…মৃত্যুর যন্ত্রণা অবশ্যই আসবে



১৮৪৯ সালের এপ্রিলে রাশিয়ান লেখক ফিওদর মিখাইলোভিচ দস্তেইয়েভস্কি কিছু “বিপদজনক রাজনৈতিক” ধারনা পোষণ করার কারনে গ্রেফতার হন। এ সময় তার বয়স ছিল ২৭ বছর। গ্রেফতারকৃত দস্তেইয়েভস্কিকে রাখা হয় সে সময়কার এক “হাই সিকিউরিটি” জেলে। স্যাঁতস্যাঁতে, হোট ছোট, অন্ধকার রুমে, খড়ের শক্ত বিছানায় বন্দীরা ঘুমাতো।
.
প্রায় ৮ মাস কোন বিচার ছাড়া দস্তেইয়েভস্কি এই অবস্থায় কাটান। অক্টোবরের এক দিএ এই বন্দীদের ডেকে অপেক্ষ্মান ঘোড়ার গাড়িতে তোলা হয়। বন্দীরা হালকা ভাবছিলেন তাদের বিচারের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। হয়তো হালকা কোন সাজা তাদের দেওয়া হবে। গাড়ি থামার পর বন্দীদের নামিয়ে একটি চারকোণা আকৃতির খোলা জায়গায় নেওয়া হল। একটি মঞ্চে তাদের লাইন ধরে দাড় করানো হল। কেউ বলে না দিলেও বন্দীরা বুঝতে পারলেন তাদের মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছে। তাদের মাথা ঢেকে দেওয়া হল।
.
প্রহরীরা এসে প্রথমে তিনজনকে নিয়ে গেল। তাদের খুঁটির সাথে বাধা হল। সেনারা নিশানা করলো। পযিশান নিলো। দস্তেইয়েভস্কি ছিলেন বন্দীদের মধ্যে ষষ্ঠ। তিনি হিসাব করছিলেন, তার পালা আসতে কতোটুক সময় লাগতে পারে। হঠাৎ বন্দীরা ড্রাম রোল শুনতে পেল। যারের পক্ষ থেকে বিশেষ দূত এসে জানালো, এই বন্দীদের যারের পক্ষ থেকে মাফ করে দেওয়া হয়েছে। দস্তেইয়েভস্কি এবং তার সাথীদের সাইবেরিয়া নিয়ে যাওয়া হল।
.
এই অভিজ্ঞতা দস্তেইয়েভস্কির উপর অত্যন্ত গভীর প্রভাব ফেলে। ফেলাটাই স্বাভাবিক। তার সাথীদের মধ্যে অন্তত দুইজন এই ঘটনার পর সম্পূর্ণভাবে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। অনেক বছর পর তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘দা ইডিয়ট” – এ দস্তেইয়েভস্কির এক কাল্পনিক চরিত্রের আড়ালে নিজ এই অভিজ্ঞতা পাঠকের সামনে তুলে ধরেন…
.
…প্রথম তিনজন বন্দীকে নিয়ে যাওয়া হল। লম্বা সাদা টিউনিক পরনে, লম্বা সাদা কাপড় দিয়ে মুখ ঢাকা। তাদের দিকে তাকিয়ে থাকা রাইফেলের নলগুলো তারা দেখতে পাচ্ছিলেন না। সেনারা পযিশান নিল। আমার বন্ধু ছিল বন্দীদের মধ্যে অস্টম, অর্থাৎ তার জায়গা হবার কথা থার্ড ব্যাচে। আমার বন্ধু হিসেব করে দেখলো তার হাতে আর পাঁচ মিনিটের মতো সময় আছে।
.
এই পাঁচ মিনিটকে ওর কাছে অনন্তকালের মতো মনে হচ্ছিলো। ওর কাছে সময়ের এক প্রাচুর্য হঠাৎ ওর সামনে চলে এসেছে। মাত্র ওই কয়েক মিনিট যেন ছিল শত শত যাপিত জীবনের মতো। এই সময়টাকে কিভাবে কাটানো যায় ও মনে মনে ঠিক করে নিল। সাথীদের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য দুই মিনিট। নিজের জীবন, নিজের ক্যারিয়ার, নিজের অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তার জন্য, আরো দুই মিনিট। শেষ মিনিটটা বরাদ্দ থাকলো চারপাশের পৃথিবীটাকে শেষবারের মতো ভালোভাবে দেখে নেওয়ার জন্য।
.
বিদায় নেওয়ার অংশ হিসেবে ও সাথীদের সাধারণ, দৈনন্দিন কিছু প্রশ্ন করা শুরু করলো। ওর মনে আছে সাধারন অবস্থার তুলনায় ও উত্তরগুলো শোনার ব্যাপারে অনেক বেশি আগ্রহ বোধ করছিল। বিদায় নেওয়া শেষ করে ও নিজের ভেতরে তাকালো। চিন্তাগুলোকে ও দ্রুত গুছিয়ে নিতে চাচ্ছিলো। তিন মিনিটের মধ্যে ও – একজন জীবন্ত, চিন্তারত মানুষ – হারিয়ে যাবে। আর যদি হারিয়ে না যায় তাহলে ও নিজেকে ঠিক কোন জায়গায় আবিষ্কার করবে? কি অবস্থায়? এই তিন মিনিটে এই প্রশ্নের মীমাংসা করতে হবে। সূর্যের আলোর উপর ওর চোখ পড়লো। কোন ভাবেই সূর্যরশ্মি থেকে ও নিজের চোখ সরাতে পারছিল না। মনে হচ্ছিল যেন প্রথম বারের মতো ও নতুন কোন কিছু দেখছে।
.
তারপর ওর মনে হল,যদি আমি এখন মারা না যাই তাহলে? যদি আমি জীবন ফিরে পাই? একটা পুরো জীবন যদি আমি পাই, শুধু নিজের জন্য? প্রতিটি মিনিট আমি গুনতাম। প্রতিটি মূহুর্তের হিসেব রাখতাম…
.
.
আস্তিক-নাস্তিক, আওয়ামী লীগ-বিএনপি, শহুরে-গ্রাম্য, সাদাকালো, সব শ্রেণী ভেদে, সবাই স্বীকার করে, মানবজীবনের যদি একটি নিশ্চয়তা থাকে, তবে তা হল মৃত্যু। কিন্তু দিনের পর দিন, একগুঁয়ের মত, জেদ ধরে, নানা টালবাহানা করে, ব্যস্তার অজুহাতে, ব্যস্ততাকে আবিষ্কার করে নিয়ে আমরা মৃত্যুকে ভুলে থাকি। পরীক্ষার রেসাল্ট, চাকরি, ব্যবসা, বিয়ে, লাইফ-স্টাইল, সামাজিক স্ট্যাটাস, ফেইসবুক স্ট্যাটাস, সম্মান-মর্যাদা – কতো কিছু, অনিশ্চিত কতো কিছু নিয়ে আমরা নিজেদের ভুলিয়ে রাখি। কিন্তু যে অতিথি প্রতিনিয়ত কাছে আসছে, তার ব্যাপারে উদাসীন…কি বিচিত্র! কি অদ্ভূত!।
.
প্রতিটি মিনিট গোণা হচ্ছে…হিসেবরক্ষগণ প্রতিটি মূহুর্তের হিসেবে রাখছেন। আর এমন একটি দিন আসছে যখন অণু-পরিমান ভালোমন্দ আমলের বিচার করা হবে…
.
কি প্রস্তুত করেছেন?
.
কি উত্তর দেবেন?
.
আর কতো দিন ঠুনকো অনিশ্চয়তার অজুহাতে নিশ্চিত পরিণতিকে ভুলে থাকবেন?
.
আর মৃত্যুর যন্ত্রণা অবশ্যই আসবে। যা থেকে তুমি পলায়ন করতে চাইতে…
.
.
#KnowYourDeen

source

Leave a Reply