হজ সফরে সহজ গাইড

হজ সফরে সহজ গাইড

মুহাম্মাদ মোশফিকুর রহমান

সম্পাদক: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

ভূমিকা

বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম

 অনুপ্রেরণা ও পটভূমি ›

  • যাবতীয় প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার। অসংখ্য সালাত ও সালাম তাঁর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর নাযিল হোক। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকার কোনো মা‘বুদ নেই এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রেরিত বান্দা ও রাসূল। আল্লাহ তা‘আলার একমাত্র মনোনীত দীন ‘ইসলাম’ এবং তাঁর দীনের অনুসারীদের আদর্শ পরিচয় ‘মুসলিম’।
  • একটি হজ প্রশিক্ষণ উপস্থাপনা (প্রেজেন্টেশন) তৈরি করা ছিল আমার মূল লক্ষ্য। ইচ্ছা ছিল বিভিন্ন হজ প্রশিক্ষণে তা উপস্থাপন করবো। আলহামদু লিল্লাহ! বেশ কিছু হজ প্রশিক্ষণে এ উপস্থাপনাটি প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়েছি। কিন্তু পরবর্তীতে এটিকে বইয়ে রূপ দেওয়াটা আমার মতো একজন নবীণ লেখকের জন্য ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহর ইচ্ছা ও সাহায্যে হজযাত্রীদের শিক্ষা ও সেবার উদ্দেশ্যে দীর্ঘ ১১মাস পরিশ্রমের পর ২০১৩ ইং সালে এ হজ নির্দেশিকার প্রথম সংস্করণ বের করতে সক্ষম হয়েছিলাম। এরপর কিছু পরিবর্ধন ও পরিমার্জন করে দ্বিতীয় ও পরবর্তীতে তৃতীয় সংস্করণ বের করতে সচেষ্ট হই, যার ফল এ বইটি।
  • আমি হজ করার সময় একটি পরিপূর্ণ, সমসাময়িক ও সহীহ হজ গাইডের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলাম, সেই অনুভব থেকেই এ বই লেখা। আমি যখন বুঝতে পারলাম, হজযাত্রীরা সাধারণত দুই একটা বই পড়ে অথবা মানুষের মুখের কথা শুনে হজ সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন; কিন্তু এর মধ্যে কোনটি সঠিক আর কোনটি ভুল সেটা যাচাই করেন না! কেউ কেউ আবার শুদ্ধতা যাচাই করার কথা মাথাতেই আনেন না! এ উপলব্ধি থেকেই আমি স্ব-প্রণোদিত হয়ে এ হজ গাইড লেখার কাজ শুরু করি।
  • আমার লক্ষ্য ছিল ইসলামী শরী‘আহ্ নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করে একটি নির্ভরযোগ্য ও সহীহ গাইড তৈরি করা। সে লক্ষ্যকে সামনে রেখেই এ নির্দেশিকায় আমি সঠিক ও বিশুদ্ধ তথ্যসূত্র/রেফারেন্স ব্যবহার করতে চেষ্টা করেছি এবং সুপরিচিত ও সুবিজ্ঞ আলেমগণের দ্বারা পর্যবেক্ষণ ও পরিমার্জন করিয়েছি। একটি কাঠামোগত উপায়ে ও ধারাবাহিকভাবে এ গাইড তৈরি করার চেষ্টা করেছি এবং এর বিষয়বস্তুকে সহজ ও সংক্ষিপ্তভাবে উপস্থাপন করেছি। বুলেট পয়েন্ট ও পর্যাপ্ত ছবি ব্যবহার করতে চেষ্টা করেছি। গতানুগতিক বইয়ের ভাষা পরিহার করে গল্পের মতো ভাষা ব্যবহার করতে সচেষ্ট হয়েছি যেন সকল শ্রেণীর পাঠকের জন্য তা সহজবোধ্য হয়। বাংলাদেশের হজ প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে আমি এ গাইড বা নির্দেশিকা তৈরি করেছি। তবে হজের কিছু ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়া বছরান্তে পরিবর্তন হতে পারে। সেক্ষেত্রে আমি নতুন তথ্য সম্বলিত নতুন সংস্করণ দেওয়ার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।
  • বইটিতে হজের নিয়ম-কানুনসহ হজের পূর্বপ্রস্তুতি, হজ যাত্রার বিবরণ, হারামাইনের পারিপার্শ্বিক বিবরণ, মক্কা ও মদীনার দর্শনীয় স্থান এবং হজ ও উমরাহতে সম্পাদিত ভুল ত্রুটি ও বিদ‘আত বিষয়গুলো যতটুকু সম্ভব আলোচনা করতে চেষ্টা করেছি। গাইডে আলোচ্য কোনো বিষয় আপনার জন্য ব্যতিক্রম হতে পারে, এটি সম্পূর্ণ পরিস্থিতি-প্রেক্ষাপটের ওপর নির্ভর করে।
  • মানুষ ভুল-ত্রুটির উর্ধ্বে নয়। এ বইয়ের যে কোনো প্রমাদ কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে উপস্থাপন করলে সে মতামত আমি গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করবো ইনশাআল্লাহ। যারা আমাকে এ গাইড লেখার জন্য অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন, সার্বিক সহযোগিতা করেছেন, পরিমার্জনে অবদান রেখেছেন সর্বোপরি যারা অর্থানুদান দিয়ে প্রকাশনায় সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি, বিশেষতঃ আমার পরিবারের প্রতি। হে দয়াময় আল্লাহ! আপনি তাঁদের সকলকে উত্তম প্রতিদান দান করুন!
  • হে আল্লাহ! আপনি এ ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাকে কবুল করুন এবং এটি প্রচার প্রসারের জন্য আমাকে সাহায্য করুন। অনাকাংক্ষিত মুদ্রণ প্রমাদের জন্য আমাকে ক্ষমা করুন এবং সুনাম অর্জন, গর্ব ও রিয়া (লোক দেখানো) থেকে হিফাযত করুন। নিশ্চয় আপনি আমার মনের উদ্দেশ্য জানেন, আপনি সর্বজ্ঞ, পরম করুণাময় ও ক্ষমাশীল। আমীন! ইয়া রব্বাল আলামীন।

 উদ্দেশ্য, দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রত্যাশা ›

  • বাংলাদেশ থেকে সরকারি অথবা বেসরকারীভাবে যারা হজে যাবেন তারা এ গাইডে তাদের প্রয়োজনীয় যাবতীয় তথ্যাদি সংক্ষিপ্তাকারে পাবেন।
  • হজ ইসলামের সর্বোৎকৃষ্ট ইবাদাতগুলোর অন্যতম। কোনো ইবাদত কবুলের জন্য ৩টি শর্ত পূরণ প্রযোজ্য –

(১) আল ঈমান: ঈমানের সকল বিষয়ের ওপর সঠিক বিশ্বাস (সহীহ আকীদা) স্থাপন করা।

(২) আল ইখলাস: নিয়ত ও ইবাদত একমাত্র একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আনুগত্যের জন্য করা। 

(৩) ইত্তিবাউস সুন্নাহ: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ প্রদত্ত যে শরী‘আত নিয়ে এসেছেন তার অনুসরণের মাধ্যমে করা।

  • বর্তমানে আমাদের দেশে বিভিন্ন মাযহাব, দল ও মতের অনুসারীরা হজ পালনের ক্ষেত্রে কিছু ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করলেও হজের মৌলিক বিধি-বিধান প্রায় সকলেরই এক।
  • এদের মধ্যে কে সঠিক আর কে সঠিক নয় সেটি নিরুপণ করা আমার উদ্দেশ্য নয়। কুরআন ও সহীহ হাদীসের তথ্যসূত্র দিয়ে আমি এমন একটা পন্থা দেখিয়ে দিতে চেষ্টা করবো যে উপায়ে স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজ করেছেন এবং তাঁর সাহাবীগণ হজ পালন করেছেন। দীনের জ্ঞান শিক্ষা করা সকলের ওপর ফরয। তাই আমি আমার বইটি পড়ার অনুরোধ করবো এবং পাশাপাশি অন্য লেখকের আরো বই পড়ার পরামর্শ দিব। এরপর আপনার নিজস্ব জ্ঞান-বুদ্ধি ও বিচক্ষণতা দিয়ে যাচাই বাছাই করে যেটি সঠিক মনে হবে আপনি সেটিকে অনুসরণ করুন। কারো জ্ঞানের ওপর নির্ভর না করে আপনি নিজে জ্ঞান অর্জন করুন এবং তারপর আমল করুন। যতই অভিজ্ঞতা সম্পন্ন লোকের সাথে আপনি হজে যান না কেন কেউ আপনাকে ত্রুটিহীন হজ করার বা মাকবূল হজের নিশ্চয়তা দিবে না। তাই নিজ হজ নিজ জ্ঞানের ভিত্তিতে করুন এবং নিজে আল্লাহর কাছে দায়বদ্ধ থাকুন।
  • আমার প্রত্যাশা -বাংলাদেশের ধর্ম মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও বিভিন্ন হজ এজেন্সিগুলো তাদের হজ প্রশিক্ষণ গাইড হিসেবে এ গাইডটি ব্যবহার করবেন।

মুহাম্মাদ মোশফিকুর রহমান

 হজের তাৎপর্য ›

  • হজ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বুনিয়াদি স্তম্ভ।
  • হজ শব্দের আভিধানিক অর্থ; সংকল্প করা বা ইচ্ছা করা।
  • আল্লাহর নির্দেশ মেনে ও তাঁর সন্তুষ্টির জন্য সৌদি আরবের নির্দিষ্ট কিছু স্থানে নির্দিষ্ট সময়ে সফর করা এবং ইসলামী শরী‘আহ অনুসারে নির্দিষ্ট কিছু কর্মকাণ্ড সম্পাদন করার নামই হজ।
  • মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ১০ম হিজরীতে একবার স্বপরিবারে হজ পালন করেন।
  • ৯ম বা ১০ম হিজরীতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে হজকে ফরয করা হয়।
  • হজ সম্পন্ন করতে জিলহজের ৮ থেকে ১৩ তারিখে মধ্যে আরবের মক্কা, মিনা, আরাফা ও মুযদালিফায় নির্দিষ্ট কিছু কর্মকাণ্ড সম্পাদন করতে হয়।
  • হজ সম্পাদনের অন্যতম একটি অংশ হলো ৯ যিলহজ আরাফা ময়দানে অবস্থান করা। এ আরাফা ময়দান হাশরের ময়দানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যেখানে সমগ্র মানবজাতি একত্রিত হবে সুবিস্তৃত এক ময়দানে।
  • হাদীসে হজযাত্রীদের আল্লাহর মেহমান হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
  • কুরআন মাজীদে সূরা আল-হাজ (২২ নং সূরা) নামে একটি সূরা রয়েছে, যেখানে হজের গুরুত্ব ও তাৎপর্য আলোচিত হয়েছে।
  • নারীদের জন্য হজ হলো জিহাদের সমতুল্য। আর এটি জান্নাত লাভের একটি অবলম্বনস্বরূপ।
  • হজ একজন মুসলিমের মাঝে শান্তি ও শুদ্ধি আনয়ন করে এবং অতীতের সকল পাপ মোচন করে দেয়।
  • হজ সফরে ইহরামের (কাফন) কাপড় পরে পরিবার ও আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে পরকালের পথে রওয়ানা হওয়াকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
  • হজের সফরে আল্লাহর বিধি-নিষেধ মেনে চলা স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে যে মুমিনের জীবন লাগামহীন নয়। মুমিনের জীবন আল্লাহর রশিতে বাঁধা।
  • হজের সফরে পাথেয় সঙ্গে নেওয়া আখেরাতের সফরে পাথেয় সঙ্গে নেওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
  • হজ মুসলিম উম্মাহকে আল্লাহর স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী মহাজাতিতে পরিণত হতে উদ্বুদ্ধ করে।
  • এখন বাংলাদেশ থেকে হজ সফর সম্পাদন করতে ১৫-৪০ দিন সময় লাগে।
  • বর্তমানে সমগ্র পৃথিবী থেকে প্রতি বছর প্রায় ২৫-৩০ লক্ষাধিক মুসলিম হজ পালন করেন।

কা‘বা ও হজের ইতিহাস ›

  • আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿إِنَّ أَوَّلَ بَيۡتٖ وُضِعَ لِلنَّاسِ لَلَّذِي بِبَكَّةَ مُبَارَكٗا وَهُدٗى لِّلۡعَٰلَمِينَ ٩٦﴾ [ال عمران: ٩٦]  

‘‘নিশ্চয় মানবজাতির জন্য সর্বপ্রথম যে ইবাদত গৃহটি (কা‘বা) নির্মিত হয় সেটি বাক্কায় (মক্কায়) অবস্থিত। একে কল্যাণ ও বরকতময় করা হয়েছে এবং সৃষ্টিকুলের জন্য পথপ্রদর্শক করা হয়েছে’’। [সূরা-আলে ইমরান, আয়াত: ৯৬]

  • বায়তুল্লাহ বা আল্লাহর ঘর বা কা‘বাকে বাইতুল আতীকও বলা হয়। কারণ, আল্লাহ এ ঘরকে কাফের শাসকদের থেকে স্বাধীন করেছেন। অথবা আতীক অর্থ প্রাচীন। কারণ এ ঘরটি সর্ব প্রাচীন ইবাদত ঘর। আশ্চর্যের বিষয় হলো -এ ঘরের স্থানটি পৃথিবীর ভৌগলিক মানচিত্রের কেন্দ্রে অবস্থিত।
  • কা‘বা ঘর নির্মাণ ও সংস্কার হয়েছে একাধিকবার। কারও কারও মতে পাঁচবার: (১) ফিরিশতা কর্তৃক (২) আদম আলাইহিস সালাম কর্তৃক  (৩) ইবরাহীম আলাইহিস সালাম কর্তৃক (৪) জাহেলী যুগে কুরাইশ সম্প্রদায় কর্তৃক (৫) ইবন যুবায়ের কর্তৃক। তবে বিশুদ্ধ মতে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম সর্বপ্রথম কা‘বা ঘর নির্মাণ করেন।
  • আল্লাহ তা‘আলা কুরআনুল কারীমে বলেন,

﴿جَعَلَ ٱللَّهُ ٱلۡكَعۡبَةَ ٱلۡبَيۡتَ ٱلۡحَرَامَ قِيَٰمٗا لِّلنَّاسِ﴾ [المائ‍دة: ٩٧]  

‘‘আল্লাহ কা‘বাকে সম্মানিত ঘর করেছেন, মানুষের স্থীতিশীলতার কারণ করেছেন’’। [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৯৭]

  • আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَعَهِدۡنَآ إِلَىٰٓ إِبۡرَٰهِ‍ۧمَ وَإِسۡمَٰعِيلَ أَن طَهِّرَا بَيۡتِيَ لِلطَّآئِفِينَ وَٱلۡعَٰكِفِينَ وَٱلرُّكَّعِ ٱلسُّجُودِ﴾ [البقرة: ١٢٥]

‘‘এবং আমরা ইবরাহীম ও ইসমা‘ঈল-কে আদেশ দিয়েছিলাম যেন তারা আমার ঘরকে তাওয়াফকারীদের, ই‘তিকাফকারীদের, রুকু ও সাজদাহকারীদের জন্য পবিত্র করে রাখে’’। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১২৫]

  • কা‘বা ও হজের ইতিহাসে রয়েছে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের মহৎ ইসলামী আখ্যান। আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে তার স্ত্রী হাজের ও পুত্র ইসমা‘ঈল আলাইহিস সালামকে মরুময়, পাথুরে ও জনশূন্য মক্কা উপত্যকায় রেখে আসার নির্দেশ দেন -এটা ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষাস্বরূপ।
  • প্রচণ্ড পানির পিপাসায় ইসমা‘ঈল আলাইহিস সালামের প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত, তাঁর মা ‘হাজের’ পানির সন্ধানে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে ৭ বার ছুটাছুটি করেন। অতঃপর  জিবরীল আলাইহিস সালাম এসে শিশু ইসমাঈলের জন্য সৃষ্টি করলেন সুপেয় পানির কূপ -যমযম। আল্লাহর নির্দেশে ইবরাহীম ও ইসমা‘ঈল আলাইহিস সালাম দু’জনে যমযম কূপের পাশে ইবাদতের লক্ষে কা‘বার পুণঃনির্মাণ কাজ শুরু করলেন।
  • আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম আলাইহিস সালামের আনুগত্য দেখার জন্য আরেকটি পরীক্ষা নিলেন। তিনি ইবরাহীম আলাইহিসকে সালাম স্বপ্নে দেখালেন যে, তিনি তার পুত্রকে কুরবানি করছেন। আর এ স্বপ্নানুসারে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম যখন বাস্তবে তার পুত্রকে জবাই করতে উদ্যত হলেন তখন আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে গেলেন এবং ইবরাহীমের পুত্রের স্থলে একটি পশু কুরবানি করিয়ে দিলেন। সেই থেকে হজের সাথে সাথে চলে আসছে এ নিয়ম, মুসলিম বিশ্বে যা ঈদুল আযহা (কুরবানী ঈদ বা বকরা ঈদ) নামে পরিচিত।
  • ইসমা‘ঈল আলাইহিস সালামের মৃত্যুর পর পবিত্র কা‘বা বিভিন্ন জাতি-উপজাতির দখলে চলে আসে এবং তারা একে মুর্তি পূজার জন্য ব্যবহার করতে থাকে এবং এ সময়ে উপত্যকা এলাকায় মৌসুমী বন্যার কবলে পড়ে কা‘বা ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।

অতঃপর ৬৩০ খৃষ্টাব্দে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নেতৃত্বে মুসলিমগণ কা‘বার মূর্তিগুলো ভেঙে ফেলেন এবং কা‘বাকে পুনরায় আল্লাহর নামে উৎসর্গ করেন।

  • কুরাইশরা যখন কা‘বা পুণঃনির্মাণ করেন, তখন জান্নাত থেকে আসা পাথর ‘হাজারে আসওয়াদ’কে কা‘বার এক কোণে স্থাপন করা হয় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে। কা‘বার এক পার্শ্বে একটি স্থান রয়েছে যার নাম ‘মাকামে ইবরাহীম’; এখানে দাঁড়িয়ে  ইবরাহীম আলাইহিস সালাম কা‘বার নির্মাণ কাজ পর্যবেক্ষণ করতেন, এখানে একটি পাথরে তাঁর পদছাপ রয়েছে। কা‘বা ঘরের উত্তর দিকে কা‘বা সংলগ্ন অর্ধ-বৃত্তাকার একটি উচু দেওয়াল আছে যা কা‘বা ঘরেরই অংশ যার নাম ‘হাতিম’ বা হিজর। হাজরে আসওয়াদ ও কা‘বা ঘরের দরজার মাঝের স্থানকে ‘মুলতাযাম’ বলা হয়। কা‘বা ঘরকে বৃষ্টি ও ধুলাবালীর থেকে রক্ষার জন্য একটি চাদর দ্বারা আবৃত করে রাখা হয় যা ‘গিলাফ’ নামে পরিচিত।
  • রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার অনুসারীরা যেসব পথে ঘুরে হজ পালন করেছেন এর মধ্যে রয়েছে; কা‘বা তাওয়াফ করা, সাফা ও মারওয়া পর্বতের মধ্যে সা‘ঈ করা, মিনায় অবস্থান করা ও আরাফায় উকুফ করা এবং মুযদালিফায় রাত্রিযাপন করা, জামারাতে কংকর নিক্ষেপ করা এবং ইবরাহীম আলাইহিস সালামের ত্যাগের স্মৃতিচারণ ও আল্লাহর স্মরণকে বুলন্দ করার জন্য পশু যবেহ করা।
  • একটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার; আল্লাহ তা‘আলা কা‘বার ভিতরে অবস্থান করেন না বা আমরা মুসলিমরা কা‘বার উপাসনা করি না বা কা‘বা থেকে কোনো বরকত হাসিল করা যায় না। কা‘বা হচ্ছে ‘কিবলা’ – যা মুসলিমদের জন্য দিক নির্ণায়ক ও ঐক্কের লক্ষ্য। আমরা মুসলিমরা সম্মিলিতভাবে কা‘বার দিকে মুখ করে আল্লাহর উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করি।
  • কাবার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ ও উচ্চতা:
উচ্চতামুলতাযেমের দিকে দৈর্ঘ্যহাতিমের দিকে দৈর্ঘ্যরুকনে ইয়েমানি ও হাতিমের মাঝে দৈর্ঘ্যহাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়েমানি মাঝে দৈর্ঘ্য
১৪ মি.১২.৮৪মি.১১.২৮মি.১২.১১মি.১১.৫২মি.
  • কা‘বা ও মক্কার ইতিহাস বিস্তারিত জানতে ‘পবিত্র মক্কার ইতিহাস: শাইখ ছফীউর রহমান মোবারকপুরী’ বইটি পড়ুন।

হজের নির্দেশনা, গুরুত্ব ও পুরস্কার ›

  • আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَأَذِّن فِي ٱلنَّاسِ بِٱلۡحَجِّ يَأۡتُوكَ رِجَالٗا وَعَلَىٰ كُلِّ ضَامِرٖ يَأۡتِينَ مِن كُلِّ فَجٍّ عَمِيقٖ ٢٧﴾ [الحج: ٢٧]  

‘‘এবং মানষের মাঝে হজের কথা ঘোষণা করে দাও; তারা পায়ে হেঁটে ও শীর্ণ উটের পিঠে করে তোমার কাছে আসবে, তারা দুর-দুরান্তের পথ অতিক্রম করে আসবে (হজ এর উদ্দেশ্যে)’’। [সুরা আল-হাজ, আয়াত: ২৭]

  • আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فِيهِ ءَايَٰتُۢ بَيِّنَٰتٞ مَّقَامُ إِبۡرَٰهِيمَۖ وَمَن دَخَلَهُۥ كَانَ ءَامِنٗاۗ وَلِلَّهِ عَلَى ٱلنَّاسِ حِجُّ ٱلۡبَيۡتِ مَنِ ٱسۡتَطَاعَ إِلَيۡهِ سَبِيلٗاۚ وَمَن كَفَرَ فَإِنَّ ٱللَّهَ غَنِيٌّ عَنِ ٱلۡعَٰلَمِينَ ٩٧﴾ [ال عمران: ٩٧]  

‘‘আর এতে রয়েছে স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ, যে মাকামে ইবরাহীমে প্রবেশ করবে সে নিরাপত্তা লাভ করবে। আর যার সামর্থ্য রয়েছে (শারীরিক ও আর্থিক) তার এ কা‘বায় এসে হজ করা আল্লাহর পক্ষ থেকে ফরয বা অবশ্য কর্তব্য, আর যদি কেউ এ বিধান (হজ) কে অস্বীকার করে তবে; (তার জেনে রাখা উচিত) আল্লাহ সৃষ্টিকুলের কারো মুখাপেক্ষী নন’’। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯৭]

  • আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿إِنَّ ٱلصَّفَا وَٱلۡمَرۡوَةَ مِن شَعَآئِرِ ٱللَّهِۖ فَمَنۡ حَجَّ ٱلۡبَيۡتَ أَوِ ٱعۡتَمَرَ فَلَا جُنَاحَ عَلَيۡهِ أَن يَطَّوَّفَ بِهِمَاۚ وَمَن تَطَوَّعَ خَيۡرٗا فَإِنَّ ٱللَّهَ شَاكِرٌ عَلِيمٌ ١٥٨﴾ [البقرة: ١٥٨]  

‘‘নিশ্চয় সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহে‎র অর্ন্তগত। যে ব্যক্তি (এ গৃহে) হজ ও উমরাহ করে তার জন্যে এ উভয় পাহাড়ের মাঝে প্রদক্ষিণ করা দোষণীয় নয় এবং কোনো ব্যক্তি নিষ্ঠার সাথে স্বেচ্ছায় সৎকর্ম করলে আল্লাহ কৃতজ্ঞতাপরায়ণ ও সর্বজ্ঞাত’’। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৫৮]

  • আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَأَتِمُّواْ ٱلۡحَجَّ وَٱلۡعُمۡرَةَ لِلَّهِۚ﴾ [البقرة: ١٩٦]  

‘‘এবং তোমরা আল্লাহর জন্য হজ ও উমরাহ পালন কর’’। সূরা আল-বাকারা:আয়াত: ১৯৬]

  • আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَتَزَوَّدُواْ فَإِنَّ خَيۡرَ ٱلزَّادِ ٱلتَّقۡوَىٰۖ وَٱتَّقُونِ يَٰٓأُوْلِي ٱلۡأَلۡبَٰبِ﴾ [البقرة: ١٩٧]  

‘‘আর তোমরা পাথেয় সঞ্চয় করে নাও (হজ যাত্রার জন্য), বস্তুতঃ সর্বোৎকৃষ্ট পাথেয় হচ্ছে তাকওয়া (আল্লাহভীতি) এবং হে জ্ঞানীরা, তোমরা আমারই তাকওয়া অবলম্বন কর’’। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৯৭]

  • বিদায় হজে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘হে জনগণ! তোমরা আমার কাছ থেকে হজের নিয়ম-কানুন শিখে নাও’’।
  • রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘যে ব্যক্তি হজের সংকল্প করে, সে যেন দ্রুত সেটা সম্পাদন করে’’।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘হজ একবার, যে ব্যক্তি একাধিকবার করবে তা (তার জন্য) নফল হবে’’।

সহীহ মুসলিম, নাসাঈ, আবু দাউদ আবু দাউদ; মিশকাত, হাদীস নং ২৫২৩ আবু দাউদ, হাদীস নং ১৭২১

  • রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘তিনটি দল আল্লাহর মেহমান; আল্লাহর পথে জিহাদকারী, হজকারী ও উমরাহ পালনকারী’’।
  • এক হাদীসে এসেছে, ‘‘উত্তম আমল কী -এ মর্মে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞসা করা হলো। উত্তরে তিনি বললেন, ‘‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান। বলা হলো, ‘‘তারপর কী?’’, তিনি বললেন, আল্লাহ পথে জিহাদ। বলা হলো, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, মাবরুর হজ।
  • বুরাইদাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘হজ পালনে অর্থ ব্যয় করা আল্লাহর পথে ব্যয় করার সমতুল্য। এক দিরহাম ব্যয় করলে তাকে সাতশত পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়’’।
  • আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ ও জাবির রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘আগুন যেভাবে স্বর্ণ, রৌপ্য ও লোহা থেকে খাঁদ দূর করে, তেমনি যদি তোমরা তোমাদের দারিদ্রতা ও পাপ মোচন করতে চাও তাহলে তোমরা পর পর হজ ও উমরাহ পালন কর’’।

নাসাঈ, মিশকাত, হাদীস নং ২৫৩৭ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৪২২ আহমদ, বায়হাকী তিরমিযী, নাসাঈ

  • আবু হুরায়রাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘যদি কেউ হজ, উমরাহ পালন অথবা জিহাদের জন্য যাত্রা করে এবং পথিমধ্যে যদি তার মৃত্যু হয় তাহলে আল্লাহ এর জন্য তাকে পূর্ণ প্রতিদান দিয়ে দেবেন’’।
  • একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করে আয়েশা বললেন, ‘‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমরা কি আপনাদের সাথে জিহাদ ও অভিযানে যাব না? তিনি বললেন, তোমাদের জন্য উত্তম জিহাদ হলো হজ (তথা মাবরুর হজ)’’।
  • হাদীসে আরও এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘কারো ইসলাম গ্রহণ পূর্বকৃত সকল পাপকে মুছে দেয়। হিজরত তার পূর্বের সকল গুনাহ মুছে দেয়, ও হজ তার পূর্বের সকল পাপ মুছে দেয়’’।
  • আবু হুরায়রাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘যে ব্যক্তি শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ পালন করল এবং নিজেকে গর্হিত পাপ কাজ ও সকল ধরনের পাপ কথা থেকে বিরত রাখল তাহলে সে হজ থেকে এমন নিষ্পাপ ও নিষ্কলঙ্ক হয়ে ফিরে আসবে যেমন সে তার জন্মের সময় ছিল’’।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘মাবরুর হজের (কবুল হজের) পুরষ্কার বা প্রতিদান জান্নাত ব্যতীত আর কিছুই নয়’’।

মিশকাত, হাদীস নং ২৫৩৯; মুসনাদে আবী ইয়া‘লা, হাদীস নং ৯১৬ (আল-মাকসাদুল ‘আলী); সহীহ আত-তারগীব আত-তারহীব, হাদীস নং ১২৬৭। সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৮৬১ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৭৩ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৪২৪ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৭৭৩/১৬৫০

 হজ সম্পর্কে ভুল ধারণা ও শাস্তি ›

  • অনেক সাধারণ মানুষই সামর্থ্য হওয়ার পরও মনে করেন -কেন কম বয়সে হজ করবো? হজ করলে তো আমাকে হজ ধরে রাখতে হবে! পূর্ণাঙ্গভাবে ইসলাম অনুসরণ না করা পর্যন্ত তো হজে যাওয়া ঠিক হবে না! হজ করলে তো আর টিভি, গান-বাজনা দেখা যাবে না! সহজ পন্থায় (অবৈধ) অর্থ উপার্জন করতে পারব না! হজ করার পর যদি আমি খারাপ কাজে লিপ্ত হই তাহলে লোকেই বা কী বলবে!.. সুতরাং এখন জীবনকে উপভোগ করি, আর কিছু টাকা পয়সা উপার্জন করে নেই। আর তারপর বৃদ্ধ বয়সে যখন কোনো কিছু করার থাকবে না তখন গিয়ে হজ করে আসব!! তখন আল্লাহ অবশ্যই আমার অতীতের সকল পাপ মাফ করে দেবেন এবং আমি ইনশা-আল্লাহ জান্নাতে যেতে পারবো!! কি যুক্তি আর বুদ্ধিমান আমরা চিন্তা করেছেন!

-হে আল্লাহ তুমি আমাদের দয়া ও হিদায়াত দান কর। আমরা যদি মনে করি, আমরা সর্বশক্তিমান আল্লাহর সঙ্গে চালাকি করব, তাহলে মনে রাখবেন এর মাধ্যমে আমরা আসলে আমাদের নিজেদেরকেই বোকা বানাচ্ছি, দোষী করছি এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবো।

  • যারা সামর্থ্য হওয়ার পরও হজকে মুলতবি করে রেখেছেন তাদের জন্য বড় সতর্কবাণী হলো, উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেছেন, ‘‘যে ব্যক্তি হজের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ পরিত্যাগ করল, সে ইয়াহূদী হয়ে মরুক অথবা নাসারা হয়ে মরুক -তাতে কিছু যায় আসে না’’। 

সুনানুল কুবরা, হাদীস নং ৮৯২৩

  • উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেছেন, ‘‘আমার ইচ্ছা হয় যে, কিছু লোককে রাজ্জ্যের শহরগুলোতে প্রেরণ করি এবং তারা খুঁজে দেখুক ঐ সমস্ত লোককে যাদের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ পালন করে না তাদের ওপর জিযিয়া কর আরোপ করা হোক। কেননা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যারা হজ পালন করে না তারা মুসলিম নয়, তারা মুসলিম নয়’’।
  • ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘যে হজ পালন করতে চায় সে যেন দ্রুত তা পালন করে। কেননা সে অসুস্থ হয়ে যেতে পারে অথবা কোনো সমস্যায় জর্জরিত হয়ে হজ করার সুযোগ হারাতে পারে”।
  • হজের সামর্থ্য হওয়ার সাথে সাথেই হজ পালন করা উচিত। কারণ মৃত্যু কখন চলে আসতে পারে তা জানা নেই। অলসতার কারণে একটি ফরয ইবাদত বাকি রেখে মারা গেলে তো আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

আবু দাউদ, হাদীস নং ১৭৩২

হজের শর্তাবলী ও যার ওপর হজ ওয়াজিব ›

  • হজ একটি অবশ্য পালনীয় ইবাদত, তবে কিছু শর্ত সাপেক্ষে।
  • নিম্নোক্ত ৭/৮টি মৌলিক শর্ত পূরণ সাপেক্ষে হজ প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য ফরয, যা জীবনে অন্তত একবার পালন করতে হবে।

শর্তগুলো হলো:

  1. মুসলিম হওয়া।
  2. প্রাপ্তবয়স্ক/বালিগ হওয়া (১৫ বছর)।
  3. স্বাধীন বা মুক্ত হওয়া (কৃতদাস না হওয়া)।
  4. শারীরিকভাবে সুস্থ ও মানসিক ভারসাম্য থাকা।
  5. হজে গমনের ও সম্পূর্ণ খরচ বহনের সামর্থ্য থাকা।
  6. হজ পালনের জন্য যাত্রাপথের নিরাপত্তা থাকা।
  7. মহিলার সঙ্গে মাহরাম থাকা।

* হজে থাকাকালীন সময়কাল পরিবারের ভরণপোষণের নিশ্চয়তা করা।

  • একজন মহিলার মাহরাম হলেন তার স্বামী অথবা তার পরিবার ও আত্মীয়ের মধ্যে এমন একজন পুরুষ যার সাথে ইসলামী শরী‘আহ্ মোতাবেক বিবাহ বৈধ নয়। (যথা -পিতা, ভাই, ছেলে, চাচা, মামা, ভাইয়ের/বোনের ছেলে)
  • যদি কেউ আপনাকে হজ করার জন্য খরচ বা অর্থ (হালাল অর্থ) প্রদান করেন তবে তা বৈধ। আপনি যদি এ টাকায় হজ পালন করেন তাহলে পরবর্তীতে আপনার ওপর হজ আর বাধ্যতামূলক হবে না; এমনকি পরবর্তীতে আপনি যদি আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান হনও।
  • আপনি যদি আপনার সন্তানকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই হজে নিয়ে যান তাহলে সেই হজ সেবামূলক হজ হিসেবে গণ্য হবে ও এ হজের সাওয়াব আপনি লাভ করবেন এবং প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর যদি সে আর্থিক সামর্থ্যবান হয়, তবে আপনার সন্তানের ওপর পুনরায় হজ ফরয হবে।
  • যে নারীর হজ সফর সম্পন্ন করার অর্থমূল্যের নিজস্ব অলঙ্কার রয়েছে তার ওপর হজ ফরয। সে এ অলঙ্কার বিক্রি করেই হজে যেতে পারবে তবে অবশ্যই মাহরাম সঙ্গে নিতে হবে। কোনো মহিলার যদি মাহরাম না থাকে তবে হজ তার জন্য প্রযোজ্য নয়। সে কাউকে দিয়ে তার বদলি হজ করিয়ে নিবে। যদি কোনো মহিলা মাহরাম ছাড়াই হজে যায় তাহলে বড় ধরনের গোনাহে লিপ্ত হলো বলে আলেমগণ মত প্রকাশ করেছেন।
  • একজন ব্যক্তি টাকা ধার/কর্জ করেও হজ পালন করতে পারবেন, যদি তিনি এ টাকা ভবিষ্যতে পরিশোধ করার সামর্থ্য রাখেন, তবে এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, ধার করে হজ করা জরুরি নয়।
  • যদি কোনো ব্যক্তি সামর্থ্য থাকার পরও হজ পালন না করেই মারা যায়, তাহলে অন্য কেউ তার পক্ষে বদলী হজ করতে পারবেন। তবে একটি জিনিস মনে রাখতে হবে, তা হচ্ছে, বদলী হজকারীকে সর্বপ্রথম তার নিজের হজ পালন করেছেন এমন হতে হবে।
  • অনেক লোক ভুল করে প্রচার করে থাকেন যে, যিনি উমরাহ করেছেন তার ওপর হজ ফরয হয়ে যায়। হজ তার ওপর ফরয নয় যার এটা পালন করার মতো যথেষ্ট সামর্থ্য নেই, এমনকি সে যদি হজের মাসেও উমরাহ পালন করে।
  • একটি ধারণা প্রচলিত আছে, যার ঘরে অবিবাহিত কন্যা রয়েছে সেই কন্যার বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত তার ওপর হজ ফরয নয়। এটা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত কথা।

হজের জন্য নিজকে প্রস্তুত করুন ›

  • প্রথমেই ঈমানকে নবায়ন ও আকীদাকে শুদ্ধ করুন। যত দ্রুত সম্ভব সুস্থ ও বলিষ্ঠ থাকা অবস্থায় হজ পালন করুন, হজ পালনে বিলম্ব করা উচিৎ নয়।
  • অন্তরের নিয়তকে পরিশুদ্ধ করুন, কারণ ‘‘নিয়তের ওপর আমল নির্ভরশীল’’। সকল প্রকার শির্ক ও বিদ‘আত সম্পর্কে জানুন ও তা থেকে মুক্ত হয়ে চলুন।
  • হজের যাত্রা জীবনে একবারই মনে করুন। সুতরাং এ যাত্রাকে নিজের জীবনের ইতিবাচক পরিবর্তনে কাজে লাগানোর চেষ্টা করুন।
  • সুখ্যাতি, ব্যবসা, ভ্রমণ বা শুধু মাহরাম হওয়ার উদ্দেশ্যে হজ করবেন না।
  • আন্তরিকভাবে অতীতের সকল পাপের জন্য আল্লাহর কাছে তাওবা করুন ও ক্ষমা চান এবং ভবিষ্যতে পাপ কাজ না করার দৃঢ় সংকল্প নিন।
  • দেনমাহরসহ আপনার অন্যান্য সকল পাওনা ও ক্ষতিপুরণ পরিশোধ করুন।
  • আপনার হজের জন্য অর্থ সংগ্রহ করুন এবং নিশ্চিত করুন তা হালাল পথে উপার্জিত হয়েছে। অবৈধ বা সুদ মিশ্রিত টাকা হজ কবুল হওয়ার অন্তরায়।
  • ভবিষ্যতে সমস্যা হতে পারে এমন গুরুত্বপূর্ণ অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করুন।
  • বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতজনদের কাছে মিথ্যা বলা, খারাপ আচরণ, হক নষ্ট করা ও তাদের কষ্ট দেওয়ার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিন।
  • এটিই আপনার জীবনের সর্বশেষ যাত্রা হতে পারে, সুতরাং আপনার পরিবারের জন্য একটি উইল বা অসীয়তনামা করে রেখে যান।
  • হজ ও উমরাহ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ও সহীহ বই থেকে জানুন এবং হজের কিছু দো‘আ মুখস্থ করুন।
  • আগে হজ করেছেন এমন ব্যক্তির কাছ থেকে হজ সম্পর্কে জানুন।
  • নিজেকে শারীরিকভাবে সুস্থ রাখুন। (পাঁচ ওয়াক্ত সালাত মসজিদে গিয়ে আদায় করুন, বেশি বেশি হাটাহাটি করুন, ব্যায়াম করুন ও নিয়মিত চিকিৎসা নিন)
  • মানসিকভাবে প্রস্তুত হোন। (ধৈর্যশীল হতে শিখুন, নিজেকে মানিয়ে নিতে, রাগকে দমন করতে ও ত্যাগ শিকার করতে শিখুন)
  • আপনার মাঝে পরিবর্তন আনুন -আপনার মুখ, চোখ, হাত, পা ও কান নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করুন। নিজকে সংযত করুন।
  • ধার্মিক, সহায়ক ও বিশ্বস্ত এরকম ২/১ জনকে সঙ্গী হিসেবে হজ যাত্রার জন্য খুঁজে নিন এবং তাদের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখুন।
  • সম্ভব হলে দরকারী কিছু ইংরেজী, আরবী ও হিন্দি শব্দের অর্থ শিখে নিন।
  • আপনার হজের যাত্রার পরিকল্পনা করুন, প্রথমে মক্কা না মদীনা গেলে উত্তম হয় -তা ভেবে দেখুন।
  • দাঁড়ি রেখে দেওয়ার ব্যাপারে ভাবুন; কারণ তা রাখা ওয়াজিব, কাটা হরাম, দাঁড়ি না রাখলে কবিরা গুনাহ হয় এবং ধুমপান, জর্দা ও গুল-এর মতো হারাম অভ্যাসগুলো পরিহার করুন।
  • সদা আল্লাহর যিকিরের মাধ্যমে আন্তরকে আন্দোলিত রাখার অভ্যাস করুন।
  • হজ সফরে আবেগ তাড়িত হয়ে কোনো কিছু না করার বিষয়ে সজাগ থাকুন।
  • গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হজে যাওয়ার পূর্বে আপনার মনে তাকওয়া অর্থাৎ আল্লাহভীতি ও ধর্মনিষ্ঠা আনতে হবে। আপনার তাকওয়াকে জাগ্রত করুন।

হজের পূর্ব প্রস্তুতি ›

  • হজে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া মাত্রই মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট করে নিন।
  • হজ সংক্রান্ত সরকারের বিভিন্ন সার্কুলার ও নির্দেশনার খোঁজ খবর রাখুন এ ওয়েব সাইট থেকে www.hajj.gov.bd
  • বিগত হাজীদের কাছ থেকে সরকারি ব্যবস্থাপনা ও বেসরকারি হজ এজেন্সির সেবা সম্পর্কে মতামত নিন (ঢাকায় হজ মেলায় যেতে পারেন)।
  • বেসরকারি বিভিন্ন হজ এজেন্সির খোঁজ নিন এবং প্যাকেজ সম্পর্কে জানুন।
  • নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পরিবার থেকে যারা হজে যাবেন তারা কম দামি হজ প্যাকেজে প্রলুব্ধ হবেন না, কারণ সস্তার তিন অবস্থা।
  • আর ধনীরাও ৫/৪ তারকা হোটেলের হজ প্যাকেজে প্রলুব্ধ হবেন না। কারণ, এটা হলিডে ট্যুর নয়।
  • অঅনুমোদিত হজ এজেন্সি থেকে সতর্ক থাকুন। কারণ, এতে আপনি প্রতারিত হতে পারেন।
  • সরকারি ব্যবস্থাপনা অথবা সরকার অনুমোদিত কোনো একটি বেসরকারি হজ এজেন্সি যারা গোড়ামি ও ভ্রান্ত আকীদা মুক্ত বিজ্ঞ হকপন্থী আলেম দ্বারা পরিচালিত তাদের হজ প্যাকেজ বেছে নিন। আপনার হজ শুদ্ধ হওয়ার জন্য এ বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
  • তাদের হজ সেবা সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন ও সেবার লিখিত বিবরণ রাখুন এবং তাদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলুন।
  • সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডে ১৫ কপি পাসপোর্ট সাইজ ও ১০ কপি স্ট্যাম্প সাইজের রঙ্গিন ছবি করুন।
  • হজ ফরম পূরণ করুন এবং হজ চুক্তি স্বাক্ষর করে এর মূল কপি ও একটি করে ফটোকপি রেখে দিন।
  • সরকারি অথবা বেসরকারি হজ এজেন্সির ব্যাংক হিসাবে টাকা জমা দিয়ে এজেন্সির অফিস থেকে পাকা জমা রশিদ সংগ্রহ করুন।
  • সবচেয়ে ভালো হয় আগেভাগেই কম দামে কিছু সৌদি রিয়াল কিনে নেওয়া।
  • জানাযা সালাত কিভাবে পড়তে হয় ও জানাযার সালাত-এর দো‘আ শিখে নিন।
  • হজে যাওয়ার আগে মহিলাদের মসজিদে সালাত আদায়ের নিয়ম-কানুন শিখে নেওয়া ভালো।
  • আপনি যদি চাকুরিজীবি হন, তাহলে আপনার প্রতিষ্ঠান থেকে অনাপত্তিপত্র সংগ্রহ করুন।
  • লিফট ও এস্কেলেটরে চড়ার অভ্যাস করুন।
  • হজে যাওয়ার জন্য প্রত্যেককে অবশ্যই জেলা পর্যায়ে সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে মেডিকেল বোর্ডে গিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হবে।
  • মনিংজাইটিস টিকা নিতে হবে, ঢাকার হজ ক্যাম্প থেকেও নেওয়া যাবে।
  • বয়স ৪০/৪৫ এর নিচে হলে পুলিশ ভেরিফিকেশন হয়ে থাকে সাধারণত।
  • কিছু হজ প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নিন এবং হজ প্রশিক্ষণ ভিডিও দেখুন।
  • ভালো হজ এজেন্সি পছন্দ করার জন্য টিপস: নন-হিলটপ বাড়ি (পাহাড়ের উপর বাড়ি না), মসজিদের নিকটবর্তী বাড়ী, তিন বেলা খাবার ব্যবস্থা, আরাফা ও মিনায় খাবারের ব্যবস্থা, হাদীর ব্যবস্থা, ভালো বাস সার্ভিস, দর্শনীয় স্থানসমূহ যিয়ারত সুবিধা ইত্যাদি।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বেসরকারি হজ এজেন্সিগুলো হজের সময় হাজীদের কেমন সেবা দেন। তাদের কাছে প্রত্যাশা কম করবেন। তাদেরকে সত্য বলার পরামর্শ দেবেন। তারা ন্যূনতম কী কী সেবা দিতে পারবে আর কী কী পারবেন না, তা যেন তারা পরিষ্কার লিখিত ভাবে জানিয়ে দেন। কোনো লুকোচুরি যেন না থাকে। তারা যেন এমন কোনো বিষয় গোপন না করেন যা হজের সময় আপনার কষ্ট বা ক্ষতির কারণ হতে পারে। বিভিন্ন অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির কারণে অনেক সময় আপনার হজ এজেন্সি প্রত্যাশিত কিছু সেবা নাও দিতে পারেন, সেক্ষেত্রে এজেন্সির লোকদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করবেন না। এক্ষেত্রে ধৈর্যের পরিচয় দিন।

কিছু তথ্য জেনে রাখুন ›

হতেপর্যন্তদূরত্ব (আনুমানিক)সময় (আনুমানিক)
ঢাকা বিমানবন্দরজেদ্দা বিমানবন্দর৩২৫৩ মাইল/৫২৩৪ কি.মি৬-৭ ঘণ্টা (বিমানে)
জেদ্দা বিমান বন্দরমক্কা৫৫ মাইল/৯০ কি.মি১-২ ঘণ্টা (বাসে)
জেদ্দা বিমানবন্দরমদীনা২৮০ মাইল/৪৫০ কি.মি৬-৭ ঘণ্টা (বাসে)
মক্কামদীনা৩০৫ মাইল/৪৯০ কি.মি৭-৮ ঘণ্টা (বাসে)
মক্কাআরাফা ১৪ মাইল/২২ কি.মি
মক্কামিনা৫ মাইল/৮কি.মি১-২ ঘণ্টা (বাসে)
মিনাআরাফা৯ মাইল/১৪ কি.মি২-৩ ঘণ্টা (বাসে)
আরাফামুযদালিফা৮ মাইল/১৩ কি.মি২-৩ ঘণ্টা (বাসে)
মুযদালিফামিনা১.৬ মাইল/২.৫ কি.মি১-২ ঘণ্টা (বাসে)
  • ভ্রমণের রুট: ভারত, আরব সাগর, মাস্কট/দুবাই হয়ে সৌদি আরব।
  • আবহাওয়া: মক্কা (২২-৪০ ডিগ্রি), মদীনা (২০-৪২ ডিগ্রি)।
  • আদ্রতা: মক্কা (৬০-৭২%), মদীনা (২০-৪৩%)।
  • সময়ের ব্যবধান: তিন ঘণ্টা (ঢাকায় সকাল ৯টা, মক্কায় তখন সকাল ৬টা)
  • সৌদি রিয়াল রেট: ১ সৌদি রিয়াল=২১-২২টাকা। (বাজার দর সাপেক্ষে)
  • বিদ্যুৎ: ১১০/২২০ ভোল্ট

সৌদি ফোন কোড: +৯৬৬ XXXXXXXXX

কিছু যোগাযোগের ঠিকানা জেনে রাখুন ›

ঢাকা বাংলাদেশ হজ অফিস:

ঠিকানা: হজ অফিস, আশকোনা, এয়ারপোর্ট, ঢাকা।

ফোন: ডিরেক্টর (৮৯৫৮৪৬২), সহকারী হজ অফিসার (৭৯১২৩৯১), স্বাস্থ্য (৭৯১২১৩২)

আইটি হেল্প: ৭৯১২১২৫, ০১৯২৯৯৯৪৫৫৫

জেদ্দায় বাংলাদেশি দূতাবাস:

যোগাযোগের ঠিকানা: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কনস্যুলেট জেনারেল

পিও বক্স-৩১০৮৫, জেদ্দাহ ২১৪৯৭, সৌদি আরব।

অবস্থান: ৩ কিলোমিটার, পুরাতন মক্কা রোডের কাছে (মিতশুবিশি কার অফিসের পেছনে) নাজলাহ, পশ্চিম জেদ্দা, সৌদি আরব।

ফোন: ৬৮৭ ৮৪৬৫ (পিএবিএক্স)

জেদ্দায় বাংলাদেশ হজ মিশন:

লোকেশন: জেদ্দা ইর্ন্টারনেশনাল এয়ারপোর্ট (বাংলাদেশ প্লাজার নিকটবর্তী)।

ফোন: +৯৬৬-২-৬৮৭৬৯০৮। ফ্যাক্স:০০-৯৬৬-২-৬৮৮১৭৮০।

আইটি হেল্প: +৯৬৬৫৬২৬৬৩৪৬৭।

ই-মেইল: jeddah@hajj.gov.bd 

মক্কায় বাংলাদেশ হজ মিশন:

লোকেশন: ইবরাহীম খলীল রোড, মিসফালাহ মার্কেট ও গ্রিনল্যান্ড পার্কের সামনে।

ফোন: +৯৬৬-২-৫৪১৩৯৮০,৫৪১৩৯৮১। ফ্যাক্স:০০-৯৬৬-২-৫৪১৩৯৮২

আইটি হেল্প: +৯৬৬৫৬২৬৫৪৬৬৪।

ই-মেইল: makkah@hajj.gov.bd 

মদীনায় বাংলাদেশ হজ মিশন:

লোকেশন: কিং ফাহাদ রোড জংশন ও এয়ারপোর্ট।

ফোন: +৯৬৬-০৪-৮৬৬৭২২০।

আইটি হেল্প: +৯৬৬৫৬২৬৫৪৩৭৬।

ই-মেইল: madinah@hajj.gov.bd 

মিনায় বাংলাদেশ হজ মিশন:

লোকেশন: ২৫/০৬২ সু-কুল আরব রোড ৬২, ৫৬, জাওয়হারাত রোডের সামান্তরালে।

বহুল ব্যবহৃত কিছু আরবি শিখে নিন ›

বাংলাআরবিবাংলাআরবি
আমিআনাআপনি কেমন আছেনকাইফাল হাল
আমি চাইআবগাআমাকে দাওআতিনী
এয়ারপোর্টমাত্বারবাজারসূক
জলদিসুরআনাইমা ফি
কত দাম?কাম ফুলুসনিনখুয
টাকা ফেরত দিনরজ্জা ফুলুসআলহামদুলিল্লাহ আমি ভালো আছিখায়ের, আলহামদুলিল্লাহ
কোথায়ফোয়েন/আইনাআমি বাংলাদেশী তাবু খুঁজছিআবগা খিমা বাংলাদেশ
ভাঙতি আছে কি?ফি সরফ?আমার মুয়াল্লিম…মুতাওয়াফী ….
মানি এক্সেঞ্জারসারাফ/মাসরাফআমি পথ হারিয়ে ফেলেছিআনা ফাগত্তু তারিক
পাসপোর্টজাওয়াযগাড়িসাইয়ারাহ
পুলিশশুরতাড্রাইভার, তুমি কি যাবে?ইয়া সাওয়াক, হাল আনতা রুহ
 ট্রাফিক সিগনালইশারাবাথরুম/টয়লেটহাম্মাম
রুটিখুবজ্সাদা ভাতরুজ সবুল
দুধহালীবমাঠালাবান
জুসআসীরপানিমুইয়া
রেস্তোরাঁমাত‘আমআপেলতুফ্ফাহ
মুরগীলাহাম দিজাজ১,২,৩,৫অহেদ, ছানি, ছালাছা, খামছা
আবাসিক হোটেলফানদাক১০, ৩০, ৫০আশারা, ছালাছিন, খামছীন
কলামাউয১০০,২০০,৩০০মিয়া, মিয়াতাইন, সালাসা মিয়াত

হজের প্রকারভেদ

১, ইফরাদ হজ > হজ> হাদী (পশু যবেহ)(ওয়াজিব নয়)

২, ক্বিরান হজ>উমরাহ>হজ> হাদী (পশু যবেহ) (ওয়াজিব)

৩, তামাত্তু হজ> উমরাহ>হজ> হাদী (পশু যবেহ) (ওয়াজিব)

  • বইয়ে তামাত্তু হজ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে এবং শেষে ক্বিরান ও ইফরাদ নিয়ে আলোচনা করবো।
  • বদলি হজ: কোনো ব্যক্তি যদি ফরয হজ আদায় করতে অক্ষম হয় তবে কোনো ব্যক্তিকে তার পক্ষ হতে হজ (বদলি হজ) পালন করার জন্য মনোনিত করতে পারেন। এক্ষেত্রে মনোনিত ব্যক্তি ইতোপূর্বে নিজের হজ পালন করেছেন এমন হতে হবে।

আবু রাযিন আল আকিলি থেকে বর্ণিত, তিনি এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করে বললেন, আমার পিতা খুব বৃদ্ধ, তিনি হজ ও উমরাহ পালন করতে পারেন না। সাওয়ারির উপর উঠে চলতেও পারেন না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার পিতার পক্ষ থেকে হজ ও উমরাহ করো।

আবু দাউদ, হাদীস নং ১৮১১; মিশকাত, হাদীস নং ২৫২৯ তিরমিযী, হাদীস নং ৮৫২

  • তিন প্রকার হজের মধ্যে বদলি হজ কোন প্রকার হবে তা, যে ব্যক্তির পক্ষ থেকে হজ করা হচ্ছে তিনি নির্ধারণ করে দেবেন। বদলি হজ -ইফরাদ হজ হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই; বরং উল্লিখিত হাদীসে হজ ও উমরাহ উভয়ের কথাই আছে।

হজের সময় যেসব জিনিসপত্র সঙ্গে নিবেন ›

  • প্রথমে ঠিক করে নিন আপনি কোন প্রকারের হজ করবেন এবং জেনে নিন আপনার প্রথম গন্তব্যস্থল কোথায়। (প্রথমে মক্কা না মদীনায় যাবেন)
  • আপনার গন্তব্যানুসারে যাত্রার প্রস্তুতি নিন। (ধরে নিচ্ছি আপনি প্রথমে মক্কায় যাবেন)
  • বেশি মালামাল নিয়ে আপনার বোঝা ভারী করবেন না, আবার কম নিয়ে অপ্রস্তুতও হবেন না।
  • পাসপোর্ট হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, সেজন্য আপনার পাসপোর্টের ফটোকপি নোটারি করে নিন এবং বিমানের টিকেট ও মেডিকেল সার্টিফিকেটের ফটোকপি করে নিন। বাসায়ও এর কপি রেখে যান।
  • অতিরিক্ত ১০ কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি ও ১০ কপি স্ট্যাম্প সাইজের রঙ্গিন ছবি সঙ্গে নিন।
  • মজবুত চাকাওয়ালা মাঝারি বা বড় আকারের ১টি ব্যাগ/লাগেজ সঙ্গে নিবেন।
  • মুল্যবান জিনিসপত্র (টাকা, টিকেট, পাসপোর্ট ইত্যাদি) রাখার জন্য ১টি কোমর/কাঁধ/সৈনিক ব্যাগ নিন।
  • সালাতের মুসাল্লা বা কাপড়, কাপড় শুকানো দড়ি ও ব্যাগ বাঁধার জন্য কিছু ছোট দড়ি সঙ্গে রাখুন।
  • পড়ার জন্য ছোট আকারের কুরআন মাজীদ ও বইপত্র এবং লোকেশন ম্যাপ সঙ্গে রাখুন।
  • যোগাযোগ এর জন্য সাধারণ মোবাইল অথবা এন্ড্রয়েড মোবাইল ফোন সঙ্গে থাকলে ভালো হয়।
  • দুই জোড়া করে চশমা ও কোমল স্লিপার সেন্ডেল এবং এগুলো রাখার জন্য ছোট পাতলা কাপড়ের একটি ব্যাগ।
  • রোদ থেকে বাঁচার জন্য ছোট সাদা বা বিশেষ রঙের ছাতা অথবা ক্যাপ।
  • পশু যবেহ (হাদী) বা ফিদিয়ার জন্য ৫০০-৬০০ সৌদি রিয়াল আলাদা করে রাখতে ভুলবেন না।
  • ব্যক্তিগত ব্যবহারের জিনিসপত্র: ব্রাশ, পেস্ট, টয়লেট পেপার, আয়না, চিরুনি, তেল, সাবান, তোয়ালে, শ্যাম্পু, নোটবুক, পারফিউম, ভ্যাসলিন, লোশন ও ডিটারজেন্ট ইত্যাদি সাথে নিন। তবে ইহরাম অবস্থায় ব্যবহার করার জন্য সেসব প্রসাধনী সুগন্ধহীন হতে হবে।
  • দুইটি ছোট বেডশিট ও একটি ফোলানো বালিশ, হালকা চাদর, পেষ্ট, গ্লাস, চামচ, টর্চ লাইট, বাথরুম সুগন্ধি, মুখোশ, রুমাল ও কাপড় হ্যাঙার প্রয়োজন মনে করলে সাথে নিন।
  • একটি দেশের পতাকা, এলার্ম ঘড়ি/হাত ঘড়ি, রোদ চশমা, মার্কার পেন।
  • পর্যাপ্ত ওষুধপত্র, কিছু দরকারি এন্টিবায়োটিক, ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র অনুসারে ভ্রমণের জন্য দরকারি কিছু ওষুধ।
  • ব্যাগের নিরাপত্তার জন্য সঙ্গে ছোট আকারের তালা-চাবি নিন এবং কিছু পলিথিন ব্যাগও নিন।
  • দরকারি জিনিসপত্র (টাকা, টিকেট, পাসপোর্ট, হজের পরিচয়পত্র, ক্রেডিট কার্ড) সবসময় হাতের কাছে অথবা নিরাপদ স্থানে রাখবেন।
  • সঙ্গে কিছু বাংলাদেশী টাকাও রাখবেন।
  • একটি সাধারণ পরামর্শ হলো : আপনার নাম, পাসপোর্ট নম্বর, হজ পরিচয়পত্র নম্বর, যোগাযোগের মোবাইল অথবা ফোন নম্বর, ট্রাভেল এজেন্টের নাম ও নং, হোটেলের নাম ও ঠিকানা, যে কোনো নিকট আত্মীয়ের নাম ও ঠিকানা ও মুয়াল্লিম নং আপনার সকল ব্যাগে ইংরেজিতে লিখে রাখবেন।
  • কিছু শুকনো খাবার যেমন-চিড়া, গুড়, বিস্কুট, বাদাম, ড্রাই কেক, ইত্যাদি সঙ্গে রাখুন।
  • হজে যাওয়ার সময় আপনার মালামালের একটি তালিকা করুন ও তালিকা চেক করুন।
  • হজে যাওয়ার সময় আপনার বড় লাগেজের আদর্শ ওজন হবে ৮ থেকে ১০ কেজি।
  • শেষ কথা হলো; হজে যাওয়ার সময় অবশ্যই সূরা-আল বাকারা-এর ১৯৭ নং আয়াতকে সাথে ব্যাগে নিয়ে নয় বরং অন্তরে করে নিয়ে যাবেন!

[পুরুষদের জন্য]

  • ইহরামের জন্য দুই সেট সাদা কাপড়।
  • ইহরামের কাপড় বাধার জন্য কোমর বেল্ট।
  • মাথা মুড়ানোর জন্য ১/২টি রেজার অথবা ব্লেড। তবে তা কোনোক্রমেই হাতের ব্যাগে রাখবেন না।
  • উপযুক্ত ও আরামদায়ক: প্যান্ট, শার্ট, ট্রাউজার, লুঙ্গি, টি-শার্ট, আন্ডারওয়্যার, পাঞ্জাবি, স্যান্ডেল, মোজা, জুতা, টুপি ইত্যাদি।

[মহিলাদের জন্য]

  • পরিষ্কার ও আরামদায়ক সালওয়ার-কামিজ, স্কার্ফ, হিজাব।
  • পুরো যাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত কাপড়।
  • লেডিস ন্যাপকিন, সেফটি পিন, কেঁচি, টিস্যু, স্যান্ডেল, মোজা ও জুতা ইত্যাদি।

হজের সময় যেসব পরিহার করবেন ›

  • টিনের ট্রাঙ্ক, ভারী স্যুটকেস, ভারী কম্বল ও পানির বালতি ইত্যাদি সাথে নেওয়া ঠিক হবে না।
  • ক্যাসেট অথবা সিডি সঙ্গে নিবেন না। কারণ, এর জন্য ইমিগ্রেশন চেক করতে পারে।
  • পচনশীল অথবা গলে যেতে পারে এমন খাবার নিবেন না। যেমন- ফল, চকলেট, দুধ ইত্যাদি।
  • পুরুষরা সিগারেট, স্বর্ণের আংটি, স্বর্ণের চেইন (সবই হারাম) সঙ্গে নিবেন না।
  • মহিলারা ভারী অলঙ্কার সঙ্গে নিবেন না।
  • শরীরে তাবিজ, কবজ ও ফিতা ইত্যাদি বাঁধা থাকলে তা খুলে ফেলে শির্ক মুক্ত হয়ে যান। কারণ শির্ক ইবাদত কবুল হওয়ার অন্তরায়!
  • সঙ্গে ক্যামেরা, ভিডিও ক্যামেরা সাথে না নেওয়া ভালো। কারণ, এতে আপনার ইবাদতের মনসংযোগ নষ্ট হবে।

নখ কাটার মেশিন, সুই-সুতা, কেঁচি, চাকু ইত্যাদি সব সময় মেইন বড় লাগেজে রাখবেন।

হজের ক্ষেত্রে ভুলত্রুটি ও বিদ‘আত ›

  • দীর্ঘ ১৪০০ বছর সময় ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের দেশগুলোতে হজের রীতি-নীতি মৌখিক ও লিখিত আকারে পৌঁছেছে। দুঃখের বিষয় হলো এ দীর্ঘ্য সময়ের ব্যাবধানে কিছু লোক অথবা দল হজের কিছু রীতি-নীতির মূল ধারা থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং এটা হওয়া স্বাভাবিকভাবে অনিবার্য ছিল।
  • কিছু লোক অথবা দল হজের কিছু রীতি-নীতি ভুলভাবে বুঝেছে এবং তারা তাদের সেই বোধ থেকেই হজের রীতিনীতি পালন করছে। আবার অনেকে হজের পদ্ধতিতে নতুন রীতি ও বিভিন্ন দো‘আ যোগ করেছে। সাধারণভাবে দেখলে এসব রীতি সঠিকই মনে হবে, এর কোনো ত্রুটিই খুজে পাবেন না। মনে হবে এসব রীতি পালন করাও ভালো।
  • কিন্তু কথা হলো কেন এসব ভ্রান্ত রীতি বা অতিরিক্ত রীতি পালন করবেন?  রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজে যা যা করেছেন তার থেকে বেশি করে আপনি কি বেশি আমল অর্জন করতে পারবেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে করেছেন এবং করার জন্য উপদেশ দিয়েছেন সে সম্পর্কে আপনি যতটুক শুদ্ধ ভাবে জানতে পারেন বা আপনার জ্ঞান অনুসারে আমল করাই কি ভালো নয়? আপনি কি জানেন, ইবাদতে বা আমলে নতুন রীতি তৈরি অথবা নতুন কিছু যোগ করার ফলে আপনার ইবাদতই বাতিল হয়ে যেতে পারে; কেননা তা বিদ‘আত!
  • এখন প্রশ্ন আসতে পারে; রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হজের নিয়ম-কানুন আমি কোথায় পাবো বা কীভাবে জানবো? উত্তর সহজ: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী-এর হজ অধ্যায়ের হাদীস পড়ুন। যদি সব হাদীস পড়ার মতো যথেষ্ট সময় না পান বা সকল হাদীস বই না থাকে তাহলে নির্ভরযোগ্য সুপরিচিত আলেমদের দলীল ভিত্তিক লেখা বই পড়ুন। কয়েকটি বই পড়ে যাচাই করুন। হজের শুদ্ধ রীতি-নীতির সবকিছুই বিভিন্ন বই থেকে পেয়ে যাবেন।
  • রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, ‘‘তোমরা হজের নিয়ম-কানুন শিখে নাও আমার কাছ থেকে”।
  • রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, ‘‘আমি তোমাদের যা কিছু করতে বলেছি সেই সব ব্যতীত আর কোনো কিছুই তোমাদের জান্নাতের নিকটবর্তী করবে না এবং যে সকল বিষয় সতর্ক করেছি সেগুলো ব্যতীত কোনো কিছুই তোমাদের জাহান্নামের নিকটবর্তী করবে না”।
  • রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন, ‘‘যে দীনের মধ্যে এমন কাজ করবে যার প্রতি আমার নির্দেশনা নেই তা প্রত্যাখ্যাত (বাতিল)”।
  • হুযায়ফাহ ইবন আল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, ‘‘যেসব ইবাদাত (আমল) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ করেন নি, তা তোমরাও করো না”।
  • ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, ‘‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ মেনে চলো ও নতুন কিছু সৃষ্টি করো না, রাসূলের দেখানো এ পথ আঁকড়ে ধরাই তোমাদের জন্য যথেষ্ট’’।

আস-সুনানুল কাবরা লিল-বায়হাকী, হাদীস নং ৯৩০৯ মুসনাদে আস শাফে‘ঈ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৫৮৯; সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৬৯৭ সহীহ বুখারী

  • রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘প্রত্যেক নতুন সৃষ্টিই (বিদ‘আত) পথভ্রষ্টতা, এবং সকল পথভ্রষ্টতা আগুনে (জাহান্নামে) নিক্ষিপ্ত হবে”।
  • রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজ সম্পন্ন করার পর আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ وَأَتۡمَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ نِعۡمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَٰمَ دِينٗاۚ﴾ [المائ‍دة: ٣]  

‘‘আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে তোমাদের জন্য পূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের ওপর আমার নি‘আমতও পূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের জন্য দীন হিসেবে ইসলামকেই মনোনিত করলাম”। [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৩]

  • ইসলামের যেকোনো ইবাদতের নির্দেশিকা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। কারো এর কম বা বেশি করার কোনো অধিকার বা ক্ষমতা নেই। আমাদের শুধু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ করা দরকার।
  • এ বইয়ে হজের বিভিন্ন বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট বিবিধ ভুলত্রুটি ও বিদ‘আত বিষয়গুলো সংযোজন করেছি; কারণ এগুলো আলাদাভাবে উল্লেখ না করলে হজযাত্রীরা এগুলোকে সাধারণ রীতি-নীতি হিসেবে ধরে নিতে পারেন। এ ভুলত্রুটি ও বিদ‘আত বিষয়গুলো বিগত শতাব্দীর প্রথিতযশা হাদীস বিশারদ, আরব বিশ্বে অত্যন্ত সুপরিচিত নাম শাইখ মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দিন আলবানীর ‘আহায্যুকা সাহীহুন’ (আপনার হজ শুদ্ধ হচ্ছে কি?) ও Innovations of Hajj, Umrah & Visiting Madinah. বই থেকে সংগ্রহ করেছি।

তিরমিযী, হাদীস নং ২৬৭৬

হজ যাত্রার পূর্বে প্রচলিত ভুলত্রুটি ও বিদ‘আত ›

  • হজ যাত্রাকে উপলক্ষ্য করে যাত্রা শুরুর পূর্ব মুহূর্তে দুই রাকাত নফল সালাত পড়া এবং ১ম ও ২য় রাকাতে সূরা আল-কাফিরূন ও সূরা আল-ইখলাস নির্ধারিতভাবে তিলাওয়াত করাকে হজের নিয়ম মনে করা। তবে যে কোনো সফরে বের হওয়ার পূর্বে নফল সালাত পড়ে বের হওয়া সুন্নাত।
  • হজযাত্রার আগে মিলাদ দেওয়া, মিষ্টি বিতরণ করা এবং আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে কান্নাকাটি করা।
  • হজে যাওয়ার সময় আযান দেওয়া অথবা এ উপলক্ষে ইসলামী সঙ্গীত বাজানো।
  • কিছু সুফীদের মতো করে ‘একমাত্র আল্লাহকে সঙ্গী করে’ একাই হজযাত্রায় রওয়ানা হওয়া।
  • একজন পুরুষের কোনো মহিলা হজযাত্রীর সঙ্গে তার মাহরাম হওয়ার জন্য চুক্তিবদ্ধ হওয়া।
  • একজন মহিলা হজযাত্রী কোনো অনাত্মীয়কে ভাই হিসেবে পরিচয় দিয়ে তাকে মাহরাম করা।
  • নারীর ক্ষেত্রে কোনো একটি আস্থাভাজন মহিলা দলের সঙ্গে মাহরাম ছাড়াই হজে যাওয়া এবং একইভাবে এমন কোনো পুরুষের সঙ্গে গমন করা যিনি পুরো মহিলা দলের মাহরাম হিসেবে নিজেকে দাবি করেন।
  • এ কথা মানা যে, হজের পরিপূর্ণতা হচ্ছে নিজ এলাকার ভিতরেই ইহরাম বাঁধা।
  • হজ যাত্রার পূর্ব মুহূর্তে অথবা বিভিন্ন স্থানে পৌছানোর পর উচ্চস্বরে যিকির করা এবং উচ্চস্বরে আল্লাহু আকবার ধ্বনি তোলা।
  • এ কথা বিশ্বাস করা যে, পায়ে হেঁটে হজ করার সাওয়াব ৭০ হজ আর আরোহনে হজ করলে ৩০ হজের সাওয়াব।
  • প্রতি যাত্রা বিরতিতে দুই রাকাত সালাত আদায় করা এবং এ কথা বলা, (হে আল্লাহ তুমি আমার জন্য এ যাত্রা বিরতির স্থানকে তোমার আশির্বাদপুষ্ট কর এবং তুমিই উত্তম আশ্রয়দাতা।)

হজের উদ্দ্যেশে ঘর থেকে বের হওয়া ›

  • হজ ফ্লাইটের শিডিউল ও বিমানবন্দর থেকে দুরত্বের ওপর ভিত্তি করে আপনার হজ এজেন্সি আপনাকে ফ্লাইটের দিনই বিমানবন্দরে অথবা এর দুই/একদিন আগে ঢাকা হজ ক্যাম্পে নিয়ে যাবেন।
  • যেহেতু অধিকাংশ হজযাত্রী বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসেন, তাই তাদেরকে কেন্দ্র করে এখানে একটি দৃশ্যপট চিন্তা করি; ধরুন প্রথমে আপনি ঢাকা হজ ক্যাম্পে যাবেন।
  • চেক লিস্ট অনুযায়ী ব্যাগ গোছান; বড় আকারের একটি মেইন ব্যাগ করবেন (ওজন ৮-১০ কেজি) এবং ছোট আকারের একটি হাত ব্যাগ করবেন (ওজন ৫-৭ কেজি) এবং ছোট ব্যাগটিতে দরকারী কাগজপত্র (পাসপোর্ট, টিকেট, অনাপত্তিপত্র, ওষুধপত্র ইত্যাদি) নিবেন। আপনার ব্যাগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ  আরও ৩টি জিনিস নিতে ভুলবেন না তা হল; ধৈর্য, ত্যাগ ও ক্ষমা!
  • বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় শান্ত ও খুশি মনে আপনার পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নিন। ভালো হয় যদি আপনার পরিবারের দুই একজন সদস্য আপনাকে বিদায় জানানোর জন্য কিছু পথ এগিয়ে দিতে আসেন।
  • যাদের ছেড়ে হজের সফরে বের হচ্ছেন তাদেরকে উদ্দেশ্য বলতে পারেন:

أَسْتَوْدِعُكمُ اللهُ الَّذِيْ لَا تضِيْعُ وَدَائِعُهُ

“আসতাওদি‘উ কুমুল্লাহুল্লাযী লা তাদী‘উ ওয়াদা-য়ী‘উহু”।

অর্থাৎ “আমি তোমাদেরকে আল্লাহর হিফাযতে রেখে যাচ্ছি যার হিফাযতে থাকা কেউই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না”।

সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১০৯৬; ইবন মাজাহ

  • ঘর থেকে বের হওয়ার সময় আপনি নিম্নোক্ত দো‘আটি পাঠ করতে পারেন:

بسم الله توكلت على الله ولا حول ولا قوة إلا بالله

‘‘বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহি ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ”।

অর্থ “আল্লাহর নামে, সকল ভরসা তারই ওপর এবং আল্লাহর সাহায্য ব্যতীত ভালো করার বা মন্দকে প্রতিহত করার ক্ষমতা নেই”।

  • সিঁড়ি অথবা লিফটে করে উপরে ওঠার সময় বলুন ‘আল্লাহু আকবার’। নামার সময় বলুন ‘সুবহানাল্লাহ’। পরিবহনে ওঠার সময় বলুন ‘বিসমিল্লাহ’। আসনে বসার সময় বলুন ‘আলহামদুলিল্লাহ’।
  • রিক্সা, ট্যাক্সি, কার, বাস, ট্রেন ও বিমানে আরোহন করে আপনি নিম্মোক্ত যাত্রা পথের দো‘আটি পড়তে পারেন:

اَللهُ أَكْبر، اَللهُ أَكْبَر، أَللهُ أَكْبَر سُبۡحَٰنَ ٱلَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَٰذَا وَمَا كُنَّا لَهُۥ مُقۡرِنِينَ وإنا إلى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُوْنَ

“আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর, সুবহানাল্লাযি সাখ্খারালানা হাযা ওয়ামা কুন্না লাহু মুক্বরিনীন ওয়া ইন্না ইলা রাব্বিনা লামুনক্বালিবূন”।

অর্থ: “আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান। পবিত্র সত্তা তিনি, যিনি এ বাহনকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন। একে বশীভূত করতে আমরা সক্ষম ছিলাম না। আমরা অবশ্যই আমাদের পালনকর্তার দিকে ফিরে যাবো”।

আবু দাউদ, হাদীস নং ৫০৯৬; তিরমিযী, হাদীস নং ৩৪২৬ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৯৯৩ সূরা-আল যুখরূফ ৪৩:১৩-১৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৩৪২

  • নৌকা, লঞ্চ ও জাহাজে উঠে আপনি নিম্নোক্ত দো‘আ পাঠ করতে পারেন:

﴿بِسۡمِ ٱللَّهِ مَجۡرٜىٰهَا وَمُرۡسَىٰهَآۚ إِنَّ رَبِّي لَغَفُورٞ رَّحِيمٞ﴾ [هود: ٤١]

 উচ্ছারণ: বিসমিল্লাহি মাজরিহা ওয়া মুরছাহা ইন্না রাব্বিবলা গাফুরুর রাহীম।

অর্থ: আল্লাহর নামেই এ বাহন চলাচল করে এবং থামে। নিশ্চয় আমার প্রভু ক্ষমাশীল ও দয়ালু”। [সূরা হুদ, আয়াত: ৪১]

  • যারা দূর থেকে আসবেন তারা বাস অথবা ট্রেন স্টেশনে এসে আপনার হজ সঙ্গীদের সঙ্গে মিলিত হবেন। তাদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন। আপনার দলনেতা অথবা আমীরের নির্দেশনা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। অতঃপর আপনার ব্যাগপত্র নিয়ে পরিবহনে উঠুন এবং চূড়ান্তভাবে আপনার পরিচিতজনদের কাছ থেকে বিদায় নিন।
  • যখন তিনজন বা এর অধিক লোক কোনো দূরবর্তী স্থানে সফরের উদ্দেশ্যে বের হবে তখন তাদের মধ্য থেকে একজনকে আমীর নির্বাচন করে নেওয়া উত্তম। তাই আমীরের নির্দেশনা শুনুন ও দলের শৃংখলা বজায় রাখুন।
  • ভ্রমণ অবস্থায় আপনি রিলাক্স হয়ে বসুন। সম্ভব হলে হজ বিষয়ে বই পড়ুন বা মনে মনে দো‘আ ও যিকির করুন। মুসাফিরের দো‘আ আল্লাহ কবুল করেন।

সফরে আপনি ঘুমাতে অভ্যস্থ হলে আপনি ঘুমিয়ে যেতে পারেন। অথবা আপনি আপনার অন্য সঙ্গীদের সঙ্গে হজ সম্পর্কিত বিষয়ে আলোচনা করতে পারেন। তবে সময় কাটানোর জন্য অযথা গল্পে লিপ্ত না হওয়াই ভালো।

আবু দাউদ, হাদীস নং ২২৪১

  • মুসাফির অবস্থায় ভ্রমণে সালাত কসর করে আদায় করতে পারেন। কসর সালাত আদায় এর নিয়ম-কানুন ভালোভাবে জেনে নিন। যোহর ও আসরকে একত্রে কসর করে যোহর বা আসরের সময় এবং মাগরিব ও এশাকে একত্রে কসর করে মাগরিব বা এশার সময় জমা করেও আদায় করতে পারেন।
  • সফররত অবস্থায় জুমু‘আর সালাত-এর পরিবর্তে যোহর সালাত আদায় করতে পারেন। কিবলা কোন দিকে তা একটু চিন্তা-ভাবনা বা জিজ্ঞাসা করে নির্ণয় করে নিবেন, তবে নির্ণয় করা সম্ভব না হলে বা জটিলতার কারণে কোনো এক দিককে কিবলা নির্ধারণ করবেন।
  • যাত্রা পথে কোথাও অবতরণ করে এ দো‘আ পাঠ করা:

أَعُوْذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّةِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ

উচ্ছারণ: আউযু বিকালিমাতিল্লা-হিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খলাক্ব।

অর্থ: আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ বাক্য দ্বারা তাঁর সৃষ্টির অনিষ্ট থেকে আশ্রয় কামনা করছি।

সহীহ মুসলিম সূরা-বাকারা ২:২৩৯, আবু দাউদ, হাদীস নং ১২২৪-২৮ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭০৮

ঢাকা হজ ক্যাম্প ›

  • হজ ক্যাম্প দূর থেকে আগত হজযাত্রীদের আশ্রয়কেন্দ্র। এখানে দলে দলে হজযাত্রীরা এসে ১/২ দিন থাকেন এবং ফ্লাইটের শিডিউল অনুযায়ী হজ ক্যাম্প ছেড়ে চলে যান।
  • আপনার হজ এজেন্সি হজ ক্যাম্পে আপনার থাকার জন্য ছোট ছোট ডরমেটরি রুম এর ব্যবস্থা করতে পারেন ২য়/৩য় তলায়। হজ ক্যাম্পের নিচ তলা অফিসিয়াল কাজের জন্য ব্যবহৃত হয়।
  • এখানে আপনার হজ এজেন্সি, হজ ক্যাম্পের অফিস থেকে বিভিন্ন কাগজপত্র পরীক্ষা করবেন ও হজ ফ্লাইটের শিডিউল চেক করবেন। কেউ যদি মেনিনজাইটিস টিকা না নিয়ে থাকেন তবে এখান থেকে টিকা নিতে পারেন।
  • এখানে কিছু খাবার ক্যান্টিন ২৪ ঘন্টা খোলা থাকে। আপনি অথবা আপনার হজ এজেন্সি এখান থেকে খাবার এর ব্যবস্থা করতে পারেন। আপনি এখানে কিছু মানি এক্সচেঞ্জার পাবেন এবং চাইলে টাকা রিয়াল করে নিতে পারেন।
  • এখানে কিছু হজ প্রশিক্ষণে অংশ গ্রহণ করতে পারেন। এখানে মক্কা, মদীনা ও মিনার তাবুর মানচিত্র বিতরণ করা হয় যা সংরক্ষণ করে রাখতে পারেন।
  • হজ ক্যাম্পে থাকার সময় সতর্ক থাকুন কারণ এখান থেকে অনেক সময় টাকা ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী হারিয়ে অথবা চুরি হয়ে যায়।

মনে রাখবেন হজ ক্যাম্প একটি ধুমপান মুক্ত এলাকা, এখানে অপনার বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনরা আপনার সাথে দেখা করতে পারেন নিচ তলায়; তবে তাদের ২য়/৩য় তলায় ডরমেটরি রুম এ যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় না।

ফ্রি সৌদি মোবাইল সিমকার্ড (মোবিলি, জেইন) পাওয়া যায় এখানে অথবা আপনি মোবাইল সিমকার্ডও কিনতে পারেন।

বোর্ডিং পাস ও ইমিগ্রেশন ›

  • হজ যাত্রার প্রস্থান প্রক্রিয়ার কাজ (বড় ব্যাগ জমা করণ, বোর্ডিং পাস ও ইমিগ্রেশন) ঢাকা হজ ক্যাম্প থেকে শুরু হতে পারে আবার বিমান বন্দর থেকেও শুরু হতে পারে, এটা নির্ভর করে বিমান কর্তৃপক্ষ ও সরকার এর সিদ্ধান্তের উপর। সাধারণত বাংলাদেশ বিমান এর প্রস্থান প্রক্রিয়ার কাজ শুরু হয় ঢাকা হজ ক্যাম্প থেকে এবং সৌদি এয়ারলাইনস-এর কাজ শুরু হয় ঢাকা বিমানবন্দর থেকে।
  • আপনি যদি ঢাকা শহরের মধ্য থেকে সরাসরি আসেন তবে আপনার হজ এজেন্সির সাথে কথা বলে জেনে নিন আপনার ফ্লাইট কোন এয়ারলাইনসে এবং আপনাকে প্রথমে কোথায় রিপোর্ট করতে হবে – ঢাকা হজ ক্যাম্প নাকি বিমান বন্দর। এখানে আমরা ধরে নিয়েছি আপনি প্রথমে ঢাকা হজ ক্যাম্পে এসেছেন কারণ বেশিরভাগ হজযাত্রী হজ ক্যাম্প হয়ে বিমানে উঠেন।
  • যখন ফ্লাইটের সময় নিকটবর্তী হবে -সাধারণত ফ্লাইটের ৫/৬ ঘন্টা আগে হজ ক্যাম্পে ও বিমানবন্দরে বিমান শিডিউল এর ঘোষণা হবে তখন আপনি আপনার ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিয়ে যাত্রার জন্য প্রস্তুত হন।
  • আপনার হজ এজেন্সির পরিকল্পনা অনুসারে আপনি যদি প্রথমে মক্কায় যান তাহলে আপনার বাড়ি থেকে অথবা হজ ক্যাম্প অথবা বিমানবন্দর থেকেই শুধু ইহরামের কাপড় পরে নিবেন কিন্তু নিয়ত বাকি রাখবেন। তবে ইহরামের কাপড় আপনি বিমানের ভেতরেও পরতে পারবেন। পৃষ্ঠা নং …. থেকে আপনি ইহরামের তাৎপর্য ও বিধি-বিধান বিস্তারিত জানতে পারবেন।
  • আপনি যদি প্রথমে মদীনায় যান তাহলে ইহরামের কাপড় পরিধান করার দরকার নেই। সাধারণ কাপড় পরিধান করে যাবেন। যেহেতু বাংলাদেশ থেকে বেশিরভাগ হজযাত্রী প্রথমে মক্কা যান ও উমরাহ পালন করেন তাই এখানে ধরে নিচ্ছি আপনি প্রথমে মক্কায় যাচ্ছেন।
  • বিমানে ইহরামের কাপড় পরা দৃষ্টিকটু ও কঠিন কাজ। তাই বিমানে আরোহণের পূর্বেই ইহরামের যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে নিবেন মানে ইহরামের কাপড় পড়ে নিবেন। শুধুমাত্র নিয়তটা বাকি রাখবেন। ইহরাম করবেন বা নিয়ত করবেন যখন আপনি মিকাত এর কাছাকাছি পৌছাবেন। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মীকাতের কাছাকাছি পৌছানোর পূর্বে ইহরামের নিয়ত করেন নি।
  • হজ ক্যাম্পে অথবা বিমানবন্দরে আপনার দলনেতা বা আমীরের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রথমে লাইন ধরে বিমান টিকেট হাতে নিয়ে কাষ্টমস ও ইমিগ্রেশন অফিসে গিয়ে ব্যাগ জমাকরণ কাউন্টারে আপনার বড় ব্যাগটি জমা দিয়ে দিন। এখানে আপনার বিমান টিকেট চেক করা হবে এবং আপনার লাগেজে স্টিকার লাগিয়ে বিমানের কার্গোতে জমা করা হবে। এখানে আপনাকে বোর্ডিং পাস দেওয়া হবে। যত্নসহকারে বোর্ডিং পাসটি সংরক্ষণ করুন।
  • এরপর ইমিগ্রেশন অফিসের দিকে অগ্রসর হউন এবং লাইনে দাঁড়ান। ইমিগ্রেশন অফিসার আপনার পাসপোর্ট চেক করবেন এবং সিল দিবেন, তিনি আপনাকে কিছু প্রশ্ন করতে পারেন, আপনার অফিস অনাপত্তিপত্র (NOC) দেখতে পারেন। ইমিগ্রেশন-এর কাজ শেষ হলে হজযাত্রী অপেক্ষা কক্ষে গিয়ে বসুন। মনে মনে দো‘আ ও যিকির করুন। এরপর হজ ক্যাম্পে হজযাত্রী পরিবহন বাস এসে হাজীদের বিমানবন্দর নিয়ে যাবে।

ঢাকা বিমানবন্দর ›

  • বিমানবন্দরের নির্দিষ্ট একটি কাউন্টারে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আপনার বোর্ডিং পাস দেখিয়ে আপনার ছোট ব্যাগপত্র চেক করিয়ে অপেক্ষার জন্য নির্দিষ্ট অপেক্ষা কক্ষে গিয়ে বসুন।
  • বিমানবন্দরে হাজীদের জন্য আপ্যায়ন হিসাবে কখনো কখনো বিভিন্ন মহল থেকে খাবার ও পানীয় দেওয়া হয়। এগুলো রাখতে পারেন।
  • হজের যাত্রায় আপনার সঙ্গে অবশ্যই ছোট হাত ব্যাগ/সৈনিক ব্যাগ/কোমরের ব্যাগ নেবেন। এ ব্যাগে টাকা, পাসপোর্ট, টিকেট, ওষুধ ও চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র রাখবেন।
  • ফ্লাইটের সময় নিকটবর্তী হলে আবার শৃংখলাবদ্ধ হয়ে লাইনে দাঁড়াবেন এবং লাইন ধরেই বিমানে উঠে পড়বেন। একটি সর্তকতা; সবসময় দলবদ্ধ হয়ে সকল জায়গায় যাবেন এবং সকল কাজ করবেন। কখনই দলছাড়া হবেন না, দলছাড়া হলে আপনি হারিয়ে যেতে পারেন ও সমস্যায় পড়তে পারেন।

বিমানের ভেতরে ›

  • বিমানে উঠে আপনার নির্দিষ্ট আসন অথবা যদি ফ্রি সিটিং বলা হয় তখন যে কোনো আসনে আসন গ্রহণ করুন। আপনার মাথার উপরের বক্সে আপনার ছোট হাত ব্যাগটি রাখুন।
  • বিমানে উাঠার পর আপনার পরিচিতজনদের ফোন করে আপনার অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করুন ও এরপর মোবাইল ফোনটি বন্ধ করে রাখুন অথবা উড্ডয়নের আগে এয়ারপ্লেন মোড দিয়ে রাখুন। আপনার সিটটি সোজা করে রাখুন এবং সিট বেল্ট বেঁধে নিন। এখন যাত্রা পথের দো‘আটি পড়তে পারেন।
  • বিমানের ক্রুদের ঘোষিত নির্দেশনা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। বিমান ক্রু যখন যাত্রী সংখ্যা গণনা করবেন তখন আপনি সিটে বসে থাকুন।
  • সাধারণত হজ ফ্লাইটে ২তলা বিশিষ্ট বোয়িং ৭৪৭/৭৭৭ বিমান ব্যবহৃত হয়। এক একটি বিমান ৪৫০-৫৫০ জন যাত্রী বহন করতে পারে।
  • বিমান উড্ডয়নের পর সিট বেল্ট খুলে সিটটি পিছনের দিকে হেলে দিয়ে আরাম করে বসুন অথবা ঘুমিয়ে যান। মনে মনে দো‘আ ও যিকির করুন।
  • বিমান সাধারণত ৬০০ মাইল/ঘন্টা বেগে ভূপৃষ্ঠ হতে ৩০,০০০ ফুট উপর দিয়ে উড়ে যাবে। সৌদি আরবের জেদ্দা বিমানবন্দর পৌছাতে সময় লাগে সাধারণত ৫-৬ ঘন্টা।
  • বিমানের ১বার লাঞ্চ/ডিনার ও ১বার হালকা খাবার পরিবেশন করা হবে।
  • বিমানের ওয়াশরুমে বিমানে পানি খুবই সীমিত তাই পানি বেশি খরচ করবেন না। ওয়াশরুমে অযু করবেন না এবং কমোডের ভিতরে টিস্যু ফেলবেন না।
  • সালাতের জন্য বিমানে তায়াম্মুম করবেন। এজন্য মাটির ইট দেওয়া হবে।
  • বিমান কোনো মীকাতের কাছাকাছি চলে এলে বিমান ক্রুরা আগেভাগেই জানিয়ে দেবেন। যারা প্রথমে মক্কায় যাবেন, তারা তখন মীকাত থেকে ইহরাম করবেন বা উমরাহর নিয়ত করবেন। এরপরই উমরাহ অধ্যায় থেকে আপনি ইহরাম ও উমরাহ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পারবেন।
  • জেদ্দা বিমানবন্দরে বিমান অবতরণের পর আপনি ছোট হাত ব্যাগ নিয়ে নিচে নেমে যাত্রীদের ওয়েটিং লাউঞ্জে/অপেক্ষা কক্ষে গিয়ে বসুন।

মদীনাতেও বিমানবন্দর আছে। আপনার হজ এজেন্সি যদি প্রথমে মদীনা যাওয়ার পরিকল্পনা করে থাকেন তবে হজ ফ্লাইটের শিডিউল মদীনা বিমানবন্দরেও নিতে পারেন তবে মদীনা যাওয়া সহজ হয়।

উমরাহ

উমরাহ-এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য

  • উমরাহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদাত; যার অর্থ কোনো স্থানের যিয়ারত করা।
  • ইসলামী শরী‘আতের পরিভাষায় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য বছরের যে কোনো সময় মসজিদুল হারামে গমন করে নির্দিষ্ট কিছু কর্মকাণ্ড সম্পাদন করাকে উমরাহ বলা হয়।
  • আবু হুরায়রাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘উমরাহ; এক উমরাহ থেকে পরবর্তী উমরাহর মধ্যবর্তী সময়ে যা কিছু পাপ (সগীরা) কাজ ঘটবে তার জন্য কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত করে)’’।
  • আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘নিশ্চয় রমযান মাসের উমরাহ একটি হজের সমান’’।
  • রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘রমযান মাসে উমরাহ পালন করা -আমার সাথে হজ করার ন্যায়’’। 
  • রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবনদশায় ৪ বার উমরাহ করেছেন।

মসজিদুল হারামে প্রবেশ করা থেকে শুরু করে তাওয়াফ, সা‘ঈ ও হালাল হয়ে উমরাহ সম্পন্ন করতে ২-৩ ঘন্টা সময় লাগে মাত্র।

সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৬৫০ মিশকাত, হাদীস নং ২৫০৯ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৮৬৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫৬ ও ৩০৩৯ মিশকাত, হাদীস নং ২৫১৮

উমরাহর ফরয, ওয়াজিব ও সুন্নাত ›

ফরযওয়াজিবসুন্ন্ত
ইহরাম করামীকাত থেকে ইহরাম করাউল্লেখযোগ্য সুন্নাতগুলো হল:
তাওয়াফ করাকসর/হলক্ব করাহাজারে আসওয়াদ চুম্বন করা
সাঈ করা পুরুষদের ওপর সুন্নাত হচ্ছে এ তাওয়াফের প্রথম তিন চক্করে ‘রমল’ করা
  পুরুষদের জন্য সুন্নাত হচ্ছে এ তাওয়াফের সব কয়টি চক্করে ইদতেবা করা
  ইয়েমেনী কোণ স্পর্শ করা
 * তাওয়াফের পর দু’রাকাত সালাত

ইহরামের মীকাত ›

  • মীকাত হলো সীমা। হজ ও উমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা গমনকারীদের কা‘বা ঘর হতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ দূরত্ব থেকে ইহরাম করতে হয়, ঐ জায়গাগুলোকে মীকাত বলা হয়।
  • মীকাত দুই ধরনের (১) মীকাতে যামানী (সময়ের মীকাত) (২) মীকাতে মাকানী (স্থানের মীকাত)।
  • হজের মীকাতের সময় হলো ৩টি মাস; শাওয়াল, জিলক্বদ ও যিলহজ মাস। তবে কিছু আলেমের মতে এটি ১০ যিলহজ পর্যন্ত। উমরাহর মীকাতের সময় হলো বছরের যে কোনো সময়।
  • মীকাতের জন্য ৫টি নির্ধারিত স্থান রয়েছে:
মীকাতের নামঅন্য নামমক্কা থেকে দূরত্বযাদের জন্য
যুল হুলায়ফাআবিয়ারে আলী৪২০ কিমিমদীনাবাসী ও যারা এ পথ দিয়ে যাবেন।
আল জুহফাহরাবিগ১৮৬ কি.মি.সিরিয়া, লেবানন, জর্দান, ফিলিস্তিন, মিশর, সুদান, মরক্কো ও সমগ্র আফ্রিকা।
ইয়ালামলামআস-সা‘দিয়া১২০ কি.মিযারা নৌপথে ইয়েমেন, ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, চীন, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, ইন্দোনেশিয়া থেকে আসবেন।
কারনুল মানাযিলসাইলুল কাবির৭৮ কি.মি.কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, ওমান, ইরাক ও ইরান। আর যারা বাংলাদেশ থেকে আকাশ পথে জিদ্দা যাবেন তাদের জন্যও এটি মীক্কাত।
যাতু ইরক১০০ কি.মিইরাক (আজকাল পরিত্যাক্ত)

সূরা আল-বাকারা ২:১৯৭ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৪২৯; সহীহ মুসলিম (২/৮৪১)

  • বাংলাদেশ থেকে যারা বিমান যোগে জেদ্দা বিমানবন্দরে অবতরণ করবেন তাদের মীকাত হলো ‘কারনুল মানাযিল’ (সাইলুল কাবীর)। আর নৌপথ যোগে যারা জাহাজে ভ্রমণ করবেন তাদের মীকাত হবে ‘ইয়ালামলাম’। তবে আজকাল নৌপথ বেশি ব্যবহৃত হয় না।

যারা মীকাতের সীমানার অভ্যন্তরে বসবাস করেন তাদের অবস্থানের জায়গাটাই হল তাদের মীকাত। অর্থাৎ যে যেখানে আছেন সেখান থেকেই হজের ইহরাম করবেন। তবে মক্কার হারাম এলাকার ভেতরে বসবাসকারী ব্যক্তি যদি উমরাহ করতে চান তা হলে তাকে হারাম এলাকার বাইরে গিয়ে যেমন তান‘ঈম তথা আয়েশা মসজিদ বা অনুরূপ কোনো হালাল এলাকায় গিয়ে ইহরাম করবেন।

ইহরামের তাৎপর্য

  • ইহরাম শব্দের আভিধানিক অর্থ- হারাম করা, সীমাবদ্ধ বা অনুমতিহীন। ইহরামের মাধ্যমে উমরাহ/হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।
  • হজ ও উমরাহ পালন করার সময় ইহরাম করা বাধ্যতামূলক। ইহরাম করা অবস্থায় নির্দিষ্ট কিছু কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হয়ে যায়।
  • ইহরাম অবস্থায় সকল পুরুষ একই রকমের পোশাক পরিধান করেন, যাতে করে ধনী-গরীবে কোনো ভেদাভেদ না থাকে। ইহরাম শ্রেণি, জাতি ও সংস্কৃতির পার্থক্য দূর করে দেয়।
  • ইহরামের কাপড় সিল্ক অথবা যে পশুর গোশত হারাম তার পশম দিয়ে তৈরি করা না হয় এবং কাপড় এতটা স্বচ্ছ হবে না যাতে শরীরের ভেতরের অংশ দেখা যায়।
  • পুরুষের জন্য ইহরামের পোশাক; সেলাইবিহীন দুই খণ্ড কাপড় (সাদা রং অগ্রাধিকার)। যে কাপড় দিয়ে শরীরের উপরের অংশ আবৃত করা হয় তাকে বলে ‘রিদা’, আর যে কাপড় দিয়ে শরীরের নিচের অংশ আবৃত করা হয় তাকে ‘ইযার’ বলে।
  • মহিলারা তাদের স্বাভাবিক পোশাকের মতো সেলাইযুক্ত হালকা যে কোনো রংয়ের পছন্দনীয় পোশাক পরিধান করবেন (তা হবে শালিন, পরিস্কার, সুগন্ধিমুক্ত এবং খুব টকটকে রংচংয়ে ও আকর্ষণীয় হবে না)। সাথে সাথে ইসলামী শরী‘আহ অনুসারে অবশ্যই যথাযথ পর্দা পরতে হবে।
  • আপনি যদি বাংলাদেশ থেকে প্রথমেই মক্কায় যান এবং উমরাহ পালন করেন তাহলে আপনি ‘কারনুল মানাযিল’ মীকাত থেকে ইহরাম করবেন। আর আপনি যদি প্রথমে মদীনা যান এবং মদীনা থেকে মক্কায় যান তাহলে সেক্ষেত্রে আপনি ‘যুল হুলায়ফা’ মীকাত থেকে ইহরাম করবেন।

ইহরামের পদ্ধতি ›

  • ইহরামের কাপড় পরিধানের আগে সাধারণ পরিচ্ছন্নতার কাজ সেরে নিন – নখ কাটা, লজ্জাস্থানের চুল পরিস্কার, গোঁফ ছোট করা। তবে দাঁড়ি ও চুল কাটবেন না। পরিচ্ছন্নতার এ কাজগুলো করা মুস্তাহাব।
  • এরপর গোসল করুন, আর যদি গোসল করা সম্ভব না হয় তাহলে অযু করুন। ঋতুবর্তী মহিলারা গোসল করে সাধারণ কাপড় পরে নিবেন এবং উমরাহ/হজ এর সকল বিধি-বিধান পালন করবেন, তবে ঋতু শেষ না হওয়া পর্যন্ত মসজিদে হারামে প্রবেশ করবেন না, তাওয়াফও করবেন না এবং সালাতও আদায় করবেন না।

ঋতু শেষ হলে তাওয়াফ করে নিবেন ও সালাত আদায় করবেন।

  • পুরুষরা ইহরামের কাপড় পড়ার আগে চুলে তেল বা ‘তালবিদ’ দিতে পারেন এবং শরীরে, মাথায় ও দাঁড়িতে সুগন্ধী ব্যবহার করতে পারেন; তবে ইহরাম বাঁধার পর পারবেন না। সুগন্ধী যেন আবার ইহরামের কাপড়ে না লাগে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। লেগে গেলে তা ধুয়ে ফেলবেন। মহিলারা কখনই কোনো অবস্থাতেই সুগন্ধি ব্যবহার করবেন না। মহিলাদের সুগন্ধি ব্যবহার করা হারাম।

সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৪৬৪ সহীহ বুখারী, হাদসি নং ১৬৩৫

  • পুরুষরা ইহরামের কাপড় সুবিধা মতো উপায়ে পরতে পারেন তবে এমনভাবে পরবেন যাতে নাভির উপর থেকে হাটুর নিচ পর্যন্ত আবৃত হয়ে যায় এবং ইহরামের কাপড় দিয়ে কাঁধ ও শরীর আবৃত থাকে।
  • মহিলারা মুখমণ্ডল এবং হাতের কব্জি খোলা রাখবেন, নেকাব বা বোরকা দ্বারা মুখমণ্ডল সবসময় ঢাকা রাখা যাবে না। তবে গায়ের মাহরাম পুরুষদের সামনে বা মাঝে গেলে তখন মুখমণ্ডল আবৃত করবেন।
  • উত্তম হলো, কোনো ফরয সালাতের পূর্বে ইহরামের কাপড় পরা ও সালাত আদায় করা। আর ফরয সালাতের সময় না হলে তাহিয়্যাতুল ওযুর ২ রাকাত সালাত পড়া। সালাতের পর ইহরামের নিয়ত না করে বিমানে উঠবেন। যেহেতু নিয়ত করেন নি তাই তালবিয়াহ পাঠ থেকে বিরত থাকুন।
  • যে কোনো ফরয সালাতের পর ইহরাম করা মুস্তাহাব। যদি কোনো ফরয সালাতের পর ইহরাম করা হয়, তাহলে স্বতন্ত্র সালাতের প্রয়োজন নেই। অন্য সময় ইহরাম বাঁধলে ২ রাকাত সালাত আদায় করে নিবেন। এ দু’রাকাত সালাত কি ইহরামের সালাত না তাহিয়াতুল অযুর -এ ব্যাপারে আলেমদের মাঝে মতভেদ আছে। তবে বিশুদ্ধতম ও গ্রহণযোগ্য মত হলো, এটি তাহিয়্যাতুল অযু হিসাবে আদায় করা হবে। ইহরামের জন্য আলাদা কোনো সালাত নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফরয সালাত আদায়ের পর ইহরামের নিয়ত করেছিলেন।
  • মীকাতের কাছাকাছি যখন পৌঁছাবেন তখন ইহরাম করার জন্য প্রস্তুতি নিবেন। পুরুষরা শরীরে তৃতীয় কোনো কাপড় থাকলে তা খুলে রাখবেন, মাথা থেকে টুপি সরিয়ে ফেলবেন। তবে শীত নিবারনের জন্য গায়ে চাদর বা কম্বল ব্যাবহার করতে পারেন।
  • মীকাতের স্থান থেকেই উমরাহর নিয়ত করবেন অর্থাৎ ইহরাম করবেন; এমনটি করা ওয়াজিব। মীকাতের কাছাকাছি পৌঁছলে বিমানের পাইলট ঘোষণা দিয়ে জানিয়ে দেবেন। জলদি ইহরাম বাঁধুন কারণ বিমান খুব দ্রুত মীকাত অতিক্রম করে চলে যাবে। অনেকে জেদ্দা বিমানবন্দরে পৌঁছালে নিয়ত করেন ও তালবিয়াহ পাঠ করেন, এমন কাজ করার কোনো নিয়ম নেই।

আপনি যখন মীকাতে কাছাকাছি পৌঁছাবেন কেবল তখনই শুধুমাত্র উমরাহর নিয়ত (হজ এর নয়, যেহেতু আপনি তামাত্তু হজ পালনকারী) করবেন, এমনকি ঋতুবর্তী মহিলারাও মীকাত থেকে উমরাহর নিয়ত করবেন। আপনি মনে মনে বলুন:  لَبَّيْكَ عُمْرَةً “লাব্বাইকা উমরাহ’’  অর্থাৎ আমি উমরাহ করার জন্য হাযির’’। অথবা বলুন, اللهم لَبَّيْكَ عُمْرَةً “আল্লাহুম্মা লাব্বাইকা উমরাহ’’। অর্থাৎ হে আল্লাহ আমি উমরাহ করার জন্য হাযির।”

  • এবার স্বশব্দে তাওহীদ সম্বলিত তালবিয়াহ পাঠ শুরু করুন এবং মসজিদে হারামে তাওয়াফ শুরুর আগ পর্যন্ত এ তালবিয়াহ পাঠ চলতে থাকবে।

لَبَّيْكَ اَللهم لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيْكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لَا شَرِيْكَ لَكَ

‘‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বায়িক, ইন্নাল হামদা ওয়ান্নি‘মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক’’।

‘‘আমি হাযির, হে আল্লাহ! আমি হাযির। আমি হাযির, তোমার কোনো শরীক নেই, আমি হাযির। নিশ্চয় সকল প্রশংসা ও নি‘আমত তোমারই এবং রাজত্বও তোমারই, তোমার কোনো শরীক নেই’’।

সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৪৬০, ৫৯১৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৮৪

  • উমরাহ সম্পন্ন করতে না পারার ভয় থাকলে (যদি কোনো প্রতিবন্ধকতা, বাধা অথবা অসুস্থতার কারণে না পারেন) তবে এ দো‘আ পাঠ করবেন:

فَإِنْ حَبَسَنِيْ حَابِسٌ فَمَحِلِّيْ حَيْثُ حَبَسْتَنِيْ

‘‘ফা ইন হাবাসানী হা-বিসুন, ফা মাহিল্লী হায়ছু হাবাসতানি’’।

‘‘যদি কোনো প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হই, তাহলে যেখানে তুমি আমাকে বাধা দিবে, সেখানেই আমার হালাল হওয়ার স্থান হবে’’।

  • তালবিয়াহ একটু উচু স্বরেই পাঠ করা উত্তম। তবে তালবিয়াহ খুব উচ্চস্বরে অথবা সমস্বরে পাঠ করবেন না যা অন্যদের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর মহিলারা তালবিয়াহ পাঠ করবেন নিচু স্বরে অথবা মনে মনে। এখন আপনার ইহরাম করা হয়ে গেছে; এ ইহরাম করার কাজটি ছিল ফরয।
  • তালবিয়াহর মাধ্যমে তাওহীদ চর্চা দৃশ্যমান। একে হজের স্লোগান বলা হয়। তালবিয়াহ বেশি বেশি পড়া মুস্তাহাব। দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে, অযু, বে-অযু; সর্বাবস্থায় তালবিয়াহ পড়া যায়।
  • কেউ যদি মীকাত অতিক্রম করে ফেলেন কিন্তু ইহরাম করতে বা উমরাহর নিয়ত করতে ব্যর্থ হন তাহলে আবার উক্ত মীকাতের স্থানে ফিরে গিয়ে ইহরাম করতে হবে। যদি এটা করা সম্ভব না হয় তবে মীকাতের কথা মনে হওয়ার সাথে সাথেই ইহরাম করতে হবে। এমতাবস্থায় এ নিয়ম লঙ্ঘনের জন্য হারাম এলাকার মধ্যে কাফ্ফারা স্বরূপ একটা দম (পশু যবেহ) অবশ্যই করতে হবে। এ পশুর গোশত সম্পূর্ণ মিসকিন ও গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দিতে হবে। এ গোশত থেকে কোনো অংশ নিজে গ্রহণ করতে পারবে না।

মিশকাত, হাদীস নং ২৭১১ ইবন খুযাইমাহ. হাদীস নং ২৬২৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২১৯০

  • অনেকে ইহরাম না করে মীকাত অতিক্রম করে ফেললে আয়েশা মসজিদে গিয়ে উমরাহর নিয়ত করেন ও ইহরাম বাঁধেন – যার কোনো ভিত্তি নেই।

ইহরাম ও তালবিয়ার ক্ষেত্রে প্রচলিত ভুলত্রুটি ও বিদ‘আত ›

  • উমরাহ বা হজের নিয়ত থাকা পরও ইহরাম না বেঁধে মীকাত অতিক্রম করা।
  • মীকাতের আগেই ইহরাম করা ও উচ্চস্বরে হজ বা উমরাহর নিয়ত করা।
  • এ কথা মানা, কথা না বলে মৌনতার সাথে হজ-উমরাহ পালন করা উত্তম।
  • যাত্রা শুরুর সময় বিমানবন্দরে পৌঁছেই ইহরাম করার আগেই তালবিয়াহ পাঠ শুরু করা, অথবা দল বেঁধে সমবেত কণ্ঠে তালবিয়াহ পাঠ করা।
  • কোনো এক নির্দিষ্ট নিয়মে ইহরামের কাপড় পরতে হবে এ কথা মান্য করা।
  • ইহরামের কাপড় ডান বগলের নিচ দিয়ে এবং বাম কাঁধের উপর দিয়ে পরা। বস্তুত এটা কেবল প্রথম তাওয়াফের সুন্নাত। অন্য সময় কাঁধ ঢেকে রাখতে হবে।
  • ইহরাম অবস্থায় তালবিয়ার স্থলে উচ্চস্বরে সমবেত কণ্ঠে তাকবীর পাঠ করা।
  • তালবিয়ার আগে বা পরে ‘আলহামদুল্লিাহ ইন্নি উরিদুল…’ দো‘আ পাঠ করা।
  • ইহরাম বেঁধে আয়েশা/তান‘ঈম মসজিদে সালাত আদায় করতে যাওয়া।
  • কিছু বইয়ের নির্দেশনা অনুসারে নির্দিষ্ট কিছু শর্তে বিশেষ ধরনের জুতা পরা।
  • ইহরাম ছাড়া মীকাতে ঢুকে আয়েশা মসজিদে গিয়ে উমরাহর নিয়ত করা।
  • ইহরামের কাপড় পরে এ কথা মানা যে সুরা-কাফিরুন ও সুরা-ইখলাস দিয়ে ইহরামের দুই রাকাত সালাত আদায় করতে হবে।
  • মীকাত এলাকায় ভেতরে প্রবেশের পর মীকাত সীমানার বাইরে যাওয়া। যাওয়ার পর সেখান থেকে ইহরাম না করে ফিরে আসা।
  • জেদ্দা বিমানবন্দরে প্রবেশের ও অবতরনের তথাকথিত দো‘আ পাঠ করা।

ইহরাম অবস্থায় অনুমোদিত কার্যাবলী ›

  • হাতঘড়ি, চশমা, হেডফোন, বেল্ট, মানিব্যাগ, শ্রবণযন্ত্র  ব্যবহার করা যাবে। মহিলারা আংটি ও গলায় চেইন পরতে পারবেন।
  • ছাতা, বাস ও গাড়িসহ তাবু, সিলিংয়ের ছায়ায় আশ্রয় নেওয়া যাবে। 
  • লাগেজ, ম্যাট্রেস ইত্যাদি মাথায় বহন করা।
  • জখম/ আহত স্থানে ব্যান্ডেজ পরা যাবে।
  • চশমা, ঘড়ি, টাকা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বহন করার জন্য সেলাইযুক্ত ছোট ব্যাগ ব্যবহার করা যাবে।
  • পরিষ্কার পরিচছন্নতার জন্য পরিধানের ইহরাম কাপড় পরিবর্তন করা যাবে। ইহরামের কাপড় ধৌত করা যাবে।
  • গোসল করা যাবে। অনিচ্ছাকৃত ও অপ্রত্যাশিত ভাবে শরীরের কোনো চুল/লোম উঠে যাওয়া।
  • গৃহপালিত পশু জবাই করা যাবে, মাছ ধরা যাবে।
  • মানুষের জন্য ক্ষতিকর কোনো প্রাণী কর্তৃক আক্রান্ত হলে তা

তাড়িয়ে দেওয়া বা আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনে হত্যা করা; যেমন-

বন্য কুকুর, ইঁদুর, কাক, সাপ, বিচ্ছু, চিল, মশা, মৌমাছি ও পিঁপড়া ইত্যাদি।

  • আত্মরক্ষার জন্য চোর/ডাকাতকে আঘাত করা।
  • ঠান্ডা থেকে বাঁচার জন্য শরীর আবৃত করার জন্য কম্বল, মাফলার ব্যবহার করা যাবে।

নাসাঈ, হাদীস নং ২৮৩৫; তিরমিযী, হাদীস নং ৮৩৮

ইহরামের পর যেসব বিষয় নিষিদ্ধ ›

  • চুল, নখ ও দাঁড়ি কাটা। (তবে মাথায় চিরুনি করার সময় যদি কোনো চুল অনিচ্ছাকৃতভাবে পড়ে যায় বা উঠে যায় কিংবা অসুস্থতা ও উকুনের কারণে  যদি চুল ফেল দিতে হয় অথবা ভুলক্রমে কেউ যদি নক বা চুল কাটে, তাহলে সেটা ক্ষমাযোগ্য)
  • দেহে, কাপড়ে, খাবার ও পানিতে সুগন্ধি ব্যবহার করা। সুগন্ধিযুক্ত সাবান, শ্যাম্পু ও পাউডার ব্যবহার করা। (ইহরাম করার আগের কোনো সুগন্ধি যদি দেহে থাকে তবে তাতে কোনো দোষ নেই, তবে কাপড়ের সুগন্ধি ধুয়ে ফেলতে হবে।)
  • হারাম এলাকার মধ্যে কোনো গাছ কাটা, পাতা ছেড়া বা উপড়ে ফেলা। এটাও হজে আসা সকল মুসলিমের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, সে ইহরাম অবস্থায় থাক বা না থাক।
  • হারামের সীমানার মধ্যে কোনো ধরনের স্থলচর প্রাণী শিকার করা বা বন্দুক তাক করা অথবা ধাওয়া করার মাধ্যমে শিকারে সহযোগিতা করা। এটা হজে আসা সকল মুসলিমের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, সে ইহরাম অবস্থায় থাক বা না থাক।
  • অন্যের খোঁয়া যাওয়া কোনো জিনিস বা পরিত্যাক্ত কোনো বস্তু কুড়িয়ে নেওয়া। তবে মূল মালিক জানা থাকলে তার কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে তুলে নেওয়া যাবে। এটাও ইহরাম ও ইহরাম ছাড়া উভয় অবস্থার জন্যই প্রযোজ্য।

সহীহ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪/৩৮৭,৩৮৮ সূরা আল-মায়েদা ৫:৯৬, ৯৭

  • কোনো অস্ত্র বহন করা বা অন্য কোনো মুসলিমের সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হওয়া, সংঘর্ষে জড়িয়ে যাওয়া অথবা খারাপ ভাষায় গালিগালাজ করা।
  • বিয়ে করা বা বিয়ের প্রস্তাব পাঠানো বা অন্য কারো জন্য বিয়ের আয়োজন করা, যৌন সঙ্গম, হস্তমৈথুন, স্ত্রীকে উত্তেজনার সাথে আলিঙ্গন বা চুমু খাওয়া বা স্পর্শ করা বা মহিলাদের প্রতি এমন কোনো ইঙ্গিত করা যা আকাঙ্খার উদ্রেক করে।
  • মহিলারা ইহরাম অবস্থায় হাত গ্লাভস বা নেকাব (শক্ত করে বাঁধা মুখোশ) পরা। তবে সামনে কোনো বেগানা পুরুষ চলে আসলে মাথার কাপড়ের কিছু অংশ দিয়ে মুখ ঢেকে নিবেন।
  • ইহরাম অবস্থায় পুরুষরা তাদের মাথায় ইহরামের কাপড় অথবা টুপি অথবা মাথার কভার দিয়ে আবৃত করতে পারবে না। আর যদি অনিচ্ছাকৃত বা ভুলক্রমে কেউ মাথা ঢেকে ফেলে তাহলে মনে হওয়ার সাথে সাথে তা খুলে ফেলতে হবে। তবে এজন্য কোনো কাফফারা আদায় করতে হবে না।
  • এছাড়া পুরুষরা ইহরাম অবস্থায় সেলাইযুক্ত কাপড় যেমন- গেনজি, শার্ট, প্যান্ট, আন্ডারওয়ার পরতে পারবে না।

সূরা আল-বাকারা: ২:১৯৭ সহীহ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫/২০৯ সহীহ মুসলিম ৪/৫৪৩, ২২৮৭ সহীহ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪/৩৩১

ইহরামের বিধান লঙ্ঘনের কাফফারা ›

  • ইহরাম অবস্থায় কারো সঙ্গে যৌন সঙ্গম করলে তার ইহরাম ভেঙে যাবে। হজ/উমরাহ সম্পূর্ণ বাতিল হয়ে যাবে। কিন্তু তবুও তাকে হজ/উমরাহর বাকি সব বিধান সম্পন্ন করতে হবে এবং তাকে কাফফারা হিসেবে হারাম এলাকার মধ্যে একটি ফিদইয়া/দম (পশু জবাই) করতে হবে এবং একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। আবার পরবর্তীতে তাকে হজ/উমরাহর জন্য আসতে হবে বা পুনরায় হজ/উমরাহ করতে হবে।
  • কেউ যদি কাউকে ইহরাম অবস্থায় কোনো একটি নিষিদ্ধ কাজ করতে বাধ্য করে অথবা অন্য কোনো কারণে বাধ্য হয়ে ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কোনো কাজ করে তাহলেও তাকে কোনো ফিদইয়া দিতে হবে না।
  • ইহরাম অবস্থায় স্বপ্নদোষ হলে তাতে ইহরাম নষ্ট হবে না। ফরয গোসলের মাধ্যমে নাপাক ধুয়ে পরিষ্কার করতে হবে। এ জন্য অতিরিক্ত আরেকটি ইহরাম কাপড় রাখা উত্তম।
  • কেউ যদি সজ্ঞানে বা ইচ্ছাকৃতভাবে ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কোনো কাজ করে তাহলে কাফ্ফারা (ফিদইয়া/দম) আদায় করতে হবে।
  • ফিদইয়া/দম: হারাম এলাকার মধ্যে কাফ্ফারাস্বরূপ একটি পশু (উট বা গরুর এক সপ্তমাংশ/ পূর্ণ এক ছাগল/ পূর্ণ এক ভেড়া) যবেহ করা যা কোরবানির উপযুক্ত এবং সম্পূর্ণ গোশত মিসকিন ও গরীবদের মাঝে বিতরণ করে দেওয়া অথবা তিন দিন সাওম রাখা অথবা ৬ জন গরীব লোককে এক বেলা খাওয়ানো (প্রত্যেককে অন্তত অর্ধ সা‘ বা ১.২০ কেজি পরিমাণ খাবার দেওয়া)।

সূরা আল-বাকারা: ২:১৯৬ সহীহ বুখারী ও মুসলিম

  • ইহরামের বিধিবিধান ও ফিদইয়া/দম বিষয়ে আরও বিস্তারিত ও খুটিনাটি বিষয় জানতে কয়েকটি বই পড়ুন।
  • মক্কার হারাম এলাকার সীমা: পূর্বে ১৬ কিলোমিটার (জা‘রানা), পশ্চিমে ১৫ কিলোমিটার (হুদায়বিয়াহ), উত্তরে ৭ কিলোমিটার (তান‘ঈম), দক্ষিণে ১২ কিলোমিটার (আদাহ), উত্তর-পূর্বে ১৪ কিলোমিটার (নাখলা উপত্যকা)।
  • জিবরীল আলাইহিস সালামের মাধ্যমে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম মক্কার সম্মানে হারাম এলাকার সীমানা নির্ধারণ করেন। হারামের সীমানার মধ্যে নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে। হারামের সীমানার মধ্যে অমুসলিমদের প্রবেশের কোনো অনুমতি নেই।

জেদ্দা বিমানবন্দর: ইমিগ্রেশন ও লাগেজ ›

  • হজ সফরের আলোচনায় ইতোপূর্বে আমরা জেদ্দা বিমানবন্দর পর্যন্ত  আলোচনা করেছিলাম এরপর উমরাহর ইহরাম বিষয়ে আলোচনা করেছি, এখন আবার হজ সফরের ধারাবাহিক আলোচনায় ফিরে যাচ্ছি
  • জেদ্দা বিমানবন্দরে বিমান থেকে অবতরণের পর আপনি ছোট হাত ব্যাগ নিয়ে নিচে নেমে যাত্রীদের ওয়েটিং লাউঞ্জে/অপেক্ষা কক্ষে গিয়ে বসুন। এখানে একটি ছোট ইমিগ্রেশন ফরম পূরণ করুন অথবা অন্য কারো সাহায্য নিয়ে এটি পূরণ করুন।
  • এরপর দলবদ্ধ হয়ে হালকা সবুজ রংয়ের যে কোনো ইমিগ্রেশন কাউন্টারে লাইনে দাঁড়াবেন। সেখানে ইমিগ্রেশন অফিসার আপনার পাসপোর্ট চেক করবেন এবং সিল দিবেন। আপনার ফিংগার প্রিন্ট নিতে পারে, ছবিও তুলতে পারে। আপনার ছোট হাত ব্যাগ স্ক্যান করা হতে পারে, আবার নাও হতে পারে, এটি পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।
  • ইমিগ্রেশন চেক করার পর দলবদ্ধ হয়ে আপনি লাগেজ বেল্ট থেকে আপনার বড় লাগেজটি নিয়ে নিন। একটি লাগেজ ট্রলি নিয়ে এতে লাগেজটি রেখে টেনে নিয়ে টার্মিনাল থেকে বের হবেন।
  • বের হওয়ার গেটে সৌদি ট্রান্সপোর্ট কর্তৃপক্ষ আপনার বড় লাগেজটি নিয়ে নিবে যা জায়গা মতো বাংলাদেশ প্লাজায় পেয়ে যাবেন।
  • পরে আরেকটি কাউন্টারে আপনার পাসপোর্ট আবার চেক করা হবে এবং আপনার পাসপোর্টে বাস ট্রাভেল স্টিকার লাগিয়ে দেওয়া হবে। এসব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করুন।

জেদ্দা বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন কাউন্টারে ও অন্য কাউন্টারে যেসব সৌদি লোক কাজ করেন তারা খুব মন্থর গতিতে ও ধীরে কাজ করেন এবং আপনি কতক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন অথবা আপনি কতটা ক্লান্ত তারা এসব বিষয় বিবেচনা করেন না। কারণ, তারা প্রতিদিন এমন হাজার হাজার হজযাত্রীকে সেবা দিচ্ছেন। তাই আপনাকে ধৈর্যশীল থাকার অনুরোধ করবো।

জেদ্দা বিমানবন্দর: বাংলাদেশ প্লাজা ›

  • বাংলাদেশ প্লাজা জেদ্দা বিমানবন্দরের বাইরে বাংলাদেশী হজযাত্রীদের অপেক্ষার জন্য একটি নির্দিষ্ট স্থান। এখানে বসে থাকুন বাস না আসা পর্যন্ত বিশ্রাম করুন। তালবিয়াহ পাঠ করতে থাকুন। আপনি যে ইহরাম করা অবস্থায় আছেন সেটা ভুলে যাবেন না।
  • এবার আপনার সৌদি আরবের মোবাইল সিম চালু করুন। আপনার পরিচিতজনদের ফোন করে আপনার অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করুন। আপনার হজ গাইডের নাম্বার ও বেশ কয়েকজন হজযাত্রীদের নাম্বার মোবাইলে সেভ করে রাখুন।
  • আপনি এখান থেকেও সৌদি সিম কিনতে পারবেন। যাদের স্মার্টফোন রয়েছে তারা ইন্টারনেট সিম কিনতে পারেন।
  • জেদ্দা বাংলাদেশ হজ মিশনের একটি অফিস এখানে অবস্থিত। এখানে আশেপাশে অনেক ক্যাফেটেরিয়া ও দোকান রয়েছে। পর্যাপ্ত ওয়াশরুম ও সালাতের স্থানও রয়েছে এখানে আশেপাশে।
  • আপনার সৌদি মু‘আল্লিম আপনার জন্য পরিবহন পাঠাবেন। বাস আসলে আপনার বড় লাগেজটি বাসের বক্স অথবা ছাদে দিয়ে দিন। এক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে আপনার ব্যাগ ও লাগেজ সঠিক বাসে উঠলো কি না।
  • বাস ড্রাইভার বা সুপারভাইজর সকল যাত্রীর পাসপোর্ট নিয়ে নিবেন। তবে কোনো চিন্তা করবেন না ও ভয় পাবেন না। কারণ, এসব পাসপোর্ট সৌদি মু‘আল্লিম অফিসে জমা রাখা হবে। হজ শেষে ফিরতি যাত্রার সময় আপনি পাসপোর্ট ফেরত পাবেন।
  • আবার সেই একই সর্তকতা; সবসময় দলবদ্ধ হয়ে সকল জায়গায় যাবেন এবং সকল কাজ করবেন। কখনই দলছাড়া হবেন না, দলছাড়া হলে আপনি হারিয়ে যেতে পারেন ও সমস্যায় পড়তে পারেন।
  • জেদ্দা থেকে বাস যাত্রা করে মক্কা পৌছাতে ২-৩ ঘণ্টা আরও অবস্থা অনুযায়ী আরও বেশি সময় লাগতে পারে। হাজীদের আপ্যায়ন হিসাবে রাস্তায় চেকপোষ্টে নাস্তা ও পানি বিতরণ করা হয়, এগুলো গ্রহণ করুন। রাস্তায় তালবিয়াহ পাঠ করতে থাকুন।

মক্কায় পৌঁছানো ও আইডি সংগ্রহ ›

  • মক্কায় পৌঁছানোর পর পরিবহন বাস আপনাকে প্রথমেই নিয়ে যাবে মক্কা মু‘আল্লিম অফিসে। সেখানে তারা আপনাকে কিছু উপহার ও আপ্যায়ন করতে পারেন। আপনি তা সানন্দে গ্রহণ করুন।
  • মু‘আল্লিম অফিস সকলের পাসপোর্ট পরীক্ষা এবং গণনা করবেন। তারা আপনার পাসপোর্ট রেখে দিবেন এবং এর পরিবর্তে পরিচয়ের জন্য আপনাকে হাতের ব্যান্ড ও হজ পরিচয়পত্র (সাময়িক আইডি কার্ড) প্রদান করবেন। পরবর্তীতে ছবিসহ একটি আইডি কার্ড প্রদান করবেন, যাতে আপনার নাম ও পাসপোর্টসহ যাবতীয় ডাটা থাকবে।   
  • এই হাতের ব্যান্ড ও আইডি কার্ড খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে আপনার মক্কা মুআল্লিমের নাম, ঠিকানা ও ফোন নম্বর আরবিতে লেখা রয়েছে। আপনি যদি হারিয়ে যান তাহলে এটা আপনার মু‘আল্লিমকে খুঁজে বের করতে সাহায্য করবে। এরপর মক্কায় হোটেল/বাড়িতে গিয়ে উঠবেন।
  • হোটেলে অথবা ভাড়া করা বাড়িতে পৌঁছানোর সাথে সাথে আপনার রুমে উঠে পড়ুন। আপনার হজ এজেন্সি আপনাদের আবাসনের জন্য বিভিন্ন রুম বরাদ্দ করে দিবেন। মহিলা ও পুরুষরা একই অথবা আলাদা আলাদা রুমে থাকতে হতে পারে।
  • দেখা যায় অনেক হজযাত্রী নিজের রুমের ব্যাপারে সন্তুষ্ট হতে পারেন না এবং তারা রুম পরিবর্তনের চেষ্টা করেন। এটা যদি সম্ভব হয় তাহলে পরিবর্তন করুন, আর তা না হলে বিষয়টি এখানেই ছেড়ে দিন। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে টানা হ্যাচড়া করে বেশি দূর নিয়ে যাবেন না। আপনি যা পেয়েছেন তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকুন। এটাকে পরীক্ষা হিসেবেই মনে করুন।
  • রুমে গিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করুন, গোসল করুন ও খাবার গ্রহণ করুন। তবে এ সময়ে কাঁচা পেঁয়াজ ও রসুন খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।
  • আপনি যে ইহরাম অবস্থায় আছেন সেটা ভুলে যাবেন না, তালবিয়া পাঠ করতে থাকুন। এরপর আপনার হজ গাইড যে কোনো সময় সবাইকে একত্রিত করে পরবর্তী কাজ তাওয়াফ ও সা‘ঈ সম্পর্কে আলোচনা করতে পারেন।

হজ সফরের যে ধারাবাহিক বর্ণনা এখানে করা হয়েছে তা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে একটি বাস্তব সফর সম্পর্কে ধারণা দিতে চেষ্টা করা হয়েছে। গাইডে আলোচিত কোনো বিষয় আপনার জন্য ব্যতিক্রম হতে পারে, এটি সম্পূর্ণ হজ ব্যাবস্থাপনা বা প্রেক্ষাপটের ওপর নির্ভর করে। হজের কিছু প্রক্রিয়া বছরান্তে পরিবর্তনও হতে পারে। আমি এক্ষেত্রে নতুন সংস্করণ দেওয়ার চেষ্টা করব। পাঠকবৃন্দের কাছে বিনীত অনুরোধ রাখবো আপনার অভিজ্ঞতা ও মতামত জানিয়ে আমাকে সহযোগিতা করবেন।

মক্কা ও মসজিদুল হারামের ইতিহাস ›

  • মক্কা সম্মানিত শহর। ‘বাইতুল আতিক’ পুরাতন ঘর অর্থাৎ ‘কা‘বা’র সম্মানের কারণে মক্কাকে সম্মানিত করা হয়েছে। সকল শহরের চেয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিকট প্রিয় এ শহর, মুসলিমদের কিবলা ও হজের স্থান।
  • এ পবিত্র শহরকে আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে কয়েকটি নামে উল্লেখ করেছেন:
  • মক্কা  ২) বাক্কা  ৩) আল-বালাদ  ৪) আল-কারিয়াহ  ৫) উম্মুল কুরা
  • ‘‘আল্লাহ দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন একটি জনপদের, যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত’’।
  • সম্মান ও মর্যাদা প্রকাশের জন্য আল্লাহ তা‘আলা মক্কার কসম করে বলেছেন;  ‘‘আমি এ নগরের শপথ করছি’’।
  • মক্কায় বসবাস উত্তম, এখানে নেকী ও ইবাদত উত্তম; ঠিক তেমনি খারাপ কাজ এবং পাপের গুনাহও অনেক বেশি। মক্কাকে নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে। মক্কায় মহামারী/প্লেগ রোগ ছড়াবে না কখনও, মক্কায় দজ্জাল প্রবেশ করতে পারবে না। মক্কা প্রবেশ এর সকল পথে আল্লাহর ফেরেশতারা রক্ষী হিসাবে অবস্থান করছেন।
  • আব্দুল্লাহ ইবন আদী ইবন আল-হামরা থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন, ‘‘আল্লাহর কসম, হে মক্কা তুমি আল্লাহর সকল ভূমির চেয়ে উত্তম ও আমার নিকট অধিক প্রিয়। আমাকে যদি তোমা হতে বের হওয়ার জন্য বাধ্য না করা হত তাহলে আমি কখনো বের হতাম না’’। 
  • কা‘বা ঘর ও এর চারপাশে তাওয়াফের জায়গা বেষ্টন করে যে মসজিদ স্থাপিত তা মসজিদুল হারাম নামে পরিচিত। কা‘বা ঘরের চারপাশে তাওয়াফের জায়গার মেঝেকে মাতাফ বলা হয়। কা‘বা ঘরের তাওয়াফ শুরু করার কর্নারটি হাজরে আসওয়াদ কর্নার নামে পরিচিত। এর ডান পাশের কর্নারটি ইরাকি কর্নার, তার ডান পাশের কর্ণারটি শামি কর্নার এবং তার ডান পাশের কর্ণারটি ইয়েমেনী কর্নার নামে পরিচিত।
  • রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘মসজিদে হারাম ব্যতীত আমার এ মসজিদে (মসজিদে নববী) সালাত অন্য স্থানে সালাতের চেয়ে ১ হাজার গুণ উত্তম, আর মসজিদে হারামে সালাত ১ লক্ষ সালাতের চেয়ে উত্তম’’।
  • রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময় কা‘বা ও মসজিদুল হারামকে কেন্দ্র করে এর চারপাশে অনেক বসতি গড়ে উঠেছিল যা পরবর্তীতে ক্রমবর্ধমান মুসল্লীদের জন্য সালাতের জায়গার সংকুলান হচ্ছিল না।

সূরা আন-নাহল: ১৬:১১২ সূরা আল-বালাদ: ৯০:১ তিরমিযী, হাদীস নং ৩৯২৫; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ১৩০৮ ইবন মাজাহ, হাদীস নং ১৩৯৬

  • খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগে প্রথমে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ও পরে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু মসজিদের আশেপাশের জায়গা লোকদের কাছ থেকে ক্রয় এর সীমা বর্ধিত করেন ও প্রাচীর দিয়ে দেন। পরবর্তীতে আব্দুল্লাহ ইবন যুবায়ের মসজিদের পূর্বদিকে এবং আবু জাফর মনসুর পশ্চিম দিকে ও শামের দিকে প্রশস্ত করেন। পরবর্তীতে বেশ কয়েকজন মুসলিম শাসকদের আমলে মসজিদুল হারামের সীমা বর্ধিত হয় ও সংস্কার সাধিত হয়।
  • এরপর প্রায় এক হাজার বছর মসজিদের সীমা বর্ধিত করার কোনো কাজ করা হয় নেই। অতঃপর ১৩৭০ হিজরীতে সৌদি বাদশাহ আব্দুল আযীয ইবন আব্দুর রহমান আল সাউদ এর আমলে মসজিদের জায়গা ছয় গুণ বৃদ্ধি করে আয়তন হয় ১,৮০,৮৫০ মিটার। এ সময়ে মসজিদে মার্বেল পাথর, আধুনিক কারুকার্য, নতুন মিনার সংযোজন করা হয়। সাফা মারওয়া দোতলা করা হয়। ছোট বড় সব মিলিয়ে ৫১টি দরজা তৈরি করা হয় মসজিদে।
  • এরপর সৌদি বাদশা ফাহাদ ইবন আব্দুল আযীয প্রশস্তকরণের কাজে হাত দেন। তিনি মসজিদের দোতলা, তিন তলা ও ছাদে সালাতের ব্যাবস্থা করেন। তিনি মসজিদের আধুনিকায়নের জন্য অনেক কাজ করেন।
  • হারামের প্রশস্তকরনের কাজ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ কাজ; কিন্তু মুসল্লিদের এক ইমামের পিছনে একত্রিত করাও ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আগে মসজিদে চার মাযহাবের লোকেদের চারটি আলাদা মুসল্লা গড়ে উঠেছিল। এক আযানের পর চার আলাদা জায়গায় চার মাযহাবের লোকদের চারটি আলাদা জামাআত হতো। যার ফলে মুসলিমদের মাঝে ভাঙ্গন ও অনেক বিদ‘আতি প্রথা প্রচলন শুরু হয়। কিন্তু পরে আল সাউদ এর আমলে সকল মুসলিমকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সালাফে সালেহীনদের পথে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন ও সকল মুসলিমদের এক ইমামের পিছনে সালাত আদায়ের আদেশ দেন।
  • সর্বশেষ ২০১০ খৃঃ সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহর তত্ত্বাবধানে মসজিদুল হারামের তাওয়াফ ও মূল মসজিদ প্রশস্তকরনের দায়িত্ব পায় সৌদি ইবন লাদেন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। এখন এ প্রশস্তকরনের কাজ প্রতীয়মান। এ কাজ শেষ হতে ২০১৭-১৮ সাল লাগবে আশা করা যায়। বর্তমানে প্রায় ৩০-৩৫ লক্ষাধিক মুসল্লি একত্রে সালাত আদায় করতে পারেন এবং আশা করা যায় এ কাজ শেষ হলে প্রায় ৫০ লক্ষাধিক মুসল্লী একত্রে সালাত আদায় করতে পারবেন।
  • মক্কা ও মসজিদুল হারাম এর ইতিহাস বিস্তারিত জানতে ‘পবিত্র মক্কার ইতিহাস: শাইখ ছফীউর রহমান মোবারকপুরী’ বইটি পড়ুন।

তাওয়াফের তাৎপর্য

  • তাওয়াফের সাধারণ অর্থ হলো – বায়তুল্লাহ বা কা‘বা আবর্তন করা।
  • কা‘বা ঘরের চারপাশে শরী‘আত নির্ধারিত পদ্ধতিতে ৭ বার প্রদক্ষিণ করাকে তাওয়াফ বলা হয়। কা‘বা ঘর তাওয়াফ করার নেকী অপরিসীম।
  • পৃথিবীর বুকে আল্লাহর ইবাদাতের জন্য নির্মিত কা‘বা ঘরই ছিল প্রথম ঘর। পৃথিবীর আর কোনো ঘর তাওয়াফ করার জন্য আল্লাহ নির্দেশনা দেন নি।
  • আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘এবং আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈল-কে আদেশ দিয়েছিলাম যেন তারা আমার ঘরকে তাওয়াফকারীদের, ইতিকাফকারীদের, রুকু ও সাজদাহকারীদের জন্য পবিত্র করে রাখে’’।
  • এক হাদীসে তাওয়াফকে সালাতের সমতুল্য বলা হয়েছে। পার্থক্য শুধু এতটুকু, তাওয়াফের সময় কথা বলা বৈধ তবে প্রয়োজন ব্যাতিরেকে না বলাই উত্তম।
  • মহাবিশ্বের বৃহৎ শক্তির চারদিকে সকল ছোট বস্তু আবর্তন করে বা আল্লাহ কেন্দ্রিক মানবের জীবন বা মহান আল্লাহর নিদর্শন ও নিয়ামতের চারপাশে মানুষের বিচরণ বা এক আল্লাহ নির্ভর জীবনযাপনের গভীর অঙ্গিকার ব্যক্ত করা – এসবকিছুরই প্রতীক হচ্ছে তাওয়াফ। তাওয়াফ করার মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার প্রতি আনুগত্য ও বশ্যতাকেই বুঝায়।
  • যদিও বেশিরভাগ উত্তম কাজ ডান থেকে বামে করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কা‘বা শরীফ তাওয়াফ করতে বলা হয়েছে বাম ধার ধরে। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো সূর্য, চন্দ্র, পৃথিবী এবং দেহের রক্ত চলাচল বাম থেকে ডানে হয়।

সূরা আল-বাকারা: ২:১২৫

  • হজ ও উমরাহ উভয় ইবাদাতের জন্যই তাওয়াফ বাধ্যতামূলক। হজ বা উমরাহ পালনকারীকে যে কোনো উপায়ে (হেঁটে অথবা হুইল চেয়ারে বা কাঁধে চড়ে) তাওয়াফ সম্পন্ন করতে হয়।
  • ঋতুবর্তী মহিলারা তাওয়াফ করতে পারবেন না; তবে তারা হজ ও উমরাহর অন্যান্য কার্যাবলী সম্পাদন করতে পারবেন এবং তাদের ঋতু বন্ধ হওয়ার পর তারা তাওয়াফ করবেন।
  • কা‘বা ঘর সংলগ্ন একটি স্থান রয়েছে যার নাম হাতিম/হিজর – কা‘বা ঘরের উত্তর দিকে কা‘বা সংলগ্ন অর্ধ-বৃত্তাকার এ উচু দেওয়ালটিও কা‘বা ঘরেরই অংশ। এ হাতিমের মধ্য দিয়ে তাওয়াফ করলে তাওয়াফ হবে না। (বাহির অংশ দিয়ে তাওয়াফ করতে হবে)

সাধারণত তাওয়াফ ৪ ধরনের। যথা – তাওয়াফুল কুদুম (ইফরাদ ও ক্বিরান হাজীর প্রথম তাওয়াফ/তামাত্তু হাজীর উমরাহর তাওয়াফ), তাওয়াফুল ইফাদাহ/যিয়ারাহ (হজের ফরয তাওয়াফ), তাওয়াফুল বিদা (হজের বিদায় তাওয়াফ) ও নফল তাওয়াফ (ঐচ্ছিক তাওয়াফ)।

তাওয়াফের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও টিপস ›

কাজথেকেপর্যন্তপ্রতি আবর্তন ও সর্বমোট দূরত্ব (আনুমানিক)
কা‘বা তাওয়াফ(মাতাফ-প্রধান ফ্লোরে)হাজরে আসওয়াদহাজরে আসওয়াদ০.৩২ কি.মি ও ২.২৫ কি.মি
কা‘বা তাওয়াফ(মাতাফের ২য় তলায়)হাজরে আসওয়াদহাজরে আসওয়াদ০.৪৫ কি.মি ও ৩.১২ কি.মি.
কা‘বা তাওয়াফ(হারামের ২য় ও ৩য় তলায়)হাজরে আসওয়াদহাজরে আসওয়াদ০.৬৮ কি.মি ও ৪.৭৬ কি.মি.
  • যদি হজ শুরুর ৭-১০ দিনের মধ্যে উমরাহ করতে যান তবে প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে পড়তে হতে পারে। এজন্য মসজিদের দুই অথবা তিন তলা দিয়ে প্রথম তাওয়াফ করা ভাল। তাছাড়া সাধারণত এশার সালাতের পরে বা মধ্যরাতে বা সকাল ৬টা থেকে ৯টার মধ্যে তাওয়াফ করা ভালো। এতে আপনি সালাতের সময়ে তাওয়াফ করা, সূর্যের তাপ ও অতিরিক্ত ভিড় এড়াতে পারবেন।
  • তাওয়াফের পূর্বে পানি কম করে পান করলে ভালো হয়। তাওয়াফের আগে টয়লেট/বাথরুম সেরে নেওয়া উত্তম। সঙ্গে মাসনুন দু‘আ-র বই নেওয়া যায়।
  • তাওয়াফ করার সময় স্যান্ডেল বহন করার জন্য ছোট কাপড়ের ব্যাগ/কাধ ব্যাগ সঙ্গে নিবেন। মোবাইল ফোনটি বন্ধ করে সাথে নিবেন অথবা সাইলেন্ট মোডে দিয়ে রাখবেন। আপনার হোটেল বা বাড়ির ঠিকানা কার্ড সঙ্গে নেবেন। হজ আইডি কার্ড ও হাতের ব্যান্ড সঙ্গে রাখুন।
  • তাওয়াফের সময় ভিড়ের মধ্যে শান্ত থাকবেন। দরকার হলে কারো হাত ধরে রাখবেন। তাড়াহুড়া করতে গিয়ে অন্যকে ধাক্কা দিয়ে কষ্ট দেবেন না।
  • সবাই দলবদ্ধ হয়ে তাওয়াফ করার চেয়ে ছোট ছোট দল হয়ে তাওয়াফ করাই উত্তম। কারণ সবার গতি এক নয় আর মনোযোগ আল্লাহর যিকির করার চেয়ে দলের প্রতি থাকবে বেশি। তবে হারিয়ে যাওয়ার খুব ভয় থাকলে কথা ভিন্ন।
  • তাওয়াফের প্রথম দিনই হাজারে আসওয়াদ চুম্বন করার চেষ্টা করবেন না। সাথে মহিলা থাকলে খুব কা‘বা ঘর ঘেষে তাওয়াফ করতে যাবেন না।
  • যখনই আযান শুনবেন তখনই তাওয়াফ/সা‘ঈ বন্ধ করে দিয়ে সালাতের প্রস্তুতি নিবেন। সালাত আদায় করে আবার সেখান থেকেই শুরু করে দেবেন।

মসজিদুল হারামে প্রবেশ  কা‘বা তাওয়াফ ›

  • এবার তাওয়াফের জন্য প্রস্তুতি নিন। তাওয়াফের পূর্বে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র হওয়া আবশ্যক। সকল প্রকার নাপাকী থেকে পবিত্র হতে হবে। মক্কার আসার পরে ও তাওয়াফের পূর্বে গোসল করা মুস্তাহাব। তবে শুধু ওযু করলেও চলবে। ওযু ছাড়া বা হায়েয নেফাস অবস্থায় তাওয়াফ করা জায়েয নয়। ইহরামের বিধি-নিষেধ স্মরণ রাখবেন এবং বেশি বেশি তালবিয়াহ পাঠ করতে থাকবেন।
  • মসজিদুল হারামের যাওয়ার রাস্তায় কিছু স্থান চিহ্নিত করুন ও সেখানে যাওয়ার পথ চিনে রাখতে চেষ্টা করুন। এতে করে আপনি যদি দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন অথবা হারিয়ে যান তাহলে সহজেই বাসা বা হোটেলে ফিরে আসতে পারবেন।
  • আপনি যে কোনো গেট দিয়েই প্রবেশ করতে পারেন। তবে তাওয়াফ শুরু করার জায়গায় সহজে পৌছানোর জন্য সাফা পাহাড়ের পাশের গেট দিয়ে প্রবেশ করলে সহজ হয়। মসজিদে প্রবেশের আগে সেন্ডেল খুলে শেলফে রাখুন অথবা সঙ্গে ছোট ব্যগে নিয়ে নিতে পারেন।
  • ডান পা দিয়ে মসজিদুল হারামে প্রবেশ করুন এবং এ দো‘আ পাঠ করুন:    بسم الله والصلاة والسلام على رسول الله اَللهم افْتَحْ لِيْ أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ

‘‘বিসমিল্লাহি ওয়াসসালাতু ওয়াসসালামু ‘আলা রাসূলিল্লাহ, আল্লাহুম্মাফ তাহলী আবওয়াবা রাহমাতিকা’’।

‘‘আল্লাহর নামে আরম্ভ করছি। সালাত ও সালাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর।

হে আল্লাহ, আপনি আমার জন্য আপনার রহমতের দরজা উন্মুক্ত করে দিন’’।

  • উমরাহর নিয়তে মসজিদুল হারামে প্রবেশ করলে ‘তাহিয়াতুল মসজিদ’ সালাত আদায় করার প্রয়োজন নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদুল হারামে প্রবেশ করে সরাসরি তাওয়াফ করেছেন। কিন্তু অন্য কোনো সময়ে মসজিদে প্রবেশ করলে দু’রাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদ সালাত আদায় না করে মসজিদে যেন কেউ না বসেন; তবে কোনো সালাতের ইকামত হয়ে গেলে সেই সালাতে শামিল হয়ে যাবেন। এ নিয়ম সকল মসজিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
  • মসজিদের ভিতরে প্রবেশ করে কা‘বার উদ্দেশ্যে যেতে যেতে তালবিয়াহ পাঠ করতে থাকুন। যখনই কা‘বা শরীফ চোখে পড়বে তখনই তালবিয়াহ পাঠ বন্ধ করে তাওয়াফের প্রস্তুতি নিন ও তাওয়াফের নিয়ত করুন। কা‘বা শরীফ চোখে পড়া মাত্রই জোরে তাকবির দেওয়া বা দু হাত তুলে দো‘আ করা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়। তাওয়াফের শুরুতে মনে মনে নিয়ত করবেন। নিয়তের জন্য মুখে কিছু বলতে হয় না, কোনো কাজের জন্য দৃঢ় ইচ্ছা পোষণ করাই হচ্ছে নিয়ত। এ তাওয়াফ করা উমরাহর ফরয কাজ।
  • তাওয়াফ শুরুর স্থানে (হাজরে আসওয়াদ কর্নার) যাওয়ার আগে শুধু পুরুষরা তাদের ইহরামের কাপড়ের এক প্রান্ত ডান বগলের নিচ দিয়ে নিয়ে বাম কাঁধের উপর দিবেন এবং ডান কাঁধ ও বাহু উন্মুক্ত করে দিবেন। একে বলা হয় ‘ইদতিবা‘’। সাত চক্বরেই এমনটি করা সুন্নাত। মেয়েদের কোনো ইদতিবা‘ নেই। এ ইদতিবা‘ শুধুমাত্র (তামাত্তু হাজীর) উমরাহর তাওয়াফ এবং (ক্বিরান ও মুফরিদ হাজীর) তাওয়াফে কুদুমের সময় করতে হয়। আর অন্য কোনো তাওয়াফের সময়ের জন্য ইদতিবা‘ করা প্রযোজ্য নয়।

এবার তাওয়াফ শুরুর স্থানে তাওয়াফকারীদের স্রোতে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করুন। স্রোতের বিপরীতে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। কারণ এতে বিপরীত দিক থেকে আসা লোকের স্রোতে আঘাত পেতে পারেন ও আপনি তাওয়াফকারীদের তাওয়াফে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারেন।

সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৬৫৫

  • তাওয়াফকারীদের সাথে চলতে চলতে হাজরে আসওয়াদ বরাবর এসে লক্ষ্য করুন হাজরে আসওয়াদ এর কোণ/কর্নার বরাবর মাসজিদুল হারামের দেওয়ালে সবুজ রংয়ের আলোর বাতি দেওয়া আছে। এ সবুজ বাতি ও হাজরে আসওয়াদের কোণ বরাবর পৌছলে বা তার একটু আগেই সম্ভব হলে একটু থেমে বা চলতে চলতেই হাজরে আসওয়াদ এর দিকে মুখ করে ডান হাত উচু করে হাজরে আসওয়াদের দিকে সোজা ধরে বলুন: بِسْمِ اللهِ اَللهُ أَكْبَرُ ‘‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’’।
  • তাকবীর বলার পর আপনার ডান হাত নিচে নামিয়ে নিন ও রমল (দ্রুত পদক্ষেপে বীরত্ব প্রকাশ) করে চলতে শুরু করুন। হাতে কোনো চুমু খাবেন না। অনেককে লক্ষ্য করবেন এক/দুই হাত উচু করে তাকবীর বলছেন ও হাতে চুমু খাচ্ছেন, এমনটি করা সঠিক সুন্নাত নিয়ম নয়।
  • হাজরে আসওয়াদ পাথর চুম্বন করে তাওয়াফ শুরু করা উত্তম ও এমনটি করা সুন্নাত। তবে যদি চুমু খেতে না পারেন তাহলে ডান হাত দিয়ে পাথরটি স্পর্শ করে আপনার হাতে চুমু দিয়ে তাওয়াফ শুরু করতে পারেন। কিন্তু হজ মৌসুমে অতিরিক্ত ভিড় ও ধাক্কাধাক্কির কারণে হাজরে আসওয়াদ এর ধারে কাছেই যাওয়া যায় না, তাই আপনাকে দূর থেকে ইশারা করেই তাওয়াফ শুরু করার পরামর্শ দিব। পরবর্তীতে আপনি যখন নফল তাওয়াফ করবেন তখন যতদূর সম্ভব ধাক্কাধাক্কি না করে ও কাউকে কষ্ট না দিয়ে হাজরে আসওয়াদ পাথর চুম্বন করার চেষ্টা করতে পারেন।
  • হাজরে আসওয়াদ পাথর স্পর্শের ফযীলত সম্পর্কে হাদীসে এসেছে, এ পাথর স্পর্শ করলে গুনাহসমূহ (সগীরা গুনাহ) সমূলে মুছে যায় ও এ পাথর হাশরের ময়দানে সাক্ষী দিবে যে ব্যক্তি তাকে স্পর্শ করেছে।
  • এবার কা‘বাকে আপনার বাম দিকে রেখে আবর্তন/চক্কর দিতে শুরু করুন। হাজারে আসওয়াদ কর্নার এর সবুজ বাতি থেকে শুরু করে কা‘বা ঘরের ইরাকি কর্নার, হাতিম, সামি কর্নার, ইয়েমেনি কর্নার পার করে ফের হাজরে আসওয়াদ কর্নার এর সবুজ বাতি পর্যন্ত হাঁটা শেষ হলে এক চক্কর গণনা করা হয়। এভাবে আরও ছয় চক্কর দিতে হবে। এ সাত চক্কর সম্পন্ন হলে তাওয়াফ শেষ হয়ে যাবে।

সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৬০৭ ইবন খুযাইমাহ, হাদীস নং ২৭২৯

  • শুধুমাত্র পুরুষেরা চক্করের শুরুতে দৃঢ়তার সাথে বীর বেশে কাঁধ হেলিয়ে প্রথম তিন চক্কর সম্পন্ন করবেন অর্থাৎ; একটু দ্রুত ও ক্ষুদ্র কদমে বুক টান করে জগিং করে/হেঁটে ‘রমল’ করে চক্কর সম্পন্ন করবেন, এমনটি করা সুন্নাত। তবে ভিড়ের কারণে রমল করা সম্ভব না হলে কোনো সমস্যা নেই, আপনি স্বাভাবিকভাবেই হাঁটবেন। এ রমল করা শুধুমাত্র (তামাত্তু হাজীর) উমরাহর তাওয়াফ ও (অন্যান্য হাজীর) তাওয়াফে কুদূমের জন্য প্রযোজ্য। আর অন্য কোনো তাওয়াফের সময় রমল করতে হয় না। চতুর্থ চক্কর থেকে আপনি আবার স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে শুরু করবেন এবং এ ধারা বজায় রাখবেন সপ্তম চক্কর পর্যন্ত। মহিলাদের কোনো রমল নেই।
  • তাওয়াফের জন্য নির্দিষ্ট কোনো দো‘আ নেই। কিছু কিছু বইতে দেখবেন; প্রথম চক্রের দো‘আ, দ্বিতীয় চক্রের দো‘আ.. লেখা থাকে। কুরআন হাদীসে এধরনের চক্রভিত্তিক দো‘আর কোনো দলীল নেই। তাওয়াফরত অবস্থায় আপনি ইচ্ছে করলে কুরআন তিলাওয়াত, দো‘আ, যিকির, ইসতিগফার করতে পারেন আপনার নিজের ইচ্ছা মত। আল্লাহর প্রশংসা করুন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর দুরূদ পড়ুন। সব দো‘আ যে আরবীতে করতে হবে তার কোনো নিয়ম নেই, যে ভাষা আপনি ভালো বোঝেন ও আপনার মনের ভাব প্রকাশ পায় সে ভাষাতেই দো‘আ করুন। তবে মনে রাখবেন; আওয়াজ করে, জোরে শব্দ করে বা দলবদ্ধ হয়ে কোনো দো‘আ পাঠ করা সুন্নাত নিয়ম এর অন্তর্ভুক্ত নয়। এতে অন্যদের মনোযোগও নষ্ট হয়। দো‘আ করবেন আবেগ ও মিনতির সাথে মনে মনে। তাওয়াফের সময় তাওহীদকে জাগ্রত করুন। তাওয়াফের সময় এদিক ওদিক তাকাতাকি ও ঘুরাঘুরি না করে একাগ্রচিত্তে বিনয় এর সাথে তাওয়াফ করাই উত্তম। খুব বেশি প্রয়োজন ব্যাতিরেকে তাওয়াফের সময় কথা না বলাই শ্রেয়। এ বইয়ের শেষে কুরআন ও হাদীস থেকে বেশ কিছু দো‘আ সংযোজন করা হয়েছে যা তাওয়াফের সময় পড়তে পারেন।
  • তাওয়াফ করার সময় পুরুষ ও মহিলা একত্রিত হয়ে একই জায়গায় তাওয়াফ করতে হয়, তাই তাওয়াফ করার সময় বেগানা পুরুষ মহিলার গায়ের সাথে ধাক্কা লাগা বা স্পর্শ লাগতে পারে তাই আপনাকে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে এবং এ বিষয়গুলো সর্বাত্নক এড়িয়ে চলতে হবে। অবস্থা বুঝে একটু ভিড় এড়িয়ে তাওয়াফ করা উত্তম। কিছু লোক বা দল তাওয়াফের সময় একে অন্যের হাত ধরে ব্যারিকেড/বৃত্ত বানিয়ে সেই বৃত্তের মাঝে মহিলাদের নিরাপত্তা দেওয়ার চেষ্টা করেন যাতে তারা হারিয়ে না যান। এমন করা ঠিক নয় কারণ এতে অন্যদের তাওয়াফ ব্যাহত হয়। দলনেতা একটি ছোট পতাকা বা ছাতা নিয়ে সামনে থাকতে পারেন এবং অন্যরা তাকে অনুসরণ করতে পারেন অথবা একে অন্যের হাত ধরে ছোট ছোট দল করে তাওয়াফ করতে পারেন।

তাওয়াফরত অবস্থায় প্রতি চক্করে ইয়েমেনী কর্নারে পৌঁছানোর পর আপনি ডান হাত অথবা দুই হাত দিয়ে কা‘বার ইয়েমেনী কর্নার শুধু স্পর্শ করবেন (এমনটি করা সুন্নাত), তবে ভিড়ের কারণে এটা করা সম্ভব না হলে কোনো সমস্যা নেই। আপনি চক্কর চালিয়ে যাবেন। দূর থেকে হাত উঠিয়ে ইশারা করবেন না বা চুম্বন করবেন না কিংবা আল্লাহু আকবারও বলবেন না।

কাবা শরীফ পরিচিতি

  • প্রত্যেক চক্করে ইয়েমেনী কর্নার থেকে হাজারে আসওয়াদ কর্নার এর মাঝামাঝি স্থানে থাকাকালে এ দো‘আ পাঠ করা মুস্তাহাব ও সুন্নাত:

رَبَّنَا اٰتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَّفِي الْاٰخِرَةِ حَسَنَةً وَّقِنَا عَذَابَ النَّارِ

‘‘রাববানা আতিনা ফিদ্দুনইয়া হাসানাহ, ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাহ, ওয়াক্বিনা আযাবান নার’’।

‘‘হে আমাদের প্রতিপালক, আপনি আমাদের দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ

দান করুন এবং জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন”।

  • প্রথম এক চক্কর শেষ করে হাজরে আসওয়াদ কর্নার পৌঁছার পর আবার আগের মতো করে দূর থেকে ডান হাত উচু করে তাকবীর দিয়ে দ্বিতীয় চক্কর শুরু করবেন। এক্ষেত্রে শুধু মনে রাখবেন ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ না বলে শুধু বলবেন ‘আল্লাহু আকবার’। এমনটি পরবর্তী সকল চক্কর এর শুরুতে বলবেন।
  • উপরোক্ত নিয়মানুযায়ী সাত চক্কর শেষ করবেন। এভাবে আপনার তাওয়াফ সম্পন্ন করবেন। তাওয়াফ শেষে মাতাফ থেকে ধীরে ধীরে বের হয়ে কোনো ফাঁকা স্থানে অবস্থান গ্রহন করুন।

তাওয়াফ শেষ হওয়া মাত্রই পুরুষরা তাদের ডান কাঁধ ইহরামের কাপড় দিয়ে ঢেকে দেবেন। এবার আপনি ‘ইদতিবা‘’ থেকে মুক্ত হয়ে গেলেন।

সূরা আল-বাকারা: ২:২০১

তাওয়াফের সময় নিম্নোক্ত বিষয়গুলো স্মরণ রাখতে হবে

  • তাওয়াফের সময় যদি অযু ভেঙ্গে যায় তখন সম্ভব হলে মসজিদের ভেতরে দ্রুত অযু করে আবার তাওয়াফ শুরু করবেন। যেখানে শেষ করেছিলেন ঠিক সেখান থেকেই আবার শুরু করবেন। কিন্তু যদি বেশি সময় ক্ষেপন করে ফেলেন বা বাইরে অযু করতে যান তবে আবার পুনরায় নতুন করে তাওয়াফ শুরু করা উত্তম।
  • একবারেই তাওয়াফ শেষ করার চেষ্টা করবেন। খুব বেশি দরকার না হলে তাওয়াফের মাঝে থামা অথবা তাওয়াফের মাঝে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার চেষ্টা করবেন না। যদি বেশি সময় ক্ষেপন করে ফেলেন তবে আবার পুনরায় নতুন করে তাওয়াফ শুরু করবেন।
  • কয়টি চক্কর শেষ করেছেন, ৩টি না ৪টি! এ নিয়ে যদি মনে কোনো সন্দেহ দেখা দেয় তাহলে ৩টিকে সঠিক ধরে তাওয়াফ চালিয়ে যাবেন। ৭ চক্কর এর ১ চক্কর কম হলে তাওয়াফ সম্পূর্ণ হবে না।
  • মহিলাদের জন্য পরামর্শ হলো – আপনারা হাজরে আসওয়াদে চুমু খাওয়ার চেষ্টা করবেন না। মহিলারা পুরুষের মতো ইদতিবা‘ ও রমল করবেন না। বেগানা পুরুষদের থেকে সতর্ক থেকে ও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে তাওয়াফ করতে চেষ্টা করবেন।
  • তাওয়াফ করার সময় কোনো সালাতের আযান বা ইকামত হলে সঙ্গে সঙ্গে সতর (কাঁধ ও শরীর) ঢেকে নিয়ে সালাত পড়ে নিবেন এবং পরে যেখানে শেষ করেছিলেন সেখান থেকে আবার ইদতিবা‘ করে তাওয়াফ শুরু করবেন। বেশি সময় ক্ষেপন না করে জলদি তাওয়াফ শুরু করবেন।
  • মসজিদুল হারামের সীমানার ভিতরে থেকে কা‘বার চারপাশ দিয়ে তাওয়াফ করতে হবে। মসজিদের সীমানার বাইরে দিয়ে তাওয়াফ করলে তাওয়াফ হবে না। অসুস্থ্য বা চলতে অক্ষম লোকদের জন্য হুইল চেয়ার ভাড়া করে তাওয়াফ করার ব্যবস্থা করতে পারেন।
  • মনে রাখবেন, হজের সময় কা‘বার দেওয়ালে আম্বর ও সুগন্ধী দেওয়া হয়। সুতরাং কেউ কা‘বার দেওয়াল স্পর্শ বা জড়িয়ে ধরবেন না। কারণ এতে আপনার ইহরামের কাপড়ে সুগন্ধী লেগে যেতে পারে। মাক্বামে ইবরাহীম এর দেওয়ালও স্পর্শ বা জড়িয়ে ধরবেন না।
  • এটি একটি শোনা কথা যার সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয় নি; তা হলো- অনেকে বলেন তাওয়াফের সময় বা অন্য সময়ে অনেকের বেল্ট কেটে মোবাইল ও রিয়াল চুরি যায়। আবার তারা চুরির শিকার হয়েছেন তা দেখিয়ে লোকজনের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন। অনেকে বলছেন তাওয়াফের সময় আসলে কারো কিছু চুরি করার সাহস হওয়ার কথা নয়, এরা মানুষের কাছে সাহায্য পাওয়ার আশায় এ অসাধু পথ অবলম্বন করেন হাজীর বেশ ধরে। আবার অনেকে বলছেন, হতে পারে আসলেই কেউ চুরি করছে! এখন এ অবস্থায় আপনার আমার দায়িত্ব চোর ধরা বা সত্য উদঘাটন করা নয়; তবে কখনো চোখের সামনে অন্যায় বা চুরি দেখলে তার প্রতিবাদ তো করতেই হবে। আপনাকে বিষয়টি অবহিত করলাম শুধুমাত্র সতর্কতা অবলম্বন করার জন্য।

মাক্বামে ইবরাহীম ও যমযম কুপ ›

  • তাওয়াফ শেষে আপনি সম্ভব হলে মাক্বামে ইবরাহীমে পেছনে যেতে পারেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিম্নোক্ত আয়াত অনুযায়ী সেখানে সালাত আদায় করেছেন। আয়াতে এসেছে,

﴿وَٱتَّخِذُواْ مِن مَّقَامِ إِبۡرَٰهِ‍ۧمَ مُصَلّٗىۖ﴾ [البقرة: ١٢٥]

‘‘আর তোমরা ইবরাহীমের দণ্ডায়মানস্থানকে সালাত আদায়ের স্থান হিসেবে গ্রহণ করো”।

  • সম্ভব হলে মাক্বামে ইবরাহীমের পেছনে দাঁড়িয়ে অথবা ভিড়ের কারণে সম্ভব না হলে মসজিদুল হারামের যে কোনো স্থানে দুই রাকাত সালাত আদায় করুন। এ সালাতের প্রথম রাকাআতে সূরা-ফাতিহা ও সূরা-কাফিরুন এবং দ্বিতীয় রাকাআতে সূরা-ফাতিহা ও সূরা-ইখলাস পড়া সুন্নাত।
  • এই দুই রাকাত সালাত ওয়াজিব নাকি সুন্নাত তা নিয়ে আলেমগণের মাঝে মতভেদ রয়েছে। আরেকটি বিষয়, মাকরুহ সময় পরিহার করে এ সালাত আদায় করা উত্তম। এ সালাতের পর দুই হাত উঠিয়ে দো‘আ করার কোনো দলীল হাদীসে খুজে পাওয়া যায় না। এ সালাত তাওয়াফের কোনো অংশ নয় বরং এটি একটি আলাদা স্বতন্ত্র ইবাদত।

মসজিদুল হারামে সালাত পড়ার সময় খেয়াল রাখতে হবে, পুরুষ নারী পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বা পুরুষ সরাসরি নারীর পেছনে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় না করেন। এমন করা জায়েয নয়। অনেকেই এ বিষয়টি জানেন না বা খেয়াল করেন না, তবে সকলের এ বিষয়ে সচেতন থাকা উচিৎ।

সূরা আল-বাকারা: ২:১২৫ তিরমিযী, হাদীস নং ৮৬৯

মাক্বামে ইবরাহীম

  • এবার যমযম কুপের পানির টেপ অথবা কন্টেইনারের কাছে গিয়ে পেট ভরে পানি পান করুন এবং কিছু পানি মাথায় ঢালুন। এখানে এখন যমযমের পানি দাঁড়িয়ে পান করাই সুন্নাত বলে কোনো কোনো আলেম মত প্রকাশ করেছেন, কারণ এভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেছেন। অন্য আলেমগণ বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওযরের কারণে এখানে দাঁড়িয়ে যমযমের পানি পান করেছেন। কারণ, তিনি মানুষের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন, সেখানে বসার সুব্যবস্থা ছিল না।
  • যমযমের পানি কয়েক ঢোকে পান করা উত্তম। খুব ঠাণ্ডা পানি পান না করে নরমাল (Not cold) পানি পান করা উত্তম।
  • যমযমের পানি পবিত্র পানি। পৃথিবীর বুকে সর্বোত্তম পানি। এ পানি ক্ষুধা নিবারক ও রোগের শেফা করে।  
  • এবার সা‘ঈ করার জন্য সাফা পাহাড়ের দিকে রওয়ানা হোন।

তাওয়াফের ক্ষেত্রে প্রচলিত ভুলত্রুটি ও বিদ‘আত ›

  • অনেকে মনে করেন তাওয়াফের জন্য গোসল করা বাধ্যতামূলক।
  • মহিলাদের কোনো স্পর্শ যাতে না লাগে সেজন্য মোজা পরা বা একজাতীয় স্যান্ডেল পরা অথবা হাত আবৃত করা।
  • মসজিদুল হারামে প্রবেশ করে (তাওয়াফের বাধ্য-বাধকতা থাকার পরও) তাহিয়্যাতুল মসজিদ সালাত পড়া।
  • তাওয়াফের তাকবীরের সময় উভয় হাত উচু করা এবং বাজেভাবে শব্দ করে হাতে চুমু খাওয়ার শব্দ করা ও হাতে চুম্বন করা।
  • হাতিমের মধ্য দিয়ে তাওয়াফের চেষ্টা করা, হাতিম আসলে কা‘বারই অংশ।
  • ৭ চক্করের জন্য ৭ টি আলাদা আলাদা দো‘আ মুখস্ত করে পাঠ করা।
  • প্রচলিত যয়ীফ হাদীস; (আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক দিন ১২০টি রহমত নাযিল করেন। ৬০টি তাওয়াফকারীদের জন্য..)
  • ইয়েমেনী কর্নার স্পর্শ করার সময় কাপড়ের নিচের প্রান্তে স্পর্শ করা।
  • কালো পাথর স্পর্শ করার সময় বলা; (হে আল্লাহ আপনার প্রতি বিশ্বাস থেকে এবং আপনার গ্রন্থের সত্যায়ন থেকে..)
  • কালো পাথর স্পর্শ করার সময় বলা; (হে আল্লাহ আমি আপনার থেকে গর্ব ও দারিদ্র এবং দুনিয়া ও আখিরাতের অমর্যাদা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।)
  • তাওয়াফ করার সময় বাম হাতের উপর ডান হাত রাখা।
  • কা‘বার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলা; (হে আল্লাহ, এ ঘর আপনার ঘর এবং এ পবিত্র এলাকা আপনার, এর নিরাপত্তার দায়িত্বও আপনার..) এবং এরপর মাক্বামে ইবরাহীমে দিকে নির্দেশ করে বলা; (এটা তার স্থান যিনি জাহান্নামের আগুন থেকে আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে।)
  • রমল করার সময় এ দো‘আ পাঠ করা বাধ্যতামূলক মনে করা; (হে আল্লাহ একে আপনি কবুল হজ হিসেবে গ্রহণ করুন, সকল গুনাহ মাফ করে দিন।)
  • ক্যামেরা হাতে নিয়ে তাওয়াফ করা ও ভিডিও করা। তবে ট্যাব হাতে নিয়ে কুরআন পড়লে আপত্তি নেই।
  • শেষের চার তাওয়াফের সময় এ দো‘আ পাঠ করা আবশ্যক মনে করা; (হে আল্লাহ আপনি আমাকে ক্ষমা ও দয়া করুন, ক্ষমা করুন যা আপনি জানেন।)
  • শামি কর্নারে ও ইরাকী কর্নারে চুম্বন করা বা হাত দিয়ে স্পর্শ করা।
  • কা‘বা শরীফ ও মাক্বামে ইবরাহীমের দেওয়াল জামা-কাপড় দিয়ে মোছা বা হাত বুলানো ফযীলত ও বরকতের আশায়।
  • দয়ীফ হাদীস; (নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা ও ফেরেশতাগন তাওয়াফকারীদের অভিনন্দন জানান।)
  • বৃষ্টির মধ্যে এ উদ্দেশ্য তাওয়াফ করা যে সকল গুনাহ ধুয়ে হয়ে যাবে।
  • অপরিষ্কার কাপড় বলে তাওয়াফ থেকে বিরত থাকা এবং যমযমের পানি দিয়ে গোসল করা পাপ মোচনের আশায় অথবা কবরের আযাব থেকে বাঁচার প্রত্যাশায় ইহরামের কাপড় ধোয়া।
  • যমযমের পানি পান করার পর অবশিষ্ট পানি আবার যমযম কুপে ফেলে বলা; (হে আল্লাহ আমি আপনার কাছে ভরণপোষণের পর্যাপ্ত যোগান, দরকারি জ্ঞান এবং সকল ধরনের রোগ থেকে উপশম কামনা করছি।)
  • আর্শীবাদ পাওয়ার আশায় যমযমের পানিতে দাড়ি, কাপড় ও টাকা ভিজানো।
  • অনেক ঢোকে যমযমের পানি পান করা এবং প্রতি ঢোকের সময় কা‘বার দিকে তাকানো।

সাঈ-র তাৎপর্য

  • সা‘ঈ অর্থ; সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে হাঁটা বা দৌড়ানো।
  • কা‘বা শরীফের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে সাফা পাহাড় এবং পূর্ব-উত্তর দিকে মারওয়া পাহাড় অবস্থিত। এ দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী সা‘ঈ করার স্থানকে মাস‘আ বলা হয়। মাস‘আর স্থানটুকু মার্বেল পাথর দ্বারা আবৃত আছে। মাস‘আ দৈর্ঘ্যে ৩৯৪.৫মি. ও প্রস্থে ২০মি.। দুই পাহাড়ের উপর গম্বুজ নির্মিত আছে।
  • বেজমেন্ট/প্রথম তলা/দ্বিতীয় তলা/ছাদের উপরও প্রয়োজনে সা‘ঈ করা যায়। তবে সাফা মারওয়ার মাস‘আ এলাকার বাইরে দিয়ে সা‘ঈ করা যাবে না।
  • প্রাচীন সাফা ও মারওয়া পাহাড় কাঁচের ঘেরা দিয়ে সংরক্ষিত আছে। সা‘ঈ করার সময় সাফা ও মারওয়ায় পৌঁছে এ পাহাড় দেখা যায়।
  • সাফা পাহাড় থেকে শুরু করে মারওয়া পাহাড়ে হাঁটা শেষ হলে এক চক্কর গণনা করা হয়। আবার মারওয়া পাহাড় থেকে সাফা পাহাড় হাঁটা শেষ হলে দুই চক্কর গণনা করা হয়। সা‘ঈ সম্পন্ন করার জন্য এভাবে সাত চক্কর হাঁটতে হবে। (অর্থাৎ সপ্তম চক্কর শেষ হবে মারওয়া পাহাড়ে)
  • হাজের আলাইহাস সালাম ও ইসমাঈল আলাইহিস সালামের ইসলামি ইতিহাসের স্মরণে সা‘ঈ করা। যা আল্লাহ তা‘আলার প্রতি সংগ্রাম, ধৈর্য, আস্থা ও বিশ্বাসের সাদৃশ্য ঘটায়।
  • পায়ে হেঁটে অথবা হুইল চেয়ারে করে সা‘ঈ করা যাবে। হুইল চেয়ারে সা‘ঈ করার জন্য মাঝখানে একটি রাস্তা নির্ধারণ করা আছে। সা‘ঈ করার সময় অযু করা বাধ্যতামূলক নয়, তবে মুস্তাহাব। সা‘ঈ করার মধ্যবর্তী স্থানে একটি সবুজ আলো চিহ্নিত স্থা্ন আছে যেখান দিয়ে শুধু পুরুষদের দ্রুত হাঁটতে হয়।
  • তাওয়াফের পরপরই সা‘ঈ করতে হবে। তাওয়াফের আগে সা‘ঈ করা যাবে না। পায়ে হেঁটে অথবা হুইল চেয়ারে সা‘ঈ সম্পন্ন করা যাবে।
  • সা‘ঈ করার সময় সাফা থেকে মারওয়া পাহাড়ে গিয়ে অথবা মারওয়া থেকে সাফা পাহাড়ে গিয়ে কিছুটা বিশ্রাম করা অনুমোদিত, এমনকি সেটা যদি সা‘ঈ করার মধ্যবর্তী অবস্থায়ও হয়।
  • ঋতুবতী মহিলারা সা‘ঈ করতে পারবেন, কারণ সা‘ঈ এলাকা মসজিদুল হারামের কোনো অংশ নয়। তবে মসজিদুল হারামের সীমানার ভিতরে প্রবেশ করা যাবে না। সা‘ঈ করা উমরাহর একটি ফরয কাজ।
কাজহতেপর্যন্তপ্রতি আবর্তন ও সর্বমোট দূরত্ব (আনুমানিক)
সাঈসাফা পাহাড়মারওয়া পাহাড়০.৪৫ কি.মি ও ৩.১৫ কি.মি

সা‘ঈ-এর পদ্ধতি ›

  • সা‘ঈ করতে যাচ্ছেন এ মর্মে মনে মনে নিয়ত বা ইচ্ছা পোষণ করুন। সা‘ঈ করতে যাবার পূর্বে হাজরে আসওয়াদ পাথর ‘ইস্তিলাম’ (চুম্বন-স্পর্শ) করা উত্তম; তবে ভিড়ের কারণে সম্ভব না হলে কোনো সমস্যা নেই, সরাসরি সাফা পাহাড়ের দিকে রওয়ানা হয়ে পড়ুন। তবে এ সময় হাজরে আসওয়াদ পাথরের দিকে হাত তুলে ইশারা করা বা তাকবীর বলার কোনো বিধান নেই।
  • সাফা পাহাড়ে যতটুকু সম্ভব উঠে বা কাছাকাছি পৌছে এ দো‘আটি শুধুমাত্র এখন একবারই পড়ুন:

إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَآئِرِاللهِ (أَبْدَأُ بِمَا بَدَأَ اللهُ بِهِ)

‘‘ইন্নাস সাফা ওয়াল মারওয়াতা মিন শা‘আয়িরিল্লাহ, আবদাউ বিমা বাদাআল্লাহু বিহি’’।

‘‘নিশ্চয় সাফা ও মারওয়াহ আল্লাহর নিদর্শন সমূহে‎র অন্যতম।

আমি আরম্ভ করছি যেভাবে আল্লাহ আরম্ভ করেছেন’’।

  • এবার কা‘বা শরীফের দিকে মুখ করে কা‘বার দিকে দুই হাত উঠিয়ে এ দো‘আটি তিনবার পাঠ করুন:

اَللهُ أَكْبَرُ  اَللهُ أَكْبَرُ  اَللهُ أَكْبَرُ

لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ – لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ يُحْيِي وَيُمِيْتُ وَهُوَ عَلٰى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ –

 لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَـهُ أَنْجَزَ وَعْدَهُ – 

وَنَصَرَ عَبْدَهُ  وَهَزَمَ الأَحْزَابَ وَحْدَهُ

‘‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার।

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওআহদাহু লা শারিকালাহ, লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদ্, ইয়ুহয়ী ওয়া ইয়ুমিতু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শায়য়িন ক্বদীর।

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওআহদাহু লা শারিকালাহু, আনজাযা ওয়া‘দাহু ওয়ানাসারা আবদাহু ওয়া হাযামাল আহযাবা ওয়াহদাহু’’।

‘‘আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান। 

আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি মহান। তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই। সকল সার্বভৌমত্ব ও প্রশংসা একমাত্র তাঁরই।

তিনিই জীবন দান করেন, তিনিই মৃত্যু দেন। তিনি সর্বশক্তিমান।

আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তাঁর কোনো শরিক নেই।

তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন এবং তাঁর বান্দাদের সাহায্য করেছেন এবং দুষ্কর্মের সহযোগীদের পরাস্ত করেছেন”।

  • পদ্ধতি এমন হবে যে, উক্ত দো‘আটি প্রথমে একবার পাঠ করে তারপর আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যান্য দো‘আ পড়বেন। ফের উক্ত দো‘আটি পড়ে আবার সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যান্য দো‘আ পড়বেন। শেষ আর একবার এমনভাবে দো‘আ পড়বেন। অর্থাৎ তিন বার এভাবে করবেন।
  • দো‘আ শেষ করে মারওয়া পাহাড়ের দিকে চলতে শুরু করুন। এখানে কা‘বাকে উদ্দেশ্য করে হাতের উঠানো বা তাকবীর বলা কিংবা তালুতে চুম্বন করার কোনো নিয়ম নেই।

সূরা আল-বাকারা: ২:১৫৮ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২১৩৭ আবু দাউদ, হাদীস নং ১৯০৫, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২/২২২ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২১৩৭

  • সাফা থেকে মারওয়া পায়ে হেঁটে অথবা হুইল চেয়ারে করে যেতে পারেন। সা‘ঈ করার সময় তাওয়াফের মতো দো‘আ করতে পারেন। আপনি ইচ্ছে করলে কুরআন তিলাওয়াত, দো‘আ, যিকির, ইসতিগফার করতে পারেন আপনার নিজের ইচ্ছা মত। আওয়াজ করে, জোরে শব্দ করে বা দলবদ্ধ হয়ে কোনো দো‘আ পাঠ করার বিধান নেই। অথচ লক্ষ্য করে দেখবেন এখানে অনেকেই এ ভুল কাজটি করছেন।
  • সাফা পাহাড় থেকে কিছু দূর এগুলেই উপরে ও ডানে-বামে সবুজ আলোর বাতি দেখবেন। এ সবুজ আলোর জায়গাটুকুতে শুধু পুরুষরা আস্তে আস্তে জগিং করার মতো দৌঁড়াবেন (রমল এর মতো)। সবুজ আলো অতিক্রম করার পর আবার স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারেন। সা‘ঈ করার সময় যতবারই এ সবুজ আলোর জায়গার মধ্য দিয়ে যাবেন ততবারই জগিং করার মতো দৌড়াবেন। কিন্তু মহিলারা এখানে দৌড়াবেন না, স্বাভাবিকভাবেই হাঁটবেন।
  • সবুজ আলোর জায়গাটুকুতে দৌড়ানোর সময় এ দো‘আটি পড়ুন:

«رَبِّ اغْفِرْ وَارْحَمْ، إِنَّكَ أَنْتَ الْأَعَزُّ الْأَكْرَمُ»

‘‘রাবিবগফির ওয়ারহাম ইন্নাকা আনতাল আ‘আযযুল আকরাম’’

‘‘হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন রহম করুন। নিশ্চয় আপনি সমধিক শক্তিশালী ও সম্মানিত।’’

  • সাফা থেকে হেঁটে মারওয়া পাহাড় এসে পৌছলে ১ চক্কর সম্পন্ন হল। মারওয়া পাহাড়ে উঠে বা যতটুকু সম্ভব মারওয়া পাহাড়ের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর আবার কা‘বার দিকে মুখ করে দুই হাত উঠিয়ে উপরোক্ত বড় দো‘আটি আবার ৩বার পড়ুন; ঠিক একই পদ্ধতিতে যেমন সাফা পাহাড়ে করেছিলেন। এবার পুনরায় মারওয়া থেকে সাফার দিকে হাঁটা শুরু করুন এবং মাঝখানে সবুজ জায়গাটুকুতে দৌড়ে পার হোন। মারওয়া থেকে হেঁটে সাফা পাহাড়ে পৌঁছলে ২ চক্কর সম্পন্ন হল। এভাবে আরও ৫ চক্কর সম্পন্ন করার পর (২+৫=৭ চক্কর) মারওয়া পাহাড়ে এসে সা‘ঈ শেষ করবেন।
  • সাঈ করার সময় কোনো সালাতের ইকামত হলে সঙ্গে সঙ্গে সালাত আদায় করে নিবেন এবং যেখানে শেষ করেছিলেন সেখান থেকে ফের শুরু করবেন।
  • সা‘ঈ করার সময় এদিক ওদিক তাকানো ও ঘুরাঘুরি না করে একাগ্রচিত্তে বিনয়ের সাথে সা‘ঈ করাই উত্তম। খুব বেশি প্রয়োজন ব্যাতিরেকে সা‘ঈ করার সময় কথা না বলাই শ্রেয়। এ বইয়ের শেষে কুরআন ও হাদীস থেকে বেশ কিছু দো‘আ সংযোজন করা হয়েছে যা সা‘ঈ করার সময় পড়তে পারেন।
  • সা‘ঈ করার সময় দলবদ্ধ হয়ে সা‘ঈ করা সহজ। কারণ বেজমেন্ট/প্রথম তলা/দ্বিতীয় তলা/ছাদের উপরও প্রয়োজনে সা‘ঈ করা যায়, তাই সা‘ঈ করার সময় লোকের ভিড় ও চাপ তাওয়াফের তুলনায় কিছুটা কম হয়।

কসর/হলক্ব ›

  • সাঈ শেষ করে মসজিদুল হারাম থেকে বের হওয়ার সময় বাম পা আগে দিয়ে বের হউন এবং নিম্নোক্ত দো‘আ পাঠ করুন:

«اَللهم إِنِّيْ أَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ»

‘‘আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা মিন ফাদলিক’’।

‘‘হে আল্লাহ! আমি আপনার অনুগ্রহ প্রার্থনা করছি’’।

  • সাঈ শেষ করার পর মাথার সব অংশ থেকে সমানভাবে চুল ছেঁটে (কসর) কাটতে হবে। তবে এক্ষেত্রে মাথা মুড়ানোই (হালক্ব) উত্তম কাজ।
  • মহিলারা এক আঙ্গুলের এক-তৃতীয়াংশ (প্রায় এক ইঞ্চি) পরিমাণ চুল কেটে ফেলবেন। মহিলাদের মাথা মুড়ানোর (হালক্ব) কোনো বিধান নেই।
  • উমরাহর সময় কসর/হলক্ব করা ওয়াজিব।
  • মসজিদুল হারামের বাইরে মারওয়া পাহাড়ের পাশে অনেক চুল কাটার সেলুন পাওয়া যাবে।
  • নাপিতকে ডান দিক দিয়ে চুল কাটা শুরু করতে বলুন। মহিলারা বাসায়  একে অপরের অথবা মহিলাদের পার্লারে গিয়ে চুল কাটাবেন।
  • এবার ইহরামের কাপড় খুলে ফেলবেন ও গোসল করে নিবেন। আপনার ইহরামের সকল নিষেধাজ্ঞা শেষ হলো। আপনার উমরাহও সম্পন্ন হলো। এখন আপনি সাধারণ পোশাক পরতে পারেন।
  • আল্লাহ তা‘আলা যে আপনাকে উমরাহ সম্পন্ন করার তৌফিক দান করেছেন সে জন্য তার দরবারে কৃতজ্ঞতা জানান।

সাঈ-এর ক্ষেত্রে প্রচলিত ভুলত্রুটি ও বিদ‘আত ›

  • প্রতি কদমে ৭০ হাজার সওয়াব লেখা হবে এ আশায় অযু করে সাফা ও মারওয়ার মাঝে সা‘ঈ শুরু করা।
  • সাফা/মারওয়ার দেওয়ালের কাছে পৌঁছানোর আগেই ঘুরে চলে যাওয়া।
  • সাফা থেকে নামার সময় এ দো‘আ করা; (হে আল্লাহ আপনি আমার কর্মকাণ্ড রাসূলের সুন্নাত সমর্থিত করে দিন ও দীনের ওপর রেখেই মৃত্যু দিন।)
  • সাঈ করার সময় বলা; (হে আল্লাহ আপনি আমাকে ক্ষমা করুন এবং দয়া করুন এবং আমার যেসব বিষয় আপনি জানেন তা গোপন করুন।)
  • ১৪ বার চক্কর দিয়ে সা‘ঈ শেষ করা।
  • সা‘ঈ শেষ করে দুই রাকাত সালাত আদায় করা।
  • সালাতের ইকামাত হওয়ার পরও সাফা মারওয়ার মাঝে সা‘ঈ চলমান রাখা।
  • দলের সামনে দলনেতা কর্তৃক দো‘আ উচ্চস্বরে উচ্চারণ করা এবং সে অনুসারে দলের সবাই মিলে সমবেত কণ্ঠে সেই দো‘আ পাঠ করা।
  • সা‘ঈ শেষ করার পর হালাল না হয়েই একে অন্যের চুল অথবা নিজেই কাচি দিয়ে মাথার বিভিন্ন অংশ থেকে চুল কেটে বক্সে সংরক্ষণ করে রাখা।
  • একটি সতর্কতা: তাওয়াফ বা সা‘ঈ করার সময় হুইল চেয়ার থেকে সতর্ক থাকবেন কারণ অনেকে জোরে হুইল চেয়ার চালিয়ে এসে পায়ের পিছনে ঠোকা লাগিয়ে দেন ফলে পা কেটে রক্তপাত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

উমরাহর পর যা করতে পারেন ›

  • উমরাহ সম্পন্ন করার পর আপনি যতো বেশি পারেন মসজিদুল হারামে ফরয, সুন্নাত, নফল, জানাযা, চাশত, তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করুন এবং নফল তাওয়াফ করুন। নফল তাওয়াফ করার নেকী অনেক অনেক বেশি।
  • উমরাহ সম্পন্ন করার পর থেকে হজ এর পূর্ব পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো কর্মকাণ্ড নেই। আপনি যদি হজ এর পূর্বে বেশ কিছু দিন অবসর সময় পেয়ে যান তবে আপনি কিছু ইসলামিক ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখে আসতে পারেন। আপনি এ সময়ে কিছু কেনাকাটাও করতে পারেন।

আপনার হজ এজেন্সি একদিন বাস ভাড়া করে কিছু ইসলামিক ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখিয়ে নিয়ে আসতে পারেন অথবা আপনি নিজে ঘুরে দেখে আসতে পারেন। এক্ষেত্রে দলবদ্ধ হয়ে ঘুরতে যাওয়া ভালো। মহিলারা মাহরাম ছাড়া বাইরে কোথাও একাকী কেনাকাটা বা ঘুরাঘুরি করতে যাবেন না।

হজ সফরে একাধিক উমরাহ ›

  • এটি একটি বিতর্কিত বিষয় এখনকার যুগে। আপনি দেখবেন অনেকে উমরাহ সম্পন্ন করার পর বাবা, মা, দাদা, দাদী, নানা, নাতি, ছেলে, মেয়ের নামে একাধিক উমরাহ করছেন, আবার কেউ কেউ একই দিনে দুই/তিনটি করে উমরাহ করছেন। উমরাহ নিঃসন্দেহে একটি নেকীর ইবাদত কিন্তু এমনভাবে গণহারে উমরাহ যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবীগণের যামানায় যদি কেউ করে থাকেন তবে আপনিও নিঃসন্দেহে করতে পারেন।
  • কিন্তু কুরআন ও হাদীসে এক সফরে একাধিক উমরাহ করার কোনো কথা খুজে পাওয়া যায় না। বরং তামাত্তু হজকারীদেরকে উমরাহ আদায়ের পর হালাল অবস্থায় থাকতে বলা হয়েছে হজ শুরুর পূর্ব পর্যন্ত। তাই উচিৎ হবে এক সফরে একাধিক উমরাহ না করা। বরং বেশি বেশি তাওয়াফ করাই উত্তম। দেখা গেছে এমন একাধিক উমরাহ পালন করতে গিয়ে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন হজের পূর্বে। তখন হজ সম্পাদন করাটাই কষ্টকর হয়ে যায়।
  • সাহাবায়ে কেরামের উমরাহ আদায়ের পদ্ধতি থেকে অবশ্য হজের সময় ব্যতীত অন্য সময়ে বছরে একাধিকবার উমরাহ করার বৈধতা প্রমাণিত হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনে ৪ বার উমরাহ পালন করেছেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বছরে ৩ টি পর্যন্ত উমরাহ করেছেন। এ বিষয়গুলো হাদীস থেকে জানা যায়।
  • এক হাদীসে এসেছে, ‘‘তোমরা বার বার হজ ও উমরাহ আদায় করো। কেননা এ দুটি দারিদ্রতা ও গুনাহ বিমোচন করে দেয়।’’ সাহাবায়ে কেরামের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এক উমরাহ আদায়ের পর তাদের মাথার চুল কালো হয়ে যাওয়ার পর আবার উমরাহ করতেন, তার আগে করতেন না।

অপর এক হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাˆ হজের পর উমরাহ আদায় করেছিলেন কারণ তিনি হায়েয অবস্থায় ছিলেন হজের পূর্বে। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে হজের পর উমরাহ করার অনুমতি দেন, এ থেকে বুঝা যায় কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে হজের পর উমরাহ পালন করা যায়।

মসজিদুল হারাম সম্পর্কিত কিছু তথ্য ›

  • সম্পূর্ণ মসজিদে এসি নেই। কিছু কিছু জায়গা ও বেজমেন্টে এসি রয়েছে।
  • মসজিদের ভেতরে কিছু জায়গা মহিলাদের সালাতের জন্য নির্দিষ্ট করা আছে, কিন্তু অনেকসময় দেখা যায় জায়গা সংকুলান না হওয়ার কারণে মহিলারা পুরুষের সালাতের স্থানে দাঁড়িয়ে যান।
  • মারওয়া গেট থেকে উমরাহ গেট পর্যন্ত মূল মসজিদুল হারামের সম্প্রসারণ ও অপর মসজিদ বিল্ডিং সংযোজন এর কাজ চলছে।
  • মসজিদের ভেতরে সবসময়ই রক্ষণাবেক্ষণ কাজ করা হয়।
  • আপনি যতবারই মসজিদুল হারামে যাবেন ততবারই কিছু না কিছু অবকাঠামো উন্নয়ন ও পরিবর্তনের কাজ লক্ষ্য করবেন।
  • দিনের বেলা মক্কার আবহাওয়া একটু বেশি উত্তপ্ত আবার রাতের বেলায় হালকা ঠান্ডা পড়ে।
  • মসজিদুল হারামের আশেপাশে বই বিতরণের কিছু ছোট ছোট বুথ আছে যেখান থেকে প্রায়ই বিনামূল্যে বই বিতরণ করা হয়।
  • মসজিদুল হারামের ভিতরে প্রবেশের জন্য ৯০টিরও অধিক গেট রয়েছে। মসজিদের দুই তলায় আরোহনের জন্য সিড়িঁ ও এস্কেলেটরের ব্যবস্থা আছে। কিছু জায়গায় লিফটের ব্যবস্থাও আছে।
  • মসজিদের ভেতরে ও বাইরে পান করার জন্য যমযমের পানি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত এবং মক্কা লাইব্রেরির পাশ থেকে বড় বড় বোতলে কুপের পানি নিয়ে আসা যায়।
  • মসজিদের ভেতরে অসংখ্য বুকশেলফ রয়েছে, সেখান থেকে ইচ্ছে করলে কুরআন শরীফ (নীল রংয়ের) নিয়ে তেলাওয়াত করতে পারবেন।
  • মসজিদুল হারামের বড় বড় গেট দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করার সময় খেয়াল রাখবেন গেটের উপরে সবুজ আলো জ্বলছে কি না। যা প্রবেশ করা যাবে কি যাবে না; তা নির্দেশ করে।
  • টয়লেট ও অযু করার ব্যবস্থা মসজিদের বাইরে। মসজিদের ভেতরে অযু করার ব্যবস্থা থাকলেও সংখ্যায় কম।
  • সাফা ও মারওয়ার পাশে ওয়াশরুমের ছাদের উপর হারানো ও পাওয়া জিনিসের খোঁজ নেওয়ার অফিস আছে।
  • মসজিদের আশেপাশে হাদী/ফিদইয়া টিকিট ক্রয়ের জন্য কিছু ব্যাংকের বুথ পাবেন। হাদীর টিকিট কিনার ইচ্ছা থাকলে আগেভাগে কিনে ফেলুন।
  • মসজিদের বাইরে মূল গেটগুলোর পাশে কিছু লাগেজ লকার পাবেন।
  • সাফা মারওয়ার পাশে শিয়াব বনি হাশিম রোডে লাশ পরিবহনের অ্যাম্বুলেন্স অপেক্ষমান থাকে। জানাযার পর এখান দিয়ে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়।
  • তাওয়াফ ও সা‘ঈ করার জন্য মসজিদের ভেতরে বিনামূল্যে ও ভাড়াভিত্তিক হুইল চেয়ার পাওয়া যায়।
  • মসজিদের প্রতি গেটে নিরাপত্তাকর্মী থাকেন ও সন্দেহজনক ব্যাগ চেক করেন। তারা সাধারণত বড় ব্যাগ নিয়ে মসজিদে প্রবেশ করতে দেন না।
  • মসজিদের ভেতরে সবসময় নীল/সবুজ পোশাক পরিহিত পচ্ছিন্নতাকর্মীরা কাজ করেন; তাদের অধিকাংশই বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের নাগরিক।
  • মসজিদের কিছু অংশের মেঝে কার্পেট দিয়ে আবৃত থাকে। অধিকাংশই থাকে উন্মুক্ত। হজের সময় কাছাকাছি হলে সব কার্পেট তুলে রাখা হয়।
  • প্রায় প্রত্যেক ফরয সালাতের পর জানাযার সালাত হয়। তাই হুট করে সুন্নাত সালাতে না দাঁড়িয়ে জানাযার সালাত পড়ুন।
  • মসজিদ প্রসস্থকরনের কাজের জন্য অস্থায়ীভাবে তাওয়াফের জায়গার উপর একটি ব্রীজ নির্মাণ করা হয়েছে তাওয়াফকারীদের জন্য।
  • মসজিদুল হারাম সম্পর্কে আরও ধারণা নিতে সৌদি আরবের টিভি চ্যানেল দেখতে পারেন, সেখানে ২৪ ঘণ্টাই কা‘বা থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। এ চ্যানেলের জন্য আপনার ক্যাবল অপারেটরের সাথে যোগাযোগ করুন।

মসজিদুল হারামের প্রচলিত অনিয়ম, ভুলত্রুটি ও বিদ‘আত ›

  • মসজিদের ভেতরে নারী-পুরুষ পাশাপাশি বসেন, সালাত পড়েন। অনেক পুরুষ তার স্ত্রীর হাত ধরে, কাঁধে হাত দিয়ে মসজিদের বাইরে এমনভাবে ঘুরে বেড়ান যেন তারা অবকাশ যাপনে এসেছেন!
  • মসজিদের ভেতরে খোলা পরিবেশে নারী ও পুরুষেরা ঘুমান এবং ঘুমের সময় তাদের পর্দার ব্যাপারে খেয়াল থাকে না।
  • অনেকে মসজিদের ভেতরে গভীর ঘুমের পর অযু ছাড়াই সালাতের জন্য দাঁড়িয়ে যান।
  • মসজিদের প্রবেশদ্বারের ভেতরে ঢ়ুকে দরজার সামনেই কিছু মহিলা বসে পড়েন, এতে অনেক মানুষ সেই স্থানের দরজা দিয়ে বের হতে সমস্যায় পড়েন। হজযাত্রীদের ভিড় সামলানোর জন্য মাসজিদুল হারামের ব্যবস্থাপনা ভালো হওয়া সত্ত্বেও তাদের হিমশিম খেতে হয়।
  • জুতা ও স্যান্ডেল রাখার পর্যাপ্ত শেলফ থাকা সত্ত্বেও অনেকে মসজিদের ভেতরে যত্রতত্র জুতা-স্যান্ডেল ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখেন।
  • অনেকেই জানেন না মসজিদে নারী পুরুষ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কিংবা মহিলার সরাসরি পেছনে পুরুষের দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করা ঠিক নয়।
  • অনেক নারী-পুরুষই ভালোভাবে কাতারবদ্ধ হয়ে দাঁড়ান না এবং ভালোভাবে কাতার সোজা করেন না ও সামনের কাতার আগে পূরন করেন না।
  • সালাতের সময় পুরুষদের কাপড় টাখনুর নিচে থাকে, সতর খোলা থাকে এবং মহিলাদের পা, মাথা অনাবৃত থাকে।
  • অনেক বৃদ্ধ মহিলা ও পুরুষের এস্কেলেটরে চড়ার অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে পড়ে গিয়ে নিজেরা আহত হন এবং অন্যকে আহত করেন।
  • অনেকে সঠিকভাবে অযু করতেও জানেন না। অনেকে অযু করার পরও ইহরাম অবস্থায় তাদের হাঁটু বের করে রাখেন।
  • অনেকে ইহরাম অবস্থায় মসজিদুল হারামের বাইরের চত্তরে ধুমপান করেন।
  • সালাত শেষ করে অনেকে মসজিদের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন, এর ফলে অনেক মুসল্লি বের হতে পারেন না।
  • অনেকে তাওয়াফের মাতাফ এলাকায় সালাতের জন্য দাঁড়িয়ে পড়েন ও তাওয়াফকারীদের তাওয়াফে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন।
  • অনেকে যমযমের পানি পান করার স্থানে যমযমের পানি দিয়ে অযু করেন।
  • অনেকে আবার সা‘ঈ এলাকার মধ্যেও জুতা পরে হাঁটেন।
  • অনেকে মসজিদের ভেতরে খাওয়া-দাওয়া করে অপরিস্কার করে ফেলে।
  • তাওয়াফ ও সা‘ঈ করার সময় নারী-পুরুষ একত্রে সমবেত কণ্ঠে উচ্চস্বরে তালবিয়াহ ও দো‘আ পাঠ করেন।
  • অনেক মহিলাই সঠিকভাবে হিজাব পরতে জানেন না। অনেকে আবার আকর্ষণীয় হিজাব পরেন। অনেক মহিলাই মাথা ও পা খোলা রাখেন।
  • মসজিদে যমযমের নরমাল পানি (Not cold) ঠান্ডা পানির চেয়ে সংখ্যায় অপ্রতুল। অনেকে পানি পান করার সময় পানি নষ্ট করেন।
  • মসজিদের ভেতরে অনেকে জুতা ও ব্যাগ অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রাখেন এবং পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা এসে সেসব জুতা ও ব্যাগ ভিজিয়ে ফেলেন।
  • তাওয়াফের সময় হাজরে আসওয়াদে চুমু খাওয়ার জন্য অনেকে ধাক্কাধাক্কি, বলপ্রয়োগ ও বৈরি আচরণ করেন।
  • অনেক মহিলা আবেগের তাড়নায় পুরুষদের মাঝেই হাজরে আসওয়াদ চুমু খাওয়ার চেষ্টা করেন।
  • অনেকে আবার কা‘বার দেওয়াল ও গিলাফ জড়িয়ে ধরে বিলাপ কান্নাকাটি করেন। তবে মুলতাযাম এ গিয়ে দো‘আ করা জায়েয আছে।
  • অনেকে কা‘বা ও মাক্বামে ইবরাহীমের দেওয়াল স্পর্শ করেন, চুমু খান এবং পরিধানের কাপড়, রুমাল ও টুপি ঘষতে থাকেন।
  • অনেকে আবার সা‘ঈ করার সময় সিসিটিভি ক্যামেরার উদ্দেশ্যে হাই… হ্যালো.. বলেন ও গল্পগুজব করেন।
  • সা‘ঈ করার সময় অনেকে সাফা-মারওয়ার দিকে হাত উচু করে দো‘আ করেন।
  • সালাত শেষ হওয়ার পরপরই অনেকে মসজিদ থেকে বের হওয়ার জন্য তাড়াহুড়া শুরু করেন, ঠিক একই সময়ে বাইরে থেকে অনেকে ভিতরে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এতে করে মারাত্নক অরাজকতা ও চাপ সৃষ্টি হয়।
  • মসজিদের বাইরে বোরখা পরা মহিলা ও ছোট মেয়েরা হাত কাটা ভাব দেখিয়ে অসাধু উপায়ে সাহায্য প্রার্থনা করে।
  • অনেকে শপিং মলে ঘুরাঘুরি, কেনাকাটা ও ফুড কোর্ট এ খাওয়া দাওয়া করে সময় অপচয় করেন যা ইবাদতের মনোযোগ ও একাগ্রতা নষ্ট করে।
  • অনেককে দেখবেন টানা নফল সালাত আদায় করে যাচ্ছেন, কারণ তার সারা জীবনে যা সালাত কাজা করেছেন তা তুলে ফেলছেন এখানে এবং সাথে সাথে আগামীতে যদি সালাত কাজা হয়ে যায় তাও তুলে ফেলছেন আগেভাগে!
  • অনেকের মাঝে এমন ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, কা‘বার ঘরের দিকে পিছন দিক ফিরে বসা ও পিছন ফিরে কুরআন তিলাওয়াত করা যাবে না আবার কা‘বার ঘরের দিকে পা দিয়ে বসা ও ঘুমানো যাবে না।

মসজিদের ভেতরে অনেক লোককে দেখবেন সালাতের সময় আপনার সামনে দিয়ে আসা-যাওয়া করছেন। সাধারণত অন্যান্য মসজিদে এধরনের দৃশ্য দেখা যায় না। আশা করি আপনি এ সম্পর্কিত চল্লিশ দিন/মাস/বছরের একটি সহীহ হাদীস শুনে থাকবেন। কিন্তু অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীর জন্য এ বিষয়টিকে শিথিল করে দেখার বিষয়ের হাদীসটি নিয়ে আলেমগণের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। তাই এক্ষেত্রে আমার পরামর্শ হলো – আপনি সতর্ক থাকুন ও সাবধাণতা অবলম্বন করুন। যখন দেখবেন কেউ সালাত পড়ছেন তখন আপনি যাওয়া-আসার জন্য যতটা সম্ভব বিকল্প পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন। তবে কোনো পথ খুঁজে না পেলে এবং যাওয়া-আসা করা যদি অপরিহার্য হয় তাহলে হেঁটে চলে যান। তবে উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটাহাটি করবেন না। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সঠিক জ্ঞান দান করুন ও ক্ষমা করুন। আমিন।

মক্কায় কেনা-কাটা ›

  • অতিরিক্ত টাকা নিয়ে হজে যাবেন না বা সেখানে গিয়ে বেশি কেনা-কাটা করবেন না। যদি পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের জন্য কোনো ছোট উপহার বা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে চান তাহলে তা হজের আগেভাগেই কিনে ফেলবেন। কেননা, হজের সময় যত কাছাকাছি হয় জিনিসপত্রের দাম ততো বেড়ে যায়। হজেরপরেও কিছু দিন দাম বাড়তি যায়, তারপর কমে।
  • মসজিদে হারামের কাছে পাবেন কিছু শপিং মল। যমযম টাওয়ারে পাবেন কিছু ব্যয়বহুল দোকান। যমযম টাওয়ারের পাশে লাগোয়া আল সাফওয়া টাওয়ার শপিংমল কেনাকাটার জন্য ভালো। হারাম শরীফের চারপাশের শপিং সেন্টারগুলোও ব্যয়বহুল। তবে কিছুদূর গেলে মু‘আল্লা কবরস্থানের পাশে পাইকারি ও সস্তায় পণ্য কেনার জন্য বেশ কিছু সুপার মার্কেট ও শপিং মল পাবেন। এছাড়া আজিজিয়া মার্কেটেও যেতে পারেন। মনে রাখবেন, হাদীসে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, পৃথিবীর মধ্যে নিকৃষ্টতম স্থান হলো বাজার। তাই বাজারে বেশি সময় নষ্ট করবেন না।
  • আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ অনুসারে, মদীনার তুলনায় মক্কায় সবকিছুর দামই একটু বেশি। সে কারণে আমার মতে, কেনা-কাটা মদীনায় করাই ভালো।
  • এখানের অনেক দোকানেই বাঙালি বিক্রয়কর্মী দেখতে পাবেন। আপনি সহজেই তাদের সঙ্গে বাংলায় কথা বলতে পারেন। তবে একটা দুঃখের বিষয় আমি লক্ষ্য করেছি এবং আমার মতো অনেকেরই এ অভিজ্ঞতা হয়েছে যে, বাঙালি বিক্রয়কর্মীরাই বাঙালিদের কাছে জিনিসপত্রের বেশি দাম চান! এমনকি অনেক বাঙালি বিক্রয়কর্মী নিজেদের বাঙালি পরিচয় পর্যন্ত দিতে চান না, কারণ এতে যদি আপনি তার সঙ্গে দামাদামি শুরু করে দেন!
  • তবে একটি বিষয় আপনার কাছে আশ্চর্যজনক মনে হবে এবং ভালোই লাগবে সেটা হলো-যে কোনো সালাতের আযান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব দোকান বন্ধ হয়ে যায়। সালাতের সময় সে দেশে কোনো বেচা-কেনা হয় না। ক্রেতা-বিক্রেতা সালাতের সময় শপিং মলে থাকলেও সালাতে দাঁড়িয়ে যান। সালাত শেষ হলে আবার বেচা-কেনা শুরু হয়ে যায়।
  • শেষ কথা হলো: মক্কা থেকে পারলে তাকওয়াকে ক্রয় করে অন্তরে গেঁথে নিয়ে যান!

মক্কায় দর্শণীয় স্থান ›

  • আপনার ট্রাভেল এজেন্সি মক্কায় একদিনের যিয়ারাহ ট্যুরের ব্যবস্থা করতে পারেন এবং আপনাদের সকলকে একত্রে বাস ভাড়া করে মক্কার কাছাকাছি ঐতিহাসিক স্থানগুলোতে এবং মিনা, আরাফাহ, জামারাত ও মুযদালিফা এলাকায় নিয়ে যেতে পারেন।
  • আপনি অবশ্যই এ ট্যুরটি উপভোগ করবেন। মক্কার চারদিকে ঘুরে দেখার এটাই আপনার সুযোগ। আপনি একটা বিষয় লক্ষ্য করবেন যে, মক্কার যমযম টাওয়ার অনেক দূর থেকেও দেখা যায়। আপনি যমযম টাওয়ার দেখলেই বুঝতে পারবেন যে মসজিদুল হারাম থেকে কত দূরে ও কোন দিকে আছেন। মক্কায় আপনি বেশ কিছু পাহাড় ও সুড়ঙ্গ সড়ক দেখতে পাবেন।
  • কিছু যিয়ারাতের স্থান খুব কাছে, ইচ্ছা করলে পায়ে হেঁটেই দেখে আসতে পারেন। তবে পরামর্শ হলো একা কোথাও যাবেন না এবং কয়েকদিন মক্কায় থাকার পর যিয়ারাতের স্থানগুলো ভ্রমণ করবেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মস্থান, জিন মসজিদ, মু‘আল্লা কবরস্থান পায়ে হেঁটেই দেখে আসতে পারবেন।
  • ফজরের সালাতের পর লক্ষ্য করবেন কিছু মাইক্রোবাস অথবা প্রাইভেট কার ড্রাইভার ‘যিয়ারাহ, যিয়ারাহ’ বলে ডাকবে। তারা আপনাকে কিছু স্থান ঘুরে দেখাবে। সবচেয়ে ভালো হয় ছোট ছোট দল করে ঘুরতে বের হওয়া, কারণ ড্রাইভার প্রতি ব্যক্তির জন্য ১০/২০ সৌদি রিয়াল ভাড়া দাবি করে থাকেন। এসব স্থান ভ্রমণ করার সময় অবশ্যই আপনার হজ পরিচয়পত্র ও হোটেলের ঠিকানা সঙ্গে রাখুন। অনেকসময় রাস্তায় পুলিশ আপনার হজেরপরিচয়পত্র চেক করতে পারেন।

হজের ফরয (হজে তামাত্তু) ›

  • ইহরাম করা; হজের নিয়ত করা।
  • আরাফায় অবস্থান করা; উকুফে আরাফা করা।
  • তাওয়াফুল ইফাদাহ বা যিয়ারাহ করা; হজের ফরয তাওয়াফ করা।
  • সাফা-মারওয়া সা‘ঈ করা; হজের ফরয সা‘ঈ করা।

উপরোক্ত ফরয কাজগুলো ধারাবাহিকতা রক্ষা করে নির্দিষ্ট স্থানে ও নির্দিষ্ট সময়ে পালন করতে হবে। উপরোক্ত ফরয বা রুকনের কোনো একটি বাদ গেলে (ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত) হজ সম্পন্ন হবে না। কোনো ক্ষতিপূরণ বা দম দিয়ে কাজ হবে না। হজ বাতিল হয়ে যাবে। পরবর্তীতে পুনরায় নতুন করে হজ করতে হবে।

হজের ওয়াজিব (হজে তামাত্তু) ›

  • মীকাত থেকে ইহরাম করা।
  • সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফায় অবস্থান করা।
  • মুযদালিফায় অবস্থান করা; মুযদালিফায় রাত্রিযাপন করা।
  • রামি করা; জামরাতসমূহে‎ কংকর নিক্ষেপ করা।
  • হাদীর পশু যবেহ করা।
  • কসর বা হলক্ব করা; চুল ছেঁটে ফেলা অথবা মাথা মুণ্ডন করা।
  • আইয়ামে তাশরীকের রাতগুলোতে মিনায় রাত্রিযাপন করা।
  • তাওয়াফে বিদা করা; হজ শেষে মক্কা ত্যাগের পূর্বে বিদায়ী তাওয়াফ করা।

*  পরিস্থিতি বা কারণ সাপেক্ষে কিছু কাজের ছাড় বা ব্যতিক্রম রয়েছে।

হজের কোনো একটি ওয়াজিব যদি বাদ পড়ে (ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত) তাহলে হজ বাতিল হবে না। তবে এজন্য হারাম এলাকার মধ্যে একটি পশু জবাই করে (দম) সম্পূর্ণ গোশত বিতরণ করা কাফফারা হিসাবে অত্যাবশ্যকীয় হয়ে যাবে। বিনা ওজরে হজের কোনো একটি ওয়াজিব বাদ দেওয়া গুনাহের কাজ। দম দিয়ে মুক্তি পাওয়ার পাশাপাশি আল্লাহর তা‘আলার কাছে অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা প্রার্থণা করা বাঞ্চণীয়।

হজের সুন্নাত (হজে তামাত্তু) ›

হজের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সুন্নাতগুলো হল:

  • ইহরাম বাঁধার আগে গোসল করা।
  • পুরুষের ক্ষেত্রে দুই খণ্ড সাদা ইহরামের কাপড় পরা।
  • উচ্চস্বরে তালবিয়া পাঠ করা।
  • ৮ যিলহজ যোহর থেকে ৯ যিলহজ ফজর পর্যন্ত মিনায় অবস্থান করা।
  • মধ্যম ও ছোট জামরায় কংকর নিক্ষেপের পর দো‘আ পাঠ করা।

হজের কোনো একটি সুন্নাত ওজরবশত বাদ দিলে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে বাদ পড়ে গেলে অসুবিধা নেই। দম দেওয়া জরুরি নয়। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে সুন্নাত বাদ দেওয়া মন্দ কাজ।

ফরয, ওয়াজিব ও সুন্নতের বিষয়ে সচেতনতা ›

  • আমার হজের অভিজ্ঞতা থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আপনাদেরকে বলতে চাই। মক্কা ও মিনায় অবস্থানকালে আমি লক্ষ্য করেছি বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন দলের অনুসারী হজযাত্রীরা হজের ফরয, ওয়াজিব ও সুন্নাত বিষয়গুলো তাদের নিজ নিজ নিয়ম অনুসারে পালন করছেন।
  • উদাহরণস্বরূপ; মিনায় ১১, ১২ ও ১৩ যিলহজ রাতে অবস্থান করা; কিছু লোক বলছেন এটা ওয়াজিব! আবার কিছু লোক বলছেন এটা সুন্নাত!

এর ফলে সাধারণ হজযাত্রীরা যারা হজ সম্পর্কে খুব বেশি পড়াশোনাও করেন নি বা তেমন কোনো জ্ঞান নেই তারা দ্বিধা দ্বন্দ্বে পড়ে যান এবং তারা যে দলের সাথে এসেছেন তাদের দেখাদেখি অন্ধের মতো সবকিছু পালন করেন। সাধারণত সকলেই চান কম কষ্টে সহজ উপায়ে হজ পালন করতে।

  • সকলের উদ্দেশ্যে আমার কথা হলো; এটা আপনার হজ, আপনার ফরয ইবাদাত, আপনি এর জন্য অর্থ ব্যয় করেছেন, হয়তো একবারই আপনি এটা পালন করবেন। ধরুন, হজ পালন করে আসার পর জানতে পারলেন হজে আপনি একটি বিধান ভুল করেছেন, তখন আপনার কেমন লাগবে? এজন্য কি উত্তম নয় সর্তকতা অবলম্বন করা বা নিরাপদে থাকা?
  • আল্লাহ তা‘আলা আমাদের আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে সৃষ্টি করেছেন, তাই যে কোনো ইবাদাত পালনের আগে সে সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান অর্জন করা জরুরী। তাই হজ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য বই থেকে জানুন এবং সে বইকে অন্যান্য ভালো বইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করুন। একইভাবে আমার লেখা গাইডও যাচাই করুন। অন্ধের মতো এটা পড়বেন না ও অনুসরণ করবেন না। আপনার বিচক্ষণতা ও জ্ঞান দিয়ে সঠিক পন্থা অবলম্বন করুন।
  • হজে যাওয়ার আগে কি কি কর্মকাণ্ড সম্পাদন করতে হবে সে সম্পর্কে মনে মনে নিশ্চিত হোন, এমনকি সেটা যদি আপনার দল থেকে ভিন্ন হয় তাহলেও! বিশ্বাস করুন; আমি আমার দল থেকে ভিন্ন উপায়ে হজের কিছু বিধান পালন করেছি। আমি ভালোভাবে তাদেরকে শুধু বলেছি, আমি আমার জ্ঞান দিয়ে হজের এই বিধানটি পালন করতে চাই এবং তারা তা মেনে নিয়েছে, বলেছে এতে তাদের কোনো সমস্যা নেই। ইনশাআল্লাহ আপনাকে কেউ কোনো বিধান পালন করার জন্য ওখানে বাধ্য/জোর প্রদান করবে না।
  • আপনি যদি আপনার নিজস্ব জ্ঞান ও জানাশোনার ওপর ভিত্তি করে হজের কোনো বিধানে কোনো ভুল করে ফেলেন, তাহলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং সে ভুল ওয়াজিব পর্যায়ের হলে কাফফারা হিসাবে একটি পশু জবাই করে দিন। আল্লাহ নিশ্চিতভাবেই আপনার মনের খবর জানেন – আপনি যে সঠিক উপায়েই সবকিছু করতে চেয়েছিলেন এবং আপনার জ্ঞান অনুসারে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। আপনি যদি একনিষ্ঠভাবে ক্ষমা চান তাহলে ইনশা-আল্লাহ আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমা করবেন, কারণ তিনি পরম দয়ালু ও ক্ষমাশীল।
  • মক্কা ও মদীনায় আপনি আপনার নিজস্ব জ্ঞান ও বিবিধ মাসলা সঠিক কি না তা যাচাই করে নিতে পারেন। আপনি বেশ কিছু ইসলামিক জ্ঞান আদান-প্রদান বুথ পাবেন অথবা মক্কা লাইব্রেরিতে আপনি কিছু বাংলা ও হিন্দি ভাষী বিদ্বান শাইখ/আলেম ব্যক্তি পাবেন যাদেরকে প্রশ্ন করে আপনি আপনার মনের সন্দেহ দুর করতে পারবেন। তাঁরা আপনার সাথে কুরআন ও সহীহ হাদীস অনুসারেই কথা বলবেন এবং বিভিন্ন মাযহাবের মতামত উল্লেখ করে এর মধ্যে কোনটি সবচেয়ে যথার্থ ও উত্তম তাও বলে দেবেন।

হিজরী ক্যালেন্ডারের দিবা-রাত্রি ধারণা ›

  • অনেকেই হজের দিনগুলোর (৮, ৯, ১০.. যিলহজ) কথা বলতে গিয়ে ইংরেজী দিন-রাত্রির হিসাবের সাথে হিজরী দিন-রাত্রির হিসাব মিলিয়ে গুলিয়ে ফেলেন। তাই এ মূল ধারণাটি আগেভাগেই পরিস্কার করে নেওয়া ভালো। ইংরেজী ক্যালেন্ডার হিসাবে রাত ১২টা পর থেকে দিন শুরু ধরা হয়। অর্থাৎ ২৪ ঘন্টা হিসাব হবে – প্রথমে ৬ ঘন্টা রাত্রি, পরে ১২ ঘন্টা দিন ও পরে ৬ ঘন্টা রাত্রি। আর হিজরী হিসাবে সূর্যাস্তের পর থেকে দিন শুরু ধরা হয়। অর্থাৎ ২৪ ঘন্টা হিসাব হবে – প্রথমে ১২ ঘন্টা রাত্রি ও পরে ১২ ঘন্টা দিন।

যিলহজ: তারবিয়াহ দিবস ›

  • এ দিনের মূল কাজ হলো সূর্যোদয়ের পর মক্কা থেকে হজের ইহরাম বেঁধে মিনায় গিয়ে তাবুতে দিবা-রাত্রি যাপন করা ও পরবর্তী পাঁচ ওয়াক্ত সালাত মিনায় আদায় করা।
  • ৮ যিলহজ ইহরাম বাঁধার আগে আপনি আপনার ব্যাগ গুছিয়ে নিন। ছোট একটি ব্যাগ নেবেন যাতে সহজেই ব্যাগটি বহন করতে পারেন। কারণ এ ব্যাগ নিয়ে কয়েক মাইল হাঁটতেও হতে পারে। আপনি কিছু শুকনো খাবার, একটি বিছানার চাদর, বায়ু বালিশ, প্লেট-গ্লাস, এক সেট ইহরামের কাপড়, সাবান, তোয়ালে, টয়লেট পেপার, কাপড় ঝোলানোর হ্যাঙার, পানির বোতল, দুই সেট সাধারণ পোশাক, কুরআন শরীফ ও কিছু বই সঙ্গে নিতে পারেন। মূল্যবান জিনিসপত্র ও অতিরিক্ত টাকা-পয়সা সাবধানে ঘরে রেখে তালা দিয়ে যান অথবা সৌদি মু‘আল্লিম অফিসে জমা দিয়ে রসিদ নিয়ে রাখুন।
  • রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পালনীয় নিয়ম অনুযায়ী সুন্নাহ হলো ৮ যিলহজ মক্কায় ফজরের সালাত আদায় করার পর সকালে মিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করা। কিন্তু বর্তমানে যদি ২৫-৩০ লক্ষ হজযাত্রী সকাল বেলায় ৮-১০ হাজার বাস গাড়ি নিয়ে ৭-৮ কিমি রাস্তা যাওয়ার চেষ্টা করেন তবে কেমন অচলাবস্থার সৃষ্টি হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।
  • তাই এখন সৌদি মু‘আল্লিমগণ ৮ যিলহজ মধ্যরাত হতেই হজযাত্রীদের মিনায় নিয়ে যাওয়া শুরু করেন। এতে হজের কোনো ক্ষতি হবে না। তাই আপনি জেনে নিন আপনাকে কখন মিনায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন আপনার এজেন্সি ও সৌদি মু‘আল্লিম। সে অনুযায়ী আপনি ইহরাম বাঁধার প্রস্তুতি নিন। সাধারণত যাত্রা শুরু করার ২-৩ ঘন্টা আগে ইহরাম বাঁধার প্রস্তুতি শুরু করা উত্তম।
  • ৮ যিলহজ ইহরামের কাপড় পরিধানের পূর্বে সাধারণ পরিচ্ছন্নতার কাজ (যদি কুরবানী করার ইচ্ছা না থাকে তবে) নখ কাটা, লজ্জাস্থানের চুল পরিস্কার, গোঁফ ছোট করা সেরে নিন। তবে দাঁড়ি ও চুল কাটবেন না। পরিচ্ছন্নতার কাজগুলো করা মুস্তাহাব।
  • এরপর গোসল করা উত্তম, যদি গোসল করা সম্ভব না হয় তাহলে অবশ্যই অযু করতে হবে। ঋতুবর্তী মহিলারা গোসল করে সাধারণ কাপড় পরে নিবেন এবং হজ এর সকল বিধি-বিধান পালন করবেন, তবে ঋতু শেষ না হওয়া পর্যন্ত মসজিদে হারামে প্রবেশ করবেন না এবং সালাত আদায় করবেন না। ঋতু শেষ হলে তাওয়াফ করে নিবেন ও সালাত আদায় করবেন।
  • পুরুষরা ইহরামের কাপড় পরার আগে চুলে তেল বা ‘তালবিদ’ (কোনো কিছু দিয়ে চুল জমাট করে রাখা; যাতে তা না উড়ে, সুতরাং তালবিদ) দিতে পারেন এবং শরীরে, মাথায় ও দাঁড়িতে সুগন্ধী ব্যবহার করতে পারেন; তবে ইহরাম বাঁধার পর পারবেন না। সুগন্ধী যেন আবার ইহরামের কাপড়ে না লাগে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। লেগে গেলে তা ধুয়ে ফেলবেন। মহিলারা কখনই কোনো অবস্থাতেই সুগন্ধী ব্যবহার করবেন না। মহিলাদের সুগন্ধী ব্যবহার করা হারাম।
  • পুরুষরা ইহরামের কাপড় সুবিধা মতো উপায়ে পরতে পারেন; তবে এমনভাবে পরবেন যাতে নাভির উপর থেকে হাটুর নিচ পর্যন্ত আবৃত হয়ে যায় এবং ইহরামের কাপড় দিয়ে কাঁধ ও শরীর আবৃত থাকে। মহিলারা মুখমণ্ডল এবং হাতের কব্জি খোলা রাখবেন, নেকাব দ্বারা মুখমণ্ডল সবসময় ঢাকা রাখা যাবে না। তবে না-মাহরাম পুরুষদের সামনে বা মাঝে গেলে তখন মুখমণ্ডল আবৃত করবেন।

সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৪৬৪ মুসনাদে আহমদ, আবু দাউদ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৬৩৫

  • উত্তম হলো কোনো ফরয সালাতের পূর্বে ইহরামের কাপড় পরা ও সালাত আদায় করা এবং তারপর ইহরাম করা। আর কোনো ফরয সালাতের সময় না হলে ইহরামের কাপড় পড়ে তাহিয়্যাতুল ওযুর ২ রাকাত সালাত পড়া। সালাতের পর ইহরাম করা মুস্তাহাব। যদি কোনো ফরয সালাতের পর ইহরাম করা হয়, তাহলে স্বতন্ত্র সালাতের প্রয়োজন নেই। অন্য সময় ইহরাম করলে ২ রাকাত সালাত তাহিয়াতুল অযুর নিয়তে আদায় করে নিবেন।
  • মক্কায় আপনার হোটেল অথবা বাসা থেকে ইহরামের কাপড় পরবেন এবং এখান থেকেই আপনি ইহরাম বাঁধবেন। এমনটি করা ওয়াজিব। ইহরাম করার জন্য আপনাকে এখন কোনো মীকাতে যেতে হবে না। সৌদি স্থানীয় লোকেরাও তাদের নিজ নিজ আবাসস্থল থেকে হজের জন্য ইহরাম বাঁধবেন। শুধুমাত্র যারা মীকাতে বাইরে থেকে আসবেন তারা মীকাত থেকে হজের নিয়ত ও ইহরাম বেঁধে প্রবেশ করবেন।
  • এখন যেহেতু আপনি ইহরামের কাপড় পরে ফেলেছেন এবং সালাতও আদায় করেছেন সেহেতু এখন আপনি হজের নিয়ত করতে পারেন অর্থাৎ ইহরাম করতে পারেন। এমনকি ঋতুবর্তী মহিলারাও হজের নিয়ত করবেন। 
  • আপনি  বলুন: “লাববাইকা হাজ্জাহ’’

‘‘আমি হজ করার জন্য হাযির’’।

মুসনাদে আহমদ-৬/৪২১; সহীহ বুখারী ও মুসলিম

  • এবার স্বশব্দে তাওহীদ সম্বলিত তালবিয়াহ পাঠ শুরু করুন এবং জামরাতুল ‘আকা‘বায় কংকর নিক্ষেপের আগ পর্যন্ত এ তালবিয়াহ পাঠ চলতে থাকবে।

لَبَّيْكَ اَللهم لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيْكَ لَكَ لَبَّيْكَ إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لَا شَرِيْكَ لَكَ

‘‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাববাইকা লা শারিকা লাকা লাববায়িক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নিয়মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক’’।

‘‘আমি হাযির, হে আল্লাহ! আমি হাযির। আমি হাযির, তোমার কোনো শরীক নেই, আমি হাযির”।

নিশ্চয় সকল প্রশংসা ও নি‘আমত তোমারই এবং রাজত্বও তোমারই, তোমার কোনো শরীক নেই”।

  • হজ সম্পন্ন করতে না পারার ভয় থাকলে (যদি কোনো প্রতিবন্ধকতা, বাধা অথবা অসুস্থতার কারণে না পারেন) তবে এ দো‘আ পাঠ করবেন:

فَإِنْ حَبَسَنِيْ حَابِسٌ فَمَحِلِّيْ حَيْثُ حَبَسْتَنِيْ

‘‘ফাইন হাবাসানী হা-বিসুন, ফা মাহিল্লী হায়ছু হাবাসতানি’’।

‘‘যদি কোনো প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হই, তাহলে যেখানে তুমি আমাকে

বাধা দিবে, সেখানেই আমার হালাল হওয়ার স্থান হবে”।

তালবিয়াহ একটু উচু আওয়াজে পাঠ করা উত্তম। তবে তালবিয়াহ খুব উচ্চস্বরে অথবা সমস্বরে পাঠ করবেন না যা অন্যদের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এমনভাবে তালবিয়াহ পাঠ করাও সুন্নাত নয়, বরং বিদ‘আত। আর মহিলারা তালবিয়াহ পাঠ করবেন কোমল স্বরে অথবা মনে মনে। এখন আপনার হজের নিয়ত করা ও ইহরাম করা হয়ে গেছে; এ ইহরাম করার কাজটি ছিল ফরয।

সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৪৬০, ৫৯১৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৮৪ মিশকাত, হাদীস নং ২৭১১

  • মনে রাখবেন এখন আপনি ইহরাম অবস্থায় আছেন। এখন আপনার ওপর ইহরামের সকল বিধি-নিষেধ প্রযোজ্য। ইহরাম অবস্থায় কি কি কাজ অনুমোদিত আর কি কি নিষিদ্ধ তা পৃষ্ঠা—– থেকে দেখে মনে রাখুন।
  • ইহরাম করার পরে ইহরামকে কেন্দ্র করে কোনো নির্দিষ্ট সালাত নেই। ইহরাম করার পরে ৮ যিলহজ কা‘বা শরীফ তাওয়াফ বা সাফা-মারওয়ায় সা‘ঈ করার ব্যাপারেও কোনো নির্দেশনা হাদীসে কোথাও পাওয়া যায় না। তাই এমন অতিরিক্ত কিছু ভিত্তিহীন আমল নেকীর আশায় করতে যাওয়া ঠিক হবে না।
  • আপনার হজ এজেন্সি ইতিমধ্যেই মু‘আল্লিম অফিস থেকে মিনার তাবু কার্ড সংগ্রহ করে ফেলবেন ও আপনাদেরকে বুঝিয়ে দিবেন এবং আপনাদের সৌদি মু‘আল্লিম অফিস সবার মিনায় যাওয়ার জন্য পরিবহণের ব্যবস্থাও করবেন।
  • হজ সফর পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে একটি তথ্য আপনাদের জানিয়ে দিতে চাই যাতে আপনি এ সার্বিক ব্যবস্থাপনার বিষয়টি বুঝতে পারেন। হজের পূর্বে বাংলাদেশের বিভিন্ন হজ এজেন্সি বা দল হজের বিভিন্ন সেবা বিষয়ে চুক্তি করেন সৌদি সরকার কর্তৃক লাইসেন্সপ্রাপ্ত সৌদি আরবের বিভিন্ন সৌদি মু‘আল্লিম এর সাথে। আপনি হজে যাবেন একটি দল বা এজেন্সির সাথে, যার একজন গাইড আপনাদের সদা বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করবেন পুরো হজ সফর ধরে। কিন্তু এ হজ গাইড এর ক্ষমতা সীমাবদ্ধ। বাংলাদেশে অবস্থানকালে এ হজ গাইড তার নিজ দায়িত্বে পাসপোর্ট, ভিসা, বিমান টিকিট এর কাজ করেন। কিন্তু যখনই আপনি সৌদি আরবে যাবেন তখন এ হজ গাইড আবার সকল বিষয়ের ব্যবস্থাপনার জন্য নির্ভরশীল সৌদি মু‘আল্লিম এর উপর। আপনাদের বাস সার্ভিস, খাওয়া-দাওয়া, হোটেল, তাবু ইত্যাদি সৌদি মু‘আল্লিম এর ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভরশীল। এক একজন সৌদি মু‘আল্লিম আবার ৫/১০ টি দল ম্যানেজ করেন। তাই অনেক সময় আপনার গাইড তার দেওয়া বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারেন না সৌদি মুআল্লিমের কারণে। যেমন উদাহরন: সৌদি মু‘আল্লিম আপনাদের হজ গাইডকে বলবেন, আপনার সকল হাজীদের প্রস্তুত হতে বলেন, মিনায় যাওয়ার বাস আসবে রাত ২টায়। এরপর দেখবেন ৫টা বেজে গেছে কিন্তু বাসের খবর নেই! আপনি দোষ দিবেন গাইডকে, কিন্তু গাইডের করার কিছু নেই। গাইড খুব জোর মু‘আল্লিমকে একটু তাগাদা দিতে পারেন, অনুরোধ করতে পারেন।
  • আপনি যখন হজ সফরের জন্য আপনার নিজ বাড়ি থেকে বের হচ্ছিলেন তখন আপনাকে কিন্তু ৩টি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস ব্যাগে নিতে বলা হয়েছিল! ধৈর্য, ত্যাগ ও ক্ষমা! আপনার হজকে সহজ করার জন্য এ ৩টি বিষয় প্রয়োগ করা খুব বেশি প্রয়োজন পড়বে। হজের সফরে বিভিন্ন চরিত্র ও মেজাজের লোকের সাথে একসাথে থাকতে হয় তাই অনেক সময় অনেক কথা ও কাজে মতপার্থক্য হয়। তাই রাগারাগি বা কথা কাটাকাটি না করে ধৈর্য্যের সাথে বনিবনা করে পার করতে হবে।
  • ৮ যিলহজ বাসযোগে আপনার দলসহ মিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন এবং আশা করা যায় ২-৩ ঘন্টার মধ্যেই তাবুতে পৌঁছে যাবেন। যানজটের কারণে মিনায় পৌঁছতে আপনাকে কিছুটা পথ হাঁটতেও হতে পারে। অনেকে পায়ে হেঁটে প্যডেস্ট্রিয়ান টানেলের (সুড়ঙ্গ পথ) রাস্তা দিয়ে মিনায় যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। যদি তাবু জামারাতের কাছাকাছি হয় ও সাথে পূর্বে হজ করা অভিজ্ঞতা সম্পন্ন লোক থাকে তবে তার সাথে পায়ে হেঁটে যেতে পারেন। তবে পুরোটা পথ পায়ে হেঁটে না যাওয়াই উত্তম, কারণ এতে আপনি পরিশ্রান্ত হয়ে পড়তে পারেন। রাস্তায় চলতে চলতে তালবিয়াহ পাঠ অব্যাহত রাখুন। সবসময় দলবদ্ধ হয়ে থাকার চেষ্টা করুন। এ সময়ই কিন্তু অনেক লোক দলছাড়া হয়ে হারিয়ে যান। তাই সাবধান থাকুন।
  • তাবু কার্ডের মাধ্যমে আপনার তাবুটি খুঁজে বের করুন। তাবুর ভিতরে গিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম ও খাবার গ্রহণ করুন। তাবুর ভিতরে কুরআন তিলাওয়াত, তসবিহ তাহলিল, ইসতিগফার, দো‘আ, যিকিরের মাধ্যমে সময়কে কাজে লাগান। তালবিয়াহ পাঠ অব্যাহত রাখুন। মিনায় অবস্থান করা সাদা-সিধে জীবন যাপনের প্রতীক। মিনায় আজকে রাত্রিযাপন করা মুস্তাহাব বা সুন্নাত।
  • এখন পরবর্তী পাঁচ ওয়াক্ত সালাত (যোহর, আসর, মাগরিব, এশা ও ফজর) মিনাতেই আদায় করবেন। হজের সময় মিনা, আরাফা ও মুজদালিফায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার ভিতরের ও বাইরের লোকদের নিয়ে কসর করে সকল সালাত পড়েছেন। এক্ষেত্রে তিনি মুকিম ও মুসাফিরের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেন নি অর্থাৎ মক্কার লোকদের চার রাকাত করে পড়তে বলেন নি। এমন কসর করে সালাত পড়া সুন্নাত। সকল চার রাকাত বিশিষ্ট ফরয সালাতসমূহকে দুই রাকাআতে সংক্ষিপ্ত করে পড়বেন মানে কসর করে পড়বেন (মাগরিব ও ফজর ব্যতীত)। কোনো সুন্নাত সালাত আদায়ের প্রয়োজনীয়তা নেই কসর অবস্থায়। তবে এ সালাত গুলো কাজা করে অথবা দুই ওয়াক্ত সালাতকে একত্রে জমা করে পড়া যাবে না। শুধুমাত্র ফজরের দুই রাকাত সুন্নাত এবং এশার পরে এক/তিন.. রাকাত বিতর সালাত আদায় করবেন।
  • তাবুর ভিতরে গ্রুপ জামাআত করা উত্তম অথবা একা একাও সালাত পড়তে পারেন। খাইফ মসজিদের কাছাকাছি তাবুর অবস্থান হলে মসজিদে গিয়ে জামা‘আতে সালাত আদায় করা সবচেয়ে উত্তম। মিনার খাইফ মসজিদ ঐতিহাসিক মসজিদ।
  • ৯ যিলহজ সূর্যোদয় পর্যন্ত মিনায় অবস্থান করা সুন্নাত। তারপর আরাফার উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে হবে। মিনায় অবস্থান করে সালাত আদায় করা, কুরআন তিলাওয়াত, তাসবীহ-তাহলিল, দো‘আ ও যিকির করা ছাড়া আর কোনো বিশেষ কাজ নেই। তাই তাবুর মধ্যে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে অথবা গল্পগুজব ও ঘুরাঘুরি না করে মিনার এ মূল্যবান সময়গুলোকে কাজে লাগানো উত্তম।

মিনা সম্পর্কিত কিছু তথ্য ›

  • মিনার সকল তাবুতে এয়ার কন্ডিশন (এসি) সুবিধা রয়েছে। একটি তাবুতে প্রায় ৩০-৫০ জন হজযাত্রী থাকতে পারে। প্রত্যেকের জন্য এক কুনুই মাপের ছোট ম্যাট্রেসের বিছানা ও বালিশ দেওয়া থাকে।
  • টয়লেট ও অযুর ব্যবস্থা খুবই কম সংখ্যক। অনেক সময় টয়লেটে যাওয়ার জন্য ২০-৪০ মিনিট লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তাই এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। আর এখানে গোসল করার কোনো ব্যবস্থা নেই।
  • মোবাইল ফোন চার্জ করার জন্য ২/৩ পিনের মাল্টিপ্লাগ সঙ্গে নিন, তাবুর খুটিতে মোবাইল ফোন চার্জ করার ব্যবস্থা আছে। সবসময় সাথে ২০/৪০ রিয়ালের মোবাইল রিচার্জ কার্ড সঙ্গে রাখুন। বিপদে কাজে লাগতে পারে।
  • হজের আইডি কার্ড ও তাবু কার্ড সবসময় আপনার সাথে রাখবেন। তাবুর বাইরের রাস্তা দিয়ে একটু হাঁটাহাঁটি করুন এবং আশেপাশের জায়গার সঙ্গে পরিচিত হোন। তবে একা একা তাবু থেকে খুব বেশি দূরে যাবেন না।
  • আপনার তাবু নাম্বার, রোডের নাম ও নং এবং জোন নং জেনে রাখুন। কারণ মিনায় হারিয়ে যাওয়া খুব সাধারণ ব্যাপার। মিনার একটি ম্যাপ সংগ্রহ করে আপনার তাবুর লোকেশন চিনে রাখুন। বর্তমানে মিনায় জায়গা সংকুলান না হওয়ায় মুযদালিফার একাংশ মিনা হিসাবে ব্যবহৃত হয়।
  • আপনার মু‘আল্লিম প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মিনায় দুই/তিনবেলা খাবারের ব্যবস্থা করতে পারেন। এছাড়া তাবুর বাইরে মেইন রোডের পাশে প্রচুর অস্থায়ী খাবারের দোকান পাওয়া যাবে। সেখান থেকে খাবার কিনে খেতে পারেন।
  • তাবুর বাইরে কন্টেইনার জারে খাবার পানি পাওয়া যাবে। কিছু বোতলে করে খাবার পানি ধরে রাখুন। পানির সংকট দেখা দেয় অনেক সময়।
  • হজের সময় আপনি মিনায় ও আরাফায় আকাশে টহল হেলিকপ্টার দেখতে পাবেন। রাস্তায় অনেক গাড়ি থেকে পানি, জুস, লাবান ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হয় হাজীদের আপ্যায়ন হিসাবে।
  • হজ পালনের স্থানসমূহে‎র এলাকা অর্থাৎ মিনা, আরাফা ও মুযদালিফা উচুঁ সাইনবোর্ড দ্বারা চিহ্নিত করা থাকে। যেমন, মিনায়: Mina starts here, Mina ends here. আরাফায়: Arafah starts here, Arafah ends here.
  • এখানেই ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ঈসমাইল  আলাইহিস সালামকে যবেহ করতে নিয়ে গিয়েছিলেন ও শয়তান জামরাত এলাকায় তাঁকে বিভ্রান্ত করতে চেষ্টা করেছিল।

সূরা কাওছার মিনায় অবতীর্ণ হয়েছে।

মিনায় প্রচলিত ভুলত্রুটি ও বিদ‘আত ›

  • তাবুতে সালাত আদায় করার পর অনেকে দলবদ্ধ হয়ে মিলাদ পড়েন, দলবদ্ধ উচ্চস্বরে যিকির করেন এবং অন্যদের যিকর-ইবাদতে বিরক্ত করেন।
  • তাবুতে দলবদ্ধ হয়ে বসে অনেকে আলোচনা করেন; যাদের অনেকেরই ইসলাম সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই এবং তারা কোনো এক পীর/সূফির পক্ষ নিয়ে কথা বলেন।
  • তাবুতে অনেকে সালাতের পরে অনির্ভরযোগ্য বই পড়েন যাতে অনেক জাল ও যয়ীফ হাদীস থাকে।
  • অনেকে আবার তাবুর মধ্যে ২/৩টি গ্রুপ করেন। এক গ্রুপ হজের বিষয়ে একভাবে ফাতাওয়া দেন; আরেক গ্রুপ আবার অন্যভাবে ফাতাওয়া প্রদান করেন। এতে সাধারণ মানুষ পড়ে যান দ্বিধা-দ্বন্দ্বে।
  • অনেকে আবার সময় কাটানোর জন্য অনর্থক গল্পগুজবে মেতে উঠেন, অনেকে ঘুমিয়ে সময় কাটান।
  • অনেক পুরুষ আবার মহিলা তাবুতে গিয়ে তাদের পরিচিত মহিলাদের সাথে কথা বলেন, যা অন্য মহিলাদের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
  • অনেকে আবার তাবুর পানি জারের খাবার পানি দিয়ে অযু করে খাবার পানির সঙ্কট তৈরি করেন। অনেকে যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা ফেলেন।

সকল ডাস্টবিন আবর্জনায় পূর্ণ হয়ে যায়, আর পরিচ্ছন্নতা কর্মীও পর্যাপ্ত নেই। সে কারণে এ স্থান পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা দুষ্কর হয়ে পড়ে।

৯ যিলহজ: আরাফাহ দিবস ›

  • এ দিনের মূল কাজ হলো সূর্যোদয়ের পর মিনা থেকে আরাফায় গমন করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফায় অবস্থান করা ও দো‘আ, যিকির, ইসতেগফার করা। আরাফায় যোহর-আছর সালাত একসাথে পরপর কসর করে আদায় করা এবং সূর্যাস্তের পর আরাফা ত্যাগ করে মুযদালিফায় গমন করা।
  • আরাফা ময়দান বিচার দিবসের হাশরের ময়দানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়; যেখানে সমগ্র মানবজাতি একত্রিত হবে সুবিস্তৃত এক ময়দানে। এ দিবস সবচেয়ে বেশি আশির্বাদপ্রাপ্ত দিবস এবং এ দিবস আল্লাহ তা‘আলা তাঁর ক্ষমাশীলতা, রহমত ও দয়া উপস্থাপন করেন। আরাফার ময়দান হারাম এলাকার সীমানার বাইরে অবস্থিত। আরাফার চর্তুদিকে সীমানা-নির্ধারণমূলক উঁচু ফলক রয়েছে। ১০.৪ কি.মি এলাকা জুড়ে বিস্তৃত আরাফা ময়দান। মসজিদুল হারাম থেকে প্রায় ২২ কি.মি দূরে অবস্থিত আরাফার ময়দান। এ আরাফার ময়দানের প্রান্তে দাঁড়িয়েই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছিলেন।
  • রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাদীসে বলেছেন, ‘‘হজের সব হলো আরাফায়”।

মুসনাদে আহমদ (৪/৩৩৫)

  • আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘আরাফা ব্যাতীত আর কোনো দিবস নেই যে দিন আল্লাহ তাঁর অধিক বান্দাহকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করেন এবং তিনি খুব সন্নিকটে চলে আসেন এবং ফিরিশতাদের সামনে তার বান্দাহদের নিয়ে গর্ব করে বলেন, ‘তারা আমার কাছে কী চায়?”
  • শয়তান এ দিনে সকল মানুষের আল্লাহর প্রতি যিকর, দো‘আ ও ইসতেগফার দেখে সবচেয়ে বেশি হীন ও লাঞ্ছিত হয়ে যায়। শয়তান ক্রোধান্বিত ও বেদনা বিধুর হয়ে যায়।
  • ৯ যিলহজ মিনায় ফজরের সালাত আদায়ের পর আরাফার উদ্দেশে দলবদ্ধ হয়ে রওয়ানা হওয়া ভালো। এসময় একাকি অথবা ছোট দল হয়ে পাঁয়ে হেঁটে আরাফায় যাওয়ার চিন্তা না করাই উত্তম। কারণ আরাফা ময়দান অনেক বড় জায়গা ও এখানে মিনার মতো তাবু নম্বর, জোন, রোড নম্বর লেখা ফলক তুলনামূলক কম আছে। অনেক সময় বাস ড্রাইভাররাই তাবু লোকেশন ঠিক মতো বুঝতে পারেন না ও অনেক ঘুরাঘুরি করে তাবু খুঁজে বের করেন। তাই বাসে যাওয়া উত্তম। বাসে যেতে যেতে তালবিয়াহ পাঠ করতে থাকুন। সম্ভব হলে আরাফায় প্রবেশের পূর্বে বা পরে গোসল করে নেওয়া উত্তম।
  • বর্তমানে হজযাত্রী সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণে ৯ যিলহজ মধ্যরাত থেকে আরাফায় নিয়ে যাওয়া হয়। এটা নিশ্চয় সুন্নতের খেলাফ; তবে যেহেতু সমস্যার কারণে এ কাজ করা হচ্ছে তাই এ সুন্নাতটি ছুটে গেলে ক্ষতি হবে না ইন-শাআল্লাহ।

আরাফার সীমানার ভিতর প্রবেশ করে মুস্তাহাব হলো নামিরা মসজিদে ইমামের খুতবা শোনা এবং যোহরের আযানের পর যোহরের আউয়াল ওয়াক্তেই যোহর-আসর সালাত ইমামের পিছনে জামাআতে আদায় করা।

সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৩৪৮

  • তবে যেহেতু সকল লোকের একত্রে মসজিদে নামিরায় একত্রিত হওয়া সম্ভব নয় তাই আরাফার ময়দানের যে কোনো স্থানে তাবুতে অবস্থান গ্রহণ করা ও যোহরের ওয়াক্তেই যোহর-আসর সালাত তাবুতে জামাআত করে আদায় করা অথবা কেউ চাইলে একাকীও আদায় করতে পারেন।
  • গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো; নিশ্চিতভাবে আরাফার সীমানার ভেতরে অবস্থান গ্রহণ করতে হবে অন্যথায় হজ হবে না। আরাফার ময়দানের চর্তুদিকে সীমানা-নির্ধারণমূলক উঁচু ফলক বা সাইনবোর্ড রয়েছে যা আপনাকে অবস্থান নির্ণয়ে সাহায্য করবে। নামিরা মসজিদের সামনের দিকের কিছু অংশ আরাফার সীমানার বাইরে, তাই সেখানে অবস্থান গ্রহণ করা যাবে না। আবার আরাফা ও মুযদালিফার মধ্যবর্তী ‘উরানাহ’ উপত্যকা এলাকা আরাফার সীমানার বাইরে, তাই সেখানেও অবস্থান গ্রহণ করা যাবে না।
  • এখানে সালাত আদায়ের নিয়ম হলো; যোহরের সালাতের আউয়াল ওয়াক্তেই এক আযান ও দুই ইকামাতে যথাক্রমে যোহর (২ রাকাত ফরয) ও আসর (২ রাকাত ফরয) কসর করে পরপর আদায় করা। এ দুই সালাতের আগে, মধ্যে ও পরে কোনো সুন্নাত পড়ার নিয়ম নেই।
  • রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবেই মক্কার মুকিম ও মুসাফিরদের নিয়ে কসর করে পরপর সালাত আদায় করেছেন। তিনি এক্ষেত্রে মুকিম ও মুসাফিরদের জন্য আলাদা কোনো নিয়মের কথা উল্লেখ করেন নি। নামিরা মসজিদের ইমামও এইভাবেই সালাত পড়ান। তাবুতে সকল লোকদের এ একইভাবে একাকী বা জামাআতে সালাত আদায় করা উচিত। যদি দিনটি শুক্রবার হয় তবে জুমআর সালাত পড়ার দরকার নেই তবে কসর সালাত আদায় করতে হবে।

সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১২১৮; সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৬৬২

  • আরাফার দিবসের রোজা, পূর্বের এক বছরের ও পরের এক বছরের গুনাহের কাফফারা হয়ে যায়। তবে এ সাওম হাজীদের জন্য নয়, বরং যারা হজ করতে আসেন নি তাদের জন্য। আপনার পরিবারবর্গকে বাড়িতে এ দিনে সাওম রাখতে বলুন। হাজীদের জন্য আরাফার দিনে সাওম রাখা মাকরূহ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাফার দিনে সাওম রাখেননি। তিনি সবার সন্মুখে দুধ পান করেছেন।
  • আরাফার ময়দানে আপনি যে কোনো স্থানে দাঁড়াতে পারেন বা বসতে পারেন অথবা শুয়েও থাকতে পারেন। আরাফার ময়দানে এ অবস্থান করাকে বলা হয় উকুফে আরাফাহ। আরাফার দিনে জাবালে রহমত পাহাড়ে উঠার বিষয়ে বিশেষ কোনো ফযিলত বা সাওয়াবের বর্ণনা হাদীসে কোথাও পাওয়া যায় না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবশ্য জাবালে রহমত তথা আরাফার পাহাড়ের নীচে উকুফ বা অবস্থান করেছেন কিন্তু তিনি বলেছেন, ‘‘আমি এখানে উকুফ করলাম, কিন্তু আরাফার পুরো এলাকা উকুফের স্থান”।

সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে গেলে (পূর্বে উল্লেখিত নিয়মে যোহর-আছর সালাতের পর) অত্যন্ত বিনয়ী ও তাকওয়ার সাথে আল্লাহর কাছে দো‘আ শুরু করুন। এখন আল্লাহর কাছে দৃঢ়-প্রত্যয়ী হয়ে আপনার আবেদন জানানোর সময়। এ দো‘আর গুরুত্ব অপরিসীম, এর জন্যই আপনার আরাফায় আসা। কিবলার দিকে মুখ করে দুই হাত উচুঁ করে (বগল উন্মুক্ত করে) চোখের পানি বিসর্জন দিয়ে হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে আল্লাহর কাছে দো‘আ করুন, ক্ষমা চান, দয়া কামনা করুন, আপনার মনের আকাঙ্ক্ষা আল্লাহ তা‘আলার কাছে ব্যক্ত করুন। আল্লাহর গুণবাচক নামসমূহ‎, দুরূদ ইবরাহীম, তালবিয়াহ, তাকবীর, যিকর, ইসতিগফার ও দো‘আ করতে থাকুন বেশি বেশি করে। যে কোনো দো‘আ পাঠ করার সময় ৩ বার করে পাঠ করা উত্তম। প্রথমে নিজের জন্য ও পরে পরিবার-আত্মীয়স্বজনদের জন্য অতঃপর প্রতিবেশী-পরিচিতজনদের জন্য এবং শেষে পুরো মুসলিম উম্মাহর জন্য দো‘আ করুন। দো‘আ করার সময় কোনো সন্দেহ না করা, ইতস্তত না করা ও সীমালঙ্ঘন না করা। দো‘আ শেষে ‘আমিন’ বলুন।

  • সব দো‘আ-যিকর যে আরবীতে করতে হবে তার কোনো নিয়ম নেই, যে ভাষা আপনি ভালো বোঝেন ও আপনার মনের ভাব প্রকাশ পায় সে ভাষাতেই দো‘আ করুন। তবে মনে রাখবেন; আওয়াজ করে, জোরে শব্দ করে বা দলবদ্ধ হয়ে কোনো দো‘আ পাঠ করা সুন্নাত নিয়ম এর অন্তর্ভুক্ত নয়। এতে অন্যদের মনযোগ নষ্ট হয়। তবে কেউ দো‘আ পাঠ করলে তার পিছনে ‘আমিন’ বলা জায়েয আছে। দো‘আ করবেন আবেগ ও মিনতির সাথে মনে মনে। দো‘আর সময় তাওহীদকে জাগ্রত করুন। আরাফায় দো‘আর সময় ওযু অবস্থায় থাকা উত্তম তবে কেউ অযু বিহীন অবস্থায় থাকলেও সমস্যা নেই। এ বইয়ের শেষে কুরআন ও হাদীস থেকে বেশ কিছু দো‘আ সংযোজন করা হয়েছে যা আরাফার ময়দানে পড়তে পারেন। যে সব মহিলারা ঋতু অবস্থায় থাকবেন তারাও অন্যান্য হাজীদের মতো দো‘আ-যিকির করবেন – তারা শুধু সালাত আদায় করা, কুরআন স্পর্শ করা ও কা‘বা তাওয়াফ করা থেকে বিরত থাকবেন।

তিরমিযী, হাদীস নং ৩৬০৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২১৩৭ সূরা আল-আ‘রাফ: ২০৫

  • আরাফার দিনে এ দো‘আ পড়া উত্তম :

لا إله إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ، لَا شَرِيْكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلٰى كُلِّ شَئْيٍ قَدِيْرِ

‘‘লা ইলাহা ইল্লালাহু ওআহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু্, ওয়া হুয়া আ’লা কুল্লি শায়য়িন ক্বদির।’’

‘‘আল্লাহ ছাড়া সত্যিকার কোনো ইলাহ নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক নেই। সকল সার্বভৌমত্ব ও প্রশংসা একমাত্র তাঁরই। তিনি সর্ব বিষয়ের ওপর সর্বশক্তিমান”।

  • ৯ যিলহজ আরাফার ময়দানে অবস্থান করা ফরয। দুপুরের সূর্য পশ্চিমে ঢলে যাওয়ার পর থেকে আরাফাতে অবস্থানের প্রকৃত সময় শুরু হয়। আরাফার ময়দানে মধ্যপ্রহর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করা ওয়াজিব। আর তার সময় শেষ হয় আরাফার দিবাগত রাত্রির শেষে দশ তারিখের সূর্য উদয় হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। কারো পক্ষে হতে অন্য কাউকে আরাফায় পাঠানো যাবে না, প্রত্যেকে স্বশরীরে আরাফায় উপস্থিত হতে হবে।

অনিবার্য কারণবশত যদি আরাফায় দিনের বেলায় পৌছা না যায় এবং ঐ দিন রাতের বেলায় পৌছায় তবে রাতের কিছু অংশ আরাফায় অবস্থান করে মুযদালিফায় গিয়ে রাতের বাকি অংশ যাপন করলে তার হজ হয়ে যাবে। আবার কেউ যদি তার দেশ থেকে সরাসরি ৯ যিলহজ আরাফার ময়দানে চলে যায় তাহলেও তার হজ হয়ে যাবে।

তিরমিযী, হাদীস নং ৩৫৮৫; আহমদ, হাদীস নং ৬৯৬১ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৬৫০; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১২১১

  • আরাফার ময়দানে সূর্যাস্তের পর লাল-হলুদ আভা বিলীন হওয়া পর্যন্ত ধীরস্থির অবস্থান করতে হবে এবং মাগরিবের আযানের পর সালাত আদায় না করেই মুযদালিফার উদ্দেশ্যে রওনা হতে হবে। মাগরিব সালাত আদায় করবেন মুযদালিফায় গিয়ে। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনটাই করেছেন। অনেকে সূর্যাস্ত হওয়ার আগেই রাস্তার জানজট কাটানোর জন্য আগেই বাসে উঠে রওনা হয়ে যান আর আরাফার ময়দান পার হতে হতে সূর্যাস্ত করেন। বুদ্ধিটি নিঃসন্দেহে ভাল! কিন্ত ইবাদতের বিষয়ে শর্টকার্ট, চটজলদি বা চালাকি বেশি খাটানো উচিৎ হবে না।

আরাফা সম্পর্কিত কিছু তথ্য ›

  • আরাফার তাবুগুলোতে এসি সুবিধা নেই। তবে মিনার তাবুগুলো থেকে আরফার তাবু আকারে বড় হয়। এখানে ম্যাট্রেস সাধারণত থাকে না, তবে মেঝেতে কার্পেট থাকে। আরাফার কিছু জায়গায় তাবুর চারদিকে অনেক নিম গাছ রয়েছে, এ গাছগুলো ভালো শীতল ছায়া দেয়।
  • মিনার মতো এখানেও টয়লেট ও অযুর ব্যবস্থা খুবই সামান্য। এখানে মোবাইল ফোনে চার্জ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
  • আপনার আইডি কার্ড ও তাবু কার্ড সবসময় সঙ্গে রাখবেন। আরাফার দিনে তাবুর ভিতরে বাইরে অযথা ঘোরাফেরা না করে যিকির ও দো‘আ করে সময় কাজে লাগান। একা একা তাবু থেকে দূরে কোথাও যাবেন না।
  • আপনার মু‘আল্লিম প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আরাফায় আপনাকে একবেলা বা দুইবেলা খাবার খেতে দিতে পারেন। এছাড়া তাবুর বাইরে রোডের পাশে প্রচুর অস্থায়ী খাবারের দোকান পাওয়া যাবে। কোথাও দেখবেন ট্রাক থেকে বিনামূল্যে খাবার/পানি বিতরণ করা হচ্ছে। আপনি ইচ্ছে করলে এ খাবার নিতে পারেন। তবে ধাক্কাধাক্কি করে এসব খাবার আনতে না যাওয়াই উত্তম কারণ এতে আপনি আহত হতে পারেন; বা খালি পকেট হয়ে যেতে পারেন।
  • মিনা থেকে আরাফা ও মুযদালিফায় যাওয়ার জন্য শাটল ট্রেনের ব্যবস্থা রয়েছে। এ ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি হয়। তবে সমস্যা হলো অনেকে টিকিট না নিয়েই ট্রেনে উঠে পড়েন। রেলওয়ের প্লাটফরম সবসময়ই হজযাত্রীদের ভিড়ে জনাকীর্ণ থাকে। ভিড় সামলানোর জন্য ব্যবস্থাপনা ও টিকিট চেক করা খুবই কঠিন কাজ এখানে। অনেকে আহত হন এখানে।

আরাফায় প্রচলিত ভুলত্রুটি ও বিদ‘আত ›

  • আরাফার সীমানার বাইরে অথবা মসজিদে নামিরার সেই অংশে বসা, যা আরাফার সীমার বাইরে অবস্থিত। এছাড়া তাড়াতাড়ি সূর্যাস্তের পূর্বে মুযদালিফার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়া।
  • সূর্যাস্তের আগেই আরাফা ত্যাগ করা, যারা এ কাজ করবে তাদের অবশ্যই আবার সূর্যাস্তের আগেই আরাফায় ফিরে আসতে হবে অথবা কাফফারাস্বরূপ একটি (দম) পশু যবেহ করতে হবে।
  • আরাফার পাহাড়ে আরোহণ করা, বা পাহাড়ের চূড়ায় আরোহনের জন্য ধাক্কাধাক্কি করা এবং সেখানে পাহাড়ের গায়ে হাত ঘষা ও সিজদা দিয়ে দো‘আ করা।
  • দুআ করার সময় জাবালে আরাফা পাহাড়ের দিকে মুখ করে হাত উঠিয়ে দো‘আ করা।
  • জাবালে আরাফা পাহাড়ের উপরস্থ ডোমে স্পর্শ করা, যা আদমের ডোম নামে পরিচিত এবং এখানে সালাত পড়া ও ডোম তাওয়াফ করা।
  • মসজিদে নামিরাতে খুৎবা শেষ করার আগেই যোহর ও আসরের আযান দেওয়া এবং সালাত পড়া।
  • যোহরের সালাতের পর ওয়াজ, দো‘আ ও মিলাদ করে দীর্ঘ সময় পর আসরের সালাত পড়া।
  • অনেকের ধারণা জুমু‘আর দিনে আরাফায় দাঁড়ানো ৭২টি হজযাত্রার সমান। এটির কোনো প্রমাণ নেই।
  • আরাফায় সন্ধ্যায় আরাফা পাহাড়ের উপর আগুন অথবা মোমবাতি জ্বালানো।

অনেকে দলবদ্ধ হয়ে মিলাদ পড়েন, বিনামূল্যের খাবার অনুসন্ধান করেন এবং ঈদের দিনের মতো কোলাকুলি মুসাফাহ করেন।

১০ যিলহজ: মুযদালিফার রাত ›

  • এ রাতের মূল কাজ হলো মুযদালিফায় গমন করে মাগরিব ও এশার সালাত একসাথে পরপর কসর করে আদায় করা ও মুযদালিফায় ঘুমিয়ে রাত্রি যাপন করা এবং ফজরের সালাতের পর মিনা তথা জামরাতুল আকা‘বাহ’য় কংকর নিক্ষেপের উদ্দেশ্যে গমন করা।
  • মুযদালিফায় অবস্থান সাদামাটা জীবন যাপন, গৃহহীনতা ও অভাবের প্রতীক। মুযদালিফা এলাকা হারামের সীমার ভিতরে অবস্থিত। আরাফার সীমানা শেষ হলেই মুযদালিফা শুরু হয় না। আরাফা থেকে ৬ কি.মি.  অতিক্রম করার পর আসে মুযদালিফা। মুযদালিফার পর কিছু অংশ ওয়াদি আল-মুহাসসির উপত্যকা এলাকা তারপর মিনা সীমানা শুরু। বর্তমানে মিনায় জায়গা সংকুলান না হওয়ায় মুযদালিফার একাংশ মিনা হিসাবে ব্যবহৃত হয়।
  • আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে বলেন, ‘‘তোমরা যখন আরাফার ময়দান থেকে ফিরে আসবে তখন মাশআরুল হারামের (মুযদালিফায়) কাছে এসে আল্লাহকে স্মরণ করবে, যেমনি করে আল্লাহ তোমাদের পথ বলে দিয়েছেন, তেমনি করে তাঁকে স্মরণ করবে, নিশ্চয় তোমরা পথভ্রষ্টদের দলে শামিল ছিলে”।
  • রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফায় অবস্থানের ফযীলত সম্পর্কে বলেছেন, ‘‘আল্লাহ তা‘আলা এ দিনে তোমাদের ওপর অনুকম্পা করেছেন, অতঃপর তিনি গুনাহগারদেরকে সৎকাজকারীদের কাছে সোপর্দ করেছেন। আর সৎকাজকারীরা যা চেয়েছে তা তিনি দিয়েছেন”।

আরাফার ময়দানে সূর্যাস্তের পর মাগরিবের সালাত না পড়েই মুযদালিফার উদ্দেশ্যে আরাফা ত্যাগ করুন। সূর্যাস্তের পূর্বে আরাফা ত্যাগ করবেন না, করলেই দম দিতে হবে। ধীরে-সুস্থে শান্ত ভাবে যাত্রা শুরু করুন, বাসে আগে উঠার জন্য ধাক্কাধাক্কি করবেন না। রাস্তায় যেতে যেতে তালবিয়াহ পাঠ অব্যাহত রাখুন। আরাফা থেকে সকল বাস প্রায় একই সময়ে মুযদালিফার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। তাই রাস্তায় প্রচুর যানজটের সৃষ্টি হয়। তাই মুযদালিফায় বাসে যাওয়ার চেয়ে ছোট গ্রুপ করে পায়ে হেঁটে যাওয়াই ভালো, কারণ এতে আপনি খুব দ্রুতই মুযদালিফায় পৌঁছাতে পারবেন। সবসময় দলবদ্ধ হয়ে থাকার চেষ্টা করুন। এখানে দলছাড়া ও হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি।

সূরা আল-বাকারা: ২:১৯৮ ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৩০২৩

  • মুযদালিফায় পায়ে হেঁটে যাওয়ার জন্য আলাদা একমুখী রাস্তা আছে, এ রাস্তায় কোনো গাড়ি চলাচল করে না। তবে রাস্তা চেনা না থাকলে ও হারিয়ে যাওয়ার ভয় থাকলে বাসে যাওয়াই উত্তম।
  • মুযদালিফা সীমানার ভিতরে প্রবেশের পর বাস কোনো একটি সুবিধাজনক ফাঁকা জায়গায় দাঁড়াবে। মুযদালিফায় যখনই পৌছাবেন তখন প্রথম কাজ হলো মাগরিব ও এশার সালাত কসর করে পরপর আদায় করা। যদি একত্রে জামা‘আত করে পড়েন তবে প্রথমে একবার আযান ও তারপর এক ইকামাতের পর মাগরিবের তিন রাকাত ফরয সালাত এবং তার পরপরই ইকামাত দিয়ে এশার দুই রাকাত ফরয সালাত আদায় করবেন। এ দুই সালাতের মাঝখানে অন্য কোনো সালাত বা তাসবিহ পড়বেন না, শুধু এশার ফরয সালাতের পর বিতর সালাত পড়বেন।
  • মুযদালিফায় পৌছার পর যদি এশার সালাতের ওয়াক্ত না হয় তবে অপেক্ষা করতে হবে। আবার আপনি যদি প্রচণ্ড যানজটের কারণে মধ্যরাতের আগে মুযদালিফায় পৌঁছতে না পারেন, তাহলে পথিমধ্যে কোথাও যাত্রাবিরতি করে মাগরিব ও এশার সালাত পড়ে নিবেন।
  • সালাত আদায়ের পর আর কোনো কাজ নেই। এবার আপনি শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফায় সুবহে সাদিক পর্যন্ত শুয়ে ঘুমিয়ে আরাম করেছেন। যেহেতু ১০ যিলহজ হাজীদের অনেক পরিশ্রম করতে হবে তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফার রাতে বিশ্রাম করেছেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফা থেকে মিনা যাওয়ার সময় সাতটি কংকর নিয়েছিলেন তা স্পষ্ট। অবশ্য মুযদালিফা থেকে কংকর নেওয়ায় কোনো সমস্যা নেই তবে উচিত হবে এটাকে জরুরী মনে না করা ও মুযদালিফার কংকরের বিশেষ গুণ আছে এমন ধারণা পোষণ না করা। পরবর্তীতে মিনা থেকে বা হারামের সীমানার ভিতরে যে কোনো স্থান থেকে কংকর সংগ্রহ করতে পারেন।

সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২৫৬; সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৫৬০

  • আপনি ইচ্ছা করলে এখান থেকে জামরায় পরবর্তী তিন দিন কংকর নিক্ষেপের জন্য (২১৩=৬৩) কংকর সংগ্রহ করতে পারেন। সব কংকরই এখান থেকে নেওয়া বিধান মনে করা যাবে না, কারণ মিনা থেকেও কংকর সংগ্রহের সময় ও সুযোগ পাওয়া যায়। তবে মিনার চেয়ে মুযদালিফায় কংকর সহজলভ্য বেশি।
  • কংকর নিক্ষেপের জন্য সংগৃহিত পাথরের আকার চনা বুটের দানা বা শিমের বিচির মতো হবে। বেশি বড় আকারের কংকর নেওয়া মাকরূহ। কংকর মুছার বা ধোয়ার কোনো নিয়ম হাদীসে কোথাও নেই। কিছু অতিরিক্ত কংকর নিবেন কারণ অনেক সময় কংকর হাত থেকে পড়ে হারিয়ে যায়। কংকরগুলো একটি ছোট ব্যাগ অথবা প্লাস্টিকের বোতলে সংরক্ষণ করে রাখুন। আবার আপনি যদি মুযদালিফা বা মিনা থেকে কংকর সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হন তাহলে অন্য কারো কাছ থেকেও কংকর নিতে পারেন। এতে কোনো সমস্যা নেই। এভাবে সবাই এতো কংকর এখান থেকে নিলে একদিন মুযদালিফার সব কংকর হয়তো শেষ হয়ে যেতে পারে বলে আপনার মনে যদি ধারণা জাগে তবে আপনাকে আশ্বস্ত করতে চাই, ইনশা-আল্লাহ এমনটি হবে না কখনো!
  • মুযদালিফা ও মিনার মধ্যবর্তী একটি জায়গার নাম ওয়াদী মুহাসসার। এটা মুযদালিফার অংশ নয়। তাই এখানে অবস্থান করা যাবে না। এ মুহাসসার এলাকায় আবরাহা রাজার হাতির বাহিনীকে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি কংকর নিক্ষেপ করে নাস্তানাবুদ করেছিল। ইতোপূর্বে এ কথাটি বলা হয়েছিল যে, বর্তমানে মুযদালিফার একাংশ মিনা হিসাবে ব্যবহার করা হয় হজযাত্রী সংকুলান না হওয়ার কারণে। তাই ঐ জায়গাটুকু মিনা হিসাবে ব্যবহৃত হলেও যেহেতু মৌলিক অর্থে মিনায় পরিনত হয় নি, তাই ঐ অংশে তাবুতে রাত্রিযাপন করলে মুযদালিফার রাত্রিযাপন হয়ে যাবে। ওয়াদী মুহাসসারেও এখন অবশ্য তাবু বিছিয়ে মিনা হিসাবে ব্যবহৃত হয়।
  • মুযদালিফার সীমানার ভিতর এ রাত্রি যাপন করা ওয়াজিব।
  • বৃদ্ধ ও দূর্বল পুরুষ-নারী, শিশু ও অসুস্থ ব্যক্তিগণ ওজর বা কারণ সাপেক্ষে মধ্যরাতের চাঁদ ডুবে যাওয়ার পর মুযদালিফা ত্যাগ করে মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হতে পারেন। অসুস্থ্য ও দুর্বলদের সাহায্যার্থে তাদের সাথে অভিভাবকরাও যেতে পারবেন। ওজর ছাড়া মুযদালিফা ত্যাগ করে মিনায় যাওয়া ঠিক হবে না। চলে গেলে দম দিতে হবে।
  • মুযদালিফায় সুবহে সাদিকে ঘুম থেকে উঠে একটু আগেভাগে আউয়াল ওয়াক্তেই ফজরের সালাত আদায় করে নিবেন। ফজরের সময় দুই রাকাত সুন্নাত ও দুই রাকাত ফরয সালাত আদায় করবেন। এবার মুযদালিফায় উকুফ করবেন, দো‘আ-যিকর করবেন ঠিক যেমন আল্লাহ করতে বলেছেন সূরা আল-বাকারা: ২:১৯৮ এবং সূরা-আল আ‘রাফ, ৭:২০৫ আয়াতে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফায় ‘কুযাহ’ পাহাড়ের পাদদেশে উকুফ করেছেন। এ স্থানটি বর্তমানে আল মাশার-আল হারাম মসজিদের সন্মুখভাগে অবস্থিত। এ মসজিদটি মুযদালিফার ৫নং রোডের পাশে অবস্থিত এবং ১২ হাজার মুসল্লী ধারন ক্ষমতা রাখে। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘আমি এখানে উকুফ (অবস্থান) করলাম তবে মুযদালিফার পুরোটাই উকুফের স্থান”।
  • এবার কিবলার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে দুই হাত উঠিয়ে দো‘আ-যিকির, তাসবিহ করতে থাকুন, আল্লাহর প্রশংসা করুন: ‘‘আলহামদুলিল্লাহ’’- ‘‘সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য’’।
  • তাকবীরের মাধ্যমে আল্লাহর মহত্ব ঘোষণা করুন: ‘‘আল্লাহু আকবার’’- ‘‘আল্লাহ মহান’’।
  • কালেমা পাঠের মাধ্যমে আল্লাহর একত্ববাদ ঘোষণা করুন: ‘‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’’ -‘‘আল্লাহ ছাড়া সত্যিকার কোনো ইলাহ নেই’’।
  • এই দো‘আ-যিকিরগুলো বারবার পাঠ করতে থাকুন এবং যতক্ষণ না পূর্ব আকাশ ফর্সা হওয়া দৃশ্যমান হয় ততক্ষণ এ দো‘আগুলো পাঠ করতে থাকুন, আপনার পছন্দ মতো অন্য দো‘আও পাঠ করতে পারেন। অতঃপর সূর্যোদয়ের আগেই মিনার উদ্দেশ্যে রওনা হবেন।

মুযদালিফা সম্পর্কিত কিছু তথ্য ›

হজের অন্যতম কঠিন ও কষ্টকর কাজ শুরু হয় এখান থেকে। সূর্যাস্তের পর আরাফাহ থেকে মুযদালিফার উদ্দেশ্যে বাস ছাড়ে। কিন্তু রাস্তায় ভারী যানজটের কারণে বাস তেমন একটা এগুতে পারে না। অনেক সময় যানজটের কারণে বাসের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হয়, এতে পরিবহন সঙ্কটে যাত্রীরা বাসের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত ও অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। আপনার এজেন্সিকে পর্যাপ্ত পরিবহণের ব্যবস্থা রাখার জন্য সতর্ক করে দেবেন যাতে সব যাত্রী বাসে আসন পায়, কাউকে যেন দাঁড়িয়ে থাকতে না হয়।

সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৫৬৪ সহীহ মুসলিম (২/৮৯৩) আবু দাউদ

  • ভারী যানজটের কারণে অনেকে বাস ছেড়ে দিয়ে হাঁটতে শুরু করেন, কারণ তাদের ধারণা এভাবে যানজটে বসে থাকলে মুযদালিফায় পৌঁছতে পারবেন না বা মুযদালিফায় রাত্রি যাপন করতে পারবেন না। আপনিও যদি এ অবস্থায় পড়েন তবে বাস ছাড়বেন কি ছাড়বেন না এ সিদ্ধান্তে আসা কঠিন। কারণ যদি বাস একবার ছেড়ে দেন তাহলে পায়ে হেঁটেই আপনাকে মিনা অথবা পরবর্তীতে জামরায় পৌঁছতে হতে পারে। এক্ষেত্রে দলনেতা অথবা অভিজ্ঞ ব্যক্তির পরামর্শ নিন।
  • আরাফা থেকে মুযদালিফার দূরত্ব ৬/৭ কি.মি. হলেও কিছু গাড়ি ফজরের আগে মুযদালিফা পৌঁছাতে পারে না। কিছু লোক মুযদালিফা এসে গেছে ধারণা করে অন্যদের দেখাদেখি মাঝপথে  মাগরিব-এশা পড়ে রাত্রি যাপন করে। অবশেষে ফজর বাদ মুযদালিফার সীমানায় এসে সাইনবোর্ড দেখে তাদের ভুল বুঝতে পেরে আক্ষেপ করে। এভাবে হজের একটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায় অনেক হাজীর।
  • মুযদালিফায় কোনো তাবু নেই। আপনার বাস এখানে পৌঁছার পর পার্কিং এলাকায় পার্ক করবে অথবা রাস্তার পাশে রেখে দেবে। আপনি চাইলে বাসের মধ্যে অথবা বাইরে খোলা আকাশের নিচে একটু সমতল ভূমিতে ম্যাট বিছিয়ে শুয়ে ঘুমাতে পারেন। আপনি দেখবেন অনেকে রাস্তার পাশে, কেউ পাহাড়ের ঢালে ঘুমিয়ে আছে। এখানে টয়লেটের সংখ্যা খুবই কম তাই এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
  • আপনি এখানে রাতের বেলায় খাবার ও পানি কেনার জন্য দোকান পাবেন না। এ কারণে কিছু খাবার ও পানীয় মজুদ রাখলে ভালো হয়। ফজরের সালাত আদায় করার জন্য প্রয়োজনে মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করে নেবেন।

মুযদালিফায় প্রচলিত ভুলত্রুটি ও বিদ‘আত ›

  • মুযদালিফার উদ্দেশ্যে আরাফা ত্যাগ করার সময় তাড়াহুড়া করা।
  • মুযদালিফায় রাত কাটানোর জন্য গোসল করা।
  • মুযদালিফাকে পবিত্র এলাকা গণ্য করে পায়ে হেঁটে এলাকায় প্রবেশ করা।
  • মুযদালিফায় পৌঁছার পর এ দো‘আ করা সুন্নাত মনে করা, (হে আল্লাহ এ মুযদালিফা, এখানে একত্রে অনেক ভাষা এসেছে..।)
  • দুই সালাতের মাঝে মাগরিবের সুন্নাত সালাত পড়া ও এশার পর সুন্নাত পড়া।
  • মুযদালিফায় পৌঁছে মাগরিব ও এশার সালাত পড়ার আগে কংকর নিক্ষেপের কংকর সংগ্রহ করা।
  • কংকর শুধু মুযদালিফা থেকে সংগ্রহ করতে হবে এ ধারণা পোষণ করা।
  • মুযদালিফায় জাগ্রত অবস্থায় রাত কাটানো।
  • পুরো রাত যাপন করা ছাড়াই কিছুক্ষণ অবস্থান করে মুযদালিফায় থেকে বের হয়ে যাওয়া।
  • ‘আল মাশার আল হারাম’ পৌঁছার পর এ দো‘আ পাঠ করা নিয়ম মনে করা, (হে আল্লাহ আমি এ রাতের মাধ্যমে আপনার কাছে প্রার্থনা করছি..।)
  • মুযদালিফা থেকে কংকর নিক্ষেপের জন্য ৭টি কংকর নেওয়া এবং বাকি সব কংকর ওয়াদী মুহাসসারের পাশ থেকে নেওয়া রীতি মনে করা।

১০ যিলহজ: বড় জামরায় কংকর নিক্ষেপ করা ›

  • ১০ই জিলহজের দিনটি হজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দিনটিকে হজের বড় দিন হিসাবে উল্লেখ করেছেন। এ দিনে ৪টি কাজ সম্পাদন করতে হবে; প্রথমত বড় জামরায় কংকর নিক্ষেপ করা (রমি করা), দ্বিতীয়ত হাদী বা পশু জবেহ করা, তৃতীয়ত কসর/হলক্ব করা, চতুর্থত তাওয়াফুল ইফাদাহ করা ও সা‘ঈ করা।
  • জামরাত এলাকা দিয়ে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে যবেহ করতে নিয়ে যাচ্ছিলেন ও শয়তান তাঁকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল এবং তিনি শয়তানকে কংকর নিক্ষেপ করেছিলেন। জামরাতে শয়তান বাঁধা আছে বলে যে কেউ কেউ ধারণা করে তা মোটেই ঠিক নয়। আবার অনেকে জামরাতকে বড় শয়তান, ছোট শয়তান নামে ডাকে যা সঠিক নয়। জামারাত এলাকা মিনার সীমানার মধ্যে পড়ে। কংকর নিক্ষেপ বা রামি করা আল্লাহর নিদর্শনসমূহে‎র অন্যতম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘বায়তুল্লাহ তাওয়াফ, সাফা মারওয়া সা‘ঈ ও জামরাতে কংকর নিক্ষেপ আল্লাহর যিকির কায়েমের উদ্দেশ্যে।’’ হাদীসে আরও এসেছে ‘‘আর তোমার কংকর নিক্ষেপ, সে তো তোমার জন্য সঞ্চিত করে রাখা হয়”।
  • সূর্যোদয়ের আগেই তালবিয়াহ পাঠরত অবস্থায় মিনার উদ্দেশ্যে মুযদালিফা ত্যাগ করুন। এসময়ও রাস্তায় প্রচুর গাড়ির ভীড় হয়। অনেক সময় রাস্তায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়ে যাওয়ার কারণে বাস আর মিনায় ঢ়ুকতে দেওয়া হয় না। তাই এখান থেকে ১০-১৫কি:মি: হাঁটার মন-মানসিকতা রাখুন। আসলে এখান থেকে মিনা হয়ে জামরাতে হেঁটে যাওয়াই উত্তম। তবে সবসময় দলবদ্ধ হয়ে থাকুন, কারণ এখানে অনেক লোক হারিয়ে দলছাড়া হয়ে যায়। যখন মুহাসসার উপত্যকা পার হবেন তখন একটু তাড়াতাড়ি যাওয়ার চেষ্টা করুন তবে শান্ত ও সুস্থিরভাবে চলুন-কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনটাই করেছেন। আর আপনি যদি বাসে থাকেন, তবে বাস তার নিজস্ব গতিতেই যাবে। জামরাত যাওয়ার পথে যদি আপনার মিনার তাবু সামনে এসে যায় তবে তাবুতে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ও কিছু খাওয়া দাওয়া করে তারপর জামরাতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। তালবিয়াহ বেশি বেশি করে পাঠ করা অব্যাহত রাখুন, কারণ তালবিয়াহ পাঠ এর সময় শেষ হয়ে আসছে। এসময় দলনেতা একটি পতাকা নিয়ে সকলকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলে উত্তম হয়।
  • রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্য উঠার ১-২ ঘন্টার মধ্যে কংকর মেরেছিলেন। সে হিসাবে সূর্য পশ্চিমে ঢলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত কংকর নিক্ষেপ করা সুন্নাত। অবশ্য সূর্য উঠা থেকে শুরু করে ১১ যিলহজ সুবহে সাদিক পর্যন্ত কংকর মারা জায়েয। বর্তমানে যেহেতু ৩০ লক্ষাধিক হাজীর সুন্নাত সময়ের মধ্যে কংকর মারা দুঃসাধ্য ও অনেকের পক্ষে কষ্টকর তাই একটু দেরী করে ও খবর নিয়ে কম ভিড়ের সময়ে কংকর নিক্ষেপ করতে যাওয়া উত্তম।

আবু দাউদ, হাদীস নং ১৯৪৫ আবু দাউদ-১৬১২; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৩৪৮ আবু দাউদ, দারেমী সুনান নাসাঈ, হাদীস নং ৩০১৩

  • নারী, বালক, অসুস্থ্য ও বৃদ্ধরা যারা মুযদালিফা থেকে মধ্যরাতে মিনায় চলে এসেছেন তারা ১০ তারিখ সূর্য উঠার আগেই কংকর নিক্ষেপ করতে পারেন। তবে এ সময়ে রাস্তায় বিপরীতমুখী প্রচণ্ড ভীড় থাকার কারণে তাদের আবার জামরাত থেকে মিনায় ফিরে আসা কঠিন ব্যাপার হয়ে যায়। সাধারণত দেখা যায় বিকেল বেলায় বা রাতে জামরাত ফাঁকা থাকে। এ সময়ে নারী, বালক, অসুস্থ্য ও বৃদ্ধদের কংকর নিক্ষেপ করা সহজ হয়।   
  • অসুস্থ্য ও বৃদ্ধ নারী-পুরুষ, শিশু-বালকদের পক্ষ থেকে অন্য যে কেউ তার প্রতিনিধি হিসাবে রমি করতে পারবেন। এক্ষেত্রে প্রতিনিধি ব্যক্তি সেই বছর হজ আদায়কারী হতে হবে এবং প্রথমে তার নিজের কংকর নিক্ষেপ করবেন ও তারপর অন্যের কংকর নিক্ষেপ করবেন। আজকাল অনেককে দেখা যায়; বিশেষ করে নারীরা ক্ষীণ শারিরীক দুর্বলতা ও অসুস্থতার অজুহাতে রমি করতে না গিয়ে অন্যকে নিযুক্ত করেন ও তাবুতে ঘুমিয়ে সময় পার করেন। এমনটি করা অনুচিত। নিজের কংকর নিজে মারা উত্তম। একেবারে চলতে অপারগ বা ওখানে গেলে পরে আরও অসুস্থ্য হওয়ার সম্ভাবনা আছে বা জামরাতে প্রচণ্ড লোকের ভীড়-এমন গুরুতর ওজর ছাড়া সকলেরই জামরাতে যাওয়া উচিত।
  • এবার পায়ে হেঁটে জামরাত এলাকায় যান। হাঁটতে হাঁটতে তালবিয়াহ পাঠ করতে থাকুন। বর্তমানে কংকর নিক্ষেপের সুবিধা উন্নত করা হয়েছে। এখন আপনি এখানে নিচতলা/দ্বিতীয় তলা/তৃতীয় তলা/চতুর্থ তলা থেকেও কংকর নিক্ষেপ করতে পারবেন।
  • জামরাতের যে কোনো এক ফ্লোরে লিফট অথবা এস্কেলেটরে উঠে এরপর পায়ে হেঁটে বড় জামরাহর কাছে আসুন। আপনি যেহেতু মিনার খাইফ মসজিদের দিক থেকে জামরাতে ঢুকেছেন সেহেতু পথে আপনি প্রথমে ছোট জামরাহ (জামরাতুল সুগরা) ও তারপর মধ্যম জামরাহ (জামরাতুল উস্তা) অতিক্রম করবেন এবং অতঃপর সবশেষে পৌঁছাবেন বড় জামরাহর (জামরাতুল ‘আকাবাহর) কাছে। সোজাসুজি বড় জামরাহর দিকে কংকর মারতে না গিয়ে চারদিকে খানিকটা ঘোরা ফেরা করে ভিড় কম এমন একটি জায়গা খুঁজে বের করুন। বড় জামরার কাছে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে তালবিয়াহ পাঠ বন্ধ করে দেবেন। তালবিয়াহ পাঠ এখানেই শেষ।
  • যদি সম্ভব হয় জামরাকে সামনে রেখে কা‘বাকে বামে ও মিনাকে ডানে রেখে অথবা যে কোনোভাবে সুবিধামত দাঁড়িয়ে ডান হাত উচু করে আলাদা আলাদাভাবে ৭টি কংকর একে একে নিক্ষেপ করুন এবং প্রতিবার নিক্ষেপের শুরুতে বলুন: اَللهُ أَكْبَرُ ‘‘আল্লাহু আকবার’’

‘‘আল্লাহ মহান’’।

  • জামরার হাউজ বা বেসিনে বুক লাগিয়ে অথবা ২-৩ মিটার দূরত্ব থেকে জামরায় রমি করুন। কংকরগুলো যেন জামরার দেওয়ালে আঘাত করে অথবা জামরার বেসিনের মধ্যে পড়ে সেটা নিশ্চিত করুন। যদি কোনো কংকর বেসিনের মধ্যে না পড়ে তবে তার পরিবর্তে আবার একটি কংকর নিক্ষেপ করুন। সে কারণে সঙ্গে অতিরিক্ত কংকর নিয়ে নেবেন। কংকর যদি জামরার দেওয়ালে লেগে বা বেসিনের মধ্য থেকে ছিটকে বাইরে পরে যায় তাতে সমস্যা নেই। কংকর আংগুল দিয়ে যে কোনভাবে ধরে নিক্ষেপ করা যাবে। এজন্য নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম নেই। নিজের কংকর নিক্ষেপ হয়ে গেলে ঠিক একই নিয়মে অন্যের কংকর নিক্ষেপ করতে পারেন। খুশু-খুজুর সাথে কংকর নিক্ষেপ করুন।
  • বড় জামরাহে কংকর নিক্ষেপ করা ওয়াজিব।

সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১২৯০

  • কংকর নিক্ষেপ শেষে তাকবীরে তাশরিক পড়া শুরু করুন এবং ১৩ যিলহজ আসরের সালাত পর্যন্ত চলবে এ তাকবীর। প্রতি ফরয সালাতের পর উচ্চস্বরে এ তাকবীর পড়ুন।

اَلله أَكْبَرُ، اَللهُ أَكْبَرُ، لاَ إِلهَ إِلَّا اللهُ وَاللهُ أَكْبَرُ، اَللهُ أَكْبَرُ وَلِلّٰهِ الْحَمْدُ

‘‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ’’।

‘‘আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকার কোনো ইলাহ নেই, আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান। সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য’’।

  • রমি করা শেষে এখানে দাঁড়িয়ে দো‘আ করার কোনো নিয়ম হাদীসে পাওয়া যায় না। জামরাহ থেকে বের হয়ে এস্কেলেটর বা লিফট দিয়ে মক্কার দিকে নেমে পড়ুন। এবার হাদী বা পশু জবাই এর জন্য মু‘আইসম বা অন্য কোনো স্থান যেখানে আপনি আগে থেকেই নির্ধারণ করেছেন সেখানে চলে যাবেন।
  • আর যদি ব্যাংকে টাকা দিয়ে থাকেন, তাহলে আর  আপনার কোনো করণীয় নেই। আপনি মাথা মুণ্ডিয়ে কিংবা চুল ছোট করে হালাল হয়ে যাবেন।

জামরাত সম্পর্কিত কিছু তথ্য ›

  • ইতোপূর্বে কয়েক বছর আগেও জামরাতে অনেক লোক পদদলিত হয়ে মারা যেত। সে কারণে অনেকে জামরাতে যেতে ভয় করত। কিন্তু বর্তমানে কংকর নিক্ষেপের নিরাপদ ও সহজ ব্যবস্থা করা হয়েছে।
  • জামরাতে কংকর নিক্ষেপের সকল রাস্তা একমুখি। আপনি যদি মিনা থেকে জামরাতে আসেন তাহলে আপনি ভিতরে প্রবেশের জন্য বেশ কয়েকটি গেট পাবেন। এস্কেলেটরে করে আপনি সহজে উপরে আরোহন করতে পারবেন। কংকর নিক্ষেপের পর আপনাকে জামরাতের অন্য দিকে নামিয়ে দেওয়া হবে, অর্থাৎ মক্কার দিকে।
  • জামরাতে অনেক নিরাপত্তাকর্মী ও হজযাত্রী ব্যবস্থাপনার লোক দেখতে পাবেন। বড় ব্যাগ মাথায় বা কাঁধে নিয়ে জামরাতে যাবেন না, তাহলে নিরাপত্তাকর্মীরা আপনাকে আটকিয়ে দেবে এবং আপনাকে ভেতরে নাও যেতে দিতে পারে। তবে ছোট হাত ব্যাগ বা কাঁধ ব্যাগ থাকলে সমস্যা নেই।
  • জামরাত বিল্ডিংয়ের ভিতর দিয়ে যাওয়ার পথে আপনি বিশাল আকারের অনেকগুলো এয়ারকুলার ফ্যান দেখতে পাবেন, হজযাত্রীদের শীতল বাতাস প্রদানের জন্য এখানে ফ্যানের ব্যবস্থা করা আছে। জামরাতের চারপাশে অনেক কংকর ও প্লাস্টিকের বোতল পড়ে থাকতে দেখবেন। অনেক লোকই এখানে এসে হারিয়ে যান, তাই আপনি সবসময় আপনার দলের সঙ্গেই থাকুন। দলনেতার হাতে ছোট পতাকা থাকলে ভালো হয়।
  • একটি বিষয় মনে রাখবেন, প্রতিদিন কংকর নিক্ষেপের জন্য আপনাকে মিনা থেকে হেঁটে জামরাতে আসতে হবে, আবার হেঁটেই জামরাত থেকে মিনার তাবুতে ফিরে যেতে হবে। তাই হাঁটার প্রস্তুতি রাখুন। তবে আপনি দেখবেন যাদের শাটল ট্রেনের টিকিট কাটা আছে তারা মিনা থেকে ট্রেনে জামরাতের একেবারে কাছে এসে কংকর নিক্ষেপ করতে পারেন। কিছু সৌদি ভিআইপি অতিথি হজযাত্রীকে কংকর নিক্ষেপের করার জন্য হেলিকপ্টারে করে জামরাত ভবনের ছাদে অবতরণ করতে দেখবেন।

কংকর নিক্ষেপের ক্ষেত্রে প্রচলিত ভুলত্রুটি ও বিদ‘আত ›

  • কংকর নিক্ষেপের জন্য গোসল বা অযু করা।
  • কংকর নিক্ষেপের আগে কংকর ধুয়ে নেওয়া।
  • একসাথে ২/৩টি বা ৭টি কংকর একত্রে নিক্ষেপ করা।
  • তাকবীরের স্থলে সুবহানাল্লাহ বা অন্য কোনো যিকির করা। তাকবীরের সাথে কোনো কিছু যোগ করে বলা।
  • অনেকের ধারণা তারা আসল শয়তানের গায়ে কংকর নিক্ষেপ করছেন, এজন্য তারা খুব রাগান্বিত হয়ে ওই জামরাহগুলোকে অপমান ও গালাগালি করেন।
  • জামরাতে বড় কংকর অথবা স্যান্ডেল বা কাঠের খন্ড নিক্ষেপ-এ ধরনের কাজ করা বাড়াবাড়ি, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন কাজ করতে নিষেধ করেছেন।
  • কংকর কাছ থেকে মারার জন্য ঠেলাঠেলি বা ধাক্কাধাক্কি করা।
  • কংকর নিক্ষেপের জন্য নির্দিষ্ট পন্থা: অনেকের বক্তব্য: ডানহাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি তর্জনির কেন্দ্রের ওপর রেখে (চিমটি করে লবণ নেওয়ার মতো করে) এবং কংকরটি তার বৃদ্ধাঙ্গুলির পিছনের দিকে রেখে নিক্ষেপ করতে হবে।
  • আবার অনেকে বলেন: তর্জনী বাঁকা করে বৃত্তের মতো বানিয়ে বৃদ্ধাগুলির জোড়া-সন্ধিতে লাগিয়ে দিতে হবে, দেখতে অনেকটা ১০-এর মতো হবে।
  • কংকর নিক্ষেপের জন্য দাঁড়ানোর স্থান নির্ধারণ করা অথবা জামরাহ ও ব্যক্তির মাঝে অন্তত পাঁচ হাত দূরত্ব থাকতে হবে এমন ধারণা পোষণ করা।

১০ যিলহজ: হাদী ›

  • আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য তামাত্তু ও কিরান হজ আদায়কারীরা যে উট, গরু, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা ইত্যাদি পশু বাধ্যতামূলকভাবে জবেহ করে থাকেন তাকে হাদী বলা হয়। অনেকে বলে থাকেন এটা হজের কুরবানি, কিন্তু আসলে হজের ক্ষেত্রে এর নাম হলো হাদী। কুরবানি, হাদী ও দম এগুলোর মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। কুরবানীর উপলক্ষ্য হলো ঈদ, হাদীর উপলক্ষ্য হজ আর দমের উপলক্ষ্য হলো কাফফারা আদায়। কুরবানী পৃথিবীর যে কোনো জায়গায় করা যায়। হাদী শুধুমাত্র হারাম এলাকা তথা মক্কা, মিনা ও মুযদালিফায় করা যাবে। দম হারামের সীমানার ভিতর আদায় করতে হবে। হাদী ও কুরবানীর গোস্ত নিজে খাওয়া যাবে কিন্তু দম এর গোস্ত নিজে খাওয়া যাবে না। যারা হজের সময় হাদী করছেন তারা যেহেতু মুসাফির তাই তাদের আর সেই বছর কুরবানী করা জরুরী নয়, তবে চাইলে করতে পারেন। ১০ যিলহজ সূর্যোদয় থেকে শুরু করে ১৩ যিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত হাদী করা যায়। হজে তামাত্তু ও হজে ক্বীরান হজকারীদের ওপর হাদী প্রদান করা ওয়াজিব।
  • হারাম এলাকা তথা মিনা, মুযদালিফা ও মক্কার যে কোনো অংশে পশু যবেহ করা যাবে, কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি এখানে যবেহ করেছি এবং মিনার সকল স্থানই যবেহ করার জায়গা, সকল পাহাড়ে ও গিরিপথের কাছে।
  • হাদীর পশু পুরুষ অথবা স্ত্রী দুটিই হতে পারে। প্রাণীর বয়স প্রকার: কমপক্ষে দুম্বা- ছয় মাস, ভেড়া- এক বছর, ছাগল- এক বছর, গরু- দু’বছর ও উট- পাঁচ বছর। প্রাণী একচোখ ওয়ালা, অসুস্থ, খোঁড়া পা ওয়ালা, খুবই দুর্বল হওয়া যাবে না।
  • উট ও গরু হলে একটা পশু সর্বোচ্চ সাত জনে বা এর কম সংখ্যায় (জোড় বা বিজোড়) অংশ নিতে পারবেন। আর ভেড়া বা ছাগল হলে একজনের জন্য একটা পশু যবেহ করতে হবে। যবেহ করা পশুর গোশত চাইলে নিজে খাওয়া যাবে এবং সাথে করে দেশেও নিয়ে আসা যাবে, যেমনটা করেছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। যবেহ করা পশুর গোশত গরীব ও মিসকীন লোকদের বেশি পরিমাণে বিতরণ করা বাঞ্চণীয়।
  • কেউ হাদী করতে না পারলে এর পরিবর্তে তিনি হজের পরবর্তী তিন দিন এবং দেশে ফিরে ৭ দিন (ধারাবাহিকভাবে অথবা ভেঙ্গে ভেঙ্গে) সাওম রাখবেন। মক্কাবাসীদের হাদী করা ওয়াজিব নয়, এমনকি সাওমও রাখতে হবে না।
  • হাদী তিন পদ্ধতিতে আদায় করতে পারেন। প্রথমত, ব্যাংকের মাধ্যমে হাদী যবেহ করার ব্যবস্থা করা। দ্বিতীয়ত, আপনার হজ এজেন্সির মাধ্যমে। তৃতীয়ত, নিজে হাট থেকে হাদী কিনে করা যায়। মিনায় তাবু এলাকায় কোথাও হাদী যবাই করা দেখতে পাবেন না। হাদী করার জন্য নির্ধারিত আলাদা জায়গা আছে মু‘আইসিম নামক এলাকায় যা মিনার সীমানার ভিতর অবস্থিত।
  • ব্যাংকের মাধ্যমে হাদী করা সবচেয়ে বিশ্বস্ত পন্থা। হজের পূর্বে আল-রাজী ব্যাংক বা অন্য কোনো ব্যাংক এর বুথে হাদীর জন্য ৪৫০-৫০০ রিয়াল জমা দিয়ে রশিদ বা টিকিট সংগ্রহ করুন। সাধারণত ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ১০ যিলহজ সকাল ১০টা থেকে হাদী জবেহ করা শুরু করেন এবং যারা মোবাইল নং দেন তাদের এস.এম.এস এর মাধ্যমে হাদী সম্পন্ন করা নিশ্চিত করেন। মক্কা ও মদীনায় অনেক হাদীর টাকা জমা দেওয়ার ছোট ছোট ব্যাংক বুথ দেখতে পাবেন। হজের একটু আগেভাগেই টিকেট ক্রয় করা উত্তম, নইলে পরে হাদী টিকেট পাওয়া যায় না।
  • আপনারা কয়েকজনে আপনার হজ এজেন্সির নেতাকে হাদীর টাকা দিয়ে দিতে পারেন। আপনার হজ এজেন্সি নেতা তিনি মিনায় হাট থেকে হাদী ক্রয় করে জবেহ করার ব্যবস্থা করতে পারেন। আবার আপনি নিজে মিনায় হাটে গিয়ে পশু ক্রয় করে জবেহ করতে পারেন। এমন করলে আপনি কিছু গোস্ত খাওয়ার জন্য নিয়ে আসতে পারেন। তবে সাধারণ হাজীদের পক্ষে হাটে যাওয়া সম্ভব নয়, তাই প্রথম দুইটির যে কোনো একটি পদ্ধতি অনুসরণ করুন।
  • নিজ হাতে যবেহ করা সুন্নাত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজে ৬৩টি উট জবেহ করেছিলেন। যবেহ করার সময় প্রাণীর মুখ থাকবে দক্ষিণ দিকে এবং পশুকে বাম দিকে কাত করে শোয়াতে হবে ও এর পা গুলো ডান দিকে অতঃপর কিবলামুখি হয়ে ছুরি চালাতে হবে।
  • যবেহ করার সময় এ দো‘আ পাঠ করুন:

بِسْمِ اللهِ وَاللهُ أَكْبَرُ، اَللهم مِنْكَ وَلَكَ، اَللهم تَقَبَّلْ مِنِّي.ْ

‘‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবর, আল্লাহুম্মা মিনকা ওয়ালাকা আল্লাহুম্মা তাক্বাব্বাল মিন্নী’’।

সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৯৯৭, ১৯৯৮ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১২২৮; ইবন খুযাইমা, হাদীস নং ২৮৫৭

‘‘আল্লাহর নামে, আল্লাহ মহান।হে আল্লাহ! এ প্রাণী আপনার পক্ষ থেকে এবং এর মালিক আপনি। হে আল্লাহ! আমার এটি আপনি কবুল করুন’’।

সতর্কতা: হজের সময় কিছু অসাধু লোক মিনার তাবুতে এসে হাদী করানোর নামে ভূয়া রশিদ দিয়ে টাকা নিয়ে প্রতারণা করে। হাদী যবেহ না করেই ফোন করে জানিয়ে দেন হাদী হয়ে গেছে! তাই ব্যাংক ছাড়া কারো হাতে এমনি টাকা দিবেন না। আবার কিছু হজ এজেন্সির নেতারাও একই প্রতারণা করেন। তাই আপনার দলের কয়েকজন লোক এজেন্সি নেতার সাথে সরেজমিনে গিয়ে হাদী ক্রয় করা ও যবেহ প্রত্যক্ষ করে অন্যান্য সহযাত্রীদের ফোন করে অবহিত করতে পারেন। হাদী শেষে মিনা অথবা মক্কার পথে রওনা হউন এবং পথিমধ্যে কসর/হলক্ব সেরে ফেলুন।

১০ যিলহজ: কসর/হলক্ব করা ›

  • হাদী করার পর মাথার সকল অংশ থেকে সমানভাবে চুল ছেঁটে ফেলাকে কসর আর সম্পূর্ণ মাথা মুড়িয়ে বা মুণ্ডন করাকে হলক্ব বলা হয়। তবে মুণ্ডন করাই উত্তম। কুরআনে মাথা মুণ্ডন করার কথা আগে এসেছে আর ছোট করার কথা পরে এসেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমস্ত মাথা মুণ্ডন করেছিলেন।
  • যারা মাথা মুণ্ডন করেছিলেন তাদের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রহমত ও মাগফিরাতের দো‘আ করেছেন তিনবার। আর যারা চুল ছোট করেছিলেন তাদের জন্য দো‘আ করেছেন একবার। আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে বলেন, ‘‘তোমাদের কেউ মাথা মুণ্ডন করবে ও কেউ কেউ চুল ছোট করবে।’’ হাদীসে এসেছে, ‘‘আর তোমরা মাথা মুণ্ডন কর, এতে প্রত্যেক চুলের বিনিময়ে একটি ছাওয়াব ও একটি গুনাহের ক্ষমা রয়েছে”।
  • রাস্তায় দেখবেন অনেকে হাতে ইলেকট্রিক রেজার বা ট্রিমার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হজের এই সময়ে চুল কাটাতে ২০-৫০ রিয়াল পর্যন্ত দাবি করবে তারা। দু’মিনিটে আপনার মাথার পুরো চুল ফেলে দিবে। নাপিতকে ডান দিক থেকে চুল কাটা শুরু করতে বলুন। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে এমনটি করেছেন। নিজেদের কাছে রেজার বা ক্ষুর থাকলে আপনারা একে অপরের চুল ফেলে দিতে পারেন। এক্ষেত্রে যে ব্যক্তি কারো চুল ফেলবেন তার চুল আগে ফেলা থাকা জরুরী নয়।

সূরা আল-ফাতাহ, ৪৮:২৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৪৮ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২৯৮

  • মহিলারা তাদের মাথার সমগ্র চুলের অগ্রভাগ হতে তর্জনী আঙ্গুলের এক-তৃতীয়াংশ পরিমাণ কাটবেন (প্রায় এক ইঞ্চি)। নারীদের জন্য হলক নেই। নারীদের মাথা মুণ্ডন করা হারাম।
  • এবার আপনি আপনার ইহরামের কাপড় খুলে ফেলুন, গোসল করে সাধারণ কাপড় পড়ুন। ইহরাম থেকে হালাল হওয়া হজের ওয়াজিব কাজ। একে বলে তাহাল্লুল আল আসগার বা প্রাথমিক হালাল। এখন আপনার ওপর থেকে যৌন সঙ্গম ছাড়া ইহরামের সকল নিষেধাজ্ঞা উঠে গেল। আপনি এখন দেহে সুগন্ধীও ব্যবহার করতে পারেন।

হালাল হওয়ার পর আপনি ইচ্ছা করলে ১০ যিলহজ মক্কায় গিয়ে তাওয়াফে ইফাদাহ ও সা‘ঈ করে সন্ধ্যা বা মধ্য রাতের আগেই মিনায় চলে আসুন। আর যদি ঐ দিন বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়েন তবে রাতটি মিনায় অবস্থান করতে পারেন এবং ১১/১২ যিলহজ দিনের বেলায় কোনো এক সময় মক্কায় গিয়ে তাওয়াফ করতে পারেন। তাকবীরে তাশরিক পাঠ অব্যাহত রাখুন।

তিরমিযী (৩/২৫৭) সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২০৪২

হাদী ও কসর/হলক্ব করার ক্ষেত্রে প্রচলিত ভুলত্রুটি ও বিদ‘আত ›

  • হাদী না করে এর সমপরিমাণ অর্থ সেবামূলক খাতে দান করে দেওয়া।
  • মাথার চুল ছাঁটানোর ক্ষেত্রে বাম দিক দিয়ে শুরু করা।
  • মাথার কিছু অংশ মুণ্ডানো এবং আর কিছু অংশ কসর করা।
  • মাথা মুড়ানোর সময় কিবলার দিকে মুখ করে বসা নিয়ম মনে করা।
  • কিছু লোক একে অন্যের চুল অথবা নিজেই কাচি দিয়ে মাথার বিভিন্ন অংশ থেকে চুল কেটে বক্সে সংরক্ষণ করে রাখে।

১০ যিলহজ: তাওয়াফুল ইফাদাহ ও সা‘ঈ করা ›

  • এ তাওয়াফের অপর নাম তাওয়াফে যিয়ারাহ বা ফরয তাওয়াফ। এটি হজের গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। তাওয়াফুল ইফাদাহ করা ও সা‘ঈ করা হজের ফরয কাজ। আপনি যদি মিনা থেকে মক্কায় এ তাওয়াফ করতে যান তবে দু’ভাবে যেতে পারেন।

এক: পায়ে হেঁটে জামরাত পার করে প্যডেস্ট্রিয়ান টানেল (সুড়ঙ্গ পথ) রাস্তা দিয়ে।

দুই: মিনায় কিং ফয়সাল ওভারব্রিজ-এর উপর থেকে বা জামরাতের পাশে থেকে কার বা মটরসাইকেল ভাড়া করে। আর আপনি যদি মাথা মুণ্ডন করার পরপরই মক্কায় চলে গিয়ে থাকেন তবে আপনার হোটেল বা ভাড়া বাসা থেকেই এ তাওয়াফ করতে যাবেন।

  • রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ১০ যিলহজ সূর্য মধ্য আকাশে বা সূর্য হেলে যাওয়ার পর এ তাওয়াফ সম্পন্ন করেছিলেন। তবে সেই দিন ফজরের সূর্য উদয়ের পর থেকে এ তাওয়াফের সময় শুরু হয়। আর এ তাওয়াফের সময় উন্মুক্ত। কারও কারও মতে ১২ ই যিলহজ সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত। আবার কারও মতে, ১৩ যিলহজ সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত। অবশ্য সত্যনিষ্ঠ একদল আলেমের মত অনুযায়ী এ তাওয়াফ যিলহজ মাস শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত বা ঐ হিজরী বছর শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত করা যাবে। তবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এ তাওয়াফ করে নেওয়াই উত্তম। যার যার তাওয়াফ তাকে নিজেই করতে হবে। অন্য কাউকে কারো পক্ষ থেকে তাওয়াফ করতে পাঠানো যাবে না। প্রয়োজনে হুইল চেয়ারের আশ্রয় নিয়ে তাওয়াফ ও সা‘ঈ শেষ করতে হবে।
  • যেভাবে উমরাহর সময় তাওয়াফ করেছিলেন ঠিক তেমনি এ তাওয়াফের নিয়ম। শুধু ব্যতিক্রম এই যে, এখন আপনি ইহরামের কাপড় পরা নেই তাই কোনো ইদত্বিবাহ নেই এবং এ তাওয়াফে রমলও নেই। সাধারণ পোশাক পরিধান করে এ তাওয়াফ করবেন। এ তাওয়াফের সময় প্রচুর লোকের চাপ হয়। তাই অবস্থা বুঝে ফাঁকা জায়গা দিয়ে তাওয়াফ শেষ করুন।
  • তাওয়াফ শেষে মাক্বামে ইবরাহীমের পেছনে অথবা মসজিদে হারামের যে কোনো স্থানে দুই রাকাত সালাত পড়ুন। এবার যমযম কুপের পানি পান করুন এবং কিছু পানি আপনার মাথায় ঢালুন। এবার সাফা-মারওয়ায় গিয়ে ঠিক উমরাহর মতো সা‘ঈ করুন। এ সাঈর পর আর চুল কাটতে হবে না।
  • মাসিক স্রাব-গ্রস্ত মহিলাগণ এ তাওয়াফ করার জন্য অপেক্ষা করবেন। স্রাব বন্ধ হলে তাওয়াফে যিয়ারত সেরে নিবেন। এক্ষেত্রে কোনো দম দিতে হবে না। আর যদি পরিস্থিতি এমন হয় যে স্রাব বন্ধ হওয়ার সময় পর্যন্ত কোনো ক্রমেই অপেক্ষা করা যাচ্ছে না ও পরবর্তীতে এসে তাওয়াফ যিয়ারাহ আদায় করে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই, তবে জমহুর ফুকহা ও আরো আলেম-আলেমগণের মত অনুযায়ী ন্যাপকিন দিয়ে ভালোভাবে বেঁধে তাওয়াফ সেরে নেওয়া যাবে।    
  • এ তাওয়াফ ও সা‘ঈ শেষ করার পর যৌনসঙ্গমও আপনার জন্য হালাল হয়ে যাবে। একে বলে তাহাল্লুল আল আকবার বা চূড়ান্ত হালাল হওয়া।
  • ১০ জিলহজ তাওয়াফ ও সা‘ঈ শেষ হয়ে যাওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব সন্ধ্যা বা মধ্য রাতের পূর্বেই তাশরীকের রাত্রিযাপনের জন্য মিনায় ফিরে আসুন।

১০ যিলহজ: কাজের ধারাবাহিকতা ভঙ্গ ›

  • এটি আরেকটি বিতর্কিত বিষয়! হজে যাওয়ার আগে এ সম্পর্কে আপনার জ্ঞান থাকা জরুরি। অনেকে আপনাকে ১০ যিলহজ এর সকল কাজগুলো ধারাবাহিকতা অনুসরণ করার জন্য বলবে, ধারাবাহিকতা ভঙ্গ করলে একটি পশু যবেহ করে দম দিতে বলবে! কিন্তু সহীহ হাদীসের তথ্যসূত্র অনুসারে ধারাবাহিকতা ভঙ্গ হলে কোনো দমের কথা বলা নেই; বরং এতে কোনো ক্ষতি নেই বলা আছে! আল্লাহ তা‘আলা অসীম দয়ালু ও করুণাময়, তাই তিনি তার বান্দাদের ওপর কোনো বিষয় কঠিন করে জোরপূর্বক চাপিয়ে দেন না। আপনি যদি আপনার সাধারণ জ্ঞান ব্যবহার করেন তাহলেই বুঝতে পারবেন কোনটা সঠিক আর কোনটা ভুল।
  • ১০ যিলহজ যদি এমন হয়, আপনার না জানার কারণে হজের কোনো বিধান ধারাবাহিকভাবে সম্পাদন করা হয় নি অথবা কোনো ওজর/জটিলতার কারণে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কোনো বিধান পালন করতে গিয়ে হজের অন্য কোনো বিধান এর ধারাবাহিকতা ভঙ্গ হয়ে যায় তাহলে এতে কোনো সমস্যা নেই। এ জন্য কোনো কাফফারা আদায় করতে হবে না। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে ধারাবাহিকতা ভঙ্গ না করা উত্তম। (উদাহরণ: আপনি যদি ব্যাংক বুথ থেকে হাদী টিকেট ক্রয় করেন, আর আপনার কাছে যদি মোবাইল না থাকে তবে আপনি তো জানতে পারবেন না আপনার পশু ১০ যিলহজ কখন যবেহ করা হলো! তবে আপনি কতক্ষণ পর্যন্ত ইহরামের কাপড় পরে থাকবেন!)
  • হজের কার্যক্রমগুলো ধারাবাহিকভাবে করা সুন্নাত: কংকর নিক্ষেপ, হাদী, কসর/হলক্ব, তাওয়াফে ইফাদাহ, সা‘ঈ করা; কিন্তু কেউ যদি ধারাবাহিকতা ভঙ্গ করে কোনটি আগে বা কোনটি পরে করেন কোনো জটিলতার কারণে তাহলে তা করা যাবে। কারণ ইবন আব্বাস থেকে বর্ণিত বেশ কয়েকটি হাদীসে লোকদের বিভিন্ন কাজ আগে পরে হওয়ার কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘কর, কোনো অসুবিধা নেই’’, ‘‘কোনো সমস্যা নেই”।

১১ যিলহজ: মিনায় রাত্রিযাপন ও জামরাতে কংকর নিক্ষেপ ›

  • রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যোহরের সালাত মসজিদুল হারামে আদায় করে, তাওয়াফে যিয়ারত শেষে মিনায় ফিরে এসেছেন ও তাশরীকের রাত্রিগুলো মিনায় অবস্থান করেছেন। মিনায় তাশরীকের রাত্রীযাপন গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল। বিভিন্ন মতাদর্শের বেশিরভাগ আলেম ও উলামা মিনায় তাশরীকের রাত্রীযাপন করাকে অত্যাবশ্যকীয় হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন।

আপনি যদি ১০ যিলহজ দিনের বেলায় তাওয়াফে ইফাদাহ না করে থাকেন তবে উত্তম হবে এ তাশরীকের রাতটি মিনায় অবস্থান করে পরদিন সকালে মক্কায় গিয়ে ফরয তাওয়াফ সম্পন্ন করা। আবার আপনি যদি মক্কায় গিয়ে তাওয়াফ শেষ করে সন্ধা বা মধ্যরাতের আগে মিনায় ফিরে আসতে পারেন তবেও কোনো সমস্যা নেই। মিনায় রাতের অর্ধেকের বেশি সময় অবস্থান করা সহ রাত্রিযাপন করা বাঞ্চনীয়। আপনার শক্তি-সামর্থ, যাতায়াত পরিস্থিতি ও দলের লোকদের সাথে আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিন।

সহীহ হাদীসের তথ্যসূত্র দেখুন: সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৬২৫, ১৬২৬; ইফা; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৩০৫; মুসনাদে আহমদ; ইবন মাজাহ। আবু দাউদ, হাদীস নং ১৬৮৩

  • আপনি যদি আগের দিন ফরয তাওয়াফ না করে থাকেন তবে ১১ যিলহজ দিনের বেলায় মক্কায় গিয়ে তাওয়াফ শেষে মাক্বামে ইবরাহীমের পেছনে অথবা মসজিদে হারামের যে কোনো স্থানে দুই রাকাত সালাত পড়ুন, যমযমের পানি পান করুন এবং সা‘ঈ করে আবার মিনায় ফিরে আসুন।
  • এবার মিনায় দুপুরের সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে যাওয়ার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত তিনটি জামরাহে গিয়ে কংকর নিক্ষেপ করুন, এটি কংকর নিক্ষেপের উত্তম সময়। এতে মোট ২১টি কংকর লাগবে (প্রতিটির জন্য ৭টি করে)। অবশ্য দুপুরের সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে যাওয়ার পর থেকে সুবহে সাদিক হওয়ার আগ পর্যন্ত কংকর নিক্ষেপ করা যেতে পারে। কংকর নিক্ষেপের সময় জামরার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা অত্যাবশ্যকীয়।
  • প্রথমে জামরাতুল সুগরার (ছোট জামরাহ) মুখোমুখি হয়ে কা‘বা আপনার বামে, মিনা ডানে রেখে অথবা যে কোনো ভাবে দাঁড়িয়ে ডান হাত উচু করে আলাদা আলাদাভাবে ৭টি কংকর একে একে নিক্ষেপ করুন এবং প্রতিবার নিক্ষেপের সময় বলুন: اَللهُ أَكْبَر ‘‘আল্লাহু আকবার’’

     ‘‘আল্লাহ মহান’’।

  • প্রথম জামরাহতে কংকর নিক্ষেপের পর একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে কিবলার দিকে মুখ করে (ছোট জামরাহকে ডানে রেখে) দুই হাত উঠিয়ে আপনার ইচ্ছা অনুযায়ী দীর্ঘক্ষণ দো‘আ করুন। এরপর পরবর্তী মধ্যম জামরাহের দিকে এগিয়ে যান।

এবার জামরাতুল উস্তার (মধ্যম জামরাহ) মুখোমুখি হয়ে কা‘বা আপনার বামে, মিনা ডানে রেখে অথবা যে কোনোভাবে দাঁড়িয়ে ডান হাত উঁচু করে আলাদা আলাদাভাবে ৭টি কংকর একে একে নিক্ষেপ করুন এবং জামরাতুল সুগরার মতো করে প্রতিবার ‘আল্লাহু আকবার’ বলুন।

  • দ্বিতীয় জামরাহে কংকর নিক্ষেপের পর আবারো একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে কিবলার দিকে মুখ করে (মধ্যম জামরাহকে ডানে রেখে) দুই হাত উঠিয়ে আপনার ইচ্ছা অনুযায়ী দীর্ঘক্ষণ দো‘আ করুন। এরপর পরবর্তী বড় জামরাহের দিকে এগিয়ে যান।
  • এবার জামরাতুল ‘আকাবার (বড় জামরাহ) মুখোমুখি হয়ে কা‘বা আপনার বামে, মিনা ডানে রেখে অথবা যে কোনোভাবে দাঁড়িয়ে ডান হাত উচু করে আলাদা আলাদাভাবে ৭টি কংকর একে একে নিক্ষেপ করুন এবং বিগত দুই জামরাহের মতো করে প্রতিবার ‘আল্লাহু আকবার’ বলুন।
  • তৃতীয় জামরায় কংকর নিক্ষেপ শেষ করে আর কোনো দো‘আ না করেই জামরাত বিল্ডিং ত্যাগ করুন এবং মিনার তাবুতে ফিরে যান।
  • মিনায় অবস্থান করে সালাত আদায় করা, কুরআন তিলাওয়াত, তসবিহ তাহলিল, দো‘আ, যিকির ও ইসতেগফার করা বাঞ্ছণীয়। তাই তাবুর মধ্যে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে অথবা গল্পগুজব ও ঘুরাঘুরি না করে মিনার সময়গুলোকে কাজে লাগানো উত্তম। মিনায় সালাত আদায়ের নিয়ম ৮ই যিলহজের মতো করে হবে। মিনায় এ তাশরীকের রাতগুলো যাপন করা ওয়াজিব।
  • অসুস্থ্য ও দুর্বল লোকেরা সূর্যাস্তের পর থেকে সুবহে সাদিক হওয়ার আগ পর্যন্ত কংকর নিক্ষেপ করতে পারবেন অথবা তার পক্ষ থেকে অন্য একজনকে কংকর নিক্ষেপ করার জন্য নিয়োগও করতে পারবেন।
  • সতর্কতা: আজকাল কিছু কিছু হজ এজেন্সির নেতাদের দেখা যায় তারা ১১ তারিখের মধ্য রাতের পর হাজীদের নিয়ে মিনা ত্যাগ করে চলে যান। রাতের বাকি অংশ মক্কায় যাপন করে পরদিন যোহরের পর মক্কা থেকে এসে কংকর নিক্ষেপ করেন ও আবার মক্কায় চলে যান। এরূপ করা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শের বিপরীত। বিশেষ অসুবিধায় না পড়লে এরূপ করা উচিৎ নয়। আর মিনায় রাত ও দিন উভয়টাই যাপন করা উচিত। কেননা মিনায় রাত্রিযাপন যদি ওয়াজিবের পর্যায়ে পড়ে থাকে তবে দিন যাপন করা সুন্নাত, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সর্বোপরি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিন ও রাত উভয়টাই মিনায় যাপন করেছেন।
  • এমন পরিস্থিতিতে পড়লে আপনি কি করবেন? আপনি যদি তাকওয়া অবলম্বনকারী হন ও বিশেষ কোনো ওজর না থাকে তবে দল থেকে আলাদা হয়ে যান ও মিনায় অবস্থান করুন। আপনি অন্যদের বিষয়টি বুঝাতে পারেন তবে এনিয়ে দ্বন্দে যাবেন না। আপনি নিশ্চয় এ কয় দিনে পথ-ঘাট বুঝে যাবেন আর হাতে যদি মোবাইল ফোন ও কিছু রিয়াল থাকে তাহলে কোনো সমস্যাই নেই। হজ যখন করতেই এসেছেন তবে এ শেষ পর্যায়ে একটু কষ্ট করে ওয়াজিব ও সুন্নাতগুলো পালন করে যান। অবশ্য আপনি হজে যাওয়ার পূর্বে আপনার এজেন্সির লোকদের সাথে এ বিষয়টি নিয়ে হালকাভাবে আলোচনা করে তাদের মনোভাবটাও বুঝে ফেলতে পারেন!

১২ যিলহজ: মিনায় রাত্রিযাপন ও জামরাতে কংকর নিক্ষেপ ›

  • যদি এখনও তাওয়াফে ইফাদাহ না করে থাকেন, তাহলে ১২ যিলহজ দিনের বেলায় মক্কায় গিয়ে তাওয়াফ করুন। তাওয়াফ শেষে মাক্বামে ইবরাহীমের পেছনে অথবা মসজিদে হারামের যে কোনো স্থানে দুই রাকাত সালাত পড়ুন, যমযমের পানি পান করুন এবং সা‘ঈ করে মিনায় ফিরে আসুন।
  • ঠিক ১১ জিলহজের মতো করে একই নিয়মে দুপুরের সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে যাওয়ার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত তিনটি জামরাতে গিয়ে কংকর নিক্ষেপ শেষ করুন।
  • সাধারণত ১২ তারিখ প্রথম ওয়াক্তে কংকর মারার প্রচণ্ড ভীড় থাকে। তাই একটু দেরী করে বিকালের দিকে গেলে ভালো হয়। আবার ১২ তারিখই কংকর নিক্ষেপের পর্ব শেষ করা যায়, তবে যুক্তিযুক্ত কারণ সাপেক্ষে। আপনি যদি কোনো বিশেষ কারণে; যেমন: সম্পদ নষ্ট হওয়ার ভয় থাকলে, জীবনের নিরাপত্তার অভাব বোধ করলে, গুরুতর শারিরীক অসুস্থতার অবনতি, রোগীর সেবার জন্য সাথে থাকা, চাকরী হারানোর ভয় ইত্যাদি বিশেষ কারণে আজ কংকর নিক্ষেপ করে সূর্যাস্তের পূর্বেই মক্কায় ফিরে যেতে চান তবে আপনি যেতে পারবেন। এতে কোনো ক্ষতি নেই।
  • আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে বলেন, ‘‘যদি কেউ তাড়াতাড়ি করে দুই দিনে চলে আসে তবে তার কোনো পাপ নেই। আর যদি কেউ বিলম্ব করে তবে তারও কোনো পাপ নেই, এটা তার জন্য; যে তাকওয়া অবলম্বন করে”।

মুসনাদে আহমদ, সহীহ মুসলিম সূরা আল-বাকারা: ২:২০৩

  • আপনি যদি ১২ তারিখই কংকর নিক্ষেপের পর্ব শেষ করতে চান তবে অবশ্যই সূর্যাস্তের পূর্বেই মিনা এলাকা ত্যাগ করতে হবে। মিনায় সূর্যাস্ত হয়ে গেলে আর মিনা ত্যাগ করবেন না, বরং রাতে মিনায় অবস্থান করে পরবর্তী দিন একই নিয়মে তিনটি জামরাতে কংকর নিক্ষেপ করে তারপর মিনা ত্যাগ করবেন। তবে কোনো বৈধ কারণ ছাড়া মিনা ত্যাগ না করাই উত্তম। কংকর নিক্ষেপের জন্য মিনায় ১৩ তারিখ পর্যন্ত অর্থাৎ তিনদিন অবস্থান করা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত।
  • মক্কার উদ্দেশ্যে মিনা ত্যাগ করার পর হজের সর্বশেষ ও চূড়ান্ত কাজ হলো বিদায়ী তাওয়াফ করা। দেশে ফেরা বা মদীনা গমনের আগে এ তাওয়াফ করবেন। এর মাঝে যে কয়দিন মক্কায় থাকবেন সে কয়দিন নফল তাওয়াফ, জামআতে সালাত, তাহাজ্জুদ সালাত, দো‘আ ও যিকিরে মশগুল থাকবেন।
  • সতর্কতা: আজকাল কিছু কিছু হজ এজেন্সির নেতাদের দেখা যায় তারা ১২ তারিখে কংকর নিক্ষেপের পর হাজীদের নিয়ে মিনা ত্যাগ করে চলে যান। তারা কুরআনের ঐ আয়াত পেশ করে অথবা দলের কয়েকজন লোকের অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে, সবাই দুর্বল ও ক্লান্ত হয়ে গেছে, আশেপাশে অন্যান্যরা সবাই চলে যাচ্ছে, তাবুতে আর খাবার পাওয়া যাবে না ইত্যাদি বলে সবাইকে নিয়ে মক্কায় চলে যেতে চায়। তাদের উদ্দেশ্য হলো তাদের কষ্ট লাঘব করা। সর্টকাটে হজ শেষ করানো। ওজর থাকতে পারে কারো ব্যক্তিগত, সে অনুযায়ী তার জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। তাই বলে সকলকে ওজরের আওতায় ফেলে এমন কাজ করা অনুচিত। দুই দিন মিনায় অবস্থান করে মিনা ত্যাগ করার অনুমতি আছে তবে যুক্তিযুক্ত কারণ সাপেক্ষে।
  • এমন পরিস্থিতিতে পড়লে আপনি কি করবেন? আবার ঐ একই কথা বলবো। আপনি যদি তাকওয়া অবলম্বনকারী হন ও বিশেষ কোনো ওজর না থাকে তবে দল থেকে আলাদা হয়ে যান ও মিনায় অবস্থান করুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত অনুসরণ করুন ও তিন দিন মিনায় অবস্থান করে জামরায় কংকর নিক্ষেপ করে তারপর মক্কায় ফিরে যান।

১৩ যিলহজ: মিনায় রাত্রিযাপন ও জামরাতে কংকর নিক্ষেপ ›

  • ১১ ও ১২ জিলহজের মতো করে একই নিয়মে দুপুরের সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে যাওয়ার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত তিনটি জামরাতে গিয়ে কংকর নিক্ষেপ শেষ করুন। শেষ দিনে লক্ষ্য করবেন লোকের ভীড় অনেক কমে গেছে। এ দিন আসরের সালাতের পর থেকে তাকবীরে তাশরীক পড়া শেষ।
  • এরপর মিনা ছেড়ে মক্কায় চলে আসুন। আল্লাহ তা‘আলা আপনাকে পরিপূর্ণভাবে হজ শেষ করার তাওফীক দিয়েছেন সেজন্য তাঁর দরবারে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করুন। যদিও শেষ একটি কাজ ‘তাওয়াফুল বিদা’ করা বাকি আছে। এ দিন আসরের সালাতের পর থেকে তাকবীরে তাশরিক পড়া শেষ হয়ে যাবে। সৌদি মু‘আল্লিম সাধারণত কখনো গাড়ি দিয়ে থাকে আবার দেয়ও না এ শেষ দিনে মালপত্র সহ আসার জন্য। আপনারা কয়েকজনে মিলে গাড়ি ভাড়া করে অথবা পায়ে হেঁটেই মক্কায় পৌছে যেতে পারেন।
  • এবার যতদিন আপনি মক্কায় থাকবেন, প্রতি ওয়াক্ত সালাত জামাআতের সাথে মসজিদে হারামে গিয়ে আদায় করার চেষ্টা করুন; কারণ মসজিদে হারামে সালাত পড়া আর অন্য সাধারণ মসজিদের সালাতের চেয়ে ১ লক্ষ গুণ শ্রেয়। যে কয়দিন মক্কায় থাকবেন সে কয়দিন নফল তাওয়াফ, মসজিদে জামআতে সালাত, দো‘আ ও যিকরে মশগুল থাকবেন।
  • যতবার ইচ্ছে নফল তাওয়াফ করুন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কা‘বার ইয়েমেনী কর্নার ও কালো পাথরের বিষয়ে বলেছেন, ‘‘যে এ দুটি স্পর্শ করে এবং তাওয়াফ সম্পন্ন করেন আল্লাহ তার নামে একটি ভালো কাজের সওয়াব লিখে দেন এবং একটি গুনাহ মুছে দেন, তার জন্য একটি অতিরিক্ত মর্যাদা লিখে দেন এবং যে বারবার এটা করবে সে যেন একটি গোলাম মুক্ত করে দিল’’।
  • হজের সর্বশেষ ও চূড়ান্ত কাজ হলো বিদায়ী তাওয়াফ করা। দেশে ফেরা বা মদীনা গমনের আগে সর্বশেষ কাজ হিসাবে এ তাওয়াফ করবেন।
  • সতর্কতা: আজকাল অনেকে নিয়ম মোতাবেক হজেররপ্রতিটি কাজ সম্পাদন করার পরও কেউ কেউ এরূপ সন্দেহ পোষণ করতে থাকেন যে, কে জানে কোথাও কোনো ভুল হলো কি না! কিছু হজ এজেন্সির নেতাদেরও দেখা যায় তারা হাজী সাহেবদের উৎসাহিত করেন যে কোনো ভুলত্রুটি হয়ে থাকতে পারে তাই একটা দমে-খাতা দিয়ে দিন, শতভাগ বিশুদ্ধ হয়ে যাবে আপনার হজ!
  • এরূপ করাটা মারাত্মক অন্যায়। কেননা আপনি হজ সহীহ শুদ্ধ ভাবে পালন করা সত্ত্বেও নিজ ইচ্ছায় হজকে সন্দেহযুক্ত করছেন। আপনার যদি কোনো বিষয় নিয়ে সত্যি সন্দেহ হয় তবে একজন বিজ্ঞ আলেমকে আপনার হজের সমস্যার কথা বলে শুনান। তিনি যদি দম দিতে বলেন তবেই দম দিন। অন্যথায় নয়। শুধু আন্দাজের ওপর ভিত্তি করে দমে-খাতা দেওয়ার কোনো বিধান ইসলামে নেই। তবে হাঁ, আপনি চাইলে নফল পশু জবাই সাদকা হিসাবে করতে পারেন। আর দম দিতে চাইলে কাউকে বিশ্বাস করে হাতে রিয়াল দিয়ে ছেড়ে দিবেন না। ব্যাংক এর বুথে গিয়ে দম টিকিট কিনে দিন অথবা হালাকা (পশুর হাট এলাকা) গিয়ে নিজে দম দিয়ে আসুন।

তাওয়াফুল বিদা/বিদায়ী তাওয়াফ ›

  • তাওয়াফুল বিদা হজের ওয়াজিব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায়ী তাওয়াফ আদায় করেছেন এবং বলেছেন, ‘‘বায়তুল্লাহর সাথে শেষ সাক্ষাত না করে তোমাদের কেউ যেন না যায়।’’ অন্য এক বর্ণনা অনুসারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবন আববাস রাদিয়াল্লাহু আনহু কে বলেন, লোকদেরকে বলো, তাদের শেষ কর্ম যেন হয় বায়তুল্লাহর সাথে সাক্ষাত, তবে তিনি মাসিক স্রাবগ্রস্ত নারীর জন্য ছাড় দিয়েছেন।
  • হজ শেষে আপনি যদি মক্কায় অবস্থান করেন তবে এ তাওয়াফ আপনি মক্কা ছাড়ার আগ মুহূর্তে করবেন। মনে রাখবেন এটাই হবে মক্কায় আপনার শেষ কাজ। এ তাওয়াফের পর কোনো সময় ক্ষেপনকারী কাজ করা যাবে না। যেমন, ঘুমানো যাবে না। ওজর ছাড়া বেশি সময় পার করলে আবারও এ তাওয়াফ করতে হবে। এ তাওয়াফের পর সা‘ঈ নেই। এ তাওয়াফ সাধারণ নফল তাওয়াফের মত; অর্থাৎ কোনো রমল নেই তবে তাওয়াফ শেষে দু’রাকাত সালাত আদায় করুন। তাওয়াফ শেষে যমযম এর পানি পান করে বাহির হন। অনেকে মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় সম্মানপ্রদর্শন করে পশ্চাৎমুখী হয়ে বের হন যার কোনো ভিত্তি নেই।
  • কোন নারী যদি তাওয়াফে ইফাদাহ করার পর ঋতুবর্তী হয়ে থাকেন এবং তাওয়াফে বিদার জন্য অপেক্ষা করতে না পারেন তাহলে তিনি চলে যেতে পারেন। এ ক্ষেত্রে কোনো কাফফারার বা দম দেওয়ার দরকার হবে না।
  • এ তাওয়াফের মাধ্যমে আপনার হজে তামাত্তু সম্পন্ন হলো।

সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৩৫০, ২৩৫১

যারা হজে ক্বিরান করবেন ›

৮ জিলহজের আগে:

  • মীকাতের বাহির থেকে আগত ব্যক্তিগণ মীকাত থেকেই ইহরাম করবেন, (মক্কার অধিবাসীরা তাদের বাসস্থান থেকে করবেন) তালবিয়া পাঠ করতে থাকবেন এবং একইসঙ্গে হজ ও উমরাহর নিয়ত করবেন।

‘‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা উমরাতান ওয়া হাজ্জান’’।

  • তাওয়াফুল কুদুম করতে পারেন। এটা বাধ্যতামুলক নয়, সুন্নাত।
  • তাওয়াফুল কুদুমের সঙ্গে সা‘ঈও করতে পারেন। তবে কেউ যদি সা‘ঈ না করেই হজের জন্য যান তাহলে তাকে তাওয়াফুল ইফাদার পরে অবশ্যই সা‘ঈ করতে হবে।
  • এরপর ৮ যিলহজ পর্যন্ত ইহরাম অবস্থায় থাকতে হবে এবং ইহরামের সকল বিধি-নিষেধ মেনে চলতে হবে।

৮ যিলহজ:

  • যেহেতু আপনি ইহরাম অবস্থায়ই আছেন, তাই মিনায় চলে যাবেন এবং হজে তামাত্তুর সকল বিধান পালন করবেন, তবে আপনাকে নতুন করে হজের নিয়ত করতে হবে না, কারণ ইহরাম করার সময় আপনি হজের নিয়ত করেছেন।

৯ যিলহজ:

  • হজে তামাত্তুর মতো সকল বিধান পালন করুন।

১০ যিলহজ:

  • হজে তামাত্তুর মতোই সকল বিধান পালন করবেন, তবে কিছু বিষয় লক্ষ্য করতে হবে।
  • তাওয়াফুল কুদুমের পর সা‘ঈ করে না থাকলে তাওয়াফে ইফাদার পরে করতে হবে। তবে কেউ যদি তাওয়াফে কুদুমের সময় সা‘ঈ করে থাকেন তাহলে তার আর করতে হবে না। এতে কোনো ক্ষতি নেই।

১১, ১২ ও ১৩ যিলহজ:

  • হজে তামাত্তুর মতো সকল বিধান পালন করুন। বিদায় তাওয়াফের ক্ষেত্রে হজে তামাত্তুর একই নিয়ম প্রযোজ্য।

š যারা হজে ইফরাদ করবেন 

৮ জিলহজের আগে:

  • মীকাতের বাহির থেকে আগত ব্যক্তিগণ মীকাত থেকেই ইহরাম করবেন, (মক্কার অধিবাসীরা তাদের বাসস্থান থেকে করবেন) তালবিয়া পাঠ করতে থাকবেন এবং শুধুমাত্র হজের নিয়ত করবেন।

‘‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা হাজ্জান’’।

  • তাওয়াফুল কুদুম করতে পারেন। এটা বাধ্যতামুলক নয়, সুন্নাত।
  • তাওয়াফুল কুদুমের সঙ্গে সা‘ঈও করতে পারেন। তবে কেউ যদি সা‘ঈ না করেই হজের জন্য যান তাহলে তাকে তাওয়াফুল ইফাদার পরে অবশ্যই সা‘ঈ করতে হবে।
  • এরপর ৮ যিলহজ পর্যন্ত ইহরাম অবস্থায় থাকতে হবে এবং ইহরামের সকল বিধি-নিষেধ মেনে চলতে হবে।

৮ যিলহজ:

  • যেহেতু আপনি ইহরাম অবস্থায়ই আছেন, তাই মিনায় চলে যাবেন এবং হজে তামাত্তুর সকল বিধান পালন করবেন, তবে আপনাকে নতুন করে হজের নিয়ত করতে হবে না, কারণ মীকাতে ইহরাম করার সময় আপনি হজের নিয়ত করেছেন।

৯ যিলহজ:

  • হজে তামাত্তুর মতো সকল বিধান পালন করুন।

১০ যিলহজ:

  • হজে তামাত্তুর মতোই সকল বিধান পালন করবেন, তবে কিছু বিষয় লক্ষ্য করতে হবে।
  • কোনো হাদী প্রদান করতে হবে না।
  • তাওয়াফুল কুদুমের পর সা‘ঈ করে না থাকলে তাওয়াফে ইফাদার পরে করতে হবে। তবে কেউ যদি তাওয়াফে কুদুমের সময় সা‘ঈ করে থাকেন তাহলে তার আর করতে হবে না।

১১, ১২ ও ১৩ যিলহজ:

  • হজে তামাত্তুর মতো সকল বিধান পালন করুন। বিদায়ী তাওয়াফের ক্ষেত্রে হজে তামাত্তুর একই নিয়ম প্রযোজ্য।

হজের পর যা করতে পারেন ›

  • হজ সম্পন্ন করার পর আপনি যতো বেশি পারেন মসজিদুল হারামে ফরয, সুন্নাত, নফল, জানাযা, চাশত, তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করুন এবং নফল তাওয়াফ করুন। নফল তাওয়াফ করার নেকী অনেক অনেক বেশি।
  • হজের পর যদি আপনার বাড়ি ফিরে যাওয়ার ফ্লাইট থাকে তবে বিদায় তাওয়াফ করে ফ্লাইট ধরুন। হজের পর আপনি কিছু ইসলামিক ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখে আসতে পারেন। আপনি এ সময়ে কিছু কেনাকাটাও করতে পারেন। আমাদের হজ সফরের ধারাবাহিকতায় এবার মদীনা যাওয়ার পালা।

মদীনার উদ্দেশ্যে মক্কা ত্যাগ ›

  • আপনার ব্যাগপত্র গুছিয়ে মদীনার যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হন। তাওয়াফে বিদা করে এসেই হোটেল থেকে ব্যাগপত্র নামিয়ে যাত্রার প্রস্তুতি নিন।
  • বাস আসার সাথে সাথে আপনার লাগেজ বাসের ছাদে উঠিয়ে আপনিও বাসে উঠে পড়ুন। ৭-৮ ঘন্টা লাগবে মদীনা পৌছাতে। এটা যেহেতু লম্বা যাত্রা তাই কিছু ফল, হালকা খাবার ও পানি সঙ্গে নিয়ে নিন।
  • পথিমধ্যে বাস একটি রেস্তোরাঁয় যাত্রাবিরতি করবে। আপনি হাতমুখ ধুয়ে ও বাথরুম সেরে নিতে পারেন। কিছু হালকা খাবার খেতে পারেন। সফরে ভারী খাবারের পরিবর্তে হালকা খাবার গ্রহণ করাই উত্তম। হাইওয়েতে বাস সাধারণত ১০০-১৪০ কি:মি বেগে চলে। ভয় পাওয়ার কিছু নেই, ইন-শাআল্লাহ কিছু হবে না। রাস্তার চারপাশে শুধু পাহাড়, মরুভুমি ও উঠের দল লক্ষ্য করবেন।
  • মদীনায় পৌঁছানোর পর পরিবহন বাস আপনাকে প্রথমেই নিয়ে যাবে মদীনা হজযাত্রী ব্যবস্থাপনা অফিসে।
  • তারা হজযাত্রী সংখ্যা গণনা করবে। এবং তারা আপনার পরিচয়ের জন্য আপনাকে হাতের ব্যান্ড ও মদীনা পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) প্রদান করবে।
  • এই হাতের ব্যান্ড ও আইডি কার্ড খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে আপনার নাম, ঠিকানা ও ফোন নম্বর আরবিতে লেখা রয়েছে। আপনি যদি হারিয়ে যান তাহলে এটা আপনার মু‘আল্লিম ও এজেন্সিকে খুঁজে বের করতে সাহায্য করবে। এরপর মদীনায় হোটেল/বাড়িতে গিয়ে উঠবেন।

মদীনা ও মসজিদে নববীর ইতিহাস 

  • মদীনা প্রসিদ্ধ শহর। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিকট প্রিয় এ শহর, যেখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরত করেছেন, বসবাস করেছেন, ইসলামি রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছেন, তাঁর মসজিদ আছে ও তিনি কবরস্থ হয়েছেন।
  • এ পবিত্র শহর আরও কয়েকটি নামে পরিচিত; ইয়াসরিব, তা-বা, তাইবা, মদীনা ইত্যাদি।
  • আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাˆ থেকে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন;  ‘‘হে আল্লাহ! মক্কার ন্যায় অথবা তার চেয়ে অধিক মদীনার মুহাব্বত আমাদের অন্তরে সৃষ্টি করুন। হে আল্লাহ আমাদের খাদ্যে ও উপাদানে বরকত দিন এবং তার আবহাওয়া আমাদের স্বাস্থ্যের উপযোগী করুন”।
  • রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় মক্কার চেয়ে দ্বিগুণ বরকত দানের কথা বলে আল্লাহর কাছে দো‘আ করেছেন। এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘ঈমান (শেষ যামানায়) মদীনার পানে ফিরে আসবে যেমন: সাপ নিজ আশ্রয় গর্তে ফিরে আসে’’। অপর এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘যে ব্যক্তি দুঃখ কষ্ট সহ্য করে মদীনায় অবস্থান করবে এবং মদীনায় মৃত্যুবরণ করবে, আমি কিয়ামতের দিবসে তার জন্য সুপারিশ অথবা সাক্ষ্য প্রদানকারী করব”।

সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৮৮৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৩৭৬ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৮৮৫; সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৮৭৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৩৬৩

  • মদীনায় বসবাস উত্তম, মদীনার একটি বড় ফযীলত হচ্ছে; নিকৃষ্ট লোকেরা সেখানে অবস্থান করতে পারবে না আর সৎ ব্যক্তিরা সেখানে স্থায়ীভাবে অবস্থান করতে পারে।
  • মদীনাকে নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে। মদীনায় মহামারী/প্লেগ রোগ ছড়াবে না, মদীনায় দাজ্জাল প্রবেশ করতে পারবে না। মদীনায় সকল রাস্তায় আল্লাহর ফিরিশতাগণ রক্ষী হিসেবে অবস্থান করছেন।
  • রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আইর’ ও ‘সাউর’ এর মধ্যস্থলকে মদীনার হারাম বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। মক্কার হারামের মতো এখানকার হারামের অভ্যন্তরে কিছু কাজের বিধি-নিষেধ প্রযোজ্য।
  • মদীনায় প্রচুর পরিমাণে খেজুরের বাগান ও কিছু সমতল ভূমি লক্ষ্যনীয়।
  • রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি মসজিদ নির্মাণের নিমিত্তে প্রথমে বনু নদ্বীরের সর্দারের কাছ থেকে খেজুর বাগান ও পরে সুহাইল ও সাহল-এর কাছ থেকে মসজিদের জন্য জায়গা করেন এবং নিজে মসজিদ নির্মাণে অংশ নেন। আব্দুল্লাহ ইবন উমরের বর্ণনা অনুযায়ী রাসূলের যুগের মসজিদের ভিত্তি ছিল ইটের, ছাদ ছিল খেজুরের ডালের এবং খুঁটি ছিল খেজুরের গাছের কাণ্ডের। সে সময় মসজিদের পরিধি ছিল আনুমানিক ২৫০০ মিটার।
  • এরপর উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর যুগে এবং ওসমান ইবন আফফান-এর যুগে মসজিদের সম্প্রসারণ ঘটে। পরবর্তীতে বেশ কয়েকজন মুসলিম শাসকের আমলে মসজিদের উন্নয়ন ও সম্প্রসারন ঘটে।

সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৮৮০ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৮৭৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৩৭২

  • এরপর সৌদি সরকার যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখন মসজিদের ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়। ১৯৫১ ইং সালে বাদশাহ আব্দুল আযীয মসজিদের উত্তর-পূর্ব ও পশ্চিম দিকের আশেপাশের ঘর-বাড়ি খরিদ করে ভেঙে ফেলেন। মসজিদের দৈর্ঘ্য ১২৮ মিটার ও প্রস্থ ৯১ মিটার করা হয় এবং আয়তন ৬২৪৬ বর্গ মিটার থেকে বাড়িয়ে ১৬৩২৬ বর্গমিটার করা হয়। মসজিদের মেঝেতে ঠান্ডা মার্বেল পাথর লাগানো হয়। মসজিদের চার কোনায় ৭২ মিটার উচুঁ চারটি মিনার তৈরি করা হয়। এ সম্প্রসারণে ৫ কোটি রিয়াল খরচ হয় ও কাজ শেষ হয় ১৯৫৫ সালে।
  • বাদশাহ ফয়সাল এর আমলে ক্রমবর্ধমান হাজীদের জায়গার সংকুলান করার জন্য পশ্চিম দিকের জায়গা বৃদ্ধি করা হয় যার আয়তন ছিল ৩৫০০০ বর্গমিটার।
  • সর্বশেষ ১৯৯৪ সালে বাদশাহ ফাহাদ ইবন আব্দুল আযীয কর্তৃক মসজিদের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ উন্নয়ন ও বিস্তার সাধিত হয়। পূর্ববর্তী মসজিদের আয়তনের তুলনায় নয় গুণ আয়তন বৃদ্ধি করা হয়। মসজিদকে এত সুন্দর করা হয় যা মুসলিমদের অন্তর জয় করে। মসজিদের ছাদ এমনভাবে বানানো হয়েছে যে প্রয়োজনে দ্বিতল বানানো সম্ভব হবে। মূল গ্রাউণ্ড ফ্লোরের আয়তন ৮২০০০ বর্গমিটার হয়। মসজিদের চারপাশে ২৩৫০০০ বর্গমিটার খোলা চত্বরে সাদা শীতল মার্বেল পাথর বসানো হয়। এর ফলে মসজিদের ভিতরে ২৬৮০০০ মুসল্লি এবং মসজিদের বাইরের চত্বরে ৪৩০০০০ মুসল্লির সালাত আদায়ের জায়গা হয়। সম্পূর্ণ মসজিদে এসি, আন্ডারগ্রাউন্ডে ওয়াশরুম ও কার পার্কিং এর ব্যবস্থা করা হয়। মসজিদের কাজ শুরু হয় ১৯৮৫ সালে আর শেষ হয় ১৯৯৪ সালে।
  • মসজিদে নববীর ভিতরে বেশকিছু ঐতিহাসিক নিদর্শনসমূহ‎ সংরক্ষিত আছে; রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর, রিয়াদুল জান্নাহ, আসহাবে সুফফা, নবিজীর মেহরাব ও মিম্বার।
  • রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘মসজিদে হারাম ব্যতীত আমার এ মসজিদে (মসজিদে নববী) সালাত অন্য স্থানে সালাতের চেয়ে ১ হাজার গুণ উত্তম, আর মসজিদে হারামে সালাত ১ লক্ষ সালাতের চেয়ে উত্তম”
  • মদীনা ও মসজিদে নববীর ইতিহাস বিস্তারিত জানতে ‘পবিত্র মদীনার ইতিহাস: শাইখ ছফীউর রহমান মোবারকপুরী’ বইটি পড়ুন।

মসজিদে নববী দর্শন ›

মদীনা সফর করা ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মসজিদে নববী দর্শন করা হজের কোনো অংশ নয় বা হজের সঙ্গে এর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এটি হজের কোনো রুকন, ওয়াজিব বা সুন্নাতও নয়। তবে কেউ ইচ্ছা করলে হজের আগে বা পরে মসজিদে নববীতে গিয়ে সালাত আদায় করতে পারেন, সেখানে যাওয়ার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর যিয়ারত করতে পারেন। এটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র মুস্তাহাব কাজ। একটি প্রচলিত হাদীস আছে ‘‘যে হজ করতে এসে আমার কবর জিয়ারতের জন্য এলো না সে আমার সাথে রূঢ় আচরণ করল।’’ এটি সম্পূর্ণ জাল ও মিথ্যা হাদীস।

ইবন মাজাহ, হাদীস নং ১৩৯৬

  • নবীজীর কবর যিয়ারত মূখ্য উদ্দেশ্য মনে নিয়ে মদীনায় যাওয়া ঠিক নয় বা এমনটি করা নিয়ম নয়। মদীনায় যেতে হবে মসজিদে নববী দর্শন ও সালাত আদায় করার নিয়তে। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘এবাদত বা প্রার্থনার নিয়তে তিনটি মসজিদ; মসজিদে হারাম, মসজিদে নববী ও আল-আকসা মসজিদ ব্যাতীত অন্য কোনো স্থানে সফর করো না’’। শুধু তাই নয় বরং কবর কেন্দ্রিক সকল উরস-উৎসব কঠিনভাবে নিষেধ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘এবং আমার কবরকে তোমরা উৎসবে পরিণত করো না’’। উৎসবে পরিণত করার অর্থ; কবর কেন্দ্রিক নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যার মধ্যে কবরকে উদ্দেশ্য করে সফর করাও শামিল। কিন্তু সফররত অবস্থায় পথিমধ্যে আপনার কোনো আত্মীয় বা কোনো ওলির কবর সামনে পড়লে তা যিয়ারত করা জায়েয আছে।
  • মদীনায় হোটেল বা ভাড়া বাসায় উঠে একটু বিশ্রাম নিয়ে নাস্তা করে  (কাঁচা পেয়াজ, রসুন পরিহার করে) ও পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ সেরে মসজিদে নববী জিয়ারতের উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়ুন। মসজিদে নববীতে ডান পা দিয়ে প্রবেশ করুন এবং নিম্নোক্ত  দো‘আটি পাঠ করুন:

بِسْمِ الله وَالصَّلاةُ وَالسَّلُامُ عَلٰى رَسُوْلِ الله اَللهم افْتَحْ لِيْ أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ

‘‘বিসমিল্লাহি ওয়াস সালাতু ওয়াসসালামু আলা রাসুলিল্লাহ, আল্লাহুম্মাফ তাহলী আবওয়াবা রাহমাতিকা’’।

‘‘আল্লাহর নামে আরম্ভ করছি। সালাত ও সালাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর। হে আল্লাহ, আপনি আমার জন্য আপনার রহমতের দরজা উন্মুক্ত করে দিন’’

  • মসজিদের ভিতরে প্রবেশ করে ‘রিয়াদুল জান্নাহ’ বা জান্নাতের বাগান নামক স্থানে দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদ সালাত আদায় করুন। ওই স্থানে হালকা সবুজ রঙের কার্পেট বিছানো থাকে। এখানে যদি অধিক ভিড় থাকে, তাহলে মসজিদের যে কোনো স্থানে সালাত আদায় করে নিন।

সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১১৮৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৩৯৭; আবু দাউদ, হাদীস নং ১৭৪৬

  • রিয়াদুল জান্নায় সহজে প্রবেশ করতে মসজিদে নববীর আস-সালাম গেট (১ নং গেট) দিয়ে প্রবেশ করুন এবং রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রওজায় প্রবেশ করতে ঐ একই গেট দিয়ে প্রবেশ করলে সহজ হয়।
  • এবার শান্ত ও বিনীতভাবে লাইন ধরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরের দিকে একমুখি চলাচলের রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যান। কবরে হাতের বামে প্রথমে স্বর্ণালী খাঁচার দরজা অতিক্রম করে পরবর্তী দ্বিতীয় স্বর্ণালী খাঁচার দরজা (বড় গোল চিহ্ন আছে) যে বরাবর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর তার সামনে এলে আদবের সাথে দাঁড়ান। দাঁড়ানোর সুযোগ না পেলে চলমান অবস্থায়ই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সালাম পেশ করুন। বলুন:

اَلسَّلَامُ عَلَيْكَ اَيُّهَا النَّبِيُّ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ

‘‘আসসালামু আলাইকা আইয়ুহান নাবীয়ু ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ’’

‘‘হে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনার ওপর শান্তি, রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক’’।

  • পাশাপাশি আপনি চাইলে সালাতের তাশাহুদের পর যে দুরূদ ইবরাহীম পাঠ করেন তা এখানেও এখন পাঠ করতে পারেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সালাত ও সালাম পেশ করার উত্তম পন্থা হলো দুরূদ ইবরাহীম পাঠ করা। বর্তমানে প্রচলিত অনেক ধরনের বানোয়াটি দুরূদ আছে যা সাহাবাদের থেকে বর্ণনা করা কোনো হাদীসে খুঁজে পাওয়া যায় না সেগুলো পরিহার করাই উত্তম।
  • এবার আপনি সামনে এক গজ মতো এগিয়ে বাম পাশের পরবর্তী স্বর্ণালী খাঁচার দরজা (ছোট গোল চিহ্ন আছে) যেখানে যথাক্রমে আবু বাকর ও উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমার কবর আছে তার সামনে এলে আদবের সাথে তাদের উদ্দেশ্যে সালাম পেশ করবেন ও তাদের জন্য দো‘আ করুন। তারা যেহেতু কবরবাসী তাই তাদের উদ্দেশ্যে কবরবাসীদের দো‘আ পাঠ করতে পারেন।
  • কবর যিয়ারতের দো‘আ:

اَلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ وَالْمُسْلِمِيْنَ، وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللهُ بِكُمْ لَلَاحِقُوْنَ، نَسْأَلُ اللهَ لَنَا وَلَكُمْ الْعَافِيَةََ.

‘‘আসসালামু আলাইকুম আহলাদ্দিয়া-রি মিনাল মু’মিনীনা অলমুসলিমীনা, ওয়াইন্না ইনশা-আল্লাহু বিকুম লালা-হিকুন, নাসআলুল্লা-হা লানা ওয়ালাকুমুল ‘আ-ফিয়াহ’’।

‘‘আপনাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক, হে কবরবাসী মুমিন-মুসলিমগণ। আমরা (আপনাদের সাথে) মিলিত হব, ইনশাআল্লাহ। আমাদের জন্য ও আপনাদের জন্য আল্লাহর দরবারে পরিত্রাণ কামনা করি”।

  • কবর যিয়ারত শেষে দো‘আ করার বাধ্যগত কোনো নিয়ম নেই। এবার বাকীউল গারকাদ বা বাকী কবরস্থান যিয়ারতে যেতে পারেন। সেখানে শায়িত কবরবাসীর উদ্দেশ্যে আপনার সালাম পৌঁছে দিন বা কবর যিয়ারতের দো‘আ পড়ুন।
  • অনেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরের সামনে গিয়ে আবেগতাড়িত হয়ে অতিরঞ্জিত কাজ করে ফেলেন যা মোটেই শরী‘আত সম্মত নয়। যেমন; কবরের সামনে গিয়ে একাকী জোরে তাকবীর বলা, বিলাপ করে কান্নাকাটি করা, দুই হাতের আঙুল চিমটির মতো করে চুমু খেয়ে চোখে দিয়ে ফের চুমু খাওয়া, একাকি বা দলবদ্ধ হয়ে কবরের দিকে হাত তুলে দো‘আ করা, খাঁচার দরজা ধরতে চেষ্টা করা বা হাত বুলিয়ে হাতে চুমু খাওয়া ইত্যাদি। অনেকে রীতিমত কবরের সামনে মাথা নিচু করে সম্মান দেখায় বা সিজদায় পড়ে যায় যা সম্পূর্ণ শির্ক করা হয়ে যায়। আপনি লক্ষ্য করে দেখবেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরের স্বর্ণালী খাঁচার দরজার সামনে বেশ কিছু আরব পুলিশ ও শাইখ/আলেমগন অবস্থান করেন। তারা হাজীদেরকে এসব আবেগতাড়িত কাজ করা থেকে বিরত রাখতে সচেষ্ট থাকেন।
  • দেখুন; আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু, উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু বা আরো অন্যান্য সাহাবীদের মতো আমরা কেউ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভালোবাসতে পারবো বলে মনে হয় না, তবে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাবো তাদের সমপর্যায়ে বা বেশি ভালোবাসতে। ভালোবাসতে গিয়ে ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরন করতে গিয়ে আমরা যেন এমন নতুন কোনো কিছু করে না বসি যা আগে কেউ কোনো সাহাবী করেন নি, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবিত বা মৃত থাকা অবস্থায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও নিজকে নিয়ে প্রশংসা করা ও তার গুণগান করা এমন পছন্দ করতেন না। সাহাবায়ে কেরাম যতটুকু যা করেছেন, আমাদের জন্য যথেষ্ট হবে যদি আমরা ততটুকু পালন করতে পারি।

সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯৭৫

  • আর একটি বিষয়; রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর কবরের সামনে গিয়ে সালাম পেশ করা আর ঘরে বসে বা মসজিদের যে কোনো জায়গায় বসে বা হাজার মাইল দূর থেকে সালাম পেশ করা একই সমমান ও মর্যাদার। মদীনায় কবরের সামনে গিয়ে দেওয়া খাস ব্যাপার! এমন বলে কোনো কথা নেই। এসবই মানুষের বানানো অতিভক্তি। অনেকে আবার বলেন, আমার সালামটি মদীনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরের কাছে পৌছে দিয়েন! এসব ভিত্তিহীন। এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘তোমাদের বাড়িগুলোকে কবর বানিও না এবং আমার কবরকে উৎসবের কেন্দ্রস্থল করো না। আমার প্রতি তোমরা দুরূদ ও সালাম পেশ করো। কেননা (দুনিয়ার) যেখান থেকেই তোমরা দুরূদ পেশ করো তাই আমার কাছে পৌঁছিয়ে দেওয়া হয়”।
  • রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘আল্লাহ তা‘আলার একদল ফিরিশতা রয়েছে যারা পৃথিবী জুড়ে বিচরণ করছে। যখনই আমার কোনো উম্মত আমার প্রতি সালাম জানায় ঐ ফিরিশতারা তা আমার কাছে তখন পৌঁছিয়ে দেয়’’। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই বলেছেন, ‘‘যে কেউই আমাকে সালাম দেয় তখনই আল্লাহ তা‘আলা আমার রুহকে ফেরত দেন, অতঃপর আমি তার সালামের জবাব দেই”।
  • নারীদের কবর যিয়ারত নিয়ে আলেমগণের মাঝে বিতর্ক আছে। এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর যিয়ারতকারী মহিলাদের লা‘নত করেছেন। পরবর্তীতে এক হাদীসের মাধ্যমে নারী-পুরুষ সকলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে বলে মনে হয়। তাই বিতর্ক থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নারীদের জন্য উত্তম হবে কবর যিয়ারতকে উদ্দেশ্য করে কোথাও না যাওয়া; যেহেতু সালাম যে কোনো জায়গা থেকে দেওয়া যায়। তবে সাধারণভাবে যে কোনো কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কবরবাসীদের সালাম দেওয়া ও দো‘আ করা জায়েয আছে।

আবু দাউদ, হাদীস নং ২০৪২ নাসাঈ, হাদীস নং ১২৮২

  • আরো কয়েকটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়। যদিও বিষয়টি প্রাসঙ্গিক নয়। অনেকে দেখবেন এ ধারণা, বিশ্বাস বা আকীদা পোষণ করেন যে – ১. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নূরের তৈরি (তিনি মাটির তৈরি মানুষ নন)। ২. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হায়াতুন নবী (তিনি জীবিত আছেন, মারা যান নি।)। ৩. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসীলায় এ বিশ্বজগত সৃষ্টি হয়েছে (তাঁকে সৃষ্টি না করলে কিছুই সৃষ্টি হত না)। ৪. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গায়েবের খবর রাখেন (তিনি অদৃশ্যের জ্ঞান রাখতেন)। ৫. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরের চারপাশের মাটির মর্যাদা আল্লাহ তা‘আলা আরশের চেয়েও বেশি। ৬. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরে শুয়ে এ পৃথিবীর সব কিছু দেখছেন ও খবর রাখছেন এবং প্রয়োজনে তিনি বিভিন্ন পরহেজগার বান্দাদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন। ৭. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৃথিবীতে হাযির হওয়ার ক্ষমতা রাখেন (বিভিন্ন মিলাদ মাহফিলে হাযির হন)। বস্তুত এ সবই পথভ্রষ্টতা ও ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাস। এগুলোর কোনো কোনোটি শির্ক, আবার কোনো কোনোটি মারাত্মক ভুল ও কুসংস্কার।
  • শিক্ষিত, সুবিজ্ঞ ও ঈমান বিষয়ে সচেতন পাঠকমন্ডলীর ওপর এ বিষয়গুলো দলীল ভিত্তিক সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ সহ জ্ঞান আহরণ ও বিশ্বাস স্থাপনের জন্য আল্লাহ তা‘আলার হিদায়াতের ওপর ছেড়ে দিলাম। ‘রাবিব যিদনী ইলমা’।

মদীনা ও মসজিদে নববী সম্পর্কিত তথ্য ›

  • মসজিদে নববী অত্যন্ত প্রশান্তিদায়ক, চমৎকার ও জমকালো মসজিদ।
  • মসজিদে মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট আলাদা সালাতের জায়গা রয়েছে।
  • মদীনার আবহাওয়া গরম। কিন্তু বাতাসে কম আর্দ্রতার কারণে খুব বেশি ঘাম হয় না।
  • মক্কার তুলনায় এখানে হোটেল বা বাসা মসজিদের খুব কাছাকাছি হবে এবং বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাও এখানে বেশি হবে।
  • মসজিদের প্রতিটি প্রবেশ গেটে নিরাপত্তাকর্মী থাকে এবং তারা বড় আকারের বা সন্দেহজনক ব্যাগ চেক করে।
  • মসজিদের বাইরে বেসমেন্ট ফ্লোরে টয়লেট, অযুর স্থান ও গাড়ি পার্কিং সুবিধা রয়েছে।
  • বাদশাহ ফাহাদ গেট মসজিদের অন্যতম প্রধান বড় প্রবেশ গেট (২১-ডি); এমন ৫ দরজা বিশিষ্ট ৭টি গেট আছে মসজিদে।
  • মসজিদের ভেতরে প্রবেশের জন্য মসজিদে নববীতে ৩০টিরও বেশি গেট বা দরজা রয়েছে।
  • মসজিদের প্রতিটি বড় প্রবেশ ফটকেই সালাতের সময়সূচি টাঙানো রয়েছে।
  • মসজিদের চারপাশে অনেক হকার দোকান ও শপিং মল রয়েছে।
  • মসজিদের চারপাশেই সানশেড বৈদ্যুতিক ছাতা রয়েছে। এসব ছাতা দিনের বেলায় খোলা থাকে এবং রাতে বন্ধ থাকে।
  • হজযাত্রীদের শীতল বাতাস প্রদানের জন্য প্রতি ছাতার খুঁটিতে দুটি করে কুলার ফ্যান রয়েছে।
  • মসজিদের ছাদে সকলের জন্য উন্মুক্ত একটি পাঠাগার রয়েছে। এখানে বাংলা বই আছে পড়ার জন্য।
  • মসজিদের ভেতরে সবদিকেই যমযম কূপের পানির কন্টেইনার পাওয়া যায় এবং এ পানি বোতলে ভরে নিয়ে আসাও যাবে।
  • মসজিদের ভেতরে জুতা রাখার জন্য অসংখ্য শেলফ্ রয়েছে। অনেক ছোট ছোট র‌্যাকও আছে জুতা-স্যান্ডেল রাখার জন্য।
  • মসজিদের ভেতরে প্রতিটি পিলারে নিচের দিকে এসি-র ব্যবস্থা রয়েছে। সম্পূর্ণ মসজিদে এসি রয়েছে।
  • রিয়াদুল জান্নাহ ব্যতীত মসজিদের ভেতরে সকল জায়গার কার্পেটের রঙ লাল। রিয়াদুল জান্নাহ এলাকার কার্পেট হালকা সবুজ।
  • নীল/সবুজ পোশাক পরিহিত পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা মসজিদের ভেতরে কাজ করছে; এদের অধিকাংশই এসেছে পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশ থেকে।
  • মসজিদের মধ্যে অনেক বইয়ের শেলফ রয়েছে। এসব শেলফ থেকে কুরআন শরীফ (নীল রং) নিয়ে পড়তে পারেন ।
  • বৃদ্ধ ও অসুস্থ হজযাত্রী বহনের জন্য মসজিদের বাইরে ছোট গাড়ি রয়েছে।
  • মসজিদের সবুজ গম্বুজের ডান দিকে কিছুটা সামনে এগিয়ে ইমাম কিবলামুখি হয়ে সালাতে দাঁড়ান।
  • রিয়াদুল জান্নাহ জায়গা এবং মসজিদের সামনের দিকে প্রথম কয়েকটি সারির নির্মাণ কৌশল পুরনো কায়দায়।
  • মসজিদের বাইরে ইমামের সালাতে দাঁড়ানোর স্থান বরাবর চিহ্নিত সাইনবোর্ড  আছে, যেটি পার করে জামাআতে সালাতের সময় দাঁড়ানো যাবে না।
  • যোহর, আসর ও মাগরিবের সালাতের পর মসজিদের ভেতরে কিছু জায়গায় ইংরেজি ও হিন্দি ভাষায় কিছু আলেম/শায়খ ইসলামিক আলোচনা করেন।
  • মসজিদের ভেতরে একটি জায়গায় কয়েকটি মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের মাধ্যমে শিশুদের কুরআন শিখানো হয় আসর ও মাগরিবের সালাতের পর।
  • রিয়াদুল জান্নাহর কিছু অংশ সকালে ও বিকালে মহিলা দর্শনার্থীদের সালাত আদায়ের জন্য মোটা ক্যানভাসের কাপড় দিয়ে আবৃত করে দেওয়া হয়।
  • রিয়াদুল জান্নাহয় রয়েছে রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মেহরাব, খুতবার মিম্বার ও মিনার।
  • এই এলাকার বাইরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রয়েছে তাহাজ্জুদের মেহরাব, সুফফা ও ফাতিমার দরজা।
  • রিয়াদুল জান্নাহ এলাকায় সবসময়ই হজযাত্রীদের ভিড় থাকে। এ কারণে হজযাত্রীদের এখানে এসেই সালাত আদায় করে দ্রুত বের হওয়া উচিৎ যাতে অন্য হজযাত্রীরা সুযোগ পান।
  • মসজিদের ভেতরে ও বাইরে হাজীদের আপ্যায়ন হিসাবে অনেকে নাস্তা /ফল/জুস/খেজুর/পানি/চা বিতরণ করে থাকেন।

মসজিদে নববী দর্শনের ক্ষেত্রে প্রচলিত ভুলত্রুটি ও বিদ‘আত ›

  • মনে মনে মূখ্য উদ্দেশ্য বা শুধু নবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রওজা জিয়ারতের নিয়তে বা উদ্দেশ্যে মদীনা ভ্রমণ করা।
  • কেউ কেউ হজযাত্রীদের কাছে তাদের সালাম রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাছে পৌঁছানোর জন্য অনুরোধ করা।
  • রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদের ৪০ ওয়াক্ত সালাত পড়ার জন্য পুরো ৮দিন মদীনায় অবস্থান করা বাধ্যতামূলক বা নিয়ম মনে করা।
  • মদীনা ও মসজিদে নববীতে প্রবেশের পূর্বে গোসল করতে হবে মনে করা।
  • মদীনায় প্রবেশের সময় ও মসজিদের মিনার দেখার পর জোরে তাকবীর দেওয়া বা এ দো‘আ পড়া নিয়ম মনে করা: (এ এলাকা তোমার বার্তাবাহকের পবিত্র এলাকা, তুমি একে রক্ষা কর..)।
  • মদীনায় প্রবেশের পর কোনো নির্ধারিত দো‘আ পড়া নিয়ম মনে করা।
  • মসজিদে প্রবেশের পর সালাত পড়ার আগেই রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর যিয়ারত করা জরুরী মনে করা।
  • কবরের কাছে গিয়ে দো‘আ করা বড় ফযিলত মনে করা ও কবরের দিকে মুখ করে দুই হাত তুলে দো‘আ করা।
  • কোনো মনের ইচ্ছা পূরণের আশায় কবরের কাছে দো‘আ করার জন্য যাওয়া।
  • রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরে চুমু খাওয়া অথবা স্পর্শ করার চেষ্টা করা অথবা এর চারপার্শ্বের দেওয়াল অথবা পিলারে চুমু খাওয়া বা স্পর্শ করা।
  • রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাছে অনুনয়-বিনয় করে শাফা‘আত চাওয়া বা কিছু চাওয়া।
  • রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করা বা কবরকে সামনে রেখে বসে দো‘আ-যিকর করা।
  • প্রতি সালাতের পরে রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর যিয়ারত করতে যাওয়া জরুরী বা ভালো মনে করা।
  • সালাতের পর উচ্চঃস্বরে বিশেয বিশেষ দো‘আ বলা বিশেষ ফযিলত মনে করা বা প্রচলিত বানোয়াটি ও বিদআতি দুরূদ পাঠ করা।
  • রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরের উপরে সবুজ গম্বুজ থেকে পতিত বৃষ্টির পানি থেকে কোনো কল্যাণ বা বরকত কামনা করা।
  • মসজিদের মূল অংশে সালাতের জন্য নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করা।
  • হজযাত্রীদের নিয়ে রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরের পাশে অথবা এর দূরে থেকে সমবেত কণ্ঠে উচ্চৈঃস্বরে দো‘আ করা।
  • মসজিদ থেকে চূড়ান্তভাবে বের হওয়ার সময় সম্মান দেখানোর উদ্দেশ্যে পিছন দিকে হেঁটে বের হওয়া।
  • মসজিদে নববী ও মসজিদে কুবা ব্যতিত মদীনার অন্য কোনো মসজিদ দর্শন করে সওয়াবের আশা করা।
  • মসজিদের খুঁটিতে সুতা বা ফিতা বাঁধা কোনো কল্যাণ বা বরকত মনে করা।
  • মদীনা থেকে নুড়ি পাথর বা বালি নিয়ে সংরক্ষণ করা ও তাবিজ-কবজ বানানোর জন্য নিজ দেশে নিয়ে আসা।
  • কিছু প্রচলিত জাল হাদীসসমূহ:
  • ‘‘যে ব্যক্তি আমার কবর যিয়ারত করবে তার জন্য আমার সুপারিশ ওয়াজিব হয়ে যাবে।’’
  • ‘‘যে হজ করতে এসে আমার কবর যিয়ারত করল সে যেন আমার সাথে সাক্ষাত করল।’’
  • ‘‘যে হজ করতে এসে আমার যিয়ারত জন্য এলো না সে আমার সাথে রূঢ় আচরণ করল।’’
  • মদীনা থেকে বিদায়ের সময় মসজিদে নববীতে দু’রাকাত বিদায়ী নামাজ পড়া ও বিদায়ী রওজা যিয়ারত করা।
  • রওজার কবর জায়গার প্রথম দরজা ফাঁকা আছে। এ জায়গা  ঈসা আলাইহিস সালামের কবরের জন্য সংরক্ষিত আছে বলে বিশ্বাস করা।
  • রওজার তৃতীয় দরজাটিও ফাঁকা। এ জায়গাটি  ইমাম মাহদী আলাইহিস সালাম কবরের জন্য সংরক্ষিত আছে ! এ জাতীয় বিশ্বাস করা।
  • মসজিদে নববী থেকে শেষবার বের হওয়ার সময় উল্টোমুখি হয়ে বের হওয়া।

মদীনায় কেনা-কাটা ›

  • আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ অনুসারে, মক্কার তুলনায় মদীনায় খেজুরের দাম কম। এখানে সবকিছুর দাম মক্কার তুলনায় তুলনামূলক একটু কম। সে কারণে আমার মতে, কেনা-কাটা মদীনায় করাই ভালো।
  • আপনাদের আগেই বলেছি; যদি পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের জন্য কোনো উপহার বা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে চান তাহলে তা হজেরআগেই কিনে ফেলবেন। কেননা, হজের সময় যত কাছাকাছি হয় জিনিসপত্রের দাম ততো বেড়ে যায়। হজের পরেও কিছু দিন দাম চড়া যায়, তারপর কমে।
  • মসজিদে নববীর চারপাশে অনেক শপিং মল, মার্কেট ও হকার মার্কেট রয়েছে। বদর গেটের বিপরীতেই আছে ইবন দাউদ ও তাইয়েবা শপিং মল। কেনাকাটার সময় কোনো দোকানে যদি ফিক্সড প্রাইস (একদাম লেখা) লেখা থাকে তারপরও দামাদামি করতে দ্বিধাবোধ করবেন না। কারণ হজের মৌসুমে তারা জিনিসপত্রের দাম একটু বাড়িয়ে লেখে, সুতরাং কিছুটা দরকষাকষি করতেই পারেন। তবে সুপার মার্কেটের যেসব পণ্যে বারকোড দেওয়া রয়েছে সেসব ক্ষেত্রে দরাদরি করে কোনো লাভ নেই।
  • এখানে বেশকিছু খেজুরের মার্কেট পাবেন। আপনার পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের জন্য বিভিন্ন জাতের খেজুর কিনে নিয়ে যেতে পারেন। তবে লাগেজের ওজনের কথা মাথায় রাখতে হবে! বিখ্যাত কিছু খেজুরের জাত হলো: আজওয়া, আম্বার, সুকারি, মাযদল, কালকি, রাবিয়া ইত্যাদি।
  • এছাড়া আপনি এখান থেকে আতর, তাসবীহ, টুপি, জায়সালাত, সৌদি জুববা, সৌদি বোরকা, হিজাব, কাপড়, ঘড়ি, বাংলা বই (দারুস সালাম পাবলিকেশন্স), সিডি, ডিভিডি, কসমেটিকস ইত্যাদি কিনতে পারেন।
  • শেষ কথা হলো: মদীনা থেকে পারলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহকে ক্রয় করে নিজ অন্তরে গেঁথে নিয়ে যান।

মদীনায় দর্শনীয় স্থান ›

  • আপনার ট্রাভেল এজেন্সি মদীনায় একদিনের যিয়ারাহ ট্যুরের জন্য বাসের ব্যবস্থা করতে পারেন এবং আপনাদের সবাইকে একত্রে মদীনার নিকটস্থ ঐতিহাসিক স্থানগুলোতে নিয়ে যেতে পারে। আপনি এ যিয়ারাহ ট্যুর উপভোগ করবেন। মদীনার চারপাশ ঘুরে দেখার এটাই সুযোগ। একটি বিষয় লক্ষ্য করবেন মদীনায় অসংখ্য খেজুর বাগান রয়েছে।
  • কিছু যিয়ারাতের স্থান খুব কাছেই, ইচ্ছে করলে পায়ে হেঁটেই সেসব স্থানে যেতে পারবেন। তবে এক্ষেত্রে পরামর্শ হলো একা কোথাও যাবেন না এবং কয়েকদিন মদীনায় থাকার পর যিয়ারাতের স্থানগুলো ভ্রমণ করবেন।
  • বাকীউল গারকাদ কবরস্থান, মসজিদে আবু বকর, মসজিদে উমার ফারুক, মসজিদে আলী, গামামা মসজিদ ও বিলাল মসজিদে পায়ে হেঁটেই যেতে পারবেন।
  • ফজরের সালাতের পর লক্ষ্য করবেন কিছু মাইক্রোবাস অথবা প্রাইভেট কার ড্রাইভার ‘যিয়ারাহ, যিয়ারাহ’ বলে ডাকবে। গাড়ি ভাড়া করে আপনি কিছু স্থান ঘুরে দেখতে পারেন। সবচেয়ে ভালো হয় ছোট ছোট দল করে ঘুরতে বের হওয়া, কারণ ড্রাইভার প্রতি ব্যক্তির জন্য ১০/২০ সৌদি রিয়াল ভাড়া দাবি করে থাকে। এসব স্থান ভ্রমণ করার সময় অবশ্যই আপনার পরিচয়পত্র ও হোটেলের ঠিকানা সঙ্গে রাখুন। কারণ, অনেক সময় পুলিশ আপনার মদীনার পরিচয় পত্র চেক করতে পারে।

এবার ফেরার পালা ›

  • আশা করা যায় আপনি আপনার ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিয়েছেন। আপনার জন্য কিছু কৌশলগত টিপস: আপনার মালামাল যদি বেশি হয় তাহলে আপনার মেইন লাগেজের ওজন এয়ারলাইনসের নিয়মানুসারে ৩০/৪০ কেজি করুন। অতিরিক্ত ওজন করবেন না কারণ এর জন্য আপনাকে অতিরিক্ত টাকা পরিশোধ করতে হবে। আর দুই/তিনটি ছোট হ্যান্ড ব্যাগ নিতে পারেন, এতে সবমিলে সর্বোচ্চ ১৫/২০ কেজি পর্যন্ত ওজন করা যাবে। যদিও বিমানে ভিতর বহনের জন্য আদর্শ ওজন হলো ৭/১০ কেজি, হজের সময় এ বিষয়গুলো এয়ারলাইনস খেয়াল করে না ও কিছুটা ছাড় দেয়। অনেকের ব্যাগে কম ওজনের মালামাল থাকে, তাদের ব্যাগেও কিছু মালামাল দিয়ে দিতে পারেন। যমযম পানি পাওয়ার বিষয়টি আপনার এজেন্সির সাথে কথা বলে জেনে নিন কিভাবে ব্যবস্থা করে নেওয়া যাবে।
  • বিমানের শিডিউল বিলম্বের কারণে ফিরতি যাত্রা পরিকল্পনা মাফিক নাও হতে পারে, সেজন্য অস্থির না হয়ে ধৈর্য ধারণ করুন। প্রথমে আপনার এজেন্সির পরিবহণে করে মু‘আল্লিম অফিসে নিয়ে যাবে। আপনার এজেন্সি আপনাদের সবার পাসপোর্ট মু‘আল্লিম অফিস থেকে ফেরত নেবে এবং এরপর  বিমানবন্দরে নিয়ে যাবে। জেদ্দা বিমানবন্দরে ওয়েটিং প্লাজায় অপেক্ষা করতে হতে পারে। আপনার এজেন্সি চেক করবে যে শিডিউল অনুসারে আপনাদের বিমান আছে কি না। বিমান আসতে দেরি হলে আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে।
  • আপনার পাসপোর্টের ট্রাভেল স্টিকার যদি থেকে যায় তবে তা উঠিয়ে ব্যাংক কাউন্টার থেকে ৩০/৬০ সৌদি রিয়াল উঠিয়ে নিতে পারেন।
  • এবার এয়ারলাইন্সের লাগেজ ওজন কাউন্টারে আপনার মেইন লাগেজটি জমা দিন। এখান থেকে আপনি বোর্ডিং পাস পাবেন। এটি যত্ন করে রেখে দিন। কিছু এয়ারলাইন্স হোটেল থেকেই লাগেজ নিয়ে কার্গোতে তুলে দেয়।
  • এবার ইমিগ্রেশন কাউন্টারে যাবেন। এখান থেকে প্রত্যেক হজ যাত্রীকে এক কপি করে কুরআন শরীফ দেওয়া হবে। এক কপি নিয়ে নেবেন অথবা কাউকে জিজ্ঞেস করুন যে কোথা থেকে কুরআন সংগ্রহ করতে হবে। এ বছর (২০১৫) থেকে বাংলা ভাষাতেও কুরআনের অনুবাদ ও তাফসীর পাবেন ইন-শাআল্লাহ।
  • ইমিগ্রেশন শেষে টার্মিনাল ভবনে প্রবেশ করবেন। এবার আপনার দেহ ও ছোট হ্যান্ড ব্যাগ স্ক্যান করা হবে। মনে রাখবেন ব্যাগে বডি স্প্রে, লোশন, ওজন পরিমাপক যন্ত্র, চাকু ও কাঁচি রাখবেন না। এগুলো নিয়ে নেবে।
  • এবার বোর্ডিং পাস দেখিয়ে ওয়েটিং জোনে প্রবেশ করুন। বিমান আসলে লাইনে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে বিমানে উঠবেন। আপনার নির্দিষ্ট আসনে অথবা যে কোনো আসনে বসে পড়ুন, কারণ বিমান ক্রু যাত্রী সংখ্যা গণনা করবে।
  • রানওয়েতে বিমান চলা শুরু করলে ক্রুর দেওয়া নির্দেশনা অনুসরণ করুন এবং সিট বেল্ট বেঁধে নিয়ে বিমান উড্ডয়নের অপেক্ষা করুন। এবার বিমানযাত্রা এবং অভ্যন্তরীণ আতিথেয়তা উপভোগ করুন।

হজের পর যা করবেন ›

  • হজের সফর শেষ করে নিজ মহল্লায় প্রবেশ করে বাড়িতে প্রবেশের পূর্বে নিকটস্থ এলাকার মসজিদে দুই রাকাত সালাত আদায় করুন।
  • হজের পর আল্লাহ ও আল্লাহর দীনের প্রতি বিশ্বাসে অটল থাকুন।
  • ঈমানকে দৃঢ় ও আকীদাকে পরিশুদ্ধ করুন।
  • অন্তরে আল্লাহভীতি রাখুন এবং মনে রাখুন এ জীবন একটি পরীক্ষা স্বরুপ।
  • সালাত, সাওম ও যাকাত নিয়মিত ও সঠিকভাবে আদায় নিশ্চিত করুন।
  • কুরআন ও হাদীসের শিক্ষা গ্রহণ করুন এবং সে অনুসারে আমল করুন।
  • আপনার জীবনে কুরআন ও হাদীসের শিক্ষার প্রতিফলন ঘটান।
  • আপনার পরিবারকেও সঠিকভাবে ইসলাম মেনে চলার জন্য বলুন।
  • আল্লাহ তা‘আলার বার্তাবাহকের বার্তাবাহক হওয়ার চেষ্টা করুন।
  • দীনের দাওয়াহ ও ইসলা করুন।
  • পরিচিতদের হজ করতে উৎসাহিত করুন।
  • উত্তম ও হালাল উপার্জন করুন।
  • সকল পাপ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করুন।
  • হাজী উপাধির অপব্যবহার না করা।
  • হজের সময়ে আল্লাহর কাছে আপনি যা প্রতিশ্রুতি করেছেন এবং যা ক্ষমা চেয়েছেন সেগুলো মনে রাখুন।

অন্যদের কাছে হজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে সঠিক নয় বা অজানা এমন কিছু অতিরিক্ত না বলা।

সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭৬৯

  • আমি হজ করে এসেছি এটা কোনো ভাবে প্রকাশের মাধ্যমে মানুষের কাছে থেকে সম্মান, ভালবাসা ও সহানুভূতি অর্জন করার চেষ্টা না করা।
  • আপনার সামর্থ্য থাকলে আরেকবার হজের জন্য অথবা অন্য কারো বদলি হজের পরিকল্পনা করুন।

ভালো আলামত ›

  • হজ কবুল হওয়া বা না হওয়া মহান আল্লাহ তা‘আলার এখতিয়ারভুক্ত। কিন্তু বান্দা যখন হজ করবে তখন সে দৃঢ়তা ও পূর্ণ বিশ্বাস এর সাথে হজ পালন করবে এবং আশা রাখবে ইন-শাআল্লাহ আল্লাহ তা‘আলা তার হজ কবুল করবেন। কখনই হতাশা বা শংকাযুক্ত হয়ে হজ পালন করা যাবে না।
  • অবশ্য হজ যদি আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে কবুল হয় তবে বাহ্যিকভাবে বান্দার মধ্যে কিছু লক্ষণ বা আলামত মোট কথা কিছু ভালো পরিবর্তন প্রতীয়মান হয়। যে বান্দা ইবাদত ও আন্তরিক আমল দ্বারা আল্লাহকে খুশি করার জন্য সচেষ্ট হবে আল্লাহ তা‘আলা সেই বান্দাকে হিদায়াত দান করবেন; এবং আল্লাহই তার অন্তরে পরিবর্তন এনে দিবেন। নিজ থেকে মানুষ দেখানো পরিবর্তন আনা অবশ্য মোটেই বেশিদিন টেকসই হয় না। আর যে হজের আগে যেমন ছিল হজেরপরেও তেমনি থাকলো, কোনো ভালো পরিবর্তন এলো না, তাহলে সেটি একটি চিন্তার বিষয়। অবশ্য কারো সম্পর্কে কোনো ধারনা পোষণ করাও ঠিক নয়। সব কিছু আল্লাহর হাতে এবং তিনিই ভালো জানেন।
  • হজের পর ঈমান ও আমলে দৃঢ়তা সৃষ্টি হওয়া ভালো লক্ষণ। পার্থিবতা ও দুনিয়াবী বিষয়ে অনীহা ও পরকালের প্রতি প্রবল আগ্রহ-লোভ সৃষ্টি হওয়া।
  • হজ পূর্ব জীবনে যেসব পাপ ও অন্যায় অভ্যস্ততা ছিল সেগুলো থেকে সম্পূর্ণভাবে বিমুক্ত জীবনযাপন করা। অন্তরে কোমলতা আসা।
  • হজ সম্পাদনের পর কৃত আমলকে অল্প মনে করা। আমল করার বিষয়ে প্রতিযোগিতা করা। লোক দেখানো ভাব, অহংকার ও বড়ত্বোবোধ থেকে বেঁচে থাকা। ইবাদত পালনে উৎসাহ ও চাঞ্চল্য বৃদ্ধি পাওয়া। বেশি বেশি দান সাদকা করা।
  • কথায় ও কাজে আল্লাহর ওপর বেশি ভরসা রাখা। বেশি বেশি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। বেশি বেশি দো‘আ ও যিকির করা।
  • দ্বীনের বিষয়ে জ্ঞান আহরোনের আগ্রহ সৃষ্টি হওয়া। খোলা মন নিয়ে ও যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যমে সত্যকে গ্রহণ করার মনমানসিকতা সৃষ্টি হওয়া ও নিজেকে শুদ্ধ করা।
  • আল্লাহর দ্বীনকে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রিয় জীবনের সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সচেষ্ট হওয়া।

‘‘হে আল্লাহ! তুমি আমাদের হজকে কবুল ও মঞ্জুর করে নাও”।-আমিন।

কুরআনে বর্ণিত দো‘আ ›

১-

﴿رَبَّنَآ ءَاتِنَا فِي ٱلدُّنۡيَا حَسَنَةٗ وَفِي ٱلۡأٓخِرَةِ حَسَنَةٗ وَقِنَا عَذَابَ ٱلنَّارِ﴾ [البقرة: ٢٠١]

১। হে আমাদের প্রভু! দুনিয়াতে আমাদের কল্যাণ দাও এবং আখিরাতেও কল্যাণ দাও। আর আগুনের আযাব থেকে আমাদেরকে বাঁচাও।

২-

﴿رَبَّنَا لَا تُزِغۡ قُلُوبَنَا بَعۡدَ إِذۡ هَدَيۡتَنَا وَهَبۡ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحۡمَةًۚ إِنَّكَ أَنتَ ٱلۡوَهَّابُ ٨﴾ [ال عمران: ٨]

২। হে আমাদের রব! যেহেতু তুমি আমাদেরকে হেদায়াত করেছ, কাজেই এরপর থেকে তুমি আমাদের অন্তরকে আর বক্র করো না। তোমার পক্ষ থেকে আমাদেরকে রহমত দাও। তুমিতো মহা দাতা।

৩-

﴿رَبِّ هَبۡ لِي مِن لَّدُنكَ ذُرِّيَّةٗ طَيِّبَةًۖ إِنَّكَ سَمِيعُ ٱلدُّعَآءِ﴾ [ال عمران: ٣٨]

৩। হে  আমার পরওয়ারদেগার! তোমার কাছ থেকে আমাকে তুমি উত্তম সন্তান-সন্ততি দান কর। নিশ্চয় তুমিতো মানুষের ডাক শোনো।

৪-

﴿رَبَّنَا ٱغۡفِرۡ لَنَا ذُنُوبَنَا وَإِسۡرَافَنَا فِيٓ أَمۡرِنَا وَثَبِّتۡ أَقۡدَامَنَا وَٱنصُرۡنَا عَلَى ٱلۡقَوۡمِ ٱلۡكَٰفِرِينَ﴾ [ال عمران:

৪। হে আমাদের রব! আমাদের গুনাহগুলো মাফ করে দাও। যেসব কাজে আমাদের সীমালঙ্ঘন হয়ে গেছে সেগুলোও তুমি ক্ষমা কর। আর (সৎপথে) তুমি আমাদের কদমকে অটল রেখো এবং কাফের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে তুমি আমাদেরকে সাহায্য কর।

৫-

﴿رَبَّنَا وَءَاتِنَا مَا وَعَدتَّنَا عَلَىٰ رُسُلِكَ وَلَا تُخۡزِنَا يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِۖ إِنَّكَ لَا تُخۡلِفُ ٱلۡمِيعَادَ ١٩٤﴾ [ال عمران: ١٩٤]

৫। হে রব! নবী-রাসূলদের মাধ্যমে তুমি যে পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছো তা তুমি আমাদেরকে দিয়ে দিও। আর কিয়ামতের দিন আমাদেরকে তুমি অপমানিত করিও না। তুমি তো ওয়াদার বরখেলাফ কর না।

 ৬-

﴿رَبَّنَآ ءَامَنَّا فَٱكۡتُبۡنَا مَعَ ٱلشَّٰهِدِينَ﴾ [المائ‍دة: ٨٣]

৬। হে আমাদের রব! তুমি যা কিছু নাযিল করেছো, তার ওপর আমরা ঈমান এনেছি। আমরা রাসূলের কথাও মেনে নিয়েছি। কাজেই সত্য স্বীকারকারীদের দলে আমাদের নাম লিখিয়ে দাও।

৭-

﴿رَبَّنَا ظَلَمۡنَآ أَنفُسَنَا وَإِن لَّمۡ تَغۡفِرۡ لَنَا وَتَرۡحَمۡنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ ٱلۡخَٰسِرِينَ﴾ [الاعراف: ٢٣]

৭। হে আমাদের রব! আমরা নিজেদের ওপর যুলম করেছি। এখন তুমি যদি আমাদের ক্ষমা না কর, আর আমাদের প্রতি রহম না কর তাহলে নিশ্চিতই আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাব।

সূরা আল-বাকারা: ২:২০১ সূরা আলে-ইমরান: ৩:৮ সূরা আলে-ইমরান: ৩:৩৮ সূরা আলে-ইমরান: ৩:১৪৭ সূরা আলে-ইমরান: ৩:১৯৪ সূরা আল-মায়িদা: ৫:১৮৩ সূরা আল-আ‘রাফ: ৭:২৩

৮-

﴿رَبَّنَا لَا تَجۡعَلۡنَا مَعَ ٱلۡقَوۡمِ ٱلظَّٰلِمِينَ﴾ [الاعراف: ٤٧]

৮। হে রব! আমাদেরকে যালিম সম্প্রদায়ের সাথী করো না।

৯-

﴿رَبِّ ٱجۡعَلۡنِي مُقِيمَ ٱلصَّلَوٰةِ وَمِن ذُرِّيَّتِيۚ رَبَّنَا وَتَقَبَّلۡ دُعَآءِ ٤٠﴾ [ابراهيم: ٤٠]

৯। হে আমার মালিক! আমাকে সালাত কায়েমকারী বানাও এবং আমার ছেলে-মেয়েদেরকেও নামাযী বানিয়ে দাও। হে আমার মালিক! আমার দো‘আ তুমি কবুল কর।

১০-

﴿رَبَّنَا ٱغۡفِرۡ لِي وَلِوَٰلِدَيَّ وَلِلۡمُؤۡمِنِينَ يَوۡمَ يَقُومُ ٱلۡحِسَابُ ٤١﴾ [ابراهيم: ٤١]

১০। হে আমাদের পরওয়ারদেগার! যেদিন চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশ হবে সেদিন আমাকে, আমার  মাতা-পিতাকে এবং সকল ঈমানদারদেরকে তুমি ক্ষমা করে দিও।

১১

﴿رَبَّنَآ ءَاتِنَا مِن لَّدُنكَ رَحۡمَةٗ وَهَيِّئۡ لَنَا مِنۡ أَمۡرِنَا رَشَدٗا ﴾ [الكهف: ١٠]

১১। হে আমাদের রব! তোমার অপার অসীম করুণা থেকে আমাদেরকে রহমত দাও। আমাদের কাজগুলোকে সঠিক ও সহজ করে দাও।

১২

﴿رَبِّ ٱشۡرَحۡ لِي صَدۡرِي ٢٥ وَيَسِّرۡ لِيٓ أَمۡرِي ٢٦ وَٱحۡلُلۡ عُقۡدَةٗ مِّن لِّسَانِي ٢٧ يَفۡقَهُواْ قَوۡلِي ٢٨ ﴾ [طه: ٢٥،  ٢٨]

১২। হে আমার রব! আমার বক্ষকে তুমি প্রশস্ত করে দাও। আমার কাজগুলো সহজ করে দাও। জিহ্বার জড়তা দূর করে দাও, যাতে লোকেরা আমার কথা সহজেই বুঝতে পারে।

১৩-

﴿رَّبِّ زِدۡنِي عِلۡمٗا﴾ [طه: ١١٤]

১৩। হে রব! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দাও।

 ১৪-

﴿رَبِّ لَا تَذَرۡنِي فَرۡدٗا وَأَنتَ خَيۡرُ ٱلۡوَٰرِثِينَ﴾ [الانبياء: ٨٩]

১৪। হে রব! আমাকে তুমি নিঃসন্তান অবস্থায় রেখো না। তুমিতো সর্বোত্তম ওয়ারিশ করার অধিকারী।

১৫-

﴿رَّبِّ أَعُوذُ بِكَ مِنۡ هَمَزَٰتِ ٱلشَّيَٰطِينِ ٩٧ وَأَعُوذُ بِكَ رَبِّ أَن يَحۡضُرُونِ ٩٨﴾ [المؤمنون: ٩٧،  ٩٨]

১৫। হে রব! শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আমি তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি। আমি এ থেকেও তোমার নিকট পানাহ চাই যে, শয়তান যেন আমার ধারে কাছেও ঘেষতে না পারে।

সূরা আল-আ‘রাফ: ৭:৪৭ সূরা ইবরাহীম: ১৪:৪০ সূরা ইবরাহীম: ১৪:৪১ সূরা কাহ্ফ: ১৮:১০ সূরা হূদ: ২০:২৫ সূরা হূদ: ২০:১১৪ সূরা আল-আম্বিয়া, ২১: ৮৯ সূরা আল-মুমিনুন, ২৩:৯৭-৯৮

১৬-

﴿رَبَّنَا ٱصۡرِفۡ عَنَّا عَذَابَ جَهَنَّمَۖ إِنَّ عَذَابَهَا كَانَ غَرَامًا ٦٥ إِنَّهَا سَآءَتۡ مُسۡتَقَرّٗا وَمُقَامٗا ٦٦﴾ [الفرقان: ٦٤،  ٦٥]

১৬। হে আমাদের রব! জাহান্নামের আযাব থেকে আমাদেরকে বাঁচিয়ে দিও। এর আযাব তো বড়ই সর্বনাশা। আশ্রয় ও বাসস্থান হিসেবে এটি কতই না নিকৃষ্ট স্থান।

১৭-

﴿رَبَّنَا هَبۡ لَنَا مِنۡ أَزۡوَٰجِنَا وَذُرِّيَّٰتِنَا قُرَّةَ أَعۡيُنٖ وَٱجۡعَلۡنَا لِلۡمُتَّقِينَ إِمَامًا﴾ [الفرقان: ٧٣]

১৭। হে আমাদের রব! তুমি আমাদেরকে এমন স্ত্রী-সন্তান দান কর যাদের দর্শনে আমাদের চক্ষুশীতল হয়ে যাবে। তুমি আমাদেরকে পরহেযগার লোকদের ইমাম  (অভিভাবক) বানিয়ে দাও।

১৮-

﴿رَبِّ أَوۡزِعۡنِيٓ أَنۡ أَشۡكُرَ نِعۡمَتَكَ ٱلَّتِيٓ أَنۡعَمۡتَ عَلَيَّ وَعَلَىٰ وَٰلِدَيَّ وَأَنۡ أَعۡمَلَ صَٰلِحٗا تَرۡضَىٰهُ وَأَدۡخِلۡنِي بِرَحۡمَتِكَ فِي عِبَادِكَ ٱلصَّٰلِحِينَ﴾ [النمل: ١٩]

১৮। হে আমার রব! তুমি আমার ও আমার মাতা-পিতার প্রতি যে নিয়ামত দিয়েছো এর শোকরগোজারী করার তাওফীক দাও এবং আমাকে এমন সব নেক আমল করার তাওফীক দাও যা তুমি পছন্দ কর। আর তোমার দয়ায় আমাকে তোমার নেক বান্দাদের মধ্যে শামিল করে দাও।

১৯-

﴿رَبِّ ٱنصُرۡنِي عَلَى ٱلۡقَوۡمِ ٱلۡمُفۡسِدِينَ﴾ [العنكبوت: ٣٠]

১৯। হে রব! ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে তুমি আমাকে সাহায্য কর।

সূরা আল-ফুরক্বান: ২৫:৬৫-৬৬ সূরা আল-ফুরক্বান, ২৫:৭৪ সূরা আন-নামল: ২৭:১৯ সূরা আল-‘আনকাবূত: ২৯:৩০

২০-

﴿رَبِّ هَبۡ لِي مِنَ ٱلصَّٰلِحِينَ ١٠٠﴾ [الصافات: ١٠٠]

২০। হে রব! আমাকে তুমি নেককার সন্তান দান কর।

২১-

﴿رَبِّ أَوۡزِعۡنِيٓ أَنۡ أَشۡكُرَ نِعۡمَتَكَ ٱلَّتِيٓ أَنۡعَمۡتَ عَلَيَّ وَعَلَىٰ وَٰلِدَيَّ وَأَنۡ أَعۡمَلَ صَٰلِحٗا تَرۡضَىٰهُ وَأَصۡلِحۡ لِي فِي ذُرِّيَّتِيٓۖ﴾ [الاحقاف: ١٥]

২১। হে রব! তুমি আমার ও আমার মাতা-পিতার প্রতি যে নি‘আমত দিয়েছ এর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার তাওফীক দাও এবং আমাকে এমন সব নেক আমল করার তাওফীক দাও যা তুমি পছন্দ কর। আর আমার ছেলে-মেয়ে ও পরবর্তী বংশধরকেও নেককার বানিয়ে দাও।

২২-

﴿رَبَّنَا ٱغۡفِرۡ لَنَا وَلِإِخۡوَٰنِنَا ٱلَّذِينَ سَبَقُونَا بِٱلۡإِيمَٰنِ وَلَا تَجۡعَلۡ فِي قُلُوبِنَا غِلّٗا لِّلَّذِينَ ءَامَنُواْ رَبَّنَآ إِنَّكَ رَءُوفٞ رَّحِيمٌ﴾ [الحشر: ١٠]

২২। হে আমাদের মালিক! তুমি আমাদের মাফ করে দাও। আমাদের আগে যেসব ভাইয়েরা ঈমান এনেছে, তুমি তাদেরও মাফ করে দাও। আর ঈমানদার লোকদের প্রতি আমাদের অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টি করে দিও না। হে রব! তুমিতো বড়ই দয়ালু ও মমতাময়ী।

২৩-

﴿رَبَّنَآ أَتۡمِمۡ لَنَا نُورَنَا وَٱغۡفِرۡ لَنَآۖ إِنَّكَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ قَدِيرٞ ﴾ [التحريم: ٨]

২৩। হে আমাদের রব! আমাদের জন্য তুমি আমাদের নূরকে পরিপূর্ণ করে দাও। তুমি  আমাদেরকে ক্ষমা কর। তুমি তো সবকিছুর ওপর সর্বশক্তিমান।

সূরা আস-সাফ্ফাত: ৩৭:১০০ সূরা আল-আহকাফ: ৪৬:১৫ সূরা আল-হাশর: ৫৯:১০ সূরা আত-তাহরীম: ৬৬:৮

২৪-

﴿رَّبِّ ٱغۡفِرۡ لِي وَلِوَٰلِدَيَّ وَلِمَن دَخَلَ بَيۡتِيَ مُؤۡمِنٗا وَلِلۡمُؤۡمِنِينَ وَٱلۡمُؤۡمِنَٰتِۖ﴾ [نوح: ٢٨]

২৪। হে আমার রব! আমাকে, আমার মাতা-পিতাকে, যারা মুমিন অবস্থায় আমার পরিবারে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে তাদেরকে এবং সকল মুমিন পুরুষ-নারীকে তুমি ক্ষমা করে দাও।

২৫-

﴿رَّبَّنَآ إِنَّنَا سَمِعۡنَا مُنَادِيٗا يُنَادِي لِلۡإِيمَٰنِ أَنۡ ءَامِنُواْ بِرَبِّكُمۡ فَ‍َٔامَنَّاۚ رَبَّنَا فَٱغۡفِرۡ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرۡ عَنَّا سَيِّ‍َٔاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ ٱلۡأَبۡرَارِ ١٩٣﴾ [ال عمران: ١٩٣]  

২৫। হে আমার রব! নিশ্চয় আমরা এক আহ্বানকারীকে আহবান করতে শুনেছিলাম যে, তোমরা স্বীয় প্রতিপালকের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর, তাতেই আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা কর ও আমাদের পাপরাশি মোচন কর এবং পুণ্যবানদের সাথে আমাদেরকে মৃত্যু দান কর।

২৬-

﴿رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذۡنَآ إِن نَّسِينَآ أَوۡ أَخۡطَأۡنَاۚ رَبَّنَا وَلَا تَحۡمِلۡ عَلَيۡنَآ إِصۡرٗا كَمَا حَمَلۡتَهُۥ عَلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِنَاۚ رَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلۡنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهِۦۖ وَٱعۡفُ عَنَّا وَٱغۡفِرۡ لَنَا وَٱرۡحَمۡنَآۚ أَنتَ مَوۡلَىٰنَا فَٱنصُرۡنَا عَلَى ٱلۡقَوۡمِ ٱلۡكَٰفِرِينَ﴾ [البقرة: ٢٨٦]

২৬। হে আমাদের রব! যদি আমরা ভুলে যাই কিংবা ভুল করি তবে তুমি আমাদেরকে পাকড়াও করো না। হে আমাদের রব! পূর্ববর্তীদের ওপর যে গুরুদায়িত্ব তুমি অর্পণ করেছিলে সে রকম কোনো কঠিন কাজ আমাদেরকে দিও না। হে আমাদের রব! যে কাজ বহনের ক্ষমতা আমাদের নেই এমন কাজের ভারও তুমি আমাদের দিও না। তুমি আমাদের মাফ করে দাও, আমাদের ক্ষমা কর। আমাদের প্রতি রহম কর। তুমি আমাদের মাওলা। অতএব কাফের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে তুমি আমাদেরকে সাহায্য কর।

২৭-

﴿رَبِّ هَبۡ لِي حُكۡمٗا وَأَلۡحِقۡنِي بِٱلصَّٰلِحِينَ ٨٣ وَٱجۡعَل لِّي لِسَانَ صِدۡقٖ فِي ٱلۡأٓخِرِينَ ٨٤ وَٱجۡعَلۡنِي مِن وَرَثَةِ جَنَّةِ ٱلنَّعِيمِ ٨٥ وَٱغۡفِرۡ لِأَبِيٓ إِنَّهُۥ كَانَ مِنَ ٱلضَّآلِّينَ ٨٦ وَلَا تُخۡزِنِي يَوۡمَ يُبۡعَثُونَ ٨٧﴾ [الشعراء: ٨٣،  ٨٧]

২৭। হে রব! আমাকে জ্ঞান-বুদ্ধি দান কর এবং আমাকে নেককার লোকদের সান্নিধ্যে রেখো। এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমার সুখ্যাতি চলমান রেখো। আমাকে তুমি নিয়ামতে ভরা জান্নাতের বাসিন্দা বানিয়ে দিও। যেদিন সব মানুষ আবার জীবিত হয়ে উঠবে সেদিন আমাকে তুমি অপমানিত করো না।

২৮-

﴿رَبِّ أَوۡزِعۡنِيٓ أَنۡ أَشۡكُرَ نِعۡمَتَكَ ٱلَّتِيٓ أَنۡعَمۡتَ عَلَيَّ وَعَلَىٰ وَٰلِدَيَّ وَأَنۡ أَعۡمَلَ صَٰلِحٗا تَرۡضَىٰهُ وَأَدۡخِلۡنِي بِرَحۡمَتِكَ فِي عِبَادِكَ ٱلصَّٰلِحِينَ﴾ [النمل: ١٩]

২৮। হে আমার রব! তুমি আমার ও আমার মাতা-পিতার প্রতি যে নি‘আমত দিয়েছো এর শোকরগোজারী করার তাওফীক দাও এবং আমাকে এমন সব নেক আমল করার তাওফীক দাও যা তুমি পছন্দ কর। আর তোমার দয়ায় আমাকে তোমার নেক বান্দাদের মধ্যে শামিল করে দাও।

সূরা নূহ: ৭১:২৮ সূরা আলে ইমরান: ৩:১৯৩

২৯

﴿رَبِّ أَوۡزِعۡنِيٓ أَنۡ أَشۡكُرَ نِعۡمَتَكَ ٱلَّتِيٓ أَنۡعَمۡتَ عَلَيَّ وَعَلَىٰ وَٰلِدَيَّ وَأَنۡ أَعۡمَلَ صَٰلِحٗا تَرۡضَىٰهُ وَأَصۡلِحۡ لِي فِي ذُرِّيَّتِيٓۖ﴾ [الاحقاف: ١٥]

২৯। হে রব! তুমি আমার ও আমার মাতা-পিতার প্রতি যে নি‘আমত দিয়েছ এর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার তাওফীক দাও এবং আমাকে এমন সব নেক আমল করার তাওফীক দাও যা তুমি পছন্দ কর। আর আমার ছেলে-মেয়ে ও পরবর্তী বংশধরকেও নেককার বানিয়ে দাও।

৩০-

﴿رَبَّنَا ٱغۡفِرۡ لَنَا وَلِإِخۡوَٰنِنَا ٱلَّذِينَ سَبَقُونَا بِٱلۡإِيمَٰنِ وَلَا تَجۡعَلۡ فِي قُلُوبِنَا غِلّٗا لِّلَّذِينَ ءَامَنُواْ رَبَّنَآ إِنَّكَ رَءُوفٞ رَّحِيمٌ﴾ [الحشر: ١٠]

৩০। হে আমাদের রব! তুমি আমাদের মাফ করে দাও। আমাদের আগে যেসব ভাইয়েরা ঈমান এনেছে, তুমি তাদেরও মাফ করে দাও। আর ঈমানদার লোকদের প্রতি আমাদের অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টি করে দিও না। হে রব! তুমিতো বড়ই দয়ালু ও মমতাময়ী।

সূরা আল-আহকাফ: ৪৬:১৫ সূরা আল-হাশর, আয়াত: ৫৯:১০

š হাদীসে বর্ণিত দো‘আ

৩১

«اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ وَالْجُبْنِ وَالْهَرَمِ وَالْبُخْلِ وَأَعُوْذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ».

৩১। হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট আশ্রয় চাই অক্ষমতা, অলসতা, কাপুরুষতা, বার্ধক্য ও কৃপণতা থেকে। আশ্রয় চাই তোমার নিকট কবরের আযাব ও জীবন মরণের ফিতনা থেকে।

৩২

«اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ جَهْدِ الْبَلَاءِ وَدَرَكِ الشَّقَاءِ وَسُوْءِ الْقَضَاءِ وَشَمَاتَةِ الأَعْدَاءِ».

৩২। হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট আশ্রয় চাই, কঠিন বালা-মুসিবত, দুর্ভাগ্য, ভাগ্যের পরিহাস  ও শত্রুদের বিদ্বেষ থেকে।

৩৩-

«اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَسْأَلُكَ الْهُدٰى وَالتُّقٰى وَالْعَفَافَ وَالْغِنٰى».

৩৩। হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট হেদায়াত তাকওয়া, পবিত্র জীবন ও অমুখাপেক্ষিতা চাই।

৩৪-

«اَللّٰهُمَّ اهْدِنِيْ وَسَدِّدْنِيْ – اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَسْأَلُكَ الْهُدٰى وَالسَّدَادَ».

৩৪। হে আল্লাহ! আমাকে হেদায়াত দান কর, আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত কর। হে আল্লাহ! তোমার নিকট হেদায়াত ও সঠিক পথ কামনা করছি।

সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৩৬৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭০৬ বুখারী, হাদীস নং ৬৩৪৭ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭২১ মুসলিম, হাদীস নং ২৭২১

৩৫-

«اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ زَوَالِ نِعْمَتِكَ وَتَحَوُّلِ عَافِيَتِكَ وَفُجَاءَةِ نِقْمَتِكَ وَجَمِيْعِ سَخَطِكَ».

৩৫। হে আল্লাহ! তোমার দেওয়া নেয়ামাত চলে যাওয়া ও সুস্থতার পরিবর্তন হওয়া থেকে আশ্রয় চাই, আশ্রয় চাই তোমার পক্ষ থেকে আকষ্মিক গজব আসা ও তোমার সকল অসন্তোষ থেকে।

৩৬-

«اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا عَمِلْتُ وَمِنْ شَرِّ مَا لَمْ أَعْمَلْ».

৩৬। হে আল্লাহ! আমি আমার অতীতের কৃতকর্মের অনিষ্টতা থেকে তোমার কাছে আশ্রয় চাই এবং যে কাজ আমি করিনি তার অনিষ্টতা থেকেও আশ্রয় চাই।

৩৭-

«اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أِعُوْذُ بِكَ أنْ أُشْرِكَ بِكَ وَأَنَا أِعْلَمُ وَأَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لَا أَعْلَمُ».

৩৭। হে আল্লাহ! আমার জানা অবস্থায় তোমার সাথে শির্ক করা থেকে তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।  আর যদি অজান্তে শির্ক হয়ে থাকে তবে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

৩৮-

«اَللّٰهُمَّ رَحْمَتَكَ أَرْجُوْ فَلَا تَكِلْنِيْ إِلٰى نَفْسِيْ طَرْفَةَ عَيْنٍ وَأَصْلِحْ لِيْ شَأْنِيْ كُلَّه لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ».

৩৮। হে আল্লাহ! তোমার রহমত প্রত্যাশা করছি। সুতরাং তুমি আমার নিজের ওপর তাৎক্ষণিকভাবে কোনো দায়িত্ব অর্পণ করে দিও না। আর আমার সব কিছু তুমি সহীহ শুদ্ধ করে দাও। তুমি ছাড়া আর কোনো মা‘বুদ নেই।

৩৯-

«اَللّٰهُمَّ اجْعَلِ الْقُرْاٰنَ رَبِيْعَ قَلْبِيْ وَنُوْرَ صَدْرِيْ وَجِلَاءَ حُزْنِيْ وَذَهَابَ هَمِّيْ».

৩৯। হে আল্লাহ! কুরআনকে তুমি আমার হৃদয়ের বসন্তকাল বানিয়ে দাও, বানিয়ে দাও আমার বুকের নূর এবং কুরআনকে আমার দুঃখ ও দুঃশ্চিন্তা দূর করার মাধ্যম বানিয়ে দাও।

৪০-

«اَللّٰهُمَّ مُصَرِّفَ الْقُلُوْبِ صَرِّفْ قُلُوْبَنَا عَلٰى طَاعَتِكَ».

৪০। হে অন্তরের পরিবর্তন সাধনকারী রব! আমাদের অন্তরকে তোমার আনুগত্যের দিকে ধাবিত করে দাও।

৪১-

«يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوْبِ ثَبِّتْ قَلْبِيْ عَلَى دِيْنِكَ».

৪১। হে অন্তরের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে তুমি তোমার দীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখ।

৪২-

«اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَسْأَلُكَ الْعَافِيَةَ فِي الدُّنْيَا وَالْاٰخِرَةِ».

৪২। হে আল্লাহ! তোমার কাছে আমি দুনিয়া ও আখেরাতের নিরাপত্তা ও সুস্থতা কামনা করছি।

মুসলিম, হাদীস নং ২৭৩৯ মুসলিম, হাদীস নং ২৭১৬ সহীহ আদাবুল মুফরাদ, হাদীস নং ৭১৬ আবু দাউদ, হাদীস নং ৫০৯০ মুসনাদ আহমদ, হাদীস নং ৩৭০৪ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬৫৪ মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ২১৪০

৪৩-

«اَللّٰهُمَّ أَحْسِنْ عَاقِبَتَنَا فِي الْأُمُوْرِ كُلِّهَا وَأَجِرْنَا مِنْ خِزْيِ الدُّنْيَا وَعَذَابِ الْاٰخِرَةِ».

৪৩। হে আল্লাহ! তুমি আমাদের সকল কাজের পরিণতি সুন্দর ও উত্তম করে দাও এবং আমাদেরকে দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা, অপমান এবং আখেরাতের শাস্তি থেকে বাঁচিয়ে দিও।

৪৪-

«اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ شَرِّ سَمْعِيْ وَمِنْ شَرِّ بَصَرِيْ وَمِنْ شَرِّ لِسَانِيْ وَمِنْ شَرِّ قَلْبِيْ وَمِنْ شَرِّ مَنِيِّيْ».

৪৪। হে আল্লাহ! আমার শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি, আমার জিহবা ও অন্তর এবং আমার ভাগ্য এসব অঙ্গের অনিষ্টতা থেকে তোমার নিকট আশ্রয় চাই।

৪৫-

«اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ الْبَرَصِ وَالْجُنُوْنِ وَالْجُذَامِ وَمِنْ سَيِّئْ الْأَسْقَامِ».

৪৫। হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট শ্বেতরোগ পাগলামি ও কুষ্ঠ রোগসহ সকল জটিল রোগ থেকে আশ্রয় চাই।

৪৬-

«اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ مُنْكَرَاتِ الْأَخْلَاقِ وَالْأَعْمَالِ وَالْأَهْوَاءِ».

৪৬। হে আল্লাহ! তোমার নিকট আমি অসৎ চরিত্র, অপকর্ম এবং কুপ্রবৃত্তি থেকে আশ্রয় চাই।

আবু দাউদ, হাদীস নং ৫০৯০ মুসনাদ আহমদ, হাদীস নং ৩৭০৪ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬৫৪ মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ২১৪০ মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১৭১৭৬ আবু দাউদ, হাদীস নং ১৫৫১ আবু দাউদ, হাদীস নং ১৫৫৪ তিরমিযী, হাদীস নং ৩৫৯১

৪৭-

«اَللّٰهُمَّ إِنَّكَ عُفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّيْ».

৪৭। হে আল্লাহ! তুমিতো ক্ষমার ভাণ্ডার, ক্ষমা করাকে তুমি পছন্দ কর। কাজেই আমাকে তুমি ক্ষমা করে দাও।

৪৮-

«اَللّٰهُمَّ اغْفِرْ لِيْ وَارْحَمْنِيْ وَاهْدِنِيْ وَعَافِنِيْ وَارْزُقْنِيْ».

৪৮। হে আল্লাহ! তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমার প্রতি দয়া কর, আমাকে হেদায়াত কর, নিরাপদে রাখ এবং আমাকে রিযিক দান কর।

৪৯-

«اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ ظَلَمْتُ نَفْسِيْ ظُلْمًا كَثِيْرًا وَلَا يَغْفِرُ الذُّنُوْبَ إِلَّا أَنْتَ فَاغْفِرْ لِيْ مَغْفِرَةً مِّنْ عِنْدِكَ وَارْحَمْنِيْ إِنَّكَ أَنْتَ الْغَفُوْرُ الرَّحِيْمُ».

৪৯। হে আল্লাহ! আমি আমার নিজের প্রতি অনেক যুলম করে ফেলেছি। আর তুমি ছাড়া গুনাহ ক্ষমা করার কেউ নেই। অতএব, তুমি তোমার পক্ষ থেকে আমাকে বিশেষভাবে ক্ষমা কর, আমার প্রতি দয়া কর। নিশ্চয় তুমি বড়ই ক্ষমাশীল ও অতিশয় দয়ালু রব।

৫০-

«اَللّٰهُمَّ اغْفِرْ لِيْ ذَنْبِيْ وَوَسِّعْ لِيْ فِيْ دَارِيْ وَبَارِكْ لِيْ فِيمَا رَزَقْتَنِيْ».

৫০। হে আল্লাহ! তুমি আমার গুনাহকে ক্ষমা করে দাও, আমার ঘরে প্রশস্ততা দান কর এবং আমার রিযিকে বরকত দাও।

৫১-

«اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ وَرَحْمَتِكَ فَإِنَّهُ لَا يَمْلِكُهَا إِلَّا أَنْتَ».

৫১। হে আল্লাহ! তোমার নিকট অনুগ্রহ ও দয়া চাই। কারণ অনুগ্রহ ও দয়ার মালিক তুমি ছাড়া কেউ না।

৫২-

«اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنَ التَّرَدِّيْ وَالْهَدْمِ وَالْغَرَقِ وَالْحَرِيْقِ وَأَعُوْذُ بِكَ أَنْ يَتَخَبَّطَنِيَ الشَّيْطَانُ عِنْدَ الْمَوْتِ وَأَعُوْذُ بِكَ أَنْ أَمُوْتَ فِيْ سَبِيْلِكَ مُدْبِرًا وَأَعُوْذُ بِكَ أَنْ أَمُوْتَ لَدِيْغًا».

৫২। হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট জমিন ধসে পড়া, ধ্বংস হওয়া, পানিতে ডুবা ও আগুনে পোড়া থেকে আশ্রয় চাই। মৃত্যুর সময় শয়তানের ছোবল থেকে তোমার নিকট আশ্রয় চাই। আশ্রয় চাই তোমার নিকট তোমার পথে পৃষ্ঠপ্রদর্শন হয়ে মৃত্যু থেকে। তোমার নিকট আশ্রয় চাই দংশনজনিত মৃত্যু থেকে।

৫৩-

«اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ الْجُوْعِ فَإِنَّهُ بِئْسَ الضَّجِيْعُ وَأَعُوْذُ بِكَ مِنْ الْخِيَانَةِ فَإِنَّهَا بِئْسَتِ الْبِطَانَةُ».

৫৩। হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট ক্ষুধা থেকে আশ্রয় চাই। করণ এটি নিকৃষ্ট শয্যাসঙ্গী। খেয়ানত থেকেও তোমার কাছে আশ্রয় চাই। কারণ এটি নিকৃষ্ট বন্ধু।

৫৪

«اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ الْفَقْرِ وَالْقِلَّةِ وَالذِّلَّةِ وَأَعُوْذُ بِكَ مِنْ أَنْ أَظْلِمَ أَوْ أُظْلَمَ».

৫৪। হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট দারিদ্র্য, স্বল্পতা, হীনতা থেকে আশ্রয় চাই। আশ্রয় চাই যালিম ও মাযলুম হওয়া থেকে।

তিরমিযী, হাদীস নং ৩৫১৩ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬৯৬ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৮৩৪ মুসনাদে আহমদ ত্ববরানী নাসাঈ, হাদীস নং ৫৫৩১ আবু দাঊদ, হাদীস নং ৫৪৬ নাসাঈ, আবু দাঊদ

৫৫- 

«اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ يَوْمِ السُّوْءِ وَمِنْ لَيْلَةِ السُّوْءِ وَمِنْ سَاعَةِ السُّوْءِ وَمِنْ صَاحِبِ السُّوْءِ وَمِنْ جَارِ السُّوْءِ فِيْ دَارِ الْمَقَامَةِ».

৫৫। হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট আশ্রয় চাই খারাপ দিন, খারাপ রাত, বিপদ মুহূর্ত, অসৎসঙ্গী এবং স্থায়ীভাবে বসবাসকারী খারাপ প্রতিবেশী থেকে।

৫৬-

«اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَسْئَلُكَ الْجَنَّةَ وَأَسْتَجِيْرُ بِكَ مِنَ النَّارِ».

৫৬। হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট জান্নাতের প্রার্থনা করছি এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি চাচ্ছি। (তিনবার)

৫৭-

«اَللّٰهُمَّ فَقِّهْنِيْ فِي الدِّيْنِ».

৫৭। হে আল্লাহ! আমাকে দীনের পান্ডিত্য দান কর।

৫৮-

«اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا وَّرِزْقًا طَيِّبًا وَّعَمَلًا مُّتَقَبَّلًا».

৫৮। হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট উপকারী ‘ইলম, পবিত্র রিযিক এবং কবূল আমলের প্রার্থনা করছি।

৫৯-

«رَبِّ اغْفِرْ لِيْ وَتُبْ عَلَيَّ إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الْغَفُوْرُ».

৫৯। হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করে দাও আমার তাওবা কবূল কর। নিশ্চয় তুমি তাওবা গ্রহণকারী ও অতিশয় ক্ষমাশীল।

৬০

«اَللّٰهُمَّ طَهِّرْنِيْ مِنَ الذُّنُوْبِ وَالْخَطَايَا – اَللّٰهُمَّ نَقِّنِيْ مِنْهَا كَمَا يُنَقَّى الثَّوْبُ الْأَبْيَضُ مِنْ الدَّنَسِ  اَللّٰهُمَّ طَهِّرْنِيْ بِالثَّلْجِ وَالْبَرَدِ وَالْمَاءِ الْبَارِد»ِ.

৬০। হে আল্লাহ! আমাকে যাবতীয় গোনাহ ও ভুলভ্রান্তি থেকে পবিত্র কর। হে আল্লাহ! আমাকে গোনাহ থেকে এমনভাবে পরিচ্ছন্ন কর যেভাবে সাদা কাপড়কে ময়লা থেকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা হয়। হে আল্লাহ! আমাকে বরফ, শীতল ও ঠান্ডা পানি দিয়ে পবিত্র কর।

৬১-

«اَللّٰهُمَّ رَبَّ جِبْرَائِيْلَ وَمِيْكَائِيْلَ وَرَبَّ إِسْرَافِيْلَ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ حَرِّ النَّارِ وَمِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ».

৬১। হে আল্লাহ! হে জিবরীল, মীকাঈল ও ইসরাফীলের রব! আমি তোমার নিকট জাহান্নামের উত্তাপ ও কবরের শাস্তি থেকে আশ্রয় চাই।

৬২-

«اَللّٰهُمَّ أَلْهِمْنِيْ رُشْدِيْ وَأَعِذْنِيْ مِنْ شَرِّ نَفْسِيْ».

৬২। হে আল্লাহ! তুমি আমার অন্তরে হেদায়েতের অনুপ্রেরণা দান কর। আমার অন্তরের অনিষ্টতা থেকে আমাকে বাঁচিয়ে রাখো।

সহীহ জামেউস সগীর, হাদীস নং ১২৯৯ তিরমিযী, ইবন মাজাহ সহীহ সহীহ বুখারী; ফাতহুলবারী; সহীহ মুসলিম ইবন মাজাহ আবু দাঊদ, তিরমিযী, হাদীস নং ৩৪৩৪ নাসাঈ, হাদীস নং ৪০২ নাসাঈ, হাদীস নং ৫৫১৯ ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৩৪৮৩

৬৩-

«اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا، وَأَعُوْذُ بِكَ مِنْ عِلْمٍ لَّا يَنْفَعُ».

৬৩। হে আল্লাহ! তোমার নিকট আমি উপকার দানকারী ইলম চাই, এমন ইলম থেকে তোমার নিকট আশ্রয় চাই যা কোনো উপকারে আসে না।

৬৪-

«اَللّٰهُمَّ جَنِّبْنِيْ مُنْكَرَاتِ الْأَخْلَاقِ وَالْأَهْوَاءِ وَالْأَعَمَالِ وَالْأَدْوَاءِ».

৬৪। হে আল্লাহ! আমাকে অসৎ চরিত্র, কুপ্রবৃত্তি, অপকর্ম ও অপ্রতিষেধক (ঔষধ) থেকে দূরে রাখ।

৬৫-

«اَللّٰهُمَّ قَنِّعْنِيْ بِمَا رَزَقْتَنِيْ وَبَارِكْ لِيْ فِيْهِ وَاخْلُفْ عَلَيَّ كُلَّ غَائِبَةٍ لِيْ بِخَيْر»ٍ.

৬৫। হে আল্লাহ! আমাকে যে রিযিক দান করেছ এতে তুমি আমাকে তুষ্টি দান কর এবং বরকত দাও। আর আমার প্রতিটি অজানা বিষয়ের পরে আমাকে তুমি কল্যাণ এনে দাও।

৬৬-

«اَللّٰهُمَّ حَاسِبْنِيْ حِسَابًا يَّسِيْرًا».

৬৬। হে আল্লাহ! আমার হিসাবকে তুমি সহজ করে দাও।

৬৭-

«اَللّٰهُمَّ أَعِنِّيْ عَلٰى ذِكْرِكَ وَشُكْرِكَ وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ»

৬৭। হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে তোমার যিকির, কৃতজ্ঞতা এবং তোমার উত্তম ইবাদাত করার তাওফীক দাও।

ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৩৮৪৩ মুসতাদরাকে হাকেম মুসতাদরাকে হাকেম মিশকাত, হাদীস নং ৫৫৬২ আবু দাউদ, হাদীস নং ১৫২২

৬৮-

«اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَسْأَلُكَ إِيْمَانًا لَا يَرْتَدُّ وَنَعِيْمًا لَا يَنْفَدُ وَمُرَافَقَةَ النَّبِيِّ e فِيْ أَعْلٰى جَنَّةِ الْخُلْدِ».

৬৮। হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট এমন ঈমানের প্রার্থনা করছি, যে ঈমান হবে দৃঢ় ও মজবুত, যা নড়বড়ে হবে না, চাই এমন নি‘আমত যা ফুরিয়ে যাবে না। এবং চিরস্থায়ী সুউচ্চ জান্নাতে প্রিয় নবী মুহম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে থাকার তাওফীক আমাকে দিও।

৬৯-

«اَللّٰهُمَّ قِنِيْ شَرَّ نَفْسِيْ وَاعْزِمْ لِيْ عَلٰى أَرْشَدِ أَمْرِيْ – اَللّٰهُمَّ اغْفِرْ لِيْ مَا أَسْرَرْتُ وَمَا أَعْلَنْتُ وَمَا أَخْطَأْتُ وَمَا عَمَدْتُ وَمَا عَلِمْتُ وَمَا جَهِلْتُ».

৬৯। হে আল্লাহ! আমাকে আমার আত্মার অনিষ্টতা থেকে রক্ষা কর। পথনির্দেশপূর্ণ কাজে আমাকে তুমি দৃঢ় রাখ। হে আল্লাহ! আমি যা গোপন করি এবং যা প্রকাশ করি, ভুল করি, ইচ্ছা বশতঃ করি, যা জেনে করি এবং না জেনে করি- এসব কিছুতে আমাকে তুমি ক্ষমা করে দিও।

৭০-

«اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ غَلَبَةِ الدَّيْنِ وَغَلَبَةِ الْعَدُوِّ وَشَمَاتَةِ الأَعْدَاءِ».

৭০। হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট ঋণের প্রভাব ও আধিক্য, শত্রুর বিজয় এবং শত্রুদের আনন্দ উল্লাস থেকে আশ্রয় চাই।

৭১-

«اَللّٰهُمَّ اغْفِرْ لِيْ وَاهْدِنِيْ وَارْزُقْنِيْ وَعَافِنِيْ أَعُوْذُ بِاللهِ مِنْ ضِيْقِ الْمَقَامِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ».

৭১। হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা কর, আমাকে হিদায়াত দান কর, আমাকে রিযিক দান কর, আমাকে নিরাপদে রাখ, কিয়ামাতের দিনের সংকীর্ণ স্থান থেকে তোমার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।

৭২-

«اَللّٰهُمَّ أَحْسَنْتَ خَلْقِيْ فَأَحْسِنْ خُلُقِيْ».

৭২। হে আল্লাহ! তুমি আমার আকৃতি ও অবয়বকে সুন্দর করেছ। অতএব, আমার চরিত্রকেও সুন্দর করে দাও।

৭৩-

«اَللّٰهُمَّ ثَبِّتْنِيْ وَاجْعَلْنِيْ هَادِيًا مَهْدِيًّا».

৭৩। হে আল্লাহ! তুমি আমাকে অটল-অবিচল রাখ এবং আমাকে পথপ্রদর্শক ও হিদায়াতপ্রাপ্ত হিসেবে গ্রহণ করে নাও।

৭৪-

«اَللّٰهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ التَّرَدِّي وَالْهَدْمِ وَالْغَرَقِ وَالْحَرِيقِ وَأَعُوذُ بِكَ أَنْ يَتَخَبَّطَنِي الشَّيْطَانُ عِنْدَ الْمَوْتِ وَأَعُوذُ بِكَ أَنْ أَمُوتَ فِي سَبِيلِكَ مُدْبِرًا وَأَعُوذُ بِكَ أَنْ أَمُوتَ لَدِيغًا»

৭৪। হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট যমীন ধসে পড়া, ধ্বংস হওয়া, পানিতে ডুবা ও আগুনে পোড়া থেকে আশ্রয় চাই। মৃত্যুর সময় শয়তানের ছোবল থেকে তোমার নিকট আশ্রয় চাই। আশ্রয় চাই তোমার নিকট তোমার পথে পৃষ্ঠপ্রদর্শন হয়ে মৃত্যু থেকে। তোমার নিকট আশ্রয় চাই দংশনজনিত মৃত্যু থেকে।

ইবন হিব্বান মুসতাদরাকে হাকেম নাসাঈ, হাদীস নং ৫৪৭৫ নাসাঈ, হাদীস নং ১৬১৭ জামেউস সগীর, হাদীস নং ১৩০৭ সহীহ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ফাতহুল বারী নাসাঈ, হাদীস নং ৫৫৩১

৭৫-

«اَللّٰهُمَّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي ظُلْمًا كَثِيرًا وَلاَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلاَّ أَنْتَ فَاغْفِرْ لِي مَغْفِرَةً مِنْ عِنْدِكَ وَارْحَمْنِي إِنَّك أَنْتَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ»

৭৫। হে আল্লাহ! আমি আমার নিজের প্রতি অনেক যুলুম করে ফেলেছি। আর তুমি ছাড়া গুনাহ ক্ষমা করার কেউ নেই। অতএব, তুমি তোমার পক্ষ থেকে আমাকে বিশেষভাবে ক্ষমা কর, আমার প্রতি দয়া কর। নিশ্চয় তুমি বড়ই ক্ষমাশীল ও অতিশয় দয়ালু রব।

اَللّٰهُمَّ صَلِّ عَلٰى مُحَمَّدٍ وَّعَلٰى اٰلِه وَأَصْحَابِه أَجْمَعِيْنَ.

“হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর পরিবার পরিজন ও সকল সাহাবীগণের প্রতি দুরূদ ও সালাম বর্ষণ করুন”।

সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৮৩৪

ব্যবহৃত তথ্যসম্ভার ও বইসমূহ‎ ›

ভিডিও: হজ – ধাপে ধাপে, হুদা টিভি : শাইখ মুহাম্মাদ সালাহ।

ভিডিও: সৌদি আরবের মিনিস্ট্রি অব ইসলামিক অ্যাফেয়ার্স কর্তৃক নির্মিত হজ ও  উমরাহ প্রামাণ্যচিত্র।

বই: হজ, উমরাহ ও মসজিদে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিয়ারত নির্দেশিকা : মিনিস্ট্রি অব ইসলামিক অ্যাফেয়ার্স, ইসলামি দাওয়া, ইরশাদ, আওকাফ, রিয়াদ। ১৪২৮ হিজরী।

বই: তাফসিরুল উশরিল আখির মিনাল কুরআনিল কারিম। (পৃষ্ঠা-১৩৮..)

বই: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে হজ করেছেন (জাবির রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু যেমন বর্ণনা করেছেন): শাইখ মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দিন আলবানী (রহ.)। (বিসিআরএফ)

বই: ছহীহ হজ উমরাহ ও যিয়ারত নির্দেশিকা: আকরামুজ্জামান ইবন আব্দুস সালাম।

বই: কুরআন ও হাদীসের আলোকে হজ, উমরাহ ও যিয়ারাহ: শাইখ আবদুল আযীয ইবন আবদুল্লাহ ইবন বায।

বই: পবিত্র মক্কার ইতিহাস: শাইখ ছফীউর রহমান মোবারকপুরী। (পৃষ্ঠা: ১৩৭-১৮৩)

বই: আহায্যুকা সাহিহুন (আপনার হজ শুদ্ধ হচ্ছে কি?): শাইখ মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দিন আলবানী।

বই: যুল হজের তের দিন: আব্দুল হামীদ আল-ফাইযী।

বই: Innovations of Hajj, Umrah & Visiting Madinah. By: Shaikh Muhammad Nasiruddin Albani.

বই: হজ, উমরাহ ও যিয়ারত গাইড: ড. মনজুরে এলাহী, আব্দুল্লাহ শহীদ আব্দুর রহমান, নু‘মান আবুল বাশার, কাউসার ইবন খালেদ, ইকবাল হোসেইন মাসুম, আবুল কালাম আজাদ, জাকেরুল্লাহ আবুল খায়ের, মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান।

বই: হজ ও উমরাহ: মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব।

বই: প্রশ্নোত্তরে হজ ও উমরা: অধ্যাপক মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম।

বই: প্রাকটিক্যাল হজ ও উমরা: মুহাম্মাদ রফিকুল ইসলাম।

বই: হিসনুল মুসলিম: দৈনন্দিন যিকির ও দু’আর সমাহার। অনুবাদে: মুহাম্মাদ এনামুল হক। সম্পাদনায়: মুহাম্মাদ রকীবুদ্দীন হোসাইন।

বই: আইনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দো‘আ অধ্যায় : আব্দুর রযযাক ইবন ইউসুফ।

বই: শুধু আল্লাহর কাছে চাই: অধ্যাপক মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *