মুসলিম নারী এবং সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য

মুসলিম নারী এবং সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য

[শরী‘আত ও বাস্তবতার নিরীখে একটি সুদৃঢ় পর্যালোচনা]

অধ্যাপক ড. ফালেহ ইবন মুহাম্মাদ আস-সুগাইর

অনুবাদ: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম

সম্পাদনা: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

ভূমিকা

بسم الله الرحمن الرحيم

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, আমরা তাঁর প্রশংসা করি, তাঁর নিকট সাহায্য ও ক্ষমা প্রার্থনা করি, তাঁর নিকট তাওবা করি, আর আমাদের নফসের জন্য ক্ষতিকর এমন সকল খারাপি এবং আমাদের সকল প্রকার মন্দ আমল থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাই। আল্লাহ যাকে পথ প্রদর্শন করেন, তাকে পথভ্রষ্ট করার কেউ নেই, আর যাকে তিনি পথহারা করেন, তাকে পথ প্রদর্শনকারীও কেউ নেই। আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো হক ইলাহ নেই, তাঁর কোনো শরীক নেই এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল।

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱتَّقُواْ ٱللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِۦ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسۡلِمُونَ ١٠٢[سورة آل عمران: 102]

“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় কর এবং তোমরা আত্মসমর্পনকারী না হয়ে কোনো অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করো না।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০২]

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ ٱتَّقُواْ رَبَّكُمُ ٱلَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفۡسٖ وَٰحِدَةٖ وَخَلَقَ مِنۡهَا زَوۡجَهَا وَبَثَّ مِنۡهُمَا رِجَالٗا كَثِيرٗا وَنِسَآءٗۚ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَ ٱلَّذِي تَسَآءَلُونَ بِهِۦ وَٱلۡأَرۡحَامَۚ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَلَيۡكُمۡ رَقِيبٗا ١[ سورة النساء: 1]           

“হে মানব! তোমরা তোমাদের রবককে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার স্ত্রী সৃষ্টি করেন, আর যিনি তাদের দুইজন থেকে বহু নর-নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট নিজ নিজ হক দাবি করে থাক এবং আত্মীয়তার বন্ধন সম্পর্কে সতর্ক থাক। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ওপর তীক্ষ্ন দৃষ্টি রাখেন।” [ সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১]

 ﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱتَّقُواْ ٱللَّهَ وَقُولُواْ قَوۡلٗا سَدِيدٗا ٧٠ يُصۡلِحۡ لَكُمۡ أَعۡمَٰلَكُمۡ وَيَغۡفِرۡ لَكُمۡ ذُنُوبَكُمۡۗ وَمَن يُطِعِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ فَقَدۡ فَازَ فَوۡزًا عَظِيمًا ٧١[ سورة الأحزاب: 70 – 71]

“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল; তাহলে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের কর্ম ত্রুটিমুক্ত করবেন এবং তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন। যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, তারা অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৭০-৭১]

অতঃপর…

নারীকে সমাজের অর্ধেক বলা হয়ে থাকে, আর নারী তিনি তো মাতা, স্ত্রী, কন্যা, বোন, নিকটাত্মীয়া…,আর তিনি তো লালনপালনকারিনী, শিক্ষিকা, শিশুদের পরিচর্যাকারিনী…। আর তিনি হলেন পুরুষদের জন্মদাত্রী, বীরপুরুষদের লালন-পালনকারিনী, মহিলাদের শিক্ষিকা …। আবার তিনি হলেন নেতা, আলিম ও দাঈ তথা আল্লাহর পথে আহ্বানকারীদের গড়ে তোলার অন্যতমা কারিগর।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাকে আদম ‘আলাইহিস সালাম থেকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি বলেন,

 ﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ ٱتَّقُواْ رَبَّكُمُ ٱلَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفۡسٖ وَٰحِدَةٖ وَخَلَقَ مِنۡهَا زَوۡجَهَا وَبَثَّ مِنۡهُمَا رِجَالٗا كَثِيرٗا وَنِسَآءٗۚ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَ ٱلَّذِي تَسَآءَلُونَ بِهِۦ وَٱلۡأَرۡحَامَۚ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَلَيۡكُمۡ رَقِيبٗا ١[سورة النساء: 1]

“হে মানব! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার স্ত্রী সৃষ্টি করেন; আর যিনি তাদের দুইজন থেকে বহু নর-নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন, আর আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট নিজ নিজ হক দাবি করে থাক এবং আত্মীয়তার বন্ধন সম্পর্কে সতর্ক থাক। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ওপর তীক্ষ্ন দৃষ্টি রাখেন।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১] 

আর সেখান থেকেই ইসলামী চিন্তবিদগণ নারীদের ব্যাপারটি নিশ্চিতভাবে আলোচনায় নিয়ে এসেছেন, যেভাবে আল-কুরআনুল কারীম সেটাকে গুরুত্ব দিয়ে নির্ধারণ করে দিয়েছে, একজন মা, বোন, স্ত্রী, কন্যা হিসেবে তার সাথে সংশ্লিষ্ট বিধিবিধানসমহ, সাথে সাথে বর্ণিত হয়েছে তার অধিকার এবং আবশ্যকীয় দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহ।

পরবর্তী যুগে নারীদের অন্যান্য দিকের আলোচনার ব্যাপক আকারে প্রসার লাভ করে, এমনি একটি দিক হচ্ছে, তার আকীদা-বিশ্বাস ও নীতি-নৈতিকতা বর্জনের ব্যাপার; আমরা শুনি ও পড়ি নারীকে তার প্রতিপালকের নির্দেশ ও তার ধর্মীয় শিক্ষাসমূহ থেকে মুক্ত করার দিকে স্পষ্ট আহ্বান সম্বলিত বক্তব্যগুলো। যার পরিপ্রেক্ষিতে নারীদের মধ্য থেকে অনেকেই ঐসব বিষয়কে স্বাধীনতা, প্রগতি, পশ্চাৎপশরতা থেকে বিমুক্তি, প্রাচীন রসম রেওয়াজ ও উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত পুরাতন জঞ্জাল, এ ধরনের বিভিন্ন ধুয়া তুলে আল্লাহর  শরী‘আতকে প্রত্যাখ্যান করার মত দুঃসাহস দেখাতে আরম্ভ করে।

আর কোনো সন্দেহ নেই যে, এটা এমন একটি ভয়াবহ সমস্যা, যা জ্ঞানী ও চিন্তাবিদদের নিকট দাবি করে যে, তারা যেন এই বিষয়টির প্রতি মনোযোগ দেন এবং তার কারণ ও প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেন, যার মাধ্যমে তারা এ ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার বিধান সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করবেন, নারীর অধিকারসমূহ এবং তার দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহ সুস্পষ্ট করবেন, তার (নারীর) ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর যে অন্ধকারাচ্ছন্ন আবরণ পড়ে আছে, তা দূর করবেন; আল্লাহ নিঃস্বার্থভাবে তাকে যে বৈশিষ্ট্য ও সৌন্দর্য দান করেছেন, তা সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরবেন এবং ইসলামের শত্রুগণ তাকে ও তার সমাজকে নিয়ে যে ষড়যন্ত্রের জাল বা আবরণ বিস্তার করেছে ও তার সাথে তারা ইচ্ছায় অনিচ্ছায় যেসব সন্দেহ ও ত্রুটিপূর্ণ দর্শনকে সম্পৃক্ত করে দিয়েছে, তা উম্মোচন করবেন। আর এই কাজটি তাদের জন্য বাধ্যতামূলক, যাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা, শিক্ষা ও দাওয়াতের দায়িত্ব প্রদান করেছেন।

আর এই সূত্র ধরেই এই কথাগুলো এসেছে, যাতে করে মুসলিম নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্য, বিশেষ করে তার জ্ঞানগত, সামাজিক, প্রশিক্ষণগত ও দাওয়াতী দায়িত্বের সংক্ষিপ্ত বিবরণের একটি রূপরেখা পেশ করা যায়। সুতরাং এ কথাগুলো হে মুসলিম নারী তোমার প্রতি, যে তার ধর্মীয় বিষয় এবং দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহের ব্যাপারে সচেতন; আর সে নারীর প্রতি, যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তার পথ উন্মুক্ত করল; সে দায়িত্ববান মায়ের প্রতি, যিনি জাতি বা প্রজন্মের শিক্ষক ও পুরুষজাতি গঠনের কারিগর, সে মমতাময়ী স্ত্রীর প্রতি! যে তার স্বামীর পাশে তাকে কল্যাণের পথে উৎসাহদানকারিনী, তার চলার পথে সাহায্যকারিনী এবং তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পথে সে যে সমস্যার সম্মুখীন হয়, তার দায়িত্ব বহনকারিনীর ভূমিকায় অবস্থানকারী, সে দা‘ঈ বা আল্লাহর পথে আহ্বানকারিনীর প্রতি! যে নিজেকে এমন মহান পথের প্রতিনিধি নিয়োগ করেছে, যে পথ জান্নাত ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে পৌঁছিয়ে দেয়; সে নারীর প্রতি যে এসব গুণাবলীর দ্বারা গুণান্বিতা; আমি এই গুণবাচক কথাগুলো বিশেষভাবে তোমাকে উদ্দেশ্য করে লিখছি; আশা করা যায় যে, তা পথ আলোকিত করবে, রাস্তা খোলাসা করবে, অন্ধকার দূর করবে, জ্ঞানকে বর্ধিত করবে, পরস্পরকে শক্তিশালী করবে এবং শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও দাওয়াতী কার্যক্রমের পথে কল্যাণকর ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে।

হে অভিভাবক! আপনাকে অনুরোধ করছি, যাতে আপনি দৃষ্টি দিতে পারেন আপনার স্ত্রী, বোন ও কন্যার দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি, যাতে আপনি তাকে এর জন্য প্রস্তুত করে নিতে পারেন, অতঃপর তার পৃষ্ঠপোষকতা করবেন এবং তার হাত ধরে এ কাজে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।

অতঃপর আমি যে কথাগুলো বলতে চেয়েছি সেগুলোর দিকেই অগ্রসর হচ্ছি, আল্লাহ তা‘আলার নিকট আবেদন করছি, তিনি যেন এর মাধ্যমে উপকৃত করেন এবং এগুলোকে জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পরবর্তী সময়ের জন্য সঞ্চিত সম্পদে পরিণত করেন, তিনি সবকিছুর শ্রবণকারী এবং আবেদন ও নিবেদনে সাড়াদানকারী।

و صلى الله و سلم و بارك على عبده و رسوله محمد و آله و صحبه أجمعين.

(আল্লাহ তাঁর বান্দা ও রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তার পরিবার-পরিজন ও সকল সাহাবীর প্রতি রহমত, শান্তি ও বরকত বর্ষণ করুন

লেখক:

ফালেহ ইবন মুহাম্মাদ আস-সুগাইর

অধ্যাপক, ইমাম মুহাম্মাদ ইবন সা‘উদ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, রিয়াদ

পোঃ বক্স: ৪১৯৬১, রিয়াদ, ১১৫৩১।

ই-মেইল: falehmalsgair@yahoo.com

নারী এবং তার দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে আলোচনা কেন?

প্রথমত: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাকে পুরুষের স্বভাব-প্রকৃতি থেকে ভিন্ন বিশেষ স্বভাব ও বৈশিষ্ট্য দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, আর সে থেকেই তিনি তাকে এমন কতগুলো বিধিবিধানের সাথে বিশেষিত করেছেন, যেগুলো ঐ বিশেষ স্বভাব-প্রকৃতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ হায়েয (ঋতুস্রাব), নিফাস, উভয় অবস্থা থেকে পবিত্রতা অর্জন, দুধ পান করানো এবং সালাত (নামায), সিয়াম (রোযা), হজ প্রভৃতি ধরনের ইবাদতের কিছু কিছু বিধানের সাথে যা সংশ্লিষ্ট। সুতরাং পুরুষ ও নারী গবেষকদের ওপর আবশ্যকীয় কর্তব্য হলো, তারা এ বিষয়ের প্রতি সংশ্লিষ্ট করে তাদের আলোচনা নির্দিষ্ট করবেন।

দ্বিতীয়ত: একজন নারীর ওপর কিছু আবশ্যকীয় দায়িত্ব ও মহান আমানত রয়েছে, যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তার ওপর ন্যস্ত করেছেন। সে সাধারণভাবে আকীদা-বিশ্বাস, পবিত্রতা অর্জন, সালাত (নামায), সিয়াম (রোযা) প্রভৃতির মত শরী‘আতের সকল বিধিবিধানের ব্যাপারে দায়িত্বপ্রাপ্ত। আর তার জন্য আরও কিছু নিয়ম-কানূন রয়েছে, একাধারে সে লালন-পালনকারিনী, মাতা ও স্ত্রী হওয়ার কারণে তাকে সেগুলোর সাথে বিশেষভাবে সম্পর্কিত করা হয়েছে। সুতরাং প্রত্যেক অবস্থায় তার ওপর আবশ্যক হলো সে ঐ নিয়ম-কানূনসমূহ যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত করবে। অতএব তাকে নিয়ে মোটামুটিভাবে ও বিস্তারিতভাবে আলোচনা হওয়া আবশ্যক। আরও আবশ্যক সুস্পষ্টভাবে আলোচনা ও পর্যালোচনা করা, যাতে মুসলিম নারী তার মধ্য দিয়ে ঐসব দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে জানতে পারে।

তৃতীয়ত: প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যব্যাপী ইসলামের শত্রুগণের পক্ষ থেকে বিগত যুগে মুসলিম নারীরা ঐ নগ্ন হামলার শিকার হয়েছে এবং মুসলিম সন্তানদের কেউ কেউ সেই প্রয়াসকে গলধঃকরণ করেছে; ফলে তারা ঐ কলমসমূহ যা লিখেছে, তা-ই আওড়াতে থাকে এবং ঐ আওয়াজসমূহের প্রতিধ্বনি-ই করতে থাকে, যাতে নারী তার আপন গৃহ থেকে বেরিয়ে যায়, সে পুরুষের সাথে অবাধে মেলামেশা করতে পারে এবং তাকে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে এবং তার শিশু সন্তানদের যত্ন নেয়ার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতে পারে। ঐ আওয়াজসমূহ মুসলিম নারীকে নিয়ে চিৎকার করে বলে: “তুমি যে অবস্থানে রয়েছো, তা ভেঙ্গে চুরমার করে দাও; তোমার চতুর্পাশে বিস্তৃত পর্দাসমূহ ছিঁড়ে ফেল; আমাদের দিকে বের হয়ে আস, যাতে তুমি আলো দেখতে পাও, যে আলো থেকে তুমি আড়ালে ছিলে যুগ যুগ ধরে। পুরুষের কর্তৃত্ব থেকে স্বাধীনতা অর্জন কর, মর্যাদার শর্তসমূহ থেকে মুক্তি লাভ কর, তোমার পর্দা খুলে ফেলে দিয়ে বের হয়ে আস, ঘর থেকে বের হয়ে আসার মাধ্যমে তোমার অস্তিত্ব ও কণ্ঠস্বরের প্রমাণ দাও, জীবনের প্রতিটি লোভনীয় বস্তু থেকে তোমার অংশটুকু গ্রহণ করার মাধ্যমে তুমি নিজেকে উপভোগ কর, তোমার স্বাধীন রুচি ব্যতীত অন্য কিছু যাতে তোমাকে শাসন না করে এবং বই পুস্তকের প্রচ্ছদ পৃষ্ঠায় তোমার যাদুকরী কোমলতা ছাপিয়ে, সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা ও রূপ-সৌন্দর্য প্রদর্শনীর মাধ্যমে তুমি ব্যবসা চালিয়ে যাও!”

আরব তরুনী! তুমি কি দারিদ্রতা চাও, অথচ সৌন্দর্য একটি বড় গচ্ছিত সম্পদ,

তুমি কি পবিত্রতা চাও, অথচ এ যুগ হচ্ছে উপভোগের যুগ!

আগে অবশ্য মান-মর্যাদা রক্ষার যুগ ছিল, এখন সেটা তো শেষ হয়ে গেছে,

এ যুগ তো নতুন অনেক কিছু করেছে, সুতরাং তুমি চমৎকার কিছু কর!

এই নগ্ন হামলা এর বিরুদ্ধে দাবি করে জোটবদ্ধ পরিশ্রম বা চেষ্টা-সাধনা, যাতে মুসলিম নারী তার বিরুদ্ধে প্রণীত পরিকল্পনাকে পরিপূর্ণ মনোযোগের সাথে বুঝতে পারে। অতঃপর সে পর্যবেক্ষণ করবে এবং তার পথ সে সচেতন দৃষ্টিতে গ্রহণ করতে সক্ষম হবে।

দ্রষ্টব্য: সাকাফাতুল মুসলিমা (ثقافة المسلمة), পৃ. ১৭।

চতুর্থত: আর তা তৃতীয়টির সাথে সংশ্লিষ্ট। উল্লিখিত নগ্ন হামলার সাথে সাথে নারী বিষয় নিয়ে অনেক ফেতনা-ফাসাদ ও বিশৃঙ্খলার উদ্ভব সাধন করা হয়েছে। যেগুলো ইসলামী শরী‘আতের ব্যাপারে সচেতন মুসলিম নারীদের কারও কারও মধ্যেও দেখা যায়। বস্তুতঃ এ ফিতনা ও বিশৃঙ্খলা নিয়ে এমন কিছু লোক হাঁকডাক দিচ্ছে, যারা চায় নিজেকে প্রকাশ করতে, আরও চায় তার জন্য এমন একটি রায় বা মত হবে, যা তার সাথে সম্বন্ধযুক্ত হবে। অবশেষে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, নারীর অনেক ব্যাপার নিয়ে পক্ষে ও বিপক্ষে দু’ভাগে মানুষ বিভক্ত হয়ে পড়েছে। আর বিষয়টি শুধুমাত্র বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলো না। ফলে আমরা দৈনিক সংবাদপত্রগুলো এবং ম্যাগাজিনসমূহে বিখ্যাত ও অখ্যাত ব্যক্তিবর্গের হাতে লেখা বিভিন্ন প্রবন্ধ অধ্যয়ন করি— কারণ, তারা দাবি করে যে,  শরী‘আত কারও একান্ত বিষয় নয়, সবাই এতে মত প্রকাশ করার অধিকার রাখে।

তারা চিকিৎসা, প্রকৌশল ও অন্যান্য ক্ষেত্রে কোনো কথা বলতে রাজি নয়; কারণ, তারা সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নয়; কিন্তু তারা মূর্খতা ও অজ্ঞতা সত্ত্বেও আল্লাহর শরী‘আতের মধ্যে নাক গলানোটাকে গ্রহণ করেছে, আল্লাহ তুমি পবিত্র! এটা কত বড় অপবাদ!!

এটা বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের ওপর গুরু দায়িত্ব চাপিয়ে দেয় যে, সত্য বর্ণনা ও ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে তারা সর্বাত্মক চেষ্টা-প্রচেষ্টা ও গবেষণা চালিয়ে যাবেন, যতটুকু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাদেরকে বর্ণনা, দলীল-প্রমাণ ও জ্ঞানবুদ্ধির শক্তি থেকে দান করেছেন।

এই উক্তিটি বর্তমানে খুব বেশি ধ্বনিত হচ্ছে এবং এর মাধ্যমে যে ব্যক্তি বিশেষজ্ঞ না হওয়া সত্ত্বেও শরী‘আত সম্পর্কে কথা বলতে ইচ্ছা পোষণ করে সে এই গণ্ডিতে অনুপ্রবেশের সুযোগ পায় এবং যেকোনো কিছু দলিল থাকুক বা না থাকুক নিজের মর্জিমতো হারাম করতে কিংবা হালাল করতে পারে। সেক্ষেত্রে তারা কোন প্রকার নিয়মনীতি বা বিধিবিধানের তোয়াক্কা না করেই যুক্তি দেখায়: ‘এটা আমার মত, আর ওটা তোমার মত’; ‘এটা আমার বুঝ, আর এটা তোমার বুঝ’।

পঞ্চমত: মুসলিম নারী পরবর্তী যুগসমূহে কাফির ও মুনাফিকদের মধ্য থেকে প্রত্যেক হাঁকডাককারী ও হাঁকডাককারিনীর বাহন ও ফটক হিসেবে গৃহীত হয়েছে, যাতে তারা এই দীনের অস্তিত্বকে ধ্বংস করে দিতে পারে; কারণ, তারা জানে যে, নারী যখন তার ঘর থেকে বের হয়ে যাবে, তার শিশুসন্তানদেরকে মুরব্বী ও কাজের মহিলার নিকট রেখে যাবে, পুরুষদের ময়দানসমূহে অনুপ্রবেশ করবে ও তাদের সাথে মেলামেশা করবে, তাদের কাপড় পরিধান করবে, তার চেহারা ও শরীরের কোনো কোনো অংশ উন্মোচিত করবে, শিল্পকারখানার ধোঁয়ায় নিজেকে কলুষিত করবে এবং খরিদ্দার ও পর্যবেক্ষকদের জন্য তার দেহের বাহ্যিক দিকটিকে সুসজ্জিত করবে, আর এভাবে সে পুরুষের সাথে তার কর্মক্ষত্রে প্রতিযোগিতা করবে এবং তার প্রকৃত ময়দানকে সে উপেক্ষা করবে; তখনই সে বিকৃতির প্রথম পদক্ষেপটি গ্রহণ করবে এবং সঠিক পথ থেকে দূরে সরে যাবে; আর এভাবেই তারা নারীকে নষ্ট-ভ্রষ্ট করে দিবে এবং শিশু ও তার লালন-পালন ও আদব-কায়দার প্রশিক্ষণের ব্যাপারে অবহেলা করবে, আর তার পুরুষের অধিকারের দিকে মনোযোগ দিবে না, আর তা থেকেই পুরো সমাজে বিশৃঙ্খলা পুনঃপ্রবর্তিত হবে।

আমি এখানে বিস্তারিত আলোচনা করতে চাই না, কিন্তু এটা বিজ্ঞজনদের ওপর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও দৃঢ় অবস্থান গ্রহণকে বাধ্যতামূলক করে দেয়। কেননা প্রয়োজনের সময় থেকে আলোচনা বিলম্বিত করা বৈধ নয়।

ষষ্ঠত: দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন দিকে নারীর উদারতার বিষয়ে যা লক্ষ্য করা যায়, সেটি মোটেই সহজ ব্যাপার নয়, চাই তার আচার-আচরণগত দিক হউক অথবা তার কাজকর্মের দিক হউক অথবা পুরুষদের সাথে তার মেলামেশার ব্যাপারে বা তাদের সাথে নির্জনে সময় কাটানোর ব্যাপারে হউক অথবা তাদের সাথে কোনো প্রকার বাধ্য-বাধকতা ছাড়া অবাধ কথা-বার্তা বলার ব্যাপারে হউক অথবা তার সাজসজ্জা, পোশাক-পরিচ্ছদ, পর্দা ও শরী‘আতের সীমা থেকে বের হওয়ার ক্ষেত্রে শৈথিল্য প্রদর্শনের ব্যাপারে হউক, অনুরূপভাবে তার নিজ গৃহে তার কাজকর্ম ও ঘর থেকে বেশি বেশি বাইরে গমন করা এবং প্রাচ্য অথবা পাশ্চাত্য থেকে আগত বিভিন্ন ফ্যাশান ও শ্লোগানে প্রভাবিত হওয়ার ক্ষেত্র্রে নমনীয়তার ব্যাপারে হউক। আমি বলব: এই উদারতা ও শৈথিল্য থেকে যা দেখা যাচ্ছে, তা অত্যন্ত যত্নসহকারে দাবি করে মুসলিম নারী বিপর্যয়ে পতিত হওয়ার পূর্বেই তাকে উদ্দেশ্য করে  আবশ্যকীয় দায়িত্ব পালন করা, যেমনিভাবে অনেক দেশে বিপর্যয়ে পতিত হয়েছে তার বোন ও মুসলিম নারীসমাজ। সুতরাং সে এমন হয়ে গেছে যে, আপনি আকার-আকৃতি ও বেশভূশায় তার মাঝে ও কাফির নারীর মাঝে কোনো পার্থক্য করতে পারবেন না।  

সপ্তমত: আজকের মুসলিম নারীর সাথে কয়েকটি প্রবণতার দ্বন্দ্ব চলছে, এগুলোকে মোটামুটি নিম্নলিখিতভাবে উল্লেখ করা যায়:

  • প্রাচীন সামাজিক প্রবণতা: নির্দিষ্ট প্রকৃতির লোক এবং প্রত্যেক প্রাচীন বিশ্বাস আঁকড়ে ধরার প্রতি আহ্বানকারী ব্যক্তি; এগুলোর মধ্যে কোনোটি  শরী‘আত স্বীকৃত আর কোনোটি  শরী‘আত স্বীকৃত নয়, সে দিকে কোনো প্রকার দৃষ্টি দেওয়া ছাড়াই শুধুমাত্র প্রথার অনুসরণ ও অনুকরণের মাঝে সীমাবদ্ধ।
  • প্রত্যাখ্যানকারী প্রবণতা: আর তা এমন এক প্রবণতা, যা প্রতিটি প্রচীন বিষয়কেই প্রত্যাখ্যান করে, আর নারীকে অতীতের আড়াল ও শরী‘আতের শিক্ষাসমূহ থেকে বের হয়ে আসার জন্য আহ্বান করে এবং তাকে ছোট হউক বা বড় হউক, আকৃতিগত হউক বা বিষয়বস্তুগত হউক প্রতিটি ক্ষেত্রেই কাফির নারীর অনুসরণের জন্য ডাকে।
  • মাঝামাঝি প্রবণতা: আর তা এমন এক প্রবণতা, যার প্রতি জাতির চিন্তাবিদগণ ও শরী‘আতের অনুসারী ব্যক্তিবর্গ আহ্বান করে এবং বলে: “হে নারী! তুমি বিবেক দিয়ে অনুধাবন কর। কেননা, তুমি মুসলিম নারী, তুমি জান যে, তোমার প্রতিপালকের নির্দেশ গ্রহণ করার মধ্যেই তোমার কল্যাণ; আর তিনিই সে সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জানেন, যা তোমাকে উপকৃত করবে। আল্লাহ তা‘আলা তোমার জন্য অনেক নির্দেশনা অবতীর্ণ করেছেন, তুমি সেগুলো গ্রহণ কর, কারণ তাতে তোমার মুক্তি নিহিত রয়েছে। আর এমন প্রত্যেকটি বিষয়, যেদিকে তারা তোমাকে পরিচালিত করে, চাই তা প্রাচীন প্রথা হউক অথবা আধুনিক ষড়যন্ত্র হউক, তোমার উচিৎ হলো, তুমি এগুলোকে এই পরিমাপক দ্বারা ওজন করে নেবে, অতঃপর তুমি গ্রহণ করবে অথবা প্রত্যাখ্যান করবে।”

দ্রষ্টব্য: সাকাফাতুল মুসলিমা (ثقافة المسلمة), পৃ. ১৭-১৮

মুসলিম সমাজে অনেক নারী সে যে সমাজে বসবাস করে, সেই সমাজের প্রবাহের শক্তি বিবেচনায় বিভক্ত হয়ে গিয়েছে এবং নারীগণ এসব আওয়াজের ধাক্কাধাক্কির ফলে অনেক দলে পৃথক হয়ে গিয়েছে। ফলে মুসলিম নারীর সামনে বহু পথের উদ্ভব হলো, প্রত্যেকেই নারীর স্বার্থ ও কল্যাণ চিন্তা করার কথা বলে, তার অধিকার দাবি করে এবং তাকে নিয়ে কান্নাকাটি করে ও কান্নার ভান করে। তাই অনেক নারীর নিকটই মিথ্যার সাথে সত্যের মিশ্রণ হয়ে গেছে এবং দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও সিদ্ধান্তহীনতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

একদিকে কারও ওপর কাফির ও ফাসিকদেরর আওয়াজ ও চেঁচামেচি প্রভাব বিস্তার করেছে এবং এই গোষ্ঠীর কলমের লেখালেখিতে প্রতারিত হয়ে ভ্রষ্ট এই ধারায় চলে গেছে। ফলে সে শরী‘আতের সীমালঙ্ঘন করে পর্দা খুলে ফেলেছে, পুরুষদের সাথে মেলামেশায় গিয়েছে এবং শিল্পকলা, অভিনয়, গান ও নৃত্যের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

আরেকদিকে কেউ কেউ আছে এক পা এগুলে দু‘পা পেছায়; সে দ্বিধাগ্রস্ত- একবার সে বস্তুবাদী চিন্তা করে, আরেকবার সে তার স্বভাবধর্ম ও স্রষ্টার শিক্ষাসমূহের দিকে ফিরে আসে।

অন্যদিকে আছেন রক্ষণশীল বুদ্ধিমান নারী, যিনি তার প্রতিপালকের শিক্ষা ও দর্শনসমূহ সংরক্ষণ করেন এবং ঈমান ও তুষ্টতা সহকারে সেই শিক্ষা অনুযায়ী কাজ করেন। তিনি এই দীনকে শক্তভাবে বহন ও আঁকড়ে ধরেছেন এবং বিজাতীয় বিনষ্ট বিষয়কে প্রত্যাখ্যান করেছেন। আর তিনি তার প্রতিপালকের দিকে অন্যদেরকে মাথা উঁচু করে দৃঢ়তার সাথে আহ্বান করেন এবং তার ব্যক্তিত্ব, পর্দা ও পবিত্রতা রক্ষা করে চলেন। তার স্বামীর অধিকার বাস্তবায়নকারিনী হিসেবে এবং তার শিশুসন্তানদের লালনপালনকারিনী হিসেবে এই জীবনে তিনি তার প্রকৃত দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করেন।

এই প্রতিটি অবস্থাই আমাদেরকে উদ্বুদ্ধ করে অন্ধকার দূর করার জন্য, যা মুসলিম নারীর বিষয়ে এই যুগ বা সময়কে প্রভাবিত করেছে, যাতে করে প্রত্যেক সত্যানুসন্ধানী মুক্তিকামী পুরুষ অথবা নারীর জন্য পথ স্পষ্ট হয় এবং তার মাইলফলকগুলো পরিষ্কারভাবে প্রকাশিত হয়ে উঠে।

অষ্টমত: মুসলিম সমাজ তথা মুসলিম জাতির পরিপূর্ণতার জন্য এমন রক্ষণশীল আদর্শ নারীর প্রয়োজন, যে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে জানে এবং তার ওপর অর্পিত আমানতকে অনুধাবন করে; যে নিজের পথ দেখতে পায় এবং তার নিজের অধিকার ও অন্যের অধিকার সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে।

  • আমাদের প্রয়োজন এমন মুসলিম মুমিন নারীর, যার রয়েছে তার প্রতিপালক আল্লাহ তা‘আলার প্রতি অগাধ বিশ্বাস। সুতরাং তিনি তাকে প্রতিপালক, স্রষ্টা ও মাবুদ বা উপাস্য বলে বিশ্বাস করেন; আরও বিশ্বাস করেন তাঁর ফিরিশতাগণের প্রতি, তাঁর কিতাবসমষ্টি ও রাসূলগণের প্রতি; আর পরকালের প্রতি এবং তাকদীরের  ভালো ও মন্দের প্রতি। অতঃপর  এই ঈমান অনুযায়ী তিনি প্রতিষ্ঠিত করেন তার এই জীবনের চিন্তাভাবনাগুলোকে; জগত, জীবন ও মানুষ সম্পর্কে।
  • আমাদের প্রয়োজন এমন সচেতন নারীর, যিনি তার প্রতিপালকের  শরী‘আত তথা বিধিবিধানকে সংরক্ষণ করেন, অনুধাবন করেন তাঁর আদেশসমূহকে। অতঃপর সে অনুযায়ী কাজ করেন। আর অনুধাবন করেন তাঁর নিষেধসমূহকে, অতঃপর সেগুলো থেকে দূরে থাকেন। তার নিজের অধিকার এবং তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পর্কে সম্যক জানেন, অতঃপর এর মাধ্যমে তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন।
  • আর আমাদের প্রয়োজন এমন সচেতন নারীর, যিনি তার প্রকৃত দায়িত্বের বিষয়গুলো এবং তার গৃহরাজ্যের বিষয়গুলো সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করেন। অতঃপর এই ছোট্ট রাজ্যের অধিকার সংরক্ষণ করেন, যে রাজ্য পুরুষদের প্রস্তুত করে এবং শিশু-কিশোরদেরকে আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের  ভালোবাসায় ও তাঁর দীনের সেবায় গঠন করে তোলে।
  • আর আমাদের প্রয়োজন এমন নারীর, যার বাহ্যিক দিক তার অভ্যন্তর সম্পর্কে বলে দেয়। কারণ, তিনি প্রাচ্য বা পাশ্চাত্যের দ্বারা প্রভাবিত নন, প্রভাবিত নন কোনো প্রবণতা বা ফ্যাশন দ্বারা; যিনি প্রত্যেক ধ্বনি বা চীৎকারের অনুসরণ করেন না। তিনি তার বাহ্যিক ক্ষেত্রে মডেল বা আদর্শ, যেমনিভাবে অভ্যন্তরীণ দিকেও আদর্শ। তার শরীর সংরক্ষিত, আর তার হৃদয় ঈমান দ্বারা পরিপূর্ণ এবং তার পবিত্রতা ও সচ্চরিত্রতার দিকটি সুস্পষ্ট, আর তার পোষাক-পরিচ্ছদ ও অন্তরের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় অবস্থাই পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র। তিনি ঈমান এনেছেন, শিক্ষা গ্রহণ করেছেন এবং আমল করেছেন।
  • আর আমাদের প্রয়োজন এমন আদর্শ আল্লাহ্‌র পথে আহ্বানকারী নারীর, যিনি তার কথার পূর্বে কাজের দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার দিকে আহ্বান করেন। তিনি মানুষের জন্য  ভালো ও কল্যাণকে পছন্দ করেন, যেমনিভাবে তা তিনি নিজের জন্য পছন্দ করেন; তিনি একে উপদেশ দেন, ওকে নির্দেশনা প্রদান করেন আর আরেকজনের অন্যায় কাজের সমালোচনা করেন। তিনি লালন-পালন করেন, গঠন করেন, ভুলত্রুটি সংশোধন করেন, সমস্যা সমাধান করেন, তার সম্পদ দ্বারা দান-সাদকা করেন, তার সাধ্যানুসারে কর্মতৎপরতা পরিচালনা করেন, দাওয়াতী কাজ নিয়েই তিনি জীবনযাপন করেন, কি দাঁড়ানো অবস্থায়, কি তার বাসায় ঘুমন্ত অবস্থায়, কি তার কাজের মধ্যে- এককথায় যে কোনো স্থানে, যে অবস্থায়ই থাকেন।
  • আর আমাদের প্রয়োজন এমন নারীর, যিনি তার শত্রুদের ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে সচেতন থাকেন, অতঃপর তাদের ফাঁদে পা দিয়ে তাদের আনুগত হওয়া থেকে, তাদের আহ্বানসমূহে সাড়া দেওয়া থেকে এবং তাদের জীবন-পদ্ধতি অনুসরণ থেকে সতর্ক থাকেন। তিনি সদা-সতর্কতা অবলম্বন করেন এবং ঐসব ভ্রান্ত প্রচার-প্রপাগান্ডা থেকে সতর্ক করেন, যেগুলো নারীকে তাদের প্রপাগান্ডার বাহন হিসেবে গ্রহণ করেছে— যার বিবরণ পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে।

এই প্রয়োজনীয়তাই বিজ্ঞজন ও বিশেষ ব্যক্তিবর্গকে তাদের বক্তব্য-বিবৃতি ও লেখনীর মাধ্যমে তাদের চেষ্টা-সাধনা শুরু করতে বাধ্য করে। যাতে তারা মুসলিম নারী ও তার অভিভাবকের দৃষ্টি খুলে দেন ‌এবং স্মরণ করিয়ে দেন তার কাঁধের ওপর অর্পিত আমানতের কথা।

নবমত: পুরুষের ওপর প্রভাব সৃষ্টির ক্ষেত্রে নারীর বড় ধরনের ভূমিকা রয়েছে। তিনি যদি মা হন, তবে তার জন্য নির্দেশ দেওয়া ও নিষেধ করার বৈশিষ্ট্য রয়েছে, আর তার (পুরুষের) ওপর আবশ্যক হলো তার আনুগত্য করা এবং সৎকাজের ব্যাপারে করা তার আদেশসমূহের বাস্তবায়ন করা।

আর সে যদি স্ত্রী হয়, তবে তার অধিকার আছে স্বামীকে আল্লাহ্‌র আনুগত্যের ব্যাপার উৎসাহিত ও প্রলুব্ধ করার এবং অন্যায় ও অবাধ্যতার ব্যাপারে সতর্ক করার। আর স্বামীর ক্ষেত্রে স্ত্রীর ভূমিকাকে গণ্ডমূর্খ ছাড়া অন্য কেউ অস্বীকার করে না। আর অনুরূপভাবে তার প্রভাব বিদ্যমান যদি সে বোন, কন্যা বা নিকটাত্মীয়ও হয়।

আর এই জন্য নারীর ওপর আবশ্যক হলো, সে এই মহান ভূমিকা অনুধাবন করবে, যাতে তার দায়িত্ব সুন্দরভাবে পালন করতে পারে।

দশমত: একজন নারী একজন পুরুষের চেয়ে নারী, নারীসমাজ ও নারীদের মাঝে প্রচলিত প্রবণতা সম্পর্কে বেশি ওয়াকিফহাল। তেমনিভাবে সে তাদের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ প্রভাব বিস্তারকারী বিষয়গুলো সম্পর্কে বেশি অবগত। সে-ই পুরুষের চেয়ে ক্ষমতাবান এই পথে চলতে।

পটভূমি হিসেবে উল্লেখিত বিষয়গুলোর প্রত্যেকটিই নারী প্রসঙ্গে এবং নারীর দায়িত্ব, অধিকার, জবাবদিহিতা ও এই সামগ্রিক সীমারেখা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে; যার মাধ্যমে একজন নারী তার ভূমিকা সুন্দরভাবে পালন এবং তার দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে আদায় করতে পারে।

নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং এগুলোর প্রকৃতি ও আদায়ের পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনার পূর্বে এ কথা বলে রাখা প্রয়োজন যে, আমাদের সঠিক দীনের সর্বজনস্বীকৃত ও নিশ্চিত বিধান হচ্ছে: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা পুরুষ ও নারীর মধ্যে দায়িত্ব অর্পণের ক্ষেত্রে সমতা বিধান করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

 ﴿إِنَّا عَرَضۡنَا ٱلۡأَمَانَةَ عَلَى ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ وَٱلۡجِبَالِ فَأَبَيۡنَ أَن يَحۡمِلۡنَهَا وأَشۡفَقۡنَ مِنۡهَا وَحَمَلَهَا ٱلۡإِنسَٰنُۖ إِنَّهُۥ كَانَ ظَلُومٗا جَهُولٗا ٧٢[ سورة الأحزاب: 72]               

“আমরা তো আসমান, জমিন ও পর্বতমালার প্রতি এই আমানত পেশ করেছিলাম, তারা তা বহন করতে অস্বীকার করল এবং তাতে শঙ্কিত হলো, কিন্তু মানুষ তা বহন করল। সে তো অতিশয় যালিম, অতিশয় অজ্ঞ।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৭২]

ইবন আব্বাস, মুজাহিদ, সা‘ঈদ ইবন জুবায়ের রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম প্রমুখ বলেন, আমানত হলো ফরযসমূহ।

আর কাতাদা রহ. বলেন, আমানত হলো দীন, ফরযসমূহ এবং শরী‘আতের সীমারেখা বা দণ্ডবিধিসমূহ।

আর উবাই ইবন কা‘ব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, আমানতের মধ্যে অন্যতম হলো নারীকে তার লজ্জাস্থানের ব্যাপারে আমানত রাখা হয়েছে।

আর ইবন কাছীর রহ. বলেন, এসব কথার মধ্যে কেনো বিরোধ নেই। বরং এগুলো একই কথা প্রমাণ করছে যে, সেই আমানতটি হচ্ছে তাকলীফ তথা (শরী‘আতের বিধিবিধানের) দায়িত্ব-প্রদান।

আর এই কথাও সর্বস্বীকৃত যে, মুসলিম নারী তার দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করলে সেও পুরুষের মতোই প্রতিদান পাবে। আল্লাহ তা‘আলা কর্মসমূহের প্রতিদানের আলোচনা করতে গিয়ে বলেন,

﴿فَٱسۡتَجَابَ لَهُمۡ رَبُّهُمۡ أَنِّي لَآ أُضِيعُ عَمَلَ عَٰمِلٖ مِّنكُم مِّن ذَكَرٍ أَوۡ أُنثَىٰۖ بَعۡضُكُم مِّنۢ بَعۡضٖۖ فَٱلَّذِينَ هَاجَرُواْ وَأُخۡرِجُواْ مِن دِيَٰرِهِمۡ وَأُوذُواْ فِي سَبِيلِي وَقَٰتَلُواْ وَقُتِلُواْ لَأُكَفِّرَنَّ عَنۡهُمۡ سَيِّ‍َٔاتِهِمۡ وَلَأُدۡخِلَنَّهُمۡ جَنَّٰتٖ تَجۡرِي مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُ ثَوَابٗا مِّنۡ عِندِ ٱللَّهِۚ وَٱللَّهُ عِندَهُۥ حُسۡنُ ٱلثَّوَابِ ١٩٥[ سورة آل عمران: 195]                              

“অতঃপর তাদের রব তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে বলেন, ‘আমি তোমাদের মধ্যে কর্মনিষ্ঠ কোনো নর অথবা নারীর কর্ম বিফল করি না, তোমরা একে অপরের অংশ। সুতরাং যারা হিজরত করেছে, নিজ গৃহ থেকে উৎখাত হয়েছে, আমার পথে নির্যাতিত হয়েছে এবং যুদ্ধ করেছে ও নিহত হয়েছে, আমি তাদের পাপ কাজগুলো অবশ্যই দূরীভূত করব এবং অবশ্যই তাদেরকে দাখিল করব জান্নাতে, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কার; আর উত্তম পুরস্কার আল্লাহরই নিকট। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৯৫]

তাফসীরু ইবন কাছীর, ৬/ ৪৮৮-৪৮৯

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

﴿وَمَن يَعۡمَلۡ مِنَ ٱلصَّٰلِحَٰتِ مِن ذَكَرٍ أَوۡ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤۡمِنٞ فَأُوْلَٰٓئِكَ يَدۡخُلُونَ ٱلۡجَنَّةَ وَلَا يُظۡلَمُونَ نَقِيرٗا ١٢٤[سورة النساء: 124]

 “মুমিন হয়ে পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে কেউ সৎ কাজ করবে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি অণু পরিমাণও যুলুম করা হবে না।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১২৪] 

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা আরও বলেন,

﴿مَنۡ عَمِلَ صَٰلِحٗا مِّن ذَكَرٍ أَوۡ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤۡمِنٞ فَلَنُحۡيِيَنَّهُۥ حَيَوٰةٗ طَيِّبَةٗۖ وَلَنَجۡزِيَنَّهُمۡ أَجۡرَهُم بِأَحۡسَنِ مَا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ ٩٧[ سورة النحل: 97]                                                                                                               

“মুমিন হয়ে পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে কেউ সৎকাজ করবে, তাকে আমি নিশ্চয় পবিত্র জীবন দান করব এবং তাদেরকে তাদের কর্মের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করব।” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৯৭] 

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿مَنۡ عَمِلَ سَيِّئَةٗ فَلَا يُجۡزَىٰٓ إِلَّا مِثۡلَهَاۖ وَمَنۡ عَمِلَ صَٰلِحٗا مِّن ذَكَرٍ أَوۡ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤۡمِنٞ فَأُوْلَٰٓئِكَ يَدۡخُلُونَ ٱلۡجَنَّةَ يُرۡزَقُونَ فِيهَا بِغَيۡرِ حِسَابٖ ٤٠[ سورة غافر: 40]                                                                                          

“কেউ মন্দ কর্ম করলে সে কেবল তার কর্মের অনুরূপ শাস্তি পাবে এবং পুরুষ কিংবা নারীর মধ্যে যারা মুমিন হয়ে সৎকাজ করবে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, সেথায় তাদেরকে দেওয়া হবে অপরিমিত জীবনোপকরণ। [সূরা গাফির, আয়াত: ৪] 

সুতরাং দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং প্রতিদানের ক্ষেত্রে তারা উভয়ে সমান।

আর এই বাস্তবতাটিও আল্লাহ তা‘আলার নিম্নোক্ত বাণীর মধ্যেও বিদ্যমান। তিনি বলেন,

 إِنَّ ٱلۡمُسۡلِمِينَ وَٱلۡمُسۡلِمَٰتِ وَٱلۡمُؤۡمِنِينَ وَٱلۡمُؤۡمِنَٰتِ وَٱلۡقَٰنِتِينَ وَٱلۡقَٰنِتَٰتِ وَٱلصَّٰدِقِينَ وَٱلصَّٰدِقَٰتِ وَٱلصَّٰبِرِينَ وَٱلصَّٰبِرَٰتِ وَٱلۡخَٰشِعِينَ وَٱلۡخَٰشِعَٰتِ وَٱلۡمُتَصَدِّقِينَ وَٱلۡمُتَصَدِّقَٰتِ وَٱلصَّٰٓئِمِينَ وَٱلصَّٰٓئِمَٰتِ وَٱلۡحَٰفِظِينَ فُرُوجَهُمۡ وَٱلۡحَٰفِظَٰتِ وَٱلذَّٰكِرِينَ ٱللَّهَ كَثِيرٗا وَٱلذَّٰكِرَٰتِ أَعَدَّ ٱللَّهُ لَهُم مَّغۡفِرَةٗ وَأَجۡرًا عَظِيمٗا ٣٥[ سورة الأحزاب: 35]   

“অবশ্যই আত্মসমর্পনকারী পুরুষ ও আত্মসমর্পনকারী নারী, মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ ও বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, সাওম পালনকারী পুরুষ ও সাওম পালনকারী নারী, যৌন অঙ্গ হিফাজতকারী পুরুষ ও যৌন অঙ্গ হিফাজতকারী নারী, আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও অধিক স্মরণকারী নারী- এদের জন্য আল্লাহ ক্ষমা ও মহাপ্রতিদান রেখেছেন।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৩৫]

দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং প্রতিদানের ক্ষেত্রে সে পুরুষের মতোই- এটি নিশ্চিত ও সর্বস্বীকৃত বাস্তবতা।

এর ওপর ভিত্তি করে আমরা বলতে পারি যে, মুসলিম নারীর ওপর যে দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে, তাতে পুরুষ ব্যক্তিও অংশীদার। আর তা হচ্ছে: আমানত, দায়িত্ব ও কর্তব্যের বোঝা।

নারীর ওপর আবশ্যক হলো এই দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে উপলব্ধি করা। সে তা উপলব্ধি করবে পূর্ণ অনুভূতিসহকারে, সে তা জেনে ও বুঝে উপলব্ধি করবে, সে তা প্রতিষ্ঠিত করে ও কাজে পরিণত করার মাধ্যমে স্মরণ রাখবে এবং সে অন্য নারীদের মাঝে তা প্রচার ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মাধ্যমে তার হিফাযত করবে। এ ব্যাপারটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংক্ষেপে বিভিন্ন হাদীসের মধ্যে উল্লেখ করেছেন; তন্মধ্যে আমরা নিম্নে কিছু উল্লেখ করছি:

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

« لا تزول قدما عبد يوم القيامة حتى يسئل عن عمره فيم أفناه وعن علمه فيم فعل وعن ماله من أين اكتسبه وفيم أنفقه وعن جسمه فيم أبلا»

“কিয়ামতের দিন বান্দার দু‘পা একটুও নড়বে না যতক্ষণ না জিজ্ঞেস করা হবে তার জীবনকাল সম্পর্কে: সে তা কোনো পথে অতিবাহিত করেছে; জিজ্ঞেস করা হবে তার জ্ঞান সম্পর্কে, সে জ্ঞান অনুযায়ী কী কাজ করেছে; জিজ্ঞেস করা হবে তার ধন-সম্পদ সম্পর্কে, সে তা কোথা থেকে উপার্জন করেছে এবং কোনো খাতে ব্যয় করেছে এবং জিজ্ঞেস করা হবে তার শরীর সম্পর্কে, কোথায় সে তা ক্ষয় করেছে।”

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إذا صلت المرأة خمسها وصامت شهرها وحفظت فرجها وأطاعت زوجها قيل لها: ادخلي الجنة من أي أبواب الجنة شئت»

“যখন নারী তার পাঁচ ওয়াক্তের সালাত আদায় করবে; তার (রমযান) মাসের সাওম পালন করবে, তার লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে এবং তার স্বামীর আনুগত্য করবে, তখন তাকে বলা হবে: তুমি জান্নাতের যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা কর, সে দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবশে কর।”

তিরমিযী, অধ্যায়: কিয়ামতের বিবরণ প্রসঙ্গে (صفة القيامة والرقائق والورع), পরিচ্ছেদ: কিয়ামত প্রসঙ্গে (باب في القيامة), বাব নং ২, হাদীস নং ২৪১৭ আহমদ, মুসানাদ, অধ্যায়: মুসনাদুল ‘আশরাতিল মুবাশশিরীনা বিল জান্নাহ (مسند العشرة المبشرين بالجنة), পরিচ্ছেদ: আবদুর রহমান ইবন ‘আউফ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণিত হাদীস (حديث عبد الرحمن بن عوف الزهري رضي الله عنه), হাদীস নং ১৬৬১।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,

«كلكم راع وكلكم مسؤول عن رعيته الإمام راع ومسؤول عن رعيته والرجل راع في أهله وهو مسؤول عن رعيته والمرأة راعية في بيت زوجها ومسؤولة عن رعيتها والخادم راع في مال سيده ومسؤول عن رعيته . قال وحسبت أن قد قال:  والرجل راع في مال أبيه ومسؤول عن رعيته وكلكم راع ومسؤول عن رعيته»

“তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল (রক্ষণাবেক্ষণকারী), আর তোমাদের প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। ইমাম বা শাসক হলেন দায়িত্বশীল, আর তাকে তার অধীনস্থদের রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আর পুরুষ তার পরিবার ও সংসারের জন্য দায়িত্বশীল, আর তাকে তার পরিবারের রক্ষণাবেক্ষণ ও দায়িত্বপালন সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আর নারী তার স্বামীর ঘর রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, আর তাকে তার দায়িত্বপালন সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আর খাদেম (সেবক) তার মনিবের ধন-সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, আর তাকে তার দায়িত্বপালন সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। বর্ণনাকারী বলেন, আমি ধারণা করি যে, তিনি (রাসূল) আরও বলেছেন: পুরুষ ব্যক্তি তার পিতার ধন-সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, আর তাকে তার দায়িত্বপালন সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আর তোমাদের সকলেই দায়িত্বশীল, আর তোমাদের সকলকেই তার অধীনস্থদের রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।”7

বুখারী, কিতাবুল জুম‘আ (كتاب الجمعة), পরিচ্ছেদ: গ্রাম ও শহরে জুম‘আ প্রসঙ্গে (باب الجمعة في القرى و المدن), বাব নং ১০, হাদীস নং ৮৫৩

এছাড়াও এ ব্যাপারে কুরআন ও সুন্নাহর আরও অনেক বক্তব্য রয়েছে।

এসব দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে আমি নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা পেশ করছি:

মুসলিম নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্যের পরিমণ্ডল

মুসলিম নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্যের পরিমণ্ডল কয়েকটি ক্ষেত্র বা পরিধির মধ্যে সীমাবদ্ধ, তা হলো:

প্রথম ক্ষেত্র: তার নিজের ব্যাপারে দায়িত্ব ও কর্তব্য

তার নিজের ব্যাপারে দায়িত্ব ও কর্তব্যের বিষয়টি নিম্নোক্ত বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে:

প্রথমত: তার প্রতিপালকের প্রতি তার ঈমান তথা বিশ্বাস প্রসঙ্গে: আর এটা হলো সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এবং আবশ্যকীয় কর্তব্যকাজ। কেননা পূর্বে উল্লেখিত আয়াতসমূহের মধ্যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা উত্তম প্রতিদান প্রাপ্তির সাথে তাঁর প্রতি ঈমানের শর্তারোপ করেছেন। তিনি  বলেন,

﴿وَمَن يَعۡمَلۡ مِنَ ٱلصَّٰلِحَٰتِ مِن ذَكَرٍ أَوۡ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤۡمِنٞ فَأُوْلَٰٓئِكَ يَدۡخُلُونَ ٱلۡجَنَّةَ وَلَا يُظۡلَمُونَ نَقِيرٗا ١٢٤[سورة النساء: 124]                                                                                                                                    

“মুমিন হয়ে পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে কেউ সৎ কাজ করবে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি অণু পরিমাণও যুলুম করা হবে না।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১২৪] তাছাড়া এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ আরও অনেক আয়াত রয়েছে।

এই ঈমানের অনুসরণকারীকে ঈমানের ছয়টি রুকন মেনে চলতে হবে,

(ক) আল্লাহর প্রতি ঈমান: এর মানে আল্লাহ তা‘আলার একত্ববাদের তিনটি অংশের প্রতিই বিশ্বাস স্থাপন করা। যথা:

 আল্লাহ তা‘আলার কাজের ক্ষেত্রে তাঁর একত্ববাদ। একজন মুসলিম নারী ঈমান আনবে যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা হলেন সকল কিছুর মালিক, পরিচালনাকারী, সৃষ্টিকর্তা ও রিযিকদাতা। তিনি বলেন,

 ﴿ٱلۡحَمۡدُ لِلَّهِ رَبِّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ٢ ٱلرَّحۡمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ ٣ مَٰلِكِ يَوۡمِ ٱلدِّينِ ٤[ سورة الفاتحة: 2 – 4]

“সকল প্রশংসা সৃষ্টিজগতের রব আল্লাহরই; যিনি দয়াময়, পরম দয়ালু; কর্মফল দিবসের মালিক।” [সূরা আল-ফাতিহা, আয়াত: ২-৪] তাছাড়া আরও অনেক আয়াত রয়েছে। আর এটাই হলো রব হিসেবে আল্লাহর একত্ববাদ (তাওহীদ আর-রুবূবিয়াহ

বান্দাদের কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে তাঁর একত্ববাদ। একজন মুসলিম নারী ঈমান আনবে যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা হলেন একচ্ছত্র মা‘বুদ তথা ইবাদতের উপযুক্ত এবং সে সকল প্রকার ইবাদত তাঁকে উদ্দেশ্য করেই করবে। তাই সে সালাত আদায় করবে আল্লাহর জন্য, পবিত্রতা ও পরিশুদ্ধতা অর্জন করবে আল্লাহর জন্য; সে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ডাকবে না এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও নিকট সাহায্য প্রার্থনা করবে না, আর সে আল্লাহর কারণেই পিতা-মাতার আনুগত্য করবে; পর্দা করবে আল্লাহ্‌র আনুগত্য করে, আর আল্লাহর নিকট যা আছে, তা পাওয়ার আশায়ই স্বামীর আনুগত্য করবে … এভাবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمَا خَلَقۡتُ ٱلۡجِنَّ وَٱلۡإِنسَ إِلَّا لِيَعۡبُدُونِ ٥٦  [ سورة الذاريات: 56]

“আমি সৃষ্টি করেছি জিন্ন এবং মানুষকে এইজন্য যে, তারা শুধু আমারই ইবাদত করবে।” [সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত: ৫৬] আর এটাই হলো ইলাহ হিসেবে তাঁর একত্ববাদ (তাওহীদ আল-উলূহিয়াহ) অথবা ইবাদতের ক্ষেত্রে তাঁর একত্ববাদ (তাওহীদ আল-‘ইবাদাহ্

– তাঁর নামসমূহ ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে তাঁর একত্ববাদ। মুসলিম নারী আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার জন্য সাব্যস্ত করবে সকল সুন্দর নামসমূহ এবং মহৎ গুণাবলী। আর তা করতে হবে যেকোনো প্রকার অপব্যাখ্যা, তার ধরন-প্রকৃতি খোঁজা, সৃষ্টির গুণাবলীর সাথে সেগুলোর সাদৃশ্যস্থাপন অথবা এগুলোকে অর্থশূন্য করা ছাড়াই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞۖ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ ١١[ سورة الشورى: 11]

“কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১]

– মুসলিম নারী এসব সুন্দর নামসমূহ এবং মহৎ গুণাবলীর মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করবে। সে স্বীকৃতি দেবে যে, আল্লাহ হলেন দয়াময়, পরম দয়ালু; তাই সে তাঁর নিকট রহমত কামনা করবে। তিনি হলেন রিযিকদাতা, পরম শক্তির অধিকারী; তাই সে তাঁর নিকট রিযিকের জন্য আবেদন করবে। তিনি হলেন রোগ নিরাময়কারী ও যথেষ্ট, সুতরাং সে তাঁর নিকট রোগ থেকে মুক্তির জন্য আবেদন করবে। আল্লাহ হলেন ক্ষমাশীল, পরম ক্ষমাপরায়ণ। তাই সে তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে। তিনি হলেন মার্জনাকারী ও দানশীল; তাই সে তাঁর নিকটই মাফ চাইবে … ইত্যাদি।

(খ) ফিরিশতার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা: সুতরাং মুসলিম নারী বিশ্বাস স্থাপন করবে যে, আল্লাহ তা‘আলার অনেক ফিরিশতা রয়েছে, যারা রাতদিন অক্লান্তভাবে তাঁর দাসত্ব করে। আর তাদের মধ্যে কিছুসংখ্যক আছে যারা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে, আর তাদের মধ্যে এমন কেউ কেউ আছেন, যার নাম ও গুরুত্ব আমাদের নিকট স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন, জিবরীল ‘আলাইহিস সালাম, যিনি অহীর দায়িত্বপ্রাপ্ত; ইসরাফীল ‘আলাইহিস সালাম যিনি সিঙায় ফুঁ দেওয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত; আর সেখানে পাহাড়-পর্বত, বাতাস এবং বান্দাদের হিসাব-নিকাশ ও তাদের কর্মতৎপরতা লিপিবদ্ধ করার জন্য আরও অনেক ফিরিশতা রয়েছে, এমনকি প্রত্যেক ব্যক্তির সাথে দু’জন করে ফিরিশতা রয়েছে, যারা ঐ ব্যক্তি থেকে প্রকাশিত প্রতিটি কথা ও কাজ লিপিবদ্ধ করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿إِذۡ يَتَلَقَّى ٱلۡمُتَلَقِّيَانِ عَنِ ٱلۡيَمِينِ وَعَنِ ٱلشِّمَالِ قَعِيدٞ ١٧ مَّا يَلۡفِظُ مِن قَوۡلٍ إِلَّا لَدَيۡهِ رَقِيبٌ عَتِيدٞ ١٨[ سُورَةُ قٓ: 17-18]

“স্মরণ রাখ, দুই সাক্ষাৎ গ্রহণকারী ফিরিশতা তার ডানে ও বামে বসে তার কর্ম লিপিবদ্ধ করে; মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার জন্য তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে।” [সূরা ক্বাফ, আয়াত: ১৭-১৮]

(গ) রাসূলদের ওপর নাযিলকৃত আল্লাহ তা‘আলার কিতাবসমূহের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা: আল-কুরআন ও সুন্নাহর মধ্যে সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিতভাবে তার উল্লেখ রয়েছে। তন্মধ্যে আমাদের জন্য চারটি কিতাবের নাম স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে: তাওরাত, যা মূসা ‘আলাইহিস সালামের ওপর অবতীর্ণ হয়েছে। ইঞ্জিল, যা ঈসা ‘আলাইহিস সালামের ওপর অবতীর্ণ হয়েছে। যাবুর, যা দাউদ ‘আলাইহিস সালামকে দেওয়া হয়েছে এবং আল-কুরআন, যা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর অবতীর্ণ হয়েছে। আর আল-কুরআনুল কারীম হলো সর্বশেষ কিতাব, যার মাধ্যমে কিতাব অবতীর্ণের ধারার পরিসমাপ্তি ঘটেছে এবং যা বাকি সকল কিতাবের বিধানকে রহিত করে দিয়েছে; আর তার (কুরআনের) মধ্যে যা এসেছে, তা ব্যতীত অন্য কোনো কিতাবের বিধান অনুযায়ী আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করা বৈধ নয়।

(ঘ) মানুষের জন্য আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক প্রেরিত রাসূলদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা: তারা মানুষকে সুসংবাদ দেয়, সতর্ক করে এবং তাদের প্রতিপালকের ইবাদত করার আবশ্যকতার কথা তাদের নিকট প্রচার করে। আর ঐসব রাসূলদের মধ্যে এমন কেউ কেউ আছেন, আমাদের জন্য যাদের নাম আলোচিত হয়েছে, আর তাদের মধ্যে এমন অনেক রয়েছেন, যাদের নাম আলোচিত হয় নি। সুতরাং মুসলিম নারী তাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে, যাদের নাম বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং সামগ্রিকভাবে তাদের প্রতিও বিশ্বাস স্থাপন করবে, যাদের নাম উল্লেখ করা হয় নি। আর তাদের মধ্যে প্রথম হলেন নূহ ‘আলাইহিস সালাম এবং সর্বশেষ হলেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, যার মাধ্যমে নবুওয়াত ও রিসালাতের ধারার সমাপ্তি ঘটে এবং তিনি তাদের মধ্যে সর্বশেষ, তাঁর পরে আর কোনো নবী আসবে না, তাঁকে সকল মানুষ ও জিনের নিকট প্রেরণ করা হয়েছে; আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে শরী‘আত প্রবর্তন করেছেন, সে অনুযায়ী আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত না হলে তা বৈধ হবে না।

(ঙ) আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা: মানুষের এই জীবনের পরিসমাপ্তির সূচনা হয় কতগুলো ভূমিকা বা উপাদানের মাধ্যমে; আর তা হলো তার মৃত্যু ও পরবর্তী জীবনে স্থানান্তরের মাধ্যমে, আর কবরের ফিতনা (পরীক্ষা), তার নি‘আমত ও শাস্তির মাধ্যমে, আর কিয়ামতের ছোট ও বড় শর্ত বা নিদর্শনের মাধ্যমে। অতঃপর পুনরুত্থান বা পুনরায় জীবিত করা, হাশর (সমাবেশ), হিসাব, প্রতিদান ও সিরাত (পুলসিরাত) এবং সব শেষে জান্নাত ও জাহান্নামে মাধ্যমে।

এই হলো মুসলিম নারীর আকীদা বা বিশ্বাস, যার ওপর ভিত্তি করে তার নিজের জীবনকে গড়ে তোলা এবং সে ব্যাপারে জবাবদিহির অনুভূতি নিয়ে বেঁচে থাকা আবশ্যক।

অতঃপর এই ঈমান বা বিশ্বাস আরও কতগুলো আবশ্যকীয় বিষয়কে অনুসরণ করে। যেমন, আল্লাহ তা‘আলার ভালোবাসা, তাঁর প্রতি একনিষ্ঠতা; তাঁর নিকট প্রত্যাশা করা, তাঁকে ভয় করা, আর সে এগুলো জেনে রাখবে এবং তার ওপর ধৈর্যধারণ করবে। আর সে এই আকীদা-বিশ্বাস পরিপন্থী কর্মকাণ্ডসমূহ এবং ঈমান বিনষ্টকারী বিষয়সমূহ থেকে সতর্ক থাকবে। আর এগুলোর শীর্ষে রয়েছে আল্লাহ তা‘আলার সাথে শরীক করা, কুফরী করা, নিফাকী করা এবং আল্লাহ তা‘আলা, তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর দীন ও তিনি যে  শরী‘আত প্রবর্তন করেছেন, তার সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা অথবা যে কোনো প্রকারের ইবাদত আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অন্য কারও উদ্দেশ্যে করা অথবা আল্লাহ ব্যতীত অন্যের বিধান আল্লাহ তা‘আলার বিধানের সমান বা তার চেয়ে উত্তম বলে বিশ্বাস করা এবং এই বিশ্বাস করা যে, মানবতা এমনিতেই সৌভাগ্যবান হবে, যেমনিভাবে সে আল্লাহ তা‘আলার বিধানের মধ্যে সৌভাগ্যবান হয় অথবা এই বিশ্বাস করা যে, যুগ-যামানা আল্লাহ তা‘আলার বিধান নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে এবং তা পবিত্র উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ হিসেবে অবিশিষ্ট রয়েছে। এই জীবনে তার ওপর আমলের প্রয়োজন নেই অথবা জাদুকর ও জ্যোতিষীর কর্মকাণ্ডে বিশ্বাস স্থাপন করা এবং ঈমান বিনষ্টকারী জাদুকর, ভেল্কিবাজ ও ভণ্ড-প্রতারকদের অনুসরণ করা।

সুতরাং মুমিন নারীর আবশ্যকীয় কর্তব্য হলো, সে এই ধরনের ভয়াবহ শিরকে নিপতিত হওয়া থেকে সতর্ক থাকবে; অতএব সে ঈমান গ্রহণের ব্যাপারে দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং আরও দায়িত্বপ্রাপ্ত ঈমান বিনষ্ট করে, এমন বিষয় থেকে সতর্ক থাকার ব্যাপারে।

দ্বিতীয়ত: তার নিজের ব্যাপারে দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহ থেকে অন্যতম হলো জ্ঞান অর্জন: আর এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো শরী‘আতের জ্ঞান, যার দ্বারা তার দীন প্রতিষ্ঠিত হবে। কারণ, এই দীন জ্ঞান ব্যতীত প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না; আর তা হলো আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারে জ্ঞান এবং তাঁর দীন ও শরী‘আত সম্পর্কিত জ্ঞান। আর এই জ্ঞান দুইভাগে বিভক্ত:

(ক) ফরযে আইন: এই প্রকারের জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিম পুরুষ ও নারীর ওপর ফরযে আইন তথা আবশ্যকীয় কর্তব্য, আর তা এমন জ্ঞান, যার দ্বারা দীনের জরুরি বিষয়গুলো জানা ও বুঝা যায় অথবা অন্যভাবে বলা যায়: এটা এমন জ্ঞান, যা ব্যতীত দীন প্রতিষ্ঠিত হয় না। যেমন, সামগ্রিকভাবে আল্লাহর প্রতি ঈমান বা বিশ্বাস স্থাপন সম্পর্কিত বিধানসমূহ, পবিত্রতা অর্জন সম্পর্কিত বিধানসমূহ, সালাত (নামায) সম্পর্কিত বিধানসমূহ। সুতরাং মুসলিম নারী শিক্ষা লাভ করবে সে কীভাবে পবিত্রতা অর্জন করবে? কীভাবে সে সালাত (নামায) আদায় করবে? কীভাবে সাওম (রোযা) পালন করবে? কীভাবে সে তার স্বামীর হক আদায় করবে? আর কীভাবে সে তার সন্তানদেরকে লালনপালন করবে? এবং এমন প্রত্যেক জ্ঞান, যা তার ওপর বাধ্যতামূলক।

(খ) আরেক প্রকার জ্ঞান অর্জন করা ফরযে কিফায়া: আর তা এমন জ্ঞান, যা কিছুসংখ্যক ব্যক্তি অর্জন করলে বাকিরা অপরাধমুক্ত হয়ে যা, আর মুসলিম নারীর জন্য এই প্রকার জ্ঞান অর্জনের উদ্যোগ গ্রহণ করা এবং সেই জ্ঞান অর্জন করে পরিতৃপ্তি লাভ করাটা উত্তম বলে বিবেচিত হবে। কুরআন ও সুন্নাহ এই জ্ঞান অর্জনের প্রশংসায়, তার ফযীলত বা মর্যাদা বর্ণনায় এবং এ প্রকার জ্ঞান ও জ্ঞানীদের গুরুত্ব বর্ণনায় অনেক বক্তব্য নিয়ে এসেছে। আরও বক্তব্য নিয়ে এসেছে অন্যদের ওপর তাদের উচ্চমর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনায়। কারণ, তারা হলেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তরসুরী।

ইবন আবদিল বার আল-আন্দালুসী রহ. বলেন, “আলিমগণ এই ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন যে, ইলম বা জ্ঞানের মধ্যে এক প্রকার এমন রয়েছে, যা প্রত্যেক ব্যক্তির জীবনে ফরযে আইন; আরেক প্রকার হলো ফরযে কিফায়া … অবশেষে তিনি বলেন, এর থেকে যতটুকু সকলের ওপর আবশ্যক তা হচ্ছে যে সকল বস্তু তার ওপর ফরয করা হয়েছে, যা না জেনে থাকার সুযোগ নেই সে ফরযটুকু জানা।”   

মুসলিম নারীকে ইসলাম যে সম্মান দান করেছে, তন্মধ্যে অন্যতম হলো: ইসলাম নারীর জন্য শিক্ষা গ্রহণ করা ও শিক্ষা প্রদান করার মর্যাদা পুরুষের মর্যাদার মত করে সমানভাবে নির্ধারণ করেছে এবং নারীকে বাদ দিয়ে পুরুষের জন্য কোনো বিশেষ মর্যাদা নির্দিষ্ট করে নি। শিক্ষা এবং শিক্ষা গ্রহণের ফযীলত বা মর্যাদা বর্ণনায় বর্ণিত সকল আয়াত ও হাদীস পুরুষ ও নারীকে সমানভাবে মর্যাদাবান বলে অবহিত করে। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَرۡفَعِ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مِنكُمۡ وَٱلَّذِينَ أُوتُواْ ٱلۡعِلۡمَ دَرَجَٰتٖۚ[ سُورَةُ المجادلة: 11]

“তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে মর্যাদায় উন্নত করবেন।” [সূরা আল-মুজাদালা: ১১]

তিনি আরও বলেন,

﴿قُلۡ هَلۡ يَسۡتَوِي ٱلَّذِينَ يَعۡلَمُونَ وَٱلَّذِينَ لَا يَعۡلَمُونَۗ [سُورَةُ الزُّمَرِ: 9]

“বল, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান?” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৯]

তিনি আরও বলেন,

﴿وَقُل رَّبِّ زِدۡنِي عِلۡمٗا ١١٤ [ سُورَةُ طه: 114]

“বল, হে আমার রব! আমাকে জ্ঞানে সমৃদ্ধ কর।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ১১৪]

অনুরূপ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী:

«مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَطْلُبُ فِيهِ عِلْمًا سَلَكَ اللَّهُ بِهِ طَرِيقًا مِنْ طُرُقِ الْجَنَّةِ وَإِنَّ الْمَلاَئِكَةَ لَتَضَعُ أَجْنِحَتَهَا رِضًا لِطَالِبِ الْعِلْمِ وَإِنَّ الْعَالِمَ لَيَسْتَغْفِرُ لَهُ مَنْ فِى السَّمَوَاتِ وَمَنْ فِى الأَرْضِ وَالْحِيتَانُ فِى جَوْفِ الْمَاءِ وَإِنَّ فَضْلَ الْعَالِمِ عَلَى الْعَابِدِ كَفَضْلِ الْقَمَرِ لَيْلَةَ الْبَدْرِ عَلَى سَائِرِ الْكَوَاكِبِ وَإِنَّ الْعُلَمَاءَ وَرَثَةُ الأَنْبِيَاءِ وَإِنَّ الأَنْبِيَاءَ لَمْ يُوَرِّثُوا دِينَارًا وَلاَ دِرْهَمًا وَرَّثُوا الْعِلْمَ فَمَنْ أَخَذَهُ أَخَذَ بِحَظٍّ وَافِرٍ».

“যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করার জন্য কোনো পথ অবলম্বন করে, এর উসিলায় আল্লাহ তা‘আলা তাকে জান্নাতের পথসমূহ থেকে একটি পথে পরিচালিত করেন। নিশ্চয় ইলম (জ্ঞান) অন্বেষণকারীর সন্তুষ্টির জন্য ফিরিশতাগণ তাদের পাখাসমূহ বিছিয়ে দেন। আর আলেমের জন্য আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সকলেই ক্ষমা প্রার্থনা করে। এমনকি গভীর পানির মাছও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। সুতরাং একজন আবেদের (ইবাদতকারীর) ওপর আলেমের মর্যাদা তেমনি, যেমন পূর্ণিমার রাতে সকল তারকার ওপর চাঁদের মর্যাদা। নিশ্চয় আলিমগণ নবীগণের ওয়ারিস (উত্তরাধিকারী আর নবীগণ কোনো দিনার এবং দিরহামের উত্তরাধিকারী রেখে যাননি; বরং তাঁরা শুধুমাত্র ইলমকে উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে গেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি ইলম অর্জন করল, সে পরিপূর্ণ অংশ (উত্তরাধিকার) গ্রহণ করল।৯

আবূ দাউদ, ইলম অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: ইলম অনুসন্ধানে উৎসাহদান প্রসঙ্গে (باب الحث على طلب العلم), বাব নং ১, হাদীস নং ৩৬৪৩; তিরমিযী, ইলম অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: ইবাদতের ওপর জ্ঞানের মর্যাদা প্রসঙ্গে (باب فضل الفقه على العبادة), বাব নং ২০, হাদীস নং ২৬৮২; ইবন মাজাহ, কিতাবের ভূমিকা (افتتاح الكتاب في الإيمان و فضائل الصحابة و العلم), পরিচ্ছেদ: ইলম অনুসন্ধানে উৎসাহদান প্রসঙ্গে (باب فضل العلماء و الحث على طلب العلم ), বাব নং ১৭, হাদীস নং ২২৩।

এগুলো ছাড়াও কুরআন ও সুন্নাহর আরও অনেক বক্তব্য রয়েছে, যার প্রতিটি বক্তব্যই সমানভাবে পুরুষ ও নারীকে অন্তর্ভুক্ত করে; আর অনুরূপভাবে প্রথম প্রজন্মের নারীগণ জ্ঞান অর্জনের এই নীতি অবলম্বন করেছেন। মুমিন জননী আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা জ্ঞান অন্বেষণকারিনী এবং সে ক্ষেত্রে প্রতিযোগী নারীদের জন্য নিজেকে অত্যন্ত চৌকস ব্যক্তি হিসেবে দৃষ্টান্ত পেশ করেন;, এমনকি তিনি অধিক হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমের মধ্যে অন্যতমা ছিলেন এবং অনেক মাসআলার ক্ষেত্রে তিনি তাদের তথ্যসূত্র বা আশ্রয়স্থল হিসেবে বিদ্যমান ছিলেন। আর তিনি সাহাবীদের কারও কারও দেওয়া বিধিবিধানের ভুল সংশোধন করে দিতেন।

আর তিনি ছাড়াও আরও অনেক মহিলা সাহাবী জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। 

আর অধ্যাপক ডক্টর আবদুর রহমান আয-যুনাইদী নারীর শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য পর্যালোচনা করেছেন, আর তা আলোচিত হয়েছে ‘নারীর সাংস্কৃতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য’ (مسئولية المرأة الثقافية)  শিরোনামের একটি পুস্তিকায়। সেখানে তিনি প্রথমে কতগুলো চ্যালেঞ্জের চিত্র তুলে ধরেছেন, মুসলিম নারী এই যুগে যেগুলোর মুখোমুখি হয়। আর তা হলো:

প্রথম চিত্র: ইসলামী ধ্যানধারণার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা না থাকা; অন্যভাবে বলা যায়: তার ইসলামী আকীদা-বিশ্বাসকে বিশৃঙ্খলামুক্ত না করা; ফলে তার ইলাহ অথবা জীবন অথবা সৃষ্টি সম্পর্কিত বিশ্বাস ও ধ্যানধারণা থাকে বিকৃত; ফলে সে দুর্বল আকীদা-বিশ্বাস নিয়ে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করে।

দ্রষ্টব্য: লেখক কর্তৃক সম্পাদিত ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে করা নারীদের প্রশ্নসমূহ’ (أسئلة النساء لرسول الله صلى الله عليه و سلم)। তাতে অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে, আর অচিরেই আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছায় তা প্রকাশিত হবে।

দ্বিতীয় চিত্র: পুরুষের সাথে নারীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার সামাজিক অবস্থান। অর্থাৎ কোনো কোনো পুরুষ কর্তৃক তার পরিবারের সাথে বিদ্যমান নেতিবাচক অবস্থান। আর এটাকেই মুসলিম নারী তার জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করে, পরিবারে নারী ও পুরুষের সম্পর্কের ব্যাপারটি সে সার্বিকভাবে বিবেচনা করতে সক্ষম হয় না। যেখানে পরিবারে নারীর সাথে পুরুষের সম্পর্ক শক্তিশালী হওয়ার কথা, সেখানে পুরুষ লোকটি সে সম্পর্কে ছেদ ঘটায় এবং সেটাকে পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয় না।

তৃতীয় চিত্র: চিন্তাগত অস্থিরতা, যা নিয়ে এই যুগ উত্তাল হয়ে আছে; যেমন আমদানিকৃত সংস্কৃতি, যা মুসলিম নারীর ওপর সংকট সৃষ্টি করে এবং তাকে নিক্ষেপ করে ধ্বংস, অপ্রিয় ও ঘৃণ্য চরিত্রের পথে; এমনকি শিল্প, নৃত্য ইত্যাদি হয়ে যায় সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য ও অগ্রাধিকার পাওয়ার মত বস্তুর অন্তর্ভুক্ত, যাকে আজকের নারীসমাজ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। আর এটা বিপজ্জনক ও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।   

চতুর্থ চিত্র: তথ্যপ্রযুক্তি বা মিডিয়া, আর কোনো সন্দেহ নেই যে, এটাও একটা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। কারণ, এতে  ভালো ও মন্দ সবই একসাথে রয়েছে। যার দ্বারা ছড়িয়ে পড়ে এমন সংস্কৃতি, যা দীনের বিরুদ্ধে লড়াই করে, মুসলিম নারীর ব্যক্তিত্বের ওপর আক্রমন করে, শিশুদেরকে তাদের ব্যক্তিত্ব নষ্ট করার প্রশিক্ষণ দেয় এবং তাদের স্বভাব-প্রকৃতিকে সত্য পথ থেকে ভিন্নমুখী করে দেয়। আর মুসলিম নারী এই দূষিত পরিবেশের মধ্যে জীবনযাপন করে, যার কারণে এই জীবনে তার নির্মল জীবনধারা কলুষিত হয়।

পঞ্চম চিত্র: আর আমি এখানে পঞ্চম চিত্রটি বৃদ্ধি করেছি; আর তা হলো: নৈতিক বিপর্যয়, যা কোনো কোনো মুসলিম সমাজের গভীরে গিয়ে পৌঁছেছে এবং তা মুসলিম নারীসমাজের ওপর নগ্নভাবে আক্রমণ করেছে ও তার জন্য সমাজটিকে বাস্তবতার বিপরীতরূপে চিত্রিত করেছে। উদাহরণস্বরূপ শিল্পকলা একাডেমিগুলোতে যেসব অনৈতিক বিষয়াদি ও কর্মকাণ্ড পরিবেশিত হয় এবং তাতে দীনের কিছু কিছু শিক্ষা ও দর্শনকে যেভাবে সেকেলে ও পশ্চাৎপদতা দ্বারা চিত্রিত করা হয়, তাতে এর মধ্য দিয়ে পশ্চিমা জাতির অনুসরণ করে ব্যাপক অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে, যাতে বলা হয় বিয়ে-সাদী হলো বন্দী করা বা আটকিয়ে রাখা। আর তার সমাধান হলো ভোগবিলাসে মত্ত থাকা এবং এরূপ আরও অনেক শ্লোগান।

ষষ্ঠ চিত্র: নারী জাতির বিশ্বায়ন; আর তা হলো পশ্চিমা নাস্তিকগণ আহ্বান করে যে, আদর্শ নারী হলো পশ্চিমা নারী, যে অধিকারের ব্যাপারে পুরুষের সমান। শিল্প-কারখানায় পুরুষের মতো শ্রমিক, সৌন্দর্য প্রদর্শনকারিনী ইত্যাদি।

আর এই চ্যালেঞ্জের বিষয়গুলো প্রকাশ হতে শুরু করে তাদের ঐসব সম্মেলনে, যেগুলোতে তারা লোকদের আহ্বান করে, আর জাতিসংঘ যেগুলোর তত্ত্বাবধান করে এবং তার মূলনীতিমালা বাস্তবায়নের আহ্বান জানায়। যেমন, শ্রমজীবি নারীকেই একমাত্র গ্রহণযোগ্য বিবেচ্য নারী হিসেবে তাদের মূল্যায়ন, হোম মেকার বা গৃহিনীদেরকে বিভিন্নভাবে পশ্চাদপদ বলে অবমূল্যায়ন করে। আর এর মধ্যে আরও রয়েছে, কতগুলো পরিবর্তিত পরিভাষার অনুপ্রবেশ। যেমন, নারী ও পুরুষের বৈষম্য দূর করার তাৎপর্য ব্যাখ্যার জন্য তারা  المساواة (সমতা) শব্দের ব্যবহার। আর যৌনস্বাধীনতা ও নৈতিকতা বর্জনের জন্য التنمية (প্রগতি) শব্দের ব্যবহার।

কিন্তু এসব চ্যালেঞ্জ সত্বেও আশার আলো তাদের মধ্যে তাদের মধ্যে থাকবে যারা তাদের দীনকে উপলব্ধি করেছে এবং তাদের শত্রুদের পাতানো পরিকল্পনার ফাঁদ সম্পর্কে সচেতন থেকেছে, তাদের ব্যাপারে আশার আলো সুস্পষ্টভাবে আলোকিত হয়ে আছে যা মনকে করে আনন্দিত এবং তাকে আস্থা, বিশ্বাস ও প্রশান্তিতে ভরে দেয়।

মুসলিম নারীর সাংস্কৃতিক ভিত্তির খুঁটিসমূহ:

১. বিশুদ্ধ ইসলামী ধ্যানধারণাকে মৌলিক বিষয় হিসেবে তার মধ্যে সুপ্রতিষ্ঠিত করা, যার ওপর শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রাসাদ নির্মিত হবে।

এই ধ্যানধারণা অন্তর্ভুক্ত করবে:

  • ঈমানের সাথে সম্পর্কিত বিষয়সমূহ, যা পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।
  • মুসলিম নারীর জীবনে আল-কুরআনুল কারীম ও পবিত্র সুন্নাহর মর্যাদার দৃষ্টিকোণ থেকে উভয়ের সাথে সম্পর্কিত বিষয়সমূহ।
  • ইসলামের স্তম্ভ ও তার বৈশিষ্ট্যসমূহের সাথে সম্পর্কিত বিষয়সমূহ।
  • আর মানুষের সাথে সম্পর্কিত জগতের বিষয়সমূহ।
  • জীবনের বিভিন্ন স্তর ও স্বভাব-প্রকৃতির সাথে সম্পর্কিত বিষয়সমূহ
  • এবং স্বয়ং মানুষের সাথে সম্পর্কিত বিষয়সমূহ।

আর যাতে করে এই ধ্যানধারণাটি বিশুদ্ধ হয়, সেই জন্য মুসলিম নারীর জন্য আবশ্যক হলো, সে ঐ ধ্যানধারণাটি ইসলামের মূল দু’টি উৎস আল-কুরআনুল কারীম ও পবিত্র সুন্নাহ থেকে গ্রহণ করবে; আর পূর্ববর্তী সত্যনিষ্ঠ আলিমগণ এই উভয় উৎস থেকে যা অনুধাবন করেছেন, তা থেকে।

২. তাফসীর, হাদীস, ফিকহ ও সীরাতসহ ইসলামের বিভিন্ন শাস্ত্রে ওপর প্রতিষ্ঠিত  শরী‘আত কর্তৃক অনুমোদিত সংস্কৃতির পূর্ণতা বিধান করা। যা মুসলিম নারীর ব্যক্তিত্বের মধ্যে সুদৃঢ় সাস্কৃতিক ভিত প্রতিষ্ঠিত করবে। আর এই সিলেবাসের পরিমাণ কতটুকু? এখানে তার নির্ধারিত কোনো পরিমাণ নেই। কারণ, তা প্রত্যেক নারীর স্বভাব-প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে; কিন্তু তাকে অবশ্যই নিম্নোক্ত বিষয়াদি সম্পর্কে সম্যক অবগত থাকতে হবে:   

ক. সে বিভিন্ন শাস্ত্রের ভূমিকাসমূহের ব্যাপারে জানবে, যা ঐ শাস্ত্রের মূলনীতি হিসেবে বিবেচিত। যেমন, উসূলে তাফসীরের ভুমিকা, অনুরূপভাবে ‘উলুমুল হাদীসের ভূমিকা …।

খ. ঐসব শাস্ত্রে নারীর ব্যাপারে যে বিশেষ আলোচনা রয়েছে, সে সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা।

গ. অনবরত শর‘ঈ তথা কুরআন ও হাদীসের জ্ঞান অর্জন এবং ইসলামী সংস্কৃতির লালন করতে সচেষ্ট থাকা।

৩. সমসাময়িক আলিমগণ যেসব লেখালেখি করেন, তা পাঠ করা। কেননা তারা যে পরিবেশ-পরিস্থিতিতে বসবাস করে, তার বাস্তব চিত্র তাদের জানা রয়েছে। আর মুসলিম নারীর জন্য পূর্ববর্তী লেখকদের লিখিত মূল গ্রন্থপঞ্জির ওপর নির্ভর করাই যথেষ্ট নয়। কারণ, তা বাস্তব অবস্থা থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে এবং তার কার্যকারিতা হ্রাস করবে।

৪. চতুর্থ খুঁটি হলো, মুসলিম নারীকে অপরাপর সহযোগী বিদ্যা যেমন ভাষা, ইতিহাস, সাহিত্যের মত জ্ঞান-বিজ্ঞানের মাধ্যমে তার সংস্কৃতিকে লালন করা। কারণ, এটি তার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করবে, নিয়মনীতির প্রচলন করবে এবং চিন্তা-ভাবনার খোরাক বৃদ্ধি করবে।  

৫. আরও একটি অন্যতম স্তম্ভ হলো মুসলিম নারীকে তার শিক্ষা ও সংস্কৃতির ভিত নির্মাণে যেসব প্রতিবন্ধকতা বাধা সৃষ্টি করে, সে দিকে মনোযোগ দেওয়া। কেননা প্রতিবন্ধকতাসমূহ কোনো কোনো সময় এই ভীতের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে অথবা তাতে ফাটল দেখা দেবে; আর যেসব বিষয় এই প্রতিবন্ধকতাসমূহ অতিক্রম করতে তাকে সহযোগিতা করবে, তা হলো:

ক. সে আকীদা-বিশ্বাস, শরী‘আতের বিধিবিধান, নৈতিকতা, পারিবারিক ইত্যাদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ইসলামী জীবনপদ্ধতি এমনভাবে অধ্যয়ন করবে যে, তা একটি পরিপূর্ণ প্রাসাদ, যার একাংশ অপর অংশের মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করে।

খ. সাংস্কৃতিক ভিত তৈরিতে ভারসাম্য রক্ষা করা, যাতে তার দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তা-দর্শনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে। সুতরাং সে কোনো নির্দিষ্ট সিলেবাসের ওপর সীমাবদ্ধ থাকবে না অথবা সে তার মেধাকে একেবারে উন্মুক্ত করে দেবে না প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতি থেকে যা ছড়িয়ে পড়েছে, তা গ্রহণ করার জন্য। সুতরাং এমনটি হলে সে পথভ্রষ্টতায় পতিত হবে।

মুসলিম নারীর সাংস্কৃতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য

১. সাংস্কৃতিক দায়িত্ব ও কর্তব্যের উপাদানসমূহ:

ক. মুসলিম নারীদের ব্যক্তিত্ব গঠনে চিন্তাধারায়, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় ও জ্ঞানগত দিক থেকে স্বভাব-প্রকৃতির ক্রম উন্নতির মধ্য দিয়ে সুস্পষ্ট ও সহজ-সরল শরী‘আতের কারিকুলামের আলোকে একটি প্রতিষ্ঠিত কেন্দ্রের মাধ্যমে একটি পদ্ধতিগত আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করা।

খ. তরুণ সমাজের জন্য মাদরাসায় ইসলামী সংস্কৃতি চালু করা এবং সিলেবাস ভিত্তিক শিক্ষাকে যথেষ্ট মনে না করা। কারণ, তা সময়ের সাথে শাসিত ও নিয়ন্ত্রিত। সুতরাং পাঠ পদ্ধতির বহির্ভূত উদ্যম বা কার্যক্রম থেকে ফায়দা হাসিল করতে হবে এবং আরও ফায়দা হাসিল করতে হবে ঐ পাঠ্যক্রম থেকে, যা সে অধ্যয়ন করে।

গ. শিশুর জন্য বিশ্বস্ত শিশু পরিচর্যাকারিনী হওয়া, তার শিশুই সেখানে প্রথম প্রাধান্য পাবে এবং দ্বিতীয় অবস্থানে থাকবে তাদের (শিশুদের) সাথে যার সম্পর্ক ও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। আর একজন মা সাধারণত: (যা অচিরেই বর্ণিত হবে ইনশাআল্লাহ) যার কাছে চাওয়া হয় তার সন্তানদের তত্ত্বাবধান এবং ফাসাদ বা বিপর্যয় থেকে তাদেরকে রক্ষা করা, তখন সত্যিকার মুসলিম নারী থেকে এটাই দাবি করা হয় যে, সে তার তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে উপযুক্ত গবেষক ও প্রশাসকদেরকে বের করে দেবে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য, তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের বন্ধুবান্ধব ও সহকর্মীদের সাথে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার জন্য এবং তাদের সমাজে ও মহল্লায় তাদের সমবয়সীদের সাথে তারা যেন হতে পারে সৎ প্রভাবশালী আদর্শ জাতি।

ঘ. একজন নারী কর্তৃক তার আশপাশে, তার ঘরের মধ্যে এবং তার প্রতিবেশী ও বান্ধবীদের সাথে যারা আছে, তাদের মধ্যে ইসলামী পরিবেশ সৃষ্টি করা। সে তাদের মধ্যে আল্লাহর যিকিরের ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টি করবে এবং দীন শিক্ষার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করবে; আর সে দীন বিরোধিতার পর্যবেক্ষণ করবে এবং সে সব ব্যাপারে সতর্ক করবে।

ঙ. কাজকর্মে সমন্বয় সাধন এবং তার ব্যক্তিগত আচার-আচরণের ওপর এই সংস্কৃতির প্রভাবকে ফুটিয়ে তোলা। সুতরাং বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করাটাই তার জন্য যথেষ্ট নয়; বরং তার জন্য আবশ্যক হলো, সে তার সংস্কৃতিকে প্রকাশ করবে তার কথাবার্তায়, নীরব থাকায়, বের হওয়ার সময়, পোশাক-পরিচ্ছদে, সঞ্চয় ও রান্নাবান্না করাসহ তার সার্বিক তৎপরতার মধ্যে, আর তার স্বামী, পরিবার-পরিজন, তার স্বামীর পরিবার-পরিজন ও তার প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তার সংস্কৃতিকে প্রকাশ করবে। কারণ, অনেক সময় কথাবার্তা সেই পরিমাণ প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে না, যেই পরিমাণ প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে প্রশংসনীয় চরিত্র বা আচার-আচরণ।

চ. তার স্বামীকে সহযোগিতা করা। যখন সে (স্বামী) দা‘ঈ তথা আল্লাহ দীনের পথে আহ্বানকারীর ভূমিকা রাখে, তখন সে হবে তার সর্বোত্তম সাহায্যকারী ও বড় ধরনের পৃষ্ঠপোষক, সে তার জন্য দো‘আ করবে, তার সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি বা আসবাবপত্রসমূহ গুছিয়ে রাখবে, তার কর্মকাণ্ডকে তার জন্য সহজ করে দেবে এবং তার কাঙ্খিত বস্তু দ্বারা যথাসম্ভব তাকে তুষ্ট করবে। সুতরাং সে তাকে (তার স্বামীকে) নিয়ে তার গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাস্তবায়ন করবে এবং সে প্রতিদান ও কল্যাণের মধ্যে তাকে অংশীদার করবে।

ছ. জ্ঞানসমৃদ্ধ বার্ষিক ম্যাগাজিন বা সাময়িকীতে অংশগ্রহণ করা; উদাহরণস্বরূপ যা বিভিন্ন সংস্থা, প্রতিষ্ঠান, কেন্দ্র ইত্যাদি থেকে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক মৌসুমে প্রকাশিত হয়।

জ. ঐসব আলাপ-আলোচনা ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা, যা নারী প্রসঙ্গ নিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে, আরও বিশেষ করে জটিল সমস্যা সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে আলোকপাত করে; উদাহরণস্বরূপ কিছু বিষয় ও সমস্যা হলো: শিক্ষা ও বিবাহ, গৃহ ও কাজ, শিশু ও প্রতিবেশীদের সাথে আচার-আচরণ, সমাজ দ্বারা প্রভাবিত হওয়া, নারী প্রসঙ্গে ধ্যানধারণা ও বিশ্বাসগত প্রভাব; বিনোদন ও পর্যটনের স্পটসমূহ ইত্যাদি। অতএব একজন বিদুষী সংস্কুতিমনা মুসলিম নারীর জন্য উচিৎ কাজ হলো, সে ঐসব বিষয়ে অংশগ্রহণ করা।

২. এই দায়িত্ব ও কর্তব্য বাস্তবায়ন-পদ্ধতি:

আর এই ব্যাপারে যা সহায়তা করবে, তা কার্যকর করবে এবং তা প্রচার-প্রসার ঘটাবে, তা হচ্ছে, মহিলা সাংস্কৃতিক দায়িত্বশীলা এবং কল্যাণ ও হিদায়াতের পথে আহ্বানকারিনীগণের মধ্যে পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা পথ সুগম করা। আর এই পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতার বিষয়টি বাস্তবায়িত হবে নম্র ব্যবহার, উন্মুক্ত হৃদয়,  ভালোবাসা, ঐক্যমত ও বিভিন্ন শাখার সাংস্কৃতিক দায়িত্ব পালনকারিনীদের পক্ষ থেকে এ ব্যাপার বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর ভিত্তি করে, শুধু বক্তৃতা-বিবৃতির পথে নয়। তাছাড়া আরও যা এ ব্যাপারে সহযোগিতা করতে পারে তা হচ্ছে, বুদ্ধিমত্তা ও আবেগ-আন্তরিকতাকে কাজে লাগানো। সুতরাং কেবল জ্ঞান হলেই যথেষ্ট নয়; যদিও এই যুগ সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে ‘জ্ঞান-বিজ্ঞানের যুগ’, এমন কথার দ্বারা যেন মুসলিম নারী প্রতারিত না হয়, বরং সে আবেগ-আন্তরিকতা ও সহানুভূতির মাধ্যমে তার উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারে।  কারণ, আবেগ-সহানুভূতি হলো একটি বড় ধরনের প্রভাব বিস্তারকারী পদ্ধতি ও কুরআনিক নিয়মনীতি, যা আল-কুরআন (মানুষকে) আগ্রহীকরণ ও ভীতি প্রদর্শনের জন্য ব্যবহার করেছে, আর তা স্বভাবজাত পদ্ধতিও বটে। আর সাংস্কৃতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন-পদ্ধতির বাস্তবায়নের অন্যতম দিক হলো: নিজের সমালোচনা করা ও অনবরত নিজের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ণ করা, যাতে সে নিজের উন্নতির চিন্তা ভুলে না যায়; নতুবা সে অলসতা ও শয়তানের ফাঁদে পতিত হবে। (যুনাইদী যা উল্লেখ করেছেন তা থেকে সংক্ষেপিত)

তৃতীয়ত: মুসলিম মহিলার নিজের ব্যাপারে দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহের অন্যতম আরেকটি দিক হলো: সৎকর্ম করা: আর সৎকর্ম এমন কাজকে বলে, যার সমর্থনে আল-কুরআনুল কারীম অথবা সুন্নাতে নববী তথা হাদীসের দলীল রয়েছে।     

আর সৎকর্মকে তার হুকুম তথা বিধান অনুযায়ী ফরয ও মুস্তাহাবের মত প্রকারে বিভক্ত করা হয়ে থাকে, আর তার প্রকারের মধ্যে এমন ধরণের সৎকর্ম আছে, যার উপকারিতা ব্যক্তির নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ; আবার এমন ধরনের সৎকাজ আছে, যার উপকারিতা অপরের দিকে ধাবিত হয়। সহজে বোধগম্য ব্যাপার হলো ইসলাম যা স্থির করে দিয়েছে, তা হলো: নারী তার কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে দায়বদ্ধ; তাকে প্রতিদান দেওয়া হবে এবং তার কাজের হিসাব নেয়া হবে; এর ওপর নির্দেশিত আয়াতসমূহের আলোচনা পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে; উদাহরণস্বরূপ আল্লাহ তা‘আলার বাণী:

﴿فَٱسۡتَجَابَ لَهُمۡ رَبُّهُمۡ أَنِّي لَآ أُضِيعُ عَمَلَ عَٰمِلٖ مِّنكُم مِّن ذَكَرٍ أَوۡ أُنثَىٰۖ بَعۡضُكُم مِّنۢ بَعۡضٖۖ[سورة آل عمران: 195]  

“অতঃপর তাদের রব তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে বলেন, ‘আমি তোমাদের মধ্যে কর্মনিষ্ঠ কোনো নর অথবা নারীর কর্ম বিফল করি না; তোমরা একে অপরের অংশ।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৯৫]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

﴿وَمَن يَعۡمَلۡ مِنَ ٱلصَّٰلِحَٰتِ مِن ذَكَرٍ أَوۡ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤۡمِنٞ فَأُوْلَٰٓئِكَ يَدۡخُلُونَ ٱلۡجَنَّةَ وَلَا يُظۡلَمُونَ نَقِيرٗا ١٢٤[سورة النساء: 124]                                                                                                                                    

“মুমিন হয়ে পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে কেউ সৎ কাজ করবে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি অণু পরিমাণও যুলুম করা হবে না।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১২৪]

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা আরও বলেন,

﴿مَنۡ عَمِلَ صَٰلِحٗا مِّن ذَكَرٍ أَوۡ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤۡمِنٞ فَلَنُحۡيِيَنَّهُۥ حَيَوٰةٗ طَيِّبَةٗۖ وَلَنَجۡزِيَنَّهُمۡ أَجۡرَهُم بِأَحۡسَنِ مَا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ ٩٧[ سورة النحل: 97]                                                                                                                 

“মুমিন হয়ে পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে কেউ সৎকাজ করবে, তাকে আমি নিশ্চয় পবিত্র জীবন দান করব এবং তাদেরকে তাদের কর্মের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করব।” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৯৭]

ঈমান ও ইলম (জ্ঞান) অর্জন যেমন একজন মুসলিম নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্য, তেমনি তার দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে, সে এই জ্ঞানের দাবি অনুযায়ী আমল বা কাজ করবে, আর এই আমল ব্যতীত দুনিয়া ও আখিরাতে তার কোনো ফলাফল অর্জিত হবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿تَبَٰرَكَ ٱلَّذِي بِيَدِهِ ٱلۡمُلۡكُ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ قَدِيرٌ ١ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلۡمَوۡتَ وَٱلۡحَيَوٰةَ لِيَبۡلُوَكُمۡ أَيُّكُمۡ أَحۡسَنُ عَمَلٗاۚ وَهُوَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡغَفُورُ ٢[سُورَةُ المُلۡك: 1 – 2]                                                                                              

“মহামহিমান্বিত তিনি, সর্বময় কর্তৃত্ব যাঁর করায়ত্ব; তিনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান। যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য- কে তোমাদের মধ্যে কর্মে উত্তম? তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।” [সূরা আল-মুলক, আয়াত: ১-২]  

কাযী ‘আইয়ায রহ. বলেন, أحسن  (উত্তম বা সুন্দর) মানে: তার (কাজের) একনিষ্ঠতা ও বিশুদ্ধতা।

সুতরাং আয়াতসমূহ আমল গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য দু’টি শর্ত নির্ধারণ করেছে:

  • ঈমান ও ইখলাস তথা একনিষ্ঠতাকে এক আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করা এবং তার সকল কর্মকাণ্ডকে তার অধীন করা।
  • সৎকর্ম: আর সৎকর্ম ততক্ষণ পর্যন্ত সৎকর্ম বলে গণ্য হবে না, যতক্ষণ তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কর্মের মত করে না হবে।

অনুরূপভাবে আয়াতসমূহ আমলের (সৎকাজের) জন্য দু’টি প্রতিদান বা পুরস্কারকে নির্ধারণ করে দিয়েছে: দুনিয়াতে পবিত্র জীবন এবং পরকালে জান্নাত।

আর মুসলিম নারীর ওপর আবশ্যক হলো এই কাজ বাস্তবায়ন করা। সুতরাং যদি তা ফরয কাজ হয়, যেমন ফরয সালাত, ফরয যাকাত, রমযান মাসের সাওম, সামর্থ্যবান হলে জীবনে একবার হজ করা এবং অপরাপর আবশ্যকীয় কাজস হয়, তবে তার ওপর কর্তব্য হচ্ছে কোনো প্রকার ত্রুটিবিচ্যুতি অথবা কমতি অথবা অবহেলা অথবা তুচ্ছ জ্ঞান করা ছাড়াই তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা।

পক্ষান্তরে যদি তা ফরয কাজ না হয়ে নফল ও মুস্তাহাবের মত কাজ হয়, যার করার অনুমতি দিয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তার মুমিন বান্দাদেরকে করুণা করেছেন, তাহলে তার উচিৎ হবে সে কাজগুলো থেকে একটি পূর্ণ অংশ গ্রহণ করা। কারণ,

  • ফরযসমূহ পালনের ক্ষেত্রে যে ত্রুটিবিচ্যুতি হয়েছে, এই নফল কাজসমূহ তার ক্ষতিপূরণ করবে।
  • তা ঐসব অপকর্ম ও গুণাহসমূহ ক্ষমা করার ব্যবস্থা করবে, যে অপরাধ তার জীবনে সংঘটিত হয়েছে।
  • এবং তা তার মর্যাদাকে সমুন্নত করবে।

আর এর মাধ্যমে সৎকর্মশীল পুরুষ ও নারীদের মধ্যে প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হবে এবং ঈমানের সম্পর্ক বৃদ্ধি পাবে।

আর সেই হলো মুসলিম বুদ্ধিমতী নারী, যে তার জন্য এই সালাত, সাওম, দান-সাদকা, হজ, উমরাহ, দাওয়াত, সৎকাজের আদেশ করা, অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখা, সততা, পরোপকার ইত্যাদি নফল ইবাদতের কিছু অংশ বরাদ্ধ করে রাখে।

আর তার উচিৎ হবে, সে যেন বিভিন্ন প্রকারের নফল কাজ করার ব্যাপারে যত্নবান হয়, সুতরাং সে নফল কর্মসমূহ থেকে এমন কাজ করার উদ্যোগ গ্রহণ করবে, যার ফায়দা বা উপকারিতা তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে এবং এমন কাজ করার উদ্যোগও গ্রহণ করবে, যার ফায়দা অপরাপর ব্যক্তিদের দিকে ধাবিত হবে; আর উভয় শ্রেণীর আমল বা কার্যক্রমের মধ্যে বিরোধের সময় ঐ কাজটিকেই প্রাধান্য দেবে, যার মধ্যে অপরের কল্যাণ বা উপকার নিহিত রয়েছে, আর যখন বিভিন্ন প্রকার নফল কাজ তার সামনে এসে উপস্থিত হবে যেমন, নিজে কুরআন পাঠ অথবা অপরকে কুরআন পাঠ করানো ও তাকে শিক্ষা দেওয়া, এমতাবস্থায় সে ঐ আমলটিকেই প্রাধান্য দেবে, যার উপকারিতা অন্যের মাঝে ছড়িয়ে পড়বে; আর তা হলো দ্বিতীয় কাজটি (অর্থাৎ অপরকে কুরআন পাঠ করানো ও তাকে শিক্ষা দেওয়া 

আর সেখান থেকেই আমি বলব: মুসলিম নারীর আবশ্যকীয় কাজ হলো সে তার দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক ও বার্ষিক কর্মকাণ্ডের জন্য একটি কর্মসূচী তৈরি করবে। অতঃপর তার জন্য একটা সম্ভাব্য ছক তৈরি করবে যাতে সে তার কাজগুলোর অনুশীলন, বাস্তবায়ন ও এগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে; এমনকি সে আল্লাহর ইবাদত করবে তার কার্যক্রমের প্রতি অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে।

আর এভাবেই তার কার্যক্রম পরিচালিত হবে। যেমন, অচিরেই এ গ্রন্থের উপসংহারে তার বিস্তারিত বর্ণনা আসবে ইনশাআল্লাহ।

তাহলে বুঝা গেল যে, নিম্নোক্ত বিষয়গুলো সৎ আমলের অন্তর্ভুক্ত হবে:

– ইসলামের পাঁচটি রুকন বা স্তম্ভকে বাস্তবায়ণ করা: সুতরাং সে পাঁচবার সময়মত সালাত আদায় করবে। তার শর্ত ও ওয়াজিবসমূহ এবং যথাসম্ভব তার মুস্তাহাবসমূহ যথাযথভাবে আদায় করবে।

– আর সে যাকাত আদায়ের মাধ্যমে তার সম্পদকে পবিত্র করবে, যদি তার নিকট এমন সম্পদ থাকে, যাতে যাকাত ওয়াজিব হয়।

– আর সে রমযান মাসে সাওম (রোযা) পালন করবে।

– আর সে জীবনে একবার হজ পালন করবে, যদি সে হজ পালনের এই পথে সামর্থ্যবান হয়; আর সামর্থ্যের মধ্যে তার সাথে মাহরাম ব্যক্তি বিদ্যমান থাকা অন্যতম।

– রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

« إذا صلت المرأة خمسها وصامت شهرها وحفظت فرجها وأطاعت زوجها قيل لها: أدخلي الجنة من أي أبواب الجنة شئت»

“যখন নারী তার পাঁচ ওয়াক্তের সালাত আদায় করবে; তার (রমযান) মাসের সাওম পালন করবে, তার লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে এবং তার স্বামীর আনুগত্য করবে, তখন তাকে বলা হবে: তুমি জান্নাতের যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা কর, সে দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ কর।”

– তার বিশেষ দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহ পালন করা: উদাহরণস্বরূপ সে  শরী‘আত কর্তৃক ফরযকৃত পর্দা যথাযথভাবে মেনে চলবে; আর তা হলো, সে তার অপরিচিত পুরুষদের থেকে তার চেহারা ও দুই হাতসহ সম্পূর্ণ শরীরকে ঢেকে রাখবে; অনুরূপভাবে সে লজ্জা, শরম ও সচ্চরিত্রের হিফাযত করবে। আর এই বক্তব্যের সমর্থনে অনেক দলীল-প্রমাণ রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

 ﴿يَٰنِسَآءَ ٱلنَّبِيِّ لَسۡتُنَّ كَأَحَدٖ مِّنَ ٱلنِّسَآءِ إِنِ ٱتَّقَيۡتُنَّۚ فَلَا تَخۡضَعۡنَ بِٱلۡقَوۡلِ فَيَطۡمَعَ ٱلَّذِي فِي قَلۡبِهِۦ مَرَضٞ وَقُلۡنَ قَوۡلٗا مَّعۡرُوفٗا ٣٢ وَقَرۡنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجۡنَ تَبَرُّجَ ٱلۡجَٰهِلِيَّةِ ٱلۡأُولَىٰۖ وَأَقِمۡنَ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتِينَ ٱلزَّكَوٰةَ وَأَطِعۡنَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥٓۚ إِنَّمَا يُرِيدُ ٱللَّهُ لِيُذۡهِبَ عَنكُمُ ٱلرِّجۡسَ أَهۡلَ ٱلۡبَيۡتِ وَيُطَهِّرَكُمۡ تَطۡهِيرٗا ٣٣[سورة الأحزاب: 32-33]

“হে নবী-পত্নিগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও, যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তবে তোমরা পর-পুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, যাতে অন্তরে যার ব্যাধি আছে, সে প্রলুব্ধ হয় এবং তোমরা ন্যায়সংগত কথা বলবে। আর তোমরা স্বগৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাচীন (জাহেলী) যুগের মতো নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়াবে না। তোমরা সালাত কায়েম করবে ও যাকাত প্রদান করবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুগত থাকবে। হে নবী-পরিবার! আল্লাহ তো কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৩২-৩৩] 

আহমদ, মুসানাদ, অধ্যায়: মুসনাদুল ‘আশরাতিল মুবাশশিরীনা বিল জান্নাহ (مسند العشرة المبشرين بالجنة), পরিচ্ছেদ: আবদুর রহমান ইবন ‘আউফ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণিত হাদীস (حديث عبد الرحمن بن عوف الزهري رضي الله عنه), হাদীস নং ১৬৬১।

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

 ﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَدۡخُلُواْ بُيُوتَ ٱلنَّبِيِّ إِلَّآ أَن يُؤۡذَنَ لَكُمۡ إِلَىٰ طَعَامٍ غَيۡرَ نَٰظِرِينَ إِنَىٰهُ وَلَٰكِنۡ إِذَا دُعِيتُمۡ فَٱدۡخُلُواْ فَإِذَا طَعِمۡتُمۡ فَٱنتَشِرُواْ وَلَا مُسۡتَ‍ٔۡنِسِينَ لِحَدِيثٍۚ إِنَّ ذَٰلِكُمۡ كَانَ يُؤۡذِي ٱلنَّبِيَّ فَيَسۡتَحۡيِۦ مِنكُمۡۖ وَٱللَّهُ لَا يَسۡتَحۡيِۦ مِنَ ٱلۡحَقِّۚ وَإِذَا سَأَلۡتُمُوهُنَّ مَتَٰعٗا فَسۡ‍َٔلُوهُنَّ مِن وَرَآءِ حِجَابٖۚ ذَٰلِكُمۡ أَطۡهَرُ لِقُلُوبِكُمۡ وَقُلُوبِهِنَّۚ وَمَا كَانَ لَكُمۡ أَن تُؤۡذُواْ رَسُولَ ٱللَّهِ وَلَآ أَن تَنكِحُوٓاْ أَزۡوَٰجَهُۥ مِنۢ بَعۡدِهِۦٓ أَبَدًاۚ إِنَّ ذَٰلِكُمۡ كَانَ عِندَ ٱللَّهِ عَظِيمًا٥٣[سورة الأحزاب: 53]                                                                                                       

 “হে মুমিনগণ! তোমাদেরকে অনুমতি দেওয়া না হলে তোমরা খাবার প্রস্তুতির জন্য অপেক্ষা না করে ভোজনের জন্য নবীর গৃহে প্রবেশ করো না। তবে তোমাদেরকে আহ্বান করলে তোমরা প্রবেশ কর এবং ভোজনশেষে তোমরা চলে যাও, তোমরা কথাবার্তায় মশগুল হয়ে পড়ো না। কারণ, তোমাদের এই আচরণ নবীকে কষ্ট দেয়, সে তোমাদেরকে উঠিয়ে দিতে সংকোচ বোধ করে; কিন্তু আল্লাহ সত্য বলতে সংকোচ বোধ করেন না। তোমরা তার স্ত্রীদের নিকট কোনো কিছু চাইলে পর্দার অন্তরাল থেকে চাইবে। এই বিধান তোমাদের এবং তাদের হৃদয়ের জন্য অধিকতর পবিত্র। তোমাদের কারও পক্ষে আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দেওয়া সংগত নয় এবং তার মৃত্যুর পর তার স্ত্রীদেরকে বিয়ে করা তোমাদের জন্য কখনও বৈধ নয়। আল্লাহর দৃষ্টিতে এটা ঘোরতর অপরাধ।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৫৩] আর এই আয়াতটি ‘পর্দার আয়াত’ বলে পরিচিত।

সুতরাং যখন এই আয়াত দু‘টি সর্বশ্রেষ্ঠ যুগের মুমিনদের স্ত্রীগণের পবিত্রতার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে, তখন তাদের পরবর্তী নারীদের জন্য পর্দা তো আরও অতি উত্তমভাবেই জরুরি হয়ে পড়ে, এই বক্তব্যকে সমর্থন করে আল্লাহ তা‘আলার বাণী:

 ﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِيُّ قُل لِّأَزۡوَٰجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَآءِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ يُدۡنِينَ عَلَيۡهِنَّ مِن جَلَٰبِيبِهِنَّۚ ذَٰلِكَ أَدۡنَىٰٓ أَن يُعۡرَفۡنَ فَلَا يُؤۡذَيۡنَۗ وَكَانَ ٱللَّهُ غَفُورٗا رَّحِيمٗا ٥٩ [ سورة الأحزاب: 59]                                                                          

“হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীও কন্যাগণকে এবং মুমিনদের নারীগণকে বল, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদেরকে উত্ত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৫৯]12

শাইখ ডক্টর আবূ যায়েদ তার ‘হারাসাতুল ফদিলত’ (حراسة الفضيلة) নামক অভিনব পুস্তকে আয়াতসমূহকে দলীল হিসেবে পেশ করার কারণসমূহ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

– আর সৎ কাজের মধ্যে আরও যা অন্তর্ভুক্ত, তা হলো: নফল ও মুস্তাহাবসমূহ, যা সম্পাদনের জন্য প্রত্যেক মুসলিম পুরুষ ও নারী উদ্বুদ্ধ করে, পূর্বে যার বর্ণনা করা হয়েছে, আর তা হলো: কুরআন পাঠ, যিকির-আযকার, নফল সালাত, নফল সাওম এবং নফল দান-সাদকা।

– অনুরূপভাবে আদব-কায়দা, শিষ্টাচারিতা ও নৈতিক চরিত্র, যা আত্মস্থ করা মুসলিম নারীর জন্য আবশ্যক। যেমন, কথায় ও কাজে সত্যবাদিতা, মিথ্যা না বলা, ধৈর্যধারণ করা, অপরের সাথে উত্তম ব্যবহার করা, কথার সময় বিনয় ও নম্রতা প্রদর্শন করা, সাক্ষাতের সময় প্রফুল্ল থাকা এবং চলাফেরায়, পানাহারে, ঘুমানোর সময়, কথাবার্তায়, উঠা-বসা ইত্যাদির ক্ষেত্রে সাধারণ শিষ্টাচারের প্রতি লক্ষ্য রাখা। সুতরাং মুসলিম নারীর ওপর আবশ্যকীয় কর্তব্য হলো এইসব মর্যদাপূর্ণ নৈতিক চারিত্রিক গুণাবলী অর্জনে আত্মনিবেদন করা এবং এসব উত্তম আচরণ ও শিষ্টাচারের অনুসরণ করা।

– আর সৎ কর্মসমূহের মধ্য থেকে অন্যতম সৎকাজ হলো: আন্তরিকতাপূর্ণ কর্মকাণ্ড। যেমন, আল্লাহ তা‘আলাকে আন্তরিকভাবে  ভালোবাসা, তাঁকে ভয় করা, তাঁর নিকট প্রত্যাশা করা, তাঁর ধ্যান করা (সর্বক্ষণ তাঁর কথা খেয়াল রাখা) ইত্যাদি।

– আর সৎ কর্মসমূহের মধ্য থেকে আরও কিছু সৎকাজ হলো: এমন কতিপয় কর্মকাণ্ড, যেগুলোর ফায়দা বা উপকারিতা অন্যের প্রতি ধাবিত হয়। যেমন, ইলম বা জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া, কুরআন পাঠ করানো, উপদেশ দেওয়া, দরিদ্রকে দান করা, অভাবীকে সহযোগিতা করা, ইয়াতীম ও বিধবাকে সাহায্য করা, দুঃখ-কষ্ট দূর করা, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রশমিত করা, সৎকর্মের আদেশ দেওয়া ইত্যাদি, অচিরেই যার বিষদ বর্ণনা আসছে ইনশাআল্লাহ।

– আর সৎ কর্মসমূহের মধ্য থেকে আরও কিছু সৎকাজ হলো: লজ্জাস্থান ও জিহ্বা (ভাষা) কে হিফাযত করা এবং দৃষ্টি অবনমিত করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

 ﴿وَقُل لِّلۡمُؤۡمِنَٰتِ يَغۡضُضۡنَ مِنۡ أَبۡصَٰرِهِنَّ وَيَحۡفَظۡنَ فُرُوجَهُنَّ [ سُورَةُ النُّورِ: 31]

“আর মুমিন নারীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে ও তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩১] আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্বে উল্লেখিত হাদীসে জন্নাতে প্রবেশের কতগুলো শর্ত বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন:

 «وحفظت فرجها »

“সে তার লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে”।

পরিতাপের বিষয় হলো, অধিকাংশ মুসলিম নারী তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গসমূহের ব্যাপারে উদার বা ছাড় দেওয়ার নীতি অবলম্বন করেছে; তারা তাদের চোখের লাগাম ছেড়ে দিয়েছে। ফলে তারা জনসমাবেশ, ম্যাগাজিন, হাট-বাজার ইত্যাদিতে হালাল ও হারাম জিনিস প্রত্যক্ষ করতে থাকে, যেমনিভাবে তারা তাদের জিহ্বাকে মুসলিম পুরুষ ও নারীদের মানসম্মান নিয়ে টানাটানির অনুমোদন দিয়ে থাকে এবং তারা গিবত (পরচর্চা), কুৎসা, মিথ্যা ইত্যাদিতে জড়িয়ে পড়ে।

– আর সৎ কাজের মধ্যে আরও অন্যতম কাজ হলো: তার স্বামীর অধিকারসমূহ প্রতিষ্ঠা বা আদায় করা। বস্তুতঃ এই অধিকারটি বিশেষভাবে আলোচনার দাবী রাখে, তার গুরুত্ব, মহত্ব ও এই ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে দৃঢ় অবস্থান ও গুরুত্ব প্রদানের কারণে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার হক তথা অধিকারসমূহের পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হক হলো স্বামীর হক, আর তার স্বামীর অধিকারসমূহ হলো:

  • তাকে সন্তুষ্ট রাখা এবং তাকে অসন্তুষ্ট বা বিরাগভাজন না করা।
  • তার পোষাক-পরিচ্ছদ ও খাবার প্রস্তুতের মত বিশেষ কাজসমূহ সম্পাদন করা।
  • তার মন-মানষিকতার প্রতি খেয়াল রাখা।
  • বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আদায়ে তাকে বিব্রত না করা। বিশেষ করে সে যখন স্বল্প আয়ের লোক হয়।
  • ভাল কাজে তাকে উৎসাহিত করা।
  • তাকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করা, যখন সে ক্রটিবিচ্যুতি করে অথবা  ভালো কাজে অবহেলা করে, আর তাকে কোমল ভাষায় উপদেশ দেওয়া।
  • তাকে তার কর্মকাণ্ডে ও মানসিক অবস্থার উন্নয়নে উৎসাহ প্রদান করা।
  • প্রত্যেক কল্যাণকর পথে তার সাথে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া।
  • তার নির্দেশসমূহ কাজে পরিণত করা, তবে সেই নির্দেশ অন্যায় কাজের হলে তা বাস্তবায়ন করা যাবে না।
  • অন্যায় ও অবাধ্যতার ক্ষেত্রে তার অনুগামী না হওয়া।

চতুর্থত: একজন মুসলিম নারীর নিজের ব্যাপারে দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহের অধীনে আরও যা অন্তর্ভুক্ত হয়, তা হলো তার নিজেকে অন্যায় ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড থেকে রক্ষা করা। শয়তানের পথসমূহ বন্ধ করা এবং কামনা-বাসনা ও লোভ-লালসাকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। আর এখানে কুরআন ও সুন্নাহর ভাষ্য থেকে যা বর্ণিত হয়েছে, তার আলোকে কিছু বিশেষ দিক উল্লেখ করা হবে:

  • প্রত্যক্ষভাবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার সাথে সম্পর্কিত ইবাদতের নির্দেশের ব্যাপারে শৈথিল্য প্রদর্শন করা থেকে সতর্ক থাকা; যেমন সালাত ও সাওমের ক্ষেত্রে অবহেলা করা; বিশেষ করে সময় মত সালাত আদায় না করা।
  • আত্মার দুর্বলতা ও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার প্রতি আস্থাহীনতা থেকে সতর্ক থাকা, আরও সতর্ক থাকা জাদুকর, ভেলকিবাজ, ভণ্ড ও প্রতারক, জ্যোতিষী, ভবিষ্যতবাণী পাঠকারী প্রমুখের মত কাফির, ফাসিক ও পথভ্রষ্টদের থেকে। আর আফসোসের বিষয় হলো, ঐসব ব্যক্তিদের নিকট বারবার গমনকারীদের অধিকাংশই হলো নারী।
  • সামগ্রিকভাবে ছোট-বড় সকল প্রকার অন্যায় ও অবাধ্যতা থেকে দূরে থাকা এবং তাতে জড়িয়ে পড়া থেকে সতর্ক থাকা, আর এই ব্যাপারে নির্দেশ সংবলিত কুরআন ও সুন্নাহর অনেক বক্তব্য রয়েছে। সুতরাং যেই নস বা বক্তব্যই আনুগত্যের ব্যাপারে নির্দেশ প্রদান করে, ঠিক সেই নস বা বক্তব্যই আবার প্রত্যক্ষভাবে অথবা পরোক্ষভাবে অন্যায় ও অবাধ্যতা থেকে সতর্ক করে।
  • মুসলিম নারীদের মান-সম্মানের মধ্যে অযাচিত হস্তক্ষেপ করা থেকে সতর্ক থাকা, যা অধিকাংশ নারীর মধ্যে ছড়িয়ে আছে। কারণ, গিবত (পরচর্চা) করা, কুৎসা রটনা করা, মিথ্যা কথা বলা এবং অমুক পুরুষ ও অমুক নারীর সমালোচনা করাটা তাদের মজলিস বা বৈঠকসমূহের মধুতে পরিণত হয়।
  • পোশাক-পরিচ্ছদ ও সাধারণ বাহ্যিক দিকের ক্ষেত্রে নমনীয়তা বা ছাড় দেওয়ার প্রবণতা থেকে সতর্ক থাকা, যা অধিকাংশ নারীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে তারা খাট, খণ্ডিত, হালকা-পাতলা, বাহু নগ্নকারক, দৃষ্টি আকর্ষক ও কাফির নারীদের অনুসরণীয় পোষাক পরিধান করতে শুরু করেছে।
  • বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীন সর্বক্ষেত্রে কাফির নারীদের অনুসরণ ও অনুকরণ করা থেকে সতর্ক থাকা। আর সতর্ক থাকা তাদের (কাফির নারীদের) কর্মকাণ্ডে বিমুগ্ধ হওয়া থেকে। কারণ, মুসলিম সম্প্রদায়ের অধিকাংশ নারী চুল, পোষাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদির আকৃতি ও ধরন-প্রকৃতির ক্ষেত্রে প্রত্যেক (বহিরাগত ও  শরী‘আত গর্হিত) হৈচৈ সৃষ্টিকারী নারী-পুরুষের অনুসরণ করতে শুরু করে দিয়েছে।

এই হলো এমন কিছু নমুনা, যা থেকে মুসলিম নারীর সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক; আর যেমনিভাবে শরী‘আতের নিয়ম-কানূনের আনুগত্য করলে সাওয়াব দেওয়া হয়, ঠিক তেমনিভাবে অন্যায়-অপরাধ পরিত্যাগ করার কারণেও সাওয়াব দেওয়া হবে। সুতরাং আনুগত্যের কাজ সম্পাদনের ব্যাপারে তার যেমন দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে তেমনিভাবে অন্যায়-অপরাধ পরিত্যাগ করার ক্ষেত্রেও তার দায়িত্ব ও কর্তব্য অনেক বড়।

দ্বিতীয় ক্ষেত্র: মুসলিম নারীর ওপর তার ঘরের দায়িত্ব ও কর্তব্য

ঘর বা আবাসগৃহ হচ্ছে এমন একটি ছোট্ট রাষ্ট্র, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার এই মৌলিক উপাদানগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে: স্বামী, স্ত্রী, পিতা ও মাতা এবং সন্তান-সন্তুতি। সুতরাং তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা কর্তৃক তাঁর বান্দাদের প্রতি প্রদত্ত নি‘আমতরাজির মধ্যে অন্যতম; তিনি বলেন,

 ﴿وَٱللَّهُ جَعَلَ لَكُم مِّنۢ بُيُوتِكُمۡ سَكَنٗا ﴾ [ سُورَةُ النَّحۡل: 80]

“আর আল্লাহ তোমাদের গৃহকে করেন তোমাদের আবাসস্থল।” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৮০] আর তার (ঘরের) প্রকৃত মূল্য সম্পর্কে শুধু তারাই অবগত এবং তার কদর বা মর্যাদা শুধু তারাই অনুমান করতে পারবে, যারা বসবাস করে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে, তাঁবুতে, মহাসড়কে, ব্রীজের নীচে ও পথে-ঘাটে। আর ঘরের মধ্যেই  পরিবারের সদস্যগণ তাদের বৈশিষ্ট্য ও পরিপূর্ণ মর্যাদার নি‘আমত ভোগ করেন। এই ঘর তাদেরকে কঠিন গরম এবং ঠাণ্ডার প্রকোপ থেকে রক্ষা করে; আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা এই মহান নি‘আমত দ্বারা তাদের মর্যাদাকে সমুন্নত করেছেন। তিনি বলেন,

 ﴿وَٱللَّهُ جَعَلَ لَكُم مِّنۢ بُيُوتِكُمۡ سَكَنٗا ﴾ [ سُورَةُ النَّحۡل: 80]

“আর আল্লাহ তোমাদের গৃহকে করেন তোমাদের আবাসস্থল।” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৮০]

ইবন কাছীর রহ. এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন,     

يذكر تبارك وتعالى تمام نعمه على عبيده، بما جعل لهم من البيوت التي هي سكن لهم، يأوون إليها، ويستترون بها، وينتفعون بها سائر وجوه الانتفاع.

“আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা‘আলা তাঁর বান্দাদের প্রতি প্রদত্ত পূর্ণ নি‘আমতরাজির কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, তিনি তাদের জন্য এমন আবাসিক ঘরের ব্যবস্থা করেছেন, যাতে তার আশ্রয় গ্রহণ করে। যার দ্বারা তারা নিজেদের ঢেঁকে রাখে এবং সকল প্রকার উপকার ভোগ করে।”

আর এই ঘরের গুরুত্ব ও তার মহান মর্যাদার কারণে ইসলাম তার বিষয় ও কার্যক্রমসমূহকে সুশৃঙ্খলভাবে সাজিয়েছে এবং দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহকে তার মৌলিক উপাদান অনুযায়ী বণ্টন করেছে। বিশেষ করে মৌলিকভাবে মুসলিম নারীর সাথে যা সংশ্লিষ্ট (তা), কেননা সে হচ্ছে ঘরের মধ্যে মা, অনুরূপভাবে স্ত্রী, কন্যা ও বোন। সুতরাং ঘরের মধ্যে তার অনেক বড় করণীয় রয়েছে এবং ঐ ঘর নামক রাষ্ট্রের মধ্যে তার দায়িত্ব ও কর্তব্যও অনেক বড়, যে রাষ্ট্রের অবকাঠামোকে ধ্বংস করার জন্য ইসলামের শত্রুগণ তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ, এ রাষ্ট্রটি হচ্ছে সমাজের প্রতি প্রসারিত এক বৃহৎ গবাক্ষ। সুতরাং যখন তাতে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে, তখন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। ফলে ইসলামের শত্রুরা সমাজের অন্যতম প্রধান দু’টি বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দিয়েছে, আর তা হলো, যে কোনো বয়সের নারী ও শিশু।

তাফসীরু ইবন কাছীর, সূরা আন-নাহলের তাফসীর, আয়াত: ৮০।

১. ঘরের মধ্যে তার দায়িত্ব ও কর্তব্যের শর‘ঈ ভিত্তি:

ঘরে নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহের ব্যাপারে শর‘ঈ ভিত্তি হচ্ছে, তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহ ব্যাপক আমানতদারিতা হিসেবে নির্ধারিত হওয়ার ওপর। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَخُونُواْ ٱللَّهَ وَٱلرَّسُولَ وَتَخُونُوٓاْ أَمَٰنَٰتِكُمۡ وَأَنتُمۡ تَعۡلَمُونَ ٢٧[ سُورَةُ الأَنفَالِ: 27]

“হে মুমিনগণ! জেনে শুনে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে বিশ্বাস ভঙ্গ করবে না এবং তোমাদের পরস্পরের আমানত সম্পর্কেও বিশ্বাস ভঙ্গ করো না।” [সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ২৭]

আর এই দায়িত্ব ও কর্তব্য প্রতিরক্ষামূলক দায়িত্বে পরিণত হয়ে যায়, যা পালন করা প্রত্যেক নারীর ওপর আবশ্যক, যেমনিভাবে তা পালন করা পুরুষের জন্যও আবশ্যক। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ قُوٓاْ أَنفُسَكُمۡ وَأَهۡلِيكُمۡ نَارٗا وَقُودُهَا ٱلنَّاسُ وَٱلۡحِجَارَةُ عَلَيۡهَا مَلَٰٓئِكَةٌ غِلَاظٞ شِدَادٞ لَّا يَعۡصُونَ ٱللَّهَ مَآ أَمَرَهُمۡ وَيَفۡعَلُونَ مَا يُؤۡمَرُونَ ٦[ سُورَةُ التَّحۡرِيمِ: 6]

“হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে নির্মমহৃদয়, কঠোরস্বভাব ফিরিশতাগণ, যারা অমান্য করে না তা, যা আল্লাহ তাদেরকে আদেশ করেন। আর তারা যা করতে আদিষ্ট হয়, তাই করে।” সূরা আত-তাহরীম: ৬  

আর  শরী‘আত এসব দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি নজর দেয়, যাতে উভয় গৃহকর্তা স্বামী ও স্ত্রীর কল্যাণকর সীমারেখার মধ্যে ব্যাপক দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে দায়বদ্ধ থাকে। কারণ, সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আবদুল্লাহ ইবন ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত আছে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,

«كلكم راع وكلكم مسؤول عن رعيته الإمام راع ومسؤول عن رعيته والرجل راع في أهله وهو مسؤول عن رعيته والمرأة راعية في بيت زوجها ومسؤولة عن رعيتها و في رواية “والمرأة راعية في بيت بعلها و ولده و هي مسؤولة عنهم” والخادم راع في مال سيده ومسؤول عن رعيته . قال وحسبت أن قد قال:  والرجل راع في مال أبيه ومسؤول عن رعيته وكلكم راع ومسؤول عن رعيته».

“তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল (রক্ষণাবেক্ষণকারী), আর তোমাদের প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। ইমাম বা শাসক হলেন দায়িত্বশীল, আর তাকে তার অধীনস্থদের রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আর পুরুষ তার পরিবার ও সংসারের জন্য দায়িত্বশীল, আর তাকে তার পরিবারের রক্ষণাবেক্ষণ ও দায়িত্বপালন সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আর নারী তার স্বামীর ঘর রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, আর তাকে তার দায়িত্বপালন সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। অপর এক বর্ণনায় আছে: ‘নারী তার স্বামীর ঘর ও তার সন্তানের রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, আর তাকে তাদের ব্যাপারে তার দায়িত্বপালন সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’ আর খাদেম (সেবক) তার মনিবের ধন-সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, আর তাকে তার দায়িত্বপালন সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। বর্ণনাকারী বলেন, আমি ধারণা করি যে, তিনি (রাসূল) আরও বলেছেন: পুরুষ ব্যক্তি তার পিতার ধন-সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, আর তাকে তার দায়িত্বপালন সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আর তোমাদের সকলেই দায়িত্বশীল, আর তোমাদের সকলকেই তার অধীনস্থদের রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।”

তেমনিভাবে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি এই দায়িত্ব ও কর্তব্যের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে অধিকার ও দায়িত্ব-কর্তব্যের ভারসাম্য রক্ষার করার ওপর জোর দেয়।

সহীহ বুখারী, কিতাবুল জুমু‘আ (كتاب الجمعة), পরিচ্ছেদ: গ্রাম ও শহরে জুমু‘আ প্রসঙ্গে (باب الجمعة في القرى و المدن), বাব নং ১০, হাদীস নং ৮৫৩; সহীহজ মুসলিম, ইমারত (الإمارة) অধ্যায়, বাব নং ৫, হাদীস নং ৪৮২৮।

সুনানের বর্ণনাকারীগণ আমর ইবনুল ‘আস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিদায় হজে ভাষণ দিতে শুনেছেন। সুতরাং তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী থেকে যা শুনেছেন, তার অংশবিশেষ হলো:

« ألا إن لكم على نسائكم حقا ولنسائكم عليكم حقا فأما حقكم على نسائكم فلا يطئن فراشكم من تكرهون ولا يأذن في بيوتكم لمن تكرهون ألا وحقهن عليكم أن تحسنوا إليهن في كسوتهن وطعامهن».

“জেনে রাখ! তোমাদের স্ত্রীদের ওপর তোমাদের যেমন অধিকার রয়েছে, অনুরূপভাবে তোমাদের ওপরও তোমাদের স্ত্রীদের অধিকার রয়েছে। সুতরাং তোমাদের স্ত্রীদের ওপর তোমাদের অধিকার হলো, তারা যেন তোমাদের বিছানায় এমন কাউকে যেতে না দেয়, যাকে তোমরা অপছন্দ কর এবং তারা যেন তোমাদের ঘরের মধ্যে এমন কাউকে অনুমতি না দেয়, যাকে তোমরা অপছন্দ কর। আরও জেনে রাখ! তোমাদের ওপর তাদের অধিকার হলো, তোমরা তাদের বস্ত্র ও অন্যের ব্যাপারে তাদের প্রতি উত্তম ব্যবহার করবে।”

তিরমিযী, অধ্যায়: দুগ্ধপান (كتاب الرضاع), পরিচ্ছেদ: স্বামীর ওপর তার স্ত্রীর অধিকারের ব্যাপারে যা এসেছে (باب ما جاء في حق المرأة على زوجها), বাব নং ১১, হাদীস নং ১১৬৩; ইবন মাজাহ, অধ্যায়: বিবাহ (كتاب النكاح),পরিচ্ছেদ: স্বামীর ওপর স্ত্রীর অধিকার (باب حق المرأة على زوجها), বাব নং ৩, হাদীস নং ১৪৫১; ইমাম তিরমিযী রহ. বলেন, এই হাদীসটি হাসান, সহীহ।

২. ঐসব দায়িত্ব ও কর্তব্যের বিস্তারিত বিবরণ:

(ক) আদর্শ স্ত্রী হিসেবে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য:

আর এই কর্তব্যের মূল হলো স্বামীর প্রতি তার দায়িত্ব। তার ওপর তার স্বামীর অধিকার অনেক বড়, যা তার পিতা-মাতার অধিকারের চেয়েও বেশি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার অধিকারের (হকের) পরেই তার অধিকারের শ্রেষ্ঠত্বের অবস্থান। আর এই অধিকারের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে এসেছে আল্লাহ তা‘আলার বাণী:

﴿ٱلرِّجَالُ قَوَّٰمُونَ عَلَى ٱلنِّسَآءِ بِمَا فَضَّلَ ٱللَّهُ بَعۡضَهُمۡ عَلَىٰ بَعۡضٖ[ سُورَةُ النِّسَاءِ: 34[

“পুরুষ নারীর কর্তা, কারণ আল্লাহ তাদের এককে অপরের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন…” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৩৪] সুতরাং সে তার (স্ত্রীর) ব্যাপারে দায়বদ্ধ ও তার পরিচালক এবং তার সকল বিষয়ের তত্ত্বাবধায়ক। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«لا يصلح لبشر ان يسجد لبشر ولو صلح لبشر ان يسجد لبشر لأمرت المرأة ان تسجد لزوجها من عظم حقه عليها ». 

“কোন মানুষের জন্য কোনো মানুষকে সাজদাহ করা সঠিক নয়; আর কোনো মানুষের জন্য কোনো মানুষকে সাজদাহ করা যদি সঠিক হত, তবে আমি নারীকে নির্দেশ দিতাম তার স্বামীকে সাজদাহ করার জন্য। কেননা তার ওপর তার স্বামীর বিরাট অধিকার (হক) রয়েছে।”

আহমদ, মুসানাদ, অধ্যায়: মুসনাদুল মুকছিরীন মিনাস সাহাবা (مسند المكثرين من الصحابة), পরিচ্ছেদ: মুসনাদে আনাস ইবন মালেক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু (مسند أنس ابن مالك رضي الله عنه), হাদীস নং ১২৬৩৫।

উম্মে সালমা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«أيما امرأة ماتت وزوجها عنها راض دخلت الجنة».

“নারীদের যে কেউ মারা যাবে এমতাবস্থায় যে তার স্বামী তার ওপর সন্তুষ্ট, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”

আর এই হক বা অধিকারের বিবরণ হচ্ছে:

– আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্যতা নেই এমন সকল কাজে সাধারণভাবে তার আনুগত্য করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إذا صلت المرأة خمسها وصامت شهرها وحفظت فرجها وأطاعت زوجها قيل لها: أدخلي الجنة من أي أبواب الجنة شئت».

“যখন নারী তার পাঁচ ওয়াক্তের সালাত আদায় করবে; তার (রমযান) মাসের সাওম পালন করবে; তার লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে এবং তার স্বামীর আনুগত্য করবে, তখন তাকে বলা হবে: তুমি জান্নাতের যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা কর, সে দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবশে কর।”

তিরমিযী, অধ্যায়: দুগ্ধপান (كتاب الرضاع), পরিচ্ছেদ: স্ত্রীর উপর স্বামীর অধিকারের ব্যাপারে যা এসেছে (باب ما جاء في حق الزوج على المرأة), বাব নং ১০, হাদীস নং ১১৬১; ইবন মাজাহ, অধ্যায়: বিবাহ (كتاب النكاح),পরিচ্ছেদ: স্ত্রীর ওপর স্বামীর অধিকার (باب حق الزوج على المرأة), বাব নং ৪, হাদীস নং ১৪৫৪। ইমাম তিরমিযী রহ. বলেন, এই হাদীসটি হাসান, গরীব। আহমদ, মুসানাদ, অধ্যায়: মুসনাদুল ‘আশরাতিল মুবাশশিরীনা বিল জান্নাহ (مسند العشرة المبشرين بالجنة), পরিচ্ছেদ: আবদুর রহমান ইবন ‘আউফ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণিত হাদীস (حديث عبد الرحمن بن عوف الزهري رضي الله عنه), হাদীস নং ১৬৬১।

আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«قيل لرسول الله صلى الله عليه و سلم أي النساء خير قال : التي تسره إذا نظر وتطيعه إذا أمر ولا تخالفه في نفسها ومالها بما يكره»

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো: কোনো নারী সবচেয়ে উত্তম? জবাবে তিনি বললেন: ঐ নারীই উত্তম, যে নারী তার স্বামীকে আনন্দ দেয় যখন সে তার দিকে তাকায়, তার আনুগত্য করে, যখন সে নির্দেশ দেয় এবং তার নিজের ও সম্পদের ব্যাপারে সে যা অপছন্দ করে তার বিরুদ্ধাচরণ করে না।”

– তার সাথে উত্তম আচরণ করা এবং তার কষ্ট লাঘব করা; আর এর ওপরই নির্ভর করে তাকে সন্তুষ্ট করা এবং তার ব্যক্তিত্বকে রক্ষা করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

« لا تؤذي امرأة زوجها في الدنيا إلا قالت زوجته من الحور العين لا تؤذيه قاتلك الله فإنما هو عندك دخيل يوشك أن يفارقك إلينا»

“দুনিয়াতে কোনো স্ত্রী তার স্বামীকে কষ্ট দিলেই তার ডাগড় চক্ষুবিশিষ্ট হুরী স্ত্রী বলে উঠে: তুমি তাকে কষ্ট দেবে না। আল্লাহ তোকে ধ্বংস করুক! কারণ, সে তোর নিকট আগন্তুক, অচিরেই সে তোকে ছেড়ে আমাদের নিকট চলে আসবে।”

– তাকে  ভালোবাসা এবং তার বন্ধুর মতো হওয়া যে, সে তাকে দেখে হাসবে এবং তাকে সম্বোধন করার ক্ষেত্রে নম্রতা প্রদর্শন করবে। আর আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতের নারীদের প্রশংসা করেছেন এইভাবে:

﴿عُرُبًا أَتۡرَابٗا ٣٧ [سُورَةُ الوَاقِعَةِ: 37]

“সোহাগিনী ও সমবয়স্কা।” [সূরা আল-ওয়াকিয়া, আয়াত: ৩৭] العروب মানে- তার স্বামীর নিকট সে সোহাগিনী।

– সে তার (স্বামীর) অনুপস্থিতিতে নিজেকে ও তার ধন-সম্পদকে রক্ষণাবেক্ষণ করবে। এই ব্যাপারে পূর্বে আলোচনা হয়েছে।

– সে তার স্বামীর উপস্থিতিতে তার অনুমতি ব্যতীত নফল সাওম (রোযা) পালন করবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«لا يحل للمرأة أن تصوم وزوجها شاهد إلا بأذنه ولا تأذن في بيته إلا بأذنه … ».

“স্বামীর উপস্থিতিতে তার অনুমতি ব্যতীত স্ত্রীর জন্য সাওম (নফল রোযা) পালন করা বৈধ নয়, আর স্বামীর অনুমতি ছাড়া অন্য কাউকে তার গৃহে প্রবেশ করতে দেবে না …।”

নাসায়ী, বিবাহ অধ্যায় (كتاب النكاح), পরিচ্ছেদ: কোনো নারী সবচেয়ে উত্তম? (أي النساء خير), বাব নং ১৫, হাদীস নং ৫৩৪৩। তিরমিযী, অধ্যায়: দুগ্ধপান (كتاب الرضاع), পরিচ্ছেদ: … (باب …), বাব নং ১৯, হাদীস নং ১১৭৪; ইবন মাজাহ, অধ্যায়: বিবাহ (كتاب النكاح),পরিচ্ছেদ: যে স্ত্রী তার স্বামীকে কষ্ট দেয়, তার প্রসঙ্গে (باب في المرأة تؤذي زوجه), বাব নং ৬২, হাদীস নং ২০১৪। ইমাম তিরমিযী রহ. বলেন, এই হাদীসটি হাসান, গরীব। আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। সহীহ বুখারী, অধ্যায়: বিবাহ (كتاب النكاح), পরিচ্ছেদ: স্ত্রী কর্তৃক তার ঘরে স্বামীর অনুমতি ব্যতীত কাউকে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়া প্রসঙ্গে

– স্ত্রী কর্তৃক তার স্বামীর ঘরকে সংরক্ষিত রাখা। সুতরাং সে তার ঘরে কোনো অপরিচিত পুরুষ অথবা এমন কোনো ব্যক্তির অনুপ্রবেশ ঘটাবে না, যার অনুপ্রবেশকে তার স্বামী অপছন্দ করে, যদিও সেই ব্যক্তিটি তার ভাই হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 

«ألا إن لكم على نسائكم حقا ولنسائكم عليكم حقا فأما حقكم على نسائكم فلا يطئن فراشكم من تكرهون ولا يأذن في بيوتكم لمن تكرهون ألا وحقهن عليكم أن تحسنوا إليهن في كسوتهن وطعامهن»

“জেনে রাখ! তোমাদের স্ত্রীদের ওপর তোমাদের যেমন অধিকার রয়েছে, অনুরূপভাবে তোমাদের ওপরও তোমাদের স্ত্রীদের অধিকার রয়েছে। সুতরাং তোমাদের স্ত্রীদের ওপর তোমাদের অধিকার হলো, তারা যেন তোমাদের বিছানায় এমন কাউকে যেতে না দেয়, যাকে তোমরা অপছন্দ কর এবং তারা যেন তোমাদের ঘরের মধ্যে এমন কাউকে অনুমতি না দেয়, যাকে তোমরা অপছন্দ কর। আরও জেনে রাখ! তোমাদের ওপর তাদের অধিকার হলো, তোমরা তাদের বস্ত্র ও অন্যের ব্যাপারে তাদের প্রতি উত্তম ব্যবহার করবে।”

– সে তার ওপর অন্ন ও বস্ত্রসহ এমন ব্যয়ের বোঝা চাপিয়ে দেবে না, যার সামর্থ্য তার নেই। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿لِيُنفِقۡ ذُو سَعَةٖ مِّن سَعَتِهِۦۖ وَمَن قُدِرَ عَلَيۡهِ رِزۡقُهُۥ فَلۡيُنفِقۡ مِمَّآ ءَاتَىٰهُ ٱللَّهُۚ [ سُورَةُ الطَّلَاقِ: 7[

“বিত্তবান নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে এবং যার জীবনোপকরণ সীমিত, সে আল্লাহ যা দান করেছেন তা থেকে ব্যয় করবে।” [সূরা আত-তালাক, আয়াত: ৭]

– বিশেষ প্রয়োজনের মুহূর্তে তার চাহিদা পূরণ করা এবং কোনো নির্ভরযোগ্য কারণ ছাড়া তাকে নিষেধ না করা। বিশুদ্ধ হাদীসের মধ্যে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إذا دعا الرجل امرأته إلى فراشه فأبت أن تجيء لعنتها الملائكة حتى تصبح »

“যখন কোনো পুরুষ তার স্ত্রীকে তার সাথে একই বিছানায় শোয়ার জন্য আহ্বান করে, আর তার স্ত্রী সেই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে, তবে সকাল পর্যন্ত ফিরিশতারা ঐ মহিলার ওপর লা‘নত (অভিশাপ) বর্ষণ করতে থাকে।”

বাব নং ৮৬, হাদীস নং ৪৮৯৯; সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: যাকাত (الزكاة), পরিচ্ছেদ: গোলাম তার মনিবের মাল থেকে যা দান করবে, সে প্রসঙ্গে (باب مَا أَنْفَقَ الْعَبْدُ مِنْ مَالِ مَوْلاَهُ), বাব নং ২৭, হাদীস নং ২৪১৭। তিরমিযী, অধ্যায়: দুগ্ধপান (كتاب الرضاع), পরিচ্ছেদ: স্ত্রীর উপর স্বামীর অধিকারের ব্যাপারে যা এসেছে (باب ما جاء في حق الزوج على المرأة), বাব নং ১০,হাদীস নং ১১৬১; ইবন মাজাহ, অধ্যায়: বিবাহ (كتاب النكاح),পরিচ্ছেদ: স্ত্রীর ওপর স্বামীর অধিকার (باب حق الزوج على المرأة), বাব নং ৪, হাদীস নং ১৪৫৪; ইমাম তিরমিযী র. বলেন, এই হাদীসটি হাসান, গরীব।

– স্বামীর জন্য সাজগোছ করা, যাতে নিজের প্রতি তাকে আকৃষ্ট করা যায়। এর ফলে স্বামী তার দৃষ্টিকে অবনমিত রাখবে এবং তাকে হারামের মধ্যে ছেড়ে দেবে না। স্ত্রীর তাই উচিৎ নিজেকে এমন বস্তুর দ্বারা সুসজ্জিত করার চেষ্টা করা, যাতে স্বামী আকৃষ্ট হয়; ফলে তার চোখ সুন্দরের প্রতি পড়বে এবং তার নাক দ্বারা সে সুন্দর ঘ্রাণই পাবে; যেমনিভাবে সে তাকে কোমল কথা ও উত্তম বক্তব্য ব্যতীত অন্য কোনো মন্দ কথা শুনাবে না।

– তার অনুগ্রহের স্বীকৃতি প্রদান এবং তার নি‘আমতের অকৃতজ্ঞ না হওয়া, আর তার  ভালো আচরণকে অস্বীকার করবে না। বিশেষ করে যখন সে তার কাছ থেকে ব্যয় ও দানশীলতার মানসিকতা লক্ষ্য করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

« تَصَدَّقْنَ فَإِنَّ أَكْثَرَكُنَّ حَطَبُ جَهَنَّمَ. فَقَامَتِ امْرَأَةٌ مِنْ سِطَةِ النِّسَاءِ سَفْعَاءُ الْخَدَّيْنِ فَقَالَتْ لِمَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ:  لأَنَّكُنَّ تُكْثِرْنَ الشَّكَاةَ وَتَكْفُرْنَ الْعَشِيرَ ».

“তোমরা সাদকা কর। কারণ, তোমাদের অধিকাংশ হবে জাহান্নামের ইন্ধন। অতঃপর মহিলাদের মধ্য থেকে একজন মহিলা দাঁড়াল, যার উভয় গালে কাল দাগ ছিল; সে বলল: হে আল্লাহর রাসূল! তা কেন? তিনি বললেন: তোমরা বেশি অভিযোগ করে থাক এবং উপকারকারীর উপকার অস্বীকার কর।” অপর এক হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«لَوْ أَحْسَنْتَ إِلَى إِحْدَاهُنَّ الدَّهْرَ ثُمَّ رَأَتْ مِنْكَ شَيْئًا قَالَتْ مَا رَأَيْتُ مِنْكَ خَيْرًا قَطُّ»

“তুমি যদি দীর্ঘকাল তাদের কারও প্রতি ইহসান করতে থাক, অতঃপর সে তোমার সামান্য অবহেলা দেখলেই বলে, ‘আমি কখনও তোমার কাছ থেকে  ভালো ব্যবহার পাই নি’।”

– স্বামীর অনুমতি ব্যতীত তার ঘর থেকে বের না হওয়া, যদিও পিতা-মাতার সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে বের হোক না কেন। আর এই ব্যাপারে অনেক হাদীস রয়েছে।

সহীহ বুখারী, অধ্যায়: বিবাহ (كتاب النكاح), পরিচ্ছেদ: যদি কোনো মহিলা তার স্বামীর বিছানা বাদ দিয়ে আলাদা বিছানায় রাত কাটায় (باب إذا باتت المرأة مهاجرة فراش زوجها), বাব নং ৮৫, হাদীস নং ৪৮৯৭; সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: বিবাহ (النكاح), পরিচ্ছেদ: স্ত্রী কর্তৃক স্বামীর বিছানায় যেতে বারণ করা হারাম (باب تَحْرِيمِ امْتِنَاعِهَا مِنْ فِرَاشِ زَوْجِهَا), বাব নং ২০, হাদীস নং ৩৬১১। সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: দুই ঈদের সালাত (صلاة العيدين), হাদীস নং ২০৮৫। সহীহ বুখারী, অধ্যায়: ঈমান (كتاب الإيمان), পরিচ্ছেদ: স্বামীর প্রতি অকৃতজ্ঞতা এবং এক কুফুর অন্য কুফুর থেকে ছোট (باب كفران العشير وكفر دون كفر), বাব নং ১৯, হাদীস নং ২৯; সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: কুসূফ (الكسوف), পরিচ্ছেদ: সালাতুল কুসূফের মধ্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট জান্নাত ও জাহান্নামের বিষয় থেকে যা কিছু পেশ করা হয় (باب مَا عُرِضَ عَلَى النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم فِى صَلاَةِ الْكُسُوفِ مِنْ أَمْرِ الْجَنَّةِ وَالنَّارِ), বাব নং ৩, হাদীস নং ২১৪৭।

– খাওয়া-দাওয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদির মত স্বামীর ঘর-গৃহস্থালির কাজসমূহ সে সম্পাদন করবে। অনুরূপভাবে তার স্বামীর বিশেষ কাজগুলো সম্পাদন করবে; যেমন, তার পোষাক-পরিচ্ছদ প্রস্তুত করা ও তা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে দেওয়া; তার খাবার প্রস্তুত করা ইত্যাদি। ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ. আসমা বিনতে আবি বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা’র হাদীস থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 

«تزوجني الزبير وما له في الأرض من مال ولا مملوك ولا شي غير ناضح وغير فرسه فكنت أعلف فرسه وأستقي الماء وأخرز غربه وأعجن … ».

“যখন যুবায়ের রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু আমাকে বিয়ে করলেন, তখন তার কাছে কোনো ধন-সম্পদ ছিল না, এমনকি কোনো স্থাবর জমি-জমা, দাস-দাসীও ছিল না, শুধু কুয়ো থেকে পানি উত্তোলনকারী একটি উট ও একটি ঘোড়া ছিল। আমি তাঁর উট ও ঘোড়া চরাতাম, পানি পান করাতাম এবং পানি উত্তোলনকারী মশক ছিঁড়ে গেলে সেলাই করতাম, আটা পিষতাম; …।”

সহীহ বুখারী, অধ্যায়: বিবাহ (كتاب النكاح), পরিচ্ছেদ: আত্মমর্যাদাবোধ (باب الغيرة), বাব নং ১০৬, হাদীস নং ৪৯২৬; মুসলিম, অধ্যায়: সালাম (السلام), পরিচ্ছেদ: অপরিচিত নারী পথ-শ্রান্ত হলে তাকে আরোহণে সঙ্গী করার বৈধতা (باب جَوَازِ إِرْدَافِ الْمَرْأَةِ الأَجْنَبِيَّةِ إِذَا أَعْيَتْ فِى الطَّرِيقِِ), বাব নং ১৪, হাদীস নং ৫৮২১

আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কন্য ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা গম পেষার চাক্কি ঘুরানোর কারণে ফোস্কা পড়া হাত নিয়ে তার কষ্টের কথা ব্যক্ত করলেন এবং একজন খাদেম দাবি করলেন, যে এসব কাজে তাঁকে সহযোগিতা করবে, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় কন্যাকে উদ্দেশ্য করে বললেন: 

«ألا أدلكما على ما هو خير لكما من خادم ؟ إذا أويتما إلى فراشكما أو أخذتما مضاجعكما فكبرا ثلاثا وثلاثين وسبحا ثلاثا وثلاثين واحمدا ثلاثا وثلاثين فهذا خير لكما من خادم»

“আমি তোমাদেরকে এমন একটি আমলের কথা বলে দেবনা, যা তোমাদের জন্য একটি খাদেমের চেয়েও অনেক বেশি উত্তম? যখন তোমরা শয্যা গ্রহণ করতে যাবে, তখন তোমরা “আল্লাহু আকবার” তেত্রিশ বার, “সুবহানাল্লাহ” তেত্রিশ বার এবং “আলহামদু লিল্লাহ” তেত্রিশ বার পড়বে। এটা তোমাদের জন্য একটি খাদেমের চেয়েও অনেক বেশি উত্তম।”

(খ) মা হিসেবে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য:

মায়ের জন্য রয়েছে বড় রকমের অধিকার; বরং আল্লাহ তা‘আলার অধিকারের পরে সবচেয়ে বড় অধিকার হলো মায়ের। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعۡبُدُوٓاْ إِلَّآ إِيَّاهُ وَبِٱلۡوَٰلِدَيۡنِ إِحۡسَٰنًاۚ إِمَّا يَبۡلُغَنَّ عِندَكَ ٱلۡكِبَرَ أَحَدُهُمَآ أَوۡ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَآ أُفّٖ وَلَا تَنۡهَرۡهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوۡلٗا كَرِيمٗا ٢٣ وَٱخۡفِضۡ لَهُمَا جَنَاحَ ٱلذُّلِّ مِنَ ٱلرَّحۡمَةِ وَقُل رَّبِّ ٱرۡحَمۡهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرٗا ٢٤ [ سُورَةُ الإِسۡرَاءِ: 23 – 24]                                                                                                 

“তোমার রব আদেশ দিয়েছেন তিনি ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত করতে এবং পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে। তাদের একজন অথবা উভয়েই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদেরকে ‘উফ’ বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না, তাদের সাথে সম্মানসূচক কথা বল। মমতাবেশে তাদের প্রতি নম্রতার পাখা অবনমিত করবে এবং বলবে, ‘হে আমার রব! তাদের প্রতি দয়া কর, যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন’।” [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ২৩-২৪] এই আয়াতের সাথে অর্থগতভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ আরও অনেক আয়াত রয়েছে।

আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 

«جاء رجل إلى رسول الله صلى الله عليه و سلم فقال يا رسول الله من أحق الناس بحسن صحابتي ؟ قال ( أمك ) . قال ثم من ؟ قال ( ثم أمك) . قال ثم من ؟ قال (ثم أمك) . قال ثم من ؟ قال ( ثم أبوك».

“এক লোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে জিজ্ঞেস করল: হে আল্লাহর রাসূল! আমার কাছে কে উত্তম ব্যবহার পাওয়ার বেশি হকদার? তিনি বললেন: তোমার মা। লোকটি বলল: তারপর কে? তিনি বললেন: তোমার মা। লোকটি বলল: তারপর কে? তিনি বললেন: তোমার মা। লোকটি বলল: তারপর কে? তিনি বললেন: তোমার পিতা।”

সহীহ বুখারী, অধ্যায়: আচার-ব্যবহার (كتاب الأدب), পরিচ্ছেদ: মানুষের মধ্যে উত্তম ব্যবহার পাওয়ার কে বেশি হকদার? (باب من أحق الناس بحسن الصحبة), বাবনং ২, হাদীস নং ৫৬২৬; সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: সদ্ব্যবহার, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ও আচার-ব্যবহার (البروالصلة والآدب), পরিচ্ছেদ: পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার এবং তারা উভয়ে এর সবচেয়ে বেশি হকদার (باب بِرِّ الْوَالِدَيْنِ وَأَنَّهُمَا أَحَقُّ بِهِ), বাব নং ১, হাদীস নং ৬৬৬৪।

আর এই অধিকারটি বাস্তবায়িত হয় কথা, কাজ ও সম্পদের মাধ্যমে ইহসানকে অন্তর্ভুক্ত করে। আর এই অধিকারের বিনিময়ে তার ওপর আবশ্যক হয়ে পড়ে গুরু দায়িত্ব পালন ও বড় রকমের আমানতের সংরক্ষণ করা। বরং তা এই জীবনে তার মহান দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহের অন্যতম। আর এই দায়িত্ব ও কর্তব্যের সূচনা হলো- আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ قُوٓاْ أَنفُسَكُمۡ وَأَهۡلِيكُمۡ نَارٗا وَقُودُهَا ٱلنَّاسُ وَٱلۡحِجَارَةُ عَلَيۡهَا مَلَٰٓئِكَةٌ غِلَاظٞ شِدَادٞ لَّا يَعۡصُونَ ٱللَّهَ مَآ أَمَرَهُمۡ وَيَفۡعَلُونَ مَا يُؤۡمَرُونَ ٦[ سُورَةُ التَّحۡرِيمِ: 6[

“হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর। যাতে নিয়োজিত আছে নির্মমহৃদয়, কঠোরস্বভাব ফিরিশতাগণ, যারা অমান্য করে না তা, যা আল্লাহ তাদেরকে আদেশ করেন। আর তারা যা করতে আদিষ্ট হয়, তাই করে।” [সূরা আত-তাহরীম, আয়াত: ৬]

হাসান রহ. বলেন, তোমরা তাদেরকে আল্লাহর আনুগত্যের নির্দেশ দাও এবং কল্যাণের প্রশিক্ষণ দাও।

বিশুদ্ধ হাদীসের মধ্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«كلكم راع وكلكم مسؤول عن رعيته … »

“তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল (রক্ষণাবেক্ষণকারী), আর তোমাদের প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। …”

ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রহ. বলেন, “পিতা-মাতার প্রতি তাদের সন্তানদের ব্যাপারে আল্লাহর নির্দেশ সন্তানদের প্রতি তাদের পিতা-মাতার ব্যাপারে নির্দেশের ওপর অগ্রগামী। সুতরাং যে ব্যক্তি তার সন্তানকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা দেওয়ার ব্যাপারে অবহেলা করে এবং তাকে অনর্থক ছেড়ে দেয়, তবে সে তার প্রতি চরম খারাপ আচরণ করল। আর অধিকাংশ সন্তানের জীবনে বিপর্যয় ও বিশৃঙ্খলা নেমে আসে তাদের পিতা-মাতার কারণে। কেননা তারা তাদের প্রতি অযত্ন ও অবহেলা করে এবং তাদেরকে দীনের ফরয ও সুন্নাতসমূহ শিক্ষা দেওয়া থেকে বিরত থাকে। তারা তাদেরকে ছোট অবস্থায় নষ্ট করেছে, ফলে বড় হয়ে তারা তাদের নিজেদের ও পিতা-মাতাদের উপকার করবে না। যেমনিভাবে এক ব্যক্তি তার সন্তানের অবাধ্যতার অভিযোগ করলে সন্তান বলে: হে আমার পিতা! আমার ছোট বেলায় তুমি আমার সাথে দুর্ব্যবহার করেছ, আর আমি তোমার বৃদ্ধ বয়সে তোমার সাথে দুর্ব্যবহার করেছি; তুমি আমাকে শিশু অবস্থায় নষ্ট করেছ, আর আমি তোমার বৃদ্ধ অবস্থায় তোমাকে কষ্ট দিচ্ছি।”

পিতা-মাতার দায়িত্ব ও কর্তব্যের ব্যাপারে এটা একটা মোটামুটি বর্ণনা; তবে মায়ের দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো নিম্নরূপ:

প্রথমত: তার সন্তানের পিতা নির্বাচন করা:

নারীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও কর্তব্যের সূচনা হলো তার শিশু সন্তানদের পিতা গ্রহণের ক্ষেত্রে বর বাছাইয়ের জটিল ধাপ বা স্তরটি। যে কেউ তাকে বিয়ে করতে ইচ্ছা পোষণ করে বিয়ের প্রস্তাব পেশ করলেই সে তা গ্রহণ করবে না; বরং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গ্রহণযোগ্য স্বামী নির্বাচনের জন্য সুস্পষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, 

«إذا أتاكم من ترضون خلقه ودينه فزوجوه . إلا تفعلوا تكن فتنة في الأرض وفساد عريض»

“যখন তোমাদের নিকট এমন কোনো ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে, যার চরিত্র ও দীনদারীতে তোমরা সন্তুষ্ট, তবে তোমরা তার বিয়ের ব্যবস্থা করে দাও। যদি তোমরা তা না কর, তবে তা পৃথিবীর মধ্যে বিপর্যয় ডেকে আনবে এবং ব্যাপক বিশৃঙ্খলার কারণ হবে।”

সহীহ বুখারী, কিতাবুল জুম‘আ (كتاب الجمعة), পরিচ্ছেদ: গ্রাম ও শহরে জুমু‘আ প্রসঙ্গে (باب الجمعة في القرى و المدن), বাব নং ১০, হাদীস নং ৮৫৩; সহীহ মুসলিম, ইমারত (الإمارة) অধ্যায়, বাব নং ৫, হাদীস নং ৪৮২৮। তুহফাতুল মাওদুদ (تحفة المودود), পৃ. ৩৮৭। তিরমিযী, অধ্যায়: বিবাহ (كتاب النكاح), পরিচ্ছেদ: যখন তোমাদের নিকট এমন ব্যক্তি আসে যার দীনদারীতে তোমরা সন্তুষ্ট, তবে তোমরা তার বিয়ের ব্যবস্থা কর (باب ما جاء إذا جاءكم من تضرون دينه فزوجوه), বাব নং ৩, হাদীস নং ১০৮৪;

মানদণ্ড হলো তিনটি বিষয়: দীন, চরিত্র ও আকল:     

যখন এই তিনটি বিষয় ব্যক্তির মধ্যে পূর্ণতা লাভ করে, তখন সে তাকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করবে। বর্তমান দিনের অধিকাংশ মানুষ এর বিপরীতে তার ধন-সম্পদের আধিক্য অথবা শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ অথবা তার সরকারি চাকরি অথবা সামাজিক মর্যাদা অথবা তার চেহারা-ছবি অথবা তার যশ-খ্যাতিসহ ইত্যাদি বিচার করে। অথচ এ ধরনের সকল মানদণ্ড রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক নির্ধারিত মানদণ্ডের মোকবিলায় কিছুই নয়।

কেন? তার কারণ হলো, সৌভাগ্য, পবিত্র বা উত্তম জীবন এবং দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম পরিণতি এই মানদণ্ডের মধ্যেই নিহিত রয়েছে।

সুতরাং বেদীন স্বামীর কারণে স্ত্রী যুলুমের শিকার হবে, আর তার সন্তানগণ হবে ধ্বংস ও বিচ্যুতির শিকার।

আর স্বামীর নৈতিকতার অভাবে স্ত্রী তার দুর্ব্যবহারের শিকার হবে এবং তার সন্তানগণ ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে ধ্বংসের শিকার হবে।

আর স্বামীর নির্বুদ্ধিতার কারণে স্ত্রী অশান্তি ও দুর্বিসহ জীবনের অধিকারী হবে; আর তার সন্তানগণ হবে অস্থিরতার শিকার। সুতরাং ধার্মিক, চরিত্রবান ও বুদ্ধিমান পিতা হলেন এমন, যিনি তার (স্ত্রীর) সন্তানদেরকে প্রতিপালন করবেন ও শিক্ষা দেবেন এবং তাদেরকে যথাযথভাবে লালন-পালন ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে তাকে সহযোগিতা করবেন, আর তাদেরকে উত্তম চরিত্র ও আচার-আচরণের ব্যাপারে উৎসাহিত করবেন।

ইবন মাজাহ, অধ্যায়: বিবাহ (كتاب النكاح),পরিচ্ছেদ: সমতা (باب الأكفاء), বাব নং ৪৬, হাদীস নং ১৯৬৭।

দ্বিতীয়ত: ভ্রুণ অবস্থায় তার রক্ষণাবেক্ষণ করা:

তার জরায়ুর মধ্যে বীর্য প্রবেশের দিন থেকেই ভ্রণের প্রতি গুরুত্ব প্রদান করা। সুতরাং সে তার সুস্থতা এবং তার জন্য উপকারী বিষয়সমূহের প্রতি যত্নবান হবে; আর তা সম্ভব হবে তার খাওয়া-দাওয়া, পান করা ও নড়াচড়ার মধ্য দিয়ে। সুতরাং জেনে রাখা দরকার যে, গর্ভবতী তার দীর্ঘ গর্ভাকালীন সময়ের মধ্যে অনেকগুলো পরিস্থিতির শিকার হয়। ফলে সে এই দিকে মনোযোগ দেবে, যাতে তার গর্ভস্থিত সন্তান নিরাপদে বের হয়ে আসে, আর এটা তাকে সুস্থ, স্বাস্থ্যসম্মত ও বুদ্ধিমত্তার সাথে তাকে লালন-পালনে সহযোগিতা করবে।

তৃতীয়ত: প্রসূত সন্তানের রক্ষণাবেক্ষণ করা:

– তাকে প্রসব করার সময় তার অধিকারসমূহ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তার পিতার সাথে এই পর্যায়ে নিম্নলিখিতরূপে সহযোগিতা করা:

  • তার ডান কানে আযান দেওয়া, যাতে সে প্রথমেই তাওহীদ তথা আল্লাহর একত্ববাদের কথা শুনতে পায়।
  • সুন্দর নাম দ্বারা তার নাম রাখা। আর খারাপ নাম দ্বারা নাম রাখা থেকে অথবা খারাপ অর্থ বহন করে এমন নাম দ্বারা নামকরণ করা অথবা কাফিরদের নামে নাম রাখা অথবা  শরী‘আত কর্তৃক নিষিদ্ধ নামে নামকরণ করা থেকে সতর্কতা অবলম্বন করা।
  • তার জন্মের সপ্তম দিনে তার নাম রাখার সাথে সাথে তার মাথার চুল মুণ্ডন করা।
  • তার মাথার চুলের ওজন পরিমাণ রৌপ্য দ্বারা সাদকা করা।
  • তার পক্ষ থেকে আকিকা করা; আর তা এইভাবে যে, ছেলের পক্ষ থেকে দু’টি ছাগল দ্বারা, আর মেয়ের পক্ষ থেকে একটি ছাগল দ্বারা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 

« الغلام مرتهن بعقيقية يذبح عنه يوم السابع ويسمى ويحلق رأسه ». (أخرجه الترمذي و أبوداود و النسائي و ابن ماجه).

“প্রত্যেক প্রসূত সন্তান স্বীয় আকিকার সাথে আবদ্ধ। তার পক্ষ থেকে তা তার জন্মের সপ্তম দিনে যবাই করতে হবে। সেদিন তার নাম রাখতে হবে এবং তার মাথা মুণ্ডন করতে হবে।”

তিরমিযী, অধ্যায়: কুরবানী (كتاب الأضاحي عن رسول الله صلى الله عليه و سلم), পরিচ্ছেদ: আকীকা (باب من العقيقة), বাব নং ২৩, হাদীস নং ১৫২২; আবূ দাউদ, অধ্যায়: কুরবানী (الضحايا), পরিচ্ছেদ: আকীকা প্রসঙ্গে (باب فِى الْعَقِيقَةِ), বাব নং ২১, হাদীস নং ২৮৩৯; নাসাঈ, অধ্যায়: আকীকা (كتاب العقيقة), পরিচ্ছেদ: কখন আকীকা করা হবে? (متى يعق), বাব নং ৬, হাদীস নং ৪৫৪৬; ইবন মাজাহ,অধ্যায়: জবেহ (كتاب الذبائح), পরিচ্ছেদ: আকীকা (باب العقيقة), বাব নং ১, হাদীস নং ৩১৬৫।

– তাওহীদ তথা একত্ববাদের ভিত্তিতে কথা বলার ওপর তাকে অভ্যস্ত করানো এবং তার প্রাণে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন বিষয়াদির বীজ বপন করা। বিশেষ করে প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যেই তা করতে হবে। সুতরাং গবেষকদের কেউ কেউ উল্লেখ করেন যে, শিশু তার প্রথম বছরগুলোতেই তার পূর্বপুরুষদের অধিকাংশ চিন্তাচেতনার আলোকে শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে; কারণ, ৯০% শিক্ষা-বিষয়ক কার্যক্রম তার প্রথম বছরগুলোতেই সম্পন্ন হয়। সুতরাং গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো এই সময়কালকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো, যা কিছুক্ষণ পূর্বে আলোচিত হয়েছে এবং যার বিস্তারিত আলোচনা অচিরেই আসছে। ইবনুল জাউযী রহ. বলেন, ছোট বয়সে যা হয়, তাকেই আমি বেশি মূল্যায়ন করি। কেননা যখন সন্তানকে তার স্বভাবের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়, তখন সে তার ওপরই বেড়ে উঠে; আর স্বভাব একটি কঠিন বিষয়, কবি বলেন,

যখন তুমি গাছের ডালকে সোজা করতে চাইবে, তখন তা সোজা হয়ে যাবে,

আর যখন তুমি শুকনো কাঠকে সোজা করতে চাইবে, তখন তা নরম হবে না।

আদব-কায়দা তরুণ সমাজকে উপকার করে, যেমনটি ঘটে লোহার মধ্যে

আর বয়স্ক লোকের মধ্যে আদব-কায়দা তেমন কোনো উপকার করে না।

আর এখানে যা উল্লেখ করার মত, তা হলো,

  • শিশুকে নিম্নোল্লেখিত যিকিরসমূহ উচ্চারণে অভ্যস্ত করা: لا إله الا الله, محمد رسول الله  (আল্লাহ ছাড়া কোনো প্রকৃত ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল ),  سبحان الله (আল্লাহ পবিত্র), الحمد لله (সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য),الله أكبر  (আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ), لا حول و لا قوة إلا بالله  (আল্লাহর সাহায্য ব্যতীত কোনো ক্ষমতা নেই এবং কোনো শক্তি নেই), ইত্যাদি।
  • শিশুর মনে আল্লাহর  ভালোবাসার বীজ রোপন করা।
  • তার মনে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও তার ভয়ের অপরিহার্যতার বীজ বপন করা।
  • তার মনে মানুষের ওপর আল্লাহর নজরদারী ও খবরদারীর বীজ রোপন করা।
  • তাকে  ভালো কথা বলার অভ্যাসে অভ্যস্ত করা, যেমন, أحسنت (তুমি সুন্দর করেছ), شكرا (ধন্যবাদ), جزاك الله خيرا (আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।
  • তাকে গুরুত্বপূর্ণ দো‘আসমূহ, ঘুম, খাওয়ার (পূর্বাপর) এবং বিভিন্ন স্থানে প্রবেশের যিকির তথা দো‘আসমূহ পাঠ অভ্যস্ত করা।
  • শিশুদেরকে (আল্লাহর) আশ্রয়ে দেওয়া, যেমনটি করেছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান ও হোসাইনের সাথে। যেমন, অভিভাবক বলবে:

«أعيذك بكلمات الله التامة من كل شيطان وهامة ومن كل عين لامة»

“আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালেমাসমূহের অসীলায় প্রত্যেক শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী এবং প্রত্যেক কুদৃষ্টিসম্পন্ন চোখ থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে দিচ্ছি।” যাতে শয়তান তাদেরকে শিকার করতে পারে না।

সহীহ বুখারী, অধ্যায়: নবীগণ (كتاب الأنبياء), বাব নং ১২, হাদীস নং ৩১৯১, আবদুল্লাহ ইবন ‘আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, «كان النبي صلى الله عليه و سلم يعوذ الحسن والحسين ويقول: إن أباكما كان يعوذ بها إسماعيل وإسحاق أعوذ بكلمات الله التامة من كل شيطان وهامة ومن كل عين لامة» “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান ও হোসাইনের জন্য আশ্রয় প্রার্থনা করতেন, তিনি বলতেন: নিশ্চয় তোমাদের পিতা ইসমাঈল ও ইসহাক ‘আলাইহিমাস সালাম তা দ্বারা প্রার্থনা করতেন: আমি আশ্রয় চাই আল্লাহর পরিপূর্ণ কালেমাসমূহ দ্বারা প্রত্যেক শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী এবং প্রত্যেক কুদৃষ্টিসম্পন্ন চোখ থেকে।

  • আরও বিশেষভাবে তিনি যা উল্লেখ্য, -যদিও তা পূর্বে উল্লেখিত বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে: তা হলো, তাকে শুরুতে ঘরের মধ্যে আল্লাহ তা‘আলার কিতাব (আল-কুরআনুল কারীম) মুখস্থ করাবে এবং তাকে তা শুনাবে। আর অনুরূপভাবে সুন্নাতে নববী তথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস থেকে কিছু মুখস্থ করাবে, বিশেষ করে ছোট ছোট হাদীসসমূহ।
  • শিশুদের সাথে গুরুত্বপূর্ণ কিচ্ছা-কাহিনীসমূহ থেকে কিছু আলোচনা করা; বিশেষ করে সীরাতে নববী তথা নবীর জীবনী থেকে ঐ পর্যায়ের বিষয়গুলো থেকে আলোচনা করা, যা সে বয়সের যে স্তরে জীবনযাপন করছে, তার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। কারণ, ঐ কাহিনীসমূহ তার মধ্যে বড় রকমের শিক্ষামূলক প্রভাব ফেলবে এবং তার মনে উন্নত ও শক্তিশালী চরিত্রের বীজ বপন করবে, আর সে প্রত্যাশা করবে, সে যেন ঐসব ব্যক্তিবর্গের মত হতে পারে, যাদের কাহিনী সে শ্রবণ করেছে।
  • শিশুর মধ্যে তার ছোটকাল থেকেই উন্নত মানের ইচ্ছা বা অভিপ্রায়ের ব্যাপারে আশা-আকাঙ্খা জাগিয়ে তোলা এইভাবে যে, সে মনে মনে পরিকল্পনা স্থির করবে যে, সে অমুকের মত আলিম (বিদ্বান) হবে অথবা অমুকের মত ডাক্তার হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি।
  • শিশুর আগ্রহ ও ইচ্ছাসমূহ প্রকাশ করতে এবং তার আল্লাহ প্রদত্ত মেধাসমূহের বিকাশে উদ্যোগ গ্রহণ করা। সুতরাং উদাহরণস্বরূপ বলা যায়: যখন দেখা যায় যে, সে পড়ার প্রতি আগ্রহী, তখন সে তাতেই তাকে নিয়োগ করে দেবে এবং তার জন্য সংশ্লিষ্ট বইপত্রের ব্যবস্থা করে দেবে, আর যখন সে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী হবে, তখন তাকে ঐ খেলাধুলার ব্যবস্থা করে দেবে, যা তার শক্তি ও মেধা বিকাশে ভূমিকা রাখবে… অনুরূপভাবে আরও অন্যান্য বিষয়ও হতে পারে।
  • আর সাত বছর বয়সের সময় শিশুর সাথে আচার-আচরণের ক্ষেত্রে নতুন আরেক ধাপের সূচনা হয়; রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কতগুলো মৌলিক সাইনপোস্ট (Signpost) ঠিক করে দিয়েছেন তাঁর বাণীর মাধ্যমে, তিনি বলেছেন: 

«مروا أبناءكم بالصلاة لسبع سنين واضربوهم عليها لعشر سنين وفرقوا بينهم في المضاجع ».

  • “তোমাদের সন্তানদেরকে তোমরা সালাতের নির্দেশ দাও, যখন তারা সাত বছর বয়সে উপনীত হয় এবং তার কারণে তাদেরকে প্রহার কর, যখন তারা দশ বছর বয়সে উপনীত হয়। আর তাদের শোয়ার স্থান পৃথক করে দাও।” আর এই সাইনপোস্টগুলো হলো:
  • শিশুকে সালাতের নির্দেশের দ্বারা শুরু করা, যা ইবাদতসমূহের মধ্যে প্রধান এবং তাকে এই দিকে মনোযোগী করা ও তার প্রতি উৎসাহিত করা। আর এই নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত হবে সাওমের (রোযার) মতো অপরাপর সকল ইবাদতও। আর তাকে এই কাজে অভ্যস্ত করে তোলা। আর সে উপলব্ধি করবে যে, তার সকল কার্যক্রমই ইবাদত, যার মাধ্যমে সে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার নৈকট্য অর্জন করবে।
  • দশম বছরে উপনীত হওয়ার পর বার বার নির্দেশ লঙ্ঘন করলে মৃদু প্রহার করা।

ঘুমের সময় নারী-পুরুষদের পরস্পর থেকে দূরে রাখা।

আহমদ, মুসানাদ, অধ্যায়: মুসনাদুল মুকছিরীন মিনাস সাহাবা (مسند المكثرين من الصحابة), পরিচ্ছেদ: মুসনাদে আবদুল্লাহ ইবন ‘আমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা (مسند عبد الله بن عمرو رضى الله تعالى عنهما), হাদীস নং ৬৭৫৬; আবূ দাউদ, অধ্যায়: সালাত (الصلاة), পরিচ্ছেদ: কখন সন্তানকে সালাতের নির্দেশ দেওয়া হবে (باب مَتَى يُؤْمَرُ الْغُلاَمُ بِالصَّلاَةِ), বাব নং ২৬, হাদীস নং ৪৯৫।

পূর্ববর্তী ধাপগুলোতে যা সহযোগিতা করবে, তা হলো নিম্নোক্ত প্রশিক্ষণ পদ্ধতিসমূহ:

(ক) শারীরিক শাস্তি ছাড়া অপরাপর শাস্তি প্রদান:

আর এই শাস্তি তখন দেওয়া হবে, যখন তার পক্ষ থেকে বার বার সালাত তরক (পরিত্যাগ) করা হবে; যেমন, তাকে নির্ধারিত উপহার দেওয়া থেকে বঞ্চিত করা, প্রহারের হুমকি দেওয়া এবং তার চাহিদা পূরণের আহ্বানে সাড়া না দেওয়া …ইত্যাদি ইত্যাদি।

আর শারীরিক শাস্তি হবে মৃদু শাস্তি, কঠোর নয়, আর এই ধরনের শাস্তি কেবল তখনই কার্যকর করা হবে, যখন তার দশ বছর পূর্ণ হবে এবং তার পক্ষ থেকে বার বার সালাত তরক (পরিত্যাগ) করা হবে; আর এই শাস্তিবিধানের সময় শরীরের স্পর্শকাতর স্থানসমূহ থেকে দূরে থাকতে হবে। যেমন, ঘাড়, পেট ও মাথা।

(খ) পুরুষ ও নারী জাতির জাতিগত বিশেষত্বের তাগিদ দেওয়া:

ছেলে ও মেয়ের প্রত্যেকের জন্য যে একে অপরের থেকে পৃথক বিশেষত্ব বা বৈশিষ্ট্য রয়েছে, সে বিষয়ে তাকে অবহিত করা; আর এই অবহিতকরণের কাজ শুরু হবে তাদের বয়স দশম বছর পূর্ণ হওয়ার সময় থেকে তাদের বিছানা আলাদা করার মাধ্যমে। আর এটা একে অপরের নিকটবর্তী হওয়ার ও অশ্লিলতার পথ বন্ধ করার জন্য এবং স্বাতন্ত্রবোধ ও একান্ত ব্যক্তিগত জীবনের অনুশীলনের জন্যও এই ব্যবস্থা।

(গ) নৈতিক চরিত্র ও শিষ্টাচারের ওপর ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ:

আর এই কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত- চারিত্রিক কর্মকাণ্ডের ওপর তাদের অনুশীলন এবং তার ওপর তাদেরকে অভ্যস্ত করানো। যেমন, আচার-আচরণে এবং কাজে ও কর্মে সত্যবাদিতার নীতি অবলম্বন করা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ না করা।

(ঘ) কর্মকাণ্ডে উৎসাহ দান:

ছোট বয়সে প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে যা সহায়ক শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখে, তা হলো শিশুদের কর্মকাণ্ডের সাথে সংগতিপূর্ণভাবে উৎসাহদান। তারা ছোট হলেও তাদের ওপর এর অনেক প্রভাব রয়েছে।

(ঙ) বন্ধু-বান্ধবকে পর্যবেক্ষণ ও অনুসরণ:

ছোটবেলা থেকেই বন্ধু-বান্ধব ও সঙ্গী-সাথীর কর্মকাণ্ডের প্রতি গুরুত্ব প্রদান করা এবং এ ব্যাপারটি উপেক্ষা না করা। কারণ, সে তার বন্ধুর কাছ থেকেই কথা বলা, স্বভাব-প্রকৃতি ও কর্মকাণ্ডের অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়। অতএব তাকে এমন বন্ধুর নিকটবর্তী করাবে, যে উত্তম পরিবেশে জীবনযাপন করে এবং এমন সাথীর সঙ্গ থেকে দূরে থাকবে, যে মন্দ পরিবেশে জীবনযাপন করে।

চতুর্থত: তাকে প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় তত্ত্ববধান করা:

আর এই বয়সে এসে পিতা-মাতার দায়-দায়িত্ব বেড়ে যায়। এখানে কয়েকটি বিষয়ে মায়ের দায়-দায়িত্ব কেন্দ্রীভূত হয়:

  • দায়িত্ব পালন ও যত্ন নেয়ার ক্ষেত্রে তার পিতার সাথে সহযোগিতা করা।
  • গৃহে তত্ত্বাবধান। এই তত্ত্বাভধানের অন্তর্ভুক্ত: ভালো ও কল্যাণকর কাজে উৎসাহ প্রদান করা এবং এর ব্যতিক্রম করলে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও সাবধান করা।
  • ছেলে অথবা মেয়েকে তার মূল্য ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অনুভূত করা। সে যদি ছেলে হয়, তবে অনুধাবন করাবে যে, সে পুরুষদের কাতারে পৌঁছেছে; তাকে পুরুষত্ব ও তার বৈশিষ্ট্যসমূহের ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দেবে। আর এই দায়িত্বটি যদি সম্ভব হয় তবে পিতার জন্যই বহন করা জরুরি। আর যদি সে কন্যা হয়, তবে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করাবে। যেমন, তার ভবিষ্যত দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে অনুশীলন করা, তাকে বিশেষ তত্ত্বাবধান করা, তার যত্ন নেওয়া, তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া, তার পড়াশুনা ও অধ্যাবসায়ের দিকে মনোযোগ দেওয়া এবং তারা পাঠসমূহ ও পোশাক-পরিচ্ছদের বিষয়টি তদারকি করা।
  • মেয়ের কাজে তার সাথে অংশ নেওয়া। এটি শুরু করতে হবে তার সাথে বন্ধুসুলভ ব্যবহারের মাধ্যমে। আর তাকে বোঝাতে হবে যে, সে তার মা হওয়ার সাথে সাথে একজন বান্ধবীও বটে। এতে করে পরবর্তীতে মেয়ে তার কাছ থেকে এমন কোনো কিছু গোপন করবে না, যা অনেক সময় তার ক্ষতির কারণ হতে পারে।
  • মেয়েকে ঘর-গৃহস্থালির কাজকর্মের কিছু দায়িত্ব প্রদান করা এবং তাকে সম্পূর্ণরূপে এমনভাবে উপেক্ষা না করা, যাতে কোনো দায়-দায়িত্ব বহন না করেই সে সকল জিনিস হাতের কাছে প্রস্তুত অবস্থায় পেয়ে যায়।
  • সকল সম্পাদিত কাজের ব্যাপারে পিতাকে অবহিত করা এবং বিশেষ করে এই স্তরের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে তাকে অংশগ্রহণ করানো, আর ছেলে হউক অথবা মেয়ে হউক সন্তানদের কোনো বিষয়ই তার নিকট গোপন না করা।  

এসব দায়িত্ব ও কর্তব্যের গভীরতাই জোর দিয়ে থাকে যে, মা হলেন শিশুর পরিচর্যাকারিনী, লালনপালনকারিনী, তত্ত্বাবধায়ক, শিক্ষিকা, পরিচালিকা ও সম্পাদিকা। তিনি হলেন একাধারে জ্ঞানীদের জননী, কীর্তিমানদের লালনপালনকারিনী ও শিক্ষিকা, শ্রমিক ও কৃষকের প্রশিক্ষক, বীর পুরুষ তৈরির কারিগর এবং মহৎ গুণাবলি রোপণকারিনী। এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ব্যবস্থাপনা মোটেই সহজ কাজ নয় (যেমনটি অনেক মায়েরা ভাবেন) বরং তিনি হলেন পৃথিবীর বুকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এর কারণ হলো, মহৎ ব্যক্তি, আলিম-জ্ঞানী, মুজাহিদ (আল্লাহর পথে জিহাদকারী), দা‘ঈ (আল্লাহর পথে আহ্বানকারী) এবং সৎকর্মশীলদের কারও আবির্ভাব হত না, যদি না তার পিছনে প্রশিক্ষক জ্ঞানী মায়েরা না থাকতেন।

(গ) আদর্শ কন্যা হিসেবে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য:

কন্যা হচ্ছে সেই মূলেরই শাখা। আল্লাহ সুবহানহু ওয়া তা‘আলা মহান অনুগ্রহের মাধ্যমে তাকে বিশেষিত করেছেন, যার কারণে সে ছেলের থেকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের হতে পারে, যদি তাকে যথাযথভাবে যেমনটি আল্লাহ সুবহানহু ওয়া তা‘আলা শরী‘আতের বিধান হিসেবে অর্পণ করেছেন সেভাবে লালনপালন করা যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 

«مَنْ عَالَ جَارِيَتَيْنِ حَتَّى تَبْلُغَا جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَنَا وَهُوَ ». وَضَمَّ أَصَابِعَهُ.

“যে ব্যক্তি দু’টি কন্যাকে প্রাপ্তবয়স্কা হওয়া পর্যন্ত লালনপালন করে, কিয়ামতের দিন সে হাজির হবে এমতাবস্থায় যে, আমি এবং সে এভাবে থাকব” বলে তিনি তাঁর আঙুলসমূহকে একত্রিত করে দেখালেন।”

কন্যা দুর্বলতা ও শান্ত-শিষ্টতার কারণে তার পিতা-মাতার অন্তর বিশেষভাবে দখল করে থাকে।

আর যেমনিভাবে কন্যার জন্য পিতা-মাতার ওপর অধিকার স্বীকৃত আছে, যা পূর্ববর্তী পৃষ্ঠাসমূহের মধ্যে ইঙ্গিত করা হয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে কন্যাও এই দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে মুক্ত নয়। কন্যা হিসেবে নারীর অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহ নিম্নরূপ:

  • ব্যক্তিগত দায়িত্বের প্রতি গুরুত্বারোপ করা। যেমন, শিক্ষালাভ ও শিক্ষা দান। একজন নারী তার মা ও  ভালো শিক্ষিকাদের সহযোগিতা নিয়ে নিজের জন্য শিক্ষা সংক্রান্ত একটি পরিপূর্ণ সিলেবাস/প্রোগ্রাম গ্রহণ করবে, যা শর‘ঈ জ্ঞান, আরবী, শিষ্টাচারিতা, তাফসীর, হাদীস, সাহিত্য, সাধারণ জ্ঞান ও নারী বিষয়ক জ্ঞান ইত্যাদিসহ গুরুত্বপূর্ণ সকল বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করবে, যার বিবরণ নারীর নিজের প্রতি শিক্ষাবিষয়ক দায়িত্ব ও কর্তব্য প্রসঙ্গে পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে।

সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: সদ্ব্যবহার, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ও আচার-ব্যবহার (البر والصلة والآدب), পরিচ্ছেদ: কন্যাদের প্রতি সদ্ব্যবহারের ফযীলত(ِ باب فَضْلِ الإِحْسَانِ إِلَى الْبَنَاتِ), বাব নং ৪৬, হাদীস নং ৬৮৬৪।

  • আল্লাহ ত‘আলার বাণীর অনুসরণে পিতা-মাতার আনুগত্য করা এবং এই ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়া। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعۡبُدُوٓاْ إِلَّآ إِيَّاهُ وَبِٱلۡوَٰلِدَيۡنِ إِحۡسَٰنًاۚ[ سُورَةُ الإِسۡرَاءِ: 23[

“তোমার রব আদেশ দিয়েছেন, তিনি ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত না করতে এবং পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে।” [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ২৩] অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, অধিকাংশ কন্যাদেরকে দেখা যায় তারা এই আনুগত্যের ব্যাপারে উদাসীন। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা পিতামাতার চাইতে বান্ধবীদের অনুসরণ করে এবং তাদেরকে অগ্রধিকার দেয়। এটা ছেলে-মেয়ে উভয়েরই বড় ধরনের অন্যায়। এই ক্ষতি ভবিষ্যতে তাদের কাছেই ফিরে আসবে। কেননা, নিঃসন্দেহে পিতা-মাতার আনুগত্য এমন এক ঋণ, যা শীঘ্রই ফেরত আসবে।

  • মায়ের বিভিন্ন কর্তব্যে সাধ্যমত সহযোগিতা করা। উদাহরণস্বরূপ:
  • রান্নবান্না, ধোয়া-মোছা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব পালন করা; পুরাপুরিভাবে কাজের মহিলা-নির্ভর না হওয়া। কারণ, এই নির্ভরতা মেয়েকে এক অদক্ষ বা অকর্মায় পরিণত করবে, ফলে সেই মেয়ে ভবিষ্যতে তার ঘর-গৃহস্থালির কাজকর্ম ও দায়িত্ব পালনে অসমর্থ্য হবে।
  • ছোট ভাই ও বোনদের লালনপালন এবং নৈতিকতা ও উন্নত চারিত্রিক শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে তার মাকে সার্বিক সহযোগিতা করা (আমরা মায়ের দায়িত্ব ও কর্তব্য প্রসঙ্গে এর বিস্তারিত আলোচনা করেছি
  • পূর্বে আলোচিত গুরুত্বপূর্ণ কোনো দায়িত্বে মায়ের প্রতিনিধিত্ব করা।
  • মা মুর্খ হলে তাকে শিক্ষা দেওয়া। বিশেষ করে এমন বিষয়গুলো শিখিয়ে দেওয়া, যাতে তার দীন পালন করতে পারে। যেমন, সালাত এবং সালাতের মধ্যে পঠিত কুরআন ও যিকির-আযকারের প্রশিক্ষণ দেওয়া; অবসর সময়ে তার নিকট এমন কিছু শিক্ষণীয় বিষয় পাঠ করবে, যা তার উপকারে আসবে। আর এই ব্যাপারে অনেকেই অমনোযোগী ও উদাসীন। নারীদের অনেকের ব্যাপারে এমন প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে, তারা (উদাহরণস্বরূপ) সূরা ফাতিহাই পাঠ করতে জানে না অথচ তার কন্যা বিশ্ববিদ্যালয় অথবা উচ্চ-মাধ্যমিক ছাত্রী। সেখানে এই অবস্থা থেকে উত্তরণের দায়-দায়িত্ব কন্যাদের ওপরই বর্তায়।

নিম্নোক্ত বিষয়গুলো থেকে সতর্কতা অবলম্বন করা:

  • এমন কাজে সময় অতিবাহিত করা, যাতে কোনো উপকার নেই: যেমন, বিভিন্ন প্রকার মিডিয়া অনুসরণ করা এবং অপরাপর এমন সব যোগযাযোগের মাধ্যমের পেছনে আত্মনিয়োগ করা, যার কোনো প্রয়োজন নেই। এতে বহু সময় অন্যায়-অপরাধে, খেল-তামাশায় ও অনর্থক কাজে নষ্ট হয়। অথচ মানুষকে তার সময়ের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হবে। সময়ই তার বয়স ও জীবন, আর তা জগতের সবচেয়ে দামী জিনিস। যখন তা এসব মিডিয়া ও যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ব্যয় করবে, তখন তা হবে তার দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য খারাপ পরিণতি ও ক্ষতির কারণ। অথচ অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের ব্যাপার হলো, অধিকাংশ মেয়ের সময়গুলো বরাদ্দ থাকে এসব মিডিয়া, খারাপ বান্ধবীদের সাথে আড্ডা, মার্কেট এবং টেলিফোনে, যার ফলে নষ্ট হচ্ছে বহু কাজ, ধ্বংস হচ্ছে সময় এবং হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্যতা।
  • খারাপ বান্ধবী সকল, যারা জ্বলন্ত আগুনের মতো, যখন তার মধ্যে কোনো কিছু পতিত হবে, তখন তা তাকে জ্বালিয়ে দেবে। এই যুগে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যোগযাযোগের মাধ্যম অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই প্রত্যেকটি মেয়ে যেন এসব খারাপ বান্ধবী থেকে সাবধানতা অবলম্বন করে। তাদের চিহ্ন হলো তারা অন্যদের জন্য খারাপ জিনিস ও উপায়-উপকরণ আমদানি করে; তারা দুষ্কর্ম ও বিশৃঙ্খলাকে পছন্দ করে ও করায়, তাতে আগ্রহ প্রকাশ করে এবং সৎকর্ম ও কল্যাণজনক বিষয় থেকে নিষেধ করে।
  • কাফির ও ফাসিকগণ কর্তৃক আমদানি করা ফ্যাশনের অনুসরণ করা: যেমন আমরা পূর্বেই জেনেছি যে, ইসলামের শত্রুগণ অত্যন্ত আগ্রহী, বরং তারা সচেষ্ট যাতে মুসলিম মেয়েরা বিশৃঙ্খল হতে পারে। তাদের অন্যতম উপকরণ হচ্ছে, তাদের বিভিন্ন ফ্যাশন, যা তারা মুসলিমগণের কন্যাদের মাঝে ছড়িয়ে থাকে। তাই মুসলিম কন্যার জন্য গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে না দেওয়া আবশ্যক।
  • অপ্রয়োজনে মার্কেটে বের হওয়া:  এটি একটি ভয়ানক সমস্যা, যা এই শেষ যামানায় শুষ্ক লাতাপাতায় আগুন ছড়ানোর মতো ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক মুসলিম কন্যারা বিভিন্ন মার্কেটে-বাজারে (অপ্রয়োজনে) ঘুরে বেড়ায়, যার ফলে তাদেরকে অনেক বিপদের সম্মুখীন হতে হয়। এসব বিপদসমূহের অন্যতম হলো শয়তানের শিকার হওয়া; কারণ, বাজার শয়তানেরই অবস্থান কেন্দ্র এবং সবচেয়ে নিকৃষ্টতম জায়গা হলো বাজারসমূহ। যখন মেয়েরা কোনো প্রয়োজনের কারণে বাধ্য হবে বাজারে যেতে, তখনই শুধু তার অভিভাবককে সাথে নিয়ে তার প্রয়োজন পূরণের উদ্দেশ্যে বাজারে বের হবে, অতঃপর প্রয়োজন শেষে তার ঘরে ফিরে আসবে। আর এই বের হওয়াটা অনুপ্রেরণা দেয় প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে বারবার ঘর থেকে বের হতে। সুতরাং প্রত্যেক মেয়ের উচিৎ সে যেন তার প্রয়োজনকে হিসাব করে নেয় এবং এই বের হওয়াটা যাতে বেশি না করে, কারণ তা হচ্ছে সকল অনিষ্টের দরজা। নারী যখন তার ঘর থেকে বের হয়, তখন শয়তান তার দিকে উঁকি দেয়। এটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত। কত মুসলিম নারী যে এই বেপরোয়া বের হওয়ার কারণে দুষ্টচক্রের রশিতে আবদ্ধ হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। সুতরাং ময়েদেরকে খুবই সতর্ক থাকা উচিৎ।

বিনোদন কেন্দ্রের উদ্দেশ্যে বের হওয়া: এটি খারাপ হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, এটি খেল-তামাশার স্থল, সময় নষ্টকারী এবং অন্যায় ও অপরাধের কারণ। 

আবদুল্লাহ ইবন মাস‘উদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, «المرأة عورة فإذا خرجت استشرفها الشيطان» “নারী হলো গোপন বস্তু, সে যখন বের হয়, তখন শয়তান তার দিকে উঁকি দেয়”। ইমাম তিরমিযী, অধ্যায়: দুগ্ধপান (كتاب الرضاع), পরিচ্ছেদ: শয়তান কর্তৃক নারীর দিকে উঁকি দেওয়া যখন সে বের হয় ( باب استشراف الشيطان المرأة إذا خرجت), বাব নং ১৮, হাদীস নং ১১৭৩; ইমাম তিরমিযী বলেন, এই হাদীসটি হাসান, গরীব। পাঠক ও পাঠিকা আবার মনে করবেন না যে, শরী‘আত নিয়ন্ত্রিত বৈধ আমোদ-প্রমোদ ও সুস্থ বিনোদন নিষিদ্ধ। বরং এখানে সেসব উদ্দেশ্য, যেগুলো মুসলিম সমাজের অধিকাংশ স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে- যেগুলোর সর্বনিম্ন পর্যায় হলো পুরুষ ও নারীদের মেলামেশা। কিন্তু যখন বিনোদন শরী‘আত সম্মত পন্থায় নিয়ন্ত্রিত হয়,তবে তা বৈধ; বরং জীবনের কোন কোন স্তরে তা কাম্যও বটে।-দ্রষ্টব্য: ডক্টর আবদুল্লাহ আস-সাদহান রচিত কিতাবুত তারফীহ (كتاب الترفيه)। গ্রন্থটিতে যথেষ্ট পরিমাণ তথ্য রয়েছে, আল্লাহ তাকে তাওফীক দিন।

  • অপ্রয়োজনে ফোন ব্যবহার করা: ফোনের উভয়দিকেই ধার আছে। মূলত এটি প্রয়োজনেই ব্যবহার করা হয়। কিন্তু খুবই পরিতাপের বিষয় হলো, টেলিফোনের ক্ষেত্রে  মেয়েদের অবস্থা অত্যন্ত দুঃখজনক। সে যখন ফোন রিসিভার তার কানে নেয়, তখন অনেক সময় অতিবাহিত হওয়ার পূর্বে তা ছাড়ে না। কত দুঃখজনক ও ধ্বংসাত্মক! বর্তমানে তা হয়ে গেছে ধ্বংসের দরজা, যার মাধ্যমে লম্পটরা মুসলিম মেয়েদের পিছনে লেগে তাদেরক নষ্ট করে। সুতরাং এই পথ থেকে সাবধান! সাবধান!!

(ঘ) আদর্শ বোন হিসেবে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য:

বোন হলো তার ভাইয়ের নিকট সকল আত্মীয়ের মধ্যে সবচেয়ে নিকটতম ও ঘনিষ্ঠ; আর তাদের উভয়ের জন্য যৌথ হক বা অধিকার রয়েছে। বরং তার (বোনের) দায়-দায়িত্ব আরও ব্যাপক। তা পালন করতে হয় ঘরের মধ্যে, যেখানে সে জীবনযাপন করে। কন্যা হিসেবে দায়িত্ব ও কর্তব্যের ব্যাপারে যা বলা হয়েছে, ছোট ও বড় ভাই-বোনদের সাথে বোনের দায়িত্ব ও কর্তব্যের ব্যাপারে পরিপূর্ণভাবে তাই বলা হয়।

এসব দায়িত্ব ও কর্তব্যগুলোর পাশাপাশি নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বৃদ্ধি করা য়ায়:

  • তার চেয়ে বয়সে বড় ভাই ও বোনদের সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া। কারণ, বড় বোন হলেন মায়ের মর্যাদায় এবং বড় ভাই হলেন পিতার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। তাদের জন্য আত্মীয়তার সম্পর্কজনিত অধিকার রয়েছে, আর তার ওপর কর্তব্য হলো সহযোগিতার মুখাপেক্ষী হলে তাদেরকে সহযোগিতা করা। যেমন, তাদেরকে আর্থিক সহযোগিতা করা, বিপদ-মুসিবতের সময় তাদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদেরকে সহযোগিতা করা এবং তাদের পড়াশুনা ও জ্ঞানের ব্যাপারে তাদেরকে সহযোগিতা করা।
  • বাড়ির মধ্যে সকল প্রকার কল্যাণ ছড়িয়ে দেওয়া- পাঠের মাধ্যমে, শুনানোর মাধ্যমে, দাওয়াতের মাধ্যমে, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকর্মে নিষেধ করার মাধ্যমে ইত্যাদি।
  • প্রথম নারীর পরে ঘরের রান্নাবান্না, ধোয়া-মুছা ইত্যাদির মত কাজকর্মের সে অন্যতম খুঁটি।

ঘরের মধ্যে প্রয়োজন হলে কাউকে উপদেশ ও দিকনির্দেশনা দেওয়া।

তৃতীয় ক্ষেত্র: সমাজ ও জাতি কেন্দ্রিক একজন নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্য

নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্যের পরিধি সমাজ ও পুরো জাতিকে অন্তর্ভুক্ত করে। আর সে কর্তব্য হচ্ছে, তাদের মাঝে আল্লাহর দিকে আহ্বান, সৎকাজের আদেশ, অসৎকাজে নিষেধ, কল্যাণ কামনা ও সংস্কার করার মত কাজের আঞ্জাম দেওয়া।

আর এখানে আমি সাধারণভাবে এই দাওয়াতের গুরুত্ব, তার আবশ্যকতা ও ফলাফল, অতঃপর বিশেষকরে নারীর সাথে সংশ্লিষ্ট শরী‘আতের কিছু দলীল-প্রমাণাদি উল্লেখ করছি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمَنۡ أَحۡسَنُ قَوۡلٗا مِّمَّن دَعَآ إِلَى ٱللَّهِ وَعَمِلَ صَٰلِحٗا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ ٱلۡمُسۡلِمِينَ ٣٣ وَلَا تَسۡتَوِي ٱلۡحَسَنَةُ وَلَا ٱلسَّيِّئَةُۚ ٱدۡفَعۡ بِٱلَّتِي هِيَ أَحۡسَنُ فَإِذَا ٱلَّذِي بَيۡنَكَ وَبَيۡنَهُۥ عَدَٰوَةٞ كَأَنَّهُۥ وَلِيٌّ حَمِيمٞ ٣٤ [ سُورَةُ فُصِّلَتۡ: 33-34[

“কথায় কে উত্তম ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা, যে আল্লাহর প্রতি মানুষকে আহ্বান করে, সৎকর্ম করে এবং বলে, ‘আমি তো অনুগতদের অন্তর্ভুক্ত।’  ভালো ও মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দ প্রতিহত কর উৎকৃষ্ট দ্বারা। ফলে তোমার সাথে যার শত্রুতা আছে, সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো।” [সূরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৩৩-৩৪]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

 ﴿وَلۡتَكُن مِّنكُمۡ أُمَّةٞ يَدۡعُونَ إِلَى ٱلۡخَيۡرِ وَيَأۡمُرُونَ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَيَنۡهَوۡنَ عَنِ ٱلۡمُنكَرِۚ وَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ ١٠٤[ سُورَةُ آلِ عِمۡرَانَ: 104]                                                                                                                                                       

“তোমাদের মধ্যে এমন এক দল থাকা উচিৎ যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে এবং সৎকাজের নির্দেশ দেবে ও অসৎকাজের নিষেধ করবে, এরাই সফলকাম।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৪]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

﴿ٱدۡعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِٱلۡحِكۡمَةِ وَٱلۡمَوۡعِظَةِ ٱلۡحَسَنَةِۖ وَجَٰدِلۡهُم بِٱلَّتِي هِيَ أَحۡسَنُۚ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعۡلَمُ بِمَن ضَلَّ عَن سَبِيلِهِۦ وَهُوَ أَعۡلَمُ بِٱلۡمُهۡتَدِينَ ١٢٥[ سُورَةُ النَّحۡلِ: 125] 

“তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান কর হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে তর্ক করবে উত্তম পন্থায়। তোমার প্রতিপালক সেই ব্যক্তি সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত, যে ব্যক্তি তাঁর পথ ছেড়ে বিপথগামী হয় এবং কারা সৎপথে আছে, তাও তিনি সবিশেষ অবহিত।” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ১২৫]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

﴿فَلَوۡلَا نَفَرَ مِن كُلِّ فِرۡقَةٖ مِّنۡهُمۡ طَآئِفَةٞ لِّيَتَفَقَّهُواْ فِي ٱلدِّينِ وَلِيُنذِرُواْ قَوۡمَهُمۡ إِذَا رَجَعُوٓاْ إِلَيۡهِمۡ لَعَلَّهُمۡ يَحۡذَرُونَ ١٢٢ [سُورَةُ التَّوۡبَةِ: 122]                                                                                                                  

“তাদের প্রত্যেক দলের একটি অংশ কেন বের হয় না কেন, যাতে তারা দীন সম্বন্ধে জ্ঞান অনুশীলন করতে পারে এবং তাদের সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পারে, যখন তারা তাদের নিকট ফিরে আসবে; আশা করা যায় তারা সতর্ক হবে।” [সূরা আত-তাওবা, আয়াত: ১২২]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

 ﴿قُلۡ هَٰذِهِۦ سَبِيلِيٓ أَدۡعُوٓاْ إِلَى ٱللَّهِۚ عَلَىٰ بَصِيرَةٍ أَنَا۠ وَمَنِ ٱتَّبَعَنِيۖ وَسُبۡحَٰنَ ٱللَّهِ وَمَآ أَنَا۠ مِنَ ٱلۡمُشۡرِكِينَ ١٠٨[ سُورَةُ يُوسُفَ: 108]                                                                                                                                                

“বল, এটাই আমার পথ; আল্লাহর প্রতি মানুষকে আমি আহ্বান করি সজ্ঞানে-০ আমি এবং আমার অনুসারীগণও। আল্লাহ মহিমান্বিত এবং যারা আল্লাহর শরীক করে আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।” [সূরা ইউসূফ, আয়াত: ১০৮]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

﴿وَٱلۡمُؤۡمِنُونَ وَٱلۡمُؤۡمِنَٰتُ بَعۡضُهُمۡ أَوۡلِيَآءُ بَعۡضٖۚ يَأۡمُرُونَ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَيَنۡهَوۡنَ عَنِ ٱلۡمُنكَرِ [ سُورَةُ التَّوۡبَةِ: 71]       

“মুমিন নর ও মুমিন নারী একে অপরের বন্ধু, তারা সৎকাজের নির্দেশ দেয় এবং অসৎকাজের নিষেধ করে।” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৭১]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

 ﴿ٱلۡمُنَٰفِقُونَ وَٱلۡمُنَٰفِقَٰتُ بَعۡضُهُم مِّنۢ بَعۡضٖۚ يَأۡمُرُونَ بِٱلۡمُنكَرِ وَيَنۡهَوۡنَ عَنِ ٱلۡمَعۡرُوفِ [ سُورَةُ التَّوۡبَةِ:  67]

“মুনাফিক নর ও মুনাফিক নারী একে অপরের অনুরূপ, তারা অসৎকর্মের নির্দেশ দেয় এবং সৎকর্ম নিষেধ করে।” [সূরা আত-তাওবাহ: ৬৭]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

﴿وَتَوَاصَوۡاْ بِٱلۡحَقِّ وَتَوَاصَوۡاْ بِٱلصَّبۡرِ ٣ [ سُورَةُ العَصۡرِ:3[

“এবং যারা পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয় ও ধৈর্যের উপদেশ দেয়।” [সূরা আল-‘আসর, আয়াত: ৩]

আর সহীহ মুসলিমের মধ্যে তামীম ইবন আওস আদ-দারেমী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«الدِّينُ النَّصِيحَةُ » قُلْنَا لِمَنْ؟  قَالَ: «لِلَّهِ وَلِكِتَابِهِ وَلِرَسُولِهِ وَلأَئِمَّةِ الْمُسْلِمِينَ وَعَامَّتِهِمْ».

“দীন হচ্ছে (জনগণের) কল্যাণ কামনা করা। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, কার জন্য? তিনি বললেন: আল্লাহ, তাঁর কিতাব, তাঁর রাসূল, মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও সমস্ত মুসলিমের জন্য।”

মুসলিম, ঈমান অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: ‘দীন হচ্ছে কল্যাণ কামনা করা’ –এর বর্ণনা (باب بيان أن الدِّينُ النَّصِيحَةُ ), হাদীস নং ৫৫

ইমাম মুসলিম আবূ সাঈদ আল-খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ وَذَلِكَ أَضْعَفُ الإِيمَانِ»

“তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোনো অশ্লীল কাজ দেখে, সে যেন তা হাত দ্বারা প্রতিরোধ করে, আর যদি তাতে সে অক্ষম হয়, তবে সে যেন তার মুখ দ্বারা তার প্রতিবাদ করে; আর সে যদি তাতেও অক্ষম হয়, তবে সে যেন তার অন্তর দ্বারা তা প্রতিরোধের পরিকল্পনা করে; আর তা হচ্ছে ঈমানের দুর্বলতা।”()

ইমাম বুখারী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু আবদুল্লাহ ইবন ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর হাদীস থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

« بلغوا عني ولو آية »

“তোমরা আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত হলেও পৌঁছে দাও।”()

সহীহ মুসলিম, ঈমান অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: অন্যায় কাজের প্রতিবাদ করা ঈমানের অন্তর্ভুক্ত … (باب بَيَانِ كَوْنِ النَّهْىِ عَنِ الْمُنْكَرِ مِنَ الإِيمَانِ وَأَنَّ الإِيمَانَ يَزِيدُ وَيَنْقُصُ وَأَنَّ الأَمْرَ بِالْمَعْرُوفِ وَالنَّهْىَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَاجِبَانِ), বাব নং ২২, হাদীস নং ১৮৬ এই হাদীসের বিস্তারিত পর্যালোচনা দেখুন আমার কিতাবে: ‘দিরাসাতু হাদীসে আবি সা‘ঈদ আল-খুদরী রিওয়াতান ওয়া দিরায়াহ্ (دراسة حديث أبي سعيد الخدري رواية و دراية) বুখারী, অধ্যায়: নবীগণ (كتاب الأنبياء), পরিচ্ছেদ: বনী ইসরাঈল সম্পর্কে যা আলোচনা করা হয়েছে, সে প্রসেঙ্গ (باب ما ذكر عن بني إسرائيل), বাব নং ৫১, হাদীস নং ৩২৭৪।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,

«مثل القائم على حدود الله والواقع فيها كمثل قوم استهموا على سفينة فأصاب بعضهم أعلاها وبعضهم أسفلها فكان الذين في أسفلها إذا استقوا من الماء مروا على من فوقهم فقالوا لو أنا خرقنا في نصيبنا خرقا ولم نؤذ من فوقنا فإن يتركوهم وما أرادوا هلكوا جميعا وإن أخذوا على أيديهم نجوا ونجوا جميعا ».

“যে মহান আল্লাহর নির্ধারিত সীমার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং যে সীমালংঘন করে, তাদের দৃষ্টান্ত সেই যাত্রীদলের মত, যারা কুর‘আ (লটারি)র মাধ্যমে এক নৌযানে নিজেদের স্থান নির্ধারণ করে নিল। তাদের কেউ স্থান পেল ওপর তলায়, আর কেউ নিচ তলায় (পানির ব্যবস্থা ছিল ওপর তলায়); কাজেই নীচের তলার লোকেরা পানি সংগ্রহকালে ওপর তলার লোকদের ডিঙ্গিয়ে যেত। তখন নীচ তলার লোকেরা বলল, ওপর তলার লোকদের কষ্ট না দিয়ে আমরা যদি নিজেদের অংশে একটি ছিদ্র করে নেই (তবে  ভালো হত)। এমতাবস্থায় তারা যদি এদেরকে আপন মর্জির ওপর ছেড়ে দেয়, তাহলে সবাই ধ্বংস হয়ে যাবে। আর যদি তারা এদের হাত ধরে রাখে (বিরত রাখে), তবে তারা এবং এরা সকলেই রক্ষা পাবে।”

দাওয়াত ও সৎকাজের নির্দেশের ভাষ্যসমূহের ব্যাপারে জানার জন্য দেখুন: আবদুল গনী আল-মাকদেসী, কিতাবুল আমরি বিলমা‘রুফ (كتاب الأمر بالمعروف)। এই গ্রন্থটির ভূমিকা ও পর্যালোচনা আমার দ্বারা সম্পাদিত। সহীহ বুখারী, অধ্যায়: অংশীদারিত্ব (كتاب الشركة), পরিচ্ছেদ: লটারীর মাধ্যমে বণ্টন ও অংশ নির্ধারণ করা যাবে কি? (باب هل يقرع في القسمة والاستهام فيه), বাব নং ৬, হাদীস নং ২৩৬১।

তাছাড়া সেখানে অনেক উপযুক্ত ও যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে, যা নারীর ওপর এই দায়িত্ব ও কর্তব্য অর্পণ করে, আর যা নিরবিচ্ছন্নভাবে তার ও তার পরিবারের জন্য এ দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনকে বাধ্যতামূলক করে দেয়। সেসব যৌক্তিকতা হচ্ছে:

১. সমাজের সাথে নারীর সম্পর্ক:

আর এটা এমন সম্পর্ক, যা নারীকে সমাজের বিভিন্ন পক্ষের সাথে মজবুত সম্পর্ক তৈরির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে এবং তাকে আত্মীয়তার রূপ দান করে। সুতরাং নারী মা অথবা স্ত্রী অথবা কন্যা অথবা বোন অথবা খালা অথবা ফুফু … ইত্যাদি হওয়া থেকে মুক্ত নয়, বা তার বাইরের কেউ নয়; আবার তার মধ্যে যুক্ত হয় বৈবাহিক সূত্রে আত্মীয়তার সম্পর্ক, প্রতিবেশিত্ব, বন্ধুত্ব ও সতীর্থ। অনুরূপভাবে নারী হচ্ছে সমাজ ও জাতির অঙ্গ এবং তার উপাদানসমূহের মধ্য থেকে অন্যতম উপাদান, সমাজের সাথে এই ধরনের প্রতিটি সম্পর্কই নারীকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও কর্তব্যের অধিকারী বানিয়ে দেয়। আর আত্মীয়তা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা বড় অধিকার (হক) ও দায়িত্ব; আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَهَلۡ عَسَيۡتُمۡ إِن تَوَلَّيۡتُمۡ أَن تُفۡسِدُواْ فِي ٱلۡأَرۡضِ وَتُقَطِّعُوٓاْ أَرۡحَامَكُمۡ ٢٢[سُورَةُ مُحَمَّد:22[

“তবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে সম্ভবত তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে।” [সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত: ২২]

আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 

«من سره أن يبسط له في رزقه أو ينسأ له في أثره فليصل رحمه».

“যে ব্যক্তি পছন্দ করে যে, তার জীবিকার মধ্যে প্রবৃদ্ধি হউক অথবা তার মৃত্যুর পরে সুনাম থাকুক, তবে সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে চলে।”

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَأَنذِرۡ عَشِيرَتَكَ ٱلۡأَقۡرَبِينَ ٢١٤ [سُورَةُ الشُّعَرَاء:22[

“তোমার নিকট-আত্মীয়বর্গকে সতর্ক করে দাও।” [সূরা আশ-শু‘আরা, আয়াত: ২১৪]

আর প্রতিবেশীরও বড় রকমের হক তথা অধিকার রয়েছে; কেননা রাসূলুল্লা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيُكْرِمْ جَارَهُ وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ».

“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, সে যেন উত্তম কথা বলে অথবা চুপ থাকে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে সম্মান করে এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে।”

রাসূলুল্লা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«ما زال يوصيني جبريل بالجار حتى ظننت أنه سيورثه».

“আমাকে জিবরীল ‘আলাইহিস সালাম সব সময় প্রতিবেশী সম্পর্কে অসীয়ত করে থাকেন। এমনকি, আমার মনে হলো যে, তিনি অচিরেই প্রতিবেশীকে ওয়ারিস (উত্তরাধিকারী) বানিয়ে দেবেন।”

সহীহ বুখারী, অধ্যায়: ক্রয়-বিক্রয় (كتاب البيوع), পরিচ্ছেদ: যে ব্যক্তি জীবিকায় বৃদ্ধি কামনা করে (باب من أحب البسط في الرزق), বাব নং ১৩, হাদীস নং ১৯৬১; সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: সদ্ব্যবহার, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ও আচার-ব্যবহার (البر والصلة والآدب), পরিচ্ছেদ: আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা এবং তা বিচ্ছিন্ন করা হারাম হওয়া প্রসঙ্গে (ِ باب صلة الرحم وتحريم قطيعتها), বাব নং ৬, হাদীস নং ৬৬৮৭ , সহীহ বুখারী, অধ্যায়: শিষ্টাচার (كتاب الأدب), পরিচ্ছেদ: যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয় (باب من كان يؤمن بالله واليوم الآخر فلا يؤذ جاره), বাব নং ৩১, হাদীস নং ৫৬৭২; সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: ঈমান (الإيمان), পরিচ্ছেদ: প্রতিবেশী ও মেহমানকে সম্মান দানের ব্যাপারে উৎসাহ প্রদান এবং কল্যাণকর কথা ব্যতীত অন্যান্য ক্ষেত্রে চুপ থাকার আবশ্যকতা এবং এই সবগুলোই ঈমানের অন্তর্ভুক্ত হওয়া (ِ باب الْحَثِّ عَلَى إِكْرَامِ الْجَارِ وَالضَّيْفِ وَلُزُومِ الصَّمْتِ إِلاَّ مِنَ الْخَيْرِ وَكَوْنِ ذَلِكَ كُلِّهِ مِنَ الإِيمَانِ), বাব নং ২১, হাদীস নং ১৮২ সহীহ বুখারী, অধ্যায়: শিষ্টাচার (كتاب الأدب), পরিচ্ছেদ: প্রতিবেশীর জন্য অসীয়ত (باب الوصاءة بالجار), বাব নং ২৮, হাদীস নং ৫৬৬৮; সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: সদ্ব্যবহার, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ও আচার-ব্যবহার (البروالصلة والآدب), পরিচ্ছেদ: প্রতিবেশীর ব্যাপারে অসীয়ত ও তার প্রতি সদ্ব্যবহার (ِ باب الوصية بالجار والإحسان إليه), বাব নং ৪২, হাদীস নং ৬৮৫২।

আর বন্ধুর জন্য রয়েছে বন্ধুত্বের এবং সাধারণ ও বিশেষ ভ্রাতৃত্বের অধিকার।

আর প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির জন্য রয়েছে ইসলাম সম্পর্কিত অধিকার, যেমনিভাবে এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা এসেছে। আর অমুসলিমদের জন্য রয়েছে তাদেরকে এই দীন তথা জীবনব্যবস্থার দিকে দাওয়াত পাওয়ার অধিকার।

আর মুসলিম নারী হলেন এই সমাজের মধ্যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াশীল মহিলা এবং তার দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো এদের প্রত্যেককে তার মান অনুযায়ী মর্যাদাবান করে গড়ে তোলা।

২. মহিলাদের সাথে বিশেষ কিছু বিষয়ে এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গঠন সম্পর্কে বিশেষভাবে কথা বলার ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে নারীই অধিক উপযুক্ত। আরও উপযুক্ত এর ওপর ভিত্তি করে বিন্যস্থ ব্যক্তিগত ও সামাজিক বিষয়গুলোর ব্যাপারে কথা বলতে। সুতরাং এখানে পুরুষের পক্ষে কোনো বিষয় প্রচার করতে যা অসম্ভব, নারীর পক্ষে তা প্রচার কারা সহজেই সম্ভব।

৩. অনুরূপভাবে নারী সংস্কারের সকল ক্ষেত্রে তার স্বজাতীয় মেয়েদের সাথে মেলামেশার মাধ্যমে, তাদের আচার-আচরণের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের মাধ্যমে এবং তারা ভুল-ত্রুটিতে পতিত হলে তার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণের মাধ্যমে যথাযথ সংস্কার-পদ্ধতি প্রয়োগে সক্ষম। এ ক্ষেত্রে পুরুষের কার্যক্রম তার বিপরীত, যিনি নকল বা মাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল; আর যে স্বচক্ষে দেখে সে ঐ ব্যক্তির চেয়ে অগ্রগামী, যে শুধু শ্রবণ করে।

সামগ্রিকভাবে এই অধিকারের বিষয়টি আমার “দুরুসুন ফিল হুকুক” (دروس في الحقوق) নামক গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। সুতরাং তা অধ্যয়ন করা যেতে পারে।

৪. কল্যাণজনক ক্ষেত্রে এবং ইসলামের শিক্ষাসমূহের সমন্বয়সাধন, তার বিধাসমূহকে বাধ্যতামূলক দায়িত্বরূপে গ্রহণ এবং তার নিয়ম-পদ্ধতিসমূহের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকার ক্ষেত্রে তার আদর্শিক প্রভাবের পরিধি মানুষের কথার চেয়ে অনেক বেশি প্রভাবশালী। সুতরাং আহূত ব্যক্তিদের প্রাণের মধ্যে তার আদর্শের একটা বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে।

৫. মহিলাদের মধ্যে ব্যক্তিগত নসিহত ও ব্যক্তিগত দাওয়াতী কাজ যথাযথভাবে পরিচালনা করা পুরুষের পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করার জন্য তাদের মধ্য থেকে নারীকে ভূমিকা রাখতে হবে; কেননা নারীদের ওপর তাদের অপরিচিত পুরুষদের থেকে পর্দা করা ফরয।

৬. মুসলিম নারী সমাজের মধ্যে কোনো ব্যর্থ সদস্য নন; বরং তিনি হলেন প্রভাব-প্রতিপত্তির পাত্র। আর মুসলিম নারী হলেন আল্লাহর পথের আহ্বানকারিনী ও উপদেষ্টা। সুতরাং তার জন্য আবশ্যক কর্তব্য হলো, সে সমাজ বিনির্মাণ, সংশোধন ও পরিচালনার কাজে অংশগ্রহণ করবে; আরও অংশগ্রহণ করবে কল্যাণের পথে দাওয়াতী কার্যক্রমে।

৭. আদর্শ নারীগণ এ রকমই হয়েছেন; আর তাদের শীর্ষে রয়েছেন সম্মানিত মহিলা সাহাবীগণ, আর যারা সংস্কার, সংশোধন ও পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখেছেন, তাদের মধ্যে মুমিন-জননীগণ উল্লেখযোগ্য। সুতরাং তাদের মধ্যে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা উম্মতের জন্য কেননা রাসূলুল্লা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনেক হাদীস বর্ণনা করেছেন, তাঁর (রাসূলের) আবাসিক অবস্থার বিবরণ দিয়েছেন এবং সাহাবীদেরকে বিভিন্ন বিষয়ে সংশোধন করেন। আর তাদেরই আরেক জন হলেন যয়নব বিনতে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা মিসকীনদের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং তাঁর নিকট কোনো কিছুই অবশিষ্ট ছিল না; আর এইভাবে অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। সুতরাং ঐসব মর্যদাবান নারীগণ হলেন আদর্শ নমুনা ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।    

৮. নারী কেন্দ্রীক ইসলামের শত্রুগণের চেষ্টা ও সাধনা দুইভাবে হয়ে থাকে:

প্রথমত: তারা নারীর জাতিসত্বাকে ধ্বংস ও বিপর্যস্ত করার জন্য তাদেরকে কেন্দ্রীভূত করে।

দ্বিতীয়ত: নারীদেরকে ধ্বংস ও বিপথগামী করার পর ঐ নারীদেরকে অন্যান্য নারীদের ধ্বংস ও বিপথগামী করার কাজে ব্যবহার করা, আর কাফির ও ষড়যন্ত্রকারীদের বাস্তবতা এই কথারই সাক্ষ্য দেয়। সুতরাং নারীর আবশ্যকীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো এই বিপর্যয়ের পথ রুদ্ধ করার জন্য তার যথাযথ ভূমিকা পালন করা। মোটকথা, মেয়ে বা নারীজাতিকে সমাজ ও উম্মতের (জাতির) মধ্যে সংস্কারমূলক ভূমিকায় ব্যস্ত থাকতে হবে।

৯. মহান মর্যাদাপূর্ণ ও পর্যাপ্ত সাওয়াবের এই কাজে সে পুরুষের সহযোগিতা নেবে। কারণ,  ভালো কাজসমূহের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ ও মুস্তাহাব কর্মসমূহের মধ্যে সর্বোচ্চ মানের কর্ম হলো সমাজের কল্যাণে সংস্কারমূলক কাজ ও দাওয়াতী কার্যক্রম প্রতিষ্ঠা করা, যেমন অচিরেই সেই ব্যাপারে বিস্তারিত বিবরণ আসছে।

৩. এই দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রয়োজনীয় বিষয়াদি:

সংস্কারের ক্ষেত্রে ব্যাপক দায়-দায়িত্বের ব্যাপারে পূর্বে যে আলোচনা হয়েছে, তার সাথে প্রয়োজনীয় বিষয়াদি নিম্নরূপে নির্ধারণ করা যায়:

(ক) আত্মীয়-স্বজন পক্ষ: নিকটতম ও দূরতম আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে নারী নিম্নলিখিতভাবে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে পারে: 

  • তাদের অধিকারসমূহ আদায় করা।
  • তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ, চুল প্রদর্শন ও কথাবার্তা বলার ক্ষেত্রে প্রকাশভঙ্গির শর‘ঈ দিক পর্যবেক্ষণ করা।
  • সময়ে সময়ে তাদের সাথে কথাবার্তা বলা, তাদের অবস্থাদি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা, বিশেষ করে তাদের মধ্যে যার কোনো বিশেষ সমস্যা রয়েছে। যেমন, রোগী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা এবং তার জন্য দো‘আ করা।
  • তাদের সমাবেশেকে  ভালো কথা ও উত্তম উপদেশ দ্বারা ফলপ্রসূ করা। এই ক্ষেত্রে উত্তম হলো তাদেরকে উপদেশ দেওয়া, তাদের নিকট উপকারী বক্তব্য পেশ করা অথবা তাদেরকে প্রচলিত ভুলত্রুটি ও অন্যায়-অপরাধ সম্পর্কে সতর্ক করা অথবা তাদের জন্য মহিলা দা‘ঈকে মেহমান হিসেবে আনা অথবা বিভিন্ন বয়স অনুযায়ী তাদের মধ্যে সাধারণ প্রতিযোগিতা পরিচালনা করা অথবা তাদেরকে উপকারী ক্যাসেট-অডিও ইত্যাদি শুনানোর ব্যবস্থা করা অথবা উপকারী কিচ্ছা-কাহিনী আলোচনা করা এবং ইত্যাদি।
  • বিভিন্ন উপলক্ষকে কেন্দ্র করে উপহার সামগ্রী বিতরণ করা, তা অল্প দামের হউক না কেন। কারণ, উপহার উপঢৌকন মানব মনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। তা সকল প্রকার বিদ্বেষ দূর করে, অন্তরের কলুষতা ও অপবিত্রতাকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে দেয়, মন থেকে বিদ্বেষ ও শত্রুতাকে আস্তে আস্তে বের করে দেয়; সম্পর্ককে নির্ভেজাল করে, সকল প্রকার হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে এবং মানুষের একে অপরকে কাছাকাছি করে।
  • তাদের দরিদ্রদেরকে (ফকীরকে) সহযোগিতা করা, মিসকীন তথা নিঃস্বদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, বিধবাদেরকে সাহায্য করা এবং তাদের অভাবীদের অভাব নিবারণ করা।
  • আরও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাদের অসুস্থকে সেবা করা, তাকে সান্তনা দেওয়া এবং তার সামনে শুভ সঙ্কেত মেলে ধরা, আর অনুরূপভাবে মৃত্যু ও অন্যান্য কারণে তাদের বিপদগ্রস্তকে সাহায্য-সহযোগিতা করা এবং তার জন্য দো‘আ করা, আর তারা যে কোনো প্রয়োজনের মুখোমুখি হলে, সে ক্ষেত্র তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া।  
  • যৌথভাবে দাওয়াতীমূলক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নেওয়া। যেমন, নিঃস্বদেরকে সহযোগিতার জন্য অনুদান সংগ্রহ করা অথবা বইপত্র ক্রয় করে বিতরণ প্রভৃতি।

(খ) প্রতিবেশীদের পক্ষ: আর প্রতিবেশীদের ক্ষেত্র্রে তাদের দাওয়াতী কার্যক্রমের মধ্যে যা অন্তর্ভুক্ত, তা নিম্নরূপ:

  • তাদের শরী‘আহ ভিত্তিক অধিকারসমূহ আদায় করা।
  • প্রতিবেশী সকল নারীর ব্যাপারে জানা এবং পৃথকভাবে নিকট ও সাংস্কৃতিক দিক বিবেচনা করে প্রত্যেক প্রতিবেশীর সাথে আচরণ করা।

সে নিজে যে খাবার খায়, তার থেকে তাদেরকে খাওয়াবে। বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীকে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে সে তার প্রতিবেশীদেরকে খাবার দান করে, যদিও তা ছাগলের খুর হউক; আর তার ঝোল থেকে তাকে কিছু দান করতে বলেছেন। 

হাদীসে আছে, আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বলেন, «يَا نِسَاءَ الْمُسْلِمَاتِ لاَ تَحْقِرَنَّ جَارَةٌ لِجَارَتِهَا وَلَوْ فِرْسِنَ شَاةٍ » “হে মুসলিম নারীগণ! কোন মহিলা প্রতিবেশিনী যেন তার অপর মহিলা প্রতিবেশিনী (প্রদত্ত হাদিয়াকে) তুচ্ছ মনে না করে, এমনকি তা স্বল্প গোশত বিশিষ্ট বকরীর হাঁড় অথবা বকরীর খুর হলেও”। সহীহ বুখারী, অধ্যায়: হেবা ও তার ফযীলত (كتاب الهبة وفضلها), পরিচ্ছেদ: হেবার ফযীলত ও তার প্রতি উৎসাহ প্রদান (باب فضلها والتحريض عليها), হাদীস নং ২৪২৭; সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: যাকাত (الزكاة), পরিচ্ছেদ: পরিমাণ অল্প হলেও তা থেকে সাদকা দেওয়ার উৎসাহ দান এবং অল্প পরিমাণ দান তুচ্ছ মনে করে বিরত না থাকা (باب الْحَثِّ عَلَى الصَّدَقَةِ وَلَوْ بِالْقَلِيلِ وَلاَ تُمْتَنَعُ مِنَ الْقَلِيلِ لاِحْتِقَارِهِ) বাব নং ৩০, হাদীস নং ২৪২৬; অপর এক হাদীসে আছে, আবূ যর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «يَا أَبَا ذَرٍّ إِذَا طَبَخْتَ مَرَقَةً فَأَكْثِرْ مَاءَهَا وَتَعَاهَدْ جِيرَانَكَ». “হে আবূ যর! যখন তুমি ঝোলবিশিষ্ট তরকারি রান্না করবে, তবে তার পানি বাড়িয়ে দাও এবং তোমার প্রতিবেশীদেরকে শামিল করে নাও”। সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: সদ্ব্যবহার, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ও আচার-ব্যবহার (البروالصلة والآدب), পরিচ্ছেদ: প্রতিবেশীর ব্যাপারে অসীয়ত ও তার প্রতি সদ্ব্যবহার (ِ باب الوصية بالجار والإحسان إليه ), বাব নং ৪২, হাদীস নং ৬৮৫৫।

  • সময়ে সময়ে তাদের সাথে সাক্ষাৎ করা এবং এই সাক্ষাতকে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ফলপ্রসূ করা (আত্মীয়-স্বজনদের সাথে আচরণে যেমনটি বলা হয়েছে
  • তাদেরকে কথা অথবা কাজের মাধ্যমে কোনো প্রকার কষ্ট না দেওয়া।
  • সময়ে সময়ে তাদেরকে ফোন করা এবং তাদের অবস্থাদি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা।
  • উপদেশ চাওয়ার সময়ে অথবা শর‘ঈ কোনো বিষয় দৃষ্টিগোচর হলে উপদেশ দেওয়া।

(গ) নারীদের সমাবেশে: নারীকে সামাজিক জীবনে বহু সমাবেশে হাজির থাকতে হয়- কখনও আবশ্যকভাবে, আবার কখনও ঐচ্ছিকভাবে। উভয় প্রকার সমাবেশেই নারীর ওপর দাওয়াতী দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে।

তন্মধ্যে আবশ্যিক সমাবেশসমূহে, উদাহরণস্বরূপ বলা যায়: মানুষ এই জীবনের মধ্যে বিভিন্ন প্রকার রোগ-ব্যাধি ও বিপদ-মুসিবতের মুখোমুখি হয়, অতঃপর সে সঠিক কারণ উদ্ঘাটন করে চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের নিকট গমন করে। সুতরাং যখন কোনো নারী ডাক্তারের নিকট গমন করে, তখন সে মহিলা ডাক্তারের নিকট প্রবেশের অপেক্ষায় থাকে। অতএব, তার সাথে একত্রিত হয় অপেক্ষমান মহিলাদের কেউ কেউ, আর এটা জানা কথা যে, পুরুষদের চেয়ে নারীরাই অধিক সামাজিক। সুতরাং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা তাদের কারও কারও সাথে আলাপ-আলোচনা ও কথাবার্তায় মেতে উঠে। সুতরাং তিনিই হলেন সৌভাগবান নারী, যিনি এই সমাবেশটিকে ব্যবহার করেন নিম্নরূপ কাজে:

  • উপহারস্বরূপ দেওয়ার জন্য কিছু বাছাই করা বইপত্র ও ক্যাসেট/সিডি সঙ্গে রাখা। অতঃপর তার সাথে অপেক্ষমান নারীকে তা উপহার দেবে, বিশেষ করে ঐ সিডিটি উপহার হিসেবে দিলেই  ভালো হবে, যখন সিডিটি রোগীর অবস্থাদি সম্পর্কে এবং শরী‘আতের বিধিবিধান ও অন্যান্য বিষয়ে (রোগীর জন্য) যেসব করণীয় নিয়ে আলোচনা করে।
  • মহিলা ডাক্তার ও রোগীদের সাথে তার ঘটে যাওয়া ঘটনাকে কাহিনী আকারে আলোচনা করা এবং তার থেকে উপকারী বিষয়গুলোকে শিক্ষা হিসেবে পেশ করা।
  • বিভিন্ন রোগ-বালাইর অবস্থা আলোচনা করা। আর এভাবেই সে উপস্থিত মহিলাদের মধ্যে আনন্দের উদ্রেক করতে পারবে এবং সেখান থেকে সে তার অর্থবহ কাঙ্খিত কথাবার্তা নিয়ে তাদের মধ্যে প্রবেশ করবে।
  • ভাল  ভালো ইসলামী পত্রপত্রিকা ও ম্যাগাজিন সঙ্গে রাখবে সেগুলোর পরিচিতি তুলে ধরার জন্য এবং তার ইতিবাচক দিকগুলো এবং তার মধ্যে যেসব উপকারী বিষয় রয়েছে, তা আলোচনা করা।
  • যখন সে এমন কোনো অবস্থা বা অবস্থান লক্ষ্য করবে, যা উপদেশ দাবি করে, তখন সরাসরি নসীহত করা।
  • আর ঐচ্ছিক সমাবেশে, উদাহরণস্বরূপ মহিলাদের ‘হিফজুল কুরআনুল কারীম’ কোর্সে উপস্থিত হওয়া। আর তার এই উপস্থিতি হয় সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে অথবা উপকৃত হওয়ার জন্য ছাত্রী হিসেবে অথবা উৎসাহদানকারিনী দর্শক হিসেবে অথবা অন্যান্য কোনো উদ্দেশ্যে। আর সকল পরিবেশ-পরিস্থিতিতে উচিৎ কাজ হলো, সে তার উপস্থিতির সুবর্ণ সুযোগটি সঠিকভাবে কাজে লাগাবে। সুতরাং সে যদি শিক্ষকা বা ছাত্রী হয়, তবে তাদের পাঠ্যক্রম (সিলেবাস) সম্পর্কে কথাবার্তা বলবে ও এর বিস্তারিত আলোচনায় আসবে; আর সে যদি দা‘ঈ তথা আল্লাহর পথে আহ্বানকারিনী হয়, তবে এই ক্ষেত্রে তার দাওয়াতী দায়িত্ব প্রতিষ্ঠা করবে। আর সে যদি উৎসাহদানকারিনী দর্শক হয়, তবে সে পরিচালক, ব্যবস্থাপক ও শিক্ষিকাদেরকে উৎসাহ দেওয়ার ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করবে এবং তাদের জন্য দো‘আ করবে। কারণ, তাদের মহৎ কাজ অব্যাহত রাখা এবং এই ক্ষেত্রে তাদের মানকে সমুন্নত করার ব্যাপারে এটা একটা বড় ধরনের উদ্দীপক।

অনুরূপভাবে সে সমস্ত হিফজ প্রতিষ্ঠানসমূহে আর্থিকভাবে সামর্থ্য অনুযায়ী যথাসম্ভব সাহায্য ও সহযোগিতা করা, যদিও তা সামান্য বস্তু হউক। কেননা কম কম করেই বেশি হয়, আর ফোটাগুলো একত্রিত হয়ে সৃষ্টি হয় বন্যার। আর যখন তারা তার নিকট কিছু জানতে বা পেতে চাইবে, তার পক্ষ থেকে সহযোগিতার কথা জানাবে এবং বলবে যে এ ব্যাপারে (সহযোগিতা করার জন্য) শুধু তার সাথে ফোনে কথা বললেই হবে।  

আর এই সবই কল্যাণের দিকে আহ্বান এবং পুণ্য ও তাকওয়ার কাজে পারস্পরিক সহযোগিতার অন্যতম প্রধান মাধ্যম।

আর এই দুই প্রকারের সমাবেশের দাওয়াতকে অন্য সব ধরনের নারী সমাবেশের জন্য মডেল হিসেবে গ্রহণ করা যাবে।

(ঘ) ক্লাবসমূহ এবং সেগুলোর প্রতি মুসলিম নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্য: আমরা যেই যুগে বসবাস করছি, তার অন্যতম দৃশ্য হলো বহু রকমের সাংস্কৃতির সাথে পরিচিত হওয়া, সাথে সাথে রয়েছে বহু সভা-সেমিনার, উৎসব-অনুষ্ঠান এবং এগুলোর মত করে আরও অন্যান্য বিবিধ নামের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

আর ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীগণ ও তাদের অনুরূপ মতাদর্শের ব্যক্তিবর্গ যা নিয়ে অগ্রসর হয়েছে, তন্মধ্যে অন্যতম হলো তাদের নারী সমাজকে এসব ক্লাব বা সংঘের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করা এবং তাদের বিকৃত চিন্তাধারার মাধ্যমে সেগুলোর সুবিধা ভোগ করা। আর মুসলিম সংস্কৃতিমনা রক্ষণশীল আল্লাহর দীনের আহ্বায়ক নারী সমাজের এসব ক্লাবে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের সময় হয়েছে। সুতরাং তারা এগুলোকে নিম্নলিখিতরূপে ব্যবহার করবে:

  • মৌলিকত্ব সহকারে সে সব সভা-সমিতিতে কার্যকরভাবে অংশগ্রহণ করা, যাতে সে সেখানে তার দ্বীন তথা আকীদা ও  শরী‘আত, চরিত্র ও চাল-চলনে যে নির্দেশনা দেয় সেটা সেখানে স্পষ্টভাবে তুলে ধরবে। আর সকল প্রকার অনিষ্টতা ও খারাপী থেকে সতর্ক করবে।
  • সেমিনারসমূহে নিজের মতামত পেশ করার মাধ্যমে কল্যাণকর কাজে উৎসাহিত করা অথবা অপকর্ম থেকে সতর্ক করা।
  • শরী‘আতের দলীল-প্রমাণ ও বাস্তবভিত্তিক প্রমাণাদির মাধ্যমে সাহসিকতা ও সচেতনতার সাথে বাতিল যুক্তি-প্রমাণাদির বিরুদ্ধে সোচ্ছার থাকা।
  • ইসলামের বাস্তব ও কার্যকর চিত্র তুলে ধরা; ফলে তা উপস্থিত লোকদের মধ্যে মুসলিম নারী তার বাহ্যিক ও আভ্যন্তরিণ গঠনে কেমন হওয়া আবশ্যক তার আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হবে।
  • সততা ও কল্যাণের অনুসারীদের সংখ্যাধিক্যকে আরও বৃদ্ধি করার মানসে এ সব সভা-সমিতিতে উপস্থিত হওয়া।
  • উপস্থিত সকল নারীর সাথে উত্তম আচার-আচরণের মাধ্যমে কাজ করা, চাই তারা উত্তম চরিত্রের অধিকারিনী হউক অথবা তারা পাপাচারিণী বা বিকৃত মানসিকতা সম্পন্না হউক। কেননা কথার চেয়ে চরিত্র ও নৈতিকতার প্রভাব অনেক বেশি; আর মুসলিম নারী তো পারস্পরিক উত্তম আচার-আচরণের জন্য আদিষ্ট।
  • এসব ক্লাবের মধ্যে যে সকল অসামাজিক ও খারাপ কাজ হয়ে থাকে সেগুলোর পরিসংখ্যান নেয়া এবং এ গুলো যাতে প্রসার লাভ করতে না পারে ও এগুলোর প্রভাব যাতে সীমাবদ্ধ করা যায় এ ব্যাপারে সহযোগিতার জন্য যথাযোগ্য কর্তৃপক্ষের গোচরীভূত করা।  

(ঙ) কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব: এই যুগে নারীরা পুরুষের সাথে অনেক বিষয়ে অংশগ্রহণ করে থাকে, এখানে রয়েছে নারীদের অনেক কর্মক্ষেত্র। নারীরা এর এক বিরাট অংশ দখল করে আছে। সুতরাং তারা বিভিন্ন ময়দানে প্রবেশ করেছে; আমি এসব ময়দানের দু’টি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করছি, বাকি ময়দান বা ক্ষেত্রসমূহকে এই দু’টি দৃষ্টান্তের ওপর অনুমান করা হবে:

প্রথম দৃষ্টান্ত: শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দান।

একজন শিক্ষিকাকে তার মিশন সম্পাদন এবং দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে যে সকল উপদেশ দেওয়া যায় তা হচ্ছে,

  • তাকে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মত দায়িত্ব ও কর্তব্যের মহত্ব ও গভীরতা অনুধাবন করতে হবে, আর তাকে বুঝতে হবে যে, তার ওপর অনেক বড় দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। আর এসব ছোট অথবা বড় নারীদের বিবেক-বুদ্ধি তার প্রভাবের অধীন। আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাকে এই দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন। কারণ, তিনি যাকে দায়িত্বের জন্য মনোনীত করেছেন, এমন প্রত্যেক দায়িত্বশীলকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। আর শিক্ষার কাজটি খুবই মহৎ ও মহান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তার মহত্ব প্রকাশ পায় এই কাজটি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হওয়ার কারণে। সুতরাং শিক্ষিকা নবুওয়তের উত্তরাধিকারের দায়িত্ব বহন করেছেন; আর তিনি হলেন আয়েশা ও ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা’র প্রতিনিধি এবং তিনি মহান প্রশিক্ষিকা, মায়ের দায়িত্ব অথবা তার চেয়ে অনেক বড় দায়িত্ব পালন করেন, আর এটা এই জন্য যে, তার ছাত্রীদের ওপর তার একটা বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে। আর তিনি হলেন নির্দেশক ও পথপ্রদর্শক, তার নির্দেশনা ও পথপ্রদর্শন শ্রোতাদের পক্ষ থেকে গ্রহণীয় হয়ে থাকে। শিক্ষক ও শিক্ষিকার গুরুত্ব চিত্রিত করার ক্ষেত্রে সেই উক্তিটিই যথেষ্ট, যা কবি আহমাদ শাওকী ছন্দাকারে বলেন,

قم للمعلم وفِّه التبجيلا كاد المعلِّم أن يكون رسولاً

শিক্ষকের জন্য দাঁড়াও, শিক্ষককে কর সম্মান

শিক্ষকের ভূমিকা তো প্রায় রাসূলের সমমান

আর তাই তার ওপর ন্যাস্ত হয়ে পড়ে বড় মিশন ও ভারী দায়িত্ব, যা পালন করা তার ওপর আবশ্যক। আর এই দায়িত্বানুভূতির সূচনা হলো এর গুরুত্ব উপলব্ধি করা।

  • তার মূল কাজটিকে সুন্দরভাবে সম্পন্ন করা, যার ওপর সে বেতন নিচ্ছে এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ অর্জন করছে। অতঃপর তার দায়িত্ব হলো তার দারস বা পাঠ প্রস্তুত করা, তার পরিকল্পনা করা, ছাত্রীদের মাঝে তা পেশ করা এবং এই বিষয়ে আবশ্যকীয় উপায়-উপকরণ ও সরাঞ্জামাদি সংগ্রহের কাজে চেষ্টাসাধনা করা। কারণ, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তোমাদের কাউকে তখন  ভালোবাসেন, যখন সে কাজটি করে তার আস্থা, বিশ্বাস ও আন্তরিকতার সাথে।
  • তিনি হবেন তার প্রকাশ্যরূপে, কথাবার্তায়, সার্বিক তৎপরতায় ও নৈতিক চরিত্রের ক্ষেত্রে ছাত্রীদের কাছে আদর্শ নমুনা; কেননা আমরা পূর্বেই বর্ণনা করেছি যে, কর্মের প্রভাব কথার প্রভাবের চেয়ে অনেক বেশি ফলপ্রসূ। বিশেষ করে ছাত্রীরা সাধারণত: তার শিক্ষিকার সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে থাকে, তাকে মডেল (আদর্শ) হিসেবে গ্রহণ করে থাকে, এমনকি তারা সার্বিক কর্মতৎপরতা, পোষাক-পরিচ্ছদ এবং চেহারা-ছবিতেও শিক্ষিকার অনুসরণ করে থাকে। সুতরাং সম্মানিত শিক্ষিকার জেনে রাখা উচিৎ যে, তার প্রতিটি কর্মতৎপরতা, কথা, কাজ ও পোশাক-পরিচ্ছদ হলো তার ছাত্রীদের দৃষ্টির ক্ষেত্র এবং শিক্ষণীয় বিষয়। সুতরাং তা  ভালো হলে, তারাও  ভালো হবে আর মন্দ হলে তারাও মন্দ হবে, আর সৌভাগ্যবান বা আদর্শ শিক্ষিকা তিনিই হবেন, যিনি এই কাজের জন্য যথাযথ হিসাব-নিকাশ করেন এবং তার যথাযথ মূল্যায়ন করেন, যাতে করে তার কর্মকাণ্ড হয় প্রভাব বিস্তারকারী, যেমন প্রভাব বিস্তারকারী হয় তার কথাবার্তা; আর এতে করে সে কথা ও কাজ উভয়টির মাধ্যমেই প্রতিদান ও সাওয়াব প্রাপ্ত হতে পারে। আল্লাহ তা‘আলার কাছে দো‘আ করছি, তিনি যেন এক্ষেত্রে শিক্ষিকাদের আগ্রহকে বাড়িয়ে দেন।
  • ছাত্রীদেরকে তার বান্ধবী হিসাবে বিবেচনা করা, বিশেষ করে তারা যখন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের মত উপরের শ্রেণির ছাত্রী হবে, তবে তারা যখন প্রাথমিক স্তরের এবং তার পূর্বের স্তরের হবে, তখন শিক্ষিকা নিজেকে ঐসব মেয়েদের মা বলে বিবেচনা করবেন, যাদেরকে তাদের পরিবারের লোকজন তার দায়িত্বে অর্পণ করেছেন। আর পূর্বে আলোচনা হয়ে গেছে যে, মায়ের কর্মকাণ্ড কেমন হবে? আর যখনই তিনি এই বিরাট অর্থ ও তাৎপর্য অনুধাবন করবেন, তখনই তার প্রভাব ও প্রতিপত্তি অনেক বড় ও মহান হবে।
  • ছাত্রীদের সাথে আচার ব্যবহারের ক্ষেত্রে সর্বোত্তম আচার-আচরণ ও লেনদেনের পরিচয় দেওয়া এবং তাদের সাথে এর দ্বারা সুন্দরভাবে মেলামেশা করা। কারণ, আচার-আচরণ ও লেনদেনের প্রভাব খুব বেশি। সুতরাং তিনি তাদের ওপর গর্ব, বড়ত্ব ও অহংকার প্রকাশ করবেন না। তার দায়িত্ব হলো, তিনি অধ্যবসায়ী ছাত্রীকে অনুপ্রাণিত করবেন, ছোট ও দুর্বল ছাত্রীদেরকে আদর-স্নেহ করবেন, ছাত্রীদের সমস্যাগুলো সমাধান করবেন এবং তাদের আবাসিক ও ব্যক্তিগত অবস্থাদির প্রতি সদয় দৃষ্টি দেবেন, আর তাদের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সামাজিক অথবা মানসিক সমস্যা এবং মাসিক শুরু জনিত পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত হওয়া ও তার যথাযথ সমাধান পেশ করা।
  • সিলেবাস বহির্ভূত কর্মতৎপরতায় অংশগ্রহণ করা, যার মাধ্যমে তিনি অত্যন্ত কাছে থেকে ছাত্রীদের সম্পর্কে জানতে পারবেন এবং উপলব্ধি করতে পারবেন তাদের প্রবৃত্তি ও শক্তি-সামর্থ্যের ব্যাপারে। ফলে এর সাহায্যে তিনি তাদেরকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করতে পারবেন।

তার হৃদয়কে ছাত্রীদের জন্য এমনভাবে উন্মুক্ত করে দেওয়া, যাতে তাদের আবাসিক সমস্যাসমূহ এবং তাদের ঘরের মধ্যে তারা যে সমস্ত সমস্যার মুখোমুখি হয়ে থাকে সেগুলো সম্পর্কে তিনি অবহিত হতে পারেন। বিশেষ করে ঐসব ছাত্রীদের ব্যাপারে অবহিত হতে পারেন, যাদের ব্যাপারে তাদের পরিবারের লোকজন অমনোযোগী এবং তারা  ভালোভাবে তাদের খোঁজখবর রাখে না। সুতরাং এখানে ঐসব ছাত্রীদের নিকট প্রবেশ করে তাদেরকে উপদেশ দেওয়া এবং সঠিক হেদায়াত তথা দিক নির্দেশনা প্রদান করা, একজন সত্যিকারের কল্যাণকামী শিক্ষিকা হিসেবে তার বৃহৎ দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। আর তার মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা একটি মেয়েকে হেদায়েত করাটা তারা জন্য একটি লালবর্ণের উটের মালিক হওয়া অপেক্ষা অনেক বেশি উত্তম, যেমনটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিশুদ্ধ হাদীসের মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে। 

সুতরাং হাদীসের মধ্যে এসেছে, সাহল ইবন সা‘দ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:«فوالله لأن يهدي الله رجلا بك خير لك من أن يكون لك حمر النعم» “আল্লাহর কসম! আল্লাহ তা‘আলা যদি তোমার মাধ্যমে এক ব্যক্তিকে হিদায়াত দান করেন, তবে তা তোমার জন্য লালবর্ণের উটের মালিক হওয়া অপেক্ষা উত্তম”। সহীহ বুখারী, অধ্যায়: জিহাদ ও যুদ্ধ জীবন (كتاب الجهاد والسير), পরিচ্ছেদ: যার হাতে কোন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেছে, তার ফযীলত (باب فضل من أسلم على يديه رجل), বাব নং ১৪১, হাদীস নং ২৮৪৭; সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: সাহাবীদের ফযীলত ( فضائل الصحابة), পরিচ্ছেদ: আলী ইবন আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’র ফযীলত থেকে (باب مِنْ فَضَائِلِ عَلِىِّ بْنِ أَبِى طَالِبٍ رضى الله عنه), বাব নং ৪, হাদীস নং ৬৩৭৬।

  • পাঠসূচীর প্রত্যেক জ্ঞানের বিষয় পাঠ দানের সময় সেটার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষনে  ভালো কাজ ও উন্নত ইসলামী চরিত্রের বিষয়ের প্রতি দিক-নির্দেশনা প্রদান; বিশেষ করে শরী‘আতের বিষয়, আরবি বিষয় ও সামাজিক বিষয়গুলোর পা‍ঠ্যক্রম। এমনকি অন্যান্য শিক্ষার পাঠ্যক্রমেও আবশ্যক হলো অনুরূপ কল্যাণ ও সম্মানজনক শিক্ষণীয় বিষয়গুলোর দিকনির্দেশনা মুক্ত না হওয়া। এই দিকনির্দেশনা পেশ করা শুধু শরী‘আতের বিষয়সমূহের পাঠদানকারিনী শিক্ষিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। নিঃসন্দেহে ছাত্রীদেরকে (পড়ানোর সময় পাঠের ভিতর থেকে) যাবতীয় কল্যাণ ও উত্তম চরিত্রের শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে শর‘ঈ বিষয়ের পাঠদানকারিনীর কর্তব্য অনেক বড়; কিন্তু এর অর্থ এ নয় যে, অপরাপর শিক্ষিকাগণ দায়িত্বশূন্য থাকবেন। 

আর আমি এখানে কীভাবে এ সুযোগের সদ্ব্যাবহার করা যাবে তার কিছু দৃষ্টান্ত পেশ করছি:

  • আল-কুরআনুল কারীমের শিক্ষিকা কর্তৃক ছাত্রীদেরকে সূরা আল-ক্বারি‘আর পাঠদান। আর এটা জানা কথা যে, সূরা আল-ক্বারি‘আ কিয়ামতের দিন ও তার মহাপ্রস্তুতি ও আয়োজন নিয়ে আলোচনা করেছে, যেমন, পৃথিবী ও পাহাড়সমূহের অবস্থার পরিবর্তন থেকে শুরু করে মানুষের জান্নাত অথবা জাহান্নামে অবস্থান করা এসবই এ সূরায় রয়েছে। সুতরাং এই অর্থ বা তাৎপর্য বর্ণনার পর তার জন্য সম্ভব হবে কতগুলো প্রশ্নের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করা। যেমন, কীভাবে আমরা জান্নাতের অধিবাসী হব? জাহান্নামে প্রবেশের কারণগুলো কী কী? আর ছাত্রীদেরকে জবাব দেওয়ার পর তিনি মুমিনদের গুণাবলী ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করবেন। আরও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করবেন কাফির ও মুনাফিকদের গুণাবলী এবং এরূপভাবে … অতঃপর এসব গুণাবলীকে মানুষের বাস্তবতার সাথে মিল করে দেখাবেন এবং মানব জীবনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক স্থানগুলো বর্ণনা করবেন।
  • অপর একটি দৃষ্টান্ত হলো: শিক্ষিকা ফিকহ শাস্ত্রের পাঠদান করবেন। তিনি শিক্ষা দেবেন হায়েয (মাসিক ঋতুস্রাব) ও নিফাস (সন্তান প্রসবকালীন স্রাব) সম্পর্কে। সুতরাং প্রস্তাবিত জ্ঞানগত বিষয়টি বর্ণনার পর তিনি যথাযোগ্য নির্দেশনার মধ্যে প্রবেশ করবেন। অতঃপর তিনি ছাত্রীদেরকে লক্ষ্য করে স্পষ্টভাবে বলবেন যে, নিশ্চয় এই হায়েযের নিয়মটি পুরুষদেরকে বাদ দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা নারীদের জন্য নির্দিষ্ট করেছেন; আর এ জন্যই নারীর স্বভাব পুরুষের স্বভাব থেকে ভিন্ন রকম হয়ে থাকে এবং তিনি স্বভাবের ভিন্নতার কিছু দিক উল্লেখ করবেন… শেষ পর্যন্ত তিনি উল্লেখ করবেন যে, নিশ্চয় নারীর জন্য এমন কতগুলো বিধান রয়েছে, যা আল্লাহ তা‘আলা পুরুষদেরকে বাদ দিয়ে নারীর সাথে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন; তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: হিজাব (পর্দা), পুরুষের স্থান থেকে দূরে থাকা… ইত্যাদি।
  • তৃতীয় দৃষ্টান্ত: শিক্ষিকা ব্যাকরণগত নিয়মাবলী মুবতাদা (উদ্দেশ্য) ও খবর (বিধেয়) শিক্ষা দেবেন। আর এখানে শিক্ষিকার জন্য সুন্দর হবে এমন কিছু যথাযথ উদাহরণ পেশ করা, যা ছাত্রীদের মধ্যে কল্যাণকর কিছু গুণাগুণ তৈরিতে সহায়ক হবে। যেমন উদাহরণস্বরূপ তিনি নিম্নোক্ত বাক্যগুলো নিয়ে আসতে পারেন: هند حفظت كتاب الله (হিন্দা আল্লাহর কিতাব মুখস্ত করেছে), فاطمة مجدة في دروسها (ফাতিমা তার পাঠে অধ্যবসায়ী), زينب ذكية فطنة (যয়নব মেধাবীনী, বুদ্ধিমতী) ইত্যাদি।   

দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত: প্রশাসনিক মহিলা কর্মকর্তা, চাই তিনি কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা অথবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের; আর অনুরূপভাবে রোগীর সেবক, ডাক্তার ও অন্যান্য স্বাস্থ্য বিষয়ক মহিলা কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণ; আর তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য নিম্নরূপ:

  • তাদেরকে অনুধাবন করতে হবে যে, নিশ্চয় এই কাজটি তাদের ওপর আবশ্যক, এই ব্যাপারে তারা আমানতদার, এর ওপর তারা একটা নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করেন এবং অচিরেই তাদেরকে সেই ব্যাপারে হিসাবের মুখোমুখি হতে হবে। সুতরাং তাদের ওপর আবশ্যক হলো, তারা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্বটি সুন্দরভাবে পালন করবেন। অতএব, তারা কোনো এক শহর বা ভূ-খণ্ডের সীমানা পাহারার দায়িত্বে নিয়োজিত। সুতরাং তাতে কোনো প্রকার অবহেলা তাদের জন্য বৈধ হবে না।
  • তাদের আত্মপ্রকাশ হবে ইসলামী বেশভূষার মাধ্যমে, যাদেরকে তাদের বান্ধবী অথবা ছাত্রীরাসহ অপরাপর নারীদের জন্য আদর্শ নমুনা হিসেবে পেশ করা যায়, যদি তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অথবা হাসপাতালের মহিলা কর্মকর্তা-কর্মচারী হন অথবা যদি হন নার্স বা সেবিকা অথবা মহিলা ডাক্তার অথবা অনুরূপ কেউ। আর তাদের জেনে রাখা উচিৎ, তাদের এই বাহ্যিক রূপ, যা নিয়ে তারা অপরাপর মহিলাদের সামনে আত্মপ্রকাশ করবেন, তারা জেনে বা না জেনে এর মাধ্যমে তাদের মাঝে ইতিবাচক অথবা নেতিবাচকভাবে প্রভাব ফেলবেন।  
  • নিজের পেশা ও চাকুরিকে অপরের সেবা, তাদের কল্যাণ কামনা এবং তাদেরকে কল্যাণকর ও মর্যাদাপূর্ণ কাজের দিকে পরিচালিত করা ও যাবতীয় অপকর্ম থেকে দূরে সরিয়ে রাখার কাজে সঠিকভাবে কাজে লাগানো; বিশেষ করে যখন তিনি হবেন রোগীর সেবিকা ও ডাক্তার কিংবা সামাজিক কনসালটেন্টের মত মানুষের সাথে সম্পর্কযুক্ত পেশার অধিকারিনী। উদাহরণস্বরূপ যখন তিনি হবেন ডাক্তার, তখন তার এ পেশা কতই না মহান! যার মাধ্যমে তিনি অন্যান্য মহিলাদের সেবা করবেন, তিনি তার নিজের মধ্যে এমন মহৎ গুণাবলী ধারণ করবেন, যা তিনি অপরের জন্য ছড়িয়ে দিবেন। যেমন, রুগ্ন নারীর মনে শান্তনা দান করা, তার জন্য রোগ নিরাময়ের দ্বার উন্মোচন ও আশাবাদ ব্যক্ত করা এবং হতাশাবাদ ব্যক্ত না করা অথবা রোগের ভয়াবহতা প্রকাশ না করা; অনুরূপভাবে রোগীদেরকে ভালো ভালো নসীহত করা, এবং পবিত্রতা ও সালাতের বিধিবিধানসমূহ থেকে কিছু কিছু দিক বর্ণনা করা।

যে বিষয়ে নির্দেশনা দেবেন তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো: রুগ্ন নারীকে আল্লাহ তা‘আলার সাথে সম্পর্কযুক্ত করা এবং এই কথা বলা যে, রোগ নিরাময়কারী হলেন একমাত্র আল্লাহ, অন্য কেউ নন। আর মানুষের পক্ষ থেকে যা করা হয়, তা হলো শুধু উসিলা বা উপলক্ষ মাত্র, আল্লাহ উপকার চাইলে তা উপকার করে, আর তিনি না চাইলে তা উপকার করতে পারে না ইত্যাদি তার আরও গুণাবলী ও প্রশংসনীয় বৈশিষ্ট্য থাকবে।

আর মহিলা ডাক্তারের মত অপরাপর যারা এ কাজটি করতে পারেন তারা হচ্ছেন: নার্স তথা রোগীর সেবিকা ও কিংবা সামাজিক কনসালটেন্ট।

আর তার দায়িত্ব ও কর্তব্য অনেক বড় মাপের হয়ে যাবে, যদি ঐ  চাকরিজীবী নারী হন প্রশাসনিক দায়িত্বশীল, যেমন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান অথবা মহিলা বিভাগসমূহ বা পরিচালনা পরিষদের  কোনো একটি বিভাগের প্রধান এবং ইত্যাদি ইত্যাদি। সুতরাং তার ওপর আবশ্যক হয়ে পড়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণমূলক দায়িত্ব, দাওয়াতী তৎপরতামূলক এবং সামাজিক দায়-দায়িত্বসমূহ পালন, যেমনটি শিক্ষিকা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তার সম্পর্কে পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।

(চ) শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে দায়িত্ব: 

কোন সন্দেহ নেই যে, আজকের দিনে মানুষের জীবন গত দিনের চেয়ে অনেক ভিন্ন, আর ভিন্নতার স্থানসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো মেয়েদের শিক্ষা, আর রাষ্ট্রসমূহের পক্ষ থেকে নারী শিক্ষার দায়িত্বগ্রহণ; বরং বর্তমান বিশ্বে ছেলেদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে প্রতিযোগিতা করে মেয়েদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেনি এমন অবস্থা খুব কমই পরিলক্ষিত হয়। আর পরিবারসমূহের পক্ষ থেকে কম পরিবারই আছে, যাতে মেয়ে আছে, অথচ সে বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে সেখানকার ছাত্রী হয় না। আর এখান থেকেই ছাত্রীর ওপর আবশ্যক হলো তার সমাজ ও জাতির সম্মুখে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে অংশ গ্রহণ করা, বিশেষ করে উচ্চ শ্রেণির ছাত্রীর ওপর এই দায়িত্ব আরও বেশি; আর আমি এখানে সংক্ষিপ্তভাবে এমন কিছু পয়েন্ট তুলে ধরছি, যার মাধ্যমে এই ছাত্রী তার দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করবে:

  • জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে সঠিক নিয়ত করা, অর্থাৎ তার নিয়ত হবে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ তা‘আলার জন্য। সুতরাং সে জ্ঞান অন্বেষণ করবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার জন্য; আর এই জ্ঞান অর্জন দ্বারা সে তার দীন, আকীদা-বিশ্বাস ও নৈতিক চরিত্রকে প্রতিষ্ঠা করবে এবং আল্লাহর ইবাদত করবে সুস্পষ্ট জ্ঞানের ভিত্তিতে।
  • ছাত্রী জ্ঞান অর্জনের আদব কায়েদা রপ্ত করার মাধ্যমে নৈতিক চরিত্র ও শিষ্টাচার অর্জন করবে। যেমন, অধ্যবসায়, উৎসাহ-উদ্দীপনা, পরস্পর পাঠক্রম আলোচনা, বারবার পাঠ ও সুন্দর চালচলন। বিশেষ করে তার শিক্ষিকাগণ ও বান্ধবীদের সাথে আচার-আচরণ ও লেনদেনের ক্ষেত্রে।
  • জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে চেষ্টা-প্রচেষ্টা ও চিন্তা-গবেষণা করা। সুতরাং সে পাঠ ব্যাখ্যা-বিশ্লষণের ক্ষেত্রে শিক্ষিকাকে অনুসরণ করবে, মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করবে, তিনি যা বলবেন সে দিকে সাবধানী হবে। অতঃপর তা তার বাসায় বার বার আলোচনা ও পর্যালোচনা করবে এবং সর্বোপরি তার সকল আবশ্যকীয় দায়িত্ব সুন্দরভাবে পালন করবে।
  • সে তার শিক্ষিকাদের সম্মান ও মর্যাদা দেবে; আর শিক্ষা দানের ব্যাপারে তাদের অধিকারসমূহ যথাযথভাবে জানবে; আর এটাও উপলব্ধি করবে যে, তারা এক মহান ও সম্মানজনক কাজ করছেন। অতএব, ছাত্রীকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দানের ক্ষেত্রে, তার কল্যাণ কামনায় এবং তার জন্য আদর্শ হওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষিকা হলেন তার মায়ের অবস্থানে। সুতরাং তিনি তাকে উত্তম বিষয় সম্পর্কে পরিচিত করাবেন এবং মন্দ বিষয় থেকে দূরে সরিয়ে রাখবেন।
  • তার বান্ধবীদের সাথে কোনো প্রকার হিংসা, বিদ্বেষ, নিষ্ঠুরতা, কঠোরতা, কটু কথা বা কঠোর শব্দ উচ্চারণ না করেই সুন্দর ব্যবহার করা। কারণ, সে হলো তার বোন, বান্ধবী ও সহপাঠী।
  • প্রাতিষ্ঠানের নির্দেশ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা; বিশেষ করে যা উত্তম চরিত্র, পোশাক-পরিচ্ছদ, প্রকাশভঙ্গি, আকার-আকৃতি ও বেশ-ভূষার সাথে সম্পর্কিত। কারণ (যদি সে প্রতিষ্ঠানের নির্দেশ  শরী‘আত বিরোধী না হয় তবে) প্রতিষ্ঠানের শৃংখলাজনিত এ নির্দেশগুলো ইসলামেরই নির্দেশ। সুতরাং সে সেগুলোকে দ্বীন ও চরিত্ররূপে বাস্তবায়ন করবে।
  • সিলেবাস বহির্ভূত তৎপরতায় অংশগ্রহণ করা, যাতে সে এমন বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারে, যে জ্ঞান পাঠকক্ষে অর্জন করা সম্ভব হয়ে উঠে না। আর এতে থাকবে তার কিছু উপকারী ইতিবাচক অংশগ্রহণ, সে  ভালো কথা বলবে অথবা সুন্দরভাবে কুরআন তিলাওয়াত করবে অথবা হাদীস মুখস্ত করবে অথবা সেলাই করা, রান্না করা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ কাজে অংশগ্রহণ করবে। বস্তুতঃ সিলেবাস বহির্ভূত কর্মকাণ্ডে এমন অনেক উপকারিতা রয়েছে, যা পাঠকক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়।
  • তার সহপাঠী তথা বান্ধবীদের উদ্দেশ্যে শ্রেণী কক্ষে বক্তব্য পেশের মাধ্যমে অথবা এমন কিছু তার দৃষ্টিগোচর হয়েছে, যা উপদেশ দাবি করে, এমন সব ক্ষেত্রে উপদেশ ও দিক নির্দেশনামূলক সাধারণ উপদেশ দেওয়ার অভ্যাস তৈরী করা।
  • তার মুখস্তকরণ, আলোচনা-পর্যালোচনা, অনুধাবন, শিক্ষা গ্রহণ ও শিক্ষা দানের ক্ষেত্রে তার সহপাঠী তথা বান্ধবীদের জন্য আদর্শ নমুনা হওয়া; বরং সে তার চেহারা-ছবিতে, প্রকাশভঙ্গি ও বেশ-ভূষার ক্ষেত্রে এবং তার কথাবার্তা, শব্দচয়ন ও অপরের সাথে তার আচার-আচরণের ক্ষেত্রে আদর্শ নমুনা হবে।

এগুলো শুধুমাত্র নারীর কর্মকাণ্ডের দৃষ্টান্ত এবং তার ওপর অর্পিত আবশ্যকীয় দায়িত্ব ও কর্তব্যের কিছু দিকের আলোচনা, আর যেসব বিষয় আলোচনা হয় নি, তা পূর্বে আলোচিত বিষয়সমূহের ওপর আন্দাজ বা অনুমান করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

চতুর্থ ক্ষেত্র: শত্রুদের ষড়যন্ত্রের বিপরীতে মুসলিম নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্য

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবী হিসেবে প্রেরিত হওয়ার পর থেকেই ইয়াহূদী, খ্রিষ্টান ও সমগ্র কাফির গোষ্ঠীসহ ইসলামের শত্রুগণ ইসলাম ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকে এবং তারা তাদের সকল শক্তি, সামর্থ্য, ষড়যন্ত্র ও অপকৌশল এই ক্ষেত্রে নিয়োজিত করে; এমনকি এই ব্যাপারে এমন কোনো চেষ্টা নেই, যা তারা প্রয়োগ করে নি এবং এমন কোনো পন্থা নেই, যা তারা অনুসরণ করে নি। আর এই ষড়যন্ত্রটি পরিচালনা করে মানুষ ও জিন সম্প্রদায়ের শয়তান গোষ্ঠী। আর এই ক্ষেত্রে তারা বিভিন্ন পন্থা গ্রহণ করেছে। সুতরাং কখনও তারা সামরিক যুদ্ধের জন্য কেন্দ্রীভূত হয়ে, আবার কখনও কখনও তারা চিন্তা ও সংস্কৃতি এবং এই দ্বীনের ব্যাপারে সন্দেহ-সংশয় ছড়িয়ে দেওয়ার যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে; আবার কখনও কখনও তারা বেছে নিয়েছে তথ্য ও প্রযুক্তি, শিক্ষা, সংস্কৃতি ইত্যাদি ব্যবহার করে শিশু ও নারীসহ উম্মতের মধ্যে প্রভাব বিস্তারকারী বলয়গুলো ধ্বংস করার জন্য।

আর এই যুগে তথা বিগত শতাব্দির শুরুর দিকে মুসলিম নারীর ব্যাপারে তার স্বাধীনতার নামে অথবা পুরুষের সাথে তার সমতার বিষয় নিয়ে অথবা তার অধিকারসমূহের জন্য মায়াকান্না করার দিকে অধিক পরিমাণে জোর দিয়ে চলেছে।

আর আমরা মুসলিম নারীর বিরুদ্ধে তাদের পরিকল্পনাকে সংক্ষিপ্তভাবে নিম্নলিখিতরূপে উপস্থাপন করতে পারি:

১. নারীকে নষ্ট-ভ্রষ্ট করার জন্য তারা বিভিন্ন প্রকার পথ ও আলাপ-আলোচনা সূত্রপাত করেছে। যেমন, 

(ক) নারীকে বিতর্কিত বিষয় হিসেবে প্রকাশ করা: আর এর সপক্ষে কিছু লোক নারীর হিতাকাঙ্খী হিসেবে দাঁড়িয়ে যাওয়া। যেমন, নারী নির্যাতিত অথবা সমাজ শুধু (পুরুষের মাধ্যমে) এক অন্ত্রে শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছে বা একপেশে আচরণ করছে, নারী অধিকার বঞ্চিত অথবা আমরা জীবনযাপন করছি প্রাচীন উত্তরাধিকারের তলানির মধ্যে; আর আমাদেরকে সিদ্ধান্ত দেয় প্রাচীন প্রথা ও সনাতন ঐতিহ্য, যার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে বহু সময় এবং ইতিহাস তাকে মুছে দিয়েছে; এভাবেই এসকল কথা দ্বারাই তারা চিল্লাচিল্লি করে, সংবাদপত্রে লেখালেখি করে, টেলিভিশনের ধারাবাহিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বর্ণনা করে এবং মাঝে মাঝে লেখার মাধ্যমে বর্ণনা করে। আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, তাদের নির্দিষ্ট কিছু দিন রয়েছে, যাতে তারা আত্মপ্রকাশ করে আর বিশেষ করে উম্মতের ওপর দিয়ে কোনো কোনো নাজুক সময়ে। অথবা দায়িত্বশীলের কথা রেকর্ড করে তারা তা টুকরা টুকরা করে এবং খণ্ড-বিখণ্ড উত্থাপন করে নতুন করে নারীর বিষয়টি ইস্যুর আকার দেয়। আর এভাবেই এ সব কথা জনগণ বিশেষ করে নারীর স্মৃতিতে সুদৃঢ় ভিত্তির জন্ম দেয় যে নারীর রয়েছে মারাত্মক সমস্যা, যা সংস্কার ও সমাধান করা আবশ্যক।

(খ) মুসলিম সমাজে ব্যাপকভাবে নোংরামি ও বিকৃত চিন্তাধারার বিস্তার করা: 

তারা তা বিভিন্ন দর্শনযোগ্য মিডিয়ার মাধ্যমে বিস্তার করে, তন্মধ্যে কিছু পঠিত এবং কিছু শ্রুত। আর এটা জানা কথা যে, সমাজ বা ব্যক্তি প্রথম বারে সেই দৃশ্য দেখার সময় বা শুনার সময় প্রতিবাদ বা নিন্দা করে; কিন্তু এই ঘৃণা বা নিন্দার মাত্রা একটু একটু করে হালকা হতে থাকে, এমনকি শেষ পর্যন্ত তা প্রচলিত বিষয়ে পরিণত হয়।

সুতরাং মিডিয়া বা তথ্য-প্রযুক্তির ক্ষেত্রে উদাহরণস্বরূপ: পর্দার বিধান ধ্বংস এবং তাকে উপহাস করে নিষিদ্ধ ও আকৃষ্টকারী ছবির বিস্তার ও প্রসার ঘটানো; আর এসব দৃশ্য বারবার প্রদর্শন করানো হয় এমন সব চ্যানেলে যেগুলো এসব খারাপ জিনিস দেখানোর কাজে নিয়োজিত করা হয়েছে। এমনকি শেষ পর্যন্ত তা মুসলিম নারী সমাজের মধ্যে প্রচলিত ও পছন্দনীয় এবং অনিন্দনীয় বিষয়ে পরিণত হয়েছে; আর অনুরূপভাবে নোংরামি চলতে চলতে শেষ পর্যন্ত তা প্রচণ্ড কুৎসিত আকারে ছড়িয়ে পড়ে।

অনুরূপভাবে তা ছড়িয়ে পড়ে সংবাদপত্র ও সাময়িকী বা ম্যাগাজিনে; আর খুব কম ম্যাগাজিনই আছে, যার প্রচ্ছদ পৃষ্ঠায় নারীর পরিপূর্ণ সৌন্দর্য প্রকাশক ও বেপর্দা ছবি ছাপানো হয় না।

অপরদিকে আরও আধুনিক প্রযুক্তি ও উপায়-উপকরণ রয়েছে, যা আমাদের নিকট নাস্তিক্যবাদী বিশ্বে প্রচলিত অপসংস্কৃতি সঞ্চালন করে, যেমন, আকাশ সংস্কৃতি ও ইন্টারনেট জগৎ।

আর চিন্তা-গবেষণা, সে তো নিজেই নিজেকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে; যেমন, সংবাদপত্রের মধ্যে তাদের কলাম অথবা প্রবন্ধ লেখার মাধ্যমে এবং বিভিন্ন চ্যানেলের মধ্যে তাদের টক শোর মাধ্যমে তারা তাদের (খারাপ) চিন্তাধারা পেশ করে থাকে।

আর খুবই দুঃখজনক ব্যাপার হলো, মুসলিম সম্প্রদায়ের অধিকাংশ ছেলে ও মেয়ে যারা ঐ সমস্ত লোকদের ভাষায় কথা বলে তারা এসব চিন্তা-দর্শন প্রচার করে থাকে, বরং তারা এর জন্য উৎসাহিত ও প্রলুব্ধ হয়।

আর তারা নারীর সাথে সংশ্লিষ্ট তথাকথিত সন্দেহ-সংশয়গুলোকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, তন্মধ্যে উদাহরণস্বরূ কিছু দিক হলো:

  • পুরুষের রক্তমূল্যের (Blood Money) অর্ধেক পরিমাণ হলো নারীর রক্তমূল্য (Blood Money 
  • পুরুষের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের অর্ধেক পরিমাণ হলো তার সম্পদ।
  • দুই নারীর সাক্ষ্য সমান একজন পুরুষের সাক্ষ্য।
  • সে প্রশাসকও হতে পারবে না এবং বিচারকও হতে পারবে না।
  • একজন পুরুষের একাধিক স্ত্রী গ্রহণের সুযোগ।
  • তার ওপর পুরুষের কর্তৃত্ব।
  • পর্দা।  

(গ) তাদের ঘোষিত দুইটি মৌলিক দাবি:

– নারী স্বাধীনতার দাবি;

আর এর দ্বারা তাদের উদ্দেশ্যে হলো, সে আল্লাহর দাসত্ব করা থেকে মুক্ত হয়ে নিজের নফসের দাসত্ব করবে অথবা সৃষ্টির দাসত্ব করবে। সুতরাং তার জন্য প্রণীত ঐ আল্লাহ তা‘আলার শরী‘আত তথা বিধিবিধান তাদেরকে মুগ্ধ করতে পারেনি, যিনি তার ও গোটা সমাজের স্বার্থ ও কল্যাণের ব্যাপরে সবচেয়ে বেশি অবগত। কেন নয়, তিনিই তো তাকে সৃষ্টি ও উদ্ভাবন করেছেন। তার ব্যাপারে তাদের ইচ্ছা ও আকাঙ্খা হলো, সে যেন শরী‘আতের শিক্ষা ও দিকনির্দেশনাসমূহ থেকে মুক্তি বা নিষ্কৃতি পায়। অর্থাৎ সে তার পর্দা, সচ্চরিত্রবান হওয়া ও লজ্জশীলতা থেকে নিষ্কৃতি পেতে চায়, যাতে সে হতে পারে এমন সস্তা পণ্য, যাকে প্রত্যেক লম্পট পেতে পারে।

“নারী স্বাধীনতা” নামক এই পরিভাষাটিকে তারা ব্যবহার করে পরিভাষাসমূহকে নিয়ে খেলাচ্ছলে বা কারচুপি করার ক্ষেত্রে; কিন্তু এর আড়াল থেকে তাদের লক্ষ্য হলো তাদের পরিকল্পিত চিন্তাধারার সম্প্রসারণ করা; আর এই পরিভাষাটি একটি ইয়াহূদী পরিভাষা। ইয়াহূদী দার্শনিকদের প্রণীত প্রটোকলসমূহের প্রথমটিতে এসেছে “আমরা হলাম প্রথম, যারা জাতির মধ্যে স্বাধীনতা, ভ্রাতৃত্ব ও সমতার ডাক দিয়েছে। এসব কথা, যা অজ্ঞরা সারা জগতে ছড়িয়ে দিয়েছে, এর পর তারা কোনো চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই অথবা অসচেতনতা বশত এই কথাগুলোর বার বার প্রতিধ্বনিত করছে, আর স্বাধীনতা, ভ্রাতৃত্ব ও সমতা নিয়ে আমাদের আহ্বান ও আমাদের সহযোগীদের দ্বারা বিশ্বের সকল কর্ণার থেকে দলে দলে লোকদেরকে এক সারিতে টেনে নিয়ে এসেছে, আর তারাই আমাদের এ পতাকাকে বীরত্ব ও আত্মমর্যাদাবোধের সাথে বহন করে চলেছে।”

-পুরুষের সাথে সমতার দাবি:

আর এটাও তার পূর্ববর্তী বিষয়ের মতো, তার মাধ্যমে তারা আল্লাহ প্রদত্ত এমন স্বভাব-প্রকৃতির বিরোধিতা করে, যার ওপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আর আল্লাহ তা‘আলা পুরুষ ও নারীকে দু’টি বিপরীতধর্মী স্বভাব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন; আর এই সত্যকে ঐ ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ অস্বীকার করবে না, যার হৃদয় ও চক্ষুদ্বয়কে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং তারা চায় যে, প্রত্যেক ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ উভয়ে সমান হউক। হ্যাঁ, এখানে শরী‘আতের সাধারণ নিয়ম-কানূনের ক্ষেত্রে উভয়ের মাঝে সমতা রয়েছে। যেমন, দায়িত্ব অর্পণের নীতির ক্ষেত্রে সমতা, সাওয়াব ও শাস্তির মাধ্যমে প্রতিদানের ক্ষেত্রে সমতা, মালিকানা গ্রহণের ক্ষেত্রে সমতা, জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সমতা ইত্যাদি।

আর প্রত্যেক ক্ষেত্রে সমতার বিধান কায়েমের কথা যারা বলে, তাদের মধ্যে আল্লাহ কর্তৃক স্বভাব-প্রকৃতিই সেটার বিরোধিতা করে, যার ওপর আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন; আল্লাহর হিকমত  ও  শরী‘আত তো সেটা কখনও মেনে নেয় না; কিন্তু তারা এসব চাকচিক্যমান শ্লোগানসমূহ দ্বারা সাদাসিদে ও তাদের অনুরূপ লোকদেরকে প্রতারিত করে থাকে। আর বাস্তবেই তারা কিছু মানুষকে প্রতারিত করতে সক্ষম হয়েছে।

আর আমরা এখানে এসব ও অনুরূপ দাবি-দাওয়ার সমালোচনায় রত হতে চাই না, বরং আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এটা জানা যে, নারী ও সমাজের জন্য ষড়যন্ত্রমূলক পরিকল্পনা রয়েছে।

(ঘ) নারীর মূল কাজকে গুরুত্বহীন হিসেবে চিত্রিত করা: 

তারা এই ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যাতে তারা নারীকে তার আসল জগৎ বাড়ি-ঘর, পরিবার-পরিজন, শিশুদের লালন-পালন ও স্বামীর প্রতি মনোযোগ দেওয়ার মত কর্মকাণ্ড থেকে সরিয়ে দিয়ে এমন কাজে লিপ্ত করবে, যেখানে সে পুরুষের সাথে প্রতিযোগিতা করতে পারে। সুতরাং সে শিল্পকারখানা, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে, পুরুষের জন্য নির্দিষ্ট  চাকরিতে ও যৌথভাবে নির্ধারিত চাকরিতে এবং এগুলো ছাড়া ও অন্যান্য পেশায় পুরুষের সহযোগী হবে।

(ঙ) পুরুষের কর্তৃত্বকে আধিপত্যবাদী ও বর্বর বলে চিত্রিত করা:

আর এখানে তাই বলা যায়, যা বলা হয়েছে “ঘ” অনুচ্ছেদে; অর্থাৎ এসব কথা তখনই কেউ বলতে পারে যখন কারও কাছে সৃষ্টিগত ও  শরী‘আত তথা বিধানগত মানদণ্ডটি নষ্ট হয়ে পড়ে, যার ওপর আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।

(চ) ‘বাস্তবতা অবশ্য পালনীয়’ নামক নীতির অনুসরণ: 

আর এটা এইভাবে যে, তারা কতগুলো সুস্পষ্ট কাজ বা বিষয়কে গ্রহণ করে, অথচ তারা জনগণকে বলবে না যে, আমাদের উদ্দেশ্য এইরূপ অথবা আমরা এই কাজের সাথে সম্পৃক্ত হতে চাই। আর তারা তাদের অভিপ্রায় বাস্তবায়নের জন্য একটি দীর্ঘ পরিকল্পনা গ্রহণ করে। আর যখন তাদের ইচ্ছা-আকাঙ্খার সৌন্দর্যপূর্ণ বাহ্যিক রূপটি পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন হবে, তখন তার সাথে নিষিদ্ধ কাজ জুড়ে দেবে; যেমন, নারীদের জন্য কয়েকটি বিশেষ বিভাগ খোলা, অথচ বাস্তবে এসব বিভাগের কোনো প্রয়োজন নেই। যেমন, নাট্য ও অনুরূপ অন্যান্য বিভাগসমূহ। সুতরাং যখন ছাত্রী পাশ করে বের হয়, তখন তার জন্য তার বিশেষ বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত চাকরি খোঁজা আবশ্যক হয়ে পড়ে, অতঃপর হারাম (নিষিদ্ধ) ও সংকটপূর্ণ কাজে নিপতিত হয়।

অপর আরেকটি দৃষ্টান্ত হলো: অভ্যর্থনাকারিনী এবং হোটেলে কর্মরত নারী শ্রমিকদের প্রশিক্ষনের জন্য কিছু ইনস্টিটিউট অথবা প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করা। আর তারা এটিকে খুব গুরুত্বের সাথে ব্যক্ত করে; যাতে করে প্রথমেই বিরোধিতার সম্মুখীন না হয়, অতঃপর যখন তারা সনদ বা সার্টিফিকেট অর্জন করে, তখন তারা ঐ চাকুরির জন্য ইচ্ছা পোষণ করে। এভাবেই তারা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে থাকে। আল-কুরআনের ভাষায়: 

 ﴿وَيَمۡكُرُونَ وَيَمۡكُرُ ٱللَّهُۖ وَٱللَّهُ خَيۡرُ ٱلۡمَٰكِرِينَ ٣٠[سُورَةُ الأَنفَال: 30[

“আর তারা ষড়যন্ত্র করে, আর আল্লাহও কৌশল করেন; আর আল্লাহই সর্বশ্রেষ্ঠ কৌশলী।” [সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ৩০]

বস্তুতঃ তারা এ পদ্ধতিতে রাষ্ট্র, সমাজ ও অভিভাবকদেরকে এমনকি স্বয়ং নারীকেও তাদের নোংরা ষড়যন্ত্রের শিকারে নিপতিত করে।

(ছ) শিক্ষা: 

আর ঐসব শত্রুগণ এবং তাদের দ্বারা প্রতারিত ব্যক্তিগণ শিক্ষাকে তাদের বাহন হিসেবে গ্রহণ করেছে, যাতে করে তারা এর আশ্রয়ে মুসলিম নারীর ধ্বংস ও বিপর্যয়ের জন্য তাদের চিন্তাধারা ছড়িয়ে দিতে পারে। আর এর কারণ হলো, শিক্ষাপদ্ধতি তথা শিক্ষার সঠিক সিলেবাসের অনুপস্থিতি, যা নারী ও তার ভূমিকা সম্পর্কে সঠিক দিক-নির্দেশনা প্রদান করবে। যেমন, ইসলামে তার অধিকারসমূহ, তার ঘর ও শিশুদের প্রতি মাতৃত্বের দায়িত্বের বর্ণনা, তাদের লালন-পালনের পদ্ধতি বর্ণনা, মায়েদের প্রতি সন্তানরা তাদের কর্তব্য পালনের বিভিন্ন মাধ্যমসমূহের বর্ণনা এবং নারীকে তার দায়িত্ব পালনে সহযোগিতাকারী সিলেবাসের অনুপস্থিতি।

যেমনিভাবে তারা কৌশলে শিক্ষাকে কয়েকটি ক্ষেত্রে আক্রমন করেছে, যেমন, প্রথম শ্রেণীসমূহের মধ্যে ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে মিশ্রিত শিক্ষার দিকে আহ্বান করা। বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের মধ্যে নারীদের জন্য এমন একাধিক বিভাগ ঢুকিয়ে দেওয়া নারীর জন্য যেসব বিভাগের কোনো প্রয়োজন নেই। ডাক্তারী ও অন্যান্য প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে সহ-শিক্ষার মাধ্যমে প্রাকটিক্যাল ক্লাসের ব্যবস্থা করা, বিদ্যালয় ও অনুরূপ প্রতিষ্ঠানে শরীরচর্চা ও কসরৎ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি করা।

(জ) পুরুষের কাজসমূহের মধ্যে নারীকে জোরপূর্বক ঢুকিয়ে দেওয়া: 

আর এটা হলো গুরুত্বপূর্ণ ময়দানসমূহের মধ্যে অন্যতম, যাতে তারা প্রবেশ করেছে। অতঃপর তারা নারীকে এসব ময়দানে ঢুকানোর জন্য অনেক উপায়-উপকরণ ও পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে; অতঃপর তারা নিঃশর্তভাবে পুরুষদের প্রত্যেকটি ময়দানে তার অনুপ্রবেশ দাবি করেছে, অনুরূপভাবে হোটেল, বিমান ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়িক চেম্বার, কোম্পানি এবং এগুলো ছাড়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠানসমূহে, আর কান্না মিশ্রিত হাস্যকর ব্যাপার হলো, প্লাম্বারিং, বৈদ্যুতিক কাজ, কাঠমিস্ত্রীর পেশা, সৈনিক, পুলিশ ইত্যাদির মতো পেশাগত কর্মকাণ্ডে নারীদেরকে প্রবেশাধিকার দেওয়ার দাবি করা। আমাদের প্রতিপালক অতি মহান ও পবিত্রময়, এটা হলো বড় ধরনের অপবাদ।

এসব বাক্য ঐসব পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত, যে ব্যক্তি এই ব্যাপারে আরও বিস্তারিত জানতে চাইবে, সে যেন “আউদাতুল হিজাব” (عودة الحجاب), কিতাবটি দেখে নেয়। তাতে আরও রয়েছে, আরব সমাজসমূহের মধ্যে মুসলিম নারীর বিরুদ্ধে আক্রমনের সূচনা, বইটিকে সংক্ষেপ ও পরিমার্জন করেছেন ড. বকর আবূ যায়েদ “হিরাসাতুল ফদিলত” (حراسة الفضيلة), গ্রন্থে, আল্লাহ তাদের সকলকে তাওফীক দান করুন।

২. এই সম্মিলিত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মুসলিম নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্য:

মুসলিম নারীর বিরুদ্ধে এই চিন্তাধারা ও নিকৃষ্ট পদক্ষেপসমূহের বিপরীতে দায়িত্ব ও কর্তব্যটি প্রশাসনযন্ত্র, আলিম, ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দ, দা‘ঈগণ ও নারীদের আইনানুগ অভিভাবকগণের মধ্যকার একটি যৌথ দায়িত্ব ও কর্তব্যপূর্ণ কাজ। আর এই দায়িত্ব ও কর্তব্যের মাঝে তাদের সাথে মুসলিম নারী আধাআধি ভাগে অংশীদার হবে। আর তাই আমরা এখানে মুসলিম নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্যকে সংক্ষেপে বর্ণনা করব; তবে তার অর্থ এই নয় যে, অন্যান্যদেরকে তাদের দায়িত্ব থেকে অবকাশ দেওয়া হয়েছে।

মুসলিম নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে:

(ক) নারী কর্তৃক নিজেকে জ্ঞানে, চিন্তায় ও কর্মে শক্তিশালীকরণ; আর এই শক্তিশালীকরণের সিলেবাস হলো তা, যা তার নিজের ব্যাপারে দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহ বর্ণনা প্রসঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে; আর এখানে বিশেষ করে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, জ্ঞান অর্জন, পাঠ, ব্যাপকভাবে ইসলামিক সাংস্কৃতির জ্ঞান লাভের মাধ্যমে নিজের সংস্কৃতির ধারণ এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার প্রতি শক্তিশালী ঈমানসহ শরী‘আতের গুঢ়রহস্য ও তাৎপর্য সম্পর্কে জানা। কেননা তিনি  শরী‘আত হিসেবে যে কোনো বিষয়কে নির্দেশ ও অনুমোদন করেছেন, তা হিকমতের কারণেই করেছেন, তাতে সৃষ্টির কল্যাণ ও স্বার্থ জড়িত রয়েছে।

(খ) জ্ঞান অর্জন: কারণ, ইয়াহূদী, খ্রিষ্টান, মুনাফিক ও ধর্মনিরপেক্ষ ইত্যাদি অনেক শত্রু রয়েছে, যারা বিভিন্ন বিভাগে তাকে (নারীকে) ঘায়েল করার জন্য সুযোগের অপেক্ষায় আছে। আর তারা কখনও কখনও আমাদের গোষ্ঠীর সন্তানদের মধ্য থেকে হয়ে থাকে এবং তারা আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করে; কিন্তু তারা হিদায়াত পাওয়ার পর পথভ্রষ্ট হতে চায়। ফলে তারা নিজেরা পথভ্রষ্ট হয় এবং অন্যদেরকেও পথভ্রষ্ট করে, আর মানুষকে প্রথমই যা থেকে সতর্ক থাকতে হয়, তা হচ্ছে তার সবচেয়ে নিরাপদ স্থান, যাতে সে সেখান থেকে দংশিত না হয়। যেমন বলা হয়: “নিরাপদ স্থান নিয়েই সাবধানতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়”। বস্তুতঃ ঐসব লোক তাদের নিজেদেরকে মুসলিম নারীর কল্যাণের জন্য একজন অশ্রুসিক্ত কল্যাণকামী হিসেবে প্রকাশ করে এবং তার স্বার্থ, কল্যাণ ও অধিকার প্রশ্নে কাঁদার ভান করে; কিন্তু তার কাপড়ের নীচে রয়েছে ষড়যন্ত্রকারী হায়েনা, যে এই নিঃস্ব নারীকে ধ্বংস করতে চায়। আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন, কোনো দিকে তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে!

(গ) আর এই জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি মুসলিম নারীকে উপরোক্ত শত্রুদের উপায়-উপকরণ, পরিকল্পনা, দাবি-দাওয়া, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহের ব্যাপারেও অবগত থাকতে হবে:

মন্দকে জান, নয় মন্দের জন্য,

বরং তা থেকে বেঁচে থাকার জন্য।

আর শত্রুদের এসব উপায়-উপকরণ জানার মাধ্যমে অতিরিক্ত সাবধানতা ও রক্ষণাবেক্ষন করা সম্ভব হবে।

(ঘ) উপায়-উপকরণের যতটুকু হাতে আছে, তার সবটুকু নিয়ে এবং প্রত্যেক নারী তার সামর্থ্য অনুযায়ী এই আক্রমনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। সুতরাং এই ব্যাপারে একজন ছাত্রীর দায়িত্ব অন্যান্যদের চেয়ে অনেক বড়; আর শিক্ষিকা এবং ছোট শিশুদের লালনপালনকারী নারী ও অন্যান্যদের দায়িত্ব ও কর্তব্যও অনুরূপ। আরও উচিৎ এসব প্রতিরোধ কার্যক্রম সর্বদা চালিয়ে যাওয়া। কেননা বিষয়সমূহের মধ্যে এই বিষয়টি খুবই ভয়ঙ্কর, জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ। ভেবে দেখ, তোমাদের অবস্থা কেমন হবে, যখন এসব শত্রুরা তাদের ‌উদ্দেশ্যসমূহ বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবে!! আর তখন,  

  • নারী তার চেহারা থেকে পর্দা খুলে ফেলবে এবং তার চুলের ব্যাপারে (পর্দাকে) সে নিরর্থক মনে করবে।
  • সে অনাবৃত অথবা আংশিক আবৃত শরীরে ভ্রমণ করবে।
  • পুরুষের কর্মক্ষেত্রের দিকে বেরিয়ে যাবে।
  • পুরুষদের সাথে অবাধ মেলামেশা করবে।
  • একাকী গাড়ি চালাবে।
  • সে তার বাচ্ছাদেরকে লালন-পালনকারী সংস্থা কিংবা কাজের মেয়ের নিকট রেখে যাবে।
  • সে পুরুষদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে এবং তাদের সাথে বিনিদ্র রাত কাটাবে।
  • সে কলকারখানার ধোঁয়া দ্বারা দূষিত হবে।
  • সে দুষ্ট প্রকৃতির লোকদের জন্য সাজগোছ করবে এবং তার স্বামী ও সন্তানদের ছেড়ে যাবে।
  • এগুলো ছাড়া আরও অনেক কিছু। তাদের ইচ্ছা, উদ্দেশ্য ও দুরভিসন্ধির তো কোনো শেষ নেই।

সুতরাং আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির প্রত্যাশী একজন সফল মুসলিম নারীর কর্তব্য হলো, সে তার শ্রেণীভুক্ত মেয়েদেরেকে সাথে নিয়ে এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।

(ঙ) আরও যেসব জ্ঞান তাকে উপকৃত করবে, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: কাফির নারীদের অবস্থাদির ব্যাপারে জেনে রাখা; আর কাফের নারীরা নিজেদেরকে উজাড় করে দেওয়ার কারণে যে সকল ধ্বংস ও দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে সেটাও জানা। তারা মূলতঃ অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তার মধ্যে জীবনযাপনে করছে। সে হয়ে গেছে অপমানিত ও তুচ্ছ এক নারী, যে তার কুকুর ও বিড়ালীকে কোলে নিয়ে মৃত্যুবরণ করে। তার যৌবন ও সৌন্দয্যের সময় তাকে নিয়ে খেলোয়াড়রা খেলে, তারপর সে হয়ে পড়ে সে টিস্যুর মত, যার দ্বারা মোছার কাজ করা হয় এবং কাজ শেষ হয়ে গেলে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়। আর তাকে আরও তুলনা করা যায় রাস্তার উপরের শৌচাগারের মতো, যাতে প্রত্যেকেই তা প্রস্রাবের কাজ সেরে তার ভ্রমণ অব্যাহত রাখে। সুতরাং যখন মুসলিম নারী জানতে ও বুঝতে পারবে যে তার পরিণতি ঐসব কাফির নারীদের চেয়ে ভিন্ন হবে না, তখন সে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাইবে এবং নিজেকে এই ধরনের পঙ্কিল কাজে জড়িয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করবে।

(চ) সে তার নিজের, ঘরের ও সমাজের সাথে সংশ্লিষ্ট সংস্কারমূলক ভূমিকা পালন করবে, যা পূর্বে আমরা বর্ণনা করেছি। সুতরাং সে প্রভাব সৃষ্টি করবে, প্রভাবিত হবে না; সংস্কার করবে, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে না; কাজের হবে, অকর্মা হবে না; অনুসরণীয় হবে, অনুগামী হবে না এবং তার এই মিশন শেষ হবে জান্নাতে প্রবেশ ও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে।

নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্যের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু সংক্ষিপ্ত অনুচ্ছেদ

নিজের প্রতি, ঘরের মধ্যে, সংস্কার ও সামাজিক পথনির্দেশের সাথে সংশ্লিষ্ট এবং সমাজ ও জাতির প্রতি একজন নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্যের দ্রুত বর্ণনা পর, তার ওপর আবশ্যক হলো বেশ কিছু বিষয়ের প্রতি মনোযোগী হওয়া, যেগুলোর বর্ণনার মাধ্যমে আমরা এই আলোচনাটি শেষ করব; আর এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কিছু অনুচ্ছেদের মধ্যে আমরা তা উপস্থাপন করব। যেগুলো পূর্বোক্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর সফলতার জন্য সহযোগী হিসেবে কাজ করবে।

প্রথম অনুচ্ছেদ: নারী কর্তৃক নিজেকে ঐ দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত করা:

কোনো সন্দেহ নেই যে, এই দায়িত্বটি খুবই বড় ও মহান এবং গৌরবময় কাজ। ঐসব সৌভাগ্যবান নারীগণ ব্যতীত কেউ তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করে না এবং তা কাজে পরিণত করে না, যারা সুউচ্চ পাহাড়ের শীর্ষে পৌঁছার জন্য প্রতিযোগিতামূলক কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে। আর এই মহান কাজটির পূর্বপ্রস্তুতির প্রয়োজন রয়েছে, আর এই প্রয়োজনসমূহের সারসংক্ষেপ নিম্নরূপ হতে পারে: 

  • জ্ঞানগত প্রস্তুতি: এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো শর‘ঈ জ্ঞান, যে জ্ঞান লাভ প্রতিটি বিবেকবান সুস্থ মানুষের ওপর কর্তব্য, বিভিন্ন ধর্মীয় বিষয় যেমন, আকীদা-বিশ্বাস, ইবাদাত, লেনদেন ও চাল-চলন সম্পর্কে। সুতরাং নারীর ওপর কর্তব্য হচ্ছে, বিভিন্ন বিষয়ের ওপর একটা পরিপূর্ণ ধারণা রাখা; যেমন, আকীদা, ইবাদত, লেনদেন, নৈতিক চরিত্র, শিষ্টাচার, আচার-আচরণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সীরাত তথা জীবনবৃত্তান্ত এবং সৎ পূর্বপুরুষ তথা সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম ও তাঁদের পরবর্তীদের জীবনী।  

সামাজিক প্রস্তুতি: অর্থাৎ সে তার নিজের জন্য একটি ছোট্ট সমাজ প্রস্তুত করবে, তার মধ্য দিয়ে সে যথাযথভাবে দাওয়াতের কাজ আঞ্জাম দিতে সক্ষম হবে, আর এই কাজে তাকে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করবে তা হলো, বিয়ের সময় সে অবশ্যই একজন ভালো মানুষকে স্বামী হিসেবে মনোনীত করবে, যিনি তার মিশনকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তার জন্য একটি যথাযথ পরিবেশ সৃষ্টি করবে; আর নারীর উচিৎ নিজেকে প্রতিটি উৎকৃষ্ট ময়দানে নিয়োজিত করার কাজে ন্যস্ত করবে এবং এই কাজে নিজেকে অভ্যস্ত করবে, যেমন, নসিহত বা উপদেশ দান, দিকনির্দেশনা প্রদান, বক্তব্য প্রদান এবং আলোচনা পেশ করতে অভ্যস্ত হওয়া; আর উত্তম হয় যদি এর ওপর সে তার ছোটকাল থেকে অভ্যাস গড়ে তুলে; বিশেষ করে ছাত্রী জীবনের প্রথম থেকে সে তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে, এতে করে সে অত্যন্ত মহৎ ও উৎকৃষ্টভাবে তার ভূমিকা পেশ করতে পারবে। আর সে সামাজিক পরিবেশ ও নারী সমাজের অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে।

নারীর জ্ঞানগত দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু বিষয়ের বর্ণনা প্রসঙ্গে পূর্বে আলোচনা হয়েছে।

  • মানসিক প্রস্তুতি: আর এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, সে তার নিজের মন-মানসকে গঠন করবে, যাতে এই ময়দানে প্রবেশ করার জন্য শক্তিশালী প্রস্তুতি তার থাকে। যে এ ময়দানে প্রবেশ করবে পূর্ণ নির্ভরযোগ্যতা, স্থিরতা, দৃঢ় সিদ্ধান্ত এবং কোনো প্রকার দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও দুর্বলতা ছাড়াই সাহসিকতাসহ। সে ব্যক্তিগত সংঘাত, ঠাট্টা-বিদ্রূপ ও উপহাসের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত থাকবে, যা কখনও কখনও তার সাথে সাক্ষাতকারিনী অথবা পাপাচারিণী অথবা চিন্তায় বা কখনও কখনও ধর্মীয়ভাবে তার বিরোধিতাকারিনীর পক্ষ থেকে সে শুনতে পাবে। আর এই ব্যাপারে তাকে যেসব বিষয় সহযোগিতা করবে, তা হলো আল্লাহ তা‘আলার প্রতি মজবুত ঈমান, এই মিশন পালনের ক্ষেত্রে তার প্রতি ইখলাস তথা একনিষ্ঠতা। এর বিনিময়ে দুনিয়ার সুনাম কুড়ানো অথবা প্রদর্শনেচ্ছা অথবা দুনিয়াবী কোনো ক্ষেত্রে উন্নতি চাওয়ার মত কোনো জিনিস না চাওয়া। আর ইখলাসের সাথে সাথে তার কাছে থাকবে এই দীনকে নিয়ে আত্মমর্যাদাবোধ। আল-কুরআনের ভাষায়:

﴿وَلِلَّهِ ٱلۡعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِۦ وَلِلۡمُؤۡمِنِينَ وَلَٰكِنَّ ٱلۡمُنَٰفِقِينَ لَا يَعۡلَمُونَ ٨[سُورَةُ المُنَافِقُونَ: 8[

“কিন্তু শক্তি তো আল্লাহরই, আর তাঁর রাসূল ও মুমিনদের। তবে মুনাফিকগণ তা জানে না।” [সূরা আল-মুনাফিকুন, আয়াত: ৮]

আর অনুরূপভাবে সত্যের ব্যাপারে সাহসিকতার পরিচয় দেওয়া; দুর্বলতা, দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও অলসতার পরিচয় না দেওয়া এবং আন্দাজ-অনুমান ও সন্দেহ-সংশয় পুঞ্জিভূত না করা। আর (দাওয়াত) গ্রহণ না করার এবং শয়তানের ধোঁকার আশঙ্কা না করা। সুতরাং সে কামনা করবে যে, সে তার নিকটস্থ সত্যের ব্যাপারে হবে আপোষহীন নারী, আর এই কারণেই সে জেনে রাখবে যে, এই পথে প্রতিবন্ধকতা থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। কেননা তার আদর্শ হলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম; তিনি এই পথে অনেক কষ্ট, ক্লান্তি, উপেক্ষা ও প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়েছেন এবং তিনি ও তাঁর সাহাবীগণ শাস্তির সম্মুখীন হয়েছেন। আর এত সব সত্ত্বেও তিনি এসব প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করেছেন, শেষ পর্যন্ত জনগণ আল্লাহর দীনের মধ্যে দলে দলে শামিল হয়েছে, আল্লাহ তাঁর জন্য দীনকে পরিপূর্ণ করে দিলেন এবং তাঁর ওপর নি‘আমতের ষোলকলা পূর্ণ করলেন।

  • পরিকল্পনাগত এবং দাওয়াতের লক্ষ্য ও পদ্ধতির পরিচয়গত প্রস্তুতি: ইসলামী দাওয়াত হলো জানা ও মানার সমন্বয়ে একটি আন্তর্জাতিক দাওয়াতী কাজ, যা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন হলো তার প্রকৃতরূপ, উপায়-উপকরণ ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানা। আর নারী কর্তৃক এই দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আবশ্যক হলো, তা সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ও নীতিমালার আলোকে পরিচালিত হবে; সে নিজের জন্য তার একটা পরিকল্পনা গ্রহণ করবে অথবা এই কাজে তার সহযোগীর সাথে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করবে। সুতরাং সে কাকে দাওয়াত দিতে চায়? এবং তার নিকটবর্তী ও দূরবর্তী লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ কী? আর এই লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য সফল পদ্ধতিসমূহ কী কী? নারীর জন্য আবশ্যক হলো (দাওয়াতের) ময়দানে প্রবেশের পূর্বে নিজেকে এসব সম্পূর্ণ প্রস্তুত করে নেয়া, যাতে সে ব্যর্থ না হয়; নতুবা তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ফলে সে তার দায়িত্ব পালন থেকে বসে পড়বে, আর এর ওপর ভিত্তি করে তার প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজন হলো:
  • তার দাওয়াতী পথের জন্য একটি পরিকল্পনা চিত্রায়ন করা: দূরবর্তী লক্ষ্যের পরিকল্পনা এবং নিকটবর্তী লক্ষ্যের পরিকল্পনা।
  • অনুরূপভাবে দাওয়াতী কাজের জন্য সহজলভ্য উপায়-উপকরণের প্রতি নজর দেওয়া, যা নারী সহজে ব্যবহার করতে পারে। কারণ, উপায়-উপকরণের বেলায় কিছু আছে পুরুষের পক্ষে ব্যবহার করা সহজ, যা নারীর জন্য সহজ নয়। আবার কিছু আছে নারীর পক্ষে ব্যবহার করা সহজ, যা পুরুষের জন্য সহজ নয়।
  • দাওয়াত দেওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে জানা, যার মাধ্যমে সে তার দাওয়াতী দায়িত্ব পালন করবে এবং তা জনগণের নিকট প্রচার করবে।
  • প্রতিবন্ধকতাসমূহের ব্যাপারে জ্ঞান রাখা, যা তার সামনে আসতে পারে, যাতে সে এর সাহায্য নিয়ে  প্রতিবন্ধকতার সময় তা অতিক্রম করতে পারে।

দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ: একজন সফল মহিলা দাঈ’র গুণাবলী:

প্রথম: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার জন্য একনিষ্ঠভাবে কাজ করা। সুতরাং এই ইখলাস তথা একনিষ্ঠতা ব্যতীত তার আমল বিক্ষিপ্ত ধূলায় পরিণত হবে। আর তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জিনিস, একজন মহিলা দা‘ঈ’র জন্য আবশ্যক হলো, সে নিজেকে তার মধ্যে আলোচনা, পর্যালোচনা ও প্রতিকার করবে।  

দ্বিতীয়: ধৈর্যধারণ করা ও কষ্টসহিষ্ণু হওয়া। কারণ, দাওয়াতী কাজ একটি ভারী দায়িত্বপূর্ণ কাজ এবং তার প্রতিবন্ধকতাও অনেক। সুতরাং তা উত্তরণের জন্য প্রয়োজন এই ধৈর্যের। আল-কুরআনুল কারীমের মধ্যে নব্বইয়েরও অধিক স্থানে তার আলোচনার পুনারাবৃত্তি হয়েছে। বরং এর প্রতি নির্দেশগুলো সরাসরি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য নিয়ে আসা হয়েছিল।

তৃতীয়: জ্ঞান অর্জন করা।

চতুর্থ:  ভালো কাজ, উত্তম চরিত্র এবং চরিত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকা; কারণ, দাওয়াতকে ব্যর্থতায় পর্যবেশনকারী এবং দাওয়াত দাতা ইতিবাচক ফলাফল লাভ করতে না পারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো কথার সাথে কাজের গরমিল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفۡعَلُونَ ٢ كَبُرَ مَقۡتًا عِندَ ٱللَّهِ أَن تَقُولُواْ مَا لَا تَفۡعَلُونَ ٣ [ سُورَةُ الصَّفّ: 2-3]                                                                                                                                            

“হে মুমিনগণ! তোমরা যা কর না, তা তোমরা কেন বল? তোমরা যা কর না, তোমাদের তা বলাটা আল্লাহর দৃষ্টিতে মারাত্মক অসন্তোষজনক।” [সূরা আস-সফ, আয়াত: ২-৩] 

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

﴿أَتَأۡمُرُونَ ٱلنَّاسَ بِٱلۡبِرِّ وَتَنسَوۡنَ أَنفُسَكُمۡ وَأَنتُمۡ تَتۡلُونَ ٱلۡكِتَٰبَۚ أَفَلَا تَعۡقِلُونَ ٤٤[سُورَةُ البَقَرَةِ: 44[

“তোমরা কি মানুষকে সৎকাজের আদেশ দাও, আর তোমাদের নিজেদেরকে ভুলে যাও? অথচ তোমরা কিতাব অধ্যয়ন কর। তবে কি তোমরা বুঝ না?” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ৪৪] আর এই অধ্যায় বা বিষয়ে আল-কুরআন ও সুন্নাহ’র আরও অনেক বক্তব্য রয়েছে।

পঞ্চম: ধৈর্য ও সহনশীলতা। কোনো ব্যক্তির জীবনে সবচেয়ে মহৎ যে জিনিস দেওয়া হয়ে থাকে, তা হলো ধৈর্য, সহনশীলতা ও তাড়াহুড়া না করা। কেননা, পথ অনেক লম্বা, আর প্রত্যেক গৃহ নির্মাণকারীই সে গৃহে বসবাস করতে পারে না। হয়ত তুমি ঘর বানাবে, আর বসবাস করবে তুমি ভিন্ন অন্য কেউ। তুমি জ্ঞান অর্জন করবে এবং তা তুমি ভিন্ন অন্যের নিকট পৌঁছিয়ে দেবে, আর তুমি সম্পদ উপার্জন করবে, আর তার থেকে ভোগ করবে তুমি ভিন্ন অন্য কেউ। সুতরাং দা‘ঈ নারী তার উদ্দেশ্য ও ইচ্ছাকৃত লক্ষ্যে পৌঁছতে এবং তার (দাওয়াতের) পথে অবিচল থাকতে এই মহৎ গুণটি দ্বারা উপকৃত হতে পারে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুল কায়েস গোত্রের আশাজ্জকে উদ্দেশ্য করে বলেন,

«إِنَّ فِيكَ خَصْلَتَيْنِ يُحِبُّهُمَا اللَّهُ: الْحِلْمُ وَالأَنَاةُ ».

“নিশ্চয় তোমার মধ্যে এমন দু’টি বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে, যেগুলোকে আল্লাহ পছন্দ করেন ধৈর্য ও সহনশীলতা।” ইমাম মুসলিম রহ. হাদীসখানা তাঁর গ্রন্থে বর্ণনা করেন। সুতরাং যার মধ্যে সহিষ্ণুতা নেই, তার ওপর কর্তব্য হলো, সহনশীলতার গুণ অর্জন করা। কারণ, জ্ঞান হয় জ্ঞান অর্জন করার মাধ্যমে, আর সহিষ্ণু হয় সহনশীলতার গুণ অর্জন করার মাধ্যমে।

ষষ্ঠ: প্রত্যেক ব্যাপারে সততার পরিচয় দেওয়া: আল্লাহর ইবাদতের ক্ষেত্রে তাঁর সাথে সত্য অবলম্বন করা, মানুষের সাথে সত্য আচরণ করা, নিজের নফসের সাথে সততার পথ অবলম্বন করা এবং কিতাব, কথা ও কাজের ক্ষেত্রে সত্য অবলম্বন করা। সুতরাং সে যেন আল্লাহ অথবা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারে মিথ্যা না বলে। কারণ, এটা জঘন্য ও ভয়াবহ মিথ্যাচার, আর সাধারণ মানুষের সাথেও মিথ্যা বলো না, এমনকি ছোট বাচ্চা ও জীবজন্তুদের সাথেও নয়। সুতরাং তার জন্য আবশ্যক হলো, সে হবে সত্যের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। 

সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: ঈমান (الإيمان), পরিচ্ছেদ: আল্লাহ, তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও দীনের অনুশাসনের প্রতি ঈমান আনার নির্দেশ এবং তার প্রতি মানুষকে আহ্বান করা, দীন সম্পর্কে প্রশ্ন করা ও তা সংরক্ষণ করা, আর যার কাছে দীন পৌঁছায়নি, তার কাছে দীনের দাওয়াত পেশ করা (باب الأَمْرِ بِالإِيمَانِ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَشَرَائِعِ الدِّينِ وَالدُّعَاءِ إِلَيْهِ, و السوال عنه, و حفظه و تبليغه من لم يبلغه.), বাব নং ৮, হাদীস নং ১২৬।

সপ্তম: সে বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে জানা, যে অবস্থার মধ্যে মুসলিম নারী জীবনযাপন করে। সুতরাং সে ততটুকুই আলোচনা করবে, যতটুকু কোনো মুসলিম নারী বুঝে ও ধারণ করে। অতএব যখন সে মানুষের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারবে, বিশেষ করে নারীর অবস্থা সম্পর্কে, তখন সে তাদের হৃদয়ে পৌঁছাতে সক্ষম হবে এবং তাদের সমস্যাসমূহ প্রতিকার করতে পারবে; আর তাদের সাথে তাদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতে পারবে।  

অষ্টম: শরী‘আতের আদব-কায়দার মাধ্যমে সে নিজে আদব-কায়দা ও শিষ্টাচার সম্পন্না হবে, আরও বিশেষ করে আবশ্যকীয় বিষয়গুলো অনুসরণের মাধ্যমে। যেমন, শর‘ঈ পর্দা, পুরুষদের সাথে মেলামেশা না করা, তাদের সাথে লেনদেনের ক্ষেত্রে নরম হয়ে কথা না বলা এবং তার আকার-আকৃতি ও বেশভূষা হবে শরী‘আতের বিধান মোতাবেক।

নবম: নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদির ওপর শরী‘আতের স্বার্থসংশ্লিষ্ট দিককে প্রাধান্য দেবে। সুতরাং তার সার্বক্ষনিক চিন্তা থাকবে অন্যদেরকে হিদায়াত করা, তাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করা এবং তাদের মধ্যে যারা শত্রুদের পাতা ফাঁদে জড়িয়ে গেছে তাদেরকে উদ্ধার করা। আর তার অভিপ্রায় এমন হবে না যে, সে খ্যাতিমান অথবা গণমানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হবে এবং দুনিয়ার কোনো বস্তু পাওয়ার প্রত্যাশা করবে, ইত্যাদি ইত্যাদি।   

দশম: দাওয়াতের সফল পদ্ধতিসমূহের প্রতি মনোযোগ দেওয়া।

আর এক কথায়,  শরী‘আত যেসব বিষয়ে নির্দেশনা প্রদান করেছে, সেসব বিষয় দ্বারা নিজেকে গুণান্বিত করা এবং  শরী‘আত যেসব বিষয় থেকে সতর্ক করেছে, সেসব বিষয় থেকে দূরে থাকা।

তৃতীয় অনুচ্ছেদ: নারীর দা‘ওয়াতের নীতিমালা:

মুসলিম নারী কর্তৃক আল্লাহ তা‘আলার দিকে দাওয়াতী কাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে উচিৎ কাজ হলো, সে নিজেকে তার স্বভাব-প্রকৃতি ও নারীত্ব থেকে বের করবে না। এখানে এই বিষয়ে কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ নিয়মনীতি রয়েছে, যেগুলো সংক্ষেপে নিম্নরূপে উল্লেখ করা যায়:

১. মৌলিকভাবে নারীর অবস্থান ঘরের মধ্যে; আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَقَرۡنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجۡنَ تَبَرُّجَ ٱلۡجَٰهِلِيَّةِ ٱلۡأُولَىٰۖ [سورة الأحزاب: 32-33]

“আর তোমরা স্বগৃহে অবস্থান করবে এবং প্রচীন (জাহেলী) যুগের মতো নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়াবে না।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৩৩] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

 «المرأة عورة فإذا خرجت استشرفها الشيطان»

“নারী হলো গোপনীয় (তথা লজ্জার) বস্তু। সুতরাং সে যখন বের হয়, তখন শয়তান তার দিকে উঁকি দেয়।”

২. নারীর জন্য কিছু বিশেষ নিয়মনীতি রয়েছে, সে যেখানেই তার দাওয়াতী কর্মতৎপরতা পরিচালনা করুক না কেন, তাকে অবশ্যই সেসব নিয়মনীতির প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে; তন্মধ্য থেকে কিছু বিষয় হলো:

(ক) চেহারা ও দুই হাতের তালু ঢেকে রাখার শর্তসহ শর‘ঈ পর্দার প্রয়োজনীয়তা ও বাধ্যবাধকতা; আর চেহারা হলো সৌন্দর্যের স্থান এবং পরিচয় লাভের জায়গা, আর তা ঢেকে রাখার বাধ্যবাধকতার ওপর অনেক দলীল-প্রমাণ রয়েছে।

(খ) মাহরাম পুরুষ ব্যতীত তার ভ্রমণ করা হারাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«لا تسافر المرأة إلا مع ذي محرم»

“মাহরম পুরুষের সঙ্গে ছাড়া নারী যেন ভ্রমণ না করে।”

(গ) অপরিচিত পুরুষের সাথে একাকী নির্জনে অবস্থান করা হারাম। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

« لاَ يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلاَّ وَمَعَهَا ذُو مَحْرَمٍ ». و في رواية : «لا يخلون رجل بامرأة إلا كان ثالثهما الشيطان»

“মাহরমের উপস্থিতি ব্যতীত কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে নির্জনে সাক্ষাত করবে না।” অপর এক বর্ণনায় আছে: “কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে নির্জনে সাক্ষাত করবে না। কিন্তু এমনটি করলে, তাদের তৃতীয় জন হবে শয়তান।”

(ঘ) অপরিচিত পুরুষদের সাথে তারা মেলামেশা হারাম। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদেরকে লক্ষ্য করে বলেছেন:

«اسْتَأْخِرْنَ فَإِنَّهُ لَيْسَ لَكُنَّ أَنْ تَحْقُقْنَ الطَّرِيقَ عَلَيْكُنَّ بِحَافَاتِ الطَّرِيقِ». فَكَانَتِ الْمَرْأَةُ تَلْتَصِقُ بِالْجِدَارِ حَتَّى إِنَّ ثَوْبَهَا لَيَتَعَلَّقُ بِالْجِدَارِ مِنْ لُصُوقِهَا بِهِ.». 

“তোমরা (রাস্তায় চলার সময়) পিছে পিছে চল, কেননা তোমাদের জন্য রাস্তার মাঝখান দিয়ে হাঁটার সুযোগ নেই। তোমাদের দায়িত্ব হলো রাস্তার পাশ দিয়ে পথ চলা। অতঃপর নারী প্রচীরের সাথে মিশে পথ চলত, এমনকি সে প্রাচীরের সাথে মিশে চলার কারণে তার কাপড় প্রাচীরের সাথে ঝুলে যেত।”

(ঙ) অভিভাবকের অনুমতি ব্যতীত নারী কর্তৃক তার ঘর থেকে বের হওয়া হারাম।… এগুলো ছাড়াও শরী‘আতের আরও নিয়ম-কানূন রয়েছে, যাতে ক্রটিবিচ্যুতি করা বৈধ নয়।

৩. ইসলামের শত্রুগণ এই অধিক সংবেদনশীল শিরায় আঘাত করে, আর তারা এই ধরনের বিধিবিধানগুলোকে ইসলাম নারীকে অপমানিত ও লাঞ্ছিত করেছে বলে চিত্রিত করার প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহার করে এবং ইসলামের দা‘ঈদের কেউ কেউ এর দ্বারা প্রভাবিত হয়। ফলে এই বিষয়ে তারা ইসলামের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে পড়ে। সুতরাং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘য়াতের দা‘ঈদের নিকট জোর তাগিদ হলো: এই ব্যাপারে জরুরি ভিত্তিতে শৃঙ্খলা রক্ষা করা এবং সমাজের খেয়ালখুশি ও কামনা-বাসনা দ্বারা প্রভাবিত না হওয়া।

তিরমিযী, তিনি আবদুল্লাহ ইবন মাস‘উদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেন, অধ্যায়: দুগ্ধপান (كتاب الرضاع), পরিচ্ছেদ: শয়তান কর্তৃক নারীর দিকে উঁকি দেওয়া যখন সে বের হয় ( باب استشراف الشيطان المرأة إذا خرجت), বাব নং ১৮, হাদীস নং ১১৭৩; ইমাম তিরমিযী বলেন, এই হাদীসটি হাসান, গরীব। সহীহ বুখারী, অধ্যায়: হজ (كتاب الحج), পরিচ্ছেদ: নারীদের হাজ্জ (باب حج النساء), বাব নং ৩৭, হাদীস নং ১৭৬৩; সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: হজ (الحج), পরিচ্ছেদ: হাজ্জ ও অন্যান্য কাজে মুহাররম পুরুষের সাথে নারীর ভ্রমণ করা (باب سَفَرِ الْمَرْأَةِ مَعَ مَحْرَمٍ إِلَى حَجٍّ وَغَيْرِهِ), বাব নং ৭৪, হাদীস নং ৩৩২২। সহীহ বুখারী, অধ্যায়: বিবাহ (كتاب النكاح), পরিচ্ছেদ: মাহরমের উপস্থিতি ব্যতীত কোন পুরুষ কোনো নারীর সাথে নির্জনে সাক্ষাত করবে না এবং স্বামীর অনুপস্থিতিতে কোন নারীর কাছে কোন পুরুষের গমন (হারাম) (باب لا يخلون رجل بامرأة إلا ذو محرم والدخول على المغيبة), বাব নং ১১০, হাদীস নং ৪৯৩৫; সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: হজ (الحج), পরিচ্ছেদ: হজ ও অন্যান্য কাজে মুহাররম পুরুষের সাথে নারীর ভ্রমণ করা (باب سَفَرِ الْمَرْأَةِ مَعَ مَحْرَمٍ إِلَى حَجٍّ وَغَيْرِهِ), বাব নং ৭৪, হাদীস নং ৩৩৩৬। তিরমিযী, অধ্যায়: দুগ্ধপান (كتاب الرضاع), পরিচ্ছেদ: স্বামীর অনুপস্থিতিতে কোনো নারীর কাছে কোনো পুরুষের গমন অপছন্দ হওয়ার ব্যাপারে যা এসেছে (باب ما جاء في كراهية الدخول على المغيبات), বাব নং ১৬, হাদীস নং ১১৭১।আবূ দাউদ, অধ্যায়: শিষ্টাচার (الأدب), পরিচ্ছেদ: রাস্তার মধ্যে পুরুষদের সাথে নারীদের পথ চলা প্রসঙ্গে (باب فِى مَشْىِ النِّسَاءِ مَعَ الرِّجَالِ فِى الطَّرِيقِ), বাব নং ১৮১, হাদীস নং ৫২৭৪।

৪. দাওয়াত ও সাধারণ ময়দানের শীর্ষস্থানীয় নেতা হওয়ার ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, তা পুরুষদের জন্য নির্ধারিত, যেমন অবস্থা ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে এবং পরবর্তী শ্রেষ্ঠ যুগসমূহে। আর ইতিহাসে নারীদের দাওয়াত সংক্রান্ত স্বতন্ত্র যে সকল নমুনা বর্ণিত হয়েছে, তার সাথে পুরুষদের ব্যাপারে যা বর্ণিত হয়েছে, তার কখনও তুলনা হয় না, আর এটা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীরই প্রতিপাদন। তিনি বলেন,

«كمل من الرجال كثير ولم يكمل من النساء إلا آسية امرأة فرعون ومريم بنت عمران وإن فضل عائشة على النساء كفضل الثريد على سائر الطعام». 

“পুরুষদের মধ্যে অনেকেই পূর্ণতা লাভ করেছেন, কিন্তু মহিলাদের মধ্যে ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া ও মারইয়াম বিনত ইমরান ‘আলাইহিস সালাম ছাড়া আর কেউ পূর্ণতা লাভ করতে পারেন নি। আর নিঃসন্দেহে অপরাপর নারীদের ওপর আয়েশার ফযীলত অন্যান্য খাদ্যের ওপর ‘সারীদ’ এর ফযীলতের মতো।”

গোশত ও রুটি দিয়ে তৈরি খাদ্য বিশেষ। যা আরবে খুব বেশি জনপ্রিয়। [সম্পাদক] সহীহ বুখারী, অধ্যায়: নবীগণ (كتاب الأنبياء), পরিচ্ছেদ: আল্লাহ তা‘আলার বাণী: আর আল্লাহ ঈমানদারদের জন্য দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন ফিরআউনের স্ত্রীকে … আর তিনি ছিলেন অনুগত বান্দা-বান্দীদের মধ্যে অন্যতমা (باب قول الله تعالى { وضرب الله مثلا للذين آمنوا امرأة فرعون-إلى قوله-وكانت من القانتين }), বাব নং ৩৩, হাদীস নং ৩২৩০; সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: সাহাবীদের ফযীলত (فضائل الصحابة), পরিচ্ছেদ: উম্মুল মুমিনীন খাদিজা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা’র ফযীলত (باب فَضَائِلِ خَدِيجَةَ أُمِّ الْمُؤْمِنِينَ رضى الله تعالى عنها), বাব নং ১২, হাদীস নং ৬৪২৫।

৫. আর এই কথার অর্থ নারীর ভূমিকাকে রহিত করা বা উপেক্ষা করা নয়; বরং তার ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না এবং তার শান ও মর্যাদার অনেক গুরুত্ব রয়েছে, এমনকি এই আলোচনাটি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে শুধু তার এই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাকে বর্ণনা করার জন্য; কিন্তু পূর্বে আলোচিত নিয়ম-কানূনের প্রয়োজনীয়তা ও বাধ্যবাধকতাসহ।

৬. আসল নিয়ম হলো, নারী দাওয়াতী কাজ করবে তার শ্রেণীভূক্ত মেয়েদের মধ্যে। সুতরাং সে এই ক্ষেত্রে যথাযথ পদ্ধতি ও উপায়-উপকরণসমূহ ব্যবহার করবে, আর শর‘ঈ নিয়ম-কানূন ব্যতীত সে এই নীতির বাইরে যাবে না।

চতুর্থ অনুচ্ছেদ: দাওয়াতের ক্ষেত্রে সফল পদ্ধতিসমূহ:

একজন যোগ্যতাসম্পন্ন আদর্শ দা‘ঈ নারী, যিনি চান তার কথা ও কাজ তার ঘরে, সমাজে ও জাতির মধ্যে ফলপ্রসূ হউক, তার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উচিৎ কাজ হলো, তিনি দাওয়াতী কাজের সফল পদ্ধতিসমূহের প্রতি মনোযোগ দেবেন, যা তার কাঙ্খিত ফলাফল অর্জনের জন্য আল্লাহ সুবহানহু ওয়া তা‘আলার পরে তার জন্য সাহায্যকারী ভূমিকা রাখবে।

আর ঐসব পদ্ধতি সংক্ষেপে তা-ই, যা আল্লাহ সুবহানহু ওয়া তা‘আলা তাঁর বাণীর মাধ্যমে উল্লেখ করেছেন; তিনি বলেন,

﴿ٱدۡعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِٱلۡحِكۡمَةِ وَٱلۡمَوۡعِظَةِ ٱلۡحَسَنَةِۖ وَجَٰدِلۡهُم بِٱلَّتِي هِيَ أَحۡسَنُۚ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعۡلَمُ بِمَن ضَلَّ عَن سَبِيلِهِۦ وَهُوَ أَعۡلَمُ بِٱلۡمُهۡتَدِينَ ١٢٥[ سُورَةُ النَّحۡلِ: 125]

“তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান কর হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে তর্ক করবে উত্তম পন্থায়। তোমার প্রতিপালক সেই ব্যক্তি সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত, যে ব্যক্তি তাঁর পথ ছেড়ে বিপথগামী হয় এবং কারা সৎপথে আছে, তাও তিনি সবিশেষ অবহিত।” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ১২৫]

এই আয়াতের মধ্যে দাওয়াতের সফল পদ্ধতিসমূহের সারসংক্ষেপ আলোচিত হয়েছে, আর তা হলো:  

  • হিকমত তথা প্রজ্ঞা বা কৌশল: আর এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো বস্তুকে তার যথাযথ স্থানে রাখা, আর হিকমতের উদাহরণ হলো: নফস বা নিজকে নিয়ন্ত্রণ, ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ও বুদ্ধিমত্তার সাথে পরস্পরিক লেনদেন। আর দাওয়াতের ক্ষেত্রে হিকমত বা কৌশল হলো:
  •  দাওয়াতের জন্য উপযুক্ত সময় বাছাই করা।
  • উপযুক্ত স্থান বাছাই করা। কারণ, দাওয়াত গ্রহণযোগ্য হওয়ার ব্যাপারে তার প্রভাব রয়েছে।
  • উপযুক্ত বিষয় নির্বাচন করা; আর যখনই তাদের সাথে আলোচিত বিষয়টি হবে বাস্তবমুখী, তখন তা হবে সর্বোত্তম, সর্বশ্রেষ্ঠ এবং গ্রহণযোগ্য হওয়ার সবচেয়ে নিকটতর।
  • শরী‘আতের নিয়মনীতি ও দলীল-প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত বিধিবিধান দ্বারা সুবিন্যস্ত সহজ নিয়মের অনুসরণ করা। তাতে অনুসরণ করা হবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীর, তিনি বলেন,

«يسروا ولا تعسروا وبشروا ولا تنفروا ».

“তোমরা (দীনের ব্যাপারে) সহজ পন্থা অবলম্বন করবে, কঠিন পন্থা অবলম্বন করবে না, মানুষকে সুসংবাদ শুনাবে, বিরক্তি সৃষ্টি করবে না।”

সহীহ বুখারী, অধ্যায়: ইলম (كتاب العلم), পরিচ্ছেদ: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়ায-নসীহতে, ইলম শিক্ষাদানে উপযুক্ত সময়ের প্রতি লক্ষ্য রাখতেন, যাতে লোকজন বিরক্ত না হয়ে পড়ে (باب ما كان النبي صلى الله عليه و سلم يتخولهم بالموعظة والعلم كي لا ينفروا), বাব নং ১১, হাদীস নং ৬৯; সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: জিহাদ ও এর নীতিমালা (الجهاد والسير), পরিচ্ছেদ: সহজ পন্থা অবলম্বন ও বিরক্তিকরণ পরিহার করার নির্দেশ (باب فِى الأَمْرِ بِالتَّيْسِيرِ وَتَرْكِ التَّنْفِيرِ), বাব নং ৩, হাদীস নং ৪৬২২।

  • দাওয়াত ও তাবলীগ তথা প্রচারের ক্ষেত্রে ক্রমধারা অবলম্বন করা এবং ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়া। কারণ, মানুষের মন অনুশীলনের প্রয়োজন অনুভব করে এবং আস্তে আস্তে অগ্রসর হয়; আর তা মু‘য়ায ইবন জাবাল রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণিত হাদীসের বক্তব্যের অনুসরণে, যখন তাঁকে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়ামানে প্রেরণ করেছিলেন, তখন তিনি তাঁকে উদ্দেশ্য করে বললেন:

« ادعهم إلى شهادة أن لا إله إلا الله وأني رسول الله فإن هم أطاعوه لذلك فأعلمهم أن الله قد افترض عليهم خمس صلوات في كل يوم وليلة فإن هم أطاعوه لذلك فأعلمهم أن الله افترض عليهم صدقة في أموالهم تؤخذ من أغنيائهم وترد على فقرائهم ». (أخرجه البخاري و مسلم).                   

“তুমি তাদেরকে এ কথার সাক্ষ্য দিতে আহ্বান করবে যে, আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত কোনো হক উপাস্য নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল। সুতরাং তারা যদি এ ব্যাপারে আনুগত্য করে, তবে তাদেরকে অবহিত করবে যে, নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা তাদের ওপর দিনে ও রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন। সুতরাং তারা যদি এ ব্যাপারেও আনুগত্য করে, তবে তাদেরকে অবহিত করবে যে, নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা তাদের ওপর যাকাত ফরয করে দিয়েছেন, যা তাদের ধনীদের নিকট থেকে গ্রহণ করা হবে এবং তাদের দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করা হবে।” সুতরাং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে তাদের মাঝে শরী‘আতের বিধান পেশ করার ক্ষেত্রে ক্রমধারা অবলম্বন করার নির্দেশ দিয়েছেন, অনরূপভাবে যোগ্যতাসম্পন্ন পুরুষ ও মহিলা দা‘ঈগণও ক্রমধারা অবলম্বন করবেন। আর এই ক্রমধারার ওপর ভিত্তি করে দাওয়াতের ক্ষেত্রে প্রথম সারির বিষয়গুলোর প্রতি মনোযোগ দিতে হবে এবং প্রথমে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তারপরে দ্বিতীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং এভাবে ক্রমান্বয়ে…।  

আর হিকমত তথা কৌশলের মধ্য থেকে অন্যতম আরও একটি দিক হলো, কল্যাণকর ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখা। সুতরাং কল্যাণকর জিনিস আহরণ করার চেয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী বিষয়টি দমন করার ব্যাপারটি প্রাধান্য পাবে। আর দু’টি কল্যাণকর বিষয়ের মধ্যে দ্বন্দ্বের সময় উভয়টির সর্বোচ্চটির প্রতি দৃষ্টি দেওয়া হবে; আর দু’টি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী বিষয়ের মধ্যে দ্বন্দ্বের সময় উভয়টির মধ্যে যেটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকারক, তা থেকে দূরে থাকতে হবে এবং অনুরূপভাবে। আর যোগ্যতাসম্পন্ন আদর্শ দা‘ঈ নারী হলেন এমন, যিনি এই পরিমাপক যন্ত্রের সাহায্যে বিষয়গুলো ওজন করবেন।

সহীহ বুখারী, অধ্যায়: যাকাত (كتاب الزكاة), পরিচ্ছেদ: যাকাত আবশ্যক হওয়া প্রসঙ্গে (باب وجوب الزكاة), বাব নং ১, হাদীস নং ১৩৩১; সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: ঈমান (الحج), পরিচ্ছেদ: শাহাদাতাঈন ও ইসলামের বিধিবিধানের দিকে আহ্বান করা (باب الدُّعَاءِ إِلَى الشَّهَادَتَيْنِ وَشَرَائِعِ الإِسْلاَمِِ), বাব নং ৯, হাদীস নং ১৩০। দ্রষ্টব্য: মু‘য়ায ইবন জাবাল রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’র হাদীসকে কেন্দ্র করে আমি যে স্বতন্ত্র পুস্তিকা লিপিবদ্ধ করেছি। সুতরাং আমি তাতে এর তাৎপর্য সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।

  • উত্তম উপদেশ: তার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো দাওয়াতপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নিকট দাওয়াত পেশ করার সময় সুন্দর, কোমল ও আন্তরিকতাপূর্ণ কথার অনুসরণ করা। আর দাওয়াতপ্রাপ্ত ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব ও যে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে সে অবস্থান করছে, তার আলোকে বক্তব্য নির্বাচন করা, আর ব্যক্তিকে উৎসাহিত ও সাবধান করার ক্ষেত্রে উত্তম উপদেশের মধ্যে দলীল-প্রমাণের সংযুক্তিও অন্তর্ভুক্ত হবে।

আর উত্তম উপদেশের মধ্যে কিচ্ছা-কাহিনীও থাকবে। কেননা আল-কুরআন ও সুন্নাহ’র মধ্যে বহুবার কিচ্ছা-কাহিনীর আলোচনার পুনারাবৃত্তি হয়েছে, আর সেই কাহিনীগুলো হবে এমন, যেগুলোতে উপদেশ ও শিক্ষা থাকবে, তবে শর্ত হলো, সেই কাহিনীগুলো বিশুদ্ধ হওয়া। কারণ, গল্পকাররা যেসব খারাপ ও নিষেধাজ্ঞায় নিপতিত হয়েছে তা কেবল এমন কিচ্ছা-কাহিনীর ওপর নির্ভর করার কারণেই, যা আল-কুরআন ও সুন্নাহ’র মধ্যে বর্ণিত হয় নি।

আর উত্তম উপদেশের মধ্যে রয়েছে মানুষকে এমন বক্তব্যের মাধ্যমে সম্বোধন করা, যে সম্বোধনটি তারা পছন্দ করে; যেমন মহিলা দা‘ঈ মানুষের মধ্য থেকে বিশেষ কোনো নারীকে বলবে: হে অমুকের মা, হে আমার বোন, হে বিশ্বস্ত মুমিন (নারী)… এবং সাধারণভাবে মানুষকে বলবে: হে প্রিয় বোনেরা, হে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী নারীরা এবং অনুরূপভাবে…।

আর পরিতুষ্টকারী পদ্ধতি ব্যবহার করাও উত্তম উপদেশের অন্তর্ভুক্ত। যেমন, কসম বা শপথের মাধ্যমে তাগিদ দেওয়া, প্রয়োজনের মুহূর্তে কথাকে পুনরাবৃত্তি করা ইত্যাদি।

  • সর্বোত্তম পদ্ধতিতে বিতর্ক করা: আর বিতর্ক হলো পরস্পর যুক্তি ও দলীল-প্রমাণের মাধ্যমে লড়াই করা অথবা প্রতিপক্ষকে বাধ্য করার জন্য বক্তৃতা ও কথাবার্তার ক্ষেত্রে বিতর্ক করা।

আর কয়েকটি ক্ষেত্রে বিতর্কের ব্যবহার হতে পারে, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু দিক হলো:

  • সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বিরোধকারীর সাথে বিতর্ক; আর এই বিরোধকারী ব্যক্তির অবস্থার আলোকে বিতর্ক পরিচালিত হবে। সুতরাং বিরোধকারী ব্যক্তি যদি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী হয়, তবে তার সাথে বিতর্ক পরিচালিত হবে ঈমান ভিত্তিক, আর সে যদি বুদ্ধিজীবী হয়, তবে তার সাথে বিতর্ক পরিচালিত হবে বুদ্ধি ভিত্তিক দলীল-প্রমাণের মাধ্যমে।
  • সাধারণ মানুষের সাথে বিতর্ক হবে, এমন কিছু দ্বারা যা তারা বুঝতে পারে এবং তাদের সাথে কথা বলার অবস্থাটি এর অন্তর্ভুক্ত হবে, যেমন এই কথা বলা: ‘বক্তা যদি এরূপ বলে, তবে এই রকম বলা হবে’।
  • ছাত্রীদের সাথে বিতর্ক হবে তাদেরকে বিতর্ক, বাদানুবাদ ও অনুরূপ বিতর্কমূলক কিছুর পদ্ধতির প্রশক্ষিণদানের জন্য।

আর এক্ষেত্রে নিম্নলিখিত আদব-কায়দা ও শিষ্টাচারপূর্ণ বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ্য করা আবশ্যক:

  • দলিল-প্রমাণের সংযুক্ত করা।
  • বিতর্ককারী ব্যক্তির ওপর কথা অথবা কাজের দ্বারা সীমালংঘন না করা।
  • বক্তব্যকে এমন অর্থে না নিয়ে যাওয়া যা বক্তব্য সমর্থন করে না।
  • মিথ্যা কথা না বলা।
  • শান্ত থাকা এবং উত্তেজিত না হওয়া।
  • সত্যকে মেনে নেয়া।
  • বিষয়বস্তুর বাইরে না যাওয়া।
  • ধারণাকে সুন্দর করা।

তাকওয়া তথা আল্লাহ সচেতনতার প্রতি এমনভাবে লক্ষ্য রাখা যে, অচিরেই বান্দাকে তার বক্তব্যের ব্যাপারে হিসাবের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে; যদি  ভালো হয়, তবে পরিণতি  ভালো হবে, আর যদি মন্দ হয়, তবে পরিণতিও মন্দ হবে।

পঞ্চম অনুচ্ছেদ: নারীর দাওয়াতী ক্ষেত্রসমূহ থেকে:

পূর্বে প্রস্তাবিত দাওয়াতী ক্ষেত্রসমূহের কিছু উল্লেখযোগ্য ও প্রসিদ্ধ দিক নিম্নে পেশ করা হলো:

১. সরকারী ও বেসরকারী বালিকা বিদ্যালয়সমূহ।

২. সৎকাজের আদেশ ও অসৎকর্মে নিষেধকারী সংস্থাসমূহ।

৩. নারীদের হিফযুল কুরআন মাদরাসা ও কোর্সসমূহ।

৪. স্বাস্থ্যবিষয়ক সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ।

৫. শর‘ঈ নিয়মনীতির আলোকে নারীর জন্য উপযুক্ত গণমাধ্যমকে (পঠিত ও শ্রুত) কাজে লাগানো।

৬. আবাসিক গৃহ।

৭. মাসজিদ।

৮. নারী সঙ্ঘ।

৯. হজের কাফেলা ইত্যাদি।

আর এই প্রাণবন্ত প্রস্তাবনাটি অচিরেই সীমিত পয়েন্ট আকারে ও সংক্ষিপ্তভাবে উপস্থাপন করা হবে, তবে তা নির্ধারিত ক্ষেত্রসমূহ, প্রত্যেক ক্ষেত্রে কাজের ধরণ-প্রকৃতি এবং সময় ও স্থানের জন্য উপযুক্ত বিবেচনা করে উন্নতকরণ ও পুনর্বিন্যাসের দাবী রাখে:

১. সরকারী ও বেসরকারী বালিকা বিদ্যালয়সমূহ:

শিক্ষিকার দায়িত্ব ও কর্তব্য প্রসঙ্গে যা আলোচনা হয়েছে, তা সত্ত্বেও এমন কিছু সুস্পষ্ট প্রাণবন্ত বিষয়ের উল্লেখ করা যায়, যেগুলো বালিকা বিদ্যালয়সমূহের অভ্যন্তরে নারীর জন্য উপস্থাপন করা সম্ভব:

১. কিছু সিডি/ক্যাসেট অথবা বাছাই করা পুস্তিকা তার প্রস্তাবনার ভিত্তিতে সৌজন্য কপি হিসেবে অথবা কোনো একজন শিক্ষিকার মাধ্যমে বিতরণ করা।

২. কিছু সংখ্যক শিক্ষিকাকে বিভিন্ন প্রকার প্রতিযোগিতার প্যাকেজ ছেড়ে দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করা। যেমন, হিফযুল কুরআন অথবা সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা অথবা বিভিন্ন প্রকার উপদেশমূলক প্রচারপত্র ও বার্ষিকী সংকলনের প্রকাশনা উপলক্ষে রচনা লিখন অথবা কিছু সংখ্যক কিতাবের সারাংশ লিখন প্রতিযোগিতা… ইত্যাদি।

৩. বিভিন্ন প্রকার জনকল্যাণমূলক মেলার আয়োজন করা এবং তার মধ্য দিয়ে কিছু সিডি/ক্যাসেট বা বই-পুস্তক প্রদর্শন করা; আর একই সাথে কোনো একজন শিক্ষিকা অথবা পরিচালিকার দ্বারা সেমিনার বা সিম্পোজিয়ামের ব্যবস্থা করা।

৪. কিছু সংখ্যক সক্রিয় শিক্ষিকাকে ছাত্রীদের জন্য বিদ্যালয়ে নির্ধারিত মুসাল্লা তথা সালাত আদায় করার জায়গায় নিয়মিত দারস বা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার জন্য উৎসাহিত করা।

৫. মুসাল্লা (সালাতের আদায়ের স্থান) ভিত্তিক সংঘ প্রতিষ্ঠা করার জন্য কোনো একজন শিক্ষিকাকে উৎসাহিত করা, যাতে বিদ্যালয়ের উপদেশ ও দিকনির্দেশনামূলক দিকগুলো প্রাণচঞ্চল করা যায়।

৬. শিক্ষিকাদের মাঝে যোগাযোগ ও দেখা-সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা, যাতে বিদ্যালয়ে দাওয়াতী কর্মসূচী পালন করার ব্যাপারে আলোচনা করা যায়।

৭. বিদ্যালয় ও কলেজসমূহে উপকারী সিডি/ক্যাসেট ও পুস্তিকাসমূহ বিক্রয়ের জন্য একটা গ্রুপ বা স্টাফ তৈরি করা।

৮. বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের নিকট থেকে ময়দানে প্রশিক্ষণকালীন সময়ের মধ্যে দাওয়াতী প্রেরণা লাভের উদ্দেশ্যে জ্ঞান লাভ করা।

৯. ইসলামী বিভিন্ন সমিতি ও সংস্থার সাথে সমন্বয় সাধন করা; যাতে কিছু সংখ্যক প্রদর্শনী মেলা এবং ইসলামী বিশ্বের সমস্যা ও ক্ষত-যখম-আঘাতসমূহ সম্পর্কে পরিচিত করে তোলা যায় এবং তাদের জন্য অনুদান সংগ্রহের সাথে সাথে তাদের মধ্যে ইসলামী চেতনা পুনরুজ্জীবনের ক্ষেত্রে তা থেকে ফায়দা হাসিল করা যায়।

১০. বেসরকারী মাদরাসাসমূহের পরিচালকদের নিকট আল-কুরআন ও আরবি ভাষার সাথে সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত দারস বা পাঠ তৈরির জন্য প্রস্তাব দেওয়া, যেমনটি কোনো কোনো মাদরাসায় চালু রয়েছে।

১১. বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ রেডিওর মধ্য থেকে যা উপকারী, তার থেকে ফায়দা হাসিল করা; চাই তা সকাল বেলার এসেম্বলীর মাধ্যমে হোক অথবা বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে কোনো ক্লাসের কর্মতৎপরতার মাধ্যমেই হোক।

১২. নেতিবাচক বাহ্যিক দৃশ্য ও  শরী‘আত বিরোধী কর্মকাণ্ডের নযরদারী করা, যা কখনও কখনও ছাত্রীদের মধ্যে পাওয়া যায় এবং এই বাহ্যিক দিকগুলো প্রতিকারের জন্য প্রচারপত্র অথবা বুকলেট বা পুস্তিকা তৈরি করা। আর এ ব্যাপারে যে বিষয়গুলোতে বেশি গুরুত্ব প্রদান করা যায়, তা হলো: “টেলিফোনে কথা চালাচালি, অপ্রচলিত বা অসামাজিক সম্পর্ক, আত্মতুষ্টি বা গর্ব ও পর্দার ক্ষেত্রে শৈথিল্য”।

১৩. ছাত্রী ও শিক্ষিকাদেরকে বিভিন্ন বার্ষিক ইসলামী ম্যাগাজিন সংগ্রহে রাখার ব্যাপারে উৎসাহিত করা।

১৪. বার্ষিক ইসলামী বই ও সিডি মেলার আয়োজন করা।

১৫. বিদ্যালয়ে “প্রতিক্ষার ব্যাগ” ভর্তি করে রাখা, যাতে শিক্ষিকা অপেক্ষাকালীন সময়ে ব্যাগ থেকে ফায়দা হাসিল করতে পারে; আর শ্রেণির ছাত্রীদের সংখ্যা অনুপাতে ব্যাগের ভিতরে পুস্তিকা (গল্প বা উপন্যাস জাতীয়) এবং প্রতিযোগিতার বই-পুস্তকের মধ্য থেকে প্রতিযোগিতামূলক বইসমূহ থাকবে। আর শিক্ষিকা ছাত্রীদেরকে পুস্তিকাসমূহ পাঠ করার দায়িত্ব অর্পণ করবেন অথবা তিনি প্রতিযোগিতার বই-পুস্তকের মধ্যে সময়ে সময়ে পস্তিকাসমূহে পরিবর্তন করে আগ্রহ সৃষ্টিসহকারে তাদের জন্য প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করবেন।

১৬. কার্য পরিকল্পনার দলীল বা রেকর্ড লিখিত আকারে সংরক্ষণে রাখা, যা এমন কিছু বিনোদনমূলক বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করবে, যার মধ্য থেকে স্বাধীন কর্মকাণ্ডের ক্লাসে সহজেই উপকৃত হওয়া যায় অথবা এই ক্লাসে দাওয়াতদানে প্রসিদ্ধ কোনো মহিলা দাওয়াতদানকারিনীকে বিদ্যালয়ে আহ্বান করার ব্যাপারে সমন্বয় সাধন করা।

১৭. শিক্ষিকাদের কক্ষসমূহকে উপযুক্ত কিছু ম্যাগাজিন বা সাময়িকী দ্বারা সমৃদ্ধশালী করা। তার সাথে বিভিন্ন উপলক্ষে প্রকাশিত ছোট ছোট পুস্তিকাসমূহও থাকতে পারে।

২. সৎকাজের আদেশ ও অসৎকর্মে নিষেধ করা:

নারীকে সঠিক দিক-নির্দেশনা প্রদান এবং তার সাথে সংশ্লিষ্ট অশ্লিলতা থেকে মুক্তির আন্দোলনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকর্মে নিষেধ করার বড় ধরণের ভূমিকা রয়েছে; তন্মধ্যে কিছু দিক হলো:

(ক) মুসলিম নারীকে এমন দিক-নির্দেশনা প্রদান করা, যা তাকে তার ধর্মীয় ব্যাপারে উপকৃত করবে এবং তাকে এমন মতামত বা পরমর্শ দেওয়া, যা তাকে তার পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে উপকৃত করবে।

(খ) বাইরের দেশে ভ্রমণ করা এবং তা থেকে যে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়, তার ভয়াবহ বর্ণনা পেশ করা।

(গ) অভিভাবকগণকে উৎসাহ দেওয়া, যাতে তারা তাদের স্ত্রী ও কন্যাদেরকে মাহরাম ব্যতীত সফর করতে না দেয়।

(ঘ) কিছু গণমাধ্যম ও মিডিয়ার ভয়াবহ দিক বর্ণনা করা। যেমন, ডিশ-এন্টিনা, ভিডিও, টেলিভিশন এবং কুরুচিপূর্ণ ম্যাগাজিন।

(ঙ) যেসব স্থানে নারীদের একত্রিত হওয়ার মধ্যে অশ্লিলতা ও বেহায়াপনার মত কাজ হয়, সেসব স্থানের ব্যাপারে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা (বিদ্যালয়, বাজার বা মেলা, বাগান বা পার্ক এবং বিনোদন কেন্দ্রসমূহ

(চ) ক্লিনিক ও হাসপাতালসমূহের মধ্যে যেসব  শরী‘আত বিরোধী কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়, সে সম্পর্কে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা।

৩. নারীদের হিফযুল কুরআন মাদরাসা ও মক্তবসমূহ:

এই বরকতময় দেশ ও অন্যান্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হিফযুল কুরআন বা তাহফিযুল কুরআন মাদরাসা ও মক্তব ছড়িয়ে পড়েছে এবং বিভিন্ন বয়স ও শিক্ষা-সাংস্কৃতির দিক থেকে বিভিন্ন স্তরের নারীদের অনেকে সেসব মাদরাসা ও মক্তবে আসা-যাওয়া করে থাকে। সেখানকার দাওয়াতী ক্ষেত্রের বা দাওয়াতকে সহযোগিতার কথা নিম্নলিখিতরূপে উল্লেখ করা যেতে পারে:

১. নারীদের জন্য হিফযুল কুরআনের আসরে সহযোগিতার জন্য কল্যাণকামীদেরকে উৎসাহিত করা এবং আরও উৎসাহিত করা এসব আসরের সাহায্যার্থে ওয়াকফকারী ব্যক্তি খুঁজে বের করতে কাজ করা।

২. এসব মাদরাসার তত্ত্বাবধায়ক কমিটিতে অংশগ্রহণ করা অথবা তার পরিচালনায় অংশগ্রহণ করা অথবা তার কোনো কোনো মাদরাসার কোনো কোনো আসরের তত্ত্বাবধান করা।

৩. হিফযুল কুরআন বা তাহফিযুল কুরআন মক্তবসমূহের জন্য সিলেবাস বা পাঠপরিকল্পনা তৈরি করা এবং আসরগুলো চালানোর জন্য পরিকল্পনা তৈরি করা।

৪. মহল্লার এসব মাদরাসার মধ্যে সমন্বয় সাধন ও সেতু বন্ধনের কাজ করা।

৫. প্রত্যেক এলাকায় বিভিন্ন বক্তৃতা ও শিক্ষাদানে ছাত্রীদের সাথে অংশগ্রহণ করা এবং উপযুক্ত দিক-নির্দেশনা প্রদানকারিনীদের কারও কারও কাছ থেকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপকৃত হওয়া।

৬. পরিবার ও বোনদেরকে শিক্ষাদানের কাজে উদ্বুদ্ধ করা এবং হিফযুল কুরআন বা তাহফিযুল কুরআন মাদরাসাসমূহে সক্রিয় অংশগ্রহণ করা।

৭. শর‘ঈ নিয়ম-কানূন প্রাণবন্তকরণমূলক কোর্সের আয়োজন করা এবং ঐসব মাদরাসার শিক্ষিকা ও প্রশাসনিক মহিলা কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরকে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।

৮. নারী দা‘ঈ তৈরির উদ্দেশ্যে দাওয়াতী কাজের প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করা।

৪. তথ্য ও প্রচার মাধ্যমের (পঠিত ও শ্রুত) ব্যবহার করা:

উপযুক্ত কাজ হলো, পাঠযোগ্য তথ্য ও প্রচার মাধ্যমে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো পেশ করা:

১. স্বামী-স্ত্রী ও সামাজিক সমস্যাসমূহের মতো প্রধান সমস্যাগুলো পেশ করা, যা ছোট-খাট সমস্যাগুলোর মৌল বলে বিবেচিত।

২. কিছু কিছু বিষয়ের মৌলিকত্ব প্রতিষ্ঠিত করা, যে ব্যাপারগুলো  শরী‘আত অকাট্যভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছে; যেমন, নারীর বাইরে বের হওয়া এবং তার কাজ করার বিষয়টি।

৩. এই উপস্থাপন করাটা অব্যাহতভাবে করে যেতে হবে  এবং মৌলিকভাবে হতে হবে, কোনোক্রমেই যেন তা বিপরীত প্রতিক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপিত না হয়।

৪. আরব রাষ্ট্রে নারীমুক্তি আন্দোলনের ফলাফলসমূহ ও তার নেতিবাচক প্রভাবসমূহ প্রকাশ করা।

৫. শরী‘আতের বিধানসমূহ ও সামাজিক প্রথার মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরা।

৬. এই দেশের প্রতিষ্ঠার সময়, তার মাঝখানে ও তার পরে পবিত্রা নারীদের ইতিবাচক ভূমিকা প্রকাশ করা; যেমন, ইমাম মুহাম্মাদ ইবন সা‘উদকে ইমাম মুহাম্মাদ ইবন আবদিল ওহাব রহ. এর সহযোগিতার প্রতি উৎসাহদান করার ক্ষেত্রে ইমাম মুহাম্মাদ ইবন সা‘উদের স্ত্রীর ভূমিকা।

৫. স্বাস্থ্যবিষয়ক সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ:

স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিষ্ঠানসমূহকে নারীর কর্মক্ষেত্র হিসেবে গণ্য করা হয়; আর সেখানে নারীর জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করাই রক্ষণশীল মুসলিম সমাজের আশা-আকাঙ্খা বা চাহিদা। সেখানে যে সকল দাওয়াতী কাজ করা সম্ভব তা হচ্ছে:

১. বড় হাসপাতালগুলোতে দিক-নির্দেশনা ও পথপ্রদর্শনের জন্য অফিস উদ্ভাবনের ব্যাপারে কাজ করা, যাতে সে অফিস মহিলা রোগী, দর্শনার্থী এবং তাদের সঙ্গী-সাথীর সেবা দিতে পারে; আর তাৎক্ষণিকভাবে কোনো কোনো হাসপাতালে প্রতিষ্ঠিত সামাজিক সেবাকেন্দ্রগুলো থেকে এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে।

২. হাসপাতালের লাইব্রেরির জন্য জ্ঞানধর্মী পুস্তকাদি ও রেফারেন্স বইয়ের সমষ্টি সরবরাহ করার কাজের সাথে সাথে ক্লিনিক ও হাসপাতালসমূহকে পুস্তকাদি ও সংশ্লিষ্ট উপকারী স্টিকারাদি দ্বারা সমৃদ্ধশালী করা।

৩. তথ্য ও প্রচার মাধ্যমে সময়ে সময়ে হাসপাতালের সাথে সংশ্লিষ্ট এবং এই কেন্দ্রীক যেসব লেখার প্রচার ও প্রকাশ হয় তা অনুসরণ করা এবং এ ব্যাপারে লেখালেখি করা।

৬. আবাসিক গৃহ:

প্রভাবের দিক দিয়ে তা হলো শ্রেষ্ঠ ময়দান ও মাধ্যম। আর অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, আল্লাহ তা‘আলা স্বামী ও স্ত্রীর প্রত্যেককেই তার ঘরের দায়িত্বশীল বানিয়ে দিয়েছেন, আর অচিরেই আল্লাহ স্বামীকে তার পরিবার-পরিজন ও তার স্ত্রীর রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে এবং স্ত্রীকে তার পরিবার-পরিজন ও তার স্বামীর রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করবেন। আর তিনি তাদের উভয়কে নির্দেশ দিয়েছেন পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর জন্য। অপরাপর মাধ্যমসমূহের মধ্য দিয়ে দাওয়াতী কাজের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলদের পক্ষ থেকে দায়িত্ব পালন যতই কম হবে ততই তা পিতা-মাতার দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে অতিরিক্ত মাত্রা যোগ করবে। আর দায়িত্বের একটা বিরাট অংশ হলো মায়ের। যেসব দায়িত্বের মধ্যে নারী পুরুষের অংশীদার তার পরিমাণ অনেক। তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু হলো: ঈমানী প্রশিক্ষণ, জ্ঞানগত, চারিত্রিক, শারীরিক, আত্মিক, সামাজিক, লিঙ্গগত, সৎকর্মের আদেশ করা, অসৎকর্মে নিষেধ করা এবং আল্লাহ তা‘আলার দিকে দাওয়াত তথা আহ্বান করার দায়িত্ব।

আর গৃহের ব্যাপারটি অন্যান্য উপায়-উপকরণ বা মাধ্যমসমূহ থেকে আলাদা। কারণ, পরিবারের সকল সদস্য দীর্ঘ সময় ধরে একত্রে বসবাস করে থাকে; আর তাদের মধ্যে আত্মিক ও সামাজিক মিল বা সমন্বয় থাকে, ফলে সেখানে সহজেই উত্তম আদর্শ পেশ করা সম্ভব। তাছাড়া সেখানে রয়েছে পরোক্ষ দিক-নির্দেশনা দেওয়ার মাধ্যমে প্রভাবিত করার, সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের সূবর্ণ সুযোগ। আরও রয়েছে সকল প্রকার সুযোগ ও অবস্থার সদ্ব্যাবহার। আর সাধারণ মানুষের চক্ষুর অন্তরালে দিক-নির্দেশনা প্রদান ও শাস্তি দ্বারা প্রভাবিত করার মতো ব্যবস্থা। 

৭. সমাজ:

আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও অভাবীদের প্রতি ইহসান তথা অনুগ্রহ করা এবং তাদেরকে দাওয়াত ও নির্দেশনা দেওয়ার মধ্য দিয়ে একটি জাতির প্রতিটি সদস্যের মধ্যে একটি চমৎকার বন্ধন ও তাদের মধ্যে একটি শরীরের মত সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, অনুরূপভাবে কতগুলো দাওয়াতী প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে তা আারও শক্তিশালী হয়ে থাকে, যেমন, 

  • পারিবারিক পরামর্শ আদান-প্রদান কেন্দ্র।
  • পরস্পর সম্পর্ক সংস্কার কেন্দ্র।
  • কারাগারে বন্দীদের পরিবারের তত্ত্বাবধান করা।
  • বিয়ের উপযুক্ত পাত্রদের জন্য কোর্সের আয়োজন করা।

৮. মসজিদ:

যখন নারীর জন্য তার অভিভাবকের অনুমতিক্রমে মাসজিদে উপস্থিত হওয়া বৈধ-আর তার অভিভাবকের জন্য তাকে বারণ করা উচিৎ হবে না, যখন সে তার নিকট অনুমতি প্রার্থনা করে তখন মাসজিদে যে বক্তব্য পেশ করা হয়, তা থেকে এবং অপর কোনো আদর্শ সৎকর্মশীলা নারী থেকে ফায়দা হাসিল করা সম্ভব। কারণ, সাধারণতঃ মানুষের মধ্য থেকে বাছাই করা ভালো লোকরাই মাসজিদে যাওয়া-আসা করে থাকে। আর এ মাসজিদই হচ্ছে তাহফিযুল কুরআন এবং উপকারী শর‘ঈ জ্ঞান শিক্ষা ইত্যাদির আসর থেকে নারীদেরকে প্রাণবন্তকরণের জন্য যথাযথ স্থান। আর সেই প্রাণবন্তকরণের বিষয়গুলো থেকে প্রস্তাবিত কিছু দিক হচ্ছে:

১. মাসজিদে নারীদের জন্য বিশেষ আলোচনার ব্যবস্থা করা, যাতে নারীদের বিরাট একটা সংখ্যা তাতে সহজে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ পায়।

২. মহিলা দা‘ঈদেরকে আমন্ত্রণ জানানো, যাতে তারা রমযান মাসে তারাবীর সালাতের পর নারী মুসল্লীদের (নামাযীদের) মাঝে আলোচনা পেশ করতে পারেন।

৩. খতীবগণ জুমু‘আ ও অন্যান্য আলোচনার মধ্যে এমন কিছু বিষয়কে নিয়ে আসবেন, যেগুলো নারী, পরিবার, আদব-কায়দার প্রশিক্ষণ… ইত্যাদির সাথে নির্দিষ্ট।

৪. রমযান মাসে, গ্রীষ্মকালে ও বিভিন্ন উপলক্ষকে কেন্দ্র করে পারিবারিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা।

৫. মসজিদের প্রশিক্ষণ ও দাওয়াতী ভূমিকা ক্রিয়াশীল করা।

৯. নারী সঙ্ঘ:

কিছু দরিদ্র পরিবার ও কারাবন্দী পরিবারকে সাথে নিয়ে এই ধরনের সঙ্ঘ বা সমিতির জন্য কিছু কিছু কল্যাণকর উদ্যোগ গ্রহণ করা যায়, তবে তা ব্যক্তি ও বস্তুর সম্ভাব্যতার ওপর ভিত্তি করে সীমিত আকারে হবে। সুতরাং উল্লেখিত ক্ষেত্রসমূহ ও অন্যান্য ক্ষেত্রে এসব সঙ্ঘ বা সমিতি প্রাণবন্ত হয়ে উঠার সম্ভাবনা রাখে।

১০. হজের সফর:

হজের সফরে নারী বিভাগে দাওয়াতী কর্মসূচী গ্রহণ করা; আর এখানে প্রস্তাবিত বিষয়গুলো হলো:

১. অভিজ্ঞ নারী দা‘ঈদেরকে এই অভিযানে অংশগ্রহণ করার জন্য উৎসাহিত করা, যাতে তারা হজের শর‘ঈ বিধানসমূহ বর্ণনা করে দিতে পারেন এবং নারীদেরকে এমন নির্দেশনা দিতে পারেন, যা তাদেরকে উপকৃত করবে।

২. নারীর জন্য বিভিন্ন প্রকারের দাওয়াতী ও দিকনির্দেশনামূলক কর্মসূচী প্রস্তুত করা। যেমন, নারীর জন্য উপযোগী প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা, হাল্কা কথোপকথন, সিডি, পুস্তিকা ও বিভিন্ন সংকলনসমূহ প্রস্তুত করা; তারপর তা অন্যান্য কাফেলায় অংশগ্রহণকারীদের মাঝে বন্টন করা এবং তাদের মাঝেও তা কার্যকর করতে উৎসাহ প্রদান করা।

ষষ্ঠ অনুচ্ছেদ: দাওয়াত ও প্রশিক্ষণের বিষয়সমূহ:

কোনো সন্দেহ নেই যে, গোটা দীনই দাওয়াতের বিষয়, যার দিকে আহ্বান করা হয় এবং যার সম্পর্কে আলোচনা করা হয়; কিন্তু এখানে আমি নারী দা‘ঈর জন্য এমন কিছু বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করবো, যা সম্ভবত তার জন্য দাওয়াতের অনেকগুলো দ্বার উন্মোচিত করে দেবে, যাতে সে সেগুলোর মধ্য দিয়ে দাওয়াতী কাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে সক্ষম হয়। আমরা এগুলোকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করতে পারি:

প্রথম প্রকার: মূলভিত্তিগত বা বুনিয়াদী বিষয়সমূহ: তার অন্তর্ভুক্ত বিষয়সমূহ হলো:

  • আকিদা বা বিশ্বসগত বিষয়সমূহ: তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো:
  • ঈমানের রুকন বা স্তম্ভসমূহ এবং সেগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট অধ্যায় ও মাসআলাসমূহ।
  • জগত, জীবন ও মানুষ নিয়ে মুসলিম ব্যক্তির ইপ্সিত চিন্তা ও ধারণা।
  • ঈমান ও তাওহীদ তথা একত্ববাদের বিপরীত, যেমন, আল্লাহর সাথে শরীক করা, নিফাক, দীন নিয়ে ঠাট্টাবিদ্রূপ, জাদু ইত্যাদি।
  • ঈমান ও তাওহীদের চাহিদাসমূহ। যেমন, মহব্বত তথা  ভালোবাসা, আশা-আকঙ্খা, ভয়ভীতি, ধৈর্য, ইখলাস বা একনিষ্ঠতা, বন্ধুত্ব, সদ্ব্যবহার ইত্যাদি।
  • ইবাদতের বিষয়সমূহ:

যেমন, পবিত্রতা ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহ, সালাত ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহ, যাকাত, সাওম, হজ ও উমরাহ, (ফরয সালাতের সাথে সংশ্লিষ্ট) সুন্নাত সালাতসমূহ ও বিতরের সালাত, আর সকল ইবাদতের মধ্যে সকল প্রকার নফল ইবাদতসমূহ; অনুরূপভাবে পবিত্রতার বিধান ও তার সাথে আবশ্যকীয় বিষয়সমূহ।

  • পারিবারিক বিষয়সমূহ:

আর তার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহ হলো যেমন,  ভালো পরিবার গঠনের জন্য কাজকর্মসমূহ, মাতার অধিকারসমূহ, পিতার অধিকারসমূহ, সন্তানদের অধিকারসমূহ, স্বামী-স্ত্রীর অধিকারসমূহ, খাদেম বা কাজের লোকের অধিকারসমূহ, পরিবার গঠনের জন্য কাজকর্মসমূহ এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার আচার-আচরণ।

  • আচার-আচরণ ও চারিত্রিক বিষয়সমূহ:

যেমন, সুন্দর লেনদেন ও আচার-ব্যবহার, উত্তম চরিত্র, অনুগ্রহ ও অনুকম্পা, উদারতা ও দানশীলতা, সততা ও সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা, হাসিমুখে থাকা, ঘরের আদব-কায়দা, কথাবার্তা ও মজলিসের আদব-কায়দা, খাওয়ার আদব-কায়দা, ঘুমানোর আদব-কায়দা, চারিত্রিক বিষয়সমূহের মধ্যে আরও মুসলিম ব্যক্তির অধিকারসমহ, প্রতিবেশীর অধিকারসমূহ, অমুসলিমদের অধিকারসমূহ এবং রাস্তার অধিকার বা হকসমূহ।

  • দাওয়াতের পদ্ধতিগত বিষয়সমূহ:

তন্মধ্যে অন্যতম হলো: দাওয়াতের হুকুম বা বিধান, তার আবশ্যকীয় বিষয়সমূহ, তার আদব-কায়দাসমূহ, তার উপায়-উপকরণসমূহ, তার পদ্ধতিসমূহ, তার গুরুত্ব, স্বাস্থ্যকর দাওয়াতের দিকসমূহ ও অস্বাস্থ্যকর দাওয়াতি দিকসমূহ, ইলম (জ্ঞান) ও তার গুরুত্ব, ছাত্রীর আদব-কায়দা বা শিষ্টাচারিতা, ছাত্রীদের সঠিক সিলেবাস, মহিলা দা‘ঈদের কিছু কিছু রোগ এবং মহিলা দা‘ঈদের দৃঢ়তা ও স্থায়িত্বের কার্যক্রমসমূহ।

দ্বিতীয় প্রকার: নারীর সাথে নির্দিষ্ট বিষয়সমূহ:

যেমন, তার সালাত ও বক্তৃতার অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া, নারী ও নারীদের অনুষ্ঠানসমূহ, নারী ও বাজারসমূহ, নারী ও বিনোদন কন্দ্রেসমূহ, পর্দা, নারী ও শরীরচর্চা, নারী কর্তৃক তার বাচ্চাদের লালনপালন ও প্রশিক্ষণ, নারী কেন্দ্রীক ইসলামের শত্রুদের ষড়যন্ত্র, প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে নারী, সংস্কারমূলক কাজে নারীর ভূমিকা এবং এই ক্ষেত্রে তার আদব-কায়দা ও বিধিবিধানসমূহ, সাংস্কৃতিক ময়দানে নারীর অংশগ্রহণ; নারীর নিজের জন্য জ্ঞানগত ও দাওয়াতী ভিত তৈরি করা, নারীর দৃঢ়তা ও স্থায়িত্ব এবং দীনের ওপর অটল থাকার কার্যক্রমসমূহ ইত্যাদি। 

তৃতীয় প্রকার: ক্রুটিপূর্ণ উপলব্ধিগত বিষয়সমূহ:

ইসলামী চিন্তা ও পরিকল্পনার ঘাটতি; দীনের বিধিবিধানের ব্যাপারে মুসলিম নারীর অজ্ঞতা, দায়িত্ব ও কর্তব্যে পালনে দুর্বলতা, এই দুর্বল কর্মকাণ্ডসমূহ ও তার প্রতিকার, শয়তান ও তার ষড়যন্ত্রসমূহ, নারী ঘরের বাইরে বের হওয়া ও তার কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে ত্রুটিপূর্ণ বুঝ বা উপলব্ধি, চিন্তা-ভাবনা ও নৈতিকতার যুদ্ধ, নারীর ওপর দুশ্চরিত্রবানদের হামলা।

চতুর্থ প্রকার: বিশেষ শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়সমূহ:

আর এটা শুধু ছাত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট, যেমন, তাফসীর অথবা সে বিষয়ে বিশেষ কোর্স অথবা হাদীস ও উসূলুল হাদীস অথবা ফিকহ অথবা (সহীহ) আকীদা ও বিপরীত আকীদা অথবা এসব বিষয়ের মূলনীতিমালার ক্ষেত্রে একটি বিশেষ পাঠপরিকল্পনা তৈরি করা। আর অনুরূপভাবে সীরাত, ইলমে নাহু (আরবি ব্যাকরণ সংক্রান্ত), সাহিত্য, ইতিহাস অথবা সাধারণ সংস্কৃতি ইত্যাদির ক্ষেত্রেও একটি বিশেষ পাঠপরিকল্পনা তৈরি করা। আর পরিশেষে আমি বলব: নিশ্চয় একজন মুসলিম মহিলা বিচক্ষণ দা‘ঈর কর্তব্য হলো, সে এমন একটি কর্মসূচী বাছাই করবে, যা এসব বিষয় ও অন্যান্য বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এবং অনুরূপভাবে তাদের জন্য সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে সে যাদের সাথে এই ব্যাপারে কথা বলবে, আর এগুলো শুধু কয়েকটি উদাহরণ মাত্র; নতুবা বিষয়টি অনেক ব্যাপক ও বড় হয়ে যেত।

সপ্তম অনুচ্ছেদ: দায়িত্ব পালনের সহযোগী উপায়-উপকরণ:

আর আমরা এই নগণ্য আলোচনাটির প্রায় শেষ পর্যায়ে এসে উপনীত হয়েছি, এখন আমি সামগ্রিকভাবে এমন উপায়-উপকরণ বা উপাদানের উল্লেখ করব, যা একজন মহিলা দা‘ঈকে যথাযথভাবে শর‘ঈ নির্দেশনার ভিত্তিতেই তার দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে সহযোগিতা করবে; যেমন,

  • আমল বা কর্মকাণ্ডের ইখলাস তথা একনিষ্ঠতাকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার জন্য নির্দিষ্ট করা এবং এই ইখলাস তথা একনিষ্ঠতাকে সংস্কার করা, আর এর ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার নিকট প্রার্থনা করা; কারণ, তা হলো প্রত্যেক সফলতার মূল এবং প্রত্যেক কামিয়াবীর পরিচালক, আর তা হলো সকল আমল বা কর্মকাণ্ডের নির্ভেজাল উৎস এবং আল্লাহ তা‘আলার নিকট গ্রহণযোগ্য হওয়ার মূলভিত্তি, আর এই ব্যাপারে কিছু বর্ণনা পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে।
  • আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার নিকট নিয়মিত দো‘আ বা প্রার্থনা করা, যাতে তিনি এই নারীকে তার ঐ পথে টিকে থাকার তাওফীক দান করেন, যে পথের পথিক সে হয়েছে এবং আরও তাওফীক দান করেন, যাতে সে তার নিজের, তার ঘরের, তার সমাজের ও তার জাতির সাথে সম্পৃক্ত তার দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করতে পারে; আর সে এই দো‘আ বা প্রার্থনা করার ব্যাপারে কখনও গাফেল হবে না; বরং সে এ ব্যাপারে বারবার দো‘আ করতে থাকবে। কারণ, যখনই কোনো বান্দা তার প্রতিপালকের নিকট এভাবে দো‘আ করে তখনই তা প্রাপ্ত হওয়া ও কবুল হওয়ার বেশি উপযোগী। আর এই অধ্যায়ে কুরআন ও হাদীসের এমন অনেক বক্তব্য রয়েছে, যা গণনার বাইরে।
  • ইবাদতগত এমন কিছু কর্মসূচী গ্রহণ করা, যার মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার সাথে সম্পর্ক শক্তিশালী হবে। যেমন, সে তার জন্য মুস্তাহাব তথা নফল সালাতের একটা অংশ বরাদ্ধ করবে; অনুরূপভাবে সাওম, দান-সাদকা, কুরআন তিলাওয়াত, যিকির-আযকার, পিতা-মাতার আনুগত্য করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা ইত্যাদি। সুতরাং এটা মহান সঞ্চয়, যা একজন বিজ্ঞ মহিলা দা‘ঈ তার এই জীবন চলার পথের পাথেয় হিসেবে বহন করবে।
  • তার এমন আকাঙ্খা থাকা যে, তার নির্ভেজাল আমলসমূহ থেকে এমন কিছু আমল থাকবে, যার ব্যাপারে এক আল্লাহ ব্যতীত অপর কেউ অবগত নয়, যদিও সে নিকটবর্তীর চেয়েও আরও নিকটবর্তী হউক। যেমন, স্বামী অথবা পিতা-মাতা অথবা সন্তান অথবা অনুরূপ অন্য কেউ, যাতে তা ইখলাস তথা একনিষ্ঠতার ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ, অন্তরের নির্মলতার জন্য শ্রেষ্ঠ দলীল এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার সাথে সম্পর্কের ব্যাপারে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ হতে পারে।
  • তার নিজের আত্মিক উন্নতি ও অগ্রগতির ব্যাপারে সদা সচেতন থাকা। সুতরাং সে এমন কোনো একটা নির্দিষ্ট সীমায় দাঁড়িয়ে থেকে মনে করবে না যে সে কামিল বা পূর্ণতা লাভ করেছে। আর এটা হলো শয়তান অনুপ্রবেশের প্রশস্ত দরজা, ফলে সে তার আমলসমূহ বিনষ্ট করবে এবং তার হৃদয়কে রোগগ্রস্থ করে দেবে।
  • কাজ ও সময়কে ভাগ করে একটি কার্যকরী কর্মসূচী বা রুটিন তৈরি করা এবং তার যথাযথ অনুসরণ করা, যদিও তা পুরাপুরিভাবে শৃঙ্খলা ও নিয়মের মধ্যে আবদ্ধ করা যাবে না; কিন্তু পুরাপুরিভাবে আয়ত্ব করা না গেলেও, পুরাপুরি পরিত্যক্ত হবে না। আর অল্প অল্প করেই অধিক হয়। যেমন, ফজরের পরে কিছু সময় কুরআন অধ্যয়ন ও যিকির-আযকারের জন্য নির্দিষ্ট করা, আর দুপর বেলায় যদি সে কাজ করে, তবে সে সময়টি তার কাজের জন্য বরাদ্ধ করা এবং সে সময়ে সে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করবে, আর যদি ঐ সময়ে সে কাজ না করে, তবে সে ঐ সময়টিকে তার ঘর-গৃহস্থালির কাজ ও বিভিন্ন বিষয়ে অধ্যয়নের জন্য নির্দিষ্ট করবে; আর যোহরের পর: হালকা কর্মকাণ্ডের জন্য, যেমন, কিছুটা বিশ্রাম নেয়ার সাথে সাথে প্রবন্ধ লেখা অথবা পিতা-মাতা ও সন্তানের সাথে আলাপ করা এবং অনুরূপ অন্য কিছু একটা করা। আর আসরের পর: অধ্যয়নকৃত বিষয় পুনরায় দেখা, আলোচনা প্রস্তুত করা, গবেষণা ও গভীরভাবে অধ্যয়ন করা। আর মাগরিবের পর: এই সময়টি বরাদ্ধ হবে কিছু কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য, যেমন, বক্তৃতা বা আলোচনা পেশ করা অথবা সন্তানদের সাথে সম্মিলন করা এবং তাদের সাথে কিছু কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা অথবা তাদের পাঠ পর্যালোচনা করা। আর এশার পর: বাকি কাজগুলো সেরে নেওয়া এবং ঘুমানোর প্রস্তুতি নেওয়া… ইত্যদি। আর সবকিছুই তার হিসাব অনুযায়ী হবে, হবে তার সময়, স্থান ও মেজায অনুযায়ী।
  • এমন সৎকর্মশীল নারীদের সাথে উঠাবসা করা, যারা তাকে স্মরণ করিয়ে দেবে, যখন সে ভুলে যাবে, তাকে শিক্ষা দেবে, সে যা জানবে না এবং স্মরণ হওয়া বিষয়ে তারা তাকে সহযোগিতা করবে। সুতরাং সে তাদের নিকট থেকে শুধু  ভালো কথাই শুনবে অথবা প্রসিদ্ধ সৎকর্মশীল নারীর ব্যাপারে শুনবে অথবা উপকারী গল্প শুনবে অথবা উপকারী ইলম তথা জ্ঞানের কথা শুনবে। সুতরাং  ভালো বন্ধুর একটা  ভালো প্রভাব রয়েছে।
  • সময়ে সময়ে নিজকে নিজে তথা আত্মসমালোচনা করা, চাই তা সাপ্তাহিক হউক অথবা মাসিক অথবা বার্ষিক হউক।
  • তার নারীগৃহে যোগদান করা অথবা ভালো দিক-নির্দেশনাসম্পন্না নারীদের সাথে মিলিত হওয়া; কারণ, পরস্পরিক সহযোগিতা প্রেরণা ও উৎসাহ যোগায় এবং শয়তানকে তাড়িয়ে দেয়, আর আল্লাহর অনুমতিক্রমে অধিক ফল ও উৎকৃষ্ট লাভ বয়ে আনার ক্ষেত্রে সহযোগী। আর তার কর্মকাণ্ড সব সময় এককভাবে হবে না, এমন হলে সে বিরক্ত ও ক্লান্ত হয়ে পড়বে; কিন্তু পারস্পরিক সহযোগিতার দ্বারা মানুষ আল্লাহর অনুমোদনক্রমে কল্যাণজনক অবস্থায় পৌঁছাতে পারে।

নারী তার সর্বশক্তি ও অনুদান বিনিয়োগ করবে দাওয়াতের ক্ষেত্রে। অতঃপর সে লক্ষ্য করবে তার শক্তি-সামর্থ্য ও বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার দিকে, অতঃপর সে উভয়টিকে নিয়ে নিকটতম ও দূরতম সমাজে তার দাওয়াতী তৎপরতা চালু করবে। উদাহরণস্বরূপঃ বিভিন্ন শ্রেণির লেখালেখি, বক্তৃতা প্রদান, সেমিনার পরিচালনা, নারী কল্যাণ সমিতি পরিচালনা, বিদ্যালয় পরিচালনা, দাওয়াতী কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা, নারীদেরকে প্রাণবন্তকরণের ব্যবস্থা করা … ইত্যাদি।

অষ্টম অনুচ্ছেদ: মুসলিম নারীর কাজ করার নিয়ম-পদ্ধতি:

নারীর কাজের ব্যাপারে মূল কথা হচ্ছে তা  শরী‘আত সম্মত। আর ইসলামের প্রাথমিক যুগের নারীদের কেউ কেউ কাজ করেছেন; কিন্তু তা কতগুলো নিয়মনীতির দ্বারা  শরী‘আত সম্মত, যখন তা পুরাপুরি বিদ্যমান থাকবে, তখন কাজ করাটা বৈধ হবে এবং কোনো প্রকার নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই তা  শরী‘আত সম্মত হবে।

আর এসব নিয়মনীতির সারকথা হলো:

১. তার হৃদয় আল্লাহ তা‘আলার পর্যবেক্ষণে থাকা। সুতরাং সে অনুধাবন করবে যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তার ব্যাপারে অবগত আছেন এবং তিনি তার সকল বিষয়ে হিসাব রাখেন; আল-কুরআনের ভাষায়:

﴿فَمَن يَعۡمَلۡ مِثۡقَالَ ذَرَّةٍ خَيۡرٗا يَرَهُۥ ٧ وَمَن يَعۡمَلۡ مِثۡقَالَ ذَرَّةٖ شَرّٗا يَرَهُۥ ٨[سُورَةُ الزَّلۡزَلَةِ: 7-8[

“সুতরাং কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে সে তা দেখতে পাবে এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে সে তাও দেখতে পাবে” [সূরা আল-যিলযাল, আয়াত: ৭-৮]

২. তার ওপর ফরযকৃত পর্দাকে তার আবশ্যকীয় দায়িত্বরূপে গ্রহণ করা, যাতে চেহারা ঢেকে রাখার ব্যবস্থা থাকবে; আর এটা আবশ্যক হওয়ার ব্যাপারে দলীল পেশ করাটা আমাদের বিষয় নয়। কারণ, এই প্রসঙ্গে কতগুলো বিশেষ লেখা রয়েছে; কিন্তু এখানে আমরা এই ব্যাপারে তাগিদ দিচ্ছি যে, এটি হচ্ছে কাজের উদ্দেশ্যে নারীর বাইরে বের হওয়ার নিয়মনীতিসমূহের মধ্য থেকে একটি নিয়ম। আল-কুরআনের ভাষায়:

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِيُّ قُل لِّأَزۡوَٰجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَآءِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ يُدۡنِينَ عَلَيۡهِنَّ مِن جَلَٰبِيبِهِنَّۚ ذَٰلِكَ أَدۡنَىٰٓ أَن يُعۡرَفۡنَ فَلَا يُؤۡذَيۡنَۗ وَكَانَ ٱللَّهُ غَفُورٗا رَّحِيمٗا ٥٩ [ سورة الأحزاب: 59[

“হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীও কন্যাগণকে এবং মুমিনদের নারীগণকে বল, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদেরকে উত্ত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৫৯] 

৩. পুরুষদের সাথে মেলামেশা থেকে দূরে থাকা, এমনকি সে যদি নিকটতম এমন কেউ হয়, যে তার মাহরাম নয়। আর এই প্রসঙ্গে কুরআন ও হাদীসের অনেক ভাষ্য বিদ্যমান রয়েছে।

৪. বাইরের কাজ যাতে তার মূল দায়িত্ব ও কর্তব্যের ওপর প্রভাব সৃষ্টি না করে। বস্তুতঃ তার মূল দায়িত্ব হলো তার ঘর, তার স্বামীর বিষয়-আশয় ও তার শিশু সন্তানগণ। সুতরাং যখন (তার বাইরের কাজ) এসব মৌলিক কাজের ওপর প্রভাব বিস্তার করবে, তখন তা বৈধতা থেকে বের হয়ে হারাম পর্যায়ে চলে যাবে। কারণ, শরী‘আতের দৃষ্টিতে ওয়াজিব বা আবশ্যকীয় বিষয়টি নফল বা অতিরিক্ত বিষয়ের উপরে অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য।

৫. কাজটি এমন হওয়া, যা নারীর জন্য উপযুক্ত এবং আল্লাহ তাকে যে স্বভাব-প্রকৃতির ওপর সৃষ্টি করেছেন, তার সাথে যথাযথ ও লাগসই। সুতরাং সে ভারী কোনো কাজের দায়িত্ব বহন করবে না, শিল্পকারখানায় কাজ করবে না এবং পুলিশ বা প্রহরী হিসেবে কাজ করবে না অথবা মহাসড়ক বা রাস্তা পরিষ্কারের কোনো কাজে অংশগ্রহণ করবে না অথবা পুরুষদের জন্য পণ্য বিক্রেতা হিসেবে কাজ করবে না অথবা এমন কোনো কাজ করবে না, যা বিশৃঙ্খলার উপলক্ষ্য বা কারণ বলে বিবেচিত হয় ইত্যাদি ইত্যাদি।

আর সামাজিক সংস্কারমূলক কাজের ক্ষেত্রে নারী যেসব পরিমণ্ডল বা ক্ষেত্রকে গ্রহণ করেছে, যে দিকে আমরা পূর্বে ইঙ্গিত করেছি, তন্মধ্য থেকে কিছু দিক হলো: শিক্ষাদান, নারীদের মাঝে আল্লাহর দিকে আহ্বানমূলক দাওয়াতী কাজ, নারীদের চিকিৎসা ও সেবাদান, এমন প্রত্যেক কল্যাণমূলক কাজ, যা নারীদের সাথে নির্দিষ্ট এবং এগুলো ছাড়া আরও যেসব কাজ তার অবস্থা ও স্বভাব-প্রকৃতির সাথে যথোপযুক্ত ও মানানসই।

৬. তার অভিভাবকের অনুমতি মানে তার স্বামী অথবা পিতার অনুমতি। সুতরাং যখন কোনো কোনো নফল ইবাদতের ক্ষেত্রে তাদের নিকট অনুমতি চাওয়ার প্রয়োজন হয়, তখন এখানে (বাইরে কাজ করার ক্ষেত্রে) অনুমতি চাওয়ার বিষয়টি আরও বেশী ও সমীচীনভাবেই জরুরি।

কতিপয় সুপারিশ বা পরামর্শ

দ্রুত এই আলোচনার পর এমন কিছু সুপারিশ বা পরামর্শকে একত্রিতভাবে পেশ করছি, যেগুলো আল্লাহর ইচ্ছায় উপকারী হবে বলে আমি আশাবাদী:

১. বিজ্ঞজন ও দা‘ঈদের পক্ষ থেকে মুসলিম নারীর সাথে সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে গুরুত্বারোপ করা, চাই তা গঠনমূলক হউক অথবা প্রতিরোধমূলক হউক বা অন্য কোনো ভাবে। কারণ, যুদ্ধ এখনো চলছে, আর ইসলামের শত্রুগণ নিরবচ্ছিন্ন ও ধারাবাহিকভাবে তাদের চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং তারা কখনও বিরক্তবোধ করে না। সুতরাং আলিম ও দা‘ঈগণের আবশ্যকীয় কর্তব্য হলো, তারা নিরবচ্ছিন্ন ও ধারাবাহিকভাবে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাবে এবং বিতর্ক করবে; আর তারা কর্তব্য কাজে অবহেলা করবে না অথবা ভুলে যাবে না অথবা মূর্খতার পরিচয় দেবে না। কারণ, বিষয়টি খুবই বিপজ্জনক। আল্লাহ আমাদেরকে সকল প্রকার অনিষ্টতা, খারাপি ও অন্যায়-অপরাধ থেকে রক্ষা করুন।

২. সরকারী কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নারীর বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া। বিশেষ করে সরকারী কর্তৃপক্ষ তার শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ এবং তার প্রত্যেকটি অবস্থা সম্পর্কে নিম্নলিখিতভাবে গুরুত্বারোপ করবে:

  • শত্রুদের ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনাসমূহের ব্যাপারে সতর্ক করা; আর এই বরকতময় দেশটিকে ঐ দিকে টেনে না নেয়া, যেদিকে তাড়িত করেছে ইসলামী বিশ্বের কোনো কোনো দেশকে।
  • নারীশিক্ষার সিলেবাস বা পাঠ্যক্রম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা, অতঃপর তার সাথে যেসব বিষয় নির্দিষ্ট, সেগুলোকে গুরুত্ব প্রদান করা, যাতে নারী শুধু তার রাজ্য তথা ঘরের বাইরে নয় বরং তার রাজ্যের অভ্যন্তরের মৌলিক কাজ সম্পাদনের জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারে।
  • নারীদের অবসর গ্রহণের বয়সের প্রতি ঐকান্তিকতার সাথে লক্ষ্য রাখা, যাতে তার বিভিন্ন প্রকার দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে সমন্বয় সাধনের উদ্যোগ নেয়া যায়।
  • নারী তার কর্মস্থল নির্ধারণ করবে, যেখানে সে থাকবে, আর তাকে দূরবর্তী কোনো জায়গায় সরিয়ে দেওয়ার চিন্তা না করা, যেখান গেলে তার বিপদ-মুসিবত বৃদ্ধি পেতে পারে।
  • রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সার্বজনীন গণপরিবহণের ব্যবস্থা করা, যাতে নারী চালক ও অনুরূপ ব্যক্তিদের শরণাপন্ন না হয়, যেমন ভাড়ায় চালিত ছোট গাড়ীসমূহ, কেননা এগুলোর মধ্যে সুস্পষ্ট নগ্নতা ও বেহায়াপনা রয়েছে।
  • নারীকে এমন স্থানে নিয়োগ না দেওয়া, যেখানে বিভিন্ন সময় ও পরিবেশ-পরিস্থিতিতে পুরুষগণ এসে তাদের সাথে মিশে যায়।
  • তাদের জন্য দৈনন্দিন কাজের সময় হ্রাস করা, যাতে সে অধিকাংশ সময় তার বাড়ি ও ঘরে কাটাতে পারে; ফলে সে  ভালোভাবে তা সম্পন্ন করতে পারবে। যেমন, তাকে দৈনিক তিন ঘন্টা অথবা সপ্তাহে তিন দিন কাজ করার দায়িত্ব অর্পণ করা।
  • মেয়েদের জন্য স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দিয়ে পৃথক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা চালু করার জোর দাবি করা।

৩. ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক নারীর মধ্যে দাওয়াতী কার্যক্রম ব্যাপকভাবে পরিচালনার জন্য একটি অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করা, যার কার্যাবলী ও উদ্দেশ্য-লক্ষ্যের আওতার অন্তর্ভুক্ত হবে নারীদের জন্য বিশেষ দাওয়াতী কর্মসূচীর ব্যবস্থা করা। সুতরাং এ কথা সুস্পষ্ট যে, এ ধরনের ভূমিকা বা কর্মসূচী বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্পষ্ট দুর্বলতা রয়েছে; কেননা তারা হলো সমাজের অর্ধেক বা তার চেয়ে বেশি এবং পুরুষদের মা-জননী ও লালন-পালনকারিনী। সুতরাং সময় হয়েছে তাদের জন্য প্রত্যেক দাওয়াতী মাধ্যম বা মিডিয়ায় বিশেষ দাওয়াতী কর্মসূচী গ্রহণ করার; নারী সেশন বা কোর্স (বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে কর্মসূচী গ্রহণ) সমাবেশমূলক সেশন…  বিভিন্ন প্রকার প্রদর্শনী এবং এগুলো ছাড়া অন্যান্য কর্মসূচী, যা কারও নিকট অস্পষ্ট নয়।

৪. নারী জাগরণমূলক বেশি বেশি ম্যাগাজিন ও তার উপযোগী পুস্তকাদি বের করার জন্য শিক্ষা পরিক্রমায় কাজ করা। যেমন, তথ্য ও প্রচার কোম্পানীগুলো বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে তা প্রকাশ করবে, আর এই ব্যাপারে বিশেষ সুযোগ হলো ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক ও অন্যান্য মিডিয়া।

৫. দাওয়াতী ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচী থেকে প্রত্যেক নারী ঐ কাজটি করবে, যা তার জন্য ও তার পরিবারের জন্য যথাযথ হয়, সে জীবনকে উদাসীনভাবে পরিচালিত করবে না।

উপসংহার

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যার নি‘আমতেই যাবতীয় সৎকর্মসমূহ পূর্ণতা লাভ করে থাকে এবং যার একান্ত কৃপা ও অনুগ্রহে সাওয়াবের মধ্যে বৃদ্ধি করা হয়ে থাকে। আমি তাঁর গুণগানসহ প্রশংসা করি এবং আমি তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি, আর তিনি হলেন অনুগ্রহের অধিকারী ও দানবীর। আর সালাত (দুরূদ) ও সালাম তাঁর সৃষ্টির সর্বোত্তম ব্যক্তির ওপর, যিনি সৃষ্টির সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী এবং শান্তি বর্ষিত হউক তাঁর পরিবার-পরিজনের ওপর, তাঁর সাহাবীদের ওপর, পবিত্র মুমিনজননীদের ওপর, তাবে‘ঈদের ওপর এবং আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে তাদের পুনরুত্থানের দিন পর্যন্ত যারা  ভালোভাবে তাঁদের অনুসরণ করবে, তাদের ওপর।

অতঃপর……

মুসলিম নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্য বর্ণনার ব্যাপারে আমরা খুব দ্রুত একটি আলোচনা শেষ করে আনলাম। আল্লাহর জন্যই সকল প্রশংসা। আমি আলোচনাটিকে এজন্যই বিভাজন ও খণ্ডিতকরণের দিকে মনোনিবেশ করেছি, যাতে তা সুস্পষ্ট ও পরিপূর্ণ হয়ে উঠে। আর শুরুর দিকে আমি নারী সম্পর্কে আলোচনার গুরুত্ব নিয়ে বক্তব্য পেশ করেছি এবং এও বলেছি যে, নারীকে নিয়ে কথা বলা বিজ্ঞজন ও ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর অত্যাবশ্যক। অতঃপর আমি নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্যকে চারটি ক্ষেত্র বা পরিমণ্ডলে কাঠামোবদ্ধ করেছি, যা এই দায়িত্ব ও কর্তব্যের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল কিছুকে একত্রিত করবে:

প্রথম ক্ষেত্র: তার নিজের ব্যাপারে দায়িত্ব ও কর্তব্য; এসব দায়িত্বের বর্ণনা করা হয়েছে নিম্নোক্ত শিরোনামের মাধ্যমে:

(ক) তার রবের প্রতি তার ঈমান তথা বিশ্বাস এবং অনুরূপভাবে ঈমানের বাকি রুকনসমূহ।

(খ) তার জ্ঞানগত দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত কথা।

(গ) তার সৎকর্ম সম্পাদনের দায়িত্ব ও কর্তব্য।

(ঘ) নিজেকে পাপাচার ও অবাধ্যতা থেকে রক্ষাকরণ প্রসঙ্গে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য।

দ্বিতীয় ক্ষেত্র: তার ঘরের ব্যাপারে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য; আর এর অধীনে যা এসেছে:

(ক) এই দায়িত্ব ও কর্তব্যের ক্ষেত্রে শর‘ঈ সূচনা।

(খ) এসব দায়িত্ব ও কর্তব্যের বিস্তারিত বিবরণ হলো:

  • আদর্শ স্ত্রী হিসেবে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য।
  • আদর্শ মা হিসেবে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য। 
  • আদর্শ কন্যা হিসেবে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য। 
  • আদর্শ বোন হিসেবে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য। 

তৃতীয় ক্ষেত্র: সমাজ ও জাতি কেন্দ্রীক তার দায়িত্ব ও কর্তব্য, আর এর অধীনে যা এসেছে:

  • এই দায়িত্ব ও কর্তব্যের শর‘ঈ সূচনা।
  • এই দায়িত্ব ও কর্তব্যের যৌক্তিকতা।
  • এই দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রয়োজনীয় বিষয়াদি; আর এর অধীনে যা এসেছে:

১. আত্মীয়-স্বজনের পক্ষে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য।

২. প্রতিবেশীদের পক্ষে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য।

৩. নারী সমাজের পক্ষে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য।

৪. ক্লাবসমূহের পক্ষে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য।

৫. তার চাকুরি জাতীয় কর্মের ব্যাপারে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য।

৬. ছাত্রী হওয়ার দিক থেকে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য।

চতুর্থ ক্ষেত্র: শত্রুদের ষড়যন্ত্রের বিপরীতে মুসলিম নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্য; তন্মধ্য থেকে:

১. মুসলিম নারীর বিরুদ্ধে শত্রুদের পরিকল্পনাসমূহের সারসংক্ষেপ।

২. এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মুসলিম নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্য।

আর আমি আলোচনাটি শেষ করেছি এসব দায়িত্ব ও কর্তব্যের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু সংক্ষিপ্ত অনুচ্ছেদের মাধ্যমে:

প্রথম অনুচ্ছেদ: নারী কর্তৃক নিজেকে ঐ দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত করা।

দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ: একজন সফল মহিলা দা‘ঈ’র গুণাবলী।

তৃতীয় অনুচ্ছেদ: নারীর দাওয়াতের নীতিমালা।

চতুর্থ অনুচ্ছেদ: দাওয়াতের ক্ষেত্রে সফল পদ্ধতি সমূহ।  

পঞ্চম অনুচ্ছেদ: নারীর দাওয়াতী ক্ষেত্রসমূহ থেকে।

ষষ্ঠ অনুচ্ছেদ: দাওয়াত ও প্রশিক্ষণের বিষয়সমূহ।

সপ্তম অনুচ্ছেদ: দায়িত্ব পালনের সহযোগী উপায়-উপকরণ।

অষ্টম অনুচ্ছেদ: মুসলিম নারীর কাজ করার নিয়মনীতি।

কতিপয় সুপারিশ বা পরামর্শ

উপসংহার: আর তাতে পুরো আলোচনাটির পয়েণ্টগুলোর সারসংক্ষেপ পেশ করা হয়েছে।

অতঃপর আমি আমার কথায় ফিরে যাচ্ছি: নিশ্চয় নারীর প্রতি নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও মহৎ, আর অনুরূপভাবে তার প্রতি তার অভিভাবকদের দায়িত্ব ও কর্তব্যও অনেক বড় ও গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং এই দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে আল্লাহকে ভয় কর! আল্লাহকে ভয় কর! কারণ, এই প্রসঙ্গে নির্দেশ হলো খুবই ভয়াবহ ও মহান। আল-কুরআনের ভাষায়:

﴿إِنۡ أُرِيدُ إِلَّا ٱلۡإِصۡلَٰحَ مَا ٱسۡتَطَعۡتُۚ وَمَا تَوۡفِيقِيٓ إِلَّا بِٱللَّهِۚ عَلَيۡهِ تَوَكَّلۡتُ وَإِلَيۡهِ أُنِيبُ ٨٨[سُورَةُ هُود: 88[

“আমি তো আমার সাধ্যমত সংস্কারই করতে চাই। আমার কর্মসাধন তো আল্লাহরই সাহায্যে। আমি তাঁরই ওপর নির্ভর করি এবং আমি তাঁরই অভিমুখী।” [সূরা হুদ, আয়াত: ৮৮]

আর আমি আল্লাহ তা‘আলার নিকট প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে, আমাদের নারীদেরকে, আমাদের পরিবারসমূহকে, আমাদের সমাজকে এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের সমাজসমূহকে সংশোধন ও সংস্কার করে দেন, আর তাদেরকে যাবতীয় অনিষ্টতা ও বিশৃঙ্খলা থেকে যেন তিনি রক্ষা করেন। আর তিনি যেন তাদের ব্যাপারে ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্রকে, সীমালংঘনকারীদের বাড়াবাড়িকে, মুনাফিকদের নিফাকীকে ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের উপায়-উপকরণসমূহকে প্রত্যাখ্যান ও প্রতিরোধ করেন। আর তিনি যেন তাদের ধ্বংসকে তাদের শিক্ষায় পরিণত করেন, তিনি শ্রবণকারী, আহ্বানে সাড়াদানকারী।

এটা হলো চেষ্টা ও সাধনা, যার জন্য আমি আল্লাহ তা‘আলার নিকট প্রার্থনা করছি, তিনি যেন এটাকে এই জীবনে ও মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের জন্য সঞ্চয় হিসেবে গ্রহণ করেন, আর তার মধ্যে যা কিছু সঠিক রয়েছে, তা তাঁরই পক্ষ থেকে, আর তার মধ্যে এর ব্যতিক্রম যা রয়েছে, তবে তো আমার পক্ষ থেকে। তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি সকল প্রকার ভুল-ক্রটি থেকে। আর পাঠক-পাঠিকা ভাই ও বোনদের মধ্য থেকে যিনি এমন কিছু পান, যা উপদেশ, দৃষ্টি আকর্ষণী অথবা প্রস্তাবনা আকারে আমার নিকট আসা প্রয়োজন, (তা যদি আমাকে জানানো হয়) তাতে আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব, আহ্বান করব আল-কুরআনের ভাষায়:

﴿وَتَعَاوَنُواْ عَلَى ٱلۡبِرِّ وَٱلتَّقۡوَىٰۖ وَلَا تَعَاوَنُواْ عَلَى ٱلۡإِثۡمِ وَٱلۡعُدۡوَٰنِۚ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَۖ إِنَّ ٱللَّهَ شَدِيدُ ٱلۡعِقَابِ ٢[سُورَةُ المَائ‍ِدَةِ: 2]                                                                                                                              

“সৎকর্ম ও তাকওয়ার ব্যাপারে তোমরা পরস্পর সাহায্য করবে এবং পাপ ও সীমালংঘনের ক্ষেত্রে একে অন্যের সাহায্য করবে না। আর আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করবে, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর।”-[সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ২]

و صلى الله و سلم على نبينا محمد و على آله و صحبه أجمعين .

লেখক: ফালেহ ইবন মুহাম্মাদ ইবন ফালেহ আস-সগীর

রিয়াদ: ১৭/৪/১৪২২ হিজরী

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *