্তরে বলে- হায়, মানুষ যা বলত, আমিও তাই বলতাম। অতঃপর বলা হবে, তুমি কিছুই জানোনি। কিছুই পড়োনি। বিশাল হাতুড়ি দিয়ে তাকে আঘাত করা হয়। তার চিৎকার জ্বিন-ইনসান ছাড়া সকলই শুনতে পায়।” (বুখারী ১২৭৩) নবী করীম সা. বলেন, 

“তোমরা ভয়ে দাফন ছেড়ে দেবে- আশংকা না করলে আমি যেমন শুনি তোমাদেরকেও তেমন মৃতের আযাব শুনানোর জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতাম।” (মুসলিম-২৮৬৭) নবী করীম সা. প্রায়ই দোয়া করতেন, 

 “আমি আপনার কাছে কবরের আযাব থেকে আশ্রয় চাচ্ছি।” (বুখারী-২৮২৩)। নবীজী বলেন, 

 “কবরের শাস্তি সত্য” (বুখারী-১৩৭৩) 

কবরের সুখ-শান্তি কাদের জন্য? কেবল সকর্মশীল মুমিনদের জন্য। আল্লাহ বলেন, 

و الايئ تتوه الكيكه طيبين 

لگو آتو اتة بما 

يقولون 

کنتقمون منها النحل: ۳۴ 

“ফেরেশতা যাদের জান কবজ করেন তাদের পবিত্র থাকা অবস্থায়। ফেরেশতাগণ বলেন, তোমাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। তোমরা যা করতে, তার প্রতিদানে জান্নাতে প্রবেশ কর।” (নাহল-৩২) হাদিসে এসেছে, “দু’জন ফেরেশতা তাকে জিজ্ঞেস করে, এই লোকটি সম্পর্কে তুমি কী বল? (অর্থাৎ মোহাম্মাদ সা, সম্পর্কে!) মুমিন উত্তরে বলে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। অতঃপর ঘোষণা হয়, “জাহান্নামে তোমার জায়গার দিকে লক্ষ্য কর, যার পরিবর্তে জান্নাতে আল্লাহ তোমার স্থান নির্দিষ্ট করেছেন।” (বুখারী-১৩৭৪) নবীজী সংবাদ দিয়েছেন যে, মুমিনগণ সকল প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে সক্ষম হবে। অতঃপর আসমান হতে ঘোষকের ঘোষণা ভেসে আসবে, 

“আমার বান্দা সত্য বলেছে। সুতরাং তার জন্য জান্নাতের বিছানা বিছিয়ে দাও! তার জন্য জান্নাতের দিকে একটি দরজা করে। দাও! তাকে জান্নাতের পোশাক পরিয়ে দাও! অতঃপর তার কাছে জান্নাতের সুবাস ও সুবাতাস আসতে থাকে। কবরকে তার দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত প্রশস্ত করে দেয়া হয়।” (আবু দাউদ) 

কবরের শাস্তি কাদের উপর? আল্লাহর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কবরের 

শাস্তি সীমালঙ্ঘনকারীদের উপর আপতিত হবে। মূলত তা কাফেরদের জন্য নির্ধারিত। তবে গুনাহের কারণে কতিপয় মুমিনের উপরেও আসবে। ইবনে আব্বাস রা. বলেন, 

 “একদা নবী করীম সা. দু’টি কবরের পাশ দিয়ে গমনকালে বলছিলেন, এ দু’জনকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে; তবে বড় কোনো 

অপরাধের কারণে নয়- হ্যাঁ.. একজন পরনিন্দা করে বেড়াতো, অপরজন প্রস্রাবের ছিটা থেকে বেঁচে থাকত না। অতঃপর তিনি গাছের একটি সিক্ত ঢাল দু’টুকরো করে দুই কবরের উপর গেঁথে দিয়ে বললেন, হয়তো এদু’টো শুষ্ক হওয়া পর্যন্ত তাদের। শাস্তি শিথিল করা হবে।” (বুখারী-৬০৫৫)। 

কবরের উপর খেজুরের ঢাল স্থাপনে কোনো উপকার হয় কি? 

উত্তরঃ না..! নবীজীর কাজ কেবল তাঁর জন্যই নির্দিষ্ট। যেমনটি নবীজী বলেছিলেন, 

 “সুপারিশের মাধ্যমে আমি তাদেরকে ক্ষণিকের সুখ দিতে চেয়েছি।” নবীজীর পর কেউ যদি কবরে এ ধরণের ঢাল স্থাপন করে, বুঝা গেল নিজেকে সে পবিত্র ভাবছে। তার কারণে আল্লাহ কবরের শাস্তি হ্রাস। করবেন।তাছাড়া নবীজী কবরের শাস্তি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে ঢাল স্থাপন করেছিলেন। কার সামর্থ্য আছে কবরের শাস্তি সম্পর্কে অবগত হওয়ার? 

কবরে প্রশ্ন কখন শুরু হয়?

 C উত্তরঃ মৃতের দাফনকার্য সম্পন্ন হওয়ার পর রূহ 

দেহে ফিরে এলেই জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়। যেমনটি উসমান রা. বলেন, 

 “ “নবী করীম সা, মৃতের দাফনকার্য সম্পন্ন করে কবরের সামনে। দাঁড়িয়ে বলতেন, তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা কর। জিজ্ঞাসাবাদ-কালে অবিচল থাকার দোয়া কর। তাকে এখন প্রশ্ন করা হবে।” (আবু দাউদ-৩২২৩) 

কোনো মানুষ কি কবরের আযাব শুনতে পায়? 

উত্তরঃ জ্বিন ও মানুষের পক্ষে কবরের আযাব শ্রবণ সম্ভব নয়। যেমনটি পূর্বোক্ত হাদিসে | বর্ণিত হয়েছে, 

 “.. সে এরকম চিৎকার করে, জ্বিন ইনসান ব্যতীত সকল কিছুই তা শুনতে। পায়.” (মুসনাদে আহমদ-১৮৬৩৭) চতুষ্পদ জন্তু কবরের আযাব শুনতে পায়।একদা মদিনার দুই ইহুদী মহিলা আয়েশা রা. এর কাছে এসে কবরের আযাব 

সম্পর্কে আলোচনা করে। নবীজী ঘরে ফিরলে আয়েশা রা, এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে নবীজী বলেন, 

“তারা সত্যই বলেছে, কবরে মানুষকে এরকম আযাব দেয়া হয় যা সকল চতুষ্পদ জন্তু তা শুনতে পায়।” (মুসলিম-৫৮৬) 

তবে কি মৃতও কিছু শুনতে পায়? 

উত্তরঃ এ বিষয়ে উলামায়ে কেরাম বিভিন্ন মত পোষণ করেছেন। প্রাধান্য-যোগ্য মত হলো, তারা জীবিতদের কিছুই শুনতে পায় না। আল্লাহর বাণী, 

وما أنت بمسمع من في القبوره 

فاطر: 22 

“আপনি কবরে শায়িতদেরকে শুনাতে সক্ষম নন” (সূরা ফাতির 

তবে দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর মৃত ব্যক্তি প্রত্যাগমনকারীদের পায়ের আওয়াজ শুনতে পায়। যেমনটি পূর্বোক্ত হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। (বুখারী-মুসলিম) 

স্বজনদের আহাজারি ও বিলাপের দরুন মৃতকে কি শাস্তি দেয়া হয়? উত্তরঃ হ্যাঁ..। যেমনটি নবী করীম সা. বলেছেন, 

“স্বজনদের আহাজারির দরুন মৃতকে কবরে শাস্তি দেয়া হয়।” (বুখারী-১২৮৬) 

( মূলত মৃতকে সুখ-শাস্তি প্রদান বা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ 

তার আমলের প্রেক্ষিতে হয়। এখানে অন্যের বিলাপের দরুন মৃতকে কেন আযাব দেয়া হবে? উত্তরঃ ইসলামপূর্ব মূর্খতা-যুগে মৃত্যুর পূর্বে মানুষ রোনাজারির অসিয়ত করে যেত। অতি-বিলাপে কাপড় ছিড়ে ফেলার কথা বলে যেত। যেন মানুষ বুঝতে পারে লোকটি কত জনপ্রিয় ছিল, কত উত্তম ছিল। সুতরাং কেউ যদি মূখর্তা-যুগের কাণ্ড ঘটায়, 

তবে অবশ্যই শাস্তিপ্রাপ্ত হবে। হাদিসে সেদিকেই ইঙ্গিত করা। হয়েছে। অনেকে হাদিসের অর্থ বলেছেন, মৃত্যুর পর তার জন্য স্বজনরা আহাজারি করবে জেনেও যে ব্যক্তি এ কাজ থেকে বারণ করে যায়নি, তাদেরকেই কবরে শাস্তি দেয়া হবে। অনেকে বলেছেন, এখানে শাস্তি দ্বারা মৃতের দুঃখবোধ উদ্দেশ্য। অর্থাৎ ফেরেশতাদের সামনে মৃত লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়। আল্লাহর আমাদেরকে তাঁর রহমতের চাদরে ঢেকে নিন..!! 

আক্কীদা,

 কবরে সুখ বা শাস্তি অদৃশ্যের বিষয়াবলীর অন্তর্ভূক্ত। এর উপর ঈমান আনয়ন ওয়াজিব। যদিও পঞ্চেন্দ্রিয় তা অনুভব করতে 

অক্ষম। 

বারযাখী জীবনে মানুষের অবস্থা 

মানুষের মৃত্যু এবং বিচার-দিবসে তার পুনরুত্থানের অন্তর্বর্তীকালীন আবাসস্থলের নাম বারযাখ; কবরস্থ হোক বা না হোক। মানুষ এবং জিনদের মধ্যে যারাই মৃত্যুবরণ করবে, তারাই বারযাখে চলে যাবে। বারযাখী জীবনে তাদের অবস্থা তাদের কৃতকর্ম অনুযায়ী নির্ধারণ হয়জীবনের কিছু অবস্থা সম্পর্কে নবী করীম সা. আমাদেরকে অবহিত করেছেন। 

* কবরে মানুষের অবস্থা কীরূপ হবে? * সুখ কিংবা শাস্তির ধরণ কী? * এসব কিছুই কি নবীজী স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছেন? 

ভূমিকা নবী করীম সা. নিজ থেকে বানিয়ে কোনো কথা বলেন না। তাঁর উচ্চারিত সকল বাণীই পালনকর্তার প্রেরিত ওহি। বারযাখী জীবন সম্পর্কে আল্লাহ তাঁর কাছে যে অহি প্রেরণ করেছিলেন, তাই তিনি আমাদের শুনিয়ে গেছেন; বরং কতিপয় অবস্থা তিনি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছেন। 

পালনকর্তার দয়া অসীম। দয়া তাঁর ক্রোধের অগ্রগামী। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু এবং করুণাময় সুমহান প্রতিপালক। পাশাপাশি তিনি পরাক্রান্ত এবং অতি প্রভাবশালীও। তাঁর ক্রোধ তিনি ছাড়া কেউ নিবারণ করতে সক্ষম নয়। উম্মতকে সতর্ক করতে নবীজী স্বচক্ষে দেখা কিছু শাস্তির বিবরণ শুনিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে সেগুলো ছিল স্বপ্ন। তবে নবীদের স্বপ্ন ওহি’র নামান্তর।

 ছামুরা বিন জুনদুব রা. বলেন, নবীজী প্রায়ই বলতেন, তোমরা কি স্বপ্নে কিছু দেখেছো? অতঃপর তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত ওহি’র বর্ণনা দিতেন। একদিন সকালে তিনি আমাদের বলছিলেন, “গতরাতে দু’জন আগন্তুক এসে আমাকে ঘুম থেকে জাগ্রত করে বলল, চলুন! আমি তাদের সাথে চললাম। চলতে চলতে শায়িত এক ব্যক্তির কাছে এলাম, তার পাশে একজন প্রস্তরখণ্ড নিয়ে দাঁড়ানো। শায়িতের মাথায় সে প্রস্তরখণ্ড দিয়ে সজোরে আঘাত করছে। আঘাতের ফলে মাথা বিক্ষিপ্ত হয়ে যাচ্ছে। পাথরও ভেঙ্গে চূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। পুনরায় সে পাথর একত্রিত করে নিয়ে আসতে আসতে ঐ লোকের মাথা আগের মতো হয়ে যাচ্ছে। অতঃপর আবারও সে সজোরে তার মাথায় আঘাত করছে। আমি বললাম, সুবহানাল্লাহ.. এটা কী? তারা বলল, চলুন, চলুন! আমি চললাম। চলতে চলতে চিত করে শায়িত এক ব্যক্তির নিকটে এলাম। তার সামনে বড় বড়শি নিয়ে একজন দাঁড়ানো। সে ঐ লোকের একপাশে গিয়ে বড়শির ধারালো অংশ মুখের ভেতর ঢুকিয়ে সজোরে টেনে চেহারাকে পিঠ পর্যন্ত নিয়ে আসছে। আবার চোখ ও নাসিকার ভেতর ঢুকিয়ে সজোরে টেনে ছিড়ে ঘাড় পর্যন্ত নিয়ে আসছে। অতঃপর সে অপর পাশে গিয়ে 

সেদিকেও একইরকম করছে। পার্শ্ব পরিবর্তন করতে করতে অপর পার্শ্ব পূর্বের মতো হয়ে যাচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম, সুবহানাল্লাহ.. এটা কী? তারা বলল, চলুন, চলুন! আমি তাদের সাথে চললাম। চলতে চলতে একটি চুলা-সদৃশ বিশাল গর্তের কাছে এলাম। গর্তের ভেতর। 

প্রতীকী চিত্র থেকে প্রচণ্ড চিৎকার ও কান্নার আওয়াজ আসছিল। আমি তাদেরকে দেখার চেষ্টা করলাম।দেখি, অসংখ্য নগ্ন নারী-পুরুষ। তাদের নীচ দিয়ে আগুনের নদী প্রবাহিত। যখনই ঐ নদী থেকে অগ্নিশিখা উপরের দিকে আসে, তখনই তারা চিৎকার শুরু করে। আমি বললাম, সুবহানাল্লাহ.. এটা কী? বলল, চলুন, চলুন! আমরা চললাম। চলতে চলতে একটি রক্তিম নদীর কাছে এসে উপনীত হলাম। নদীতে একজন সাঁতার কাটছিল। আরেকজন। তীরে অনেকগুলো পাথর নিয়ে দাঁড়ানো ছিল। যখনই ঐ সাঁতারু সাঁতার কাটতে কাটতে তীরে এসে মুখ খুলে, তখনই সে তার মুখে পাথরগুলো ঢেলে দেয়। জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা? বলল, চলুন, চলুন! 

আমরা চললাম। চলতে চলতে এক অতি-বিশ্রী লোকের কাছে এলাম। সে আগুনের পাশে প্রদক্ষিণ করছে। লাকড়ি জমা। করে আগুনে দিচ্ছে। ফেরেশতা দু’জনকে জিজ্ঞেস করলাম, কে সে? তারা বলল, চলুন, চলুন! 

দুনিয়াতে ব্যবহৃত চুল, চলতে চলতে ফুলে-ফলে তবে হাদিসে এটা উদ্দেশ্য নয়। 

সজ্জিত ও সুশোভিত একটি মনোরম বাগিচার কাছে এলাম, বাগিচার মাঝে দীর্ঘকায় একব্যক্তি। অতি দৈর্ঘ্যের দরুন আকাশের দিকে আমি তার মাথা দেখতে পাচ্ছিলাম না। তার পাশে অসংখ্য সুশ্রী বালক। বললাম, এরা কারা? বলল, চলুন, চলুন! আমরা চললাম। চলতে চলতে একটি সুদীর্ঘ ও বৃহৎ বাগানের কাছে এসে উপনীত হলাম। এরকম সুদীর্ঘ ও বিরাট বাগান। ইতিপূর্বে কখনই দেখিনি। ফেরেশতা দু’জন আমাকে সেই বাগানে উঠতে বললে আমি তাতে ওঠে গেলাম। ভেতরে গিয়ে স্বর্ণ-রূপার ইট দিয়ে তৈরি একটি শহর দেখতে পেলাম। কাছে। এসে শহরের প্রধান ফটক খুলতে বললে আমাদের জন্য ফটক খুলে দেয়া হলো। সেখানে কিছু লোক দেখতে পেলাম, যাদের অর্ধাঙ্গ অতি-সুন্দর এবং অর্ধাঙ্গ অতি-কুৎসিত। ফেরেশতা দু’জন তাদের বললেন, তোমরা ঐ নদীতে ডুব দিয়ে এসো! দেখলাম, 

একটি প্রবহমান নদী, যার পানি দুধের চেয়েও সাদা। তারা গিয়ে সে নদীতে ডুব দিয়ে ফিরে আসল। দেখলাম, দৈহিক বীভৎসতা দূর হয়ে তারা অতি-সুদর্শনে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। ফেরেশতা দু’জন বললেন, এটি হলো “জান্নাতে আদন”। আর ওই হলো আপনার মাক্কাম। আমি উপরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম খণ্ড মেঘ-সদৃশ একটি প্রাসাদ। বলল, এ হলো আপনার বাড়ী। আমি বললাম, আল্লাহ তোমাদেরকে কল্যাণ দিন, আমাকে আমার বাড়ীতে প্রবেশ করতে দাও! তারা বলল, এখনই নয়। তবে অচিরেই আপনি তাতে প্রবেশ করবেন। ফেরেশতা দু’জনকে বললাম, আজরাত অনেক অত্যাশ্চর্য বিষয় প্রত্যক্ষ করলাম, এগুলো কী ছিল? তারা বলল, অচিরেই আপনাকে সেগুলো সম্পর্কে অবহিত করব। প্রথম যাকে আপনি দেখেছেন পাথর মেরে মাথাকে পিষে ফেলা হচ্ছে, সে কুরআন গ্রহণ করেও প্রত্যাখ্যান করত। ফরয নামায। না পড়ে ঘুমিয়ে থাকত। অতঃপর যাকে মাথা থেকে চোয়াল পর্যন্ত ধারালো বড়শি দিয়ে ছিড়ে ফেলা হচ্ছে, সে সকালে ঘর থেকে বের হয়ে মিথ্যা-রটনা করত আর দিকদিগন্তে (চতুর্দিকে) তা ছড়িয়ে পড়ত। অতঃপর চুলা-সদৃশ ভয়ানক অগ্নিগর্ভে যেসব নগ্ন নারী-পুরুষ দেখেছেন, তারা হলো ব্যভিচারী সম্প্রদায়। অতঃপর যে সাঁতারুকে রক্তিম নদীর তীরে এসে পাথর গলদগরন করতে দেখেছেন, সে হলো সুদ-ভক্ষক। 

Contents 

অতঃপর যে বীভৎস লোকটিকে আপনি আগুনের পাশে বসে অগ্নি প্রজ্বলিত করতে দেখেছেন, সে হলো জাহান্নামের। দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা “মালেক”। অতঃপর মনোমুগ্ধকর বাগিচায় যে দীর্ঘকায় লোকটিকে আপনি দেখেছেন, তিনি হলেন ইবরাহীম আ.। আর তার আশপাশের সুদর্শন বালকেরা হলো পনের বৎসরের নীচে মৃত্যুবরণকারী শিশুসকল।। একজন জিজ্ঞেস করল, মুশরিকদের শিশুদের কী পরিণতি হবে হে আল্লাহর রাসূল? উত্তরে বললেন, তারাও ইবরাহীম আ. এর সাথে সেখানেই থাকবে। (বুখারী-৭০৪৭)। পরিশেষে যে জাতিকে আপনি অর্ধাঙ্গ সুদর্শন এবং অর্ধাঙ্গ কুৎসিত দেখেছেন, তারা হলো সৎকর্মের সাথে অসৎকর্ম। মিশ্রণকারী মুমিন, যাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। আল্লাহ তা’লা আমাদের সকলকে তাঁর রহমতের চাদরে ঢেকে নিন! 

কবরের শাস্তি যন্ত্রণাদায়ক ঠিক; তবে পরকালের শাস্তি অতি-যন্ত্রণাদায়ক ও অধিক স্থায়ী। 

কবরে শাস্তির কারণ 

কবরে সুখ বা শাস্তির অনেকগুলো কারণ রয়েছে। আল্লাহ তা’লা আমাদের জন্য হালাল এবং হারামকে স্পষ্টরূপে বর্ণনা করেছেন। হেদায়েত এবং গোমরাহি পৃথক করে দিয়েছেন। সুতরাং কারও প্রতি আল্লাহ বিন্দুমাত্র জুলুম করবেন না। 

* কবরে আযাবের কারণগুলো কী কী? * কবরে সুখের আমলসমূহ কী কী? * কীভাবে মানুষ কবরের জন্য প্রস্তুতি নিবে? 

ভূমিকা প্রত্যেক শরীয়ত অধ্যয়নকারীর সামনেই বিষয়টি স্পষ্ট। অনেক আমল সে পাবে, যেগুলোর ব্যাপারে শাস্তির হুমকি এসেছে; | সেগুলো পরিত্যাগ করে কবরের শাস্তি হতে পরিত্রাণ পাওয়া 

সম্ভব। 

শিরক ও কুফর শিরক হলো মহাপাপ। শিরক মানে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য উপাসনা সাব্যস্ত করা; প্রার্থনায় হোক, নামাযের ক্ষেত্রে হোক, পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে হোক বা সাহায্য কামনার ক্ষেত্রে হোক! কবরের শাস্তির বিবরণ দিতে গিয়ে নবী করীম সা. বলেছিলেন,“অতঃপর তার শাস্তির জন্য এক অন্ধ ও বধির ফেরেশতা নিয়োজিত করেন, যার হাতে থাকে একটি বিশাল হাতুড়ি, তা দিয়ে যদি সে পর্বতকে আঘাত করে তবে পর্বত নিমিষেই মাটির সাথে মিশে যাবে। হাতুড়ি দিয়ে সে তাকে একটি আঘাত করে, তার চিৎকার মানুষ ও জিন ছাড়া সকলেই শুনতে পায়। আঘাতের ফলে সে মাটির সাথে মিশে যায়। অতঃপর আল্লাহ তাকে পুনরায় জীবিত করে পূর্বের মতো করে দেন।” উক্ত হাতুড়ির বিবরণ অপর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, 

– “প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সকল মানুষ মিলেও যদি তা উঠাতে চায়, তবে সকলেই অপারগ হয়ে যাবে।” (বায়হাকী) 

প্রস্রাবের ছিটা থেকে অসচেতনতা 

অর্থাৎ প্রস্রাবকালে ছিটা এবং শেষে প্রস্রাবের ফোটা থেকে পরিচ্ছন্নতা অবলম্বন না করা। যদ্দরুন কাপড়ের মধ্যে তার প্রতিক্রিয়া থেকে যায়। নবী করীম সা. বলেন, 

“কবরের অধিকাংশ শাস্তিই প্রস্রাবের ছিটা থেকে অসচেতনতার দরুন হবে।” (মুস্তাদরাকে হাকিম-৬৫৪)। সুতরাং প্রতিটি মুসলিমকে তার দেহ, বস্ত্র ও নামাযের স্থান সদা পবিত্র রাখতে অধিক মনযোগী হওয়া উচিত। 

পরনিন্দা

 ঝগড়া ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে একজনের দোষ অন্যজনের কাছে বর্ণনা করা। ইবনে আব্বাস রা. বলেন, 

“একদা নবী করীম সা. দু’টি কবরের পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে বলছিলেন, এ দু’জনকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে, তবে বড় কোনো অপরাধকে কেন্দ্র করে নয়; একজনকে প্রস্রাবের ছিটা থেকে অসচেতন থাকায় আর অপরজনকে মন্দালোচনা বলে বেড়ানোর দরুন। অতঃপর নবীজী খেজুর বৃক্ষের একটি সিক্ত ঢাল ভেঙ্গে দু’টুকরা করে দুই কবরের উপর গেঁথে দিয়ে বললেন, এগুলো শুষ্ক হওয়া পর্যন্ত হয়ত তাদের শাস্তি হ্রাস করা হতে পারে।” (বুখারী-২১৩)। সুতরাং গীবত বা পরনিন্দায় অভ্যস্তদের জন্য বারযাখী জীবনে চরম শাস্তি অপেক্ষা করছে। নবী করীম সা. বলেন,“মে’রাজের রাত্রিতে একদল লোককে দেখেছি যাদের নখসমূহ পিতলের। ধারালো নখগুলো দিয়ে তারা নিজেদের চেহারা ও বক্ষগুলো আঁচড়িয়ে ক্ষতবিক্ষত করছে। জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা হে জিবরীল? বললেন, এরা মানুষের মাংস ভক্ষণ করত ও তাদের দোষত্রুটি বলে বেড়াত।” (আবু দাউদ) 

যুদ্ধ-লব্ধ সম্পদে চুরি (দুর্নীতি) অর্থাৎ আল্লাহর জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের পথে যুদ্ধ-লব্ধ সম্পদে বণ্টনের পূর্বেই চুরি করে নেয়া। কুরআনুল কারীমে এ ব্যাপারে কঠিন শাস্তির কথা বর্ণিত হয়েছে, 

ومن يغل يأتي بما ل ومه آل عمران: ۱۲۱ 

“যে ব্যক্তি যুদ্ধ-লব্ধ সম্পদে চুরি করবে, চুরিকৃত সম্পদ নিয়েই সে বিচারদিবসে উপস্থিত হবে।” (সূরা আলে ইমরান-১৬১) আবু হুরায়রা রা. বলেন, “খায়বার যুদ্ধে আমরা কোনো স্বর্ণ-রূপা গনিমতরূপে পাইনি; সেদিন শুধু গরু, ছাগল, উট, গৃহ-সরঞ্জাম। ও কিছু লাকড়ি পেয়েছিলাম। যুদ্ধ-শেষে আমরা নবীজীর সাথে ওয়াদিয়ে কুরা’য় ফিরে এলাম। নবীজীর সাথে বনী দাবাব এর জনৈক ব্যক্তি থেকে উপঢৌকনে প্রাপ্ত কৃতদাস ‘মিদআম’ও ছিল। সে নবীজীর বাহন থেকে সরঞ্জাম নামাচ্ছিল, এমনসময় একটি তীর এসে তার দেহে বিদ্ধ হলে সাথে সাথে সে মৃত্যুবরণ করল। মানুষজন বলতে লাগল! কতই না উত্তম শাহাদাত! একথা শুনে। নবী করীম সা. বললেন, বরং আল্লাহর শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, খায়বার যুদ্ধে যে চাদর সে পেয়েছিল, তা গনিমতে বণ্টিত ছিল না। অবশ্যই সেটি আগুন হয়ে তার শাস্তির উপকরণ হবে। একথা শুনে একব্যক্তি জুতার ফিতা নিয়ে এসে বলল, এই বস্তুটিও আমি সেখান থেকে নিয়েছিলাম। নবীজী বললেন, সামান্য জুতার ফিতা হলেও সেটি তার জন্য আগুন হয়ে। আসবে।” (বুখারী-৬৭০৭) 

বিনা কারণে রমযানে রোযা ভেঙ্গে ফেলা

 রমযান মাসে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোযা পালন ফরয। সূর্যাস্তের। পূর্বে কোনোভাবেই রোযা ভাঙ্গা বৈধ। নয়। অন্যথায় সে অপরাধী সাব্যস্ত হবে। নবী করীম সা. বলেন, 

“একদা আমি নিদ্রায় ছিলাম, দু’জন ব্যক্তি এসে দুই বাহু ধারণ করে আমাকে একটি পর্বতের কাছে নিয়ে এসে বলল, আরোহণ করুন! আমি বললাম, আমি তো আরোহণ করতে অক্ষম। তারা বলল, আমরা আপনাকে সহজ করে দেব। অতঃপর আমি। 

আরোহণ করে পাহাড়ের মধ্যস্থলে উপনীত হয়ে গগনবিদারী | কিছু চিৎকার ও আর্তনাদ শুনতে পেলাম। জিজ্ঞেস করলাম, এগুলো কীসের আওয়াজ? তারা বলল, এগুলো জাহান্নামবাসীর আর্তনাদ। অতঃপর তারা আমাকে নিয়ে চলল।পথিমধ্যে একদল লোককে পায়ের গোছায় বাঁধা অবস্থায় উপরের দিকে ঝুলন্ত দেখলাম।আর তাদের মুখ দিয়ে রক্ত নির্গত হচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম, ওরা কারা? বলল, ওরা সূর্যাস্তের পূর্বেই রোযা ভেঙ্গে ফেলত।” (মুস্তাদরাকে হাকিম-১৫৬৮)। এই হলো কুরআন-হাদিসের আলোকে বারযাখী জীবনের কিছু বর্ণনা। 

ফায়দা,

 কবরবাসীর অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞাত হলেই কবরের জন্য প্রস্তুতি নেয়া ও কবরের শাস্তি হতে বাঁচা সম্ভব হবে। 

কবরের শাস্তি হতে মুক্তির উপায় 

মুসলিম সবসময় কিছু বিষয় অর্জন এবং কিছু বিষয় বর্জনের জন্য আদিষ্ট। যেন সে এগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন। করতে পারে। নবী করীম সা. কবরের শাস্তি হতে মুক্তি দানকারী কিছু আমলের কথা বলে গেছেন, 

* কী সেই আমল? * এ সকল আমল কেনইবা প্রাধান্যযোগ্য? * এসব আমলের কী মর্যাদা? 

ভূমিকা সৎকর্ম সবসময় বান্দার জন্য লাভজনক হয় এবং দুনিয়া ও আখেরাতে তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে। সৎকর্মসমূহের কিছু ভাগ ও কিছু স্তর রয়েছে। নবী করীম সা. কবরের শাস্তি হতে। মুক্তিদানকারী কিছু আমলের কথা বিশেষভাবে বলে গেছেনঃ 

নামায নামায হলো সর্বশ্রেষ্ঠ এবাদত। যে নামাযকে সংরক্ষণ করল, সে দ্বীনকে সংরক্ষণ করল। যে নামাযকে বিনষ্ট করল, সে দ্বীনকে ধ্বংস করল। নামায মানুষকে কবরের আযাব থেকে পরিত্রাণ 

দেয়। 

যাকাত

 যাকাত ইসলামের মৌলিক স্তম্ভগুলোর একটি। যাকাত হলো সম্পদের মধ্যে আল্লাহর অধিকার। 

রোযা।

 এটিও ইসলামের মৌলিক স্তম্ভগুলোর একটি। ফরয রোযা হলো রমযান মাসের রোযা। নফল রোযাসমূহের মধ্যে প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার রোযা, আশুরার দিন রোযা এবং আরাফার দিন রোযা ইত্যাদি.. অন্যতম। 

কল্যাণকাজ 

যেমন, সৎকাজের আদেশ, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ এবং মানুষের মাঝে মীমাংসা স্থাপন ইত্যাদি। 

সাদকা ও আত্মীয়দের খোঁজ

 কেবল টাকা নয়; বরং সম্পদ, বস্ত্র বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় বস্তু দিয়েও সাদকা হতে পারে। আত্মীয়দের খোঁজ বলতে পিতামাতার খোঁজ নেয়া, তাদের প্রয়োজনগুলো পূর্ণ করা। তাদের প্রতি দয়াশীল হওয়া। 

উত্তম কাজ

 যেমন, সদা হাসিমুখে থাকা, সবসময় মানুষকে উপদেশ দেয়া এবং তাদের জন্য কল্যাণ কামনা করা ইত্যাদি। 

করুণা করা

 সম্পদ দিয়ে হোক, কথা দিয়ে হোক বা উত্তম শিষ্টাচার দিয়ে হোক। নবী করীম সা. উপরোক্ত সবগুলো আমল একত্রে বর্ণনা করেছেন, 

“ঐ সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, নিশ্চয় দাফনকৃত ব্যক্তি কবরস্থকারীদের প্রস্থানকালে তাদের পায়ের আওয়াজ শুনতে পায়। যদি সে মুমিন হয়ে, তবে নামায তার মাথার পাশে থাকে। যাকাত তার ডানদিকে থাকে। রোযা তার বাম দিকে থাকে। কল্যাণকাজ এবং মানুষের প্রতি দয়া তার পায়ের দিকে থাকে। ফেরেশতা তার মাথার পাশ দিয়ে আসতে চাইলে নামায বলে, এ দিক দিয়ে যাওয়ার পথ নেই। অতঃপর ডানদিক দিয়ে আসতে চাইলে যাকাত বলে, এদিক দিয়ে যাওয়ার পথ নেই। বাম দিক দিয়ে আসতে চাইলে রোযা বাঁধা দিয়ে বলে, যাওয়ার সুযোগ নেই। পায়ের দিক দিয়ে গমন করতে চাইলে কল্যাণকাজ বাঁধা দিয়ে বলে, পথ নেই।” (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা ১২০৬২) অপর বর্ণনায় নবী করীম সা. বলেন,“মানুষ যখন কবরে প্রবেশ করে, মুমিন হয়ে থাকলে তখন তার সৎকর্মগুলো তাকে ঘিরে রাখে। ফেরেশতা নামাযের দিক দিয়ে আসতে চাইলে নামায তার গতিরোধ করে। রোযার দিক দিয়ে আসতে চাইলে রোযা গতিরোধ করে..।” (মুসনাদে আহমদ ২৬৯৭৬) 

Leave a Reply

Address
304 North Cardinal St.
Dorchester Center, MA 02124

Work Hours
Monday to Friday: 7AM - 7PM
Weekend: 10AM - 5PM