পরকাল ২

হওয়ার পরিবর্তে এখানে তিনি বেঁচে গেছেন নাকি আল্লাহ তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন!! (বুখারী-৪৩৬০) 

পুনরুত্থান অস্বীকারকারীর বিধান 

পুনরুত্থান দিবসে বিশ্বাস ঈমানের মৌলিক স্তম্ভগুলোর অন্যতম। যে তা অস্বীকার করল, সে আল্লাহ ও তাঁর কুরআনকে অস্বীকার করল।নবী করীম সা. বলেন, “আল্লাহ বলেন, আদম সন্তান আমায়। মিথ্যারোপ করেছে; অথচ সে অধিকার তার ছিল না। আমাকে গালমন্দ করেছে; এ অধিকার তার ছিল না। মিথ্যারোপ করার নমুনা হলো এ কথা বলা যে, আমি তাকে প্রথমবারের মতো পুনরায় সৃষ্টি করতে সক্ষম নই। আমাকে গালমন্দ করার নমুনা হলো এ কথা বলা যে, আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন। অথচ আমি সেই অমুখাপেক্ষী সত্তা, যিনি কখনো জন্ম নেননি এবং কোন সন্তানও গ্রহণ করেননি। যার সমকক্ষ কেহই নেই।” (বুখারী-৪৬৯০) 

পুনরুত্থানের অর্থ হলো একথা বিশ্বাস করা যে, মৃত্যুর পর কেয়ামত দিবসে আবারও আল্লাহ আমাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ ও কর্মফল প্রদানের জন্য জীবিত করবেন। 

শিঙ্গায় ফুঁৎকারে যখন পৃথিবীর সকল মানুষ জীবিত হয়ে উঠবে, তখন আল্লাহ তালা সকলকে একস্থলে একত্রিত করতে বলবেন। 

* কোন সে স্থল? 

* সেখানে কী ঘটবে?

 * এর স্বপক্ষে প্রমাণ কী? 

বিস্তারিত বিবরণ সামনে আসছে.. 

পুনরুত্থানের বিষয়ে অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। ফলে অস্বীকারকারী মিথুকদের আর অজুহাত দাঁড় করানাের সুযােগ নেই। 

কেয়ামতে ঘটিত ভয়াবহতা 

কেয়ামত ঘটিয়ে পৃথিবীকে এক ভিন্ন পৃথিবীতে রূপান্তর করা হবে। আসমান পরিবর্তন হয়ে যাবে। বিশ্বজগতের প্রকৃতি উলট পালট হয়ে যাবে। মানুষের বিচারকার্য সম্পাদনের জন্য পরাক্রমশালী আল্লাহ তালা অবতরণ করবেন। 

* আসমানসমূহের অবস্থা কী হবে?

 * পৃথিবীকে কীভাবে পরিবর্তন করা হবে?

 * সেদিন মানুষের কী দশা হবে? 

কেয়ামতের দিন আসমান-যমিনের অবস্থা 

পর্বতসমূহকে চূর্ণ করা হবে।

 সমুদ্রগুলোকে উত্তাল করে তোলা হবে।

 আসমানগুলো ভেঙ্গে যাবে।

 সেদিন আকাশ বিচিত্র রঙ ধারণ করবে।

সূর্য আলোহীন ও নিষ্প্রভ হয়ে যাবে।

 চন্দ্র 

গ্রহ-নক্ষত্র 

কেয়ামত দিবসের ভয়াবহতা সম্পর্কে আল্লাহ আমাদের অবহিত করেছেন। কেয়ামত মানুষের অন্তরসমূহ কাঁপিয়ে তুলবে। ভূমি প্রকম্পিত হয়ে ফেটে পড়বে। পর্বতমালা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে। সমুদ্র উত্তাল হয়ে বিস্ফোরিত হবে।আসমানগুলো ভেঙ্গে পড়বে। চন্দ্ৰ আলোহীন হয়ে যাবে। গ্রহ নক্ষত্ররাজি অন্ধকারে রূপান্তরিত হবে। পৃথিবীকে আল্লাহ স্বহস্তে ধারণ করবেন। আসমানসমূহকে তিনি ডানহাতে গুটিয়ে নেবেন। 

কেয়ামতের দিন আসমান যমিনের অবস্থা কুরআন-হাদিসের অসংখ্য প্রমাণের ভিত্তিতে বিষয়টি স্বতঃসিদ্ধ যে, জমিনকে সেদিন আল্লাহ মুঠোয় নিয়ে নেবেন। আসমানগুলোকে গুটিয়ে নেবেন। 

মহাকাশচিত্র। তবে হাদিসের দ্বারা এটা উদ্দেশ্য নয়, 

আসমান

 আল্লাহ বলেন, 

ه الأنبياء: ۱۰۶ 

و يوم نطوي السماء كطي الجل لل 

“সেদিন আমি আকাশকে গুটিয়ে নেব, যেমন গুটানো হয় লিখিত কাগজপত্র” (সূরা আম্বিয়া-১০৪) অন্য আয়াতে বলেন, 

والموت موی بینی که الزمر: 17 

“আসমানসমূহ ভাঁজ করা অবস্থায় থাকবে তাঁর ডানহাতে।” (সূরা যুমার- ৬৭) 

নবী করীম সা. বলেন, “আল্লাহ তা’লা সেদিন জমিনকে মুঠোয় নিয়ে নেবেন। আসমানসমূহকে ডানহাতে গুটিয়ে নিয়ে বলবেন, আমিই প্রকৃত অধিপতি! কোথায় আজ জমিনের অধিপতিসকল!” (বুখারী-৪৫৩৪)

নবী করীম সা. বলেন, “কেয়ামতের দিন আসমান-জমিনকে আল্লাহ গুটিয়ে নেবেন। ডানহাতে ধারণ করে বলবেন, আমিই অধিপতি! কোথায় আজ প্রতাপশালী ব্যক্তিবর্গ! কোথায় অহংকারী। নেতৃবৃন্দ! অতঃপর বামহাতে জমিনসমূহকে গুটিয়ে নিয়ে বলবেন, আমিই রাজা! কোথায় প্রতাপশালী ব্যক্তিবর্গ! কোথায় অহংকারী নেতৃবৃন্দ!” (মুসলিম-৭২২৮) 

জমিন 

 নবী করীম সা. বলেন, “কেয়ামতের দিন জমিন হবে একটি রুটির টুকরার ন্যায়; মহা পরাক্রমশালী প্রতিপালক জমিনকে | সেদিন নিজের হাতে নিয়ে নেবেন। ঠিক যেমন তোমরা জান্নাতে মেহমানকে আপ্যায়ন করার জন্য হাতে রুটি নেবে।” অতঃপর এক ইহুদী ব্যক্তি এসে বলতে লাগল, হে আবুল কাসিম আপনাকে দয়াময় আল্লাহ কল্যাণ দান করুন, আমি কি বলব কেয়ামতের দিন জান্নাতবাসীর আতিথেয়তা কীরূপ হবে? নবী করীম সা. বললেন, অবশ্যই বল! সে বলল, জমিন সেদিন। একটি রুটির ন্যায় হয়ে যাবে। অতঃপর নবীজী সাহাবীদের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন, এমনকি তার দাঁতগুলো ভেসে 

উঠল। অতঃপর তিনি বললেন, 

 আমি কি তোমাদেরকে জান্নাতবাসীর খাদ্য সম্পর্কে অবহিত করব? বললেন, তাদের খাদ্য হবে ষাঁড় ও মাছ। এতদুভয়ের কলিজার অতিরিক্ত অংশ থেকে সত্তর হাজার লোক আহার করতে পারবে।” (মুসলিম-৭২৩৫) 

পর্বতসমূহ চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাবে । শিঙ্গার ফুকারে পৃথিবীতে অবস্থিত সকল পর্বতমালা চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাবে। আল্লাহ বলেন, 

والجبال فكا دكة 

و إذا تي في آلور نفخة ويده ولي آ 

الحاقة:۱۳ – ۱۰ 

وجدة ( فيوميذ وقعت الواقة 

“যখন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে একটি মাত্র ফুৎকার এবং পৃথিবী ও পর্বতমালা উত্তোলিত হবে ও চুর্ণ বিচুর্ণ করে দেয়া। হবে। সেদিন কেয়ামত সংঘটিত হবে।” (সূরা আল হাক্কা ১৩ 

পবর্তগুলো সেদিন নরম বালিতে রূপান্তরিত হবে। আল্লাহ বলেন, 

ويوم ته الأمم الجبال وكانت الجبال كيبا هيلاه 

المزمل: ۱۶ 

“যেদিন পৃথিবী ও পর্বতমালা প্রকম্পিত হবে এবং পর্বতসমূহ। হয়ে যাবে বহমান বালুকাস্তুপ।” (সূরা মুযযাম্মিল-১৪)। পাহাড়সমূহ ভীষণ কম্পণ ও আন্দোলনের কারণে ধুনিত পশমের মতো হয়ে যাবে। আল্লাহ বলেন, 

وتكوين الجبال الفن المنفوشه 

القارعة: 5 

“এবং পবর্তমালা হবে ধুনিত রঙিন পশমের মতো।” (সূরা কারিআ-৫) পর্বতগুলো স্থানচ্যুত হয়ে যাবে। আল্লাহ বলেন, 

النبأ: 20 

وشيرين الجبال فكانت سرايا 

“এবং পর্বতমালা চালিত হয়ে মরীচিকা হয়ে যাবে।” (সূরা নাবা 

২০) 

হ্যাঁ.. মরীচিকা.. যা দূর থেকে পানির মতো দেখা যায়, কিন্তু নিকটে গেলে কিছুই থাকে না। এমনভাবে চুর্ণ করা হবে যে, বাতাস সেগুলো ধুলির ন্যায় উড়িয়ে নিয়ে যাবে। যেমনটি আল্লাহ বলেন, 

و وسلوك عن الجبال فق ينهاري تقام فيها قاعا صفقات فيهاعوجا و ما که طه: ۱۰۰ – ۱۰۷ 

“তারা আপনাকে পাহাড় সম্পর্কে প্রশ্ন করে। অতএব, আপনি বলুন, আমার পালনকর্তা পাহাড়সমূহকে সমূলে উৎপাটন করে বিক্ষিপ্ত করে দিবেন। অতঃপর পৃথিবীকে মসৃণ সমতলভূমি করে ছাড়বেন। তাতে তুমি মোড় ও টিলা দেখবে না।” (সূরা তাহা ১০৫-১০৭) এই হলো কেয়ামত মুহূর্তে পাহাড়ের অবস্থা। আর সমুদ্র.. পৃথিবীর তিন-চতুর্থাংশই যার দখলে, তার অবস্থা হবে পাহাড়ের চেয়েও করুণ..! 

সমুদ্রের উত্তাল.. বৃহৎ, ভয়ানক ও সুগভীর সমুদ্রগুলো.. যার গহ্বরে কত অগণিত। সৃষ্টির বসবাস.. কেয়ামতের দিন তা উত্তাল করে তোলা হবে। বিস্ফোরিত করে তা আগুনে রূপান্তরিত করা হবে। যেমনটি 

আল্লাহ বলেন, 

وإذا البحار جرثية الانفطار: ۳ 

“যখন সমুদ্রকে বিস্ফোরিত করা হবে” (সূরা ইনফেতার-৩)। বিস্ফোরিত হওয়ার অর্থ এই হতে পারে যে, অক্সিজেন ও হাইড্রোজেনের সংমিশ্রণের ফলে তা মহাবিস্ফোরকে রূপান্তরিত হবে। যেমনটি সম্প্রতি পারমাণবিক বোমা তৈরির ক্ষেত্রে করা হয়ে থাকে। আল্লাহ বলেন, 

و التكوير: 6 

جرث 

واذا البحار 

“যখন সমুদ্রগুলোকে অস্থির করে তোলা হবে।” (সূরা তাকবীর 

এখানে অস্থির বলতে আগুনে রূপান্তরিত করা উদ্দেশ্য। হতে পারে তা ভূমি অভ্যন্তরীণ অগ্নি প্রকাশ হয়ে পানির সাথে সংমিশ্রণের ফলে সম্পূর্ণ পানিও আগুনে রূপান্তরিত হয়ে যাবে। 

আসমানসমূহের ঘূর্ণায়ন বিদীর্ণতা.

সেদিন আসমানসূহ প্রবলভাবে প্রকম্পিত হবে। চরম আন্দোলনের শিকার হবে। আল্লাহ বলেন। 

ويوم تور آلماء موراه الطور: ۹ 

“সেদিন আসমানসমূহ প্রকম্পিত হবে প্রবলভাবে।” (সূরা তুর 

আসমান অস্থির হয়ে চাকা’র ন্যায় দ্রুত ঘুরতে থাকবে। এভাবে। এক পর্যায়ে ভেঙ্গে খান খান হয়ে পড়বে। আল্লাহ বলেন, 

و إذا السماء انفطرة 

الانفطار: ۱ | 

“যখন আসমানগুলো ফেটে পড়বে।” (সূরা ইনফেতার-১) অন্য আয়াতে বলেন, 

ويوم تش الماء المرة الفرقان: 25 | 

“যেদিন আকাশ মেঘমালাসহ বিদীর্ণ হবে।” (সূরা ফুরকান-২৫)। কীভাবে বিদীর্ণ হবে তা আমাদের জানা নেই। তবে নিঃসন্দেহে। সেটা অত্যন্ত ভয়াবহ ও কঠিনভাবে হবে। আল্লাহ বলেন, । 

وأذنت لها وحتى 

الانشقاق: ۱-2 

و إذا السماء انشقت 

“যখন আকাশ বিদীর্ণ হবে এবং তার পালনকর্তার আদেশ পালন। করবে এবং আকাশ এরই উপযুক্ত।” (সূরা ইনশেকাক-১,২)। অপর আয়াতে বলেন, 

الحاقة: 19 

وأنت 

الماء فهى يومپير واهية 

“সেদিন আকাশ বিদীর্ণ হবে ও বিক্ষিপ্ত হবে।” (সূরা হাক্কা-১৬)। আকাশ দুর্বল হয়ে বিদীর্ণ ও বিক্ষিপ্ত হয়ে যাবে। 

সেদিনের আকাশবর্ণ

 আকাশের নীল রঙ সেদিন পরিবর্তন হয়ে বিচিত্র রঙ ধারণ করবে। কখনো কালো, কখনো নীল, কখনো হলুদ, কখনো সবুজ। আল্লাহ বলেন, 

فإذا انشقين السماء فكانت ورده البرهان ) که الرحمن: ۳۷ 

“যেদিন আকাশ বিদীর্ণ হবে, তখন সেটি রক্তবর্ণে রঞ্জিত চামড়ার মতো হয়ে যাবে।” (সূরা আর রাহমান-৩৭) 

সূর্য

  কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময় সূর্য নিষ্প্রভ ও আলোহীন হয়ে পড়বে। সূর্যের একাংশকে অপরাংশের সহিত মিলিত করে দেয়া হবে। ভিতর-বাহির উলট পালট করে দেয়া হবে। আল্লাহ বলেন, 

و التكوير: ۱ 

وإذا المورث 

“যখন সূর্য আলোহীন হয়ে পড়বে।” (সূরা তাকবীর-১) ভিন্ন অর্থও উদ্দেশ্য হতে পারে (আল্লাহই ভাল জানেন) 

চন্দ্র জ্যোতিহীন হয়ে যাবে। আল্লাহ বলেন, 

يقول الإنك 

وجمع الشمس والقمر 

بها القيامة: ۷ – 

المستقر 

يوم 

و إذا بق البصر وخت القمر 

ك 

وره إلى 

يومي أن المف 

“যখন দৃষ্টি চমকে যাবে। চন্দ্র জ্যোতিহীন হয়ে যাবে। সূর্য ও চন্দ্রকে একত্রিত করা হবে। সেদিন মানুষ বলবে, পলায়নের জায়গা কোথায়? না, কোথাও আশ্রয়স্থল নেই। আপনার পালনকর্তার কাছেই সেদিন ঠাঁই হবে।” (সূরা কিয়ামাহ ৭-১২)। 

গ্রহ নক্ষত্র 

আকাশে অবস্থিত গ্রহ নক্ষত্রসমূহ সেদিন মলিন ও জ্যোতিহীন হয়ে যাবে। সৌন্দর্য বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আল্লাহ বলেন, 

و التكوير: 2 

وإذا الجو آنکدر 

“যখন নক্ষত্র মলিন হয়ে যাবে।” (সূরা তাকবীর-২) অন্য আয়াতে, 

، فإذا الجوه ست هي المرسلات: ۸ 

“যখন নক্ষত্রসমূহ নির্বাপিত হয়ে যাবে।” (সূরা মুরসালাত-৮) পাশাপাশি সেগুলো ঝরে পড়বে। আল্লাহ বলেন, 

و إذا الجو طمت فيه المرسلات: ۸ 

“যখন নক্ষত্রসমূহ ঝরে পড়বে।” (সূরা ইনফেতার-২) অন্য আয়াতে 

ض أن تؤولا ولين الا إن 

و 

الشملو 

له يم 

و إ أ ما من أي بقدوة إن كان حليماغواي که فاطر:1ء 

“নিশ্চয় আল্লাহ আসমান ও যমীনকে স্থির রাখেন, যাতে টলে না যায়। যদি এগুলো টলে যায় তবে তিনি ব্যতীত কে এগুলোকে স্থির রাখবে? তিনি সহনশীল, ক্ষমাশীল।” (সূরা ফাতির-৪১) 

আসমান-যমিনের এসকল পরিবর্তন কেয়ামতের ময়দানে মানুষের সমাবেশ ও পুনরুত্থানের পূর্বে সংঘটিত হবে। তাহলে হাশরের ময়দানে সমাবেশের পর কী ঘটবে? 

বিশ্বাস, আল্লাহর কুরসি যমিন ও আসমানসমূহকে বেষ্টন করে আছে, সুতরাং বিশ্বজগত নিয়ে তিনি যা ইচ্ছা করতে পারেন। সকল কিছুর উপর তিনি ক্ষমতাবান..! 

হাশর 

হাশর (সমাবেশ) একটি সংক্ষিপ্ত শব্দ। কিন্তু কুরআন-হাদিসের 

আলোকে তার অর্থ খুবই ব্যাপক ও তাৎপর্যপূর্ণ। 

* তবে কী সেই হাশর?

 * কোথায় ও কীভাবে মানুষকে একত্রিত করা হবে?

 * হাশরের ময়দানই বা কী?

 * সেখানে মানুষের অবস্থা কীরূপ হবে? 

ভূমিকা

 হাশরের পক্ষে দলিল।

 হাশরের ময়দানের বৈশিষ্ট 

হাশরস্থল।

 হাশর দিবসের দৈর্ঘ

 হাশরের প্রকারসমূহ 

সমাবেশের বিবরণ।

 হাশরের ময়দানে নবীজীর ঝাণ্ডা 

হাশরের ময়দানে মানুষের অবস্থা 

ভয়াবহতা

 সেদিনে মুমিনদের অবস্থা

 কাফেরদের সমাবেশের অবস্থা।

 কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম বস্ত্রাবৃত ব্যক্তি

 সর্বপ্রথম আহ্বানকৃত।

 হাশরের ময়দানের ভয়াবহতা হ্রাস করতে কতিপয় আমল কেয়ামতের দিন অপরাধীদের অবস্থা।

 যাদের সহিত আল্লাহ কথা বলবেন না

 যাদেরকে আগুনের লাগাম পরানো হবে।

 সাক্ষাতকালে যাদের উপর আল্লাহ ক্রোধান্বিত থাকবেন 

ভুমিকা

 ‘হাশর’ শব্দের অর্থ হলো বিক্ষিপ্ত বস্তুসমূহকে একস্থলে একত্রিত। করা। কেয়ামতের দিন হাশর’ বলতে সকল সৃষ্টিকে তাদের হিসাব গ্রহণ ও প্রতিদানের জন্য নির্দিষ্ট একটি স্থানে একত্রিত করা উদ্দেশ্য। কেয়ামত দিবসকে আল্লাহ “সমাবেশ দিবস” বলে আখ্যায়িত করেছেন। কারণ, সেদিন তিনি সকল সৃষ্টিকে একত্রিত করবেন। আল্লাহ বলেন, 

که هود: 

وذالك يؤ ممجمموع له ألا وذالك يوه مشهود 

“তা এমন একদিন, যেদিন সব মানুষেই সমবেত হবে, সেদিনটি যে হাযিরের দিন।” (সূরা হূদ-১০৩) পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল মানুষকে তিনি জমায়েত করবেন। তিনি বলেন, 

و قل إن الأولين والآخرين ( لمجموعون إلى ميقي يوم معلوم نه 

 “বলুন, পূর্ববর্তী ও পরবর্তীগণ, সবাই একত্রিত হবে এক নির্দিষ্ট সময়ে।” (সূরা ওয়াকিআ ৪৯-৫০) 

যেখানেই সে মৃত্যুবরণ করুক, যে স্থলেই সে দাফন হোক, সাগরের গভীরে ডুবে কিংবা আগুনে পুড়ে ভস্ম হোক; অবশ্যই আল্লাহ তাকে পুনর্জীবিত করবেন। আল্লাহ বলেন, 

ه الله جميعا إن الله على كل شيء قدي 

وأين ماتكو و يأت ب و البقرة: ۱۶۸ 

“তোমরা যেখানেই থাক না কেন, আল্লাহ অবশ্যই তোমাদের সমবেত করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ববিষয়ে ক্ষমতাশীল।” (সূরা বাক্কারা-১৪৮)। আল্লাহর জ্ঞান সকলকে বেষ্টন করে আছে। তিনি কাউকে ভুলেন না। আল্লাহ বলেন, 

“من في الموت والأرض إلا اتى التمن عبدا ( لقد 

و إن أهم وعدهعا ولف ايد يوم القيودا به 

“নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে কেউ নেই যে, দয়াময় আল্লাহর কাছে দাস হয়ে উপস্থিত হবে না। তাঁর কাছে তাদের পরিসংখ্যান রয়েছে এবং তিনি তাদেরকে গণনা করে রেখেছেন। কেয়ামতের দিন তাদের সবাই তাঁর কাছে একাকী অবস্থায় আসবে।” (সূরা মারইয়াম ৯৩-৯৫) হ্যাঁ. আল্লাহর কাছে সকলের পরিসংখ্যান রয়েছে। নারী, পুরুষ, শিশু, যুবক ও বৃদ্ধ; এমনকি তাদের কথা ও কাজ সবই আল্লাহর 

পরিসংখ্যানাধীন। সকলেই আল্লাহর কাছে একাকী আসবে। আল্লাহ তার বিচার করবেন যেভাবে ইচ্ছা। তিনি বলেন, 

وحثه فلتر عادم أداره الكهف: ۶۷ 

“এবং আমি মানুষকে একত্রিত করব অতঃপর তাদের কাউকে ছাড়ব না।” (সূরা কাহফ-৪৭)। মোটকথা, হাশরের ময়দানে আল্লাহ সকলকে নির্দিষ্ট একটি স্থলে একত্রিত করবেন। 

হাশর (সমাবেশ) সম্পর্কিত প্রমাণ 

হাশর কুরআন-হাদিসের অসংখ্য দলিলের দ্বারা সাব্যস্ত। যেমন, আল্লাহর বাণী 

بيه الكهف: 47 | 

و وحشتی تر دژمنهم أحدا 

“এবং আমি মানুষকে একত্রিত করব অতঃপর তাদের কাউকে ছাড়ব না।” (সূরা কাহফ-৪৭)। অন্য আয়াতে 

لمجموعون إلى ميقي يوم معلوم نه 

و قل إن الأولين والآخرين 

 “বলুন, পূর্ববর্তী ও পরবর্তীগণ, সবাই একত্রিত হবে এক নির্দিষ্ট সময়ে।” (সূরা ওয়াকিআ-৪৯-৫০)। অপর আয়াতে 

في الصور معه جمعاه ايه الكهف: ۹۹ | 

و 

“এবং শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে। অতঃপর অবশ্যই আমি সকলকে একত্রিত করব।” (সূরা কাহফ-৯৯) 

নবী করীম সা. বলেন, “নিশ্চয় কেয়ামতের দিন আল্লাহ পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলকে একটি সমতল ভূমিতে একত্রিত করবেন। আল্লাহর আওয়াজ সকলেই স্পষ্ট শুনতে পাবে। সকলেই আল্লাহর দৃষ্টিসীমার ভিতরে থাকবে।” (মুসলিম-৯৬২৩) 

হাশরের ময়দানের বৈশিষ্ট্য স্বচ্ছ ও সাদা সমতল ভূমিতে আল্লাহ সকলকে সমবেত করবেন।

নবী করীম সা. বলেন, “কেয়ামতের ময়দানে মানুষকে গোলাকৃতির ফোলা আটার রুটির মতো পরিস্কার একটি সাদা ভূমিতে সমবেত করা হবে, 

যেখানে কোন চিহ্ন বলতে কিছু থাকবে না।” (বুখারী-৬১৫৬) 

সমাবেশস্থল

 সমাবেশস্থল হবে শামের দিকে। নবী করীম সা. শামের দিকে ইশারা করে বলেন, “ওই দিকে.. ওই দিকে তোমাদেরকে সমবেত করা হবে। কেউ আরোহী, কেউ পদব্রজে আর কাউকে টেনে হেঁচড়ে নেয়া হবে। তোমাদের। সবার মুখে থাকবে লাগাম (মুখে কথা বলতে পারবে না)। 

সিরিয়া 

বর্তমান লেবানন, সিরিয়া 

অধিকৃত ফিলিস্তিন ও জর্ডানকে ‘শাম দেশ বলা হত। 

সত্তরটি জাতির উপর আল্লাহ তোমাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা দেবেন। সর্বপ্রথম কথা বলবে ব্যক্তির উডু।” (মুসনাদে আহমদ ২০০২৫) 

হাশরের মাঠে অবস্থানের সময়কাল হাশরের ময়দানে সকল সৃষ্টির বিচার হবে। সকল রহস্যের 

উন্মাোচন হবে। সেদিনের দৈর্ঘ হবে পঞ্চাশ হাজার বছর। আল্লাহ বলেন, 

و تعرج المملكه والروح إليه في يوم كان مقدار و خمسين ألف سيرة المعارج: 

“ফেরেশতাগণ এবং রূহ আল্লাহ তা’লার দিকে উধ্বগামী হয় এমন একদিনে, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর।” (সূরা মাআরিজ-৪)। 

অতি দৈর্ঘ্যের ফলে মানুষ দুনিয়ায় অবস্থানের পরিমাণ ভুলে যাবে। কারণ, সে তুলনায় দুনিয়ার জীবন তুচ্ছ ও যৎসামান্য মনে হবে। মানুষ ভাববে, দুনিয়াতে কেবল এক সকাল কিংবা এক সন্ধ্যা সে অবস্থান করেছে। আল্লাহ বলেন, 

ويوم يخه أن يلبوساعة بين النهار يتعارفو بینقد 

بن يونس: 45 

خير الذين گوا بلقاء الله وماكا وأهتدين 

“আর যেদিন তাদেরকে সমবেত করা হবে, যেন তারা অবস্থান করেনি, তবে দিনের একদণ্ড। একজন অপরজনে চিনবে। নিঃসন্দেহে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যারা মিথ্যাপ্রতিপন্ন করেছে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতকে এবং সরলপথে আসেনি।” (সূরা ইউনুস-৪৫) অন্যত্র বলেন, 

و ويوم تقوم الساعة يقس المجرمون ما ليوا عير ساعة 

الروم: 55 | 

ذالك كانوا يؤفكون ( 

“যেদিন কেয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন অপরাধীরা কসম খেয়ে বলবে যে, এক মুহূর্তেরও বেশী অবস্থান করিনি। এমনিভাবে তারা সত্যবিমুখ হত।” (সূরা রূম-৫৫)। সেদিন কেউ কারো দিকে তাকাবে না। সবাই নিজের মুক্তির চিন্তায় বিভোর থাকবে। ব্যক্তি আপন ভাই থেকে পলায়ন। করবে। পিতা মাতা থেকে পলায়ন করবে। সাথী-সঙ্গী ও সন্তান থেকে পলায়ন করবে। আশ্রয়দাতাদের তাদের থেকে পলায়ন করবে। সকল মানুষ থেকে সে পলায়ন করবে.. বাঁচতে চাইবে। কেউ তাকে বাঁচাতে পারবে না। হায়.. কী ভয়াবহতা..! বন্ধু তার প্রিয়জনকে ভুলে যাবে। মা তার সন্তানকে ভুলে যাবে! 

আল্লাহ বলেন, 

وأمه وأبيه 

يوم يف المني من أخيه 

و إذا جاء الضائه 

يؤمي شأن يغنيه م که 

وصحبته وبنيه ت لكل آمري ممن 

 “অতঃপর যেদিন কর্ণবিদারক নাদ আসবে, সেদিন পলায়ন করবে মানুষ তার ভ্রাতার কাছ থেকে। তার মাতা, তার পিতা, তার পত্নী ও তার সন্তানদের কাছ থেকে। সেদিন প্রত্যেকেরই। | নিজের এক চিন্তা থাকবে, যা তাকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখবে।” 

(সূরা আবাসা ৩৩-৩৭)। অন্যত্র বলেন, 

ي وه و المجوه لويفتی من عذاب يومېز يبيه ي 

مياه ينجيه 

ولحبيه وأخيه وفصيليه لي ويه ومن في 

 “যদিও একে অপরকে দেখতে পাবে। সেদিন গোনাহগার ব্যক্তি পণস্বরূপ দিতে চাইবে তার সন্তান সন্ততিকে, তার স্ত্রীকে, তার ভ্রাতাকে। তার গোষ্ঠীকে, যারা তাকে আশ্রয় দিত এবং পৃথিবীর সবকিছুকে; তারপরও যেন তার রক্ষা হয়ে যায়।” (সূরা মাআরিজ ১১-১৪)। এ এক চরম ভয়াবহ ও কঠিন দিবস। আল্লাহ বলেন, 

يوما عبوسا قمطريراه الإنسان: ۱۰ 

“ভীতিপ্রদ ভয়ংকর দিন” (সূরা ইনসান-১০) 

* হাশরের প্রকারসমূহ

কেয়ামত সংঘটনকালে সকল সৃষ্টি দু’টি ভাগে বিভক্ত থাকবে। একভাগ যারা কবরে থাকবে। অপরভাগ যাদের উপর কেয়ামত সংঘটিত হবে এবং প্রথম ফুকার শুনে মৃত্যুমুখে পতিত হবে।। কেয়ামত আপতিত হবে নিকৃষ্টতর লোকদের উপর।কেননা এর পূর্বেই মুমিনদের রূহ কবজা করতে আল্লাহ তা’লা এক প্রকার শীতল সুবাতাস প্রেরণ করবেন। কুরআন-হাদিসের অসংখ্য বর্ণনায় হাশর প্রকৃতির বিস্তারিত বিবরণ এসেছে। আল্লাহ তা’লা এ বিষয়গুলোকে মানুষের ধারণার উপর ছেড়ে দেননি। 

সুতরাং হাশর দুপ্রকারঃ 

(১) জীবিতদের হাশর 

জীবিত সৃষ্টিকে শামে হাশরের ময়দানের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। আদন’ এলাকার গহ্বর থেকে উথিত এক বিশাল অগ্নি তাদেরকে হাশরের ময়দানের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবে। 

নবী করীম সা. বলেন, “কেয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না। তোমরা দশটি বৃহৎ নিদর্শন প্রত্যক্ষ কর। অতঃপর তিনি। বলছিলেন – 

এবং আদন থেকে উত্থিত বিশাল অগ্নি যা মানুষকে হাশরের ময়দানের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবে। মানুষ যেখানে রাত্রিযাপন। করবে, অগ্নিও সেখানে রাত্রিযাপন করবে। মানুষ যেখানে বিশ্রাম করবে, অগ্নিও সেখানে থেমে থাকবে।..” (মুসলিম-৭৪৬৮)

অপর বর্ণনায় নবী করীম সা. বলেন, “কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার প্রথম নিদর্শন হলো সেই অগ্নি যা মানুষকে প্রাচ্য থেকে। পাশ্চাত্যে নিয়ে যাবে।” (বুখারী-৩১৫১)। 

অন্যত্র নবীজী বলেন, “নিশ্চয় তোমাদেরকে সমবেত করা হবে, কেউ পদব্রজে আবার কেউ আরোহী হয়ে চলবে। আবার অনেককে চেহারার উপর টেনে হেঁচড়ে ওইদিকে নিয়ে যাওয়া হবে.. হাত দিয়ে শামের দিকে ইঙ্গিত করছিলেন।” (মুসনাদে 

আহমদ-২০০৪৩)

 মোটকথা, বিশাল সেই অগ্নি মানুষকে শামের নির্দিষ্ট একটি ময়দানের দিকে নিয়ে যাবে। সকলেই সেখানে সমবেত হবে। অতঃপর শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হলে সবাই মৃত্যুবরণ করবে। 

সর্বশেষ যাদের হাশর হবে। বিশাল সেই অগ্নির উত্থানকালে স্বাভাবিকভাবেই মানুষ নিজেদের কাজকর্মে ব্যস্ত থাকবে। জীবিকা উপার্জনে লিপ্ত থাকবে। আকস্মিক আগুন তাদের কাছে এসে উপনীত হবে। সর্বশেষ হাশরকৃত ব্যক্তি সম্পর্কেও নবী করীম সা. বলে গেছেনঃ 

 “সর্বশেষ হাশরকৃতরা হবে মুযাইনা গোত্রের দু’জন রাখাল। তারা চিৎকার করে ছাগলকে ডাকতে থাকবে। অতঃপর তারা ছাগলকে বন্যপশুর মতো পলায়নপর পাবে। অতঃপর তারা উত্তর দিকে যাত্রা শুরু করে ‘ছানিয়্যাতুল বিদায় এসে মাটিতে 

লুটিয়ে পড়বে।” (বুখারী) এই হলো প্রথম প্রকার মানুষের হাশর (সমাবেশ) 

(২) মৃতদের হাশর 

প্রথমবার শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হলে বিশ্বজগতের আমূল পরিবর্তন ঘটবে। অতঃপর কিছুকাল অতিবাহিত হবে। সেটি হবে ‘চল্লিশ’। অতঃপর আরশের নিম্নদেশ থেকে আল্লাহ এক প্রকার বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। সকল সৃষ্টি উৎপন্ন হতে থাকবে। অতঃপর যখন সকলের দেহ সম্পূর্ণরূপে পুনর্গঠিত হয়ে যাবে, তখন দ্বিতীয়বার শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে। ফলে সকলের দেহে প্রাণ ফিরে আসবে। তখন তাদেরকে হাশরের ময়দানের দিকে তাড়িয়ে নেয়া হবে। হাশরের ময়দানে তারা প্রথমবার শিঙ্গায় ফুক-দানকালে মৃত্যুবরণকারীদের সঙ্গে গিয়ে মিলিত হবে। 

সমাবেশের ধরণ

 সৃষ্টি অগণিত; মানুষ-জ্বিন, পশু-পাখি, মৎস্যকুল, ছোট-বড়, মুসলিম-কাফির.. নিঃসন্দেহে সকলকেই সমবেত করা হবে। আল্লাহ বলেন, 

به هود: 

وذالك يؤه مجموع له ألاش وذلك يوه مشهود 

“উহা এমন এক দিন, যেদিন সব মানুষই সমবেত হবে, সেদিনটি যে হাযিরের দিন।” (সূরা হূদ- ১০৩) অন্যত্র বলেন, 

که 

و قل إن الأولين والآخرين ( لمجموعون إلى ميقتي يوم معلوم 

 “বলুন, পূর্ববর্তী ও পরবর্তীগণ, সবাই একত্রিত হবে এক নির্দিষ্ট দিনের নির্দিষ্ট সময়ে। (সূরা ওয়াকিআ ৪৯,৫০) আল্লাহ তা’লা সকল কিছুর উপর ক্ষমতাবান। যেখানেই মানুষ মৃত্যুবরণ করুক, নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে জীবিত করে সকলের সাথে হাশর করাবেন। আল্লাহ বলেন, 

“যেখানেই তোমরা থাকবে, আল্লাহ অবশ্যই তোমাদেরকে সমবেত করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ববিষয়ে ক্ষমতাশীল।” (সূরা বাক্কারা-১৪৮) 

হাশরের প্রকারসমূহ আল্লাহ নিজেই কুরআনে বর্ণনা করেছেনঃ 

সকল সৃষ্টির হাশর

আল্লাহ বলেন, 

فيه الكهف: ۶۷ 

أحدا 

ف ادري 

وح 

“এবং আমি তাদের সকলকে একত্রিত করব অতঃপর তাদের কাউকে ছাড়ব না।” (সূরা কাহফ-৪৭) 

জীবজন্তু এবং প্রাণীকুলের হাশর 

আল্লাহ বলেন, 

وإذا الوحوش لحشرة التكوير:ه 

“যখন বন্য পশুরা একত্রিত হয়ে যাবে।” (সূরা তাকবীর-৫) অপরাধীদের হাশর

 অপরাধ চায় কুফরের সীমা অতিক্রম করুক বা না করুক। তাদের হাশর হবে অত্যন্ত কঠিন। নীল চক্ষু অবস্থায় তাদের সমবেত করা হবে। আল্লাহ বলেন, 

المجرمين يؤمرقاة طه: 102 

ويوم ينف في الصور و 

“সেদিন আমি অপরাধীদেরকে সমবেত করব নীল চক্ষু অবস্থায়।” (সূরা ত্বাহা-১০২)। 

জালেম অত্যাচারীদের হাশর

 ব্যভিচারীরা ব্যভিচারীদের সাথে আর সুদখোররা সুদখোরদের সাথে হাশর করবে। আল্লাহ বলেন, 

الصافات: 22 

آ وا الذين كو واژولجر وماكائواقبون ( 

“একত্রিত কর গোনাহগারদেরকে, তাদের দোসরদেরকে এবং যাদের এবাদত তারা করত।” (সূরা সাফফাত-২২)। এখানে “দোসরদেরকে বলতে তাদের সাদৃশ্যপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ। উদ্দেশ্য। 

প্রশ্নঃ চতুষ্পদ জন্তুদেরও কি হাশর হবে? 

উত্তরঃ হ্যাঁ.. অন্যান্য সৃষ্টির ন্যায় তাদেরও হাশর হবে। আল্লাহ বলেন, 

وما من دابة في الأرض و طب يطير يجتاحيه إلا أممم امتالكرما كافي الكتب من شئ ثم إلى ربه يخشون یه الأنعام: ۳۸ 

“আর যত প্রকার প্রাণী পৃথিবীতে বিচরণশীল রয়েছে এবং যত প্রকার পাখী দু’ডানাযোগে উড়ে বেড়ায় তারা সবাই তােমাদের মতোই একেকটি শ্ৰেণী। আমি কোনো কিছু লিখতে ছাড়িনি। অতঃপর সবাই স্বীয় প্রতিপালকের কাছে সমবেত হবে।” (সূরা আনআম-৩৮)। অন্য আয়াতে বলেন, 

ووين ، ایته خلق السموت والأرض وما بك فيهما من دابير وهوعلى 

الشوری: 29 | 

جوهر إذایش قدي ي 

“তাঁর এক নিদর্শন নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সৃষ্টি এবং এতদুভয়ের মধ্যে তিনি যেসব জীবজন্তু ছড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি যখন ইচ্ছা এগুলোকে একত্রিত করতে সক্ষম।” (সূরা শূরা-২৯) এখানে তাদের হাশর বলতে মানুষ ও জ্বিনদের মতো তাদের হিসাব-নিকাশ ও জান্নাত-জাহান্নাম প্রদান উদ্দেশ্য নয়; বরং তাদের পরস্পর সংঘটিত যাবতীয় অবিচারের কেসাস (প্রতিশোধ) গ্রহণ শেষে তাদের সকলকে মাটি হয়ে যেতে বলা 

হবে। 

নবী করীম সা. বলেন, “কেয়ামতের দিন সকলের হক পূর্ণরূপে আদায় করা হবে। এমনকি শিংবাহী যদি শিংবিহীন ছাগলকে গুঁতো দিয়ে কষ্ট দিয়ে থাকে, তবে কেয়ামতের দিন শিংবাহী ছাগল থেকে কেসাস নেয়া হবে।” (মুসলিম-৬৭৪৫)। 

প্রশ্ন, “আল ফাযাউল আকবার’ (চরম ভয়াবহতা) কী? C উত্তরঃ তা হলো পুনরুত্থানের পর মানুষের অন্তরে সৃষ্ট ভীতি। তবে সকর্মশীলদের কোনো ভয় থাকবে না। কারণ, কেয়ামতের এই দিনের জন্য পূর্বে থেকেই তারা প্রস্তুত ছিল। আল্লাহর সাক্ষাতের জন্য ব্যাকুল ছিল। আল্লাহ বলেন, 

ذلك اليوم ولقه 

فوقها 

ايوا عبوسا قمطريرا 

و إن تخاف من 

هو الإنسان: ۱۰ – ۱۲ 

وأجت ويا 

تر ورورا وكلهم بما 

“আমরা আমাদের পালনকর্তার তরফ থেকে এক ভীতিপ্রদ ভয়ংকর দিনের আশঙ্কা রাখি। অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে সেদিনের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন এবং তাদেরকে দিবেন সজীবতা ও আনন্দ। এবং তাদের সবরের প্রতিদানে তাদেরকে। দিবেন জান্নাত ও রেশমী পোশাক।” (সূরা ইনসান ১২-১২) 

 নবী করীম সা. বলেন, “আল্লাহ তা’লা বলেন, আমার মর্যাদার শপথ! অবশ্যই বান্দার ক্ষেত্রে আমি দুই ভয় অথবা দুই নিরাপদ-ভাবনা একত্রিত হতে দেব না। দুনিয়াতে যদি সে অভয়ে ও সুখ শান্তিতে জীবনযাপন করে, তবে আখেরাতে আমি তাকে ভয় ও বিপদে রাখব। আর যদি সে দুনিয়াতে আমার ভয়ে জীবনযাপন করে, তবে আখেরাতে তাকে আমি নিরাপদে রাখব।” (মুসনাদে শামিয়্যীন)। 

হাশরের ময়দানে নবী করীম সা. এর ঝাণ্ডা 

আল্লাহর পক্ষ থেকে শেষনবী মুহাম্মাদ সা. কে প্রদত্ত মর্যাদার বহিঃপ্রকাশ হলো, হাশরের ময়দানে তাঁর ঝাণ্ডাতলে সকল নবী রাসূল একত্রিত হবেন। তিনিই হবেন নবীদের সরদার। কেয়ামতের দিন প্রথম সুপারিশকারীও হবেন তিনি। 

নবী করীম সা. বলেন, “কেয়ামতের দিন আমি সকল নবীদের নেতা এবং তাদের মুখপাত্র হব, তাদের পক্ষ থেকে আমিই 

সুপারিশ করব; তবে এতে গর্বের কিছু নেই।” (তিরমিযী ৩৬১৩) প্রশংসার ঝাণ্ডা তাঁর হাতেই থাকবে। সকল নবী তাঁর পতাকাতলে অবস্থান করবেন। 

 নবী করীম সা. বলেন, “কেয়ামতের দিন আমি সকল আদমসন্তানের নেতা হব; এতে গর্বের কিছু নেই। প্রশংসার। ঝাণ্ডা আমার হাতেই থাকবে; এতে গর্বের কিছু নেই। আদম আ. সহ সকল নবী সেদিন আমার পতাকাতলেই অবস্থান করবেন; এতে গর্বের কিছু নেই। আমার কবর সর্বপ্রথম উন্মোচিত হবে; এতে গর্বের কিছু নেই।” (তিরমিযী-৩৬১৬) 

হাশরের ময়দানে মানুষের অবস্থা

 হাশরের দিনটি হবে সুদীর্ঘ, সুকঠিন ও চরম ভয়াবহ একটি দিন। সেখানে মানুষের অবস্থাও হবে বিভিন্ন রকম। এর বিবরণ দিতে গিয়ে নবী করীম সা. বলেন, 

ها 

و گما بدأت أول حتي يده وعدا علينا اۓ افيليين 

 “ওহে লোকসকল! তোমাদেরকে হাশরের ময়দানে নগ্নপদ, নগ্নদেহ ও খতনাবিহীন অবস্থায় একত্রিত করা হবে। অতঃপর তিনি নিম্নোক্ত আয়াত পাঠ করলেন, “যেভাবে আমি প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম, সেভাবে পুনরায় সৃষ্টি করব। আমার ওয়াদা নিশ্চিত, আমাকে তা পূর্ণ করতেই হবে।” (সূরা আম্বিয়া-১০৪) 

 প্রশ্ন, অপর হাদিসে এসেছে যে, মানুষ যে কাপড় পরে । মৃত্যুবরণ করেছে, কেয়ামতের দিন সে কাপড়েই তার উত্থান হবে। * আবু সাইদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি মৃত্যুর সময় নতুন কাপড় নিয়ে আসতে বললেন। নতুন কাপড় পরে বলতে লাগলেন, আমি নবী করীম সা. কে বলতে শুনেছি যে, নিশ্চয়। মৃতকে মৃত্যুকালে পরিহিত কাপড়েই পুনর্জীবিত করা হবে।” (বুখারী-মুসলিম) 

আর উপরের হাদিসে ‘নগ্নদেহ..’ বলা হয়েছে। এতদুভয়ের মাঝে সামঞ্জস্য বিধান কী করে সম্ভব? 

উত্তরঃ কবর থেকে যখন মানুষকে জীবিত উঠানো হবে, তখন তারা নগ্নদেহ থাকবে। কিন্তু যখন আল্লাহ তাদেরকে বস্ত্রাবৃত করতে চাইবেন, তখন মৃত্যুকালে পরিহিত কাপড় দিয়েই তাকে আবৃত করা হবে। কেউ কেউ বলেছেন, বস্ত্রাবৃত অবস্থায় পুনরুত্থানের হাদিসটি শহীদগণের জন্য নির্দিষ্ট। কারণ, নবী করীম সা, তাদেরকে শাহাদাকালে পরিহিত বস্ত্রসহ দাফন করতে বলেছেন। যাতে অন্যদের থেকে তারা সম্পূর্ণ পৃথক থাকে। 

প্রশ্ন, মানুষকে উলঙ্গ অবস্থায় পুনর্জীবিত করা হবে। 

একজন অন্যজনের দিকে তাকাবে কি? 

উত্তরঃ উপরোক্ত হাদিস শুনার পর আয়শা রা. জিজ্ঞেস করেছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল, তবে কি একজন অন্যজনের প্রতি দৃষ্টিপাত করবে না? উত্তরে নবীজী বলেছিলেন, হে আয়শা! পরিস্থিতি এত ভয়াবহ হবে যে, একজন অপরজনের দিকে তাকানোর সুযোগ থাকবে না।” (মুসলিম-৭৩৭৭)। অর্থাৎ পুনরুত্থান, হিসাব-নিকাশ ও পরিণামের চিন্তায় লোকেরা এত চিন্তিত থাকবে যে, একে অন্যের দিকে তাকানোর লিপ্সা পাবে না।। 

পরিস্থিতির ভয়াবহতা

 সেদিনে মানুষের অবস্থার বিবরণ নবী করীম সা. এভাবে দিয়েছেন, 

 “কেয়ামতের দিন সূর্যকে মানুষের নিকটবর্তী করা হবে। এমনকি সূর্য কেবল এক মাইল দূরে অবস্থান করবে। প্রচণ্ড গরমে ঘর্মাক্ত হয়ে মানুষ আমল 

অনুযায়ী ঘামের মধ্যে অবস্থান। করবে। কারো ঘাম জমাট হয়ে পায়ের গোছা পর্যন্ত চলে আসবে, কারো হাঁটু পর্যন্ত, কারো গলা পর্যন্ত, কেউ কেউ ঘামের মধ্যে সাঁতার কাটতে থাকবে।” (মুসলিম)  . 

 নবী করীম সা. বলেন, “কেয়ামতের দিন মানুষ ঘর্মাক্ত হয়ে যাবে। এমনকি কারো কারো ঘাম সত্তর গজ দূর পর্যন্ত চলে যাবে।কারো ঘাম কানের লতি পর্যন্ত জমাট হয়ে যাবে।” (বুখারী)। 

নবী করীম সা. বলেন, “কেউ কেউ ঘামের মধ্যে দাঁড়ালে ঘাম তার দুই কানের মধ্যস্থল পর্যন্ত পৌঁছে যাবে।” (বুখারী-৪৬৫৪)। 

 নবী করীম সা. বলেন, “কেয়ামতের দিন সূর্যকে নিকটবর্তী করা হবে। এমনকি তা কেবল এক মাইল বা দুই মাইল দূরে অবস্থান করবে। সূর্য দেহের চর্বি বিগলিত করে তাদেরকে প্রচণ্ড ঘর্মাক্ত করে তুলবে।” (তিরমিযী-২৪২১) 

* সেদিনে মুমিনদের অবস্থা। প্রচণ্ড ভয়ভীতি ও চরম উৎকণ্ঠার সেই দিনে মুমিনদের অবস্থা হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফেরেশতারা সেদিন তাদেরকে সান্ত্বনা দেবেন। তাদেরকে সন্তুষ্ট রাখবেন। আল্লাহ তা’লা বলেন, 

هذا 

الأكبر وتتلقه الملك 

الله 

نه وعدون (که الأنبياء: ۱۰۳ | 

ولايت يوكو الذی 

“মহাত্রাস তাদেরকে চিন্তান্বিত করবে না এবং ফেরেশতারা তাদেরকে অভ্যর্থনা জানাবে- আজ তোমাদের দিন, যে দিনের ওয়াদা তোমাদেরকে দেওয়া হয়েছিলো।” (সূরা আম্বিয়া-১০৩)। হ্যাঁ. সেদিন তারা নিশ্চিন্ত থাকবে, কারণ দুনিয়াতে তারা আপন। প্রতিপালককে ভয় করত। তাঁর সামনে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিত। আল্লাহ বলেন, 

و اخاف من بنايواكبوا قطريا به الإنسان: ۱۰ 

“আমরা আমাদের পালনকর্তার তরফ থেকে এক ভীতিপ্রদ ভয়ংকর দিনের আশঙ্কা রাখি।” (সূরা ইনসান-১০)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, 

و 

مأموني 

والذين هرين عذاب ربهم شفون ( إن عذاب بھر 

এবং যারা তাদের পালনকর্তার শাস্তির ভয়ে ভীত-কম্পিত, নিশ্চয় তাদের পালনকর্তার শাস্তি থেকে তারা নিঃশঙ্কা যায় না।” (সূরা মাআরিজ ২৭,২৮) অপর আয়াতে বলেন, 

ورايه الإنسان: ۱۱ 

لك اليوروله 

وفقه الله 

“অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে সেদিনের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন এবং তাদেরকে দিবেন সজীবতা ও আনন্দ।” (সূরা ইনসান-১১) 

 নবী করীম সা. বলেন, “আল্লাহ তা’লা বলেন, আমার মর্যাদার শপথ, অবশ্যই বান্দার ক্ষেত্রে আমি দুই ভয় অথবা দুই নিঃশঙ্কা একত্রিত করব না। দুনিয়াতে যদি সে আখেরাতের নিঃশঙ্কায় ও বেপরোয়া সুখ শান্তিতে জীবন যাপন করে, তবে আখেরাতে আমি তাকে ভয় ও বিপদে রাখব। আর যদি দুনিয়াতে আমার ভয়ে জীবন যাপন করে, তবে আখেরাতে আমি তাকে নিঃশঙ্কায় রাখব।” (মুসনাদে শামিয়্যীন) 

কাফেরদের হাশর প্রকৃতি নিজ নিজ আমল অনুযায়ী প্রত্যেককে হাশর করা হবে। মুমিনদের জন্য সহনীয় এবং কাফেরদের জন্য সেটি চরম অসহনীয় হবে। কোনো কোনো কাফেরকে চেহারায় টেনে হিচড়ে হাশরের ময়দানের দিকে সমবেত করা হবে। আল্লাহ বলেন, 

ووته يوم القمة على وجوههر يا كما وبما أنه 

ماځ زه سيرا (که الإسراء: ۹۷ 

جه 

“আমি কেয়ামতের দিন তাদের সমবেত করব তাদের মুখে ভর দিয়ে চলা অবস্থায়, অন্ধ অবস্থায়, মুক অবস্থায় এবং বধির অবস্থায়। তাদের আবাসস্থল জাহান্নাম। যখনই নির্বাপিত হওয়ার উপক্রম হবে আমি তখন তাদের জন্যে অগ্নি আরও বৃদ্ধি করে দিব।” (সূরা ইসরা-৯৭)। 

 আনাছ রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল- হে আল্লাহর নবী, কাফেরদেরকে উপুড় করে তাদের চেহারায় টেনে। সমবেত করা হবে? নবীজী বললেন, যে প্রতিপালক দুনিয়াতে তাকে দুই পায়ে হাটার ক্ষমতা দিয়েছিলেন, সেই প্রতিপালক কি আখেরাতে চেহারা দিয়ে হাটার ক্ষমতা দিতে পারেন না?” (বুখারী-৬১৫৮) পিপাসিত অবস্থায় তাদের হাশর হবে। আল্লাহ বলেন, 

وسوق المجريين إلى جهنم را که مریم: ۸۶ 

“এবং অপরাধীদেরকে পিপাসার্ত অবস্থায় জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাব।” (সূরা মারইয়াম-৮৬)। শাফাআতের হাদিসে নবী করীম সা, আল্লাহ ব্যতীত অন্যদের উপাসনাকারী কাফেরদের সম্পর্কে বলেন, 

অতঃপর তাদেরকে বলা হবে, তোমরা কী চাও! তারা বলবে, হে প্রতিপালক, আমরা তৃষ্ণার্ত, আমাদের পানি দিন। অতঃপর ইঙ্গিত করা হবে যে, তোমাদের জন্য আজ পানি পানেরও অনুমতি নেই। অতঃপর তাদেরকে জাহান্নামের দিকে একত্রিত করা হবে। মরীচিকা সদৃশ আগুনকে পানি মনে করে তারা দলে দলে জাহান্নামে নিপতিত হবে।” (মুসলিম-৪৭২)) 

সর্বপ্রথম বস্ত্রাবৃত ব্যক্তি সর্বপ্রথম বস্ত্রাবৃত হবেন ইবরাহীম আ.। যেমনটি নবীজী বলেছেন,“ওহে লোকসকল! নিশ্চয় তোমাদেরকে নগ্নপদ, নগ্নদেহ ও খাতনাবিহীন অবস্থায় সমবেত করা হবে। আল্লাহর বাণী- “ঠিক। যেমন প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম, সেভাবেই দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করব। এটা আমার ওয়াদা, আমাকে তা বাস্তবায়ন করতেই হবে।” জেনে রেখ, কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম বস্ত্রাবৃত হবেন ইবরাহীম আ.।” (বুখারী-৪৩৪৯) অতঃপর আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিনদেরকেও মর্যাদাপূর্ণ পোশাক পরানো হবে। আমল অনুপাতে তাদের জন্য স্তর নির্ধারণ করা হবে। 

সর্বপ্রথম যাকে ডাকা হবে। সর্বপ্রথম ডাকা হবে পিতা আদম আ. কে । 

নবী করীম সা. বলেন, “কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম ডাকা হবে পিতা আদমকে। তিনি নিজ সন্তানদেরকে দেখতে পাবেন। বলা 

হবে, ইনি হচ্ছেন তোমাদের পিতা আদম। তিনি বলবেন, জ্বি.. আমি উপস্থিত। অতঃপর আল্লাহ বলবেন, তুমি তোমার। সন্তানদের থেকে জাহান্নামের অধিবাসী বের কর। আদম বলবেন, হে প্রতিপালক, কতজন বের করব? প্রতিপালক বলবেন, প্রত্যেক একহাজার থেকে নয়শত নিরানব্বই জন। একথা শুনে সাহাবীগণ প্রচণ্ড ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, হে আল্লাহ রাসূল, একহাজার থেকে নয়শত নিরানব্বই বের হয়ে গেলে কতজনই বা অবশিষ্ট থাকবে?! নবীজী বললেন, সকল উম্মতের মধ্যে আমার উম্মত সেদিন কালো ষাঁড়ের দেহে একটি সাদা পশম সদৃশ হবে।” (বুখারী-৬১৬৪) 

হাশরের ভয়াবহতা হ্রাসকারী আমলসমূহ

 কেয়ামতের সেই মহাত্রাসময় আর প্রচণ্ড ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে মানুষ আশ্রয়স্থল খোঁজবে। পরিস্থিতি হালকা ও সহজ করার উপায় তালাশ করবে। নবী করীম সা. জান্নাত লাভের আমলের পাশাপাশি হাশরের পরিস্থিতি লাঘব হওয়ার আমলও বলে গেছেন।

 মুমিনের আমলসমূহ কয়েক প্রকারঃ

 কুরআন-হাদিসের বর্ণনানুযায়ী অনেক আমল আল্লাহর সামনে জবাবদিহিতা সহজ করে দেবে। আবার মুমিনগণও হবে একাধিক স্তরের। তন্মধ্যে.. 

T যাদেরকে আল্লাহ হাশরের সেই ভয়াবহ দিনে, অতি উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে আরশের ছায়াতলে আশ্রয় দেবেন। যেদিন মানুষ। প্রচণ্ড গরমে ঘর্মাক্ত হয়ে জমাট ঘামের মধ্যে সাঁতার কাটতে থাকবে। সাত ধরণের ব্যক্তিদেরকে আল্লাহ আরশের ছায়াতলে আশ্রয় দেবেন।

নবী করীম সা. বলেন, “যেদিন আল্লাহর ছায়া ব্যতীত কোন ছায়া থাকবে না, সেদিন সাত ধরণের ব্যক্তিকে আল্লাহ সেই ছায়াতলে স্থান দেবেনঃ ন্যায়পরায়ণ বাদশা, ওই যুবক যে আপন প্রতিপালকের এবাদতে বেড়ে উঠেছে, ওই ব্যক্তি যার অন্তর সদা মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত থাকে। ওই দু’জন যারা আল্লাহর জন্য পরস্পরকে ভালোবাসে, আল্লাহর ভালােবাসা অর্জনে একত্রিত হয় এবং পৃথক হয়, ওই ব্যক্তি যাকে সুন্দরী মর্যাদাশীল নারী অপকর্মের জন্য আহবান করলে সে বলে দেয় ‘আমি আল্লাহকে ভয় করি’, ওই ব্যক্তি যে অতিগোপনে সাদকা করে এমনকি তার বাম হাত জানে না ডানহাতে কী সাদকা করছে এবং ওই ব্যক্তি যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে অশ্রু ঝরায়।” (বুখারী-৬২৯)। 

আল্লাহর জন্য ভালোবাসা পোষণকারী যারা একে অন্যকে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ভালোবেসেছে; কোনো সৌন্দর্য, পদ কিংবা স্বার্থ উদ্ধারের জন্য নয়।

 নবী করীম সা. বলেন,

 “কেয়ামতের দিন আল্লাহ তা’লা বলবেন, আমার মর্যাদার খাতিরে ভালোবাসা পোষণকারীগণ কোথায়? আজ তাদের আমি আপন ছায়াতলে আশ্রয় দেব; আজ আমার ছায়া ব্যতীত কোন। ছায়া নেই।” (মুসলিম-৬৭১৩) 

অভাবীকে সুযোগ দানকারী ব্যবসায়ী

নবী করীম সা. বলেন, “যে ব্যক্তি অভাবীকে সুযোগ দিল অথবা তার প্রতি করুণা করল, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে নিজ ছায়াতলে আশ্রয় দেবেন।” (মুসলিম-৭৭০৪) 

 নবী করীম সা. বলেন, “যে ব্যক্তি ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির ঋণ লাঘব করল অথবা চুকিয়ে দিল, কেয়ামতের দিন সে আরশের ছায়াতলে স্থান পাবে।” (মুসনাদে আহমদ-২২৬১২) 

অভাবীর কষ্ট সহজকারী 

পূর্বেরটির ন্যায়। তারা হলো ঐ সকল ব্যবসায়ী যারা দরিদ্রদেরকে মাল দেয়, তবে টাকা পরিশোধে কোন চাপাচাপি করে না। তাদের কষ্ট বুঝে কিছু মাফ করে দেয়। কেয়ামতের দিন মানুষের অবস্থার বিবরণ দিতে গিয়ে নবী করীম সা. বলেন, “আল্লাহ যে বান্দাদের সম্পদ দিয়েছিলেন, তাদের থেকে একজনকে ডেকে নিয়ে এসে বলবেন, দুনিয়াতে তুমি কী আমল। করেছ? সে বলবে, আমি কিছুই করিনি হে প্রতিপালক; তবে আপনার দেয়া সম্পদ দিয়ে আমি ব্যবসা করেছি। আমার অভ্যাস। ছিল, দুঃখ কষ্টে জীবনযাপনকারী ব্যক্তিদের জন্য আমি সহজ করতাম। অভাবীদেরকে সুযোগ দিতাম। আল্লাহ তা’লা বলবেন, সহজ করার জন্য আমিই অধিক উপযুক্ত, আমার বান্দাকে ছেড়ে দাও! নবী করীম সা. বলেন, “এক ব্যক্তি কখনই কোন সৎকর্ম করেনি। তবে সে মানুষকে ঋণ দিত। উসুলকারীকে বলত, | সহজ হলে নিয়ে নিয়ো আর ব্যক্তির জন্য কঠিন হলে ছেড়ে দিয়ো এবং মাফ করে দিয়ো! হয়ত আল্লাহও একদিন আমাদেরকে মাফ করে দেবেন। অতঃপর মৃত্যুর পর জিজ্ঞাসিত হলো, তুমি কি কখনো সৎকর্ম করেছ? সে বলবে, ! তবে আমার এক ছেলে ছিল; আমি মানুষকে ঋণ দিতাম। যখনই ওই ছেলেকে ঋণ উসুল করতে পাঠাতাম, তখন বলতাম সহজ হলে নিয়ো কঠিন হলে ছেড়ে দিয়ো এবং মাফ করে দিয়ো; হয়ত আল্লাহও আমাদেরকে মাফ করে দেবেন। তখন আল্লাহ বলবেন, তোমাকে মাফ করে দিলাম।” (মুসনাদে আহমদ-৮৭১৫) 

অন্যের প্রয়োজনে দৌড়ঝাঁপকারী

আল্লাহ তা’লা দুনিয়াতে কাউকে সম্পদ দিয়েছেন, কাউকে অভাবী রেখেছেন। শক্তি-সামর্থ্য ও জ্ঞান বুদ্ধি সবক্ষেত্রেই আল্লাহ বান্দাদের মধ্যে কিছু ব্যবধান রেখেছেন। যাকে আল্লাহ সামর্থ্য দিয়েছেন অবশ্যই যেন সে সামর্থ্যানুযায়ী আরশের ছায়াতলে স্থান পেতে চেষ্টা করে যায়।

নবী করীম সা. বলেন, “যে ব্যক্তি দুনিয়াতে অপর মুসলিমের একটি বিপদ দূর করবে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তার উপর থেকে একটি বিপদ দূর করবেন। যে কষ্টপীড়িত ব্যক্তির জন্য সহজ করবে, দুনিয়া ও আখেরাতে আল্লাহ তার জন্য সহজ 

করবেন।যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের দোষ গোপন করবে, দুনিয়া ও আখেরাতে আল্লাহ তার দোষ গোপন করবেন। ব্যক্তি যতক্ষণ অপর ভাইয়ের সহযোগিতায়, ততক্ষণ আল্লাহ তার সহযোগিতায়..।” (তিরমিযী-১৯৩০) 

ন্যায়পরায়ণ শাসক

 ন্যায়পরায়ণতা এবং সুবিচার হলো মহান ব্যক্তিদের গুণ ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিদের শোভা। যে তা অবলম্বন করবে, নিঃসন্দেহে সে লাভবান হবে। পরকালে তার স্তর উন্নীত হবে। তার শসংখ্যা হ্রাস পাবে। বন্ধু-বান্ধব বেড়ে যাবে। পক্ষান্তরে অন্যায়-অবিচার হলো ইবলিস শয়তানের বৈশিষ্ট্য। যার কর্মীরা দুনিয়া ও আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্ত। ন্যায়পরায়ণ লোকদেরকে কেয়ামতের দিন আল্লাহ সম্পূর্ণ অনন্য মর্যাদায় ভূষিত করবেন। 

 নবী করীম সা. বলেন, “নিশ্চয় ন্যায়বিচারকগণ আল্লাহর কাছে। আলোকোজ্জ্বল মিম্বরগুলোতে দয়াময় প্রতিপালকের ডানদিকে উপবেশন করবে। প্রতিপালকের উভয় হাতই ডান। যারা তাদের বিচারকার্যে, পরিবারে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত শাসনকার্যে ন্যায়বিচার। করে।” (মুসলিম-৪৮২৫) 

যারা সুবিচার করে.. –

 মামলা মুকাদ্দামায় বিচারকার্যে – পরিবারে; স্ত্রী সন্তানের উপর জুলুম না করে। – কোন শাসনকাজের জন্য নিয়োগ হলে, যেমন রাষ্ট্রপ্রধান, মন্ত্রী, বোর্ড প্রধান, সভাপতি অথবা মাদরাসা/স্কুলের অধ্যাপকের দায়িত্বে ন্যায়পন্থা অবলম্বন করে এবং যথাযথ দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকে। তারা যদি তাদের নিজ নিজ দায়িত্বে সৎ ও নিষ্ঠাবান হয়, কোনোরূপ অন্যায়-অবিচার না করে সঠিকভাবে আদায় করে, অবশ্যই তাদেরকে আল্লাহ কেয়ামতের দিন আলোকোজ্জ্বল মিম্বরসমূহে বসাবেন। 

ক্রোধ সংবরণকারী গোস্বা বা রাগ হলো একটি নিন্দনীয় স্বভাব, যার পরিণতি 

অশুভ। একব্যক্তি নবী করীম সা. এর কাছে বারবার উপদেশ প্রার্থনা করলে প্রতিবারই তিনি 

“রাগান্বিত হয়ো না.. রাগান্বিত হয়ো না” বলছিলেন। কারণ, তিনি জানতেন রাগের পরিণতি কতটা ভয়াবহ! ক্রোধ কত যুগলকে পৃথক করে দিয়েছে। কত মানুষের জীবন নিয়ে নিয়েছে। কত ঝগড়া তৈরির উৎস হয়েছে। প্রকৃত 

বীরপুরুষ সেই যে ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করে নিতে পারে। 

নবী করীম সা. বলেন, “বীরত্ব কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে নয়; প্রকৃত বীরত্ব গোস্বাকালে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখায়।” (বুখারী-৫৭৬৩)। ক্রোধ সংবরণকারী এবং রাগ নিয়ন্ত্রণকারীদেরকে আল্লাহ কেয়ামতের দিন পুরস্কৃত করবেন। নবী করীম সা. বলেন, “প্রতিশোধে সক্ষম থাকা সত্ত্বেও যে ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করল, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে সকল সৃষ্টির সামনে আহবান করবেন। জান্নাতের হুরদের থেকে তাকে নির্বাচন করে গ্রহণ করতে বলবেন।” (তিরমিযী-২০২১)। 

মুয়াযযিনবৃন্দ 

নামাযের জন্য আহবান করা একটি এবাদত। মানুষ যদি আযানের মর্যাদা জানত, অবশ্যই তাতে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হত। 

কেন নয়; সে তো তাওহীদের কালেমার আঁওয়াজ উঁচু করছে। স্বজোরে তার ঘোষণা দিচ্ছে। 

নবী করীম সা. বলেন, “কেয়ামতের দিন মুয়াযযিনবৃন্দের গ্রীবাগুলো সবচেয়ে লম্বা হবে।” (মুসলিম)।

 গ্রীবা লম্বা হওয়া এক প্রকার সৌন্দর্যের প্রতীক হবে সেদিন। কেয়ামতের দিন মুয়াযযিনের জন্য তার আওয়াজ শ্রবণকারী প্রতিটি তার জন্য সাক্ষ্য দেবে।  আবু সাইদ খুদরী রা, একদা আব্দুর রহমান বিন সা’সা রা. কে বললেন, আমি দেখছি তুমি ছাগল ও গ্রাম পছন্দ কর। সুতরাং যখন তুমি তোমার ছাগলদের সাথে অথবা গ্রামে থাকবে, তখন নামাযের জন্য উঁচু আওয়াজে আযান দিয়ো। কারণ, তোমার আযাদের ধ্বনি যত জ্বিন-ইনসান, জীব-জন্তু, গাছ-পালা, মরু প্রান্তর ও কীটপতঙ্গ শুনতে পাবে; সকলেই তোমার জন্য কেয়ামতের দিন সাক্ষ্য দেবে।” (বুখারী-৩১২২)। 

যারা ইসলামের উপর বৃদ্ধ হবে।

ইসলামের উপর অবিচল থাকা এবং ইসলাম নিয়ে মৃত্যুবরণ করা এক পরম সৌভাগ্য। আল্লাহ বলেন, 

ويأيها الذين آمنوا اتقوا الله حق تقاته 

به آل 

وأنت ممنون 

وتموت 

عمران: ۱۰۴ 

“হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিৎ ঠিক তেমন ভয় করতে থাক এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো ।” (সূরা আলে ইমরান-১০২)

 পাশাপাশি আল্লাহ আদেশ করেছেন বয়োবৃদ্ধকে সম্মান করতে এবং বার্ধক্যের মর্যাদা দিতে। 

 নবী করীম সা. বলেন, “যে যুবক কোনো বৃদ্ধকে বয়সের খাতিরে সম্মান করবে, আল্লাহ তা’লা তার বার্ধক্যের সময়েও একজন সম্মানকারী ঠিক করে দেবেন।” (তিরমিযী-২০২২)। 

নবী করীম সা. বলেন, “কোন বয়স্ক মুসলিম, কুরআনের বাহক (যে কুরআনকে সঠিক মর্যাদা দিয়েছে, কোনোরূপ ত্রুটি করেনি) এবং ন্যায়পরায়ণ শাসককে সম্মান দেখানোর অর্থ আল্লাহকে সম্মান দেখানো।” (আবু দাউদ-৪৮৪৫)। বয়স্ক মুসলিমকে কেয়ামতের দিন আল্লাহ সম্মানিত করবেন। 

 নবী করীম সা. বলেন, “ইসলাম নিয়ে যে ব্যক্তি বয়োবৃদ্ধ হলো, কেয়ামতের দিন বার্ধক্য তার জন্য নূর হবে।” (তিরমিযী-১৬৩৪)। 

অযুকারী

 অযু হলো নামায ও কুরআন তেলাওয়াতের চাবিকাঠি। অনেক এবাদত রয়েছে যেগুলো অযু ব্যতীত আদায় করা যায় না। অযু হলো মুসলিমদের প্রতীক। অযুকারীগণ কেয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর মুহূর্তে অযুর অঙ্গগুলো আলোকোজ্জ্বল দেখতে পাবে।  নবী করীম সা. বলেন, “নিশ্চয় আমার উম্মতকে কেয়ামতের দিন আহ্বান করা হবে। তাদের অযুর অঙ্গগুলো উজ্জ্বল ও শুভ্র থাকবে।” (বুখারী-১৩৬) 

 নবী করীম সা. বলেন, “মুমিনের সৌন্দর্য সেসকল অঙ্গ পর্যন্ত। পৌঁছুবে, যেগুলো অযুর সময় ধৌত করা হয়।” (মুসলিম-২৫০)। কেয়ামতের দিন যখন সকল সৃষ্টি জমায়েত হবে, সকল জাতির মহাসমাবেশ ঘটবে, নবী করীম সা. সেদিন স্বীয় উম্মতকে তাদের অযুর অঙ্গগুলোর উজ্জ্বলতা ও শুভ্রতা দেখে চিনে নেবেন। – 

নবী করীম সা. বলেন, “কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম আমিই সেজদার অনুমতি পাব। সর্বপ্রথম আমাকেই মাথা উঠাতে বলা হবে।অতঃপর আমি সামনের দিকে তাকাব। সকল উম্মতের। মাঝে আমি আমার উম্মতকে চিনে নেব। আমার পেছনে, আমার ডানে, আমার বামেও এরূপ থাকবে। একজন জিজ্ঞেস করল, এতসব উম্মতের ভিড়ে আপনি আপনার উম্মতকে কী করে চিনবেন? উত্তরে নবীজী বললেন, অযুর অঙ্গগুলোর শুভ্রতা ও উজ্জ্বলতা দেখে তাদের চিনে নেব।” (মুসনাদে আহমদ-২১৭৩৭)। 

কুরআনের সঙ্গী

 আল-কুরআন হলো দুনিয়ায় সম্মান ও আখেরাতে মুক্তির উপায়। দিনরাত যে ব্যক্তি কুরআন নিয়ে লিপ্ত থাকবে, কুরআন হিফজ করবে, কুরআন নিয়ে গবেষণা করবে- অলস এবং অবহেলাকারী কোনক্রমেই তার স্তরে উপনীত হতে পারবে না।। সূরা বাক্কারা ও সূরা আলে ইমরান পাঠকারীদের প্রশংসা করতে গিয়ে নবী করীম সা. বলেন, 

“তোমরা অধিক পরিমাণে কুরআন পড়, কেননা কেয়ামতের দিন সে তার সাথীদের জন্য সুপারিশকারী হবে। উজ্জ্বলদ্বয়- সূরা বাক্কারা ও আলে ইমরান পাঠ কর।কারন কেয়ামতের দিন এ দুটো তার পাঠকারীদের জন্য ছায়া হয়ে আসবে। মনে হবে দু’টো মেঘমালা। এ যেন দু’টো স্বচ্ছ পাখির বহর। কেয়ামতের দিন তারা পাঠকারীদের পক্ষে প্রমাণ পেশ করবে। তোমরা সূরা বাক্কারা পাঠ কর! কারণ তা কল্যাণময়। এতে অবহেলা পরিতাপের বিষয়। অনিষ্টকারীগণ এর পাঠককে কোন ক্ষতি করতে পারে না।” (মুস্তাদরাকে হাকিম-২০৭১)। * 

 নবী করীম সা. বলেন, “কেয়ামতের দিন কুরআনের সঙ্গী আল্লাহর কাছে আসলে কুরআন বলবে, হে প্রতিপালক, তাঁকে। শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটে সজ্জিত করুন! অতঃপর তাকে তা পরানো হবে। কুরআন বলবে, হে পালনকর্তা, আরো বেশী সজ্জিত করুন! ফলে তাকে শ্রেষ্ঠত্বের অলংকার পরানো হবে। কুরআন বলবে, হে আল্লাহ, তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন! পালনকর্তা সন্তুষ্ট হবেন। অতঃপর বলা হবে, পড় এবং উন্নীত হও! প্রতিটি আয়াতের বিনিময়ে তোমাকে প্রতিফল দেয়া হবে।” (তিরমিযী ২৯১৫) 

দানশীল ব্যক্তিবর্গ। 

যাদেরকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন এবং যারা গরীব দুঃখীদের সহযোগিতা করে, তাদের খোঁজখবর নেয়, অত্যাচারিতের পাশে। দাঁড়ায়, অভাবীর অভাব পূরণ করে, বিপদগ্রস্তদের বিপদ দূর করে এবং দুর্দশাগ্রস্তদের দুর্দশা লাঘব করে, কেয়ামতের দিন আল্লাহও তাদের বিপদ দূর করে দেবেন। 

নবী করীম সা. বলেন, “যে ব্যক্তি দুনিয়াতে অপর মুসলিমের একটি বিপদ দূর করবে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তার উপর থেকে একটি বিপদ দূর করবেন। যে কষ্টপীড়িত ব্যক্তির জন্য সহজ করবে, দুনিয়া ও আখেরাতে আল্লাহ তার জন্য সহজ করবেন। যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের দোষ গোপন করবে, দুনিয়া 

ও আখেরাতে আল্লাহ তার দোষ গোপন করবেন। ব্যক্তি যতক্ষণ অপর ভাইয়ের সহযোগিতায়, ততক্ষণ আল্লাহ তার সহযোগিতায়..।” (তিরমিযী-২২৫)। 

দুর্বলদের সহায়। আল্লাহ তা’লা মানুষকে বিভিন্ন স্তরে সৃষ্টি করেছেন; কাউকে ধনী কাউকে গরিব। কখনো বিত্তশালীরা দুর্বলদের উপর চড়াও হয়, তাদের অধিকার হরণ করে অথবা তাদেরকে দৈহিক বা মানসিক কষ্ট দেয়। তবে অনেক মুমিন বিত্তবান এমন, যারা দুর্বলদের সহায়তা করে, তাদের অধিকার যথাসময়ে বুঝিয়ে দেয়। নবী করীম সা, তাদেরকে সুসংবাদ দিয়ে বলেন, 

 “গোপনে যে ব্যক্তি অপর ভাইয়ের সহযোগিতা করল, দুনিয়া ও আখেরাতে আল্লাহও তাকে সহযোগিতা করবেন।” তাবারানী ৩৩৭) 

পরিশেষে..

 এই হলো কেয়ামতের দিন মুমিন মুত্তাকীদের কতিপয় অবস্থার বিবরণ। সেদিন তো কোনো সম্পদ, মর্যাদা বা সন্তান তার কোনো উপকারে আসবে না। তবে যে স্বচ্ছ হৃদয় নিয়ে আল্লাহর কাছে আসবে; যে হৃদয় যা শিরক, প্রতারণা ও বিদ্বেষ থেকে পবিত্র আর ঈমান, সততা ও তাকওয়ায় ভরপুর থাকে। 

* কেয়ামতের দিন অপরাধীদের অবস্থা 

যারা তাওহীদের বিশ্বাস ও শিরক থেকে মুক্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে ঠিকই, তবে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ছিল; বড় গুনাহ। হোক বা ছোট গুনাহ। তারা আল্লাহর ইচ্ছার অধীন; হতে পারে আল্লাহ শাস্তি দেবেন বা তাদের মাফ করে দেবেন। হাশরের ময়দানে অপরাধীদের অবস্থা সম্পর্কে অসংখ্য হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তাদের অবস্থা হবে অনেক রকম। হাদিসে দুঃসংবাদও এসেছে আবার সুসংবাদও বর্ণিত হয়েছে। নবী করীম সা. এমন কিছু কাজ থেকে সতর্ক করে গেছেন, যার দরুন হাশরের ময়দানে কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে। তন্মধ্যে, 

যাকাত প্রদানে অবহেলা সেদিন তারা থাকবে মহাবিপদে। কারণ সম্পদে আল্লাহর অংশকে তারা আবদ্ধ রেখেছে। গরিব দুঃখী মানুষের অধিকার লুট করেছে।

الله من فضله وياله 

و ولايحسبن الذين يبخلون بماء ان 

ابوابه يوه آل عمران: ۱۸۰ 

بل هو الوسيط 

নবী করীম সা. বলেন, “যাকে আল্লাহ সম্পদ দেয়ার পরও সে তার যাকাত আদায় করেনি, কেয়ামতের দিন তার সম্পদকে দু’টি ভয়ানক দাঁতবাহী অতি-দংশনকারী বিশাল সাপের আকৃতিতে তার গলায় পেঁচিয়ে দেয়া হবে। সে বলবে, আমিই তোমার সেই সম্পদ, তোমার রত্নভাণ্ডার..। (বুখারী-৪২৮৯) এ কথা বলে নবীজী এই আয়াত পাঠ করলেন, (অর্থ- আল্লাহ তাদেরকে নিজের অনুগ্রহে যা দান করেছেন তাতে যারা কৃপণতা করে, এই কার্পন্য তাদের জন্য মঙ্গলকর হবে বলে তারা যেন ধারণা না করে। বরং এটা তাদের পক্ষে একান্তই ক্ষতিকর প্রতিপন্ন হবে। যেগুলোতে তারা কার্পণ্য করে। সেসকল ধন-সম্পদকে কিয়ামতের দিন তাদের গলায় বেড়ী বানিয়ে পরানাে হবে। অন্য আয়াতে বলেন, 

و ولذين ي رون الهب والفضة ولا يفوتها في 

يوم يحمل عليها في نار 

سبيل الل؛ فبرهم بعذاب أليو 

ف ویل بھاجباهه وجوه وظهورهم هذا ما 

جه 

التوبة: ۳۶ 

ژم لأفيكو وأماكن تكون ( 

| ০ – “আর যারা স্বর্ণ ও রূপা জমা করে রাখে এবং তা ব্যয় করে না আল্লাহর পথে, তাদেরকে কঠোর আযাবের সুসংবাদ শুনিয়ে দিন! সেদিন জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তার দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশকে দগ্ধ করা হবে (সেদিন বলা হবে) এগুলো হলো যা তোমরা নিজেদের জন্যে জমা রেখেছিলে, সুতরাং এক্ষণে আস্বাদ গ্রহণ কর জমা করে। রাখার।” (সূরা তাওবা ৩৪,৩৫) 

 নবী করীম সা. বলেন, “ওই সকল স্বর্ণ রূপার অধিকারী ব্যক্তি যারা সম্পদের অধিকার আদায় করেনি, কেয়ামতের দিন তাদের সম্পদকে আগুনে। নিক্ষেপ করা হবে। অতঃপর সেগুলো আগুনে রূপান্তরিত হলে ঐ ব্যক্তিকে সে আগুনের মধ্যে নিক্ষেপ করা হবে। ফলে। তার ললাট, তার পার্শ্ব, তার পিঠ দগ্ধ হয়ে যাবে। যখনই কিছু শিথিল হবে, তখনই পুনরায় উত্তপ্ত করে দেয়া হবে। সেদিনের দৈর্ঘ্য হবে পঞ্চাশ হাজার বছর। শেষপর্যন্ত মানুষের বিচারকার্য শেষ হলে তাদেরকে তাদের গন্তব্য বলে দেয়া হবে। হয়ত 

জান্নাত নয়ত জাহান্নামের দিকে। জিজ্ঞেস করা হলো, তবে যদি উটের ক্ষেত্রে হক আদায় না করে? বললেন, হ্যাঁ.. উটের ক্ষেত্রেও যদি হক আদায় না করে তবেও। উটের ক্ষেত্রে হক হলো, সাদাকার। দিন গরিব মিসকীনদেরকে তার দুধ দান করা। যদি না করে, তবে কেয়ামতের দিন ঐ উটকে পুরো রিষ্ট-পোষ্ট আকারে একটি প্রশস্ত ময়দানে তার চেহারার। উপর নিক্ষেপ করা হবে।উট তাকে পায়ের গোড়া দিয়ে আঘাত করবে এবং মুখের দাঁত দিয়ে তাকে কামড়াবে। সকল উটকেই এভাবে তার উপর নিক্ষেপ করা হবে। কোনো ছোট উট থেকেও সে রেহাই পাবে না। যখনই সবকটির পালা শেষ হবে, তখনই প্রথমটি থেকে পুনরায় শাস্তি শুরু হবে। সেদিনের দৈর্ঘ্য হবে পঞ্চাশ হাজার বছর।শেষপর্যন্ত মানুষের বিচারকার্য শেষ হলে তাদেরকে তাদের গন্তব্য বলে দেয়া হবে। হয়ত জান্নাত নয়ত জাহান্নামের দিকে। 

জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল, গরু এবং ছাগলের 

ক্ষেত্রে যদি আদায় না করে? বললেন, “যতগুলো গরু এবং ছাগলের হক সে আদায় করেনি, কেয়ামতের দিন এগুলোকেও এক প্রশস্ত ময়দানে ব্যক্তির চেহারায় নিক্ষেপ করা হবে। দুনিয়াতে যেগুলো শিংবাহী ছিল, শিংবিহীন ছিল, রোগাক্রান্ত (অর্ধশিংবিশিষ্ট) ছিল; কেয়ামতের দিন সেগুলো পূর্ণ শিং নিয়ে উঠবে এবং ওই ব্যক্তিকে ধারালো শিং দিয়ে আহত করতে থাকবে ও পায়ের গোড়া দিয়ে আঘাত করতে থাকবে। সেদিনের দৈর্ঘ্য হবে পঞ্চাশ হাজার বছর। 

শেষপর্যন্ত মানুষের বিচারকার্য শেষ হলে তাদের গন্তব্য বলে দেয়া হবে। হয়ত জান্নাত নয়ত জাহান্নামের দিকে।” (মুসনাদে 

আহমদ-৭৫৬৩) 

অহংকার করা।

 অহংকার হলো এক ধ্বংসাত্মক ব্যাধি। অহংকারীদেরকে আল্লাহ পছন্দ করেন না। তাদের স্তর উন্নীত করেন না; বরং যার অন্তরে বিন্দু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে 

প্রবেশ করতে পারবে না। অহংকারী থেকে মানুষ দূরে থাকে। জ্ঞানীগণ তাদেরকে অপছন্দ করেন। ছোট বড় সকলেই তাদেরকে ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখে। কেয়ামতের দিন তাদের অবস্থা সম্পর্কে নবীজী 

বলেন, 

 “অহংকারীদেরকে কেয়ামতের দিন পুরুষের আকৃতিতে পিঁপড়ার। মতো ছোট করে উঠানো হবে। সকলেই তাদেরকে পায়ের নিচে পিষতে থাকবে। এভাবে সর্বত্রই তারা লাঞ্ছিত হতে থাকবে।” (তিরমিযী-২৪৯২)। 

* যে সব অপরাধীদের সঙ্গে আল্লাহ কথা বলবেন না।

 হ্যাঁ.. কতিপয় অপরাধী এমন থাকবে, তাদের কৃতকর্মের দরুন আল্লাহ তাদের সাথে কথা বলবেন না। কেয়ামতের সর্বনিকৃষ্ট শাস্তিদের মধ্যে এটা হবে অন্যতম। অতি লাঞ্ছিত হওয়ায় তাদের কোনো মূল্যায়ন থাকবে না। এদের কারো কারো সম্পর্কে আল্লাহ কুরআনে বলেছেন। নবী করীম সা.ও হাদিসের মধ্যে এদের কার্যকলাপ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। 

(১) পাদ্রী, আলেম ও ধর্মীয় পণ্ডিত।

 যারা দুনিয়ার তুচ্ছ লাভ অথবা পর-সন্তুষ্টির আশায় শরীয়তের জ্ঞান লুকিয়ে রাখত। জেনে-বুঝে সত্য গোপন করত। আল্লাহ বলেন, 

و إضى الذين يكتمون ما أنزل الله من الكتب ويشترون پوء ثمنا قليلا أوليك ما يألو في بطونهم إلا التيار ولا 

هه له يوم القيمة ولا يزيه وله عذاب أليه 

“নিশ্চয় যারা সেসব বিষয়। গোপন করে, যা আল্লাহ কিতাবে নাযিল করেছেন এবং সেজন্য অল্প মূল্য গ্রহণ করে, তারা আগুন ছাড়া নিজের পেটে আর কিছুই ঢুকায় না। আর আল্লাহ কেয়ামতের দিন তাদের সাথে কথা বলবেন না, তাদের পবিত্র করা হবে না । বস্তুত তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি।” (সূরা বাক্বারা ১৪৭) অপর আয়াতে বলেন, 

و إضى الذين يشوت بعهد ال؛ وأنهمثمنا قليلا أليك لا خلق لهم في اخرۃ ولا يكلمه الله ولا ينظر إليه يوم القيمة 

که آل عمران: ۷۷ 

يهرولهعذاب ألي 

ولايز 

“যারা আল্লাহর নামে কৃত অঙ্গীকার এবং প্রতিজ্ঞা সামান্য মূল্যে বিক্রয় করে, আখেরাতে তাদের কোনো অংশ নেই। আর তাদের সাথে কেয়ামতের দিন আল্লাহ কথা বলবেন না। তাদের প্রতি (করুণার) দৃষ্টিও দেবেন না। আর তাদের পরিশুদ্ধও করবেন। না। বস্তুত তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” (সূরা আলে ইমরান-৭৭) 

(২) গোছার নীচে বস্ত্র পরিধানকারী

 গোছা বা টাখনার নীচ পর্যন্ত বস্ত্র পরিধান সম্পর্কে নবীজী বলেন, 

 “লুঙ্গি (পাজামা/প্যান্ট) এর অংশ যতটুকু দুই গোছার নীচে থাকবে, ততটুকু অঙ্গ। জাহান্নামে যাবে।” (মুসনাদে আহমদ-১২০৬৪) 

(৩) মিথ্যা শপথ করে সম্পদ বিক্রেতা

 কথায় কথায় শপথ করা নিন্দনীয়। আল্লাহ বলেন, 

ووافوا أمره المائدة: ۸۹ 

“তোমরা তোমাদের শপথগুলো রক্ষা কর!” (সূরা মায়িদা-৮৯) উপরন্তু শপথকারী যদি মিথ্যুক হয়, তবে অপরাধের মাত্রাও বেড়ে যাবে। মিথ্যা শপথ করে পণ্য বিক্রেতা মহামিথুক সাব্যস্ত হবে। 

(৪) উপকার করে খোটা-দানকারী

আবু যর রা. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সা. বলেন, “তিন ধরণের ব্যক্তিদের সাথে কেয়ামতের দিন আল্লাহ কথা বলবেন না। তাদের দিতে তাকাবেন না। তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন না। তাদের জন্য থাকবে যন্ত্রণার শাস্তি। বললাম, হতভাগা আর ক্ষতিগ্রস্ত এরা কারা হে আল্লাহর রাসূল? নবীজী তিনবার উপরের কথাগুলো বললেন। চতুর্থবার বলতে লাগলেন, গোছার নীচে বস্ত্র পরিধানকারী, মিথ্যা শপথ করে মাল বিক্রয়কারী এবং উপকারান্তে খোটা প্রদানকারী।” (মুসনাদে 

আহমদ-২১৩১৮) 

(৫) পানি নিয়ে কৃপণতাকারী

 কৃপণতা একটি নিন্দনীয় অভ্যাস, যা ব্যক্তির নীচু প্রকৃতি ও দুর্বল মনের পরিচয় প্রকাশ করে। আর যদি কার্পণ্য পানি নিয়ে হয়, যা দান করলে তার কোনো ক্ষতি হবে 

, সম্পদ কমে যাবে না; অন্যদিকে পানির জন্য মানুষের হাহাকার..। নবী করীম সা. পানির ক্ষেত্রে সর্বসাধারণ অংশীদার বলেছেন। 

(৬) প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী 

ইসলামে প্রতিশ্রুতি এবং চুক্তির গুরুত্ব অপরিসীম। প্রতিশ্রুতি নিয়ে খেলা করা বা বাহানা করার পরিণতি ভয়াবহ। 

নবী করীম সা. বলেন, “তিন ধরণের ব্যক্তিদের সাথে কেয়ামতের দিন আল্লাহ কথা বলবেন না, তাদের দিকে দৃষ্টি দিবেন না, তাদেরকে পরিশুদ্ধও করবেন না এবং তাদের জন্য থাকবে কঠিন শাস্তি; ওই ব্যক্তি যে পথচারীকে তার উচ্ছিষ্ট পানি থেকে বঞ্চিত করল, ওই ব্যক্তি যে আসরের পর (দিনের শেষভাগে) মাল। বিক্রিতে মিথ্যা-শপথ করল এবং ওই ব্যক্তি যে কোনো নেতার হাতে বায়আত হলো, নেতা তাকে কিছু দিলে বায়আত পূর্ণ করবে, আর না দিলে পূর্ণ করবে না।” (মুসনাদে আহমদ ৭৪৪২) 

(৭) বৃদ্ধ ব্যভিচারী 

অনেক দুশ্চরিত্র মানুষ আছে যাদের গুনাহ করার ক্ষমতা নেই, তারপরও পুরোনো অভ্যাস অনুযায়ী তারা গুনাহে লিপ্ত হয়। যেমন, কোনো বয়স্ক লোক যার হাড় দুর্বল হয়ে গেছে, মনোবৃত্তি হ্রাস পেয়ে গেছে, উপরন্তু সে যদি ব্যাভিচারে লিপ্ত হয়, তবে নিঃসন্দেহে তার পরিণতি ঐ যুবকের চেয়ে কঠিন হবে যে তাওবা করেও গুনাহে লিপ্ত হয়ে যায় এবং আবার তাওবা করে। তবে ‘যিনা’ নিঃসন্দেহে একটি কবীরা গুনাহ। যুবক-বৃদ্ধ, পুরুষ মহিলা সকলের ক্ষেত্রেই তার বিধান সমান।। 

(৮) মিথুক শাসক

 কারণ, সে নিজের মর্যাদা বৃদ্ধির আশায় মানুষের সামনে মিথ্যা। কল্পকাহিনী প্রচার করে। জনসমর্থন আদায়ের জন্য উপকথা বলে বেড়ায় এবং মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয়। এর মাধ্যমে এটা উদ্দেশ্য নয় যে, শাসক ব্যতীত অন্যদের জন্য মিথ্যা বৈধ। বরং সকলের জন্যই শাস্তি বরাবর। তবে অন্যদের তুলনায় শাসকের শাস্তি অধিক হবে। জেনে রাখবেন, মিথ্যা পাপাচার ডেকে আনে আর পাপাচার জাহান্নামের দিকে নিয়ে। 

যায়। 

(৯) অহংকারী ফকির 

জীর্ণবস্ত্র পরিহিত দরিদ্র ব্যক্তি, যার। ঘরে এক বেলা খাবার নেই, থাকার জন্য ভালো কোনো আবাস নেই, চলাফেরার জন্য কোনো যানবাহন নেই; সে যদি মানুষের সামনে অহংকার করে, অপরকে ছোট মনে করে, সত্যকে অস্বীকার করে, গোঁড়ামি করে এবং দম্ভভরে চলাফেরা করে, তবে অবশ্যই তার শাস্তি হবে দ্বিগুণ। তবে অহংকার একটি অতিঘৃণ্য অপরাধ; তা বিত্তবানদের থেকে প্রকাশ হোক বা দরিদ্রদের থেকে।

 নবী করীম সা. বলেন, “তিন ধরণের ব্যক্তিদের সঙ্গে কেয়ামতের দিন আল্লাহ কথা বলবেন না, তাদের পরিশুদ্ধ করবেন না এবং তাদের দিকে ফিরেও তাকাবেন না আর তাদের জন্য থাকবে বেদনাদায়ক শাস্তি; বয়স্ক ব্যভিচারী, মিথ্যাবাদী শাসক এবং অহংকারী দরিদ্র।” (মুসনাদে আহমদ-১০২২৭)। 

* যে সব অপরাধীদের দিকে আল্লাহ দৃষ্টি দিবেন না। কেয়ামতের দিন কিছু লোকদের সঙ্গে আল্লাহ কথা বলবেন না। আবার কতিপয় ব্যক্তিদের প্রতি আল্লাহ তাকাবেন না। এটা হবে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের জন্য চরম লাঞ্ছনা। নবী করীম সা. এমন কিছু অপরাধের কথা বলে গেছেন, যেগুলোর দরুন বান্দা আল্লাহর দৃষ্টি থেকে বঞ্চিত থাকবে। আর কেউ যদি আল্লাহর দৃষ্টি থেকে বঞ্চিত থেকে যায়, নিঃসন্দেহে তার ধ্বংস অনিবার্য। 

(১) গর্বভরে গোছার নীচে বস্ত্র 

পরিধানকারী। টাখনো বা গোছার নিচে লুঙ্গি, পাজামা বা প্যান্ট পরিধান করা গুনাহ। নিয়ম হলো, গোছর উপর পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখা। এর সঙ্গে যদি অহংকার যোগ। হয়, তবে অপরাধের মাত্রা দ্বিগুণ হয়ে যায়। এ ধরনের অপরাধীদের দিকে | কেয়ামতের দিন আল্লাহ দৃষ্টি দিবেন না। 

 নবী করীম সা. বলেন, “গর্বভরে যে ব্যক্তি কাপড় টেনে ধরল, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তার দিকে তাকাবেন না।” (বুখারী 

 নবী করীম সা. আরো বলেন, “লুঙ্গি (পাজামা-প্যান্ট), জামা এবং পাগড়ী; এগুলোর কোন অংশ যদি কেউ অহংকারবশতঃ টেনে। ধরে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তার দিকে দৃষ্টি দেবেন না।” (ইবনে মাজা-৩৫৭৬) 

(২) পিতা মাতার অবাধ্য।

 পিতা-মাতার অবাধ্যতা একটি চরম অপরাধ। আল্লাহ তা’লা কুরআনুল কারীমে নিজের অধিকারের সাথে সাথে পিতা-মাতার 

অধিকার জুড়ে দিয়েছেন, 

في وقضى ربك أ بوا إلا إياه وبالولاين إختاه الإسراء: ۲۳ 

“তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে তাঁকে ছাড়া অন্য কারো এবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর।” (সূরা ইসরা-২৩) অন্য আয়াতে পিতা-মাতার কৃতজ্ঞতা আদায়কে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় সাব্যস্ত করেছেন, 

ه لقمان: ۱۶ 

وأن آشلي ولوالديك إلى المي 

“নির্দেশ দিয়েছি যে, আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। অবশেষে আমারই নিকট ফিরে আসতে হবে।” (সূরা লুকমান-১৪) পিতা-মাতার অনুগত হওয়া উভয়জগতে সফলতা অর্জনের সহজ উপায়।

নবী করীম সা. বলেন, “যে চায়- তার রিযিক প্রশস্ত হোক এবং আয়ু বৃদ্ধি পাক; সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।” (বুখারী-১৯৬১) 

(৩) পুরুষদের সাদৃশ্য ধারণকারী নারী সম্পদ্রায় 

এখানে সাদৃশ্য বলতে কথাবার্তা, কাজকর্ম ও পোশাক-পরিচ্ছদে সাদৃশ্য উদ্দেশ্য। বর্তমানে ইন্টারনেট এবং স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে এগুলো প্রচার প্রসার করা হচ্ছে। এটাকে ফ্যাশন ও উৎকৃষ্ট পোষাকরূপে তুলে ধরা হচ্ছে। ফলে পুরুষরা 

মহিলাদের পোষাক এবং মহিলারা পুরুষদের পোশাক বেছে নিচ্ছে। এথেকেও আশ্চর্যের বিষয়, কতিপয় নারী-পুরুষ অত্যাধুনিক অস্ত্রোপচার ও হরমোন জাতীয় ঔষধ সেবন করে লিঙ্গ পরিবর্তনের পথ বেছে নিচ্ছে।আল্লাহর সৃষ্টিতে বিকৃতি সাধনের দুঃসাহস করে তারা চরম অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। এসকল বিষয় থেকে নবী করীম সা. আমাদেরকে নিষেধ করেছেন। এরকম কাজে লিপ্ত ব্যক্তিদের প্রতি কেয়ামতের দিন আল্লাহ দৃষ্টি দিবেন না। 

(৪) দাইয়ুস।

 দাইয়ূছ হলো ওই ব্যক্তি, যে চোখ-বুঝে পরিবারে সৃষ্ট সকল অনিষ্টতা দেখে চুপ থাকে। পরিবারকে ফেৎনা ফাসাদ থেকে উদ্ধার করতে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করে না। স্ত্রীকে পর্দার আদেশ করে না। কখনো কখনো পরিবারস্থ নারীরা পরপুরুষের সাথে দৈহিক সম্পর্ক গড়ে তুলে; তথাপি সে তাদের সংশোধনের চিন্তা করে না। এরকম ব্যক্তি পুরুষ নামের কলঙ্ক। ভীতু কাপুরুষ। হাদিসের ভাষায় এদেরকে ‘দাইয়ূছ’ বলা হয়েছে। 

 নবী করীম সা. উপরোক্ত ব্যক্তিদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, “তিন ধরণের ব্যক্তিদের সাথে কেয়ামতের দিন আল্লাহ কথা বলবেন না; পিতা-মাতার অবাধ্য, পুরুষদের সাদৃশ্য ধারণকারী নারী এবং ‘দাইয়ূছ’। আর তিন ধরণের ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, পিতা-মাতার অবাধ্য, মদ্যপ, দান করে খোটা প্রদানকারী।” (মুসনাদে আহমদ-৬১৮০) 

(৫) পশ্চাদপথে স্ত্রীদের সহিত সঙ্গমকারী

 স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আল্লাহ তা’লা এক স্বভাবজাত সম্পর্ক সৃষ্টি করেছেন। একে অপরের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করেছেন। তাদের মিলনের জন্য শরীয়তসম্মত পন্থা নির্ধারণ করেছেন। তা ব্যতীত সকল পন্থা হারাম ঘোষণা করেছেন। কবীরা গুনাহের অন্যতম হলো, স্বামী কর্তৃক স্ত্রীদের সহিত পশ্চাদপথে সঙ্গম করা। 

 নবী করীম সা. বলেন, “অভিশপ্ত, যে আপন স্ত্রীর পশ্চাদপথে সঙ্গমে লিপ্ত হলো।” (মুসনাদে আহমদ-৯৭৩৩)। 

অন্য হাদিসে বলেন, “স্ত্রীর পশ্চাদপথে সঙ্গমকারীর দিকে আল্লাহ দৃষ্টি দেবেন না।” (মুসনাদে আহমদ-৭৬৮৪)। 

যে সব অপরাধীদের মুখে লাগাম পরানো হবে দুনিয়াতে যাদের কাছে শরীয়তের জ্ঞান জিজ্ঞেস করা হতো, কিন্তু জেনে শুনেও সে জ্ঞান তারা গোপন করে ফেলত। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও জ্ঞান প্রচার থেকে বিরত থাকত, কেয়ামতের দিন এ সকল ব্যক্তিদের মুখে আগুনের লাগাম পরিয়ে দেয়া হবে। 

 নবী করীম সা. বলেন, “শরীয়তের কোনো জ্ঞান জিজ্ঞেস করার পর যে তা গোপন করল, কেয়ামতের দিন তার মুখে আগুনের লাগাম পরানো হবে।” (মুসনাদে আহমদ-১০৪২০) 

যাদের সাথে সাক্ষাতকালে আল্লাহ রাগান্বিত থাকবেন

 আল্লাহর অসন্তুষ্টি এবং ক্রোধ থেকে আমরা তাঁরই আশ্রয় চাই। 

 নবী করীম সা. বলেন, “অন্যায়ভাবে অপর মুসলিমের সম্পদ হরণের জন্য যে ব্যক্তি শপথ করল, আল্লাহর সাথে সাক্ষাতকালে আল্লাহ তার উপর রাগান্বিত থাকবেন।” (বুখারী-২২৮৫) 

বিলাসপ্রিয় বিত্তশালীবৃন্দ 

সীমার ভেতরে থেকে আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত ব্যয় করা বৈধ কাজ। সঠিকরূপে যদি তা ব্যবহার করে এবং সকলের হক আদায় করে, তবে তো সে পুরস্কৃতও হবে। আর যদি বিলাসিতায় সীমা ছাড়িয়ে যায়, অবশ্যই তা নিন্দনীয় গণ্য হবে। একদা নবী করীম সা. একব্যক্তি সম্পর্কে শুনলেন যে, সে সবসময় মুখ ফুলিয়ে রাখে (যা খাদ্যের দ্বারা উদরপূর্তি হওয়া বুঝায়), নবীজী তা অপছন্দ করে বললেন, 

মুখ ফোলানো বন্ধ কর। নিশ্চয় দুনিয়াতে অনেক পরিতৃপ্ত আখেরাতে দীর্ঘকাল ক্ষুধার্ত থাকবে।” (তিরমিযী-২৪৭৮) II  

নবী করীম সা. আরো বলেন, “নিশ্চয় বিত্তশালীরা কেয়ামতের দিন সবচেয়ে দরিদ্র থাকবে। তবে যাকে আল্লাহ তা’লা কল্যাণ দিয়েছেন আর সে ওই কল্যাণ থেকে ডানদিকে, বামদিকে ও সামনে-পেছনে বিলিয়ে দেয়। উত্তমকাজে তা ব্যয় করে।” (বুখারী-৬০৭৮) 

কেয়ামতের দিন বিশ্বাসঘাতকের অবস্থা

 বিশ্বাসঘাতকতা মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য।কারণ,মুনাফিক যখনই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়, বিশ্বাসঘাতকতা করে। তার । কাছে আমানতের বস্তু রাখা হলে তা বিনষ্ট করে ফেলে। এরকম ব্যক্তিদেরকে পরকালে চরম লাঞ্ছনার শিকার হতে হবে। 

 নবী করীম সা. বলেন, হাশরের ময়দানে যখন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল মানুষকে একত্রিত করা হবে, তখন প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকের জন্য একটি করে পতাকা উত্তোলন করা হবে। বলা হবে, এটি হলো অমুকের পুত্র অমুকের বিশ্বাসঘাতকতা।” (বুখারী-৫৮২৪)। এভাবে কেয়ামতের ময়দানে বিশ্বাসঘাতককে সকলের সামনে। লাঞ্ছিত করা হবে। পতাকা স্থাপন করা হবে তার নিতম্বে। 

 নবী করীম সা. বলেন, “প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকের জন্য কেয়ামতের দিন তার নিতম্বে পতাকা স্থাপিত থাকবে।” (মুসনাদে আহমদ-১১০৩৮) গাদ্দারী যত বড় হবে, পতাকাও তত বড় হবে। 

 নবী করীম সা. বলেন, “প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকের জন্য কেয়ামতের ময়দানে গাদ্দারী অনুযায়ী পতাকা স্থাপিত হবে। জেনে রেখ, শাসকের বিশ্বাসঘাতকতা অপেক্ষা অধিক। বিশ্বাসঘাতকতা আর হয় না।” (মুসনাদে আহমদ-১১৫৮৭) 

এখানে শাসক বলতে এলাকার চেয়ারম্যান, জেলার এমপি-মন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপ্রধানবৃন্দ উদ্দেশ্য। ঠিকতেমনি বোর্ড প্রধান, কমিটি প্রধান, কোন প্রতিষ্ঠানের সভাপতি বা বিদ্যালয়ের অধ্যাপক। কারণ তাদের গাদ্দারী হয় ব্যাপক এবং ক্ষতিও হয় মারাত্মক। পাশাপাশি এরকম গাদ্দার থেকে প্রতিশোধ নেয়ারও কোনো সুযোগ থাকে না। 

প্রাসঙ্গিক 

জাহিলিয়্যাত যুগে গাদ্দারের পরিণতি 

| সে যুগে গাদ্দারদেরকে হজ্জ্বের মওসুমে মানুষদের সামনে ঘোরানো হতো। অপরাধীকে তার অপরাধকৃত বস্তু নিয়ে সবার সামনে ঘুরতে হতো। চুর তার চুরাই বস্তু নিয়ে সবার সামনে প্রদক্ষিণ করত। এভাবে তাদেরকে চরমভাবে অপমাণ ও লাঞ্ছিত করা হতো। 

যুদ্ধলব্ধ সম্পদে চুরি

 যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বলতে যুদ্ধ জয়ের পর মুজাহিদীন কর্তৃক শত্রুপক্ষের পরিত্যাক্ত সম্পদপ্রাপ্তি উদ্দেশ্য। এ সম্পদকে একত্র করে শরিয়তসম্মত পন্থায় এর সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা আবশ্যক। তন্মধ্যে কেউ যদি সামান্য পরিমাণ নিজের কাছে রেখে দেয়, সেটাই চুরির অন্তর্ভুক্ত হবে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের নিন্দা করে আল্লাহ বলেন, 

ل فیس ما 

و 

ومن يتم يأت بما ل يوم القيمة 

که آل عمران: ۱۲۱ 

کسب وهم لا يظلمون 

“আর যে লোক গোপন করবে, সে কেয়ামতের দিন সেই গোপন বস্তু নিয়ে হাজির হবে। অতঃপর পরিপূর্ণভাবে পাবে প্রত্যেকে, যা সে অর্জন করেছে। আর তাদের প্রতি কোনো অন্যায় করা হবে না।” (সূরা আলে ইমরান-১৬১)। নবী করীম সা. সাথীদেরকে প্রায়ই এ সম্পর্কে সতর্ক করতেন। 

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, “একবার নবী করীম সা. আমাদের মাঝে দাঁড়িয়ে যুদ্ধলব্ধ সম্পদে চুরি সম্পর্কে অনেক কথা বললেন। একে চরম গর্হিত ও অপরাধকাণ্ড আখ্যায়িত করলেন। বললেন, “কেয়ামতের দিন তোমাদের কাউকে যেন আমি এমতাবস্থায় না পাই যে, তার কাঁধে বিরাট উট চিৎকার করছে। সে আমার কাছে এসে বলবে, হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে সহায়তা করুন! আমি তখন বলে দেব, তোমার জন্য আমি কিছুই করতে পারব না; আমি তো তোমাকে জানিয়ে দিয়েছিলাম।” “কেয়ামতের দিন তোমাদের কাউকে যেন আমি এমতাবস্থায় না পাই যে, তার কাঁধে ঘোড়া চিৎকার করছে। সে আমার কাছে এসে বলবে, হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে সহায়তা করুন! আমি তখন বলে দেব, তোমার জন্য আমি কিছুই করতে পারব না; আমি তো তোমাকে জানিয়ে দিয়েছিলাম।” “কেয়ামতের দিন তোমাদের কাউকে যেন আমি এমতাবস্থায় না পাই যে, তার কাঁধে ছাগল চিৎকার করছে। সে আমার কাছে এসে বলবে, হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে সহায়তা করুন! আমি তখন বলে দেব, তোমার জন্য আমি কিছুই করতে পারব না; আমি তো তোমাকে জানিয়ে দিয়েছিলাম।” 

“কেয়ামতের দিন তোমাদের কাউকে যেন আমি এমতাবস্থায় না পাই যে, তার কাঁধে অন্য কোন প্রাণী চিৎকার করছে। সে। আমার কাছে এসে বলবে, হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে সহায়তা। করুন! আমি তখন বলে দেব, তোমার জন্য আমি কিছুই করতে পারব না; আমি তো তোমাকে জানিয়ে দিয়েছিলাম।” “কেয়ামতের দিন তোমাদের কাউকে যেন আমি এমতাবস্থায় না পাই যে, তার কাঁধে কোন নীরব বস্তু (স্বর্ণ-রূপা কিংবা অন্য কোনো নিষ্প্রাণ বস্তু)।সে আমার কাছে এসে বলবে, হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে সহায়তা করুন! আমি তখন বলে দেব, তোমার জন্য আমি কিছুই করতে পারব না; আমি তো তোমাকে জানিয়ে। দিয়েছিলাম।” (মুসনাদে আহমদ-৯৫০৩)। 

এরা সকলেই যুদ্ধলব্ধ সম্পদে চুরি করেছিল। চুরিকৃত বস্তু দ্বারা তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে।নিজের কাঁধে সে তা বহন করে বেড়াবে। প্রচণ্ড চিৎকার করে সকল সৃষ্টির সামনে সে শাস্তি ভোগ করতে থাকবে। 

এ ধরনের চুরি অনেক ধরনেরঃ

– রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে শাসক (মন্ত্রী/এমপি)দের চুরি

 – বেতন ভাতা থেকে কর্মকর্তা/কর্মচারীদের চুরি

 – জনগণের সম্পদে দায়িত্বশীল (মেয়র/চেয়ারম্যান/মেম্বার)দের চুরি 

 নবী করীম সা. যাকাত উসূলের জন্য সাহাবীদেরকে বিভিন্ন গ্রামে ও গোত্রে পাঠাতেন। একবার ইবনে লুতাইবিয়া নামক এক ব্যক্তিকে ‘আযদ’ গোত্রে যাকাত উসূলের জন্য পাঠালেন। সে। গোত্রের উট-ছাগল মালিকদের কাছে আসলে তাদের কেউ কেউ নবী করীম সা. এর কাছে পৌঁছাবার জন্য আরোপকৃত যাকাতের মাল হস্তান্তর করল। পাশাপাশি ইবনে লুতাইবিয়াকে ব্যক্তিগতভাবে কিছু অতিরিক্ত বখশিশ দিয়ে দিল। সে যাকাতের সম্পদকে একপাশে জমা করল আর নিজের অতিরিক্ত উপার্জনকে অন্যপাশে জমা করল। মদীনায় নবী করীম সা. এর কাছে এসে বলল, এই হলো আপনাদের উসুলকৃত যাকাত আর এটা আমার উপঢৌকন (যা আমার কাছে রেখে দিলাম)। একথা শুনে নবীজী প্রচণ্ড রাগান্বিত হয়ে গেলেন। মিম্বরে উঠে বলতে লাগলেন, 

“একজন বেতনভূক্ত কর্মচারীকে কাজে পাঠানোর পর কী করে মুসলমানদের ঘর থেকে অতিরিক্ত হাদিয়া (বখশিশ) গ্রহণ করে! সে এসে বলে যে, এটা আপনাদের অংশ আর এটা আমার অংশ?! পিতা-মাতার ঘরে বসে থেকে দেখুক, তাকে কেউ 

হাদিয়া দেয় কিনা?! ওই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, এ ধরণের কোনো অতিরিক্ত বিষয় যে গ্রহণ করবে, কেয়ামতের। দিন সে তা নিজের ঘাড়ে। করে নিয়ে আসবে। উট হলে সে উট তার ঘাড়ে চড়ে চিৎকার করতে থাকবে। গরু ছাগল হলে সেটাই তার ঘাড়ে চড়ে চিৎকার করতে থাকবে।” (মুসনাদে আহমদ-২৩৫৯৮)। 

এটি একটি সতর্কবার্তা। স্কুল, কলেজ বা মাদরাসা প্রধান যদি ছাত্রদের থেকে অতিরিক্ত কিছু গ্রহণ করে। পৌরসভা, ক্লিনিক বা হাসপাতালের ডাক্তার ও কর্মচারীরা যদি রোগীদের থেকে অতিরিক্ত কিছু গ্রহণ করে। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, পুলিশ বা সেনাবাহিনীর সদস্যগণ যদি জনসাধারণের কাছ থেকে (ঘুষ) গ্রহণ করে. সবই উপরোক্ত বিধানের আওতাভূক্ত হবে অর্থাৎ কেয়ামতের দিন এ সবগুলোকে তার ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হবে। 

জমি আত্মসাৎ বর্তমান সমাজে অন্যের জমি জবরদখল, ভাইবোনের উত্তরাধিকার আত্মসাৎ, কৌশলে জমি ব্যক্তিগতকরণ.. ইত্যাদি 

ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এ ধরণের কর্মকাণ্ডে জড়িতদের জন্য মারাত্মক শাস্তির কথা বর্ণিত হয়েছে।

নবী করীম সা. বলেন, “অন্যায়ভাবে কেউ যদি কারো জমি থেকে বিন্দুমাত্র নিয়ে নেয়, কেয়ামতের দিন এ জমিসহ সাত তবক জমিনের নীচে তাকে চাপা দেয়া হবে।” (বুখারী-২৩২২) 

থাকা সত্তেও অন্যের কাছে ভিক্ষা (ছুওয়াল) সচ্চরিত্রবান দরিদ্র ওই ব্যক্তি, যে দিনের উপার্জন দিনে খায়, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কষ্ট করে উপার্জন করে জীবিকা নির্বাহ করে। কারো সামনে লজ্জিত হয় না। কারো কাছে নিজের দারিদ্র্য প্রকাশ করে না। পক্ষান্তরে যে নিজের কাছে যথেষ্ট পরিমাণ থাকা সত্ত্বেও অন্যের কাছে ভিক্ষা (ছুওয়াল) করে, তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। নবী করীম সা. এ ধরনের ব্যক্তিদের সম্পর্কে সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন,

“অপরের কাছে হাত পাততে হয় না এমন সম্পদ থাকার পরও যে অন্যের কাছে চাইল, কেয়ামতের দিন তার চেহারা ধারালো নখ দিয়ে আঁচড়িত ও ক্ষতবিক্ষত থাকবে। জিজ্ঞেস করা হলো, কতটুকু সম্পদ থাকলে বুঝা যাবে সে অন্যের মুখাপেক্ষী নয়? বললেন, পঞ্চাশ দিরহাম বা তার সমমূল্যের স্বর্ণ ।”(ইবনে। মাজা-১৮৪০) 

নামাযে অবহেলা

 নামায হলো ইসলামের মৌলিক স্তম্ভ। নামায হলো মুমিনদের চক্ষু শীতলকারী ও খোদাপ্রেমিকদের আশ্রয়স্থল। মুসলিমদের ওপর এ মহান এবাদতকে আল্লাহ ফরয করেছেন। নবীজীর সর্বশেষ অসিয়ত ছিল নামায। কেয়ামতের দিন নামায সম্পর্কেই সর্বপ্রথম জিজ্ঞেস করা হবে। আল্লাহর কৃতজ্ঞতা যে, তিনি আমাদেরকে তাঁর সামনে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা করে। দিয়েছেন। তার কাছে চাওয়ার মাধ্যম তৈরি করে দিয়েছেন। নামায হলো আল্লাহর সাথে বান্দার মতবিনিময়স্থল। নবী করীম সা. কোন দুঃসংবাদ বা বিপদের কথা শুনলে দ্রুত নামাযে দাঁড়িয়ে যেতেন। হাশরের ময়দানে নামায মানুষের অনেক উপকারে আসবে। নামায সম্পর্কে নবী করীম সা. বলেন,“যে ব্যক্তি সময়মতো গুরুত্ব সহকারে ফরয নামাযগুলো আদায় করবে, কেয়ামতের দিন সেগুলো তার জন্য উজ্জ্বল আলো এবং প্রমাণ হয়ে আসবে এবং তার মুক্তির উপায় হবে। আর যে এগুলো সময়মতো আদায় করবে না, তার জন্য কোন নূর নেই, কোন দলিল নেই এবং নাজাতের কোন পথ নেই। কেয়ামতের দিন সে ফেরাউন, কারুন, হামান এবং উবাই বিন খালাফের সাথে থাকবে।” (মুসনাদে আহমদ-৬৫৭৬) 

কুৎসাকারী এবং পরনিন্দুক

 পরনিন্দুক হলো, যে মানুষের নিন্দা ও সমালোচনা করে বেড়ায়। কুৎসাকারী (নাম্মাম) হলো, যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে একজনের কথা অন্যজনের কাছে বলে বেড়ায়। এ সবের কারণে সমাজে ফেত্না-ফাসাদ দেখা দেয়। পরিবারে কলহ সৃষ্টি হয়। এ ধরণের ব্যক্তিদের ব্যাপারে কঠোর শাস্তির সতর্কবাণী এসেছে। হাশরের ময়দানে তাদের অবস্থা হবে। অতিভয়াবহ। যেমনটি নবী করীম সা. বলেন,

 “দুনিয়াতে যে অপর ভাইয়ের মাংস খেল, কেয়ামতের দিন তার লাশ উপস্থিত করে বলা হবে, জীবিত অবস্থায় যেমন তার মাংস খেতে, আজ তার মৃতদেহের মাংস খাও! অতঃপর সে তা থেকে ভক্ষণ করবে আর চরম অনীহাবশতঃ চিৎকার করতে থাকবে।” (বুখারী) 

দুমুখো

 যে একজনের কাছে একরকম কথা এবং অপরজনের কাছে অন্যরকম কথা নিয়ে উপস্থিত হয়। নবী করীম সা. বলেন, “দুনিয়াতে যে দু’মুখো হবে, কেয়ামতের দিন তার মুখে আগুনের দু’টি জিহ্বা থাকবে।” (ইবনে হিব্বান ৫৭৫৬) 

চিত্রকার

 চিত্র তৈরি বিভিন্ন রকম হতে পারে। উলামায়ে কেরাম প্রকার বুঝে এগুলোর বিধান নির্দিষ্ট করেছেন। তবে চিত্র তৈরি হারাম হওয়ার বিষয়ে সকলেই একমত পোষণ করেছেন। বিশেষতঃ তা যদি হয় কোনো বিশিষ্ট জনের..। 

 নবী করীম সা. বলেন, “নিশ্চয় যারা এসকল চিত্র তৈরি করবে, কেয়ামতের দিন তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে। বলা হবে, তোমাদের চিত্রিতকে জীবিত কর।” (বুখারী-৫৬০৭)। 

 নবী করীম সা. আরো বলেন, “দুনিয়াতে যে কারো চিত্র তৈরি করবে, কেয়ামতের দিন চিত্রে রূহ দিতে তাকে চাপ দেয়া হবে। 

অথচ কোনোদিনই সে তাতে রূহ দিতে পারবে না।” (মুসনাদে আহমদ-২২১৩)। 

পরিশেষে..

এই হলো হাশরের ময়দানে অপরাধীদের বিভিন্ন অবস্থার সংক্ষিপ্ত বিবরণ। 

তাহলে হিসাব কখন শুরু হবে?

 আমলনামা কীভাবে বিতরণ করা হবে? 

কখন মানুষ নিজেদের আমলনামা পাঠ করবে?

তাদেরকে প্রশ্ন করা হবে কীভাবে? 

বিস্তারিত বিবরণ সামনে আসছে..! 

দুনিয়াতে মানুষের কৃতকর্মই, পরকালে তার পরিণাম নির্ণয় করবে। 

আমলনামা বিতরণ 

হাশরের ময়দানে প্রত্যেককেই একটি করে পুস্তিকা দেয়া হবে। যাতে দুনিয়াতে তার সকল কৃতকর্মের বিবরণ উল্লেখ থাকবে। বলা হবে.. 

کو 

هدايا ينطق عير بالحق ا ا تنیس ماکت موت 

الجاثية: ۳۹ 

“আমার কাছে রক্ষিত এই আমলনামা তোমাদের সম্পর্কে সত্য কথা বলবে। তোমরা যা করতে আমি তা লিপিবদ্ধ করতাম।” (সূরা জাছিয়া-২৯)। 

* তবে কী সেই আমলনামা?

* কী লেখা থাকবে তাতে? 

* মানুষ তা কীভাবে গ্রহণ করবে? 

ভূমিকা

 একদল, যাদের আমলনামা তাদের ডানহাতে দেয়া হবে। অপরদল, যাদের আমলনামা বামহাতে পিঠের পিছন দিকে নিয়ে দেওয়া হবে। 

ভূমিকা 

প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যই লিখিত আমলনামা থাকবে। তাতে তার ভালোমন্দ সকল কর্ম লিপিবদ্ধ থাকবে। ছোট বড় সকল কৃতকর্মের বিবরণ থাকবে। হাশরের ময়দানে প্রত্যেককে নিজের আমলনামা দেখতে ও পাঠ করতে দেয়া হবে। তবে আমলনামা বিতরণের প্রক্রিয়া হবে ভিন্ন। মুমিনদেরকে সহজ হিসাব নেয়ার পর তাদের আমলনামা সামনের দিক দিয়ে ডানহাতে দেয়া হবে। আমলনামা পেয়ে অত্যন্ত খুশী হয়ে সে পরিবারের কাছে ফিরে আসবে। পক্ষান্তরে অপরাধী ও মুনাফিকদের আমলনামা পিঠের পিছন দিক থেকে বাম হাতে দেওয়া হবে। প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে আমলনামা বিতরণকার্য শুরু হবে। আল্লাহ 

বলেন, 

وإذا اله شرثية التكوير: ۱۰ 

“যখন আমলনামা খোলা হবে।” (সূরা তাকবীর-১০) প্রত্যেক মানুষকে আমলনামায় লিপিবদ্ধ নথি অনুযায়ী প্রতিদান দেয়া হবে। আল্লাহ বলেন, 

وكل إنسن أمه طبره في عقيره ومخرج لهو يوم القيمة تبا قله منشورا ي أقرأ كتابك كفى بنفسك اليوم عليك كيبا يک 

الإسراء: ۱۳ – ۱۶ 

“আমি প্রত্যেক মানুষের কর্মকে তার গ্রীবালগ্ন করে রেখেছি। কেয়ামতের দিন বের কের দেখাব তাকে একটি কিতাব, যা সে। খোলা অবস্থায় পাবে। পাঠ কর তুমি তোমার কিতাব! আজ তোমার হিসাব গ্রহণের জন্য তুমিই যথেষ্ট।” (সূরা ইসরা ১৩,১৪) প্রত্যেকেই নিজ নিজ আমলনামা পাঠ করে নিজেদের পরিণামস্থল বুঝতে পারবে। 

ডানহাতে যাদের আমলনামা দেয়া হবে

 সহজ হিসাব গ্রহণের পর তারা পরিবারের কাছে অত্যন্ত খুশি হয়ে ফিরে আসবে। সব ভয় তার দূর হয়ে যাবে।আনন্দে হৃদয় ভরে উঠবে। মানুষের সামনে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াবে। আল্লাহ তা’লা বলেন, 

و اما من أوتي كتبه و بيمينه فيقول هاؤم اقر وأكتبية ( إلى ظننت أني 

فهو في عيشتي راضية في جة عالية قطوفها دانية 

ملق حسابية 

وأوشو أهني بما ألف في الأيام الخالية به الحاقة: 19 – 24 

“অতঃপর যার আমলনামা ডান হাতে দেয়া হবে, সে বলবে, নাও! তোমরাও আমলনামা পড়ে দেখ! আমি জানতাম যে, আমাকে হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে। অতঃপর সে সুখী জীবনযাপন করবে, সুউচ্চ জান্নাতে। তার ফলসমূহ অবনমিত থাকবে। বিগত দিনে তোমরা যা প্রেরণ করেছিলে, তার প্রতিদানে তোমরা খাও এবং পান কর তৃপ্তি সহকারে।” (সূরা আল-হাক্কা ১৯-২৪) 

যাদের আমলনামা পিঠের পিছন দিক থেকে বাম হাতে দেয়া হবে

 ক্ষতিগ্রস্ত, পাপিষ্ঠ, অপরাধী.. যারা জীবনকে হেলায় ফেলায় নষ্ট করেছে, পরকাল ধ্বংস করেছে, তাদের চেহারা হবে সেদিন কালো। আল্লাহ বলেন, 

وا من أوق به ورا ظهره ي 

سيرا 

فسوف يغوأ وا ي وي و الانشقاق: ۱۰ – ۱۴ 

“এবং যাকে তার আমলনামা পিঠের পশ্চার্দিক থেকে দেয়া হবে, সে মৃত্যু আহবান করবে এবং জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (সূরা ইনশিকাক ১০-১২)। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, 

و وأما من أوتي كتبه بشماله فيقول ليتني لم أوت كتابية في ولي درما 

ع طية 

هل 

حسابية ايليتها كانت القاضية ما أ عنى مالية 

 “যার আমলনামা তার বাম হাতে দেয়া হবে, সে বলবে, হায়! আমায় যদি আমার আমলনামা না দেওয়া হত। আমি যদি না জানতাম আমার হিসাব! হায়, মৃত্যুই যদি আমার শেষ হত। আমার ধন-সম্পদ আমার কোন উপকারে আসল না। আমার ক্ষমতাও বরবাদ হয়ে গেল।” (সূরা আল হাক্কা ২৫-২৯)। সেদিন মুমিনদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে নবী করীম সা. বলেন“.. অতঃপর তার সৎকর্মের আমলনামা ডানহাতে দেয়া হবে। পক্ষান্তরে কাফের ও মুনাফিকদেরকে সকল সৃষ্টির সম্মুখে ডেকে। বলা হবে “এরাই সেসব লোক, যারা তাদের পালনকর্তার প্রতি মিথ্যারোপ করেছিল। শুনে রাখ, জালেমদের উপর আল্লাহর 

অভিসম্পাত রয়েছে।” (সূরা হূদ-১৮) 

ন্যায়বিচার, 

که 

م ون 

هدانا ينطق ليگر بالحق إنا ناشتنی ما 

الجاثية: 29 | 

“আমার কাছে রক্ষিত এই আমলনামা তোমাদের সম্পর্কে সত্য কথা বলবে। তোমরা যা করতে আমি তা লিপিবদ্ধ করতাম।” (সূরা জাছিয়া-২৯) 

উপস্থিতি হিসাব 

মানুষ যখন তাদের আমলনামা গ্রহণ করবে, তখন থেকেই তাদের উপস্থিতি ও হিসাবকার্য শুরু হয়ে যাবে। পাশাপাশি আমলনামা ওজন, সীরাতে জাহান্নামের উপর দিয়ে পারাপার.. ইত্যাদি পর্বগুলোও শুরু হয়ে যাবে। তখনই হবে মূল প্রদর্শনী… 

* তবে কী সেই প্রদর্শনী?

 * কী প্রদর্শিত হবে? 

* প্রদর্শনের সময় বান্দার অবস্থা কীরূপ হবে? 

ভূমিকা

 “হিসাব” এর অর্থ 

আখেরাতে “হিসাব” এর ধাপসমূহ

বান্দাদের হিসাবনিকাশের মূলনীতি 

যে সব বিষয়ে প্রশ্ন করা হবে

 প্রথম যারা জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন হবে

 প্রথম যে বস্তুর ফায়সালা হবে 

বিচারদিবসে মানুষের অবস্থা

 কেয়ামতের দিন অধিকার আদায়ের ধাপসমূহ

 কেয়ামতের বিচারালয়ে সাক্ষীবৃন্দ 

ভূমিকা 

“উপস্থিতির দু’টি অর্থ হতে পারেঃ

 (১) প্রতিপালকের সামনে সকল সৃষ্টির উপস্থিতি।

 এ পর্যায়ে কোনো হিসাব-নিকাশ থাকবে না। শুধু পরাক্রমশালী আল্লাহর সামনে সকলেই দণ্ডায়মান থাকবে। জ্বিন-ইনসান, পশু পাখি.. সকল সৃষ্টি আল্লাহর সামনে আসবে। ঠিক-যেমন প্রথমবার তিনি সৃষ্টি করেছিলেন। কোনো কিছু গোপন থাকবে 

না। 

আল্লাহ বলেন, 

و لاقی منافيه 

الحاقة: ۱۸ 

ويوم 

“সেদিন তোমাদেরকে উপস্থিত করা হবে। তোমাদের কোনোকিছু গোপন থাকবে না।” (সূরা আল হাক্কা-১৮) অন্য আয়াতে বলেন, 

القدموا كماخلقت أول مرة بل عمه 

ورځوأعلى بك أ جعل لك وعدا که الكهف: ۸ 

“তারা আপনার পালনকর্তার সামনে পেশ হবে সারিবদ্ধভাবে এবং বলা হবে, তোমরা আমার কাছে এসে গেছ, যেমন তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম। না, তোমরা তো বলতে যে, আমি তোমাদের জন্যে কোনো প্রতিশ্রুত সময় নির্দিষ্ট করব না।” (সূরা কাহফ-৪৮) 

হিসাবের জন্য উপস্থিতি

 এ উপস্থিতিতে আমল নিরীক্ষণ চলবে। বান্দাদের জিজ্ঞেস করা হবে, রাসূলদের তোমরা কী উত্তর দিয়েছিলে? দুনিয়াতে তোমরা কোন কাজে লিপ্ত ছিলে? সে সময়ের উপস্থিতি অত্যন্ত কঠিন ও ভয়াবহ হবে। ভয়ে পা পিছলে যাওয়ার উপক্রম হবে। শিশু বৃদ্ধে রূপ নেবে। জিহ্বা কথা বলতে শুরু করবে। আল্লাহ বলেন, 

الغاشية: 25 – 

دا علی احسابهم 

إيابهم 

و إ إلي 

“নিশ্চয় তাদের প্রত্যাবর্তন আমারই নিকট। অতঃপর তাদের | হিসাব-নিকাশ আমারই দায়িত্বে।” (সূরা গাশিয়া ২৫,২৬)। 

* হিসাবএর অর্থ

 হিসাব অর্থ গণনা করা, নিরীক্ষণ করা। বিচারদিবসে বান্দাদের | হিসাব গ্রহণ আল্লাহর ন্যায়বিচারের বহিঃপ্রকাশ। সুতরাং যারা সঙ্কর্ম করে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করেছে, পাপিষ্ঠ ও সীমালঙ্ঘনকারীরা কখনই তাদের সমকক্ষ হতে পারবে না। 

* পরকালে ‘হিসাব’ এর প্রকারসমূহ

 আমল অনুযায়ী মানুষের হিসাব বিভিন্ন রকম হবে। কেউ কেউ বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। কারো কারো হিসাব সহজ করা হবে আর কারো কারো হিসাব কঠিন। 

তন্মধ্যে 

যারা বিনা-হিসাবে জান্নাতে চলে যাবে। সংখ্যায় তারা সত্তর হাজার। এরা হবে উম্মতের শ্রেষ্ঠাংশ, যারা ঈমান, তাকওয়া, সবর ও জিহাদে অগ্রগামী ছিল। তাদের ব্যাপারে নবী করীম সা. বলেন, 

 “আমার সামনে সকল উম্মতকে উপস্থাপন করা হল, সেখানে। আমার উম্মতকে দেখলাম। তাদের আধিক্য এবং মর্যাদা আমাকে। মুগ্ধ করল। সংখ্যাধিক্যের দরুন তারা সকল উঁচু স্থান ও পাহাড় ভরে উঠল। আল্লাহ বললেন, তুমি সন্তুষ্ট হয়েছ হে মোহাম্মাদ? তিনি বললেন, হ্যাঁ.. হে আমার প্রতিপালক। আল্লাহ বললেন, তাদের সঙ্গে আরও সত্তর হাজার বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে, যারা চিকিৎসার জন্য ঝাড়ফুক গ্রহণ করত না এবং আরোগ্য লাভের আশায় দেহ দগ্ধ করত না।” এ কথা শুনে উকাশা রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, দোয়া করুন আমি যেন তাদের অন্তর্ভুক্ত হই। নবীজী দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! তাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। অতঃপর আরেকজন বলল, আমার জন্যও দোয়া করুন, যেন আমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত হই। তখন নবীজী বললেন, উকাশা তোমার আগে বলে ফেলেছে।” (বুখারী-৫৩৭৮)

 মোটকথা, এই সত্তর হাজার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তাদের কোন হিসাব হবে না। অন্যদের মত তাদের আমল নিরীক্ষণ হবে না। আল্লাহ আমাদেরকেও সেই দলের অন্তর্ভুক্ত করুন..! 

তন্মধ্যে

 যাদের আল্লাহ হিসাব নিবেন ঠিকই; তবে কোনোরূপ নিরীক্ষণ ব্যতীত অত্যন্ত সহজ হিসাব নিয়ে সেরে ফেলবেন। অল্প উপস্থাপন করে তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। নবী করীম সা. বলেন, 

 “নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনের নিকটবর্তী হয়ে তাকে রহমতের ডানা দিয়ে ঢেকে বলবেন, তোমার কি অমুক অমুক গুনাহের কথা। মনে আছে? সে বলবে, হ্যাঁ.. প্রতিপালক! শেষপর্যন্ত যখন সকল গুনাহের স্বীকারোক্তি দেবে, মনে মনে ভাববে যে, সে ধ্বংস হয়ে গেছে। তখন আল্লাহ বলবেন, দুনিয়াতে তোমার এই  অপরাধগুলো আমি গোপন রেখেছিলাম আর আজ আমি সেগুলো ক্ষমা করে দিলাম। অতঃপর তাকে পুণ্যের আমলনামা দেয়া হবে” (বুখারী-২৩০৯) 

এ জন্য বেশি করে দোয়া করা, “হে আল্লাহ, আমার হিসাব সহজ করে দিন” যেমনটি আয়েশা রা বলেন যে, 

আমি নবী করীম সা. কে কোনো কোনো নামাযে এই দোয়া পড়তে শুনেছি.. “হে আল্লাহ, আমার হিসাব সহজ করে নিয়ো! নামায থেকে ফেরার পর জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর নবী, সহজ হিসাব কী? উত্তরে বললেন, আমলনামার দিকে তাকিয়েই ছেড়ে দেয়া।” (মুসনাদে আহমদ-২৪২১৫) 

তন্মধ্যে

 কারো কারো হিসাব অত্যন্ত কঠিন করা হবে। অপরাধের দরুন লাঞ্ছিত করা হবে। সকল কাজ নিরীক্ষণ করা হবে। কেন তুমি নামাযে অবহেলা করতে? কীভাবে যাকাত আদায় করতে? পিতা-মাতার অবাধ্য হয়েছিলে কেন? বান্দার হক নষ্ট করেছিলে কেন? এ ধরণের জিজ্ঞাসিতদেরকে শাস্তির সম্মুখীন করা হবে। 

 নবী করীম সা. বলেন, “কেয়ামতের দিন যাকেই হিসাবের সম্মুখীন করা হবে, তাকেই শাস্তি দেয়া হবে।” একথা শুনে আয়েশা রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ কি বলেননি “যাকে তার আমলনামা ডান হাতে দেয়া হবে, তার হিসাব নিকাশ সহজে হয়ে যাবে।” (সূরা ইনশিকাক ৭,৮)? উত্তরে নবীজী বললেন, এতো উপস্থাপন! কিন্তু যার কৃতকর্ম নিরীক্ষণ হবে, তাকেই শাস্তি দেয়া হবে।” (বুখারী-১০৩) 

তন্মধ্যে 

গুনাহের আধিক্য, বড়ত্ব, স্থায়ী অভ্যাস, নিয়তে গরমিল.. এ সকল কারণে অনেকের হিসাব দীর্ঘ ও কঠিন করা হবে। 

 নবী করীম সা. বলেন, “কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যার বিচার করা হবে, সে হল শহীদ। তাকে উপস্থিত করে তার উপর কৃত আল্লাহর অনুগ্রহগুলো তাকে জানিয়ে দেয়া হবে। সকল অনুগ্রহ সে অকপটে স্বীকার করে নেবে। প্রতিপালক বলবেন, এতসব অনুগ্রহ পেয়ে তুমি কী আমল করেছ? সে বলবে, আমি আপনার জন্য যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছি। প্রতিপালক বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ! বরং তুমি যুদ্ধ করতে যেন তোমাকে সাহসী বীর বলা হয়। আর সেটা দুনিয়াতেই তোমাকে বলা হয়ে গেছে। অতঃপর জাহান্নামে নিক্ষেপের আদেশ করা হলে চেহারায় টেনে হেঁচড়ে তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে। অপরব্যক্তি যে শরীয়তের জ্ঞান শিখে অন্যকে শিখিয়েছে এবং কুরআন পড়েছে; তাকে উপস্থিত করে তার উপর কৃত আল্লাহর অনুগ্রহগুলো তাকে জানিয়ে দেয়া হবে।সকল অনুগ্রহ সে অকপটে স্বীকার করে নেবে। তখন জিজ্ঞেস করা হবে, এতসব অনুগ্রহ পেয়ে তুমি কী আমল করেছ? সে বলবে, আমি জ্ঞান শিখে অন্যকে শিখিয়েছি এবং আপনার সন্তুষ্টির জন্য কুরআন। পাঠ করেছি। প্রতিপালক বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ! বরং তুমি এজন্য শিখেছ, যেন তোমাকে আলিম বলা হয়। কুরআন পড়েছ; যেন তওমাকে কারী বলা হয়। আর দুনিয়াতে তোমাকে সেটা। বলা হয়ে গেছে। অতঃপর জাহান্নামে নিক্ষেপের আদেশ করা হলে চেহারায় টেনে হেঁচড়ে তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে। অপর ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ রিযিকের প্রশস্ততা দান করেছেন। অনেক সম্পদ দিয়েছেন। তাকে উপস্থিত করে তার উপর কৃত আল্লাহর অনুগ্রহগুলো তাকে জানিয়ে দেয়া হবে। সকল অনুগ্রহ সে অকপটে স্বীকার করে নেবে। প্রতিপালক বলবেন, এতসব পেয়ে তুমি কী আমল করেছ? সে বলবে, যত পন্থায় আপনি দান করতে বলেছেন, সকল পন্থায় আপনার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আমি দান করেছি! প্রতিপালক বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ! বরং তুমি এজন্য দান করতে, যেন তোমাকে দানবীর বলা হয়। আর দুনিয়াতেই তোমাকে সেটা বলা হয়ে গেছে। অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপের আদেশ করা হলে চেহারায় টেনে হেঁচড়ে। তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে। (মুস্তাদরাকে হাকিম-৩৬৪) 

প্রশ্নঃ সব মুমিনই কি হিসাবের সম্মুখীন হবে? উত্তরঃ একদল মুমিনকে আল্লাহ হিসাবের ঊর্ধ্বে 

| রাখবেন। বিনা হিসাবে তাদেরকে জান্নাত দেবেন। নবী করীম সা. বলেন, “আমার উম্মত থেকে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করব। তারা হল ওই সব লোক, যারা চিকিৎসার উদ্দেশ্যে অন্যের কাছ থেকে ঝাড়ফুক চাইত না। কিছু দেখে, শুনে, বা শুকে তাকে অশুভ লক্ষণ মনে করত না; কেবল প্রতিপালকের উপরই তারা ভরসা করত।” (বুখারী ৬১০৭) 

 অপর বর্ণনায়- “প্রত্যেক হাজারের সাথে আরও সত্তর হাজার” (মুসনাদে আহমদ-২২১৫৬) 

* যে সকল মূলনীতি অনুসারে হিসাবকার্য শুরু হবে 

সকল সৃষ্টি যখন মহান প্রতিপালকের সামনে দাঁড়াবে। কঠিন সেই দৃশ্য.. নগ্নপদ.. পায়ে হেটে চলবে। কোনো বাহন নেই।। নগ্নদেহ.. কোনো বস্ত্র নেই। খাতনাবিহীন অবস্থায়.. ঠিক যেমন প্রথমবার সৃজিত হয়েছিল। সে এক মহাত্রাসময় সুদীর্ঘ দিবস। দুশ্চিন্তায় সেদিন সীমালঙ্ঘনকারীদের দৃষ্টি উল্টে যাবে। পাপিষ্ঠদের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠবে।অহংকারীরা চরম লাঞ্ছনার শিকার হবে। অত্যাচারীরা ভীত সন্ত্রস্ত থাকবে। আল্লাহ বলেন, 

ولا تحسب له فعایق اللون إماؤهم يؤير تشخص فيه الأبصر مقطعين مقیعی ژ وهم لايرتد إليهم 

إبراهيم: 42 – 43 

م هواء 

د 

طرفه و 

“জালেমরা যা করে, সে সম্পর্কে আল্লাহকে কখনও বেখবর মনে করবেন না। তাদেরকে তো ওই দিন পর্যন্ত অবকাশ দিয়ে রেখেছেন, যেদিন চক্ষুসমূহ বিস্ফোরিত হবে। তারা মস্তক উপরে তুলে ভীত-বিহ্বল চিত্তে দৌড়াতে থাকবে। তাদের দিকে তাদের দৃষ্টি ফিরে আসবে না এবং তাদের অন্তর উড়ে যাবে।” (সূরা ইবরাহীম ৪২,৪৩) অন্য আয়াতে বলেন, 

وأنه يوم زفة إذ القلوب لدى المارگظمين که غافر: 

“আপনি তাদেরকে আসন্ন দিন সম্পর্কে সতর্ক করুন, যখন প্রাণ কণ্ঠাগত হবে, দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে।” (সূরা গাফির ১৮)

 ভূ-পৃষ্ঠ পরিবর্তিত হয়ে যাবে। পর্বতমালা চূর্ণ করে দেয়া হবে। আকাশ বিদীর্ণ হয়ে যাবে। গ্রহ-নক্ষত্রগুলো নিষ্প্রভ হয়ে যাবে। উপগ্রহসমূহ খসে পড়বে। সমুদ্রকে উত্তাল করে আগুনে রূপান্তর করা হবে। সূর্য আলোহীন হয়ে যাবে। ফেরেশতাকুল ভীত বিহ্বল থাকবে। 

সবাই সেদিন মহা বিচারালয়ে দাঁড়াবে। কেয়ামতের সেই বিচারালয়। সেদিন সূর্যকে অতি-নিকটবর্তী করা হবে। আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর সেই পরিস্থিতি হবে চরম ভয়াবহ। সেই বিচারালয়ে সকল অপরাধী উপস্থিত থাকবে। সকল সাক্ষীর সমাবেশ ঘটবে। আমলনামা উন্মুক্ত হবে।অজুহাত পেশ করার কোনো সুযোগ থাকবে না। অন্তরসমূহ প্রকম্পিত থাকবে। জিহ্বা সকল কৃতকর্মের স্বীকারোক্তি দেবে। আল্লাহ বলেন, 

نفس ماكبث 

و 

واتقوا يوما ترجعو فيه إلى اله 

لا 

يظلمون ( که البقرة: ۲۸۱ | 

و 

“ওই দিনকে ভয় কর, যেদিন তোমরা আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে। অতঃপর প্রত্যেকেই তার কর্মের ফল পুরোপুরি পাবে এবং তাদের প্রতি কোনোরূপ অবিচার করা হবেনা।” (সূরা বাক্বারা-২৮১)। 

কুরআন হাদিস গবেষণান্তে সেদিনের হিসাব গ্রহণকালের কতিপয় মূলনীতি আবিষ্কার করা গেছে। 

* প্রথম মূলনীতি

 পুরোপুরি ন্যায়বিচার, যেখানে বিন্দুমাত্র অবিচারের অবকাশ নেই।

 প্রতিপালক হলেন ন্যায়বিচারের অধিপতি। তিনি কারো প্রতি বিন্দুমাত্র অবিচার করবেন না। 

আল্লাহ বলেন, 

لا يظلمون ( که البقرة: 

نفس ماكسبت و 

و 

“অতঃপর পরিপূর্ণভাবে পাবে প্রত্যেকে, যা সে অর্জন করেছে। আর তাদের প্রতি কোনো অন্যায় করা হবে না।” (সূরা বাকারা ২৮১))

 অন্য আয়াতে তিনি বলেন, 

وه النساء: 

و الله لايظا متقال 

“নিশ্চয়ই আল্লাহ কারো অধিকারে বিন্দুমাত্র অবিচার করেন। 

।” (সূরা নিসা-৪০) অন্য আয়াতে বলেন, 

ومن يعمل من الصحي من ذكر أو أنثى وهو مؤمر أليك يدلون الجنة ولا يظلموت يا به النساء: ۱۲۶ 

“যে লোক পুরুষ হোক কিংবা নারী, যদি কোনো সৎকর্ম করে এবং বিশ্বাসী হয়, তবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রাপ্য তিল পরিমাণও নষ্ট হবে না।” (সূরা নিসা-১২৪)। 

নবী করীম সা. বলেন, “আল্লাহ বলেন, হে আমার বান্দাগণ, নিশ্চয় অবিচারকে আমি নিজের জন্য হারাম করেছি। তোমাদের জন্যও তা নিষিদ্ধ করেছি; সুতরাং তোমরা পরস্পর অবিচার করো না। হে আমার বান্দাগণ, তোমাদের প্রত্যেকেই পথভ্রষ্ট; তবে যাকে আমি পথ দেখাই! সুতরাং আমার কাছেই পথ প্রদর্শন প্রার্থনা কর, অবশ্যই আমি তোমাদের পথ দেখাব। হে। আমার বান্দাগণ, তোমাদের প্রত্যেকেই ক্ষুধার্ত, তবে যাকে আমি খাদ্যদান করি; সুতরাং আমার কাছেই খাদ্য প্রার্থনা কর, অবশ্যই তোমাদের আমি খাদ্য দেব। হে আমার বান্দাগণ, তোমাদের প্রত্যেকেই নগ্ন, তবে যাকে আমি বস্ত্রদান করি; সুতরাং আমার কাছেই বস্ত্র প্রার্থনা কর, আমি তোমাদেরকে বস্ত্র দেব। হে আমার বান্দাগণ, তোমরা দিনরাত অপরাধ করতে থাকলেও আমি তোমাদের সকল অপরাধ ক্ষমা করে দেব, সুতরাং আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, অবশ্যই আমি তোমাদের মাফ করে দেব। হে আমার বান্দাগণ, কখনো তোমরা আমার কোনো ক্ষতি সাধন করতে পারবে না এবং কোনো উপকারও আমার করতে পারবে না। হে আমার বান্দাগণ, তোমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী জ্বিন-ইনসান সকলেই যদি তোমাদের সর্বাধিক তাকওয়াবিশিষ্ট লোকের ন্যায় হয়ে যায়, তবে তা দ্বারা আমার রাজত্বে কিছুই বৃদ্ধি পাবে না। হে আমার বান্দাগণ, তোমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী জ্বিন-ইনসান সকলেই যদি তোমাদের অতিনিকৃষ্ট পাপিষ্ঠের ন্যায় হয়ে যায়, তবে তা দ্বারা আমার রাজত্বে বিন্দুমাত্র হ্রাস পাবে না। হে আমার বান্দাগণ, তোমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী জ্বিন-ইনসান সকলেই যদি একটি বিশাল সমতল ভূমিতে একত্রিত হয়ে আমার কাছে চায়, আর আমি যদি সকলের চাওয়া পূরণ করি; এর দ্বারা আমার বিন্দুমাত্র কমবে না, তবে এতটুকুই.. সমুদ্রের পানিতে সূচ প্রবেশ করালে সূচের অগ্রভাগে পানি জমাট হয়ে সমুদ্র থেকে যতটুকু কমে। হে আমার বান্দাগণ, তোমরা যা আমল করবে, তা আমি সংরক্ষণ। করে রেখে দেব। অতঃপর প্রতিদানস্বরূপ তা তোমাদেরকে পূর্ণরূপে বুঝিয়ে দেব। সেখানে যে উত্তম কিছু পায়, সে যেন আল্লাহর প্রশংসা জ্ঞাপন করে। তা ব্যতীত অন্য কিছু পেলে কেবল নিজেকেই যেন তিরস্কার করে।” (মুসনাদে আহমদ ৭৬০৬) 

* দ্বিতীয় মূলনীতি

 অন্যের অপরাধ কেউ বহন করবে না

 হ্যাঁ.. এটিই হলো ন্যায়বিচারের বহিঃপ্রকাশ। প্রত্যেকেই নিজ নিজ কৃতকর্মের ফল ভোগ করবে। আল্লাহ বলেন, 

ولاتكتفي إليها وتزر وازر وأرى به الأنعام: 

“যে ব্যক্তি কোনো গোনাহ করে, তা তারই দায়িত্বে থাকে। কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না।” (সূরা আনআম-১৬৪)। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, 

ومن اهتدى إتمايهتدي فيه ومن ضل إمايل عليها ولاز وازرة وزر أخرى ومااعبين حتي بعث ولاية الإسراء:۱۰ 

“যে কেউ সৎপথে চলে, তারা নিজের মঙ্গলের জন্যেই সৎপথে চলে। আর যে পথভ্রষ্ট হয়, তারা নিজের অমঙ্গলের জন্যেই পথভ্রষ্ট হয়। কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না।” (সূরা ইসরা-১৫)

আল্লাহ বলেন, 

أتزژ 

بن موسى ( وإبريد الذى و 

و أم لم يا يما في وازر و ژر أخرى . وأن ليس للإنسين إما سعى ( وأين سعيه و 

ثم يجله الجزاء الأوقة 

النجم: ۳۶ – ۱ | 

سوف يرى 

“তাকে কি জানানো হয়নি যা আছে মুসার কিতাবে এবং ইবরাহীমের কিতাবে, যে নিজ-দায়িত্ব পালন করেছিল? কিতাবে এই আছে যে, কোনো ব্যক্তি কারও গোনাহ নিজে বহন করবে না। আর মানুষ তাই পায়, যা সে করে। তার কর্ম শীঘ্রই দেখা হবে। অতঃপর তাকে পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে।” (সূরা নাজম ৩৬-৪১) 

. প্রশ্নঃ মানুষ যদি অন্যের অপরাধের বোঝা বহন না। 

করে, তবে অপর আয়াতে তো বলা হয়েছে, 

– 

ولييرو أوزارهم كاملة يوم القيمة ومن أوزار الذين يضلونهم بغير علم الاساء تمایز ژونجه النحل: 25 

“ফলে কেয়ামতের দিন ওরা পূর্ণমাত্রায় বহন করবে ওদের পাপভার এবং পাপভার তাদেরও যাদেরকে তারা তাদের অজ্ঞতাহেতু বিপথগামী করে।” (সূরা নাহল-২৫) এবং অন্য আয়াতে 

وولي أقاله وأثقالا مع أثقالهممه العنكبوت: ۱۳ 

“তারা নিজেদের পাপভার এবং তার সাথে আরও কিছু পাপভার বহন করবে।” (সূরা আনকাবুত-১৩)

 তবে এতদুভয়ের মাঝে কী করে সামঞ্জস্য বিধান সম্ভব? উত্তরঃ কোনো মানুষ যদি অন্যের পথভ্রষ্টের কারণ হয়। ইচ্ছাকরে অন্যকে অপরাধের পথ দেখিয়ে দেয়, তবে সে অপরাধ করে যতটুকু গুনাহ অর্জন করল, ঠিক তার সমপরিমাণ গুনাহ পথপ্রদর্শনকারীর উপরেও আসবে। 

নবী করীম সা. বলেন, “যে ব্যক্তি কাউকে সৎপথের দিকে আহ্বান করল, তার আহ্বানে সাড়া দানকারী সকলের সঙ্কর্মের সমপরিমাণ প্রতিফল তাকেও প্রদান করা হবে; কারো প্রতিদানে বিন্দুমাত্র হ্রাস ব্যতীতই। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি অন্যায়ের দিকে আহ্বান করল, তার আহ্বানে সাড়া দানকারী সকলের পাপভারের সমপরিমাণ তার উপরও চাপিয়ে দেয়া হবে; কারো পাপভারে কোনোরূপ হ্রাস ব্যতীতই।” (মুসনাদে আহমদ-৯১৬০) 

* তৃতীয় মূলনীতি

 বান্দাদেরকে তাদের সকল কৃতকর্ম জানিয়ে দেয়া হবে। পালনকর্তার নিকট কোনোকিছুই গোপন নয়। আমলনামায় ভালোমন্দ সবকিছু লিপিবদ্ধ থাকবে। কেয়ামতের দিন সবই সে নিজের সামনে দেখতে পাবে। আল্লাহ বলেন, 

في قاعملت من خيرها 

وماعملت من شوو 

ويوجد تو لوأتي بينها وبينه أمدا که آل عمران: ۳۰ 

“সেদিন প্রত্যেকেই যা কিছু সে ভাল কাজ করেছে; চোখের সামনে দেখতে পাবে এবং যা কিছু মন্দ কাজ করেছে তাও! ওরা তখন কামনা করবে, যদি তার এবং এসব কর্মের মধ্যে ব্যবধান দূরের হতো।” (সূরা আলে ইমরান-৩০) অন্য আয়াতে বলেন, 

ة الانفطار:ه 

وعلمت نفش ماقدمت وأر 

“তখন প্রত্যেকে জেনে নিবে সে কী অগ্রে প্রেরণ করেছে এবং কী পশ্চাতে ছেড়ে এসেছে।” (সূরা ইনফিতার-৫)।

 অন্যত্র বলেন, 

دووج وأما عملوأحاضرا ولا يظلورك أحداري به الكهف: ۶۹ 

“তারা তাদের কৃতকর্মকে সামনে উপস্থিত পাবে। আপনার পালনকর্তা কারও প্রতি জুলুম করবেন না।” (সূরা কাহফ-৪৯)। প্রত্যেককেই নিজ নিজ কৃতকর্ম সম্পর্কে অবহিত করা হবে তাদের আমলনামার মাধ্যমে। আমলনামা পড়েই সে সবকিছু বুঝতে পারবে। আল্লাহ বলেন। 

ج 

لهو يوم القيمة تبا 

و 

و في ممق 

و وكل إنسن ألمه لقلة منشورا ي اقرأكتب كفى بنفسك اليوم عليك حسيبا ن کا 

الإسراء: ۱۳ – ۱۶ | 

“আমি প্রত্যেক মানুষের কর্মকে তার গ্রীবালগ্ন করে রেখেছি। কেয়ামতের দিন বের করে দেখাব তাকে একটি কিতাব, যা সে। খোলা অবস্থায় পাবে। পাঠ কর তুমি তোমার কিতাব! আজ তোমার হিসাব গ্রহণের জন্য তুমিই যথেষ্ট।” (সূরা ইসরা ১৩,১৪) উক্ত আমলনামায় ছোট বড় সকল কৃতকর্মের বিবরণ থাকবে। আল্লাহ বলেন, 

ووضع الكتب في المجريين مشفقين ما فيه ويقولون يوتيلا مال هذا التي لا يتماد صغير ولاية أصلها ووج وأمالو حاضر وظلك أدا) الكهف: 49 

“আর আমলনামা সামনে রাখা হবে। তাতে যা আছে তার কারণে আপনি অপরাধীদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত দেখবেন। তারা বলবেঃ হয় আফসোস, এ কেমন আমলনামা। এ যে ছোট বড় কোনোকিছুই বাদ দেয়নি- সবই এতে রয়েছে। তারা তাদের কৃতকর্মকে সামনে উপস্থিত পাবে। আপনার পালনকর্তা কারও প্রতি জুলুম করবেন না।” (সূরা কাহফ-৪৯) 

* চতুর্থ মূলনীতি 

অসৎকর্মফলসমূহ নয়; সকর্মফলসমূহ বাড়িয়ে দেয়া হবে।

 এটি হবে বান্দাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে সীমাহীন দয়া ও করুণার বহিঃপ্রকাশ। শাস্তি ও আযাব প্রদান অপেক্ষা দয়া ও ক্ষমাই আল্লাহর কাছে অধিক পছন্দনীয়।ফলে বান্দার সৎকর্মে 

সন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহ তা আরও বাড়িয়ে দেবেন। তবে অসৎকর্মফল তিনি ঘৃণা করেন ঠিকই, তবে তা বৃদ্ধি করবেন না। হতে পারে ক্ষমা করবেন অথবা শাস্তি দেবেন। আল্লাহ বলেন, 

و إن تقرضوا اله احساضعه لك ويغفرلكرة التغابن: ۱۷ 

“যদি তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দান কর, তবে তিনি। তোমাদের জন্যে তা দ্বিগুণ করে দেবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন।” (সূরা তাগাবুন-১৭)।

 সৎকর্মফল বৃদ্ধির সর্বনিম্নরূপ হল দশগুণ। আল্লাহ বলেন, 

ومن جاء بالحسنة فله عشر أمثالها و الأنعام: ۱۹۰| 

“যে একটি সৎকর্ম করবে, সে তার দশগুণ পাবে।” (সূরা আনআম-১৬০) 

পক্ষান্তরে অসৎকর্মফলের প্রতিদান হবে সমান। আল্লাহ বলেন, 

به 

ومن جاه النية فلا يرى إلا مثلها وهم لا يظلموت 

الأنعام: ۱۹۰| 

“এবং যে একটি মন্দকাজ করবে, সে তার সমান শাস্তিই পাবে। বস্তুত তাদের প্রতি জুলুম করা হবে না।” (সূরা আনআম-১৬০) ” নবী করীম সা. আপন প্রতিপালক থেকে বর্ণনা করে বলেন, “নিশ্চয় তোমাদের প্রতিপালক অসীম, দয়ালু। যে সৎকাজের ইচ্ছা করে, কিন্তু বাস্তবায়ন করতে পারেনি, তাকে একটি পুরস্কার দেয়া হয়। আর যদি বাস্তবায়ন করে, তবে তার জন্য দশটি থেকে সাতশত অথবা ততোধিক সংখ্যা পর্যন্ত পুরস্কার বৃদ্ধি করা হয়। পক্ষান্তরে যে অসৎকাজের ইচ্ছা করে, কিন্তু বাস্তবায়নের করতে পারেনি, তার জন্য কোনো গুনাহ নেই; বস্তুত পরিত্যাগের দরুন তার জন্য একটি পুরস্কার লিপিবদ্ধ হয়। আর যদি করে ফেলে, তবে একটি গুনাহই লেখা হয়। অথবা আল্লাহ তা মিটিয়ে দেন। এতকিছুর পরও যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে সেই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত।” (মুসনাদে আহমদ-২৫১৯) 

নবী করীম সা. এর ভাষ্য, “আল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি সৎকর্ম করবে, তার জন্য দশগুণ বা ততোধিক আমি বৃদ্ধি করে দেব। 

আর যে অসৎকর্ম করে, তার প্রতিদান সমান বা তাকে ক্ষমা করে দেব। কেউ যদি শিরক না করে ভূ-পৃষ্ঠভর অপরাধ নিয়ে। আমার কাছে আসে, আমি তার জন্য অনুরূপ ক্ষমা নিয়ে আসব। কেউ আমার দিকে এক হাত আগে বাড়লে আমি তার দিকে একগজ বেড়ে যাব। কেউ আমার দিকে এক গজ অগ্রসর হলে আমি তার দিকে দুই হাত এগিয়ে যাব। কেউ আমার দিকে হেটে আসলে আমি তার দিকে দৌড়ে যাব।” (মুসনাদে আহমদ ২১৩৬০)

 আল্লাহর পক্ষ থেকে অতিশয় দয়া ও অনুগ্রহের বহিঃপ্রকাশ যে, তিনি সকর্মফলগুলো দশ থেকে সাতশত গুণ বা ততোধিক পর্যন্ত বৃদ্ধি করে দেবেন। আল্লাহ বলেন, 

الوقت الذين ينفقون أمولهم في سبيل ال. كمل حتي نبتت سبع 

ل لتي أحبة والضيف لمن يشاء الله 

ستايل في 

هو البقرة: 261 

واسع عليه 

“যারা আল্লাহর রাস্তায় স্বীয় ধন সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উদাহরণ একটি বীজের মত, যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায়। প্রত্যেকটি শীষে একশত করে দানা থাকে। আর আল্লাহ যার জন্য চান, বৃদ্ধি করে দেন। আল্লাহ অতি দানশীল, সর্বজ্ঞ।” (সূরা বাক্কারা-২৬১)। 

* পঞ্চম মূলনীতি, সাক্ষ্য প্রতিষ্ঠা

 কেয়ামতের দিন বান্দার কৃতকর্মের সাক্ষী তার সাথেই থাকবে। দুনিয়াতে যেসব বস্তু সর্বদা তার সঙ্গে অবস্থান করত, বান্দা এগুলোকে সাক্ষী মনে করত না; প্রহরী ফেরেশতাবৃন্দ, লিপিকার ফেরেশতাদ্বয়, তার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ..! হ্যাঁ.. এগুলোই তার পক্ষে বিপক্ষে সাক্ষী দেবে।। আল্লাহ বলেন, 

و ما تكون في شي وماتتوأمثه من اير و مون من عمل إلا 

اليكر شهودا إ يوت فيه ومايقب عن بيك من ثقال در في الأرض ولا في السماء ولا أضمن ذلك ولا أ بالا في كتب 

که يونس: ۱۱ 

ممبيي 

“বস্তুতঃ যে কোনো অবস্থাতেই তুমি থাক এবং কোরআনের যে কোনো অংশ থেকেই পাঠ কর কিংবা যে কোনো কাজই তোমরা কর, অথচ আমি তোমাদের নিকটে উপস্থিত থাকি যখন তোমরা তাতে আত্মনিয়োগ কর। আর তোমার প্রতিপালক থেকে গোপন থাকে না একটি কণাও, না যমীনের এবং না আসমানের। না এর চেয়ে ক্ষুদ্র কোন কিছু আছে, না বড় যা এই প্রকৃষ্ট কিতাবে নেই।” (সূরা ইউনুস-৬১)।

 অন্যত্র আল্লাহ বলেন, 

شئو شهيدايه النساء: ۳۳ 

ات على 

وإن الله 

“নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা’লা সবকিছুই প্রত্যক্ষ করেন।” (সূরা 

আহকাফ-৮)

 পাশাপাশি নবী-রাসূলগণ এবং অন্যসব সৃষ্টিও সাক্ষী হবে। আল্লাহ বলেন, 

و كيف إذا جا من كل أمة بشهيد وجابك على هؤلاء شهیداة 

النساء: 41 | 

“আর তখন কী অবস্থা দাঁড়াবে, যখন আমি ডেকে আনব প্রতিটি উম্মতের মধ্য থেকে অবস্থা বর্ণনাকারী এবং আপনাকে ডেকে আনব তাদের উপর অবস্থা বর্ণনাকারীরূপে।” (সূরা নিসা-৪১)। আল্লাহ আরও বলেন, 

ل أقشهيدا قناه او برهنه القصص: 

وتزاين 

০ 

“প্রত্যেক সম্প্রদায় থেকে আমি একজন সাক্ষী আলাদা করব; অতঃপর বলব, তোমাদের প্রমাণ আন।” (সূরা কাসাস-৭৫) আল্লাহ বলেন, 

وجاءت كل نفر های وشهیدی که ق: ۲۱ 

“প্রত্যেক ব্যক্তি আগমন করবে, তার সাথে থাকবে চালক ও কর্মের সাক্ষী।” (সূরা কাফ-২১) 

সাক্ষী হিসেবে আরও থাকবে,

ভূমিঃ সে তার উপর কৃত আমলের সাক্ষ্য দেবে। 

ويؤمېډير أخبارها به الزلزلة: 4 | 

“সেদিন সে তার বৃত্তান্ত বর্ণনা করবে” (সূরা যিলযাল-৪) দিনরাতঃ তারা উভয়ে তাদের মাঝে কৃত আমলের সাক্ষ্য দেবে

 সম্পদঃ কোথেকে অর্জন করেছে এবং কী কাজে ব্যয় করেছে 

সে সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবে। 

ফেরেশতাঃ ব্যক্তির সকল কর্মের সাক্ষ্য দেবে। 

বান্দা যদি অস্বীকার করে,

 কেয়ামতের ময়দানে কোনো কোনো লোক আমলনামায় লিখিত কৃতকর্ম অস্বীকার করবে। মনে করবে, এসব তারা করেনি। বান্দা যখন বেশি বাড়াবাড়ি করবে, সাক্ষীদেরকে মিথ্যারোপ করবে, তখন আল্লাহ তার মুখ বন্ধ করে দেবেন। অঙ্গ প্রত্যঙ্গই তখন তার সকল কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে।.. কী ভয়াবহ সেই পরিস্থিতি..! 

হাত বলবে, আমার দ্বারা সে হারাম বস্তু স্পর্শ করেছে। পা বলবে, আমাকে ব্যবহার করে সে হারাম কাজে গিয়েছে। চোখ বলবে, আমার মাধ্যমে সে নিষিদ্ধ বস্তু দেখেছে। কান বলবে, আমাকে ব্যবহার করে সে হারাম শুনেছে। এভাবে নাক.. চামড়া.. সব অঙ্গই তার বিপক্ষে সাক্ষ্য দেবে। হে আল্লাহ.. আমাদের ক্ষমা করুন.. আমাদের দোষত্রুটি গোপন করুন! আল্লাহ বলেন, 

و بين أيديهم وتشهد أ هم ما 

على أقويه 

هو اليوم تحت 

که پس: ۹۵ 

بود 

او 

“আজ আমি তাদের মুখে মোহর এঁটে দেব তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে এবং তাদের পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে।” (সূরা ইয়াসিন-৬৫)

 আবু মুছা আশআরী রা. বলেন, কাফের মুনাফিককে কেয়ামতের দিন হিসাবের জন্য ডাকা হবে। প্রতিপালক তার সামনে কৃতকর্ম প্রকাশ করলে সে সামনাসামনি অস্বীকার করে বলবে, হে প্রতিপালক, আপনার মর্যাদার শপথ, এই ফেরেশতা আমার বিরুদ্ধে লিখেছে, আমি এগুলো করিনি। ফেরেশতা বলবে, তুমি অমুক দিন অমুক কাজটি করনি? সে বলবে, হে প্রতিপালক। অতঃপর তার মুখ বন্ধ করে দেওয়া হবে। অঙ্গ প্রত্যঙ্গই তখন তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। একথা বলে তিনি উপরোক্ত আয়াত পাঠ করছিলেন।” (তাবারানী)। 

নবী করীম সা. বলেন, “বান্দা বলবে, হে প্রতিপালক! জুলুম থেকে আমাকে রেহাই দেবেন না? প্রতিপালক বলবেন, অবশ্যই! সে বলবে, আমি শুধু আমার ভিতর থেকেই সাক্ষ্য গ্রহণ করব। প্রতিপালক বলবেন, তোমার হিসাব গ্রহণের জন্য আজ তুমিই যথেষ্ট। লিপিকার ফেরেশতাও আছে তোমার সাথে। অতঃপর তার মুখ বন্ধ করে দেয়া হবে। অঙ্গগুলোকে বলা হবে, বল! 

অতঃপর অঙ্গ তার সকল কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে। অতঃপর কথা | বন্ধ করে দিয়ে বলবেন, দূর হয়ে যাও! তোমার সাথেই আমি 

বিবাদ করছিলাম?! (ইবনে হিব্বান-৭৩১৮)। 

আল্লাহ বলেন, 

وتصهم وجودهم بما 

إذا ماجا وهاشهد عليه رسم 

و 

، فصلت:20 

او يعملون 

“তারা যখন জাহান্নামের কাছে পৌঁছাবে, তখন তাদের কান, চক্ষু ও ত্বক তাদের কর্ম সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবে।” (সূরা ফুসসিলাত ২০) 

* যে সব বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হবে 

الصافات: 24 | 

وقفهمم ا ول ( 

“এবং তাদেরকে থামাও, তারা জিজ্ঞাসিত হবে।” (সূরা সফফাত-২৪)। মানুষকে তার কৃতকর্ম, তার ইচ্ছা, তার কথা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। কুরআন হাদিসে যেসকল অপরাধ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার বিবরণ এসেছে 

() সর্ববৃহৎ অপরাধঃ শিরক 

আল্লাহর নিকট সর্ববৃহৎ অপরাধ হলো, বান্দা কোন সৃষ্টিকে তাঁর সমকক্ষ সাব্যস্ত করা। শিরকের অপরাধ কখনো আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। আল্লাহ বলেন, 

و الله لا يغفر أن يشرك به ويغما دون ذلك لمن يشا ومن يشرك بال؛ فقد فترى إما عظيادة النساء: 48 

“নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে লোক তাঁর সাথে শরীক করে। তিনি ক্ষমা করেন এর নিম্ন পর্যায়ের পাপ, যার জন্য তিনি ইচ্ছা করেন। আর যে লোক অংশীদার সাব্যস্ত করল আল্লাহর সাথে, সে যেন অপবাদ আরোপ করল।” (সূরা নিসা ৪৮)

 সকল পূজ্য সেদিন নিজেদেরকে তাদের উপাসনা থেকে মুক্ত ঘোষণা করবে এবং তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে অভিযোগ করবে। আল্লাহ বলেন, 

 “তাদেরকে বলা হবেঃ তারা কোথায়, তোমরা যাদের পূজা করতে আল্লাহর পরিবর্তে? তারা কি তোমাদের সাহায্য করতে পারে, অথবা তারা প্রতিশোধ নিতে পারে?” (সূরা শুআরা ৯২,৯৩) অন্যত্র বলেন, 

“যেদিন আল্লাহ তাদেরকে ডেকে বলবেন, তোমরা যাদেরকে আমার শরীক মনে করতে, তারা কোথায়?” (সূরা কাসাস-৭৪)। আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে জবাইকৃত জন্তু সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। আল্লাহ বলেন, 

عمان 

يبا ارزه تا ل 

ووجعلوك ما لا يعلو تفترون هكته النحل: 56 

“তারা আমার দেয়া জীবনোপকরণ থেকে তাদের জন্যে একটি অংশ নির্ধারিত করে, যাদের কোনো খবরই তারা রাখে না। আল্লাহর কসম, তোমরা যে অপবাদ আরোপ করছ, সে সম্পর্কে অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে।” (সুরা নাহল-৫৬) 

জিজ্ঞেস করা হবে রাসূলদের মিথ্যারোপ করা সম্পর্কে। আল্লাহ 

বলেন, “যে দিন আল্লাহ তাদেরকে ডেকে বলবেন, তোমরা রাসূলগণকে কী জওয়াব দিয়েছিলে? অতঃপর তাদের কথাবার্তা বন্ধ হয়ে যাবে এবং তারা একে অপরকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে না।” (সূরা কাসাস ৬৫,৬৬) 

() দুনিয়াতে কী করেছে?

 দুনিয়ায় কৃত তাদের ভালো-মন্দ আমল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। আল্লাহ বলেন, . 

 “অতএব আপনার পালনকর্তার কসম, আমি অবশ্যই ওদের। সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করব, ওদের কাজকর্ম সম্পর্কে।” (সূরা হিজর ৯২,৯৩) 

হ্যাঁ.. ধনী-গরিব, রাজা-বাদশা, আরব-অনারব, শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ ও স্বাধীন-কৃতদাস সকলেই জিজ্ঞাসিত হবে। এমনকি রাসূলদেরকেও আপন সম্প্রদায় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে এবং সম্প্রদায়কে তাদের রাসূল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। আল্লাহ বলেন, 

ليهم 

و قال الذين أرسل إليهولنك المرسلين ( قل 

يوم في الحق فمن تقل 

ا ين و والو 

بولر وما 

موازیهو أولك له الملوك ( ون ځقت موزيه و أوكيك 

و الأعراف: 6 

ريماكائو اياظليمون 

و أن 

الذين 

“অতএব আমি অবশ্যই তাদেরকে জিজ্ঞেস করব যাদের কাছে রসূল প্রেরিত হয়েছিল এবং আমি অবশ্যই জিজ্ঞেস করব রাসূলগণকে। অতঃপর আমি সজ্ঞানে তাদের কাছে অবস্থা বর্ণনা করব। বস্তুতঃ আমি অনুপস্থিত তো ছিলাম না। আর সেদিন যথাযথই ওজন হবে। অতঃপর যাদের পাল্লা ভারী হবে, তারাই সফলকাম হবে। আর যাদের পাল্লা হালকা হবে, তারাই এমন হবে, যারা নিজেদের ক্ষতি করেছে। কেননা, তারা আমার আয়াতসমূহ অস্বীকার করত।” (সূরা আ’রাফ ৬-৯) 

 নবী করীম সা. বলেন, “কেয়ামতের দিন চারটি বিষয়ে জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত কোন বান্দার পা সামান্য পরিমাণ নড়বে না- তার বয়স, সে তা কোন কাজে নিঃশেষ করেছে। তার জ্ঞান, সে অনুপাতে কতটুকু আমল করেছে।তার সম্পদ, কোথেকে উপার্জন আর কোথায় খরচ করেছে। তার দেহ, কোন কাজে তা খর্ব করেছে।” (তিরমিযী-২৪১৬)। 

() ভোগ বিলাসের বস্তু সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে 

 প্রশস্ত বাড়ী, দ্রুতগামী গাড়ী, সুস্বাদু খাদ্য ও নির্মল পানিয়, কোমল পোশাক, সেবক সেবিকা, পরিতৃপ্তি, সুঠাম ও সক্ষম দেহ, নির্মল নিদ্রা এমনকি পানকৃত মধু সম্পর্কেও জিজ্ঞেস করা হবে। আল্লাহ তা’লা বলেন, 

يوم عن اليمية التكاثر: ۸ 

اول 

“অবশ্যই সেদিন তোমরা নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।” (সূরা তাকাসুর-৮) 

 নবী করীম সা. বলেন, “কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম মানুষকে নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। বলা হবে, তোমাকে কি সুস্থ সবল দেহ দেইনি? তোমার জন্য শীতল পানিয়ের ব্যবস্থা করিনি?” (তিরমিযী-৩৩৫৮)

 সুতরাং কোনো নেয়ামতকেই ছোট মনে করা অনুচিত। 

একব্যক্তি আব্দুল্লাহ বিন আমর রা. কে জিজ্ঞেস করল, আমরা কি দরিদ্র মুহাজির ছিলাম না? উত্তরে আব্দুল্লাহ বললেন, তোমার। কি কোনো স্ত্রী আছে? সে বলল, হ্যাঁ! তিনি বললেন, থাকার মত বাড়ী আছে? বলল, হ্যাঁ..! বললেন, তবে তো তুমি ধনী। সে বলল, একজন খাদেমও আছে আমার! বললেন, তবে তো তুমি বাদশা।” (উমদাতুত তাফসীর)। 

() নাক, কান অন্তর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে বান্দা 

যতবেশি সামর্থ্যবান হবে, ততবেশি তাকে জিজ্ঞেস করা হবে। আল্লাহ বলেন, 

إن السمع والبصر والفؤاد كل 

كان ته مو ت و 

أولته الإسراء: ۳۹ 

“নিশ্চয় কান, চক্ষু ও অন্তঃকরণ। এদের প্রত্যেকটিই জিজ্ঞাসিত হবে।” (সূরা ইসরা-৩৬) 

 কাতাদাহ রা. বলেন, না দেখে কখনো দেখেছি বলো না। না শুনে কখনো শুনেছি বলো না। না জেনে কখনো জেনেছি বলো না। কারণ, এসব কিছু সম্পর্কেই তুমি জিজ্ঞাসিত হবে।” তাফসীরে ইবনে কাছীর) 

* সর্বপ্রথম যাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে 

সুদীর্ঘকাল মানুষ অপেক্ষমাণ থাকবে। সবার মনে চরম আতঙ্ক বিরাজ করবে। তাদের সামনে জাহান্নাম প্রদর্শন করা হবে। নবীগণ পর্যন্ত ভয়ে থাকবেন। অলিগণ অস্থির থাকবেন। মুমিনগণ পেরেশান হয়ে যাবেন। পাপিষ্ঠরা ঘর্মপুকুরে হাবুডুবু খেতে থাকবে। কেয়ামতের ময়দানের সেই সুদীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে হিসাবকার্য শুরু হবে.. শেষ নবীর প্রতি দয়া ও তার উম্মতকে মর্যাদা দিতে গিয়ে সর্বপ্রথম আল্লাহ তা’লা এই উম্মতের হিসাবকার্য শুরু করবেন। যেমনটি নবী করীম সা. বলেন, “আমরা সর্বশেষ জাতি এবং আমাদের হিসাবই সর্বাগ্রে গৃহীত হবে। বলা হবে, উম্মী জাতি এবং তাদের নবী কোথায়? সুতরাং আমরা সর্বশেষে এসেছি, তবে সর্বাগ্রে থাকব।” (ইবনে মাজা ৪২৯০)

 নবী করীম সা. আরো বলেন, “দুনিয়াবাসীর মধ্যে আমরাই সর্বশেষ জাতি। তবে কেয়ামতের দিন আমরাই সর্বাগ্রে থাকব। সকল সৃষ্টির পূর্বে আমাদেরই হিসাব-নিকাশ শুরু হবে।” (মুসলিম-২০১৯) 

* সর্বপ্রথম যে বিষয়ের ফায়সালা হবে

  অন্যের অধিকারে সবচেয়ে বড় অপরাধ হলো, অন্যায়ভাবে তার। রক্ত প্রবাহিত করা। বর্তমানকালে অস্ত্রশস্ত্র সহজলভ্য হওয়ায় খুনাখুনি ও হত্যাযজ্ঞ বেড়েই চলেছে। নবী করীম সা. 

একে কেয়ামতের নিদর্শন বলে আখ্যা দিয়েছেন। 

 “কেয়ামত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ না হত্যাযজ্ঞ বেড়ে যায়।” (বুখারী-মুসলিম)। 

রক্তের অধিকার সবচেয়ে বড় অধিকার। তাই সর্বপ্রথম এ বিষয়ের হিসাব শুরু হবে। 

 নবী করীম সা. বলেন, “কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যে বিষয়ের ফায়সালা হবে, তা হলো রক্তের অধিকার।” (মুসলিম-৪৪৭৫) 

নবী করীম সা. আরো বলেন, “কেয়ামতের দিন একজন অপরজনকে ধরে নিয়ে এসে বলবে, হে প্রতিপালক, সে আমাকে হত্যা করেছিল। আল্লাহ বলবেন, কেন তুমি তাকে হত্যা করেছিলে? সে বলবে, এজন্য হত্যা করেছি, যেন আপনার মর্যাদা উন্নীত হয়। প্রতিপালক বলবেন, মর্যাদা একমাত্র আমার জন্যই! অপর ব্যক্তি অন্য একব্যক্তিকে ধরে নিয়ে এসে বলবে, হে 

প্রতিপালক, সে আমাকে হত্যা করেছিল। আল্লাহ বলবেন, কেন তুমি তাকে হত্যা করেছিলে? সে বলবে, যেন অমুকের মর্যাদা। বৃদ্ধি পায়। প্রতিপালক বলবেন, মর্যাদা তার জন্য নয়। অতঃপর তার জন্য অপরাধ সাব্যস্ত হয়ে যাবে।” (তিরমিযী-৩০২৯)। প্রতিটি মানুষের উচিত, রক্তের অপরাধ থেকে দূরে থাকা। ঝগড়া-বিবাদ, হানাহানি, মারামারি পরিত্যাগ করা। গোস্বাকালে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। 

* বিচারদিবসে মানুষের অবস্থা

বিচারদিবস এক সুদীর্ঘ কঠিন দিবস, তবে আল্লাহ যার জন্য সহজ করে দেন। মানুষের অবস্থা সেদিন হবে বিভিন্ন রকম। মহা প্রতাপশালী আল্লাহর সামনে সেদিন সকলেই ভীত সন্ত্রস্ত থাকবে। একে অন্যকে চিনতে চাইবে না।পরস্পর বংশ ভুলে যাবে। আল্লাহ বলেন। 

کو 

يوم ولايته ون 

و إذا تي في الصور فلا أنساب بين 

; “অতঃপর যখন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে, সেদিন তাদের পারস্পরিক আত্মীয়তার বন্ধন থাকবে না এবং একে অপরকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে না।” (সূরা মুমিনুন-১০১)। 

বন্ধুত্ব যতই গভীর হোক, সম্পর্ক যতই পুরোনো হোক; কেয়ামতের দিন একে অন্যকে চিনতে চাইবে না। সকলেই নিজের পরিণাম নিয়ে চিন্তিত থাকবে। আল্লাহ বলেন, 

ووكيل مي حماية المعارج: ۱۰ 

“(সেদিন) বন্ধু বন্ধুর খবর নেবে না।” (সূরা মাআরিজ-১০) সেদিন মানুষ তার পরিবার ও বন্ধুদের থেকে পলায়ন করবে। ভাই-বোন থেকে দূরে থাকবে। সকল ক্ষমতার অবসান ঘটবে সেদিন। সকল প্রতাপশালী চরম লাঞ্ছনার শিকার হবে, 

طه: 

وعن الوجوه الحي القيوم وقد خاب من حمل ظلماه 

۱۱۱ 

“সেই চিরঞ্জীব চিরস্থায়ী সত্তার সামনে সব মুখমণ্ডল অবনমিত হবে এবং ব্যর্থ হবে যে জুলুমের বোঝা বহন করবে।” (সূরা ত্বাহা-১১১)। কত কঠিন হবে সেই দৃশ্য..!! 

 নবী করীম সা. বলেন, “রাসূলগণ ছাড়া সেদিন কেউ কথা বলার সাহস পাবে না।” (বুখারী-৭০০০)

 সেদিন সকলেই তার কৃতকর্ম হাতের সামনে উপস্থিত পাবে। আল্লাহ বলেন, 

في قاعملت من خير محضرا وماعملت من شو؟ 

ويوجد 

ابعيدا حكر لنفسه , وأله وفي 

ولو أن بينها وبيته بالعبادي که آل عمران: ۳۰ 

“সেদিন প্রত্যেকেই যা কিছু সে ভাল কাজ করেছে; চোখের সামনে দেখতে পাবে এবং যা কিছু মন্দ কাজ করেছে তাও, ওরা তখন কামনা করবে, যদি তার এবং এসব কর্মের মধ্যে ব্যবধান। দূরের হতো! আল্লাহ তাঁর নিজের সম্পর্কে তোমাদের সাবধান করছেন। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু।” (সূরা আলে ইমরান-৪০) 

* ব্যক্তির রেখে যাওয়া আমল 

আল্লাহ বলেন, 

ما 

و ا ح ي الموت و قدموا واثره وكل شىء أ يته في إمام ممبيين ي که 

 “আমিই মৃতদেরকে জীবিত করি এবং তাদের কর্ম ও কীর্তিসমূহ লিপিবদ্ধ করি। আমি প্রত্যেক বস্তু স্পষ্ট কিতাবে সংরক্ষিত রেখেছি।” (সূরা ইয়াছিন-১২)

 প্রতিপালক মানুষের অবস্থা এবং কৃতকর্ম সংরক্ষণ করছেন। হ্যাঁ.. সেদিন প্রতিটি বস্তুর যথাযথ হিসাব নেওয়া হবে। দুনিয়াতে যা সে করেছে; কুরআনের জ্ঞান শিখেছে এবং এর প্রচার করেছে, সেবামূলক কাজ করেছে, নলকূপ স্থাপন করেছে, নদী প্রবাহিত করেছে, এতিমকে লালন করেছে, জ্ঞানের প্রসার করেছে অথবা সুসন্তান রেখে গেছে।এ সবই মৃত্যুর পর তার জন্য সাদাকায়ে জারিয়ার উপকরণ হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি হারাম বস্তু রেখে গেছে। যেমন, মদ্যশালা, নৃত্যাগার, অশ্লীল টিভি চ্যানেল অথবা উপকথা সম্বলিত পুস্তক, তবে এসবই মৃত্যুর পর তার জন্য গুনাহ সরবরাহের মাধ্যম 

হবে। হাশরের ময়দানে সবকিছুই সে উপস্থিত দেখতে পাবে। আল্লাহ বলেন, 

ولو 

أ بل الإنس على 

نبيه بصير 

ويتبوأ الإنس يميز بما قد 

القيامة: ۱۳ – ۱۰ | 

ألقى معاذيره. ( 

“সেদিন মানুষকে অবহিত করা হবে যা সে সামনে প্রেরণ করেছে ও পশ্চাতে ছেড়ে দিয়েছে। বরং মানুষ নিজেই তার নিজের চক্ষুষ্মন। যদিও সে তার অজুহাত পেশ করতে চাইবে।” (সূরা কিয়ামাহ ১৩-১৫)

 যে ব্যক্তি কোন গুনাহকে ছোট মনে করল, কেয়ামত দিবসে আল্লাহ তা বড় করে দেখবেন। 

নবী করীম সা. বলেন, “তোমরা ছোট গুনাহ থেকে বেঁচে থেকো! কেননা তার উদাহরণ ঐ দলের ন্যায়, যারা একটি উপত্যকায়। অবস্থান করল। সবাই ছোট ছোট লাকড়ি এনে জমা করল। অতঃপর লাকড়িগুলো দিয়ে তারা রুটি পাক করে খেলো। ছোট গুনাহের জন্য কাউকে ধরে ফেলা হলে নির্ঘাত সে ধ্বংস হয়ে যাবে।” (আল-মু’জামুল কাবীর-৫৮৭২) 

* অধিকার আদায়ের ধাপসমূহ 

অধিকার (হক) আদায় বলতে কোনো বস্তুকে তার প্রকৃত মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেয়া। মানুষের জন্য আল্লাহ অধিকার নির্ধারণ করেছেন। আল্লাহ নিজের জন্যও কিছু অধিকার ধার্য করেছেন। উভয় প্রকার অধিকারে যদি বিন্দুমাত্র খর্ব করা হয়, তবে এর জন্য জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন হতে হবে। 

আল্লাহর হক

 বান্দাদের উপর আল্লাহর অধিকার (হক) হল, তারা কেবল তাঁরই ইবাদত করবে। তাঁর সঙ্গে কাউকে শরীক সাব্যস্ত করবে 

। নামায প্রতিষ্ঠা করবে। যাকাত আদায় করবে। অন্যান্য এবাদতগুলো যত্নসহকারে আদায় করবে। কেয়ামতের দিন প্রথম প্রশ্নই হবে, “দুনিয়াতে তোমরা কীসের এবাদত করতে? রাসূলদের আহ্বানে তোমরা কতটুকু সাড়া দিয়েছিলে?”.. 

এবাদতসমূহের মধ্যে সর্বপ্রথম হিসাব হবে নামাযের.. 

নবী করীম সা. বলেন, “কেয়ামতের দিন বান্দার আমলের মধ্যে সর্বপ্রথম হিসাব হবে নামাযের। নামাযের হিসাব ঠিকঠাক থাকলে সে সফলকাম হয়ে যাবে। আর যদি নামাযে ধরা খেয়ে যায়, তবে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। তবে যদি সামান্য ঘাটতি থাকে, তবে প্রতিপালক বলবেন, দেখ বান্দার কোনো নফল এবাদত আছে কিনা! থাকলে সেগুলো দিয়ে ফরয। 

নামাযের ক্ষতিগুলো পূরণ করা হবে। এরপর অন্যসব আমলের হিসাব নেয়া হবে।” (তিরমিযী-৪১৩) 

বান্দার হক

 আল্লাহ মানুষের একে অন্যের উপরও কিছু হক নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। পিতার কিছু হক রয়েছে সন্তানের উপর। আবার সন্তানের কিছু অধিকার রয়েছে পিতার উপর। প্রতিবেশীর কিছু হক রয়েছে। স্বামী স্ত্রীর পারস্পরিক হক রয়েছে এমনকি জীবজন্তুর প্রতিও কিছু হক রয়েছে। বান্দার হকসমূহের মধ্যে কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম হিসাব হবে রক্তের অধিকার। সুতরাং যে ব্যক্তি অন্যের হাতে খুন হলো অথবা ছুরিকাঘাতে আহত হলো.. এর বিচার হবে সর্বপ্রথম। যেমনটি পূর্বোক্ত হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। 

মানুষকে প্রহার করে অভ্যস্ত 

কেয়ামতের দিন প্রহারের মাধ্যমে এ ধরণের ব্যক্তিদের থেকে তারা প্রতিশোধ নেবে 

 নবীজী আরো বলেন, “কোনো লোক যদি অপর কোনো লোককে প্রহার করে, তবে কেয়ামতের দিন তার থেকে অনুরূপ প্রতিশোধ নেয়া হবে।” (মুসনাদে বাযযার)

 নবী করীম সা. বলেন, “অন্যায়ভাবে যাকে চাবুক দিয়ে আঘাত করা হয়েছে, কেয়ামতের দিন সে এর বদলা গ্রহণ করবে।” (বুখারী-মুসলিম)। 

 নবী করীম সা. এর সম্মানিত স্ত্রী উম্মে সালামা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা নবী করীম সা. আমার ঘরে ছিলেন। তাঁর হাতে ছিল মিসওয়াক। তিনি ছোট সেবিকাকে ডাকছিলেন। (কয়েকবার ডাকার পর) রাগান্বিত হয়ে গেলেন। অতঃপর উম্মে সালামা ঘর থেকে বেরিয়ে দেখলেন সে জন্তু নিয়ে খেলা করছে। 

বললেন, নবীজী তোমাকে ডাকছেন আর তুমি এখানে জন্তু নিয়ে খেলা করছ?! সে নবীজীর কাছে এসে বলল, ঐ সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্য দিয়ে প্রেরণ করেছেন, আমি শুনতে পাইনি। তখন আল্লাহর রাসূল বললেন, কেয়ামতের দিন প্রতিশোধের ভয় না থাকলে আমি এই মিসওয়াক দিয়ে তোমাকে ব্যথিত করতাম।” (আল-মু’জামুল কাবীর-৮৮৯) 

পাওনাদার

মানুষের হক কখনো বৃথা যাবে না। আল্লাহ তা’লা সকলকে নিজ নিজ অধিকার বুঝিয়ে দেবেন। এমনকি তা সামান্য হলেও! 

 নবী করীম সা. বলেন, “কেউ যদি  অন্যের উপর অবিচার করে থাকে, তবে আজই যেন সে তা মীমাংসা করে নেয়। সেদিন আসার পূর্বেই, যেদিন দিরহাম-দীনার বলতে কিছু থাকবে না। সৎকর্ম থাকলে অবিচার অনুপাতে কেটে নেয়া হবে। নচেৎ 

তার কৃত অপরাধের বোঝা তাকে বহন করতে হবে।” (বুখারী)। পাওনাদার আখেরাতে অবশ্যই তার পাওনা বুঝে নেবে। হয়ত সৎকর্মফল নিয়ে নেবে অথবা অসৎকর্মফলের বোঝা তার ঘাড়ে চাপিয়ে দেবে। দুনিয়ার স্বর্ণমুদ্রা বা রৌপ্যমুদ্রা সেখানে কোনই কাজে আসবে না। 

অপবাদ আরোপকারী 

কারো প্রতি ব্যভিচারের অপবাদ আরোপকারীকে দুনিয়াতেও এবং আখেরাতেও শাস্তি প্রদান করা হবে। এমনকি কৃতদাসের উপর ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ করলে কেয়ামতের দিন। মনিবের উপর যিনার দণ্ড কার্যকর হবে। 

নবী করীম সা. বলেন, “যে ব্যক্তি তার কৃতদাসকে যিনার অপবাদ দিল, বাস্তবে এমনটি না হলে কেয়ামতের দিন তাকে বেত্রাঘাত করা হবে।” (মুসলিম-৪৪০১) 

দরিদ্রদের নিপীড়নকারী

 শক্তি, প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে গরিব-দুঃখী মানুষকে নিপীড়নকারী থেকে কেয়ামতের দিন বদলা নেয়া হবে। 

 ” আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে যে, একব্যক্তি নবী করীম সা. এর সামনে বসে বলতে লাগল, হে আল্লাহর রাসূল, আমার কিছু কৃতদাস রয়েছে। তারা আমাকে মিথ্যা বলে, আমার সাথে অবাধ্যতা ও বিশ্বাসঘাতকতা করে। ফলে আমি তাদের। গালমন্দ করি। প্রহার করি। এতে কি আমার কিছু হবে? নবীজী উত্তরে বললেন, যতটুকু তারা তোমার অবাধ্য হয়েছে বা মিথ্যারোপ করেছে বা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে ততটুকু তাদের থেকে হিসাব নেয়া হবে। আর তাদের প্রতি তোমার শাস্তি যদি অপরাধ অনুপাতে হয়ে থাকে, তবে তাতে তোমার কোনো সমস্যা হবে না। তবে যদি মাত্রাতিরিক্ত শাস্তি দিয়ে থাক, তবে অতিরিক্ত শাস্তির প্রতিশোধ তোমাকে কেয়ামতের দিন পেতে হবে।” একথা শুনে ব্যক্তি হাউমাউ করে কাঁদকে আরম্ভ করল। আল্লাহর রাসূল বললেন, তুমি কি আল্লাহর গ্রন্থ পাঠ কর না? (অর্থ-) “আমি কেয়ামতের দিন ন্যায়বিচারের মানদণ্ড স্থাপন। করব। সুতরাং কারও প্রতি জুলুম হবে না। যদি কোনো আমল। সরিষার দানা পরিমাণও হয়, আমি তা উপস্থিত করব এবং হিসাব গ্রহণের জন্যে আমিই যথেষ্ট।” (সূরা আম্বিয়া-৪৭) তখন ব্যক্তিটি বলল, এখন তাদেরকে স্বাধীন করে দেয়াটাই আমার জন্য শ্রেয় মনে করছি। আপনাকে সাক্ষী রেখে বলছি, আজ থেকে তারা সকলেই স্বাধীন।” (তিরমিযী-৩১৬৫)। 

এই হল অবিচারের পরিণাম। অবশ্যই তা থেকে আমাদের | বিরত থাকা উচিত। অবিচার কেয়ামতের দিন অন্ধকার হয়ে 

দেখা দেবে। 

প্রশ্ন, কেয়ামতের দিন কীভাবে প্রতিশােধ নেয়া হবে? উত্তরঃ অবিচারের পরিবর্তে যদি তার সৎকর্মফল 

থাকে, তবে অনুরূপ কেটে নেয়া হবে। অন্যথায় অবিচারককে তাদের পাপভার বহন করতে হবে।

নবী করীম সা. বলেন, “কেউ যদি অন্যের উপর অবিচার করে থাকে, তবে আজই যেন সে তা মীমাংসা করে নেয়। সেদিন। আসার পূর্বেই, যেদিন দিরহাম-দীনার বলতে কিছু থাকবে না। সৎকর্ম থাকলে অবিচার অনুপাতে কেটে নেয়া হবে। নচেৎ তার কৃত অপরাধের বোঝা তাকে বহন করতে হবে।” (বুখারী ২৩১৭) 

জীবজন্তুদের হক 

পরম সুবিচারের বহিঃপ্রকাশ হল, কেবল মানুষের পারস্পরিক নয়; বরং জীবজন্তুদের পারস্পরিক অন্যায় অবিচারের প্রতিশোধও আল্লাহ গ্রহণ করবেন। 

নবী করীম সা. বলেন, “নিশ্চয় কেয়ামতের দিন সকল অধিকার ফিরিয়ে দেয়া হবে; এমনকি শিংবাহী ছাগল থেকে শিংবিহীন ছাগল (দুনিয়াতে কৃত আঘাতের পরিবর্তে) প্রতিশোধ গ্রহণ করবে।” (মুসলিম-৬৭৪৫)। কেউ যদি জীবজন্তুকে কষ্ট দিয়ে থাকে, তবে আখেরাতে এর বদলা নেয়া হবে। 

 নবী করীম সা. বলেন, “জনৈক মহিলা একটি বিড়ালকে আটকে রেখে কষ্ট দিয়েছিল। বিড়ালটি কষ্টে মৃত্যুবরণ করলে এর পরিবর্তে ঐ মহিলা জাহান্নামে গিয়েছিল। আল্লাহ বললেন, আবদ্ধ রেখে তুমি তাকে খাদ্য দাওনি, পানি দাওনি; জমিন থেকে কিছু খাওয়ার জন্য ছেড়েও দাওনি।” (বুখারী-২২৩৬)। এটিই হলো আল্লাহ তা’লার ন্যায়পরায়ণতার শীর্ষ চূড়া। সকলের। প্রাপ্যই তিনি যথাযথভাবে বুঝিয়ে দেবেন। 

* হাশরের বিচারালয়ে সাক্ষীবৃন্দ

 কেয়ামতের দিন পুরো ময়দান প্রতিপালকের নূর দ্বারা আলকিত থাকবে। সৃষ্টির বিচারকার্য সমাধা করতে তিনি নূর ছড়িয়ে দেবেন। নবী ও শহীদদেরকে উপস্থিত করা হবে। আল্লাহ বলেন, 

و وأشرقي الأر بور ربها ووضع الكتب وأيء بالتي 

و الزمر: 19 

والشهداء وقضى بينظر بالحق وهم لا يظلمون 

“জমিন তার পালনকর্তার নূরে উদ্ভাসিত হবে, আমলনামা স্থাপন করা হবে, নবী ও সাক্ষীগণকে আনা হবে এবং সকলের মধ্যে ন্যায় বিচার করা হবে- তাদের প্রতি অবিচার করা হবে না।” (সূরা যুমার-৬৯)। প্রশ্ন, কারা সেই সাক্ষী এবং কীসের উপর সাক্ষ্য দেবে? স্বয়ং আল্লাহ সর্বপ্রথম মানুষকে তাদের আমল জানিয়ে দেবেন। তিনিই প্রধান সাক্ষী।কোন কিছুই তার থেকে গোপনীয় নয়। আল্লাহ বলেন, 

ووالله شهید علی ماموت ( که آل عمران: ۹۸ 

“তোমরা যা করছ তা তিনি প্রত্যক্ষ করছেন।” ( সূরা আলে ইমরান-৯৮) 

আমাদের নবী মোহাম্মাদ সা. তাঁর উম্মত সকল সম্প্রদায়ের উপর সাক্ষী হবে। 

নবী রাসূলদেরকে আল্লাহ তা’লা সৃষ্টির প্রতি রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছিলেন। তারা মানুষকে সুসংবাদ দিয়েছেন এবং ভীতি প্রদর্শন করেছেন। কেউ তাদের কথা শুনেছে আবার কেউ তাদেরকে মিথ্যারোপ করেছে। কেয়ামতের দিন সকল সৃষ্টি যখন আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে- আল্লাহর ভাষ্য, 

عليهم 

وقت الذين أرسل إليه ولكل الممسلين ؟ قلتق 

الأعراف: 6 -۷ 

بين 

بعير وما 

“অতএব, আমি অবশ্যই তাদেরকে জিজ্ঞেস করব যাদের কাছে রাসূল প্রেরিত হয়েছিল এবং আমি অবশ্যই রাসূলদেরকে জিজ্ঞেস করব। অতঃপর আমি সজ্ঞানে তাদের কাছে অবস্থা বর্ণনা কর। বস্তুতঃ আমি অনুপস্থিত ছিলাম না।” (সূরা আ’রাফ ৬,৭)।

 বিভিন্ন সম্প্রদায় যখন তাদের কাছে আগত রিসালাতকে অস্বীকার করবে, তখন নবী মোহাম্মাদ সা. এবং তাঁর উম্মত সেই নবী রাসূলদের পক্ষে সাক্ষ্য দেবেন। আল্লাহ বলেন, 

ولتكونوا شهداء على ألای کوه البقرة: ۱۶۳ 

“যাতে করে তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানবমণ্ডলীর জন্যে..” (সূরা বাক্কারা-১৪৩)।

নবী করীম সা. বলেন, “কেয়ামতের দিন নূহকে ডাকা হবে। তিনি বলবেন, “উপস্থিত হে প্রতিপালক”। জিজ্ঞেস করা হবে, তুমি কি বাণী পৌঁছিয়েছিলে? বলবেন, হ্যাঁ।তার উম্মতকে জিজ্ঞেস করা হবে, তিনি কি তোমাদেরকে বাণী পৌঁছিয়েছেন? সকলেই বলবে, আমাদের কাছে কোনো ভীতি প্রদর্শনকারী আসেনি। প্রতিপালক বলবেন, তোমার পক্ষে কে সাক্ষ্য দেবে হে নূহ! তিনি বলবেন, মোহাম্মাদ ও তাঁর উম্মত। অতঃপর তোমরা তার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে। এটিই হলো আল্লাহর বাণীর মর্মার্থ “এমনিভাবে আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী সম্প্রদায় করেছি। যাতে করে তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানবমণ্ডলীর জন্যে” (সূরা বাক্কারা-১৪৩)

 সুতরাং উম্মতে মোহাম্মাদী হলো কেয়ামতের দিন সকল মানুষের উপর সাক্ষী। অন্য বর্ণনায়- উম্মতে মোহাম্মাদী সকল নবীদের পক্ষে তাদের সম্প্রদায়ের উপর সাক্ষ্য দেবে। 

নবী করীম সা. বলেন, “কেয়ামতের দিন একজন নবী আসবে, যার অনুসারী কেবল একজন। আরেকজন আসবে, যার অনুসারী দু’জন বা ততোধিক। তাকে বলা হবে, তুমি কি আপন সম্প্রদায়ের কাছে বাণী পৌঁছিয়েছ? তিনি বলবেন, হ্যাঁ..। অতঃপর তাদের সম্প্রদায়কে ডেকে বলা হবে, সে কি তোমাদের কাছে বাণী পৌঁছিয়েছে? তারা বলবে, । নবীকে বলা হবে, কে তোমার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে? বলবে, মোহাম্মাদ ও তাঁর উম্মত। অতঃপর উম্মতে মোহাম্মাদীকে ডেকে জিজ্ঞেস করা হবে, সে কি আল্লাহর বাণী পৌঁছিয়েছে? সকলেই বলবে, হ্যাঁ..! প্রতিপালক। বলবেন, তোমরা কী করে জানলে? তারা বলবে, আমাদের নবী আমাদেরকে অবহিত করেছেন যে, নবীগণ আল্লাহর বাণী পৌঁছিয়েছেন। আর আমরা নবীর কথা সত্যায়ন করেছি।” (মুসলিম-৫৪৯) 

নবী মোহাম্মাদ সা. স্বীয় উম্মতের উপর সাক্ষী 

তিনি সাক্ষ্য দেবেন যে, তিনি উম্মতের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছিয়েছেন। তাদেরকে ভীতিপ্রদর্শন করেছেন। সকল কল্যাণকর বিষয়ে সংবাদ শুনিয়েছেন। সকল অনিষ্ট থেকে তাদের সতর্ক করেছেন। আল্লাহ বলেন, 

ل أمة بشهيد وجابك على هؤلاء 

هو فكيف إذا جتا من شهيدايه النساء: ۶۱ 

الله

“আর তখন কী অবস্থা দাঁড়াবে, যখন আমি ডেকে আনব প্রতিটি উম্মতের মধ্য থেকে অবস্থা বর্ণনাকারী এবং আপনাকে ডাকব তাদের উপর অবস্থা বর্ণনাকারীরূপে।” (সূরা নিসা-৪১) কেয়ামতের সেই সাক্ষ্যর বিষয়টি স্মরণ করে তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন। এমনকি অতি ক্রন্দনের ফলে তাঁর দাড়ি ভিজে উঠেছিল (তাঁর জন্য আমার পিতা-মাতা উৎসর্গ হোক) 

 একদা তাঁর নিকট আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ বসা ছিলেন। তিনি বললেন, আমাকে কুরআন পড়ে শুনাও! ইবনে মাসউদ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনার উপরই তো কুরআন অবতীর্ণ হয়, আমি আপনাকে পড়ে শুনাবো? নবীজী বললেন, আমি অন্যের থেকে কুরআন শ্রবণ পছন্দ করি। ইবনে মাসউদ রা. বলেন, অতঃপর আমি সূরায়ে নিসার কিছু আয়াত পাঠ করে এই আয়াত পর্যন্ত পৌঁছলাম- (অর্থ-) “আর তখন কী অবস্থা দাঁড়াবে, যখন আমি ডেকে আনব প্রতিটি উম্মতের মধ্য থেকে অবস্থা বর্ণনাকারী এবং আপনাকে ডাকব তাদের উপর অবস্থা বর্ণনাকারীরূপে।” নবীজী বললেন, ব্যাস..! আমি নবীজীর দিকে তাকিয়ে দেখলাম তাঁর দু’চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে।” (বুখারী ৪৭৬৩) 

কী পরিমাণ দয়া ও ভালোবাসা ছিল উম্মতের প্রতি। সুতরাং উম্মত হিসেবে আমরা যেন তার সেই সুধারণা রক্ষা করি। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে তাঁকেও খুশি করে তুলি। 

প্রত্যেক রাসূল স্বীয় উম্মতের উপর সাক্ষী

 অতঃপর নবীগণ নিজ নিজ সম্প্রদায়ের জন্য সাক্ষী হয়ে আসবেন। তারা আপন সম্প্রদায়ের প্রতি আল্লাহর বাণী পৌঁছানোর এবং শিরকের পরিণাম সম্পর্কে তাদেরকে সতর্ক করার পক্ষে সাক্ষী দেবেন। আল্লাহ বলেন, 

فلموت 

ل أم شهيدا قلاه او برهن 

وتزامن 

و القصص: ۷۰ 

الحق له وضل عنهم مااأيفون 

“প্রত্যেক সম্প্রদায় থেকে আমি একজন সাক্ষী আলাদা করব; অতঃপর বলব, তোমাদের প্রমাণ আন। তখন তারা জানতে পারবে যে, সত্য আল্লাহর এবং তারা যা গড়ত, তা তাদের কাছ থেকে উধাও হয়ে যাবে।” (সূরা কাসাস-৭৫)                 আয়াতে সাক্ষী বলতে নবীগণ উদ্দেশ্য। 

প্রহরী ফেরেশতাগণ

 প্রহরী ফেরেশতাগণ কখনই মানুষ থেকে পৃথক হন না। জাগ্রত অবস্থায় বা নিদ্রায়.. সর্বক্ষণ তারা আমল সংরক্ষণের কাজে ব্যস্ত। মানুষের সকল কথা এবং কাজ তারা সংরক্ষণ করেন। আল্লাহ তা’লা বলেন, 

علي شهواه يونس: ۱۱ 

ولا من من عمل إلا 

“যে কোন কাজই তোমরা কর আমি তোমাদের নিকট উপস্থিত থাকি।” (সূরা ইউনুস-৬১)

 কেয়ামতের দিন তারা মানুষের জন্য সাক্ষী দেবে। কতবার সে নামায পড়েছে, কতবার সে আল্লাহর দরবারে দোয়া করেছে, কতবার কুরআন পাঠ করেছে।

মানুষ নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে 

কৃত পাপের স্বীকারোক্তি দেবে। কাফেররা তাদের কুফুরি সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবে। অপরাধীরা তাদের অপরাধের কথা বলতে থাকবে। একাধিক সাক্ষীর উপস্থিতিতে তারা অস্বীকার করার সাহস পাবে না। আল্লাহ বলেন, 

که 

كافرین 

أ كائو 

و وشهدوا على أنهت 

الأنعام: ۱۳۰ 

“তারা নিজেদের বিরুদ্ধে স্বীকার করে নিয়েছে যে, তারা কাফের ছিল।” (সূরা আনআম-১৩০)। 

জমিনের সাক্ষ্য

 জমিন তার উপর কৃত সকল আমলের সাক্ষ্য দেবে। নামাযী ব্যক্তির নামায সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবে। মুজাহিদদের প্রতিটি পদক্ষেপ সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবে। পাশাপাশি ব্যভিচারীর ব্যভিচার সম্পর্কেও সাক্ষ্য দেবে। চুরের চুরি বলে দেবে। খুনির খুন ফাঁস করে দেবে। অপরাধীদের সেদিন পলায়নের কোনো পথ থাকবে না। আল্লাহ বলেন, 

“সেদিন সে তার বৃত্তান্ত বর্ণনা করবে, কারণ আপনার পালনকর্তা তাকে আদেশ করবেন।” (সূরা যিলযাল ৪,৫) 

 আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, একদা নবী করীম সা. উপরোক্ত আয়াত পাঠ করে বলতে লাগলেন, তোমরা কি জান জমিনের বৃত্তান্ত-বর্ণনা কী? সবাই বলল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই অধিক জানেন। বললেন, তার বৃত্তান্ত-বর্ণনা হল, প্রত্যেক স্বাধীন ও কৃতদাস তার বুকে কী কী কাজ করেছে সেগুলো প্রকাশ করা। সে বলবে, অমুক আমার উপর অমুক দিন অমুক কাজ করেছে..!” (তিরমিযী-২৪২৯)

নবীজী আরো বলেন, “তোমরা জমিনকে সংরক্ষণ কর, কারণ তা হল তোমাদের মাতা সদৃশ। মানুষ তার উপর যত কাজ করেছে, কেয়ামতের দিন সে সকল কাজের সাক্ষ্য দেবে।” (তাবারানী) 

পালনকর্তার সাথে সাক্ষাত করতে হবে, তাঁর সামনে দাঁড়াতে হবে জানার পরও মানুষ কী করে অপরাধে লিপ্ত হয়! 

অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সাক্ষ্য

 যে চোখ দিয়ে সে দেখেছে, যে কান দিয়ে। সে শুনেছে, যে হাত দিয়ে সে স্পর্শ করেছে, যে পা দিয়ে হেটে চলেছে; এমনকি দেহের চামড়াও একদিন সাক্ষ্য দেবে। তেমনি পেট, পিঠ, গোছা, উরু ইত্যাদিও..! আল্লাহ বলেন, 

أيديهم 

على أقويه و 

و اليوم 

ا يكسبون ( که 

وتشهد أهم بما 

\০ : 

৩ 

“আজ আমি তাদের মুখে মোহর এঁটে দেব তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে এবং তাদের পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে।” (সূরা ইয়াসিন-৬৫)। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, 

و يوم تشهد عليهم أله وأيديهو وأهم ما كانو يعملون ع النور: 24 

“যেদিন প্রকাশ করে দেবে তাদের জিহ্বা, তাদের হাত ও তাদের পা, যা কিছু তারা করত।” (সূরা নূর-২৪) 

আনাছ রা. বলেন, একদা আমরা নবী করীম সা. এর কাছে ছিলাম, তিনি হেসে দিয়ে বললেন, তোমরা কি বুঝতে পারছ। কীজন্যে আমি হাসছি? বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই অধিক জানেন। বললেন, আল্লাহর সাথে বান্দার সংলাপ স্মরণ করে..। বান্দা বলবে, হে প্রতিপালক! আপনি কি আমাকে অবিচার থেকে 

মুক্তি দেবেন না? প্রতিপালক বলবেন, অবশ্যই! সে বলবে, আজ আমি নিজসত্তা ছাড়া অন্য কারো সাক্ষ্য গ্রহণ করব না। অতঃপর প্রতিপালক বলবেন, তোমার সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আজ তুমিই যথেষ্ট। পাশাপাশি তোমার সাথে আছে লিপিকার ফেরেশতা। অতঃপর তার মুখ বন্ধ করে দেয়া হবে। অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে বলা হবে, বল! অতঃপর অঙ্গসমূহ তার কৃতকর্মের বিবরণ তুলে। ধরবে। অতঃপর পুনরায় কথা বলার অনুমতি দেয়া হলে সে নিজের অঙ্গসমূহকে লক্ষ্য করে বলবেঃ ধিক তোদের! তোদের বাঁচানোর জন্যই তো আমি মিথ্যা বলছিলাম। তোদেরকে আগুন থেকে রক্ষা করতে চেয়েছিলাম।” (মুসলিম-৭৬২৯)। অন্য হাদিসে নবী করীম সা. কেয়ামতের দিন বান্দাদের প্রশ্নোত্তর পর্বের বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন, 

“.. অতঃপর তৃতীয়জন অনুরূপ বলতে থাকবে। বলবে, হে প্রতিপালক, আমি আপনার প্রতি, আপনার কিতাবসমূহের প্রতি, আপনার রাসূলদের প্রতি বিশ্বাসী ছিলাম। দুনিয়াতে আমি নামায পড়েছি, রোযা রেখেছি, যাকাত আদায় করেছি.. এভাবে যতগুলো পারবে বলবে। প্রতিপালক বলবেন, এখানে এসেও মিথ্যা বলছ? অতঃপর বলা হবে, এখন আমার পক্ষের সাক্ষী বের করব। এমনসময় সে নিজেকে নিয়ে চিন্তা করতে থাকবে; কে তার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে পারে..! অতঃপর তার মুখে মোহর এঁটে দেওয়া হবে।উরু, মাংস ও হাড়কে বলা হবে, সাক্ষ্য দাও! অতঃপর এগুলো তার কৃতকর্ম সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবেঃ এ হলো 

মুনাফিক, এ হলো মিথুক, নিজের সম্পর্কে সে অজুহাত পেশ করছে, এর উপর প্রতিপালক অসন্তুষ্ট হয়েছেন।” (মুসলিম ৭৬২৮) 

পাথর বৃক্ষকুলের সাক্ষ্য

 এগুলোও কেয়ামতের দিন মানুষের পক্ষে বিপক্ষে সাক্ষ্য দেবে। মুয়াযযিনের জন্য আযানের সাক্ষ্য দেবে। হাদিসে আছে,  “মুয়াযযিনের আযানের ধ্বনি। যতদূর পর্যন্ত পৌঁছায়, তত দূর পর্যন্ত যত জ্বিন, ইনসান এবং যত বস্তু রয়েছে, সকলেই তার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে।” (বুখারী ৫৮৪) 

। 

। 

হিসাব গ্রহণের পূর্বে নিজের হিসাব নিজেই করে নাও! 

আমল পরিমাপের পূর্বে নিজের আমল মেপে নাও! আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে যাও! 

মীযান (মানদণ্ড) 

হাশরের ময়দানে সবাইকে যথাযথ প্রতিফল প্রদানের জন্য মানুষের কৃতকর্ম পরিমাপ করতে মানদণ্ড স্থাপন করা হবে। আমল পরিমাপের ধাপ শুরু হবে প্রশ্নোত্তর ও হিসাব নিকাশ শেষে। কারণ, হিসাব-নিকাশ হলো আমলের প্রতিদান নির্ধারণের জন্য, আর পরিমাপ হলো আমলের পরিমাণ নির্ণয়ের জন্য; যেন পরিপূর্ণ প্রতিফল সাব্যস্ত হয়, বিন্দুমাত্র তারতম্যের কোন। অবকাশ না থাকে। 

* কী সেই মীযান? 

* কী তার বৈশিষ্ট্য? কেমন তার আকৃতি?

 * কী পরিমাপ করা হবে? 

* সকল কৃতকর্মই কি মাপে আসবে? 

ভূমিকা 

মীযান (মানদণ্ড) স্থাপন সংক্রান্ত দলীলসমূহ 

মীযান এর আকৃতি

 সূক্ষ্ম পরিমাপ

 মীযানে কী কী রাখা হবে।

 ওজন অনুযায়ী পরিণাম নির্ধারণ 

কাফেরদের আমলসমূহ

 মীযানে সবচে’ ভারী আমল 

ভূমিকা

 আল্লাহ তা’লা কুরআনুল কারীমে মীযানের কথা উল্লেখ করে তার জন্য যথাযথ প্রস্তুতি নিতে মানুষকে আদেশ করেছেন। নবী করীম সা, মীযানের বর্ণনা দিয়ে তাতে ভারী ও হালকা আমল। সম্পর্কে উম্মতকে অবহিত করেছেন। 

* মীযান স্থাপন সংক্রান্ত প্রমাণ 

আল্লাহ বলেন, 

ووضع الموازين القط ليؤمر القيمة فلا كه نقش شيا وإن كان مثقال حبة من خردل آتي بها وكفى بالكليبين ( که الأنبياء: ۷ء 

“আমি কেয়ামতের দিন ন্যায়বিচারের মানদণ্ড স্থাপন করব। সুতরাং কারও প্রতি জুলুম হবে না। যদি কোনো আমল সরিষার দানা পরিমাণও হয়, আমি তা উপস্থিত করব এবং হিসাব গ্রহণের জন্য আমিই যথেষ্ট।” (সূরা আম্বিয়া ৪৭) অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, 

ولا يتساء لون ( فمن 

في الصور فلا أنساب بينهم يوم 

فإذا قلت موازيو فاليك هم المفلحون ( ومن ممت موازير 

ل ون ( که المؤمنون: ۱۰۱ 

ولكيك الذين يروا فترفيجه 

• + – 

“অতঃপর যখন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে, সেদিন তাদের পারস্পরিক আত্মীয়তার বন্ধন থাকবে না এবং একে অপরকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে না। যাদের পাল্লা ভারী হবে, তারাই হবে সফলকাম। আর যাদের পাল্লা হালকা হবে তারাই নিজেদের ক্ষতি সাধন করেছে, তারা দোযখেই চিরকাল বসবাস করবে।” (সূরা মুমিনুন ১০১-১০৩)

 নবী করীম সা. বলেন, “দুটি বাক্য, উচ্চারণে অতি সহজ, তবে মীযানে অনেক ভারী হবে এবং দয়াময় আল্লাহর কাছেও বাক্য দু’টি প্রিয়ঃ । 

  আমরা আল্লাহর প্রশংসা ও পবিত্রতার গুণগান করছি।মহান আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করছি।” (বুখারী-৬০৪৩)

 আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. এর পায়ের দুই গোছা সম্পর্কে নবীজী বলেছিলেন,  “ওই দুটি পা মীযানে ওহুদ পর্বত অপেক্ষা ভারী পড়বে।” সামনে বিস্তারিত বিবরণ আসছে। 

* মীযানের আকার

কুরআন হাদিসের বর্ণনাসমূহে চিন্তা করলে স্পষ্ট বুঝে আসে যে, মীযান হবে প্রকৃত মানদণ্ড। পরিমাপ করার জন্য একটি কজা ও দু’টি পাল্লা থাকবে। একটি ভারী হলে অপরটি হালকা হয়ে যাবে। তবে এর আয়তন সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু বর্ণিত নয়। আল্লাহ ছাড়া এর সঠিক আয়তন সম্পর্কে কেউ অবগত নয়। সেটি হবে বিশাল এক মানদণ্ড। 

 নবী করীম সা. বলেন, “কেয়ামতের দিন মীযান স্থাপন করা হবে। সকল আসমান ও জমিন যদি তাতে পরিমাপ করতে হয়, করা যাবে। ফেরেশতাগণ বলবেন, হে প্রতিপালক, কার জন্য পরিমাপ হবে? আল্লাহ বলবেন, আমার সৃষ্টি থেকে যার জন্য ইচ্ছা! তখন ফেরেশতাগণ বলবেন, আমরা আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি। সত্যিই, আমরা আপনার যথাযথ উপাসনা করতে পারিনি।” (মুস্তাদরাকে হাকিম-৮৭৩৯) 

* সূক্ষ্ম এক মানদণ্ড

 চরম সুবিচারের বহিঃপ্রকাশ। মানুষের ছোট-বড় সকল কৃতকর্ম সেখানে তোলা হবে। আল্লাহ বলেন, 

ووضع الموازين القط ليؤم القيمة فلا ظلم تف شيئا وإن كان مثقال حبة من خير أتينا بها وكفى بنايبين ( که 

 “কেয়ামতের দিন আমি ন্যায়বিচারের মানদণ্ড স্থাপন করব। সুতরাং কারও প্রতি জুলুম হবে না। যদি কোনো আমল সরিষার দানা পরিমাণও হয়, আমি তা উপস্থিত করব এবং হিসাব গ্রহণের জন্য আমিই যথেষ্ট।” (সূরা আম্বিয়া-৪৭) 

প্রশ্ন, মীযান কি একটি হবে নাকি একাধিক?  

উত্তরঃ একাধিক মীযানও হতে পারে। হতে পারে প্রত্যেক মুমিনের জন্য পৃথক মানদণ্ড। অথবা মুমিনদের জন্য এক মীযান এবং কাফেরদের জন্য ভিন্ন মীযান। প্রত্যেক উম্মতের জন্য পৃথক পৃথক মীযানও হতে পারে। এর সঠিক জ্ঞান কেবল আল্লাহর কাছেই। তবে। 

ووضع الموازينه 

“আমি কেয়ামতের দিন ন্যায়বিচারের মানদণ্ড স্থাপন করব” আয়াত থেকে বুঝা যায় যে, মীযান একাধিক হবে। আবার উক্ত আয়াতে মানদণ্ড বলতে পরিমাপকৃত বিষয়ও উদ্দেশ্য হতে পারে। 

* মীযানে কী রাখা হবে?

 পরিমাপকৃত কি মানুষের কৃতকর্ম, আমলনামা নাকি বান্দা নিজেই? 

উলামায়ে কেরাম এ বিষয়ে বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মত হলো, সবগুলোই পরিমাপযোগ্য। বিভিন্ন। হাদিসে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। 

কৃতকর্ম পরিমাপ 

কতিপয় হাদিসে মানুষের কৃতকর্ম পরিমাপের কথা বলা হয়েছে। 

নবী করীম সা. বলেন, “দুটি বাক্য, যা উচ্চারণে অতি সহজ, তবে মীযানে অনেক ভারী এবং দয়াময় আল্লাহর কাছেও বাক্য। দু’টি প্রিয়ঃ যার অর্থঃ (আমরা আল্লাহর প্রশংসা ও পবিত্রতার গুণগান করছি। মহান আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করছি।” (বুখারী-৬০৪৩) 

অন্যত্র নবীজী বলেন, “আল্লাহর প্রশংসা পাঠ মীযানকে ভরে দেবে।” (মুসলিম-৫৫৬)। 

আমলনামা পরিমাপ 

মানুষের কৃতকর্মের বিবরণ-সম্বলিত আমলনামা পরিমাপ হবে। নবী করীম সা. কালেমায়ে শাহাদাৎ লিখিত কাগজ মীযানে স্থাপন সংক্রান্ত হাদিসের মধ্যে বলেন, “একব্যক্তিকে কেন্দ্র করে কেয়ামতের দিন সকল সৃষ্টির মধ্যে হৈ-চৈ পড়ে যাবে। তার বিপক্ষে নিরানব্বইটি সংরক্ষিত কাগজ উন্মুক্ত করা হবে। প্রতিটি কাগজ দৃষ্টিসীমা পরিমাণ দীর্ঘ। আল্লাহ বলবেন, এগুলো তুমি অস্বীকার করতে পারবে? সে বলবে, না হে প্রতিপালক! বলবেন, আমার পক্ষ থেকে নিযুক্ত ফেরেশতাগণ। কি তোমার প্রতি অবিচার করেছে? সে বলবে, হে প্রতিপালক! প্রতিপালক বলবেন, তোমার কিছু বলার আছে? তোমার কি কোন নেকী আছে? অতঃপর লোকটি ভয় পেয়ে বলবে, না। প্রতিপালক বলবেন, নিশ্চয় তোমার জন্য আমার কাছে একটি পুণ্য রয়েছে। আজ তোমার প্রতি অবিচার করা হবে না। অতঃপর একটি কাগজ বের করা হবে যেখানে লেখা ।  সে বলবে, হে প্রতিপালক! এতগুলো বিশাল তালিকার সামনে এই ছোট্ট চিরকুটের কীই-বা মূল্য! প্রতিপালক বলবেন, আজ তোমার প্রতি অবিচার করা হবে না।অতঃপর সকল কাগজগুলো এক পাল্লায় রাখা হবে এবং ছোট্ট চিরকুট অপর পাল্লায় রাখা হবে। অতঃপর দীর্ঘ কাগজগুলোর পাল্লা ধপাস করে পড়ে যাবে এবং ছোট্ট চিরকুটের পাল্লা ভারী হয়ে যাবে। আল্লাহর নামের বিপরীতে কোন কিছু ভারী হতে পারে না।” (তিরমিযী-২৬৩৯) বুঝা গেল, মানুষের আমলনামাও পরিমাপ হবে। 

প্রাসঙ্গিক

 শুধু “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে 

| দেবে?

হাদিসে বলা হয়েছে যে, একত্ববাদের স্বীকৃতি সকল গুনাহকে মুছে দেয়। যে স্বীকৃতির পর মুরতাদ হওয়ার ভয় থাকে না। ইসলাম থেকে বের হওয়ার অবকাশ থাকে না। তবে যদি মুরতাদ হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে তার “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” কেবল একটি বাক্য উচ্চারণ ছাড়া কিছু নয়।হাসান বসরী রহ. কে জিজ্ঞেস করা হলো, অনেকে বলে থাকে, যে ব্যক্তি “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। উত্তরে তিনি বললেন, যে ব্যক্তি “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলবে এবং তার সমুদয় অধিকার ও ফরযগুলো আদায় করবে, সেই জান্নাতে প্রবেশ করবে।” হ্যাঁ.. “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” তখনই জান্নাতে প্রবেশের উপকরণ হবে, যখন এ বাক্যের সমুদয় চাহিদা পূরণ হবে। মুনাফিকরা যদি “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলে, তাদের কোনো কাজে আসবে ; বরং তাদের ঠিকানা জাহান্নামের সর্বনিম্নেই হবে। কারণ, তারা কেবল মুখেই বলে, অন্তরে বিশ্বাস করে না। অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দিয়ে তার চাহিদাগুলো পূরণ করে না। 

স্বয়ং ব্যক্তিও পরিমাপ হতে পারে এভাবে যে, ব্যক্তিকে মীযানে উঠানো হলো। অতঃপর তার কৃতকর্ম অনুযায়ী তার পাল্লা ভারী বা হালকা হলো। ইবনে মাসউদ রা. এর ঘটনা সম্বলিত হাদিসে এর বিবরণই এসেছে। তিনি নবী করীম সা. এর সাথে একবার একটি বৃক্ষের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। নবী করীম সা, তাকে সেই বৃক্ষে উঠে মিসওয়াক তৈরির জন্য একটি ঢাল কেটে আনার আদেশ করলেন। ইবনে মাসউদ ছিলেন হালকা দেহগড়নের। তিনি গাছে উঠে ঢাল কাটছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে বাতাস এসে কাপড় সরিয়ে ফেললে তার পায়ের দুই নলা প্রকাশ হয়ে যায়। তার দু’পায়ের ছিপছিপে নলা দেখে সবাই হেসে উঠে। নবী করীম সা. বললেন,

 তোমরা হাসছ কেন? তার দুই সরু নলা দেখে? ঐ সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ, তার দুই সরু নলা মীযানে ওহুদ পর্বত থেকেও অধিক ভারী পড়বে।” (মুসনাদে আহমদ-৩৯৯১) 

কীসে তার দুই পা’কে মীযানে ভারী করল? নিঃসন্দেহে তা তার দীর্ঘ নামায, অধিক পরিমাণে রোযা.. ইত্যাদি। আর ইবনে মাসউদ ব্যতীত যে ব্যক্তিবর্গ নিজেদের দেহকে সুঠাম ও স্থূলকায় বানিয়েছে। বাহ্যত সুদর্শন পোশাক পরলেও অভ্যন্তর রয়ে গেছে নোংরা, তাদের ব্যাপারে নবীজী বলেন, 

“নিশ্চয় সুঠাম ও স্থূলকায় ব্যক্তি কেয়ামতের দিন আসবে, আল্লাহর কাছে সে মশার ডানা পরিমাণ মূল্যায়নও পাবে না। অতঃপর বললেন, তোমরা চাইলে পাঠ কর.. “কেয়ামতের দিন তাদের জন্য আমি মানদণ্ড স্থাপন করব না” (সূরা কাহফ-১০৫) (বুখারী-৪৪৫২) 

ব্যক্তির পরিণাম তার আমলের পরিমাপ অনুপাতে নির্ধারণ হবে

 সুতরাং যার সৎকর্মফলের পাল্লা ভারী হবে, সে জান্নাতে যাবে। আর যার অসৎকর্মফলের পাল্লা ভারী হবে, সে জাহান্নামে যাবে। তবে যদি আল্লাহ ক্ষমা করে দেন অথবা তার ব্যাপারে সুপারিশকারীদের সুপারিশ গ্রহণ করেন। আল্লাহ বলেন, 

يومين الحق فمن ثقلت موازيو قولك هه 

و والو 

ومنځ موزيه و أولهك الذين يوا أفريما 

المفلحون 

اأبعايا يظلون (5) الأعراف: ۸-۹ 

“আর সেদিন যথাযথই ওজন হবে। অতঃপর যাদের পাল্লা ভারী হবে, তারাই সফলকাম হবে। আর যাদের পাল্লা হালকা হবে, তারাই এমন হবে, যারা নিজেদের ক্ষতি করেছে। কেননা, তারা আমার আয়াতসমূহ অস্বীকার করত।” (সূরা আ’রাফ ৮,৯) 

প্রশ্ন, যাদের সৎকাজের পাল্লা এবং অসৎকাজের পাল্লা সমান-সমান হবে, তাদের কী উপায়? 

উত্তরঃ এদের ঠিকানা হবে আরাফে। আরাফবাসী জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যস্থলে থাকবে। যেমনটি আল্লাহ বলেছেন, 

بسيمه که 

وبينهما حجاب وعلى الأعراف رجال يرون 

“এবং আরাফের উপরে অনেক লোক থাকবে। তারা প্রত্যেককে তার তার চিহ্ন দ্বারা চিনে নেবে।” (সূরা আ’রাফ-৪৬)। আরাফবাসীর পরিণাম-স্থল বিলম্বে নির্ধারণ হবে। পরিণাম-স্থল নির্ধারণ শেষে জান্নাতবাসী জান্নাতে চলে যাবে আর জাহান্নামবাসী জাহান্নামে প্রবেশ করবে। অতঃপর সুপারিশের প্রেক্ষিতে আরাফবাসীকে আল্লাহ তা’লা জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। এটি হবে দয়াময় আল্লাহর পক্ষ থেকে পরম করুণা। জান্নাত ও জাহান্নামবাসীর আলোচনা শেষে আল্লাহ তা’লা আ’রাফবাসীর বিবরণ এভাবে দিয়েছেন। 

بيمه ونادو 

وبينهما حجاب وعلى الأعراف رجال يعرفون أضحلب الجنة أن سكو عليك كريدوها وممر يموت ) وإذا 

أ ممبر تلقاء أضح آلتارقالو ربنا لا تجعلنا مع القوم الظليين 

رفت 

 “উভয়ের মাঝখানে থাকবে একটি প্রাচীর এবং আ’রাফের উপরে অনেক লোক থাকবে। তারা প্রত্যেককে তার চিহ্ন দ্বারা চিনে নেবে। তারা জান্নাতীদেরকে ডেকে বলবেঃ তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। তারা তখনও জান্নাতে প্রবেশ করবে না, কিন্তু প্রবেশ করার ব্যাপারে আগ্রহী হবে। যখন তাদের দৃষ্টি জাহান্নামীদের উপর পড়বে, তখন বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদেরকে এ জালেমদের সাথী করবেন না।” (সূরা আ’রাফ ৪৬,৪৭) 

* কাফেরদের কৃতকর্ম 

ব্যক্তি চায় কাফের হোক বা মুসলিম; কারও প্রতি আল্লাহ বিন্দু পরিমাণ অবিচার করবেন না। অনেক কাফেরের আমল ওজনই করা হবে না। আল্লাহ বলেন, 

و أوكتيك الذين كفروا بكات بهتر ولقاء محطت أعلم قلائقي 

الفيوم لقيمة ونا) که الكهف: 105 

“তারাই সে লোক, যারা তাদের পালনকর্তার নিদর্শনাবলী এবং তাঁর সাথে সাক্ষাতের বিষয় অস্বীকার করে। ফলে তাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যায়। সুতরাং কেয়ামতের দিন তাদের জন্য আমি কোন গুরুত্ব স্থির করব না।” (সূরা কাহফ-১০৫) 

কাফেরদের কৃতকর্ম দুই প্রকার 

প্রথম প্রকার

 যারা সীমালঙ্ঘন করেছে এবং দুনিয়াতে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়েছে। তাদের সকল কৃতকর্ম পরিত্যাজ্য। মূলত কর্ম সম্পাদনকালেই তারা কোন ফলাফল আশা করেনি। তাদের এসব কৃতকর্মকে আল্লাহ অন্ধকার বলে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহ বলেন, । 

و أوكلي في بحر لجي شله مو من فقهے موج ممن فوقيه سحاب 

بعضها فوق بعض إذا أخرج دولت یگذرها ومن ليجعل 

ظل آه لو ورا فما له ومن وري که النور: ۰ة 

“অথবা (তাদের কর্ম) প্রমত্ত সমুদ্রের বুকে গভীর অন্ধকারের ন্যায়, যাকে উদ্বেলিত করে তরঙ্গের উপর তরঙ্গ, যার উপরে ঘন কালো মেঘ আছে। একের উপর এক অন্ধকার। যখন সে তার হাত বের করে, তখন তাকে একেবারেই দেখতে পায় না। আল্লাহ যাকে জ্যোতি দেন না, তার কোন জ্যোতিই নেই।” (সূরা নূর-৪০) 

দ্বিতীয় প্রকার 

দুনিয়াতে যারা পরকালে প্রতিদানের আশায় সৎকাজ করেছে, যেমন সাদকা, আত্মীয়তার বন্ধন বজায়, অত্যাচারিতের সহায়তা, জনসেবামূলক কাজ ইত্যাদি.. এর বিনিময় তাকে দুনিয়াতেই দিয়ে দেয়া হবে। হয়তো তাদের ধনসম্পদ বাড়িয়ে দেওয়া হবে, আত্মা প্রশান্ত করা হবে, অসুস্থতা দূর করা হবে, কষ্ট লাঘব করা হবে অথবা বিপদ দূর করা হবে। তবে পরকালে এসব কর্ম কোনোই উপকারে আসবে না। কারণ, আমল কবুলের একমাত্র শর্তই হল, আল্লাহর প্রতি ঈমান। 

তথাপি আল্লাহর নিকট সৎ ও অসৎ কাফের এক নয়। তাই তো তাদের সকর্মীদেরকে দুনিয়াতেই প্রতিদান দিয়ে দেন। আল্লাহ বলেন, 

ومن كان يريد الحياة الدنيا وزينتها وق إليهن أمله فيها وهمر فيها لا يبون ( أوليك الذين ليس لهم في الأخيرة إلا 

هود: ۱۰ 

يه 

ألا تربط ماتوفيها بطل ماكاو أيغموت 

“যে ব্যক্তি পার্থিব জীবন ও তার চাকচিক্যই কামনা করে, হয় আমি দুনিয়াতেই তাদের আমলের প্রতিফল ভোগ করিয়ে দেব এবং যাতে তাদের প্রতি কিছুমাত্র কমতি করা হয় না। এরাই সেসব লোক যাদের জন্য আগুন ছাড়া কিছুই নেই। তারা এখানে যা কিছু করেছিল সবই বরবাদ করেছে; আর যা কিছু উপার্জন করেছিল, সবই বিনষ্ট হলো।” (সূরা হূদ ১৫,১৬) 

আল্লাহ তাদের কৃতকর্মের কিছু দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন,

 মরীচিকা সদৃশ 

কারণ, তারা এসব কাজের বিনিময়ে প্রতিদান আশা করে। অথচ প্রতিদানে এরা কিছুই পাবে না। তার দৃষ্টান্ত ঐ পিপাসিত ব্যক্তির ন্যায়, যে মরীচিকাকে পানি মনে করে। আল্লাহ বলেন, 

والذين كفروا أعملكراب بقيعة يحسبه آلمان ماء ك إذا 

او د الله عنده فوقه حساب . واله سريع 

جاء و لم يجده الحساب ام النور: ۳۹ 

“যারা কাফের, তাদের কর্ম মরুভূমির মরীচিকা সদৃশ, যাকে পিপাসিত ব্যক্তি পানি মনে করে। শেষপর্যন্ত যখন সে তার কাছে। যায়, তখন কিছুই পায় না এবং পায় সেখানে আল্লাহকে, অতঃপর আল্লাহ তার হিসাব চুকিয়ে দেন। আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।” (সূরা নূর-৩৯)। 

আল-কুরআনে বর্ণিত মরীচিকার নমুন। দেখতে ঠিক পানির মত মনে হলেও বাস্তবে তা মরুভূমি। কাছে গেলেই তা উধাও হয়ে যাবে। তপ্ত মরুপ্রান্তরে সূর্যের আলোকরশ্মি পতিত হওয়ার ফলে অনেক সময় এরকম দৃষ্টিগোচর হয়। তাছাড়া 

প্রচণ্ড বাতাস প্রবাহের কালেও কখনো কখনো এরকম লক্ষ্য করা যায় 

ছাই সদৃশ

 লাকড়ি আগুনে পুড়ে যাওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে, তাকেই ছাই এবং কয়লা বলা হয়। কাফেরদের আমল সেই ছাইয়ের ন্যায়, যা সামান্য বাতাস এলেই বিক্ষিপ্ত হয়ে উড়ে যায়। 

আল্লাহ বলেন, 

ما اشتدت به 

اليك 

ب وأعلى شي 

الممثل الذين كفروا بربه أمه 

لايقدرون يا 

في يوير مما 

الي 

إبراهيم: ۱۸ 

العيد 

هوال 

যারা স্বীয় পালনকর্তার সত্তার অবিশ্বাসী তাদের অবস্থা এই যে, তাদের কর্মসমূহ ছাইভস্মের মত যার উপর। দিয়ে প্রবল বাতাস বয়ে যায় ধূলিঝড়ের দিন। তাদের উপার্জনের কোনো অংশই তাদের করতলগত হবে না। এটাই দূরবর্তী পথভ্রষ্টতা। (সূরা ইবরাহীম ১৮)। 

প্রশ্ন, কাফেরদের কৃতকর্ম অগ্রাহ্য কেন? 

উত্তরঃ আল্লাহ তালা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন কেবলই তার উপাসনার জন্য। তাদেরকে আদেশ করেছেন আনুগত্যের। পাশাপাশি যুগে যুগে নবী-রাসূল প্রেরণ করে তাদেরকে সুসংবাদের সাথে সাথে শাস্তির ভয়ও দেখিয়েছেন। নবীগণ তাদেরকে প্রমাণসহ সত্য বুঝিয়েছেন। তথাপি তারা বিমুখতার পথ বেছে নিয়েছে। আল্লাহর বাণী অস্বীকার করেছে। অথচ তারা পাগল ছিল না। ফলে নিজেদের কৃতকর্মের দ্বারাই তারা শাস্তির যোগ্য হয়েছে। সেদিন সকল মানুষকে আল্লাহ উপস্থিত করবেন। সকলের  হিসাব নেবেন হাশরের ময়দানের সেই বিচারালয়ে। সেদিনে কাফেরদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ বলেন, 

کی 

ويوم يايه فيول أن شراء الذين گنت تموت 

القصص: 62 

“যেদিন আল্লাহ তাদেরকে ডেকে বলবেন, তোমরা যাদেরকে আমার শরীক মনে করতে, তারা কোথায়?” (সূরা কাসাস-৬২)। হ্যাঁ.. কোথায় তারা, যাদের তোমরা উপাসনা করতে? যাদেরকে তোমরা বড় মনে করতে? যাদের নৈকট্য অর্জন সচেষ্ট ছিলে? আল্লাহর রাজত্বে তাদেরকেও অংশীদার ভাবতে! আজ তারা কোথায়? কেন তোমাদের মুক্ত করতে আসছে না? আল্লাহ বলেন, 

و القصص: 

ويوم ياديه فيقول ماذا أجبتم المرسلين 

“যেদিন আল্লাহ তাদের ডেকে বলবেন, তোমরা রাসূলদেরকে কী উত্তর দিয়েছিলে?” (সূরা কাসাস-৬৫)

 অন্যত্র আল্লাহ বলেন, 

وأقامت 

موزی یقه و هاوية وما أدرك ماهية 

کاحامين القارعة: ۸ -۱۱ 

“আর যার পাল্লা হালকা হবে, তার ঠিকানা হবে হাবিয়া। আপনি। জানেন তা কী? প্রজ্বলিত অগ্নি।” (সূরা কারিআ ৮-১১)

 আল্লাহর বাণী, 

ث موزه و أوليك الذين يا أستمر في جه 

و ومن 

الا وهم فيها كلون ( ألم تكن 

خلدون ( تل وجوه 

توباگزبون ده المؤمنون: ۱۰۳ – ۱۰۰ 

ایتی تل علي 

“এবং যাদের পাল্লা হালকা হবে তারাই নিজেদের ক্ষতিসাধন করেছে, তারা জাহান্নামেই চিরকাল বসবাস করবে। আগুন তাদের মুখমণ্ডল দগ্ধ করবে এবং তারা তাতে বীভৎস আকার ধারণ করবে। তোমাদের সামনে কি আমার আয়াতসমূহ পঠিত হতো না? তোমরা তো সেগুলোকে মিথ্যা বলতে।” (সূরা মুমিনুন। ১০৩-১০৫) 

প্রশ্ন, কাফেরদের হিসাব নেয়া হবে কি? 

উত্তরঃ সবাইকে প্রশ্ন করা হবে এবং সকলের কাছ থেকেই হিসাব নেওয়া হবে। 

প্রশ্ন, কাফেরদের ঠিকানা তো জাহান্নাম; তারপরও 

 কেন তাদের হিসাব নেয়া হবে? কেন তাদের কৃতকর্ম পরিমাপ করা হবে?

 আল্লাহর বাণী 

وقولهم إنهم قولون بيه الصافات: 24 

“তাদেরকে থামাও, তারা জিজ্ঞাসিত হবে” (সূরা সাফফাত-২৪) উত্তরঃ বিভিন্ন কারণে তাদেরকে প্রশ্ন করা হবে। তন্মধ্যে, 

() ন্যায়বিচার তাদের বিপক্ষে প্রমাণ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে যাতে তাদের কোনোরূপ যুক্তি বা অজুহাত উপস্থাপন করার সুযোগ না থাকে। আল্লাহ বলেন, । 

و وضع الكتب فترى المجرمين مشفقين ما فيه ويولون يوتيلا مال هذا البيت لا يغادر صغير و ي إ أخصها ووج وأمام وأحاضر ولايظل ترك أداء الكهف: 49 

“আর আমলনামা সামনে রাখা হবে। তাতে যা আছে; তার কারণে আপনি অপরাধীদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত দেখবেন। তারা বলবে, হায় আফসোস, এ কেমন আমলনামা। এ যে ছোটবড় কোন কিছুই বাদ দেয়নি; সবই এতে রয়েছে। তারা তাদের কৃতকর্মকে সামনে উপস্থিত পাবে। আপনার পালনকর্তা কারও 

প্রতি জুলুম করবেন না।” (সূরা কাহফ-৪৯)। 

() লাঞ্ছিত করার উদ্দেশ্যে..

 আল্লাহ বলেন, 

ووتى إثر وقوع به قال أليس هذا بالحق قالوابل وربنا قال 

به الأنعام: ۳۰ 

تكون 

قوقو العذاب بما 

“আর যদি আপনি দেখেন; যখন তাদেরকে প্রতিপালকের সামনে দাঁড় করানো হবে। তিনি বলবেন, এটা কি বাস্তব সত্য নয়? তারা বলবে, হ্যাঁ, আমাদের প্রতিপালকের কসম! তিনি বলবেন, অতএব স্বীয় কুফরের কারণে শাস্তি আস্বাদন কর।” (সূরা আনআম-৩০) 

 () মৌলিক বিধানাবলীর পাশাপাশি শরীয়তের শাখাগত 

বিধানসমূহ পালনেও তারা আদিষ্ট.

ফলে যেসব বিষয়ে তারা অবজ্ঞা করেছে ও সত্যের বিরুদ্ধাচরণ করেছে, সেসব বিষয়ে তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে। নামায, রোযা ও যাকাত ইত্যাদি ফরয বিষয় পরিত্যাগ সম্পর্কেও তাদের জিজ্ঞেস করা হবে।

আল্লাহ বলেন, 

و الذين لا يؤتون الكؤة وهم بالأخرة هر 

وويل المشركين گفون چه فصلت: 6 -۷ 

“আর মুশরিকদের জন্য রয়েছে দুর্ভোগ, যারা যাকাত দেয় না। এবং পরকালকে অস্বীকার করে।” (সূরা ফুসসিলাত ৬,৭)। অপরাধীদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, 

و المسكين 

وماشگرفي سقر قالو لتر من المصلين ( ولون 

المدثر: 

بيوم الين ( 

مع ايضين ( وكانك 

وكان 

 “বলবে, তোমাদেরকে কীসে জাহান্নামে নীত করেছে? তারা বলবে, আমরা নামায পড়তাম না, অভাবগ্রস্তকে আহাৰ্য্য দিতাম 

, আমরা সমালোচকদের সাথে সমালোচনা করতাম এবং আমরা প্রতিফল দিবসকে অস্বীকার করতাম।” (সূরা মুদ্দাছছির ৪২-৪৬)। 

() কৃতকর্মে তারতম্য হবে

ফলে শাস্তির স্তর নির্ণয়ের জন্য তাদের হিসাব হবে; জান্নাতে প্রবেশের জন্য নয়। যেমনটি কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী আবু তালেব (নবীজীর চাচা) সম্পর্কে আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব রা. জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ 

হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কি আবু তালিবের কোনো উপকার করতে পেরেছেন? তিনি তো আপনাকে নিরাপত্তা দিতেন, আপনার জন্য রাগান্বিত হতেন। নবীজী বললেন, হ্যাঁ.. সে পায়ের গোছা পরিমাণ আগুনের মধ্যে আছে। আমি না হলে তার ঠিকানা। জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে হতো।” (মুসলিম-৫৩১)। বুঝ গেল, আবু তালেব আবু লাহাব অপেক্ষা লঘু শাস্তির মধ্যে আছে। 

 প্রশ্ন, কাফেরদের আমলনামা কীভাবে ওজন হবে? 

পাল্লায় রাখার মত কোন সৎকর্ম কি তাদের থাকবে? উত্তরঃ কাফেরদের কৃতকর্ম মীযানের উভয় পাল্লায় রাখা হবে। এক পাল্লায় তার কুফর ও শিরকের আমল রাখা হবে, অপর পাল্লায় রাখার মত কিছু থাকবে না। এভাবে কুফরের পাল্লা ভারী পড়বে। পূর্বেই আলোচিত হয়েছে, কোন কাফের যদি সৎকর্ম  করে থাকে, তবে আল্লাহ দুনিয়াতেই এর বিনিময় দিয়ে দেবেন। আল্লাহ বলেন, 

وهو من كان يريد الحيوة الدنيا وزينتها وفي إليه أعمالهم فيها وهمر فيهالايون و أوليك الذين ليس لهم في الآخرة إلا 

هود: ۱۰ 

ألا تربط مات وأفيها وبطل ماكان يعملون ( 

| \7 – “যে ব্যক্তি পার্থিব জীবন ও তার চাকচিক্যই কামনা করে, হয় আমি দুনিয়াতেই তাদের আমলের প্রতিফল ভোগ করিয়ে দেব এবং যাতে তাদের প্রতি কিছুমাত্র কমতি না করা হয়। এরাই সেসব লোক যাদের জন্য আগুন ছাড়া কিছুই নেই। তারা এখানে যা কিছু করেছিল সবই বরবাদ করেছে; আর যা কিছু উপার্জন করেছিল, সবই বিনষ্ট হল।” (সূরা হূদ ১৫,১৬) 

শিরক সকল সৎকর্মকে ধ্বংস করে দেবে। ফলে আখেরাতে তার প্রাপ্য বলতে কিছুই থাকবে না। আল্লাহ বলেন, 

فوأ ايبي ال 

وليه مقاليد السموات والأرض ولين أولك له ځيروت عقل فقير أوت أو أعبد أليها الجهلون ( ولقد أوحي إليك وإلى الذين من قبليك لين 

بللي 

لخبط عمك ولو من الخيري 

أشرت 

که الزمر: ۱۳ – ۱۹ 

الله فاعبدون 

من الكرین 

“আসমান ও জমিনের চাবি তাঁরই নিকট। যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত। বলুন, হে মূখরা, তোমরা কি আমাকে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের এবাদত করতে আদেশ করছ? আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি প্রত্যাদেশ হয়েছে, যদি আল্লাহর শরীক স্থির করেন, তবে আপনার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের একজন। হবেন। বরং আল্লাহরই এবাদত করুন এবং কৃতজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত থাকুন” (সূরা যুমার ৬৩-৬৬)

 নবী করীম সা. থেকে বর্ণিত যে, কাফেরের সৎকর্মের প্রতিদান দুনিয়াতেই দিয়ে দেয়া হবে। ফলে কেয়ামতের দিন সে খালি হাতে আল্লাহর কাছে আসবে। 

নবী করীম সা. বলেন, “মুমিনের সৎকর্মের ব্যাপারে আল্লাহ বিন্দুমাত্র অবিচার করবেন না। দুনিয়াতেও আল্লাহ এর সুফল দেবেন এবং আখেরাতে উত্তম বিনিময় দান করবেন। পক্ষান্তরে কাফেরের সঙ্কর্মের ফল দুনিয়াতেই আল্লাহ ভোগ করিয়ে দেবেন। অতঃপর যখন আখেরাতে সে আল্লাহর কাছে আসবে, তখন প্রতিফল দেওয়ার মতো কোনো সৎকর্ম তার ভাণ্ডারে থাকবে না।” (মুসলিম-৭২৬৭) 

প্রশ্ন, কাফেদেরকে তো প্রশ্নই করা হবে না। 

و القصص: 

ولا يلعن وبه المجرمون 

V

“পাপীদেরকে তাদের পাপকর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে না” (সূরা কাসাস-৭৮) এবং অপর আয়াতে 

المرسلات: ۳۵ 

وهذا يوم لا ينطقون ولايود له فيعتذرون 

EL 

Y1 – “এটা এমন দিন, যেদিন কেউ কথা বলবে না। এবং কাউকে তাওবা করার অনুমতি দেয়া হবে না।” (সূরা মুরসালাত ৩৫,৩৬)

 আয়াতদ্বয়ের ব্যাখ্যা কী?

 উত্তরঃ কেয়ামতের দিন কাফেরদের অবস্থা দু’ধরনের হবেঃ   (১) মুমিনদের ন্যায় তাদেরকে সঙ্কর্ম কিংবা অসৎ কর্ম সম্পর্কে কোনো জিজ্ঞাসাই করা হবে না। বরং তাদেরকে কেবল লাঞ্ছিত করার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করা হবে। কেন চুরি করেছ? কেন ব্যভিচার। করেছ? .. 

(২) কেয়ামতের ময়দানে বিভিন্ন পর্যায় থাকবে। হিসাব নিকাশ, আমলনামা বিতরণ, সীরাত, হাউযে কাউসার..। সে দিনটি হবে অনেক দীর্ঘ। কিছু কিছু পর্যায়ে তাদের জিজ্ঞেস করা হবে আর কিছু কিছু পর্যায়ে তাদের জিজ্ঞেস করা হবে না। 

* মীযানে অতিভারী আমল 

আমল যতই আল্লাহর প্রিয় হবে, ততই মীযানে তা ভারী পড়বে। আর মীযানে সৎকর্মের পাল্লা ভারী হলেই সে চিরসফলদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। আমলের মধ্যেও আবার কিছু প্রকার রয়েছে; ছোট বড়, অধিক পুণ্যময়, অল্প পুণ্যময়, হালকা ভারী..। নবী করীম সা. মীযানে ভারী কতিপয় আমলের কথা বলে গেছেন। তন্মধ্যে.. 

() সৎচরিত্র 

সাধারণ একটি গুণ;  হাস্যোজ্জ্বল চেহারা আর নরম কথা। যাদেরকে সৎচরিত্র দেওয়া হয়েছে, সদা মুচকি হাসি যাদের চেহারায় লেগে থাকে এবং যাদের শিষ্টাচার উত্তম, মীযানে তাদের আমল সবচেয়ে ভারী হবে। দয়াময় আল্লাহর কাছে তারা অতিপ্রিয় বিবেচিত হবে। নবী করীম সা. ছিলেন সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। তাঁর আচরণ ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ। কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা’লা তার চরিত্রের প্রশংসা করে বলেন, 

عظيريه القلم:4 

و لعل 

“আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী।” (সূরা কালাম-৪) 

অন্য আয়াতে বলেন, 

قمامة بين أنه لنت له ولو كنت فظا غليظ القلب لانفضوأين 

و آل عمران: ۱۰۹ 

حول 

“আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন। পক্ষান্তরে আপনি যদি রাগ ও কঠিন হৃদয় হতেন তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত।” (সূরা আলে ইমরান ১৫৯) 

সৎচরিত্রের প্রশংসায় নবীজী বলেন, 

 “কেয়ামতের দিন মীযানে সবচে’ ভারী হবে সৎচরিত্র। ইতর এবং অশিষ্ট লোকেরা আল্লাহর ঘৃণার পাত্র।” (মুসনাদে আহমদ ২৭৫৫) 

() আল্লাহর জিকির 

অধিক পরিমাণে আল্লাহর জিকির এবং তাসবিহ-তাহলিল মানুষকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়। যে যাকে ভালোবাসে, তার স্মরণ বা আলোচনা সে বেশি করে। সুতরাং যে আল্লাহকে ভালোবাসবে, আল্লাহর স্মরণও সে বেশি বেশি করবে। 

আল্লাহ বলেন, 

البقرة: 152 

“তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করব।” (সূরা বাক্বারা-১৫২)

 অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, 

و ولایت الله كثيرا ولا أعد له لهم تعبير وأجرا عظيما مكة الأحزاب: ۳۵ 

“আল্লাহর অধিক যিকিরকারী পুরুষ ও যিকিরকারী নারী- তাদের জন্য আল্লাহ প্রস্তুত রেখেছেন ক্ষমা ও মহাপুরষ্কার।” (সূরা আহযাব-৩৫)

 নবী করীম সা. বলেন, “শ্রেষ্ঠ আমল, প্রতিপালকের কাছে সবচে’ খাঁটি, স্তর বৃদ্ধিকারী এবং স্বর্ণ-রূপা দান অপেক্ষা উৎকৃষ্ট আমল সম্পর্কে কি আমি তোমাদের বলব? তাছাড়া এটি যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুদের শিরচ্ছেদ বা তোমাদের শহীদ হওয়া অপেক্ষা অধিক উত্তম আমল! সবাই বলল, বলুন হে আল্লাহর রাসূল! বললেন, তা হলো আল্লাহর যিকির।” (মুসনাদে আহমদ-২১৭০২) 

একব্যক্তি এসে নবী করীম সা. কে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল, ইসলামের বিধিবিধান আমার কাছে অধিক মনে হচ্ছে। আমাকে নির্দিষ্ট কোনো আমল বলে দিন, যার উপর আমি অবিচল থাকব! নবীজী বললেন, তোমার জিহ্বা যেন সর্বদা আল্লাহর স্মরণে সজীব থাকে।” (মুসনাদে আহমদ)

জিকির মীযানে অনেক ভারী পড়বে। নবী করীম সা. বলেন, 

“দুটি বাক্য, উচ্চারণে অতি সহজ, তবে মীযানে অনেক ভারী হবে এবং দয়াময় আল্লাহর কাছেও বাক্য দু’টি প্রিয়ঃ 

আমরা আল্লাহর প্রশংসা ও পবিত্রতার গুণগান করছি। মহান আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করছি।” (বুখারী-৭১২৪)। 

উত্তম জিকির হলো, ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা। মীযানে তা অনেক ভারী হবে। 

। । 

 নবী করীম সা. বলেন, “পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক। ‘আলহামদুলিল্লাহ’ মীযানকে ভরে দেয়। ছুবহানাল্লাহ’ এবং ‘আলহামদুলিল্লাহ’ আসমান-জমিনের মধ্যস্থল পূর্ণ করে দেয়।” (মুসলিম-৫৫৬) 

() আল্লাহর জন্য কোনোকিছু ওয়াকফ করা 

ওয়াকফ হলো জমি বা সম্পদের নির্দিষ্ট কোনো অংশ আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া। ফলে কেউ আর তা বিক্রি করতে পারবে না। তা থেকে উপার্জিত সমুদয় অর্থ সেবামূলক কাজে ব্যয় হবে। আর ওয়াকফকারীর জন্য এটি সাদাকায়ে জারিয়া’র উপকরণ 

হবে। 

 নবী করীম সা. বলেন, “মানুষ মরে গেলে তিনটি ব্যতীত সব আমল তার বন্ধ হয়ে যায়ঃ সাদাকায়ে জারিয়া, তার রেখে যাওয়া জ্ঞান যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় অথবা সুসন্তান যে 

 নবী করীম সা. বলেন, “মৃত্যুর পর যে সব আমল মুমিনের সঙ্গে গিয়ে মিলিত হবেঃ তার শেখানো ও প্রচারকৃত জ্ঞান, রেখে আসা সুসন্তান, উত্তরাধিকারীদের জন্য রেখে আসা আল-কুরআন, নির্মিত মসজিদ, পথিক-মুসাফিরদের জন্য তৈরি ঘর, প্রবাহকৃত ও খননকৃত পুকুর এবং জীবদ্দশায় সুস্থ অবস্থায় প্রদানকৃত সাদকা। সর্বশেষ সাথে থাকবে তার মৃত্যুপরবর্তী জীবন।” (ইবনে মাজা-২৪২)। 

 নবী করীম সা. বলেন, “আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস রেখে এবং তাঁর প্রতিশ্রুতি সত্য জেনে আল্লাহর রাস্তায় যে একটি অশ্ব লালন করল, তাকে পরিতৃপ্ত করা, পানি পান করানো, তার বিষ্ঠা এবং প্রস্রাব.. সবই কেয়ামতের দিন সৎকর্মের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (বুখারী-২৬৯৮)। 

এসব বর্ণনাসমূহের দ্বারা ওয়াকফের ফযিলত উপলব্ধি করা যায়। আবু তালহা রা. মদিনার আনসারীদের মধ্যে সবচে’ ধনী ব্যক্তি ছিলেন। তার কাছে অধিক প্রিয় ছিল মসজিদে নববীর পাশে অবস্থিত ‘বায়রুহা’ নামক একটি নিজস্ব খেজুর বাগান। তা ছিল মসজিদের ঠিক কেবলার দিকে। নবী করীম সা. সেখানে। ঢুকতেন এবং সেখান থেকে পানি পান করতেন। অতঃপর যখন আয়াত নাযিল হলো 

ولنا و ابن وامما تحبونه آل عمران: ۹۴ 

“কস্মিনকালেও কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যদি তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে তোমরা ব্যয় না কর।” (সূরা আলে ইমরান-৯২)। তখন আবু তালহা রা, নবীজীর কাছে গিয়ে বললেন, আল্লাহ তার কালামে বলেছেন, “কস্মিনকালেও কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যদি তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে তোমরা ব্যয় না কর।” আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয় হলো এই বায়রুহা’ খেজুর বাগান। আজ থেকে এটি আল্লাহর জন্য দান করে দিলাম। এর প্রতিদান ও পুরষ্কার কেবল আল্লাহর কাছেই আমি আশা করি। সুতরাং হে আল্লাহর রাসূল, একে আপনি যেভাবে ইচ্ছা ব্যবহার করুন। নবী করীম সা. বললেন, হ্যাঁ. এটিই সর্বাধিক লাভ-যোগ্য বস্তু.. এটিই সর্বাধিক লাভ-যোগ্য বস্তু..! তুমি যা বলেছ, আমি শুনেছি। আমি মনে করি, এই বাগানকে তুমি তোমার নিকটাত্মীয়দের কল্যাণে দিয়ে দাও! আবু তালহা রা. বললেন, ঠিক আছে হে আল্লাহর রাসূল! অতঃপর তিনি তার আত্মীয় এবং চাচাতো ভাইদের মধ্যে সেটি ভাগ করে দিয়ে দিলেন।” (বুখারী-১৩৯২)। 

ইবনে উমর রা. বলেন, উমর রা. খায়বারে গনিমতের বণ্টনে কিছু জমি পেয়েছিলেন। নবী করীম সা. এর কাছে এসে পরামর্শ চেয়ে বলতে লাগলেন, হে আল্লাহর রাসূল, খায়বারে আমার কর্তৃত্বে কিছু জমি রয়েছে, এরকম মূল্যবান বস্তু আমি কোনোসময় পাইনি। এগুলো কী করব? আল্লাহর রাসূল বললেন, চাইলে মূলটা রেখে বাকীটা দান করে দিতে পার।” অতঃপর উমর রা. তা দান করে দিলেন। ফলে তা আর বিক্রি হয়নি, উত্তরাধিকার বণ্টনে আসেনি। দরিদ্র, আত্মীয়, কৃতদাস, আল্লাহর পথের মুজাহিদ, পথিক ও মেহমানদের জন্য তা ওয়াকফ করে দিলেন। ন্যায়পথে যে কেউ তা থেকে খেতে পারবে। কোনোরূপ অর্থ যোগান না দিয়ে বন্ধুদের খাওয়াতে পারবে।” (বুখারী-২৫৮৬) 

কোনোকিছু আল্লাহর জন্য ওয়াকফ করে দেওয়া ইসলামের একটি বড় বৈশিষ্ট্য। ওয়াকফ মীযানে ভারী পড়বে। 

 নবী করীম সা. বলেন, “আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস রেখে এবং তাঁর প্রতিশ্রুতি সত্য জেনে আল্লাহর রাস্তায় যে একটি অশ্ব লালন করল, তাকে পরিতৃপ্ত করা, পানি পান করানো, তার বিষ্ঠা এবং প্রস্রাব.. সবই কেয়ামতের দিন সৎকর্মের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (বুখারী-২৬৯৮) 

হাদিসের দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মুসলিমদেরকে উৎসাহিত করা, তারা যেন কোনোকিছু ওয়াকফ হিসেবে রেখে যায়। তা ঘোড়া হোক, জমি হোক, মসজিদ হোক, মাদরাসা হোক বা অন্যকিছু। যেন এর প্রতিদান সে পরকালে পরিপূর্ণরূপে পায়। 

পরিশেষে.

. বেশি করে নেক আমলের মাধ্যমে মীযানের পাল্লা ভারী করতে মুসলিমদের সচেষ্ট হওয়া উচিত। 

নবী করীম সা. বলেন, প্রতিটি সৎকর্ম দশগুণ থেকে সাতশত গুণ বা ততোধিক পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়।” (বুখারী-মুসলিম)। 

। 

অন্য হাদিসে বলেন, “যে ব্যক্তি পুণ্যের ইচ্ছা করে অথচ বাস্তবায়ন করেনি, তার জন্যও একটি নেকী লেখা হয়।” (মুসলিম) 

নিষ্ঠাপূর্ণ আমল আল্লাহর নৈকট্য অর্জন সহজ করে দেয় এবং ঈমানকে পূর্ণ করে দেয়। 

হাউযে কাউসার 

মুমিনগণ নবী করীম সা. এর সাথে হাউযে কাউসারে সাক্ষাত করবে। নবীজী তাদেরকে নিজ হাতে কাউসারের পানি পান করাবেন। যা পান করার পর কখনো তারা পিপাসিত হবে না। মুনাফিক ও মুরতাদ সম্প্রদায়কে সেখান থেকে বিতাড়িত করা হবে। ফলে তারা পান করার সুযোগ পাবে না। 

* কী সেই হাউয? 

* কোথায় তার অবস্থান? 

* পানকারীদের বৈশিষ্ট্য কী? 

ভূমিকা

 নবীজীর মিম্বার তার হাউযের উপর

হাউযের স্থান এবং আখেরাতে তার বিন্যাস

 কাউসার নদী এবং হাউযের সাথে তার যোগসূত্র 

হাউযের বৈশিষ্ট্য 

সর্বাগ্রে উপনীত ব্যক্তিবর্গ

 ইয়েমেন-বাসীর অগ্রাধিকার

 আরও যারা উপনীত হবে 

নবী করীম সা. এর হাউয কেবল তাঁর উম্মতের জন্যই.. 

ভূমিকা

 হাশরের ময়দানে মানুষ দীর্ঘকাল দাঁড়িয়ে থাকবে। সেখানে। আদম আ. থেকে নিয়ে কেয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীতে আগত সকল। সম্প্রদায়ের সমাবেশ ঘটবে। সূর্যকে নিকটবর্তী করা হবে। মহাত্রাসের সেই দিনে মানুষ চরম তৃষ্ণার্ত থাকবে। সকলেই। পানির জন্য হাহাকার করবে। সেসময় প্রত্যেক নবীর জন্য একটি করে হাউয প্রকাশ করা হবে। অনুসারীরা সেখান থেকে পান করতে পারবে। কাউকে পান করানো হবে আবার কাউকে বিতাড়িত করা হবে। হাউয হলো এক সুবিশাল জলাশয়। নবী মোহাম্মাদ সা. কে হাউয দিয়ে আল্লাহ সম্মানিত করবেন। হাউয অতিপ্রশস্ত ও বিশালকায়, যার পানি হবে অতিশয় নির্মল ও স্বচ্ছ। বর্ণ হবে দুধের চেয়ে সাদা। স্বাদ হবে মধুর চেয়ে মিষ্টি। ঘ্রাণ হবে কস্তুরী অপেক্ষা সুগন্ধিময়। পানপাত্র সংখ্যা আকাশের তারকাসমূহের ন্যায়। সেখানে উম্মতে মোহাম্মাদী পান করতে আসবে। একবার যে পান করবে, পরবর্তীতে কখনো সে তৃষ্ণার্ত হবে না। 

প্রশ্ন, হাউয কি কেবল মােহাম্মাদ সা. এর জন্যই নির্দিষ্ট? 

উত্তরঃ প্রত্যেক নবীর জন্যই হাশরের ময়দানে পৃথক পৃথক হাউয থাকবে। নবী করীম সা. স্বীয় হাউযে অধিক অবতরণকারী (অনুসারী) কামনা করবেন। 

 নবী করীম সা. বলেন, “প্রত্যেক নবীর জন্যই হাউয থাকবে, প্রত্যেকে চাইবে তার হাউযে যেন বেশি লোক অবতরণ করে।আমি আশা করি, আমার হাউযেই অধিক পরিমাণ লোক অবতরণ করবে।” (তিরমিযী-২৪৪৩) 

অর্থাৎ সকল নবীই চাইবে নিজের উম্মত অধিক হোক। উম্মত যত বেশি হবে, ততই তাঁরা সন্তুষ্ট ও খুশি হবেন। অন্য নবীদের উপর গর্ববোধ করবেন। 

* হাউযের উপর নবীজীর মিম্বার 

আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী মোহাম্মাদ সা. এর সম্মানার্থে এবং তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি করতে হাউযের উপর তার মিম্বার স্থাপিত হবে। কেয়ামতের দিন তিনিই হবেন সকল আদম সন্তানের নেতা।

নবী করীম সা. বলেন, “আমার ঘর ও মিম্বারের মধ্যস্থল জান্নাতের বাগান সমূহের একটি। আমার মিম্বার আমার হাউযের উপর থাকবে।” (বুখারী-১১৩৮)

 কেয়ামতের কঠিন দিনে মুমিন আপন নবীকে দেখার জন্য পাগলপারা থাকবে। তার হাত থেকে পান করার জন্য ব্যাকুল থাকবে। 

* হাউযস্থল এবং পরকালে তার বিন্যাস..

 হাশরের সেই মহা-সমাবেশে ভয় ও তৃষ্ণা যখন চরম আকার ধারণ করবে, তখন সকলেই হাউযে অবতরণের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করবে। হাউযে মুমিনদের অবতরণ কি সিরাত পাড়ি দেয়ার পূর্বে হবে নাকি পরে?                                    উলামায়ে কেরাম এতে বিভিন্ন মত পোষণ করেছেন। তবে সঠিক মত হল, সীরাত পাড়ি দেয়ার পূর্বেই। কারণ, মুরতাদ, কাফির ও মুনাফিকরা হাউয থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর সীরাত পাড়ি দিতে আসবে। পাড়ি দিতে গিয়ে তারা জাহান্নামে নিপতিত হবে। 

* কাউসার নদী এবং হাউযের সাথে তার যোগসূত্র 

কাউসার এমন একটি বিশেষ্য, যা অধিক পরিমাণ বুঝায়। হাউযের যোগসূত্র এই ‘কাউসার’ নদীর সাথেই হবে। বিভিন্ন হাদিসে সেই নদীর গুণাগুণ বর্ণিত হয়েছে। ফলে অনেক আহলে এলেম হাউকেই ‘কাউসার’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। সূরায়ে  কাউসারে উল্লেখিত ‘কাউসার’ দ্বারাও তারা হাউয উদ্দেশ্য নিয়েছেন। 

তবে বাহ্যত যা বুঝা যায়, হাউয হাশরের ময়দানে প্রকাশ করা হবে। আর ‘কাউসার’ হলো জান্নাতের একটি নদীর নাম। কাউসার নহর থেকেই হাউযে পানি সরবরাহ হবে। মনে হবে হাউযটি কাউসার নদীরই একটি শাখা। হাউযের পানিতে কাউসার নহরের পানির সকল গুণাগুণ থাকবে। সামনে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা আসবে ইনশাআল্লাহ। 

* হাউযের বৈশিষ্ট্য

 হাউয হলো এক সুবিশাল জলাশয়। মুমিনগণ তা থেকে পান করবে। হাউ এর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। হাদিসে বর্ণিত হাউযের গুণগুলো হলো, – সেটি সুপ্রশস্ত ও বিশাল 

– তার পানি দুধের চেয়ে সাদা, স্বাদ মধুর চেয়ে মিষ্টি, সুবাস কস্তুরী অপেক্ষা সুগন্ধিময়। তার পাত্র-সংখ্যা আকাশের তারকাসমূহ হতেও অধিক – জান্নাতের কাউসার নদী থেকে সেখানে পানি সরবরাহ হবে। কেবল মোহাম্মাদ সা. এর উম্মত সেখান থেকে পান করবে।একবার যে পান করবে, পরবর্তীতে কখনো সে পিপাসিত হবে না। 

* সুপ্রশস্ত বিশাল হাউয 

হাউযের প্রশস্ততা, বিশালতা ও আয়তন সম্পর্কে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। সেখানে জন-জট হবে না। পান করার ক্ষেত্রে ভোগান্তির সম্মুখীন হতে হবে না। নবী করীম সা. বিভিন্ন শহরের আয়তনের সাথে এর তুলনা দিয়েছেন।  নবী করী সা. বলেন, “তোমাদের সামনে থাকবে হাউয, যা জারবা ও আযরুহ (দুটি নগরী) এর মধ্যস্থলের সমান।” (বুখারী-৬২০৬)। 

নবীজী বলেন, “আমার হাউযের আয়তন আয়লা (জর্ডানের একটি উপকুল) এবং ইয়েমেনের ‘সানা’র মধ্যস্থলের সমান প্রশস্ত।” (বুখারী-৬২০৯)। 

 নবীজী বলেন, “আমার হাউযের এক পার্শ্ব থেকে অপর পার্শ্বের। দূরত্ব মদিনা এবং ‘সানা’র দূরত্বের সমান।” (মুসলিম-৬১৩৮)। 

নবীজী বলেন, “আমার হাউয কা’বা থেকে বায়তুল মাকদিস এর দূরত্বের সমান।” (ইবনে মাজা-৪৩০১) 

 নবীজী আরো বলেন, “হাউযে আমি তোমাদের নিকট আগমন করব, যার প্রশস্ততা আয়লা এবং জুহফা এলাকা-দ্বয়ের মধ্যস্থল তুল্য।” (মুসলিম-৬১১৭)

 অন্য হাদিসে নবীজীকে হাউয সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি 

বলেন, 

 “এখান থেকে আম্মান (জর্ডানের রাজধানী) এর দূরত্বের সমান প্রশস্ত।” (মুসলিম-৬১৩০)। 

প্রাসঙ্গিক

 একেক সময় একেক নগরীর নাম উল্লেখ করার 

কারণ কী?

 এখানে একাধিক নাম উল্লেখ করার দ্বারা বিষয়টি পরিষ্কার ও 

স্পষ্ট করা উদ্দেশ্য। কারণ, একেকজন একেক এলাকা চেনে। 

* হাউয হবে চতুষ্কোণ

হাউযের আকার বর্ণনা করতে গিয়ে নবীজী বলেন, 

“আমার হাউয এক মাস ভ্রমণের দূরত্ব পরিমাণ বৃহৎ এবং তার পার্শ্বগুলো সমান।” (মুসলিম-৬১১১) 

অর্থাৎ তার এক পার্শ্ব হতে অপর পার্শ্বে যেতে সময় লাগবে এক 

মাস। 

* পাত্রসংখ্যা

 মুমিনগণ হাউযে উপনীত হবে। সেখানে অগণিত পেয়ালা রাখা থাকবে। সেখানে তাদের ঝগড়া করতে হবে না। হুড়োহুড়ি করা লাগবে না। 

নবী করীম সা. বলেন, “সেখানে স্বর্ণরুপার পানপাত্র থাকবে, সংখ্যায় সেগুলো আকাশের তারকারাজির সমান বা ততোধিক হবে।” (মুসলিম-৬১৪০)। 

* হাউযের পানির উৎস

হাউযের পানি জান্নাতের কাউসার নহর থেকে সরবরাহকৃত হবে। যেমনটি নবী করীম সা. বলেন, 

“জান্নাত হতে দুটি নালা দিয়ে সেখানে পানি প্রবাহিত হবে।” (মুসলিম-৬১২৯)। 

* হাউযের পানির বৈশিষ্ট্য

তার পানি পবিত্র এবং সুমিষ্ট। কারণ, তা জান্নাতেরই পানি।

 নবী করীম সা. এ পানির বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, “দুধের চেয়ে সাদা। মধুর চেয়ে মিষ্টি। জান্নাত থেকে দুটি নালা হয়ে সেখানে পানি প্রবাহিত হবে। একটি নালা হবে স্বর্ণের, অপরটি রূপার।” (মুসলিম-৬১৩০) 

 নবীজী বলেন, “তার সুবাস কস্তুরী অপেক্ষা সুগন্ধিময়। তার পেয়ালা সংখ্যা আকাশের তারকারাজির সমান।” (মুসলিম)। 

একবার পান করলে আর তৃষ্ণার্ত হবে না

নবীজী বলেন, “সেখানে অসংখ্য পেয়ালা থাকবে, যার পরিমাণ আকাশের তারকসমূহের সমান। একবার যে পান করবে, দ্বিতীয়বার সে তৃষ্ণার্ত হবে না।” (মুসলিম-৬২০৮) 

* সর্বপ্রথম যারা পান করতে আসবে 

নবী করীম সা. এর মর্যাদা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা’লা তাঁকে হাউয দান করবেন। ঈমান যত মজবুত হবে এবং আমল যত অধিক হবে, তত দ্রুত তারা সেখান থেকে পানি পান করতে পারবে। সর্বপ্রথম পান করবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য প্রাণোৎসর্গকারী দরিদ্র মুহাজিরগণ। কুরআনে আল্লাহ নিজেই তাদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন 

و للفقراء المهجرين الذين أخرجوا من ديرهم وأولهن يتمتعون فضلا الله ورضوا ويرون الله ورسوله أليك هو الصين 

که الحشر:8 

“এই ধন-সম্পদ দেশত্যাগী নিঃস্বদের জন্যে, যারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি লাভের অন্বেষণে এবং আল্লাহ তাঁর রাসূলের সাহায্যার্থে নিজেদের বাস্তুভিটা ও ধন-সম্পদ থেকে বহিস্কৃত হয়েছে।” (সূরা হাশর-৮)। তাদের সম্মুখভাগে থাকবে আবু বকর, উমর, উসমান, আলী রা. এবং সকল সাহাবীবৃন্দ। 

নবীজী বলেন, “হাউযের পানপাত্র-সংখ্যা আসমানের তারকারাজির সংখ্যার সমান। একবার যে পান করবে, দ্বিতীয়বার সে তৃষ্ণার্ত হবে না। সর্বাগ্রে পান করতে আসবে শীর্ণকায় জীর্ণবস্ত্রবিশিষ্ট দরিদ্র মুহাজিরগণ। দুনিয়াতে যারা সম্ভ্রান্ত নারীদেরকে বিয়ে করতে পারেনি। যাদের জন্য দুয়ার খোলা হতো না।” (মুস্তাদরাকে হাকিম-৭৩৭৪) 

* ইয়েমেনবাসীর অগ্রাধিকার 

ইয়েমেন-বাসী হলো কোমল হৃদয়ের মানুষ। তারাই সর্বাগ্রে মুসাফাহা করতে আসে। তাদের স্বভাব হলো উৎকৃষ্ট। হাউযে তারাই অগ্রগামী থাকবে। নবীজী তাদেরকে সর্বাগ্রে পান করাবেন। 

 নবী করীম সা. বলেন, “আমি আমার হাউসের সামনে ইয়েমেন বাসীর জন্য মানুষকে সরাতে থাকব। পানিতে প্রহার করব যেন। বেশি করে প্রবাহিত হয়।” (মুসলিম-৬১৩০)

 অর্থাৎ অন্যদেরকে সরাতে থাকব যেন ইয়েমেনবাসী আগে পান করতে পারে। ইসলামের খেদমতে তাদের অগ্রগণ্যতার পুরষ্কার স্বরূপ তাদেরকে এ সম্মানে ভূষিত করা হবে। 

* হাউযে আগমনকারীগণ

 ব্যক্তি যত পরিশুদ্ধ হবে, তত দ্রুত সে হাউযে উপনীত হতে পারবে। সর্ব-পরিশুদ্ধ হলেন সাহাবীগণ। তাদের মধ্য শ্রেষ্ঠ হলেন। আবু বকর, উমর, উসমান ও আলী রা.। আনসার সাহাবীগণও অগ্রগণ্য থাকবেন। আনসার সাহাবীদের সম্পর্কে নবীজী বলেন, 

 “আমার মৃত্যুর পর তোমরা অপ্রাধান্য থাকবে। তখন তোমরা ধৈর্যধারণ করো। শেষপর্যন্ত হাউযে তোমরা আমার সাথে সাক্ষাৎ করবে।” (বুখারী-৩৫৮২)

 আনসার সাহাবীগণ ইসলামের জন্য বিশাল ত্যাগ স্বীকার করেছেন। মুহাজিরদেরকে স্থান দিয়েছেন, তাদেরকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন, নবীজীকে আশ্রয় দিয়েছেন, জিহাদ ও খেদমতে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এর যথাযথ পুরষ্কার তারা দুনিয়ায় প্রাপ্ত হবে না। নবীজী তাদেরকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে বলেন, “তোমরা চিন্তিত হয়ো না। তোমাদের যথাযথ 

প্রতিদান আল্লাহ পরকালে দিবেন।” পক্ষান্তরে যারা নবীজীর মৃত্যুর পর মুরতাদ হয়েছিল এবং যে সকল মুনাফিক ভেতরে ভেতরে চরম কুফুরী পোষণ করত, কেয়ামতের দিন তাদের চরিত্র উন্মোচিত হবে। হাউযের পাড় থেকে তাদেরকে বিতাড়িত করা হবে। 

নবী করীম সা. বলেন, “হাউযে আমি তোমাদের অপেক্ষায় থাকব; এমন সময় কিছু লোককে আমার সামনে উপস্থিত করে লাঞ্ছিত করা হবে। আমি তাদেরকে চিনে ফেলব। বলব- হে প্রতিপালক, ওরা আমার সাথী.. ওরা আমার সাথী! তখন বলা হবে, আপনি জানেন না; আপনার মৃত্যুর পর তারা কী কাণ্ড ঘটিয়েছে! 

অন্য বর্ণনায়- “আপনার মৃত্যুর পর তারা ইসলাম থেকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেছে, মুরতাদ হয়ে গেছে।” (বুখারী-৬২১৫)। 

প্রাসঙ্গিক 

এখানে সাহাবীদের ত্রুটি ধরা হয়নি.. 

উপরোক্ত হাদিসে সাহাবীদের নিন্দা করা হয়নি; বরং হাদিসের অর্থ হলো, সেদিন হাউয থেকে বিতাড়িত লোকেরা সেসব লোক, যারা নবীজীর ইন্তেকালের পর আবু বকর রা. এর শাসনামলে মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল। আবু বকর রা. তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। ফলে তারা কুফরের উপরই মৃত্যুবরণ করেছিল। প্রসিদ্ধ সাহাবীগণ কেউই মুরতাদ হননি; বরং আরবের কিছু বেদুইন ও মুনাফিকেরা মুরতাদ হয়েছিল, যারা ইসলামের জন্য সামান্য পরিমাণ ত্যাগও স্বীকার করেনি। পাশাপাশি মুনাফিকরাও হাউয়ে আসতে চাইবে। নবীজী তাদেরকে দেখে আপন সহযোগী মনে করবেন। যেমন, মুনাফিক আব্দুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুল ও তার সমমনা ব্যক্তিবর্গ। বাহ্যত তারা ইসলাম প্রকাশ করলেও অন্তরে চরম কুফুরী পোষণ করত। কেয়ামতের ময়দানে আল্লাহ তাদের মুখোশ উন্মোচন করে তাদেরকে চরম লাঞ্ছিত করবেন। 

মোহাম্মাদ সা. এর হাউয কেবল তাঁরই উম্মতের জন্য.. প্রত্যেক নবীরই একটি করে হাউয থাকবে, যা থেকে অনুসারী মুমিনগণ পান করতে পারবে। নবী করীম সা. আমাদেরকে অবহিত করেছেন যে, তাঁর হাউয কেবল তাঁরই উম্মতের জন্য নির্দিষ্ট হবে, 

নবীজী বলেন, “আমার হাউযে আমার উম্মত সেদিন উপনীত হবে। আমি মানুষকে বিন্যাস করতে থাকব, যেমন তোমরা ঊটকে পানি পান করানোর সময় বিন্যাস করে থাক। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর নবী, আপনি কি সেদিন আমাদেরকে। চিনবেন? বললেন, হ্যাঁ.. নিদর্শন দেখে চিনব। তোমাদের ওযুর অঙ্গগুলো শুভ্র এবং উজ্জ্বল থাকবে। তোমাদের কিছু লোক সেদিন আমার কাছে আসতে চাইবে, কিন্তু তারা পৌঁছুতে পারবে না। বলব, হে প্রতিপালক, ওরা আমারই সহযোগী! এক ফেরেশতা তখন উত্তরে বলবেন, আপনি কি জানেন তারা আপনার পর কী কাণ্ড ঘটিয়েছে!?” (মুসলিম-৬০৫)

 উপরোক্ত হাদিস থেকে বুঝা যায়, হাউয থেকে বিতাড়িতরা হলো মুনাফিক সম্প্রদায়, যারা অন্তরে কুফুরী পোষণ করত আর মুখে ইসলাম প্রকাশ করত। নবী করীম সা, যেন তার আশপাশে থাকা মুনাফিকদেরকেই সতর্ক করছিলেন। কারণ, কেয়ামতের 

দিন আল্লাহ তা’লা তাদের প্রকৃত অবস্থার উপর বিচার করবেন। নবীজীর জীবদ্দশাতেই কতিপয় মুনাফিকের পরিচয় প্রকাশ হয়ে গিয়েছিল। যেমন, উহুদ যুদ্ধের দিন প্রায় তিনশত মুনাফিক যুদ্ধের পূর্বেই রণাঙ্গন ছেড়ে চলে এসেছিল।

 কেয়ামতের দিন অগণিত সম্প্রদায় থাকবে যাদের সংখ্যা সম্পর্কে আল্লাহ ব্যতীত কেউ অবগত নয়। প্রচণ্ড ভিড় হবে সেদিন।উম্মতে মোহাম্মাদীর অবস্থান সেদিন কালো ষাঁড়ের দেহে একটি সাদা লোম সদৃশ হবে। সেই কঠিন পরিস্থিতিতে মানুষ একজন সুপারিশকারীর প্রতীক্ষায় থাকবে। সুপারিশকারীগণ হবেন নবী, রাসূল, ফেরেশতা, শহীদ এবং সৎকর্মশীল ব্যক্তিবর্গ। বিস্তারিত সামনে আসছে.. 

আক্কীদা, 

নবীজীর সাহাবীগণ উম্মতের সর্বোৎকৃষ্ট মানব সম্প্রদায়, তাই হাউযে সর্বপ্রথম তারাই উপনীত হবেন। 

শাফা‘আত (সুপারিশ

কেয়ামত দিবসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলীর মধ্যে অন্যতম হলো সুপারিশ। হাশরের ময়দানে মানুষের পরিণাম নির্ধারণে তা বিরাট ভূমিকা পালন করবে। সকল মানুষ সেদিন নবী রাসূলদের কাছে গিয়ে সুপারিশ প্রার্থনা করবে। নবী রাসূলগণ সুপারিশ করতে অপরাগতা প্রকাশ করবেন। শেষপর্যন্ত আল্লাহ তা’লা নবী মোহাম্মাদ সা. কে ‘মাক্কামে মাহমুদ’-এ উত্তোলন করে সুপারিশের অনুমতি দেবেন। 

* সুপারিশ কী? 

* সুপারিশের শর্তগুলো কী?

 * সুপারিশের প্রকারগুলো কী? 

* শুধু আমাদের নবীর জন্য নির্দিষ্ট, নাকি সকল নবীর জন্যও? 

* নবীগণ ব্যতীত অন্যরাও কি সুপারিশের অধিকার রাখবে? 

ভূমিকা

 শাফা’আত বা সুপারিশের সংজ্ঞা

 সুপারিশের শর্তসমূহ

 সুপারিশের গুরুত্ব 

প্রত্যেক নবীর জন্যই গৃহীত প্রস্তাব 

সুপারিশের প্রকারসমূহ 

সুপারিশ-কারীগণ

 নবীজীর সুপারিশ পাওয়ার উপায়

 অধিকহারে অভিশাপ সুপারিশ প্রতিরোধ করে দেয়

 নবীজীর সুপারিশ লাভের সর্বাধিক হকদার 

* ভূমিকা 

কেয়ামতের সেই কঠিন দিনে মানুষ যখন সুদীর্ঘকাল দাঁড়িয়ে থাকবে, চরম ত্রাস সৃষ্টি হবে, সীমালঙ্ঘনকারীদের চোখ অশ্রু ঝরিয়ে শুকিয়ে যাবে, ক্ষতিগ্রস্তদের সকল আশা নিরাশায় পরিণত হবে, নবী রাসূলগণ পর্যন্ত ভীত সন্ত্রস্ত থাকবেন, মর্যাদাশীল ফেরেশতাগণ ভয়ে অস্থির থাকবেন, সেদিন মানুষ মহান আল্লাহর কাছে হিসাবকার্য শুরু করতে একজন সুপারিশকারী খোঁজে বেড়াবে। অনেক খোঁজাখোজির পর, অনেক আকুতি মিনতি ও দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর, সকল নবীদের অপারগতা প্রকাশের পর.. শ্ৰেষ্ঠনবী মোহাম্মাদ সা. প্রশংসার ঝাণ্ডা বহন করে সুপারিশকারীরূপে আগমন করবেন। তিনি মহান প্রতিপালকের সামনে সেজদায় লুটিয়ে পড়বেন। দোয়া করতে থাকবেন। আকুতি মিনতি করতে থাকবেন।কাঁদতে থাকবেন। অতঃপর আল্লাহ তার সুপারিশ গ্রহণ করবেন। এরপর আরও সুপারিশ করবেন। সেই সুপারিশের প্রেক্ষিতে আল্লাহ তা’লা অনেক মানুষকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাত দেবেন। অনেক মুমিনের স্তর উন্নীত করবেন…।। 

নবী করীম সা. বলেন, “আমাকে এমন পাঁচটি বিষয় দেওয়া হয়েছে যেগুলো অন্য কোন নবীকে দেওয়া হয়নি- ১. একমাস দূরত্বের ব্যবধানে থাকা শত্রুর অন্তরে আমার ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ২. আমার জন্য যুদ্ধ লব্ধ সম্পদ গ্রহণ বৈধ করা হয়েছে, যা ইতিপূর্বে কোন নবীর জন্য বৈধ ছিল না। ৩. ভূ-পৃষ্ঠের সকল স্থানে নামায আদায় আমার জন্য বৈধ করা হয়েছে, সুতরাং নামাযের সময় হলে যেখানেই তোমরা থাক; নামায পড়ে নিয়ও। ৪. আমাকে শাফা’আত (সুপারিশের অধিকার) দেয়া হয়েছে। ৫. সকল নবী নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে প্রেরিত, আর আমি সমগ্র বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে প্রেরিত।” (বুখারী-৩২৮)। 

* শাফাআতএর সংজ্ঞা

আরবী শাফাআত’ শব্দের অর্থ হলো কোন বস্তুকে অপর কোন বস্তুর সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া, জোড়া হওয়া। পরিভাষায় ‘শাফা’আত’ হলো, অন্যের জন্য কিছু চাওয়া। কারণ, ব্যক্তি নিজের চাহিদা পূরণে প্রথম একক থাকে, অতঃপর যখন তার সঙ্গে অন্যজন মিলিত হয় তখন তারা জোড়া হয়ে যায়। 

* সুপারিশ এর শর্তসমূহ 

সুপারিশ কবুল হওয়ার জন্য আল্লাহ তা’লা কুরআনে দুটি শর্ত উল্লেখ করেছেন..

 (১) সুপারিশকারীকে আল্লাহর পক্ষ থেকে সুপারিশের অনুমতি প্রদান। এক্ষেত্রে সুপারিশকারী যেই হােক; নবী, শহীদ কিংবা ফেরেশতা। আল্লাহ বলেন, 

و ولا تنق الشفع عنده إلا لمن أذن ال رح إذا فع عن لو بهتر قالوا ماذا قال 

قالوا الحق وهو لعل ألبيري 

 “যার জন্য অনুমতি দেওয়া হয়, তার জন্যে ব্যতীত আল্লাহর কাছে কারও সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না।” (সূরা সাবা-২৩) 

(২) সুপারিশকৃত ব্যক্তির প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং শিরকের গুনাহ থেকে সে পবিত্র হতে হবে। সুপারিশকৃত ব্যক্তি কাফের হলে কখনই সুপারিশ গৃহীত হবে না। কারণ, শিরক এর গুনাহ কিছুতেই আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। কাফেরদের সম্পর্কে আল্লাহ 

বলেন, 

و فانتفع شفعه الفعين ( که المدثر: ۶۸ 

“সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোন কাজে আসবে না।” (সূরা মুদ্দাছছির-৪৮) 

অন্যত্র আল্লাহ বলেন, 

لا يملكون اللمعة إلا من أذين المان ها و مريم: 

“যে দয়াময় আল্লাহর কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছে, সে ব্যতীত আর কেউ সুপারিশ করার অধিকারী হবে না।” (সূরা মারিয়াম-৮৭)

 এখানে প্রতিশ্রুতি হলো শাহাদাত তথা “আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই” সাক্ষ্য দেওয়া। অনেক ব্যাখ্যাকার এখানে প্রতিশ্রুতি বলতে নামায উদ্দেশ্য করেছেন। কারণ, 

|নবীজীর ভাষ্য, “তাদের এবং আমাদের মাঝে প্রতিশ্রুতি হলো নামায। যে নামায ত্যাগ করল, সে কুফুরী করল।” (তিরমিযী ২৬২১) 

আল্লাহর কাছে কাফেরের কোন প্রতিশ্রুতি নেই। যদ্দরুন তাদের ব্যাপারে সুপারিশকারীদের কোনো সুপারিশ কাজে আসবে না। 

। নবী করীম সা. বলেন, “আমার সুপারিশ কেবল আমার উম্মতের কবীরা গুনাহকারীদের জন্য।” (মুসনাদে আহমদ-১৩২২২) 

অর্থাৎ নবী করীম সা. সাধারণ গুনাহগারদের জন্য সুপারিশ করবেন। তবে যদি তার অপরাধ কবীরা গুনাহের ঊর্ধ্বে হয়, শিরক হয়, তবে কখনো তিনি সুপারিশ করবেন না। শাফাআতের শর্তদ্বয়কে আল্লাহ একটি আয়াতেই বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ বলেন, 

ق . لایه 

ويومي لاتفه الفئة من أوله ل 

“দয়াময় আল্লাহ যাকে অনুমতি দেবেন এবং যার কথায় সন্তুষ্ট হবেন সে ছাড়া কারও সুপারিশ সেদিন কোন উপকারে আসবে না।” (সূরা ত্বাহা-১০৯)

 যার কথায় সন্তুষ্ট হবেন বলতে যে শিরিক মুক্ত হয়ে তাঁর কাছে 

আসবে। শাফাআতের অনুমতি কেবল আল্লাহর নিকট হবে। আল্লাহ বলেন, 

وقل له الشفعة جمياه الزمر: کا 

“বলুন, সকল সুপারিশ আল্লাহরই ক্ষমতাধীন।” (সূরা যুমার-৪৪) 

* সুপারিশের গুরুত্ব

 নবী করীম সা. সহ যাদের সুপারিশ আল্লাহ কবুল করবেন, তাদের জন্য সুপারিশের অনুমতি প্রদান আল্লাহর পক্ষ থেকে 

এক বিরাট সম্মাননা সুপারিশকৃতদের জন্য সেটি হবে পরম | সৌভাগ্য। 

সুপারিশের গুরুত্ব একটি হাদিস থেকেই অনুমান করা যায়, নবী করীম সা. কে দুটি বিষয়ের একটি নির্বাচনের কথা বলা হয়েছিল- ১, তাঁর উম্মতের অর্ধেক লোককে জান্নাত প্রদান ২, সুপারিশ। তিনি সুপারিশকেই বেছে নিয়েছিলেন। যেমনটি নবী করীম সা. বলেন, “তোমরা কি জান প্রতিপালক গতরাতে আমাকে কী নির্বাচনের কথা বলেছেন? আমরা বললাম, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই অধিক জানেন। বললেন, তিনি আমাকে দুটি বিষয়ের একটি নির্বাচন করতে বলেছেন- ১, আমার উম্মতের অর্ধেক লোককে জান্নাত প্রদান। ২, সুপারিশ। আমি সুপারিশকেই বেছে নিয়েছি। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, দোয়া করুন আল্লাহ যেন আমাদেরকে সুপারিশকৃতদের 

অন্তর্ভুক্ত করেন। বললেন, সেটি প্রতিটি মুসলিমের জন্যই..!” (মুস্তাদরাকে হাকিম-২২১)। 

* প্রত্যেক নবীর জন্যই গৃহীত প্রস্তাব.

শাফা’আতের ব্যাপারে নবী করীম সা. উচ্ছ্বসিত ছিলেন। শাফা’আতের প্রসঙ্গ আসলেই তিনি প্রফুল্ল হয়ে যেতেন। প্রত্যেক নবীকেই আল্লাহ একটি মকবুল দোয়ার সুযোগ দিয়েছেন। সকল নবী দুনিয়াতেই সে দোয়া করে ফেলেছিলেন। তবে নবী করীম সা. শত কষ্ট এবং দুর্ভোগ সত্ত্বেও দোয়াটি তিনি সম্পন্ন করেননি; বরং পরকালের জন্য তা সঞ্চিত রেখেছেন। 

 নবী করীম সা. বলেন, “প্রত্যেক নবীকেই আল্লাহ গৃহীত দোয়ার একটি সুযোগ দিয়েছেন। সকল নবীই সেই দোয়া দুনিয়াতে করে ফেলেছেন। আমি আমার সেই দোয়া পরকালে শাফা’আত মুহূর্তের জন্য রেখে দিয়েছি। আল্লাহর সাথে শরীক না করে যে মৃত্যুবরণ করবে আল্লাহ চাহেন তো সেই তা লাভ করবে।” (মুসলিম-৫৫১)

 উপরন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে শেষ নবীর প্রতি পরম সম্মাননা হলো, আল্লাহ তাঁর উম্মতের সত্তর হাজার সদস্যকে বিনা হিসাবে জান্নাতে দেওয়ার ওয়াদা করেছেন। সত্তর হাজারের সাথে আরও অনেক…!  যেমন নবী করীম সা. বলেন, “প্রতিপালক আমাকে ওয়াদা দিয়েছেন যে, আমার উম্মত থেকে সত্তর হাজার লোককে বিনা হিসাবে ও বিনা আযাবে জান্নাতে দেবেন। প্রত্যেক হাজারের সাথে আরও সত্তর হাজার এবং প্রতিপালকের পক্ষ জাহান্নাম থেকে তিন তিনটি মুষ্টি।” 

* শাফাআতের প্রকারসমূহ

 কেয়ামতের দিন সকল সৃষ্টিই শাফা’আত-প্রাপ্তি কামনা করবে। কারো আশা পূরণ হবে, কেউ নিরাশ হয়ে ফিরে যাবে। সেদিন সর্বাধিক বিতাড়িত এবং ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে সেসব লোক, যারা দুনিয়াতে মূর্তি, প্রস্তর, পদার্থ বা কবরের পূজা করত। তাদের কাছে প্রার্থনা করত। তাদের কাছে বিপদ দূরীকরণ কামনা করত। তাদের কবরের পাশে পশু জবাই দিত। কবরে ফুল দিত। আতর ছেটাত। কেয়ামতের দিন সেসব উপাস্যরা তাদের উপাসনা অস্বীকার করবে। তারা তাদের কোনো উপকার করতে পারবে না। আযাব থেকে তাদের বাঁচাতে পারবে না। 

আল্লাহর বাণী, 

كك آل 

من دون أل أندادا چونه 

ومن الاس من يت والذين امنوا أشد حبا لله وويرى الذين ظلموا إيرون العذاب أن القوة يل جميعا وأين الله شديد العذاب ” إذ تب الذين اتبعوا من الذين اتبعوا ورأوا العذاب وتقطعت بهم 

كما 

فب 

وقال الذين اتبعوا وأين أنا 

الأسباب 

تراني عليه وما هم 

تبوأ مالك يريهه له أمل بخرجين من السياره 

البقرة: ۱۹۵ – ۱۹۷ 

“আর কোনো কোনো লোক এমনও রয়েছে যারা অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে এবং তাদের প্রতি তেমনি ভালোবাসা পোষণ করে, যেমন আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা হয়ে থাকে। কিন্তু যারা আল্লাহর প্রতি ঈমানদার তাদের ভালোবাসা ওদের তুলনায় বহুগুণ বেশি। আর কতই না উত্তম হতো যদি এ জালেমরা পার্থিব কোনো কোনো আযাব প্রত্যক্ষ করেই উপলব্ধি করে নিত যে, যাবতীয় ক্ষমতা শুধুমাত্র আল্লাহরই জন্য এবং আল্লাহর আযাবই সবচেয়ে কঠিন। অনুসৃতরা যখন অনুসরণকারীদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে যাবে এবং যখন আযাব প্রত্যক্ষ করবে আর বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে তাদের পারস্পরিক সকল সম্পর্ক। এবং অনুসারীরা বলবে, কতই না ভালো হত, যদি আমাদিগকে পৃথিবীতে ফিরে যাবার সুযোগ দেওয়া হতো। তাহলে আমরাও তাদের প্রতি তেমনি অসন্তুষ্ট হয়ে যেতাম, যেমন তারা অসন্তুষ্ট হয়েছে আমাদের প্রতি। এভাবেই আল্লাহ তা’লা তাদেরকে দেখাবেন তাদের কৃতকর্ম তাদেরকে অনুতপ্ত করার জন্য। অথচ, তারা কস্মিনকালেও আগুন থেকে বের হতে পারবে না।” (সূরা বাক্বারা ১৬৫-১৬৭)

 কুরআন-হাদিস অধ্যয়নে বুঝা যায় যে, কেয়ামতের দিন কোনো কোনো সুপারিশ গৃহীত এবং লাভজনক হবে, আবার কোনো কোনো সুপারিশ ব্যর্থ হবে; নির্বিকার থেকে যাবে। 

বুঝা গেল সুপারিশ দুই প্রকার, 

() গৃহীত সুপারিশ 

কুরআন-হাদিসে যার বিবরণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। এর অধিকারী হবেন নবী, রাসূল, ফেরেশতা, মুমিন এবং শহীদগণ। গৃহীত সুপারিশের আবার কিছু প্রকার রয়েছে, কিছু ধাপ রয়েছে;  কোনোটি পুরো সম্প্রদায়ের জন্য আবার কোনোটি নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য। 

() ব্যর্থ সুপারিশ 

দুনিয়াতে কাফের-মুশরেকরা তাদের উপাস্যের ক্ষেত্রে সুপারিশের যে ধারণা পোষণ করে থাকে, কবর পূজারীরা তাদের ‘বাবা’দের কাছ থেকে যে সুপারিশ কামনা করে থাকে; তাদের নামে পশু জবাই করে থাকে, এবাদত মনে করে কবরে হাত স্পর্শ করে থাকে, কবরের সামনে নামায আদায় করে পরকালে তাদের কাছ থেকে সুপারিশ আশা করে। এসব ব্যক্তিদেরকে আল্লাহ মিথ্যাবাদী বলে উপাধি দিয়েছেন। আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত সেদিন কেউ কারো জন্য সুপারিশ করার সাহস পাবে না। সুপারিশকারী এবং সুপারিশকৃত উভয়ের ক্ষেত্রে যদি আল্লাহর অনুমতি এবং সন্তুষ্টি থাকে, তবেই সুপারিশ করতে পারবে। আল্লাহ বলেন, 

ومن الي يشفع عنده إلا بإذنه که البقرة: 255 

“কে আছে এমন, যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া?” (সূরা বাকারা-২৫৫) 

অন্য আয়াতে, 

ولا يشفعوت إلا لمن أرضى به الأنبياء: ۲۸ 

“তারা শুধু তাদের জন্যে সুপারিশ করে, যাদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট।” (সূরা আম্বিয়া-২৮)। 

সুতরাং যে ব্যক্তি মাজারে গিয়ে পয়সা ঢালে, পশু জবাই দিয়ে, ওসিলা গ্রহণ করে, প্রার্থনা, তাওয়াফ অথবা নামায আদায় করে কবরস্থ ব্যক্তির নৈকট্য অর্জন করতে চায়, সে চরম পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত। পরকালে কখনো সে শাফাআতপ্রাপ্ত হবে না। 

* সুপারিশকারীগণ

 নৈকট্যশীল বান্দাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বিরাট সম্মাননা যে, তিনি জাহান্নামীদের ব্যাপারে তাদেরকে সুপারিশের অনুমতি দেবেন। 

কুরআন-হাদিসের উদ্ধৃতিসমূহ পর্যালোচনান্তে সুপারিশকারীরূপে যাদের উল্লেখ পাওয়া যায়.. 

() নবীগণ 

সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানবসম্প্রদায় হলেন নবীগণ। যাদেরকে আল্লাহ তা’লা মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে পথপ্রদর্শন করতে মনোনীত করেছেন। তাদের কারো মর্যাদা বেশি, আবার কারো তুলনামূলক কম। আল্লাহ বলেন, 

هارول 

وتلك ألأ فضلنا بعضهم على بعض منهمر من كل الله ورفع 

بعضهم درجي که البقرة: 253 | 

“এই রাসূলগণ আমি তাদের কাউকে কারো উপর মর্যাদা দিয়েছি। তাদের মধ্যে কেউ তো হলো তারা যার সাথে আল্লাহ কথা বলেছেন, আর কারও মর্যাদা উচ্চতর করেছেন।” (সূরা বাক্কারা-২৫৩) হাশরের ময়দানে তাদেরকে সুপারিশের অনুমতি প্রদান বিষয়টি তাদের জন্য সবচে’ মর্যাদার বিষয় হবে। আল্লাহ তাদের সুপারিশ গ্রহণ করবেন। সর্বপ্রথম আমরা নবী মোহাম্মাদ সা. এর সুপারিশগুলো উল্লেখ করব।আল্লাহ যেন আমাদেরকে তাঁর সুপারিশপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করেন। কোনো কোনো সুপারিশ কেবল তিনিই করবেন, আবার কোনো কোনো সুপারিশের ক্ষেত্রে তাঁর সাথে অন্য নবী ও শহীদগণও মিলিত হবেন। 

সুপারিশগুলো হল,

 প্রথম সুপারিশ 

এটিই ‘মহা সুপারিশ’। কেয়ামতের দিন সকল সৃষ্টির আকুতি মিনতির প্রেক্ষিতে তিনি মাকামে মাহমুদে অধিষ্ঠিত হবেন। আল্লাহ বলেন, 

و عسى أن يبعثك ربك مقاما محمودا نية الإسراء: ۷۹ 

“হয়তোবা আপনার পালনকর্তা আপনাকে মাক্কামে মাহমুদে পৌঁছাবেন।” (সূরা ইসরা-৭৯)

 এ সুপারিশ কেবল নবী মোহাম্মাদ সা. এর জন্য নির্দিষ্ট। মানুষের শত আকুতির পরও সকল নবীগণ এ সুপারিশ থেকে অপারগতা প্রকাশ করবেন। তা হলো হাশরের ময়দানের ভয়াবহ ও কঠিন পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে বিচারকার্য শুরু করার সুপারিশ।ইবনে উমর রা. বলেন, “কেয়ামতের দিন মানুষ সুদীর্ঘকাল দাঁড়িয়ে থেকে তাদের পাগুলো বিকল হওয়ার উপক্রম হবে। ফলে হাঁটু গেড়ে তারা দাঁড়িয়ে থাকবে। প্রত্যেক সম্প্রদায় নিজ নিজ নবীর অনুসরণ করবে। সকলেই গিয়ে বলবে, হে অমুক.. আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। শেষপর্যন্ত নবীজীর কাছে এসে পৌঁছুবে। সেদিন আল্লাহ তাকে ‘মাকামে মাহমুদ (প্রশংসনীয় স্থান) দান করবেন।” (বুখারী-৪৪৪১) 

ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত দীর্ঘ হাদিসেও বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে। সেখানে নবী করীম সা. বলেন, 

 “অতঃপর মানুষের হিসাবকার্য শুরু করার জন্য তিনি সুপারিশ করবেন। হাটতে থাকবেন, শেষপর্যন্ত গিয়ে দরজায় হাত রাখবেন। সেদিন আল্লাহ তাকে মাক্কামে মাহমুদে অধিষ্ঠিত করবেন।সকল সৃষ্টি সেদিন তাঁর প্রশংসা করবে।”

 এই মহা সুপারিশের জন্য নির্দিষ্ট করা আল্লাহর পক্ষ থেকে মোহাম্মাদ সা. এর জন্য এক বিরাট সম্মাননা। 

 নবী করীম সা. বলেন, “কেয়ামতের দিন আমিই সকল আদম সন্তানের নেতা হব; এতে গর্বের কিছু নেই। আমার কবরই সর্বপ্রথম উন্মোচিত হবে। আমিই প্রথম সুপারিশকারী এবং আমার সুপারিশই সর্বপ্রথম গৃহীত হবে; এতে গর্বের কিছু নেই।” (ইবনে মাজা-৪৩০৮) 

আর এটিই হল নবী করীম সা. এর সঞ্চিত প্রার্থনা, যা তিনি দুনিয়াতে অপূর্ণ রেখেছিলেন। 

একব্যক্তি এসে নবী করীম সা. কে বলতে লাগল, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি প্রতিপালকের কাছে সুলাইমান আ. এর মতো রাজত্ব চান না? আল্লাহর রাসূল হেসে দিয়ে বললেন, হয়তো তোমাদের সাথীর জন্য আল্লাহর কাছে সুলাইমান আ. এর রাজত্বের চেয়েও উৎকৃষ্ট কিছু রয়েছে। প্রত্যেক নবীর জন্যই 

আল্লাহ একটি গৃহীত প্রার্থনার সুযোগ দিয়েছেন। কেউ এ প্রার্থনা দুনিয়াতে করে তা অর্জন করে ফেলেছে। কেউ আপন কওমের উপর বদদোয়া করেছে, ফলে তারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ঠিক আমাকেও আল্লাহ একটি প্রার্থনার সুযোগ দিয়েছেন, আর সেটি আমি কেয়ামতের ময়দানে আমার উম্মতের জন্য সুপারিশ হিসেবে রেখে দিয়েছি।” (মুস্তাদরাকে হাকিম-২২৬) 

মোহাম্মাদ সা. ব্যতীত সকল নবী সেই সুপারিশ থেকে অপারগতা প্রকাশ করবেন একাধিক হাদিসে এই সুপারিশের বিস্তারিত বিবরণ এসেছে। 

– 

নবী করীম সা. বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ তা’লা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল সৃষ্টিকে একটি সমতল ভূমিতে একত্র করবেন। আল্লাহর কথা সেদিন সকলেই একসাথে শুনতে পাবে। আল্লাহ সকলকেই একসাথে দেখতে পাবেন। সূর্যকে সেদিন অতি নিকটবর্তী করা হবে। মানুষ সেদিন চরম ভীতিপ্রদ পরিস্থিতি এবং অতিশয় দুর্ভোগের শিকার হবে। পরিস্থিতি যখন ভয়াবহ আকার ধারণ করবে, তখন তারা দ্রুত বিচারকার্য-সূচনা প্রার্থনা করবে। একে 

অন্যকে বলতে থাকবে, তোমরা কি নিজেদের পরিস্থিতি লক্ষ্য করছ না? চরম দুর্ভোগ সহ্য করছ না? কেন তোমরা প্রতিপালকের কাছে একজন সুপারিশকারী খোঁজে বের করছ না!? কেউ কেউ বলবে, পিতা আদমের কাছে যাই! অতঃপর তারা আদম আ. এর কাছে এসে বলবে, হে আদম, আপনি সমগ্র জাতির পিতা, নিজ হাতে আল্লাহ আপনাকে সৃষ্টি করেছেন, আপনার মধ্যে তাঁর রূহ ফুকে দিয়েছেন, ফেরেশতাদের প্রতি আপনাকে সেজদা করার আদেশ করেছেন, সুতরাং আজ আপনি আমাদের জন্য সুপারিশ করুন! আপনি তো দেখছেন আমরা কী দুর্ভোগের মধ্যে আছি! কী ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সময় অতিবাহিত করছি! আদম আ. উত্তরে বলবেন, নিশ্চয় প্রতিপালক আজ এমন। রাগান্বিত হয়েছেন, অতীতে কখনো এরকম রাগান্বিত হননি, ভবিষ্যতেও হবেন না। তিনি আমাকে নির্দিষ্ট একটি বৃক্ষ থেকে বারণ করেছিলেন, কিন্তু আমি অবাধ্য হয়েছিলাম।হায়.. আমার কী উপায়.. আমার কী উপায়.. আমার কী উপায়..! অন্যদের কাছে যাও! অতঃপর তারা নূহ এর কাছে গিয়ে বলবে, হে নূহ, আপনি হলেন রাসূলদের পিতা। আপনাকে আল্লাহ কৃতজ্ঞ বান্দা বলে আখ্যায়িত করেছেন। সুতরাং আপনি প্রতিপালকের কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন; দেখছেনই তো আমরা কী দুরবস্থায় আছি, কী দুর্ভোগে সময় কাটাচ্ছি! নূহ আ. বলবেন, নিশ্চয় প্রতিপালক আজ এমন রাগান্বিত হয়েছেন, অতীতে কখনো এমন রাগান্বিত হননি, ভবিষ্যতেও হবেন না। আমি তও আমার কওমের উপর বদদোয়া করেছিলাম। হায়.. আমার কী উপায়.. আমার কী উপায়.. আমার কী উপায়..! অন্যদের কাছে। যাও! অতঃপর তারা ইবরাহীম আ. এর কাছে এসে বলবে, হে ইবরাহীম, আপনি তো আল্লাহর নবী, দুনিয়াবাসীর মধ্যে আপনি ছিলেন আল্লাহর পরম বন্ধু। সুতরাং আপনি প্রতিপালকের কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন; দেখছেনই তো আমরা কী দুরবস্থায় আছি, কী দুর্ভোগে সময় কাটাচ্ছি! ইবরাহীম আ. বলবেন, নিশ্চয় প্রতিপালক আজ এমন রাগান্বিত হয়েছেন, অতীতে কখনো এরকম রাগান্বিত হননি, ভবিষ্যতেও হবেন না। তিনি তার মিথ্যাবাদীতার অজুহাত দিয়ে বলবেন, হায়.. আমার কী উপায়.. আমার কী উপায়.. আমার কী উপায়..! তোমরা মুসা’র কাছে যাও! অতঃপর তারা মুসা’র কাছে এসে বলবে, হে মুসা, আপনি তো আল্লাহর রাসূল, রিসালাত দিয়ে তিনি আপনাকে সম্মানিত করেছেন এবং দুনিয়াতে আপনার সঙ্গে কথা বলেছেন। সুতরাং আজ প্রতিপালকের কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন; দেখছেনই তো আমরা কী দুরবস্থায় আছি, কী দুর্ভোগে সময় কাটাচ্ছি! মুসা আ. বলবেন, নিশ্চয় প্রতিপালক আজ এমন রাগান্বিত হয়েছেন, অতীতে কখনো এরকম রাগান্বিত হননি, ভবিষ্যতেও হবেন না। নিশ্চয় আমি আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত একজনকে হত্যা করে ফেলেছিলাম; হায়.. আমার কী উপায়.. আমার কী উপায়.. আমার কী উপায়..! অন্যদের কাছে যাও! তোমরা ঈসা’র কাছে যাও! অতঃপর তারা ঈসা’র কাছে এসে বলবে, হে ঈসা, আপনি হলেন আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর কালিমা এবং তাঁর পক্ষ থেকে রূহ, যা মারিয়াম এর কাছে দেওয়া হয়েছিল! শিশুকালেই আপনি কথা বলেছেন! সুতরাং আজ প্রতিপালকের কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন; দেখছেনই তো আমরা কী দুরবস্থায় আছি, কী দুর্ভোগে সময়। কাটাচ্ছি! ঈসা বলবেন, নিশ্চয় প্রতিপালক আজ এমন রাগান্বিত হয়েছেন, অতীতে কখনো এরকম রাগান্বিত হননি, ভবিষ্যতেও হবেন না। তিনি কোনো অপরাধের বিবরণ না দিয়ে বলবেন, অন্যদের কাছে যাও! মোহাম্মাদের কাছে যাও! নবীজী বলেন, অতঃপর তারা আমার কাছে এসে বলবে, হে মোহাম্মাদ, আপনি হলেন আল্লাহর রাসূল এবং সর্বশেষ নবী। আল্লাহ আপনার অতীত ও ভবিষ্যতের সকল গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন। সুতরাং আজ প্রতিপালকের কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন; দেখছেনই তো আমরা কী দুরবস্থায় আছি, কী দুর্ভোগে সময় কাটাচ্ছি! অতঃপর আমি গিয়ে আরশের নীচে 

Leave a Reply

Address
304 North Cardinal St.
Dorchester Center, MA 02124

Work Hours
Monday to Friday: 7AM - 7PM
Weekend: 10AM - 5PM